Monday, February 16, 2026

 বোকার সাথে বন্ধুত্ব করতে যাবে না, সে তোমার উপকার করার চাইতে ক্ষতি করবে বেশি। কৃপণের সাথেও কখনও বন্ধুত্ব করতে যাবে না, কারণ সে তোমার বিপদের দিনে পাশে না থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে, সাবধান। কোন পরনিন্দাকারীকেও নিজের বন্ধু বানিও না, কারণ সে নিজের প্রয়োজনে তোমাকে ব্যবহার করবে। আর সেই সাথে মিথ্যাবাদীর সাথেও কখনও বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে না, কারণ সে মরিচিকার মতো দূরের স্বপ্নে বিভোর করে, কাছের জিনিস গুলোকে দূরে সরিয়ে দেবে। আর সুবিধাবাদীর সাথেও বন্ধুত্ব করবে না, কারণ সে  নিজের দোষ সুকৌশলে অন্যের উপর চাপিয়ে দিয়ে, কান ভাঙ্গিয়ে ফায়দা তুলবে। আর অলস ব্যক্তির সাথেও কখনো বন্ধুত্ব স্থাপন করবে না, কারণ তোমার প্রয়োজনের সময় ঝুলিয়ে দিয়ে তামাশা দেখবে। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা তার সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে না, কারণ সে প্রতি মুহূর্তেই  তোমাকে অপ্রস্তুত অবস্থানে ঠেলে দেবে। যে ব্যক্তির নিজে কাজ করবে না, কিন্ত অন্যের ছিদ্রাণ্বেষণ করে তার সাথেও বন্ধুত্ব করবে না, কারণ সে তোমার কাজের ব্যাঘাত ঘটাবে, আর তোমাকে নতুন সৃষ্টিশীল কাজ করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, আমি করছি না, করতে পারছি না, তোকেও করতে দেবো না, বরং সে তোমাকে অন্যের পিছনে লেলিয়ে দিয়ে মূল্যবান সময়ের অপচয় করাবে। অকেজো মস্তিষ্ক আর অর্ধ শিক্ষিত ও মূর্খ ব্যক্তির সংস্পর্শ করবে না বা বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে না, কারণ সে নিজের অপকর্ম ঢাকতে তোমাকে ব্যবহার করে তোমার মান সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। চাটুকারদের সঙ্গেও সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব স্থাপন করবে না, কারণ সে তোমাকে সত্য মিথ্যা যাচাই করার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে সবার অপ্রিয় করে দেবে। কারণ সে নিজের অযোগ্যতা ঢাকতে দুষ্কর্মটি করবে।

                                   

