সম্বোধি-অঙ্গের অন্যতম সোপান 'সমাধি'
সুমনপাল ভিক্ষু
সম্বোধি-অঙ্গের অন্যতম হলো 'সমাধি'
(Concentration Link to Awakening বা Samādhi-Sambojjhanga)। স্থির মনোযোগ বা একাগ্রতা হলো এই সম্বোধি-অঙ্গের বৈশিষ্ট্য। বিক্ষিপ্ততা, ব্যাঘাত, মনোযোগের বিচ্যুতি, অস্থিরতা এবং মানসিক দোলায়মানতা দূর করাই হলো সমাধির উদ্দেশ্য। সুনিশ্চিত ও গভীর প্রত্যয় হলো এই সম্বোধি-অঙ্গের প্রকাশ। এই স্থিতিশীলতা সত্য উপলব্ধির পথ প্রশস্ত করে! সব ধরনের চেতনার মধ্যেই কোনো না কোনো মাত্রায় একাগ্রতা বা সমাধি বিদ্যমান থাকে।
মনোযোগকে সংকুচিত বা ঘনীভূত করে কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তুর ওপর নিবদ্ধ করার প্রক্রিয়াই হলো এই প্রশিক্ষণ। সমাধির ফলস্বরূপ জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির উদয় হয়! সুখ বা আনন্দ হলো সমাধির নিকটতম কারণ সমাধি বা একাগ্রতা ক্রমশ গভীরতর মাত্রায় বিকশিত হয়:
১: ক্ষণস্থায়ী সমাধি—যেখানে কয়েক সেকেন্ডের জন্য মন একমুখী থাকে।
২: প্রস্তুতিমূলক সমাধি—যা দীর্ঘস্থায়ী হলেও এর মনোযোগের গুণমান তখনও কিছুটা অস্থিতিশীল থাকে।
৩: উপচার সমাধি (Access concentration)—যা প্রথম ধ্যানের (jhāna) গভীর অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছায়।
৪: অর্পণ সমাধি বা গভীর ধ্যানমগ্নতা (Absorption concentration)—যেখানে মন সুদৃঢ় ও অখণ্ডভাবে একমুখী হয়ে স্থির থাকে।
সমাধির সুফল বা আশীর্বাদ চার প্রকার:
১: চারটি ধ্যানের (jhāna) মাধ্যমে ইহকালেই পরম সুখ বা আনন্দ লাভ।
২: বিষয়বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান ও যথার্থ অন্তর্দৃষ্টি লাভ।
৩: সমস্ত অনিত্য বা পরিবর্তনশীল ঘটনার প্রতি সচেতনতা ও স্পষ্ট বোধ।
৪: আসক্তি বা আঁকড়ে ধরার প্রবণতা বর্জনের মাধ্যমে সমস্ত মানসিক কলুষ বা আস্রবের (āsava) অবসান। (সূত্র: দীঘ নিকায়, ৩৩)।
বুদ্ধ একবার বলেছিলেন: কোন মানসিক কলুষ বা আস্রবগুলো (āsava) অনুশীলনের মাধ্যমে জয় করা উচিত? যদি কোনো ভিক্ষু সতর্ক ও যৌক্তিক মনোযোগের সাথে 'সমাধি-সম্বোধি-অঙ্গ' (Concentration Link to Awakening) বিকশিত করেন—যা নির্জনতা, বৈরাগ্য ও নিরোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এবং যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো সর্বপ্রকার আসক্তি বর্জন বা ত্যাগ—তবে তাঁর মধ্যে কোনো মানসিক কলুষ, কোনো মানসিক দহন বা কোনো অসন্তোষ আর কখনোই উৎপন্ন হতে পারে না। (সূত্র: মজ্ঝিম নিকায় ২, [১ম খণ্ড, ১১])।
যার শরীর শান্ত এবং যিনি আনন্দদায়ক সুখ অনুভব করেন, তাঁর মন একাগ্র হয়ে ওঠে। ঠিক সেখানেই 'সমাধি-সম্বোধি-অঙ্গ' জাগ্রত হয়। তিনি একে বিকশিত করেন এবং বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে তার পূর্ণ বিকাশের স্তরে উপনীত হয়। মধ্যম নিকায, ১১৮, [৩য় খণ্ড ৮৫]।
চিত্ত-একাগ্রতার (সমাধি) ঘনীভূতকারী বা সংহতকারী গুণ সম্পর্কে আরও কিছু ভাবনা: একাগ্রতা (সমাধি), সম্যক-সমাধি, একাগ্রতার ক্ষমতা, উচ্চ ও সতর্ক অবস্থা, সম্যক সমাধি কী?, একাগ্রতার পুষ্টিসাধন, মানসিক হতাশা নিবারণ, শারীরিক বেদনা নিবারণ, একাগ্রতার মাধ্যমে উপলব্ধ সত্য, গভীর নিমজ্জনের শিল্প, ধ্যান-নিমজ্জন (ঝান), জাগতিক সীমার বাইরের আনন্দ, প্রশান্তির ৯টি স্তর, ধ্যান-নিমজ্জনের বিস্তারিত বিবরণ, ধ্যান-নিমজ্জনের আবশ্যিক শর্তাবলি, কোনো বেদনা নেই!
একাগ্রতা = সমাধি!
No comments:
Post a Comment