ধর্ম-বিচয়' বা 'ধর্ম-অনুসন্ধান
সুমনপাল ভিক্ষু
'ধর্ম-বিচয়' বা 'ধর্ম-অনুসন্ধান' (সকল অবস্থার স্বরূপ অনুসন্ধানের ক্ষমতা)-কে কীভাবে পুষ্ট করা যায়!
ভগবান বুদ্ধ একবার বলেছিলেন:
হে ভিক্ষুগণ, যেমন এই শরীর আহারের দ্বারা পুষ্ট হয়, আহারের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে এবং আহার ছাড়া বাঁচতে পারে না; ঠিক তেমনই 'বোধি-অঙ্গ' বা জ্ঞানোদয়ের অঙ্গসমূহের অন্যতম 'ধর্ম-অনুসন্ধান' (Investigation of states)-ও আহার বা পুষ্টির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে এবং তা পুষ্টি ছাড়া বজায় থাকতে পারে না তাহলে, যে ধর্ম-অনুসন্ধান-শক্তি এখনও উৎপন্ন হয়নি তার উৎপত্তির জন্য এবং যে ধর্ম-অনুসন্ধান ইতিমধ্যে উৎপন্ন হয়েছে তার পূর্ণতার জন্য 'আহার' বা পুষ্টি কী? সেই সূত্রটি হলো: এমন কিছু অবস্থা বা বিষয় আছে যা—
১। হিতকর বা অহিতকর।
২। নিন্দনীয় বা অনিন্দনীয়।
৩। সাধারণ বা উৎকৃষ্ট।
৪। উজ্জ্বল (শুভ) বা অন্ধকার (অশুভ) পক্ষের।
এগুলোর প্রতি ঘন ঘন সতর্ক ও যৌক্তিক মনোযোগ দেওয়া হলো সেই 'আহার' যা নতুন অনুসন্ধান-শক্তিকে জাগিয়ে তোলে এবং ইতিমধ্যে উৎপন্ন অনুসন্ধান-শক্তিকে পূর্ণতা দান করে... আর হে ভিক্ষুগণ, সেই 'অনাহার' বা অভাব কী যা নতুন অনুসন্ধান-শক্তির উদয়কে বাধা দেয় এবং চলমান অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করে? এমন কিছু বিষয় আছে- হিতকর-অহিতকর, নিন্দনীয়-অনিন্দনীয়, সাধারণ-উৎকৃষ্ট এবং উজ্জ্বল-অন্ধকার পক্ষের—সেগুলোর প্রতি ঘন ঘন সতর্ক ও যৌক্তিক মনোযোগ না দেওয়া এবং সেগুলোকে বারবার গভীরভাবে বিবেচনা না করাই হলো সেই 'অনাহার'; যা নতুন অনুসন্ধান-শক্তির উদয়কে রোধ করে এবং ইতিমধ্যে উৎপন্ন অনুসন্ধান-শক্তিকে মানসিক বিকাশের মাধ্যমে পূর্ণতা ও উৎকর্ষ লাভ করা থেকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রাচীন ভাষ্যসমূহ থেকে প্রাপ্ত মন্তব্য:
সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই হলো 'ধর্ম-অনুসন্ধান' বা 'ধর্ম-বিচয়' বোধি-অঙ্গের (Dhamma-Vicaya-sambojjhang) বৈশিষ্ট্য। পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন, জিজ্ঞাসা, অন্বেষণ, বিশ্লেষণ, গবেষণা এবং বারবার পর্যালোচনা করাই হলো এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য। আগ্রহপূর্ণ ও উৎসুক কৌতূহল হলো এই অনুসন্ধানের বহিঃপ্রকাশ। মানসিক, বাচনিক বা কায়িক কোনো কাজ করার আগে, করার সময় এবং করার পরে নিজেকে কেবল এই প্রশ্নটি করুন: এই আচরণটি কি হিতকর না অহিতকর, নিন্দনীয় না অনিন্দনীয়, সাধারণ না উৎকৃষ্ট, উজ্জ্বল না অন্ধকার পক্ষের? এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন! নৈতিক বিচার-বিবেচনার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাটিকে ক্রমাগত শাণিত ও পরিমার্জিত করতে থাকুন! অনুসন্ধান বা জিজ্ঞাসার ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য সহায়ক শর্তগুলো হলো:
১। নিজের কাছে এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের কাছে প্রশ্ন করা।
২। মানসিক ও শারীরিক ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিশীলিত জীবনযাপন বা চর্চা।
৩। অস্পষ্ট বা বিভ্রান্ত চিন্তাধারার মানুষদের সঙ্গ বর্জন করা।
৪। সঠিক ও গভীর উপলব্ধিসম্পন্ন মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা।
৫। গভীরতর প্রশ্নগুলোর বিষয়ে বারবার পর্যালোচনা ও চিন্তন-মনন করা।
৬। কোনো কিছুর কারণ ও কার্যপদ্ধতি—অর্থাৎ কার্য-কারণ সম্পর্ক—সুনির্দিষ্টভাবে জানার প্রতি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া।
বাহ্যিক অবস্থার অনুসন্ধান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অভ্যন্তরীণ অবস্থার অনুসন্ধানও। সত্য উপলব্ধির পথে অগ্রগতির জন্য উভয়ই অপরিহার্য। 'জাগরণ' বা বোধোদয় হলো এক বিশুদ্ধ জ্ঞান, যা নিখুঁত অনুসন্ধানেরই ফল!
উৎস (সম্পাদিত অংশ): বুদ্ধের সংগৃহীত উপদেশাবলি (The Grouped Sayings of the Buddha) — সংযুক্ত নিকায় (Samyutta Nikāya)।
অনুসন্ধানের ক্ষমতাকে পুষ্ট করা!
No comments:
Post a Comment