 এক অস্থির প্রজন্ম তৈরি করছি আমরা তৈরি হচ্ছে। এই প্রজন্মের স্বাতন্ত্র্যদায়ক কোন লক্ষ্য নেই। এদের আদর্শিক কোন গৌরবাকাঙ্ক্ষা নেই। নিষ্কলুষ কোন মিশন নেই। এরা বই পড়ে না, খবরের কাগজ পড়ে না। বহিরঙ্গন খেলাধুলাও এদের অনীহা। এরা রৌদ্রে হাঁটতে পছন্দ করে না। বৃষ্টিতে ভিজতে চায় না। কাদামাটি, ঘাস, লতাপাতায় এদের এলারজি বা অতিপ্রতিক্রিয়া। এরা আধা কিলোমিটার গন্তব্যে যেতে আধা ঘণ্টা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করে। এরা অস্থির, প্রচণ্ড রকম অস্থির এক প্রজন্ম। এরা অপরিচিত বয়জ্যেষ্ঠদের সম্মান দেবে না, পাশ কাটিয়ে হনহন করে চলে যাবে। অথবা গা ঘেঁষে পা পাড়া দিয়ে চলে যাবে। দুঃখপ্রকাশ বা সরি বলার প্রবৃত্তি এদের মধ্যে নেই। এরা অনর্থক তর্ক জুড়ে দেবে। না পাবেন বিনয়ী ভঙ্গী, না পাবেন কৃতজ্ঞতাবোধ। এদের উদ্ধত আচরণ, সদম্ভ চলাফেরায় আপনি ভয়ে কুঁকড়ে যাবেন। সংযত হওয়ার উপদেশ দিতে চাইলেই বিপদ নাজেহাল হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। আপনি সর্বসাধারণ যাত্রীবাহী গাড়িতে  চড়ছেন দেখবেন খালি পীঠিকা বা বসার জায়গা পেতে সবচেয়ে বয়ঃকনিষ্ঠ ছেলেটা বেশি প্রতিযোগিতা করবে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে সটান বসে পড়বে তার বয়সের দ্বিগুণ এই আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া তেমন কিছু করার থাকে না, বলছিলাম; এই প্রজন্মের কথা সবচেয়ে ভয়াবহ অনাচারের কথা যে, সভা সমিতিতে এই প্রজন্মের দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেই আসরে বা সভায় তারা নিজের জন্য চেয়ার খোঁজ করে যেখানে চুপ থাকার কথা, সেখানে জ্ঞান দিতে চেষ্টা করে। সারা রাত ধরে চলমান অবস্থায় বা অনলাইনে  থাকে, সারা সকাল ঘুমায় এরা সূর্যোদয় দেখে না, সূর্যাস্ত দেখে না সূর্যোদয়ে বিছানায় থাকে, সূর্যাস্তে মুঠোফোন বা মোবাইল থাকে। এরা ফাস্টফুডে বা ঝটপট আসক্ত, এরা বহিরঙ্গন খেলা অপছন্দ করে, এরা অন্তরঙ্গনে স্বস্তি পায়। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মূলত অনলাইন বা চলমান অবস্থার গেম বা অনুসন্ধিত বস্তুত  তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এরা ইতিহাস পড়ে না, সাহিত্য বুঝে না। এরা নজরুল চিনে না, রবীন্দ্রনাথ চিনে না, নেতাজী সুভাষ চেনে না, শরৎচন্দ্র চেনে না, ঠাকুরমার ঝুলি পড়ে না, শেখ সাদী, রুমি বহু অচেনা প্রসঙ্গ। এরা বই বুঝে না, বই পড়ে না, বই কিনে না। এরা সব কিছুতেই অপটু বা নন স্কিলড, এরা হাঁটতে পারে না, দৌড়াতে পারে না। সাগর পাড়ি দেওয়ার সেই দুঃসাহসিকতা নেই। পাহাড় কেটে পথ তৈরি করার সেই অদম্য মনোবল নেই। এদের উচ্ছ্বাস নেই, আবেগ নেই, সৎ সাহস নেই। এদের স্কিল একটাই স্মার্ট ফোন দ্রুত স্ক্রল বা সর্বানো করতে পারা। এদের না আছে মূল্যবোধ, না আছে শ্রদ্ধাবোধ, না আছে শৃঙ্খলাবোধ। কখন চলতে হবে, কখন থামতে হবে। কখন বলতে হবে, কখন শুনতে হবে এরা জানে না। এই সব কিছুর জন্য আমি, আমরা, আমাদের উপর কিছু দায় বর্তায়, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রজন্মকে যথাযথ ও গঠনমূলক করে প্রতিষ্ঠা দিতে, আগে নিজেদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যালোচনা করা অপরিহার্য।

ক্ষণস্থায়ী চিন্তাভাবনা স্থায়ীত্বের মায়া বন্ধ করে।

 ক্ষণস্থায়ী চিন্তাভাবনা স্থায়ীত্বের মায়া বন্ধ করে।

সুমনপাল ভিক্ষু


 বুদ্ধ একবার বলেছিলেন:

অনিচ্চানুপসন্নং ভবেন্তো নিচ্চসন্নং পজহতি। অনিশ্চয়তার (অনিচ্চ) চিন্তাভাবনা বিকাশের মাধ্যমে, কেউ স্থায়ীত্বের উপলব্ধি কাটিয়ে উঠতে পারে। যে কোনও সময়, সর্বত্র এবং সকলের জন্য প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য হল:

সমস্ত অবস্থা চলে যাবে। সমস্ত জিনিস অদৃশ্য হয়ে যাবে। সমস্ত গঠন অস্থির। সমস্ত পর্বত শূন্যে ভেঙে পড়ে। বৃষ্টির অশ্রুর মতো সমস্ত স্মৃতি হারিয়ে যায়। পরিবর্তন ছাড়া কিছুই স্থির থাকে না।

