আত্ম-সমালোচনা বনাম অন্যদের দোষারোপ
সুমনপাল ভিক্ষু
একজন ভালো বন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন :
১: পরিস্থিতি যখন অনুকূল থাকে না, তখন আমরা কীভাবে নিজেকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকতে পারি?
২: আধ্যাত্মিক অপর্যাপ্ততা বা ঘাটতির অনুভূতি থেকে আমরা কীভাবে মুক্তি পেতে পারি?
উত্তর ১:
দোষারোপের (তা নিজের ক্ষেত্রেই হোক বা অন্যের ক্ষেত্রে) মধ্যে ঘৃণা বা বিদ্বেষের একটি রেশ থাকে,
যা গঠনমূলক কাজের মাধ্যম হিসেবে একে একেবারেই অনুপযুক্ত করে তোলে... গঠনমূলক সমালোচনা বা সদুপদেশ (নিজের বা অন্যের ক্ষেত্রে) দেওয়া উচিত ভগবান বুদ্ধের নির্দেশিত এই ৫টি নীতির ওপর ভিত্তি করে :
[১] "আমি কি সঠিক সময়ে চিন্তা বা কথা বলছি?"
[২] "আমি কি প্রকৃত সত্য বা বাস্তব বিষয় নিয়ে চিন্তা বা কথা বলছি?"
[৩] "আমার চিন্তা বা কথা কি কোমল নাকি কঠোর?"
[৪] "আমার চিন্তা বা কথা কি দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনে?"
[৫] "আমার চিন্তা বা কথা কি সদয় হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে কোনো বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব (অন্তর্নিহিত বা বাহ্যিক) কাজ করছে?"
উত্তর ২: “আধ্যাত্মিক অপর্যাপ্ততা”-র অনুভূতিকে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে কাজে লাগানো যেতে পারে :
ক : কুশলতার সঙ্গে : জরুরি অবস্থার (urgency) অনুভূতি জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে নিজের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার বা সুদৃঢ় করতে উদ্বুদ্ধ হওয়া!
খ: অকুশলতার সঙ্গে: নিজেকে দোষারোপ ও ঘৃণা করার মাধ্যমে মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যা সমস্ত ভালো প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে, যখনই ‘খ’ অবস্থার উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে, তখনই মনকে ‘ক’ অবস্থার দিকে ঘুরিয়ে নিতে হবে। এটি মনের মধ্যে উদ্দেশ্যবোধ (purposefulness) জাগিয়ে তুলে তাকে উন্নত করতে পারে! এমনকি কোনো ‘খারাপ’, অবাঞ্ছিত, ভুল বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যেও—এমনকি কোনো অযৌক্তিক ঘটনার মাঝেও—একটি ‘অর্থ’ বা তাৎপর্য খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে। যেমন: “আহা! এই হতাশাজনক ঘটনাটি আসলে কত চমৎকার একটি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র এবং অগ্রগতির সুযোগ!” অথবা : “ঠিক আছে, তবে এখানে উন্নতির যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে...” তবে : আত্ম-সমালোচনার উপযোগিতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করে ব্যক্তির স্বভাবের ওপর :
১: যারা মূলত লোভী, কামুক ও আকাঙ্ক্ষাপরায়ণ, তারা আত্মতুষ্টির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
২: যারা মূলত রাগী ও খিটখিটে মেজাজের, তারা সত্য অস্বীকার করা বা নিজের প্রতি ঘৃণা পোষণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
৩: যারা মূলত বিভ্রান্ত ও অনিশ্চয়তায় ভোগে, তারা অবহেলা বা দ্বিধাগ্রস্ততার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
দুর্ভাগ্যবশত : এই তিনটি ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত ফলাফল একই :
মানসিক ক্লেশ বা অশুচি ভাবগুলো মনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে অপ্রতিহতভাবে থেকে যায়—তা অসতর্কতা (১), বিরোধিতা (২) কিংবা উপেক্ষা ও দোলায়মানতার (৩) কারণেই ঘটুক না কেন।
কেন এমন হয়? সমস্যাটি (যা অভ্যন্তরীণ ও মানসিক) আসলে যেমন, ঠিক সেভাবে দেখা হয় না—অর্থাৎ মন, চিন্তা, বাক্য ও আচরণে এর প্রকৃত উপস্থিতি বা গভীরতা ধরা পড়ে না—এর কারণ হলো (আত্ম-)সচেতনতা বা ‘সতি’ (sati)-র চরম অভাব বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি।
সচেতনতার বিচ্যুতি বা অভাব হলো এমন সময়কাল : যখন মন নিজেকে কেবল ক্ষণিকের জন্য বা বড়জোর কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখতে পায়
এবং এর মাঝে দীর্ঘ বিরতি ঘটে : যখন মন বাইরের অন্য কোনো বিষয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে—মিনিট, ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর বা এমনকি জন্ম-জন্মান্তর ধরে।
যেমনটি লুয়াং পু আতুলো যথার্থই বলেছেন : বাইরের দিকে ধাবিত মনই হলো দুঃখের কারণ। বাইরের দিকে ধাবিত মনের ফল হলো দুঃখ। মন যখন মনকে দেখে, সেটাই হলো পথ : সেই আর্য মার্গ! মন যখন মনকে দেখে, তার ফল হলো দুঃখের অবসান। চারটি ভিত্তির ওপর সচেতনতা (সতিপট্ঠান) স্থাপন প্রসঙ্গে : সচেতনতা (সতি): সঠিক সচেতনতা কী?, সচেতনতার চারটি ভিত্তি, সচেতনতা (সতি), সতীর কারণসমূহ, সতি বিষয়ক অধ্যয়ন, নির্জনে সতি, আর্য সচেতনতা, সচেতনতা বিশ্লেষণ, স্পষ্ট বোধগম্যতা, সচেতনতা পুষ্ট করা, একমাত্র পথ, সুফল সঞ্চয়, সচেতনতার ৪টি ভিত্তি, অনুরুদ্ধ-সম্মত সতি, সুফল সঞ্চয়, মাইন্ডফুলনেস (সজাগ মনোযোগ), সতর্ক ও যৌক্তিক মনোযোগ, আলোকিত ও জাগরণ, উদয়ের কারণসমূহ, প্রথমে মোহভঙ্গ তারপর আনন্দ, সুস্পষ্ট ও সচেতন বোধগম্যতা, অপরিহার্য ভিত্তি, আকাঙ্ক্ষাহীনতাই অমরত্ব, স্থায়িত্ব নির্ধারণ, চূড়ান্ত জ্ঞান, ‘সতি’ (সচেতনতা)-র সারসংক্ষেপ, সঠিক পথে, ঋজু দৃষ্টিভঙ্গি, পরম ভাগাভাগি, বর্তমানকে এড়িয়ে চলা, সচেতনতার সক্ষমতা, চারটি শারীরিক ভঙ্গি,
ঘটনাপ্রবাহই হলো মানসিক অবস্থা, এক থেকে চার-এর উৎপত্তি, মহাশক্তিশালী জাদুকরী মহিমা, প্রখর সচেতনতা, সম্ভাবনার দর্শন, বিচক্ষণ উপস্থিতি, সহস্র মহাকাল, বিজয়ী সচেতনতা, সচেতন ও স্থিরচিত্ত, সচেতন ও সুস্থিত।
No comments:
Post a Comment