Thursday, October 8, 2026

ভূমিকা, সংঘনায়ক ধম্মবিরিয়ো মহাস্থবির

 ভূমিকা


​মনোপুব্বঙ্গমা ধম্মা, মনোসেট্‌ঠা মনোময়া।
মনসা চে পদুট্‌ঠেন, ভাসতি বা করোতি বা।
ততো নং দুক্খমন্বেতি, চক্‌কং ব বহতো পদং, ২। — ধম্মপদ, যমক বগ্‌গো ১ম।

​মানুষের সকল প্রকার প্রবৃত্তি এবং চেষ্টা (কর্ম) র সূচনা (উৎপত্তি) তে মন (ভাবপ্রবণতা)'ই পূর্বগামী (প্রথমে আগমনকারী = মুখ্য বা প্রধান) হয়। মন সেই কর্মের উৎপাদক ধর্মের প্রধান (শ্রেষ্ঠ) হয়, অতএব এই ধর্ম মন হতেই উৎপন্ন। যেমন সুবর্ণদি দ্বারা নির্মিত পাত্রকে ‘সুবর্ণময়’ এবং দারু (কাষ্ঠ) দ্বারা নির্মিত পাত্র ‘দারুময়’ হয়; ঠিক সেইভাবে এই ধর্ম মন হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে একে ‘মনোময়’ বলা হয়।  

​মানুষ তার অলোভ ইত্যাদি গুণ দ্বারা সম্প্রযুক্ত, প্রসন্নমন দ্বারা প্রেরিত হয়ে বাণী দ্বারা যা কিছু ব্যক্ত করেন বা শরীর দ্বারা চেষ্টা করেন; এই ১০ (৩ মানসিক, ৪ বাচনিক এবং ৩ কায়িক) কুশল কর্ম হতে উৎপন্ন সুখ তাকে সেইভাবে পশ্চাৎ ধাবন করে, যেমন নিরন্তর সঙ্গে অবস্থান রত মানুষের ছায়া তার পশ্চাৎ ধাবন করে।  
​হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;—
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুখণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি
অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরন্যে বরি;—
কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল-কাণন!
— মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
  
​জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট’এর মতে, “কোন মানুষই নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বাইরে বড় হয়ে ওঠেনা, আবার একই সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানসিকভাবে পূর্ণতা লাভ করার জন্য আত্ম-স্বাতন্ত্র্যে- বিশেষ প্রয়োজন হয়। সে-কারণেই একজন পরিপূর্ণ মানুষকে … তার আত্মস্বাতন্ত্র্যের পরিচয় গড়ে তুলতে হয়।” এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য জার্মান দার্শনিক হেগেল-এর মন্তব্য : প্রাচীন রোমক পুরাণের জ্ঞানদায়িনী দেবী মিনার্ভার পেঁচা সাঁঝের আঁধারেই তার ডানা মেলে বের হতো।  
​‘মানুষ অমর’ এবং …… সর্বোপরি ‘মনুষ্যত্বে’র কোন বিনাশ নেই। কেননা ক্রোধাগ্নি মানুষকে কোথাও পৌঁছে দেয় না। আসলে একথা গুলো আমার নয়। কেননা কোন ঘটনা বা বিষয়ে অনুসরণ বা অনুধাবন করার অভ্যেস আমার নেই। হয়তো এই কারণেই কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিবেকের ক্ষুধায় অস্থির হয়ে ‘সাগ্নিক’ কবিতায় লিখেছেন :
​‘তোমার কাজ
আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়—
আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা।

​অস্থির হয়ো না,
শুদ্ধ প্রস্তুত হও।’

​আমার কেন জানি না মনে হয়েছে, কোনো স্রষ্ট যদি এই যন্ত্রনাকে অতিক্রম করে জীবনের অন্য এক সত্যে (যে সত্য তাঁর সামাজিক জীবনের পারিপার্শ্বিক অনুভব ও অভিজ্ঞতায় কদাচিৎ প্রতিফলিত হয়) তথাপি অগ্রসর হতে পারেন, তখনই আমরা এমন একজন পরিশুদ্ধ মানুষের মুখোমুখি হই, যাঁর সৃষ্টি সূর্যের আলোকের মতো আমাদের নষ্ট চেতানাকেও রোগমুক্ত করে, আমাদের নির্মল এবং সম্মানিত করে।