সমস্ত ভবন এবং ঘরবাড়ি ধুলোয় ভেঙে পড়ে।
সমস্ত ঘটনা ভেঙে যাওয়ার প্রকৃতির।
সমস্ত মুহূর্ত ক্ষণিকের জন্য থামে না এবং ফিরে আসে না।
সমস্ত মহাবিশ্ব অর্থহীন এককতায় ডুবে যায়।

সমস্ত ঘটনা ক্ষণস্থায়ী, এবং এইভাবে ক্ষণস্থায়ী। সমস্ত দেহ বৃদ্ধ, জীর্ণ, পতিত, পতিত এবং অবশেষে পচে যায়। সমস্ত প্রাণী বৃদ্ধ, অসুস্থ, কুৎসিত, উন্মাদ, গন্ধযুক্ত এবং মারা যায়। সমস্ত পার্থিব সুখ এবং আনন্দ পরিবর্তিত হয় এবং হারিয়ে যায়। সকল রূপ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং ভেঙে পড়বে।

সকল গঠন - শারীরিক ও মানসিক - উত্থিত হয় এবং থেমে যায়। যা কিছু উদ্ভূত হয়, তাও স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়ে যাবে। নির্বাণ ছাড়া কোথাও স্থায়ী স্থায়ীত্ব নেই।

 *মুখবন্ধ:*

এই কবিতাটি আলোর বাহ্যিক দীপ্তিকে নয়, তার অন্তর্গত নৈঃশব্দ্যকে অনুসন্ধান করে। এখানে আলো কোনো বস্তুগত শিখা নয় বরং আত্মদর্শনের এক ধ্যানময় যাত্রা, যেখানে অহংকার ভাঙার মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় অন্তর্দীপ। বৌদ্ধ ভাবধারা ও আধ্যাত্মিক মননের অনুপ্রেরণায় রচিত এই কবিতা মানুষের অন্তর্গত রূপান্তরের পথকে নীরব অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছে।
______________________
 *আলোর অর্থে অন্তর্দীপ : নৈঃশব্দ্যের অর্ঘ্য* 
*নির্মল কুমার সামন্ত* 

আলো—
কোনো শিখার নাম নয়,
এ এক নিঃশব্দ বীজ
যা অন্ধকারের কপালে রেখে যায়
অদৃশ্য উচ্চারণের উষ্ণতা। 

অর্ঘ্যপাত্রে আজও ফুল আছে,
কিন্তু প্রার্থনা দাঁড়িয়ে থাকে
অব্যক্ত বার্তার শুষ্ক হৃদয়ে—
বিশ্বাস তখন
দূর আকাশে ভেসে থাকা
অপূর্ব অথচ অনাথ নক্ষত্র। 

ভোরের ধ্যানঘন জানালায়
আমি ছায়াকে ডেকে বলি—
'বল তো, আলো কোথায় জন্ম নেয়?'
নরম ধুলো হয়ে উত্তর দেয় সে—
'যেখানে অহংকার ভাঙে,
সেখানে প্রথম জ্বলে ওঠে শুদ্ধ অন্তর্দীপ।' 

শূন্যতার নীল কূপে
ডুবে থাকে কিছু অসমাপ্ত মন্ত্র,
বাতাসে ভাসে নীরব আলোকরেণু, 
যেন সময়ের গোপন বোধিনিধি
অদেখা হাত তুলে আশীর্বাদ করে। 

আলো মানে দৃষ্টি,
দৃষ্টি মানে আয়না—
যেখানে মানুষ নিজেকেই দেখে 
অপরিচিত এক সত্যের পোশাকে। 

হে নৈঃশব্দ্যের শিখা,
তুমি জ্বলো না শঙ্খের উল্লাসে,
জ্বলো সেই অন্তরাল প্রান্তরে
যেখানে ভাঙা বিশ্বাসের কণাগুলো জুড়ে জুড়ে 
মানুষ গড়ে তোলে নিজেরই নবজনম। 

