Thursday, October 8, 2026

ভগবান বুদ্ধের শিক্ষা শুধু উত্তর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না

 ভগবান বুদ্ধের শিক্ষা শুধু উত্তর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; কালক্রমে এর প্রভাব দক্ষিণ ভারতের কেরালাতেও পৌঁছেছিল। এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র হলো পালায়ম তাম্রলিপি।


আনুমানিক খ্রিস্টীয় নবম-দশম শতাব্দীর পালায়ম তাম্রলিপি মধ্যযুগীয় কেরালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। এই তাম্রলিপিগুলো ছিল তৎকালীন শাসকদের দ্বারা জারি করা সরকারি দলিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ভূমি অনুদান, কর আরোপের অধিকার, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রদত্ত বিশেষাধিকার স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করা।

সেই সময়ে চেরা রাজ্য পশ্চিম উপকূলের সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। আরব, রোমান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বণিকদের সাথে কেরালার গভীর যোগাযোগ ছিল। এই বাণিজ্য পথগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও আদান-প্রদান হতো। ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, এই সময়ের আগে এবং সেই সময়ে কেরালায় বৌদ্ধ ও জৈন ঐতিহ্যের প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। এর প্রমাণ শুধু সাহিত্যেই নয়, অসংখ্য প্রাচীন ভাস্কর্য, স্থানের নাম এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষেও পাওয়া যায়।

পালায়াম তাম্রলিপিগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দেয় যে মধ্যযুগীয় কেরালার সমাজ ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে সাদরে গ্রহণ করত। এগুলোতে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিপক্কতা, ভূমির মালিকানার একটি সুস্পষ্ট ব্যবস্থা, কর আদায়ের একটি পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার নীতির বিশদ বিবরণ রয়েছে। এই শিলালিপিগুলো আরও দেখায় যে তৎকালীন রাজকীয় ক্ষমতা কেবল শাসনকার্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

এই তাম্রলিপিগুলোতে ভাট্টেলুট্টু এবং গ্রান্থা লিপি ব্যবহৃত হয়েছে, যা দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন লিখন ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই কারণে, ঐতিহাসিক, শিলালিপিবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা কেরালার মধ্যযুগীয় ইতিহাস, প্রশাসন, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ অধ্যয়নের জন্য এই তাম্রলিপিগুলোকে একটি অমূল্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।

যদিও পালায়াম তাম্রলিপিগুলোতে সরাসরি ভগবান বুদ্ধের উল্লেখ নেই, তবুও এগুলো এমন একটি ঐতিহাসিক যুগের আভাস দেয় যখন কেরালার সমাজ ও সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের স্মৃতি তখনও প্রচলিত ছিল। অতএব, পালায়াম তাম্রলিপিগুলো কেবল তাম্রলিপি নয়, বরং সেই যুগের এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর, যা আজও আমাদের দক্ষিণ ভারতের সমৃদ্ধ ও বহু-ধর্মীয় ইতিহাসে নিমজ্জিত করে।

শুধুমাত্র স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শনের মাধ্যমেই নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মূল নথিপত্র পাঠের মাধ্যমেও ইতিহাসকে বোঝা সম্ভব।

***সুমনপাল ভিক্ষু***

No comments:

Post a Comment