​বঙ্গদেশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ভদন্ত সংঘনায়ক ধম্মবিরিয়ো মহাস্থবির ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন মহামানব, যিনি সমাজ সংস্কারক, কিন্তু সর্বপ্রথম মানবতাবাদী। সমকালীন সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈষম্য, অমানুষিকতা বা শোষণের প্রতিবাদ না করে তিনি কোনোদিনই স্থির থাকতে পারেন নি। তাঁর কর্মজীবনেও এই অস্থিরতা বারংবার প্রতিফলিত হয়েছে। সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির প্রথমে মানুষ এবং শেষেও মানুষ। পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর যুদ্ধ, কোলাহল, সর্বনাশের মধ্যে অবস্থান করেও তাঁর মন স্বপ্ন ছেড়ে কখনোই সমকালীন ঘটনার স্রোতে ভেসে যায় নি। যে মানবজমিন আজ মৃত, যে সভ্যতার কংকালটুকুই আজ অতীত-আহরনের স্মৃতি এবং সঞ্চয়, সেখানে তিনি তাঁর শ্রমকে নিযুক্ত করেছিলেন মানবতাবাদীর মন নিয়ে। হারিয়ে যাওয়া জীবন দর্শনের সাঁঝবাতিকে তিনি নতুন করে প্রজ্বলিত করতে চেয়েছিলেন, ফসিলের মধ্যে কান পেতে জীবনের হৃদস্পন্দন অনুভব করার মন ছিল তাঁর। তাই কোনো যুদ্ধ, কোনো হতাশাই তাঁকে বিচলিত করতে পারে নি কোনোভাবেই।

​ধ্যানস্থ শিল্পীর মতো পৃথিবীতে বেশি থাকে না, কিন্তু সচেতন মানবতাবাদীর বিরুদ্ধে সমস্ত পৃথিবীটাই।…  

​বর্তমানের প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে চলতে হয়েছে বলে সমকালীন মানুষ এবং পৃথিবীকে সমস্ত উত্তাপ দিয়ে ভালোবাসতে হয়েছে বলে ভদন্ত সংঘনায়ক ধম্মবীরিয়ো মহাস্থবির এর মনে কখনই আশাভঙ্গের যন্ত্রণা উদ্ভূত হয় নি। তবুও একথা বলতে পারি মাঝে মাঝেই তাঁর জ্বরাক্রান্ত- হৃদয়ে এমন সব প্রশ্ন জেগেছে যে, বস্তুত মানুষের পৃথিবীতে ‘মানুষ’ আছে কিনা; অথবা পৃথিবীতে কোথাও সেই পবিত্র উজ্জ্বল দীপশিখা আছে কিনা, অন্ধকারের জটিল আবর্ত অথবা সকল প্রকার বিরুদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানুষের প্রতিফলিত হওয়াই যার স্বভাব।  

​যে জন বন্ধ করে থাকে,
স্তব্ধ তার কাছে জীবনের জয়যাত্রা?
কূপমণ্ডুক শোনে না সমুদ্রের গান,
কিন্তু সে তো দেখে কূপের উপরে
বৃত্তবদ্ধ নীল আকাশ,
দু-একটি অমর নক্ষত্র,
বৈশাখী মেঘের ভগ্নাংশ কোনদিন।

​মানুষের সঙ্গে বড়ো বেশি ঘনিষ্ঠ যুক্ত হওয়ার এবং মানুষের কাজে গভীর-ভাবে নিবিষ্ট করার অভিপ্রায় থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিদ্যায়তন। ফলে অজস্র মানুষের সংস্পর্শে তাঁর অধিকাংশ সৃষ্টিই জীবন অনুভবের মানবীয় ফসল, মানবীয় চেতনা এবং পরিশুদ্ধ মানবতা।  

​পরিচ্ছন্ন মানবতাবাদী (হিউম্যানিষ্ট) সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির এর মতো বৃহৎ বঙ্গে ক-জনই বা জন্মগ্রহণ করেছেন? তাই একটি মানবজীবনের অধিকতর উজ্জ্বল প্রতিভাত হবে, এমন কথা উপলব্ধি করা বা ভাবতে পারা— সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির এর উদাহরণ আমাদের সামনে উপস্থিত না থাকলে— খুব সহজতর হত না। কিন্তু এমন ভাবতে পারা, কেননা আমরা ‘মানবতাবাদী’ সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবিরকে অনুভব করতে জেনেছি।  

সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির-এর কর্মজীবনে মানব-প্রেম এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত সক্রিয় থেকেছে, এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার কোনো আঘাত'ই এ প্রেম বা বিশ্বাসকে চূর্ণবিচূর্ণ করতে পারে নি। আজীবন তিনি ‘অনুভবের যন্ত্রনাতে দগ্ধ হয়েছেন, কিন্তু পুড়ে অঙ্গার হন নি, জ্যোতির্ময় সূর্যই হয়েছেন। তিনি রচনা করেছেন আলোর সঙ্গীত এবং বিশ্বাসের অমোঘ মন্ত্র। তাই তিনি ‘আমাদের অনেক কাছে’র মানুষ, আজকের দিনের মানুষ; তাই অতীতকাল, অতীত কীর্তিকে পেছনে ফেলে তমসাচ্ছন্ন বর্তমানের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের পথও খুঁজেছেন। তিনি অনেক বর্ণিল মানবীয় দায়িত্বকে স্নেহছায়ায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। 
 
​এ দেশ আমার গর্ব,
এ মাটি আমার কাছে সোনা।
এখানে মুক্তির লক্ষ্যে হয় মুকুলিত
আমার সহস্র সাধ, সহস্র বাসনা।
  
​এখানে বিচিত্র স্রোত
মুক্তির একাগ্র লক্ষ্যে আসে;
আজকের তুরঙ্গ ইতিহাসে
দেশ প্রেম বল্গা ধরে।
……… ……… ………
গ্রামে গঞ্জে শহরে বাজারে
দুর্জয় সংকল্প নেয় হাজারে হাজারে।
  
সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির'এর এই দেশপ্রেম ভালোবাসাময় মানবিক বিশ্বরচনার লক্ষাভিসারী।
আমাদের উজ্জীবিত করে সমুদ্রের একটি স্বপ্ন……।  

​বিবেক তো সর্বপ্রকার ভীতি এবং হীনমন্যতারও ঊর্ধ্বে, এমন কি যাত্রাভিনয়ের মুখোশ পরে রাজা ও জল্লাদের ভিড়েও সে নিষ্পাপ, তার কোনো মুখোশ নেই। হতে পারে কবন্ধ কিংবা অন্যকিছু। তবে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য কথা বলে।  
​কোনদিকে? কোথায় তুমি যাবে?
মোড়ে মোড়ে
অন্ধকারে ধ'রে আছে ভাল
সারি সারি প্রশ্নচিহ্ন—
হেঁট মুণ্ডে
ঝুলছে পঞ্চবিশতি বেতাল।
  
​সময় অনুকুল, নাস্তিক প্রতিকুল অথবা একূল ওকূল, একথা মনে হওয়ার মূল কারণ হল চতুর্দিকের ভাঙ্গনের ছবি। তারা ক্রমাগত পিকাসো গেরনিয়েকা হতে হতে গতানুগতিক পথে হাঁটছে। তাই চিন্তার তরঙ্গ গুলো পটারী রোডের সংকীর্ণ রাস্তায় এলোমেলো ভাবে কাঁপচ্ছে; মনে হয় এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প বুঝিবা তাকেও সম্পূর্ণ ভাবে গ্রাস করবে বলে মাটির নিচে চাপা থাকা বিক্ষোভে ফেটে পড়তে চাইছে। আসলে আমরা বড়ই অদ্ভূত জাতি, কেননা আমাদের কোন প্রস্তুতিই নেই কোথাও। চারিদিকের পুঞ্জীভূত ধূলার আস্তরণ আমাদের বৌদ্ধ সমাজকেও সম্পূর্ণই গ্রাস করতে চাইছে। জানি না, তথাকথিত মানবধর্মে উদ্দীপিত মানুষের মুখগুলি কী বলবেন, তখনই এক অদ্ভুত আঁধার এখন।

​একচক্ষু, ছিন্নপাখা জিজ্ঞাসার পাখি
নামে, শুধু নামে।
পলায়ন ছাড়া বেরোবার পথ জানা নেই,
চক্রবর্তীর ঢোকা কেন প্রয়োজন।
……… ……… ………
চাবিতে বন্ধ দুয়ার, অন্ধঘরে একেবারেই থাকি,
রক্তের জোয়ার হৃদয় কাঁপায়,
নশ্বর সমর্পনের দারুণ সাহস ছাড়া
ভীরু মজ্জয় আর কিছু নেই।

​সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির বিংশ শতাব্দী এবং আমাদের বৌদ্ধ জাতিরও সারথি। এই শতাব্দীর স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা যেন তাঁর রক্তের মধ্য দিয়ে চেতনা, অবচেতনা এবং সুচেতনায় সর্বতোভাবে প্রবাহিত। কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন, যদি বৌদ্ধ জাতিকে অন্য ট্র্যাজিডির পথ থেকে বিচ্যুত না করা যায় তাহলে মিথ্যা দৃষ্টির ক্লেদময় পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে একদিন এই জাতি পৃথিবীর কক্ষপথ হতে হারিয়ে যাবে।

​মানুষকে সহোদর ভেবে এবং সদ্ধর্মকে রক্তের মধ্যে অনুভব করে সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির তাই এই যন্ত্রণায় উন্মাদের ন্যায় মানব ইতিহাসের এক আলোক- অন্ধকার থেকে অন্য আলোক- অন্ধকার রাজ্যে, সঙ্গে বিচরণ করেছেন। ফুলন দেবীকে সদ্ধর্ম প্রদানের বিষয়টিকে অঙ্গুলিমালের কথা মনে করিয়ে দেয় না। ফলে কোথাও নিয়তির নিষ্ঠুর মারের প্রতিষেধক রয়েছে, সেই মৃতসঞ্জীবনীর (অমৃত পদ) সন্ধানে জীবনের অনেক বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছিলেন তিনি।  

​অন্য সব যখন দুর্মূল্য প্রসাধনের প্রতিযোগিতায়
কুৎসিত বিকৃতিকে চাপার চেষ্টা করে,
……… ……… ………
যেন অপ্রতিদন্ধী সেই মুখ
নিষ্কোষিত তরবারির মতো
জেগে ওঠে আমাকে জাগায়।
  
​সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির’এর নামের পাশে একটি বিশেষ অর্থ আমাদের চেতনায় সকল সময় কাজ করে। সেই অর্থটি হল মনুষ্যত্ববোধ, যা আসে ‘বুদ্ধানুশাসন’ থেকে, কিন্তু বাইরের জীবনেও তাকে ধারণ এবং লালন করতে হয়। তিনিই সত্যিকারের সাধক, তাঁর মনুষ্যত্বের অমলতা বাইরের সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝায়, এমন কি মানবসমাজের অভ্যন্তরে যে বিপরীত অমানুষিকতা এই উত্তরকালে আমাদের উন্মাদ করে তার বিষক্রিয়াতেও এইরকম ভাবেই অম্লান থাকে। চতুর্দিকের পীড়িত মানবগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর কাজ মহাবোধির মতো, যে শুধু শীতল ছায়া এবং আশ্রয়ই প্রদান করে না, অধিকিন্তু ব্যাধি মুক্তিরও উপায় জানে। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন—  
​ন পুপ্পগন্ধো, পটিবাতমেতি, ন চন্দনং তগর মল্লিকা বা।
সতং চ গন্ধো পটিবাতমেতি, সব্বা দিসা সপ্পুরিসো পবায়তি।
—ধম্মপদ, পুপ্ফগ্গো (পুষ্পবর্গ)।
  
​পুষ্পের গন্ধ বায়ুর বিপরীতে গমন করে না; একইভাবে চন্দন, টগর বা মল্লিকা (জুঁই)-এর গন্ধ ও বায়ুর বিপরীত (প্রতিকূল) গমন করে না; কিন্তু সজ্জনের (শীলবান) গুণাবলীর প্রশংসা গন্ধ (সুগন্ধ) বায়ুর প্রতিকূল ধাওয়া সত্ত্বেও সমর্থ হয়। এইভাবে, সজ্জন (শীলবান), তাঁর শীল কারণে, সর্বব্যাপ্ত দিকে ব্যাপ্ত হয়ে প্রশংসা লাভ করেন।  

​এক অধ্যায় হতে আরও এক অধ্যায়, এ যেন সীমাহীন যাত্রা। সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির এক অর্থে সীমিত সাধ্যের অসীম সম্ভাবনাময় এক নাম।  

​ ইতিহাসের উপাধ্যায় :

​মানবতার অগ্রগামী সৈনিক তথা সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির ১৯৩৯ ’এর ১ অক্টোবর বৌদ্ধপ্রধান রেঙ্গুন শহরের (বর্তমান মায়ানমার) রেঙ্গুনের মেমিওতে জন্মগ্রহণ করেন। তখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের করাল গ্রাস (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুগ সন্ধিক্ষণে তাঁর পিতা প্রিয়নাথ চৌধুরী পরিস্থিতির প্রতিকূলতাকে অনুভব করে পিতৃভূমি চট্টগ্রামের পটিয়াস্থ বৌদ্ধ অধ্যুষিত কর্তালা-বেলখাইন গ্রামে সপরিবারে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রসঙ্গত মনে রাখা প্রয়োজন যে শ্রদ্ধেয় ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবিরের গৃহী নাম ছিল শ্রীযুক্ত দীনেশ চৌধুরী। তিনি তাঁর পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। তাঁর মাতা এবং ভগিনী নয় জন।  