আলোর অর্থ কোনো নিবেদন নয়,
এ এক অন্তহীন পথচলা,
যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে 
মানুষ ধীরে ধীরে অন্ধকারকে
নিজেরই আলোয় রূপান্তরিত করে। 
________________________ 
১৩/০২/২০২৬ * দুপুর ১২-০৬ * প্রফুল্ল ধ্বনি 
__________________________ 
*মাননীয় ভিক্ষু সুমনপাল ভন্তেজি* প্রেরিত *'বোধি-নিধি'র* ক্লিপ *'আলোর অর্ঘ্য'* থেকে উৎসারিত ভাববস্তু-অনুসারী কবিতা *"আলোর অর্থে অন্তর্দীপ : নৈঃশব্দের অর্ঘ্য"* সৃজিত ও তাঁর উদ্দেশে নিবেদিত। 
_______________________
*Preface:*
This poem explores light not as a physical flame but as an inward awakening shaped by silence and self-reflection. Drawing inspiration from contemplative philosophy and spiritual insight, it portrays light as a journey of inner transformation where the breaking of ego reveals the first glow of the inner lamp. Rather than proclamation, the poem embraces stillness, suggesting that true illumination unfolds quietly within the human heart.
______________________
 *Inner Lamp Of Light : An Offering To Silence* 
*Nirmal Kumar Samanta* 

Light—
Not the name of any flame,
It is a silent seed
That rests upon the forehead of darkness
Leaving the warmth of an unseen utterance. 

Flowers still remain in the vessel of offering,
Yet the fragrance of compassion fades,
Prayer stands waiting
Within the arid heart of an unspoken message—
Faith then becomes
A wandering star in distant skies,
Beautiful, yet orphaned. 

At the meditation-filled window of dawn
I call the shadow and ask—
'Tell me, where is light born?'
Soft as dust it replies—
'Where pride breaks,
There first awakens
The pure inner lamp.' 

In the blue well of emptiness
Some unfinished mantras lie submerged,
Silent particles of light drift through the air—
As if a hidden treasury of time
Raises an unseen hand in blessing. 

Light means vision,
And vision becomes a mirror—
Where a human being encounters the self
Clothed in an unfamiliar truth. 

Oh, flame of silence,
Do not blaze in the clamour of conches,
Burn instead in that inner horizon
Where shattered fragments of faith unite
And shape a new birth within. 

The meaning of light is not mere offering,
It is an endless pilgrimage—
With every step, a human slowly
Transforms darkness itself
Into one’s own light. 
________________________ 
13.02.2026 * Night 11-52 * Prafulla Dhwani  
______________________ 
The poem *"Inner Lamp Of Light: An Offering To Silence"* is composed and extracted from the klip of *'Bodhi-Nidhi'* series *"Offering Of Light" (Aalor Arghya)* by the gracious inspiration of *Venerable Bhikkhu Sumanapal Bhanteji* and respectfully dedicated to him. 
______________________
 *মুখবন্ধ:*
এই কবিতাটি অহমিকার সীমা অতিক্রম করে অন্তরের এক নীরব আলোর সন্ধান। এখানে সত্য কোনো উচ্চারণে নয়, বরং নীরব উপলব্ধির মধ্যে জন্ম নেয়। নদী, আকাশ, সমুদ্র ও সন্ধ্যাতারার রূপক ব্যবহার করে কবি দেখাতে চেয়েছেন— বিনয় আসলে ক্ষুদ্রতা নয়, এটি আত্মবোধের গভীর বিস্তার।
কবিতাটি পাঠককে মনে করিয়ে দেয়, বড়ো হওয়া মানে উচ্চস্বরে নিজেকে বলা নয়— বরং অন্তরের স্বচ্ছ নীরবতায় নিজের সীমানা ছেড়ে দেওয়া।
___________________
 *অহমিকার ওপারে যে নীরব আলো* 
*নির্মল কুমার সামন্ত* 

তুমি কে?
এই প্রশ্ন কোনোদিন অদৃশ্য আঙুল ছিলো না,
এ শুধু অন্তরের দরজায়
ঠক্-ঠক্ করা এক অদৃশ্য আঙুল 
যে নিজেকে উচ্চারণ করে না,
তার ভিতরেই জন্ম নেয় সর্বোচ্চ পরিচয়। 

*কেউ বলে— 'আমি গর্ব করি না'*,
*তবু শব্দের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে*
*অহমিকার ক্ষুদ্র ছায়া*—
*যেন শুকনো নদীও*
*স্বপ্নে সমুদ্রের শব্দ শোনে*। 

আমি দেখি—
সত্য কখনও মাপে না নিজের সীমা,
সে শুধু পথ বানায় নীরবে।
*সমুদ্র জানে তার জলরেখা*,
*আকাশ জানে তার নিঃশ্বাস*....
*কিন্তু তারা জানেই না নিজের বিশালতা*। 

যে তত্ত্বে নিজেকে বলা হয় বড়ো
সেখানে শব্দগুলো হয়ে যায় ভারী
যেখানে সত্য জন্ম নেয় নীরবতায়,
সেখানে একটি বীজই যথেষ্ট
অরণ্যকে দিতে প্রতিশ্রুতি। 

আমি তাকে বড়ো বলি
যে জানে— 
নিজের চেয়েও বিস্তৃত এক আলোর অস্তিত্ব আছে।
*যেমন সন্ধ্যার তারা*
*অন্ধকারকে করে না ছোটো*,
*শুধু মনে করায় আকাশের গভীরতা*। 

*তোমার মূল্য তার মধ্যেই বাঁধা*,
*যেন দুটি নদী হাঁটে একই সাগরের দিকে*। 
*নাম আলাদা* 
*কিন্তু লবণের স্বাদ এক*। 

অহমিকা যখন ঝরে যায়,
হৃদয় হয়ে ওঠে স্বচ্ছ কাঁচ,
মানুষ তখন প্রথম শেখে—
*বড়ো হওয়া মানে উঁচু হয়ে দাঁড়ানো নয়* 
*বরং গভীরভাবে নত হওয়া*। 

একদিন প্রশ্নগুলো থেমে যাবে,
উত্তরগুলো আর শব্দ চাইবে না,
শুধু নীরব আলোয়
দুটি ছায়া পাশাপাশি দাঁড়াবে—
বলবে না কিছুই,
তবু বুঝে নেবে সব। 
_________________ 
১২/০২/২০২৬ * সকাল ১০-০০ * প্রফুল্ল ধ্বনি ___________________________  
 *উৎস:*
অহমিকা, আত্মপরিচয় ও নীরব সত্যের দার্শনিক অনুভব থেকে এই কবিতার বীজ সৃজিত। বৌদ্ধ দর্শনে নীরবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষের ভিতরের আলো ও নীরবতার গভীরতা এবং অন্তঃস্থ হৃদয়ের বিনয়— এই তিনের সমন্বয়ে কবিতার চিত্রকল্প বিনির্মিত এবং *মাননীয় ভন্তেজি সুমনপাল ভিক্ষু মহাশয়ের* হৃৎকমলে উৎসর্গীকৃত। 
________________________
*Preface:*
This poem journeys beyond the fragile architecture of ego toward a quiet illumination within the self. Instead of declaring truth through loud assertions, it listens to the silent pulse where identity dissolves into awareness. Through recurring images of rivers, sky, and evening stars, the poet explores humility not as weakness but as a deeper expansion of consciousness and silence.
The work invites readers to experience stillness as a form of knowledge, where the highest recognition is born not from self-proclamation but from inward clarity.
___________________
 *Beyond The Ego, A Quiet Light* 
*Nirmal Kumar Samanta* 

Who are you?
This question was never an invisible finger,
It was only a soft knocking
On the inner door.
One who does not pronounce himself
Carries the highest identity within silence. 

Some say — 'I do not carry pride,'
Yet between the folds of words
A small shadow of ego remains,
Like a dry river
Dreaming of the sound of the sea. 

*I see*—
*Truth never measures its own edges*,
*It only builds paths quietly*.
*The sea knows its shoreline*,
*The sky knows its breath*,
*Yet neither knows its vastness*. 

Where a theory declares itself great,
Words grow heavy with weight,
*Where truth is born in silence*,
*A single seed is enough*
*To promise a forest*. 

I call him great
Who knows
There exists a light wider than himself.
Like an evening star
That does not diminish the dark,
But reveals the depth of the sky. 

Your worth is bound within that flow,
*Like two rivers walking toward the same ocean*.
*Names are different*,
*Yet the taste of salt remains one*. 

When ego falls away,
The heart becomes clear glass,
*And humanity learns*—
*To grow is not to stand taller*,
*But to bow deeper*. 

One day questions will fade,
Answers will need no words,
Only in quiet light
Two shadows will stand side by side —
Saying nothing,
Understanding everything. 
__________________________ 
12.02.2026 * Night 8-37 * Prafulla Dhwani 
____________________________  
*Source Note*: 
 Silence is the very important philosophical concept . The poem emerges from a contemplative reflection on ego, humality and inner awareness. I've tried to compose it on the basis of Buddhist principle and the poem is respectfully dedicated to *Venerable Bhikkhu Sumanapal Bhanteji*. 
--------------------------------------
___________________
*মুখবন্ধ:*
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকের অন্তর্নিহিত ‘চাহিদা ও মুক্তি’র দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত এই কবিতায় মানুষের প্রয়োজন, নেশা ও আত্মমুক্তির অন্তরযাত্রা প্রতিফলিত হয়েছে। দৈহিক চাহিদার সীমা ও মানসিক আকাঙ্ক্ষার অসীমতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কবিতাটি শেষ পর্যন্ত এক নীরব মুক্তির পথ নির্দেশ করে।
____________________
*প্রয়োজনের শেষপ্রান্তে রক্তকরবী* 
*নির্মল কুমার সামন্ত* 

থালায় ভাত ঠান্ডা হয়ে এলে
মানুষ প্রথম শেখে—
ক্ষুধারও একদিন মাথা নামায়, 
জলের গ্লাসে শেষ চুমুক থেমে গেলে
নিঃশ্বাস বলে ওঠে,
'এটুকুই যথেষ্ট, আর নয়।' 

তবু মনের ভিতর অন্য দরজা খুলে যায়,
যেখানে ক্ষুধার হিসাব চলে না,
চলে শুধু অদৃশ্য চাওয়ার অঙ্ক...
হাত ভরে ওঠে চাহিদায়,
চোখ খোঁজে নামহীন আলো। 

প্রয়োজনের পথ ছোটো—
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারই সীমা।
কিন্তু নেশার পথ দীর্ঘতর,
সে রাতের ভিতর দিয়ে আরও রাত বানায়।
কখনো সে সোনা'র শব্দ,
কখনো বা ক্ষমতার উল্লাস,
কখনো নিজ নামের নিনাদ-প্রতিধ্বনি—
যে ফিরে ফিরে বলে— 
'আরও দূর, আরও দূরতর।' 

রক্তকরবীর মতো সেই চাওয়া
দূর থেকে লাল ফুল,
কাছে গেলে জানা যায় উষ্ণতা বিষের।
তার পাপড়িতে রঙ আছে,
শিকড়ে ঘুমিয়ে থাকে অস্থির রক্ত। 

মানুষ দাঁড়ায় যখন চাহিদার শেষপ্রান্তে—
হাতে তার সব, 
তবু ভিতরে শূন্যতার হাওয়া।
বুঝতে শেখে সে,
খাবারের শেষ আছে বলেই শরীর শান্ত,
আর নেশার শেষ নেই বলেই
বারবার মন পথ হারায়। 

*একদিন সন্ধ্যার বাতাসে*
*ধীরে ধীরে সে নামিয়ে রাখে সব চাওয়া*,
*দেখে*—
*আকাশের কোনো চাহিদা নেই*,
*তবু সে পূর্ণ*, 
*নদীর কোনো নেশা নেই*,
*তবু সে অনন্ত*। 

*তখন মানুষ নীরবে হাঁটে*,
*রক্তকরবীর বাগান পেরিয়ে*—
*দরকারের সীমা ছুঁয়ে* 
*অ-দরকারের মুক্ত আলোর দিকে*।_____________________ 
১১/০২/২০২৬ * সকাল ১১-০০ * প্রফুল্ল ধ্বনি ______________________ 
*রক্তকরবী নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চাহিদা ও মুক্তি'* ভাবনