বুদ্ধের প্রজ্ঞা ও করুণা
সুমনপাল ভিক্ষু
সেই পরম পূজনীয় 'ভগবান' বুদ্ধ :
প্রজ্ঞার বলেই তিনি সেই সত্য ধর্মকে পুনরায় আবিষ্কার করেছিলেন! করুণার বশেই তিনি বহু প্রাণীর উদ্দেশ্যে তা বিশদভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন। প্রজ্ঞার বলেই তিনি জন্ম-মৃত্যুর এই চক্রের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। করুণার বশেই তিনি দীর্ঘকাল এই চক্রে অবস্থান করেছিলেন, যাতে অন্যদের মুক্তির পথ শেখাতে পারেন। প্রজ্ঞার বলেই তিনি অন্য প্রাণীদের দুঃখ-কষ্টকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। করুণার বশেই তিনি তাদের সেই অসীম দুঃখ মোচনের ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। প্রজ্ঞার বলেই তিনি নিজে নির্বাণ-তীর অভিমুখে সেই ভব-সাগর বা মহাপ্লাবন পার হয়েছিলেন!
করুণার বশেই তিনি অন্য প্রাণীদেরও সেই মহাপ্লাবন পার করিয়েছিলেন...! করুণার বশেই তিনি নিজে অহিংসার চর্চা করেছিলেন এবং অন্যদেরও তা শিখিয়েছিলেন। প্রজ্ঞার বলেই তিনি অন্য সকল প্রাণীর প্রতি নির্ভয় ছিলেন। করুণার বশেই তিনি এই জগতের একমাত্র প্রকৃত ও পরম সহায় হয়ে উঠেছিলেন।
প্রজ্ঞার বলেই তিনি নিজের চূড়ান্ত ও পরম সহায় হয়ে উঠেছিলেন। করুণার বশেই তিনি বোধিসত্ত্ব হিসেবে দীর্ঘকাল বিনম্র ও মৃদুস্বভাব ছিলেন। প্রজ্ঞার বলেই তিনি যোগ্য বুদ্ধ হিসেবে মহিমান্বিত মর্যাদা লাভ করেছিলেন। করুণার বশেই তিনি এক রক্ষক ও হিতৈষী পিতার মতো সকল প্রাণীকে সহায়তা করেছিলেন। প্রজ্ঞার বলেই তিনি সকল প্রাণীর তৃষ্ণা বা আসক্তি থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত রেখেছিলেন।
প্রজ্ঞার বলেই তাঁর নিজের মন সকল জাগতিক বিষয় বা প্রপঞ্চ থেকে নির্লিপ্ত ছিল। ঠিক যেমন ভগবানের করুণা ছিল কোনো পক্ষপাতমূলক আবেগপ্রবণ আসক্তি-বর্জিত,
তেমনি তাঁর পরম প্রজ্ঞাও ছিল "আমি", "আমাকে" ও "আমার"—এই ধারণাগুলো থেকে মুক্ত...।
সূত্র: বিসুদ্ধিমগ্গ-অট্ঠকথা, ১৯২-৯৩।
মন্তব্য:
একই ব্যক্তির মধ্যে প্রজ্ঞা ও করুণার এমন সমন্বয় দেখা বেশ বিরল।
কেন এমন? কারণ, উচ্চ বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি অনেক সময় উদ্ধত ও সংশয়বাদী (cynical) হয়ে পড়তে পারেন। আবার গভীর সহানুভূতি ও করুণাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি অনেক সময় সরলমনা ও অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে পারেন। কেবলমাত্র 'সম্যক সম্বুদ্ধ' বা জাগরিত সত্তার মধ্যেই পূর্ণ প্রজ্ঞা ও মহৎ করুণার এক নিপুণ ও অখণ্ড সমন্বয় দেখা যায়। এই দুটি গুণ একে অপরের সীমাবদ্ধতা বা অভাব পূরণ করে; এর ফলে সেই সূক্ষ্ম করুণা—তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সহায়তায়—সমস্ত প্রাণীকে নির্বাণের পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। নির্বাণ হলো সর্বোচ্চ, নিরাপদ, সুনিশ্চিত এবং অনন্য ও চিরস্থায়ী সুখ।
সম্যক-সম্বুদ্ধ (পরম আত্ম-বোধিপ্রাপ্ত বুদ্ধ) বিষয়ক: ভবিষ্যৎ ১০ জন বুদ্ধ, মৈত্রেয়, পরবর্তী বুদ্ধ, সুগত, বুদ্ধ মৈত্রেয়, বুদ্ধ-অনুস্মৃতি, সুমেধের উপমা।
No comments:
Post a Comment