​যে সময়কালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় (১৯৬০ সালে) উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সেই সময় বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে শিক্ষার প্রচার-প্রসারের নিতান্তই অভাব ছিল। তবুও তিনি উচ্চতর বিদ্যা অর্জনের তাগিদে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দীপক রঞ্জন চৌধুরীর বদান্যতায় ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত ভিলাই শহরে গমন করেন। অতঃপর দিল্লীতে অবস্থানকালে ভদন্ত আনন্দ কৌসাল্যায়ন, ভিক্ষু জগদীশ কশ্যপ এবং মহাপণ্ডিত তথা বিশ্ব নাগরিক রাহুল সাংকৃত্যায়ন প্রমুখ বিশিষ্ট গুণীজনদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ভদন্ত ধম্মওয়ারা ভিক্ষুর নিকষ্ট হতে প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষিত হন।  

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী—
ভয় নাই, ওরে ভয় নাই!
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
  
​যিনি মানবের কল্যাণে বা কোন মহৎ উদ্দেশ্যে নিজের স্বার্থ ও প্রাণ সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিতে পারেন, ইতিহাসে তার কখনো মৃত্যু বা ক্ষয় হয় না; তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকেন।  

সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির ছিলেন মানবহিতৈষী বুদ্ধপুত্র। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে সাংগঠনিক ব্যক্তিত্বহীন মানুষ সর্বদাই কুপমণ্ডুক হয়। তারা কখনোই সমাজ-বিকাশের ধারাকে স্বীকার করে না। কিন্তু সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির ছিলেন সীমাহীন উন্মুক্ত গগনের ন্যায়। কোনরূপ আত্মপ্রতিষ্ঠা বা আত্মপ্রচারকে তিনি স্বীকার করেন নি। এই অর্থে তিনি ছিলেন ভগবান বুদ্ধের যোগ্য উত্তরসাধক।  

​চট্টগ্রামের মহান কীর্তি সন্তান — ভারতে বৌদ্ধধর্মের পুনঃজাগরণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সর্বোপরি তিনি দলিত মুক্তি আন্দোলনের একজন অগ্রগণ্য সৈনিক ছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে পারি—  
​'আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রানে
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে'॥
  
​সংঘনায়ক এবং কর্মবীর ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির’এর জীবন বৃত্তাত্ত সম্পর্কে আলোচনা করা আমার মত একজন অতি ভিক্ষুর পক্ষে একেবারেই অসম্ভব বলেই মনে হয়েছে। কারণ এই বিষয়টিকে আমি মনে করি সিন্ধু হতে এক বিন্দু জল সংগ্রহের মতোই।  

​আমি শ্রদ্ধাস্পদ পন্ডিত ড. জিনবোধি ভিক্ষুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি বন্দনা জানাই, কারণ তিনি যেভাবে সংঘনায়ক ভদন্ত ধম্মবীরিয় মহাস্থবির’এর বর্ণময় জীবনবৃত্তান্ত বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের নিকটে উপস্থাপন করেছেন তা সত্যি অর্থে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। প্রসঙ্গক্রমে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে উনবিংশ শতক হতে একবিংশ শতক কালে বৌদ্ধধর্মের পুনরুত্থানের প্রশ্নে যে সকল সাধুজন তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই সকল ইতিহাস উত্তরকালীন প্রজন্মের নিকট তুলে ধরা একান্ত জরুরী কারণ জীবন ইচ্ছা শক্তি দাবী করে। 
 
​যাবার আগে যেন দেখে যেতে চাই
মেঘ ভাঙ্গা রামধনু
ঢেলে সাজাক পৃথিবীর বুক।
অপাংতেয় কথার দিনলিপি
মুছে যাক রক্তিম প্রভাতে
নবজন্ম হোক……।

 সুমনপাল ভিক্ষু
অতিথি অধ্যাপক
পালি বিভাগ 
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
ও 
চেয়ারম্যান, বোধি-নিধি সোস্যাল ওয়েলফেয়ার কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। 



​

No comments:

Post a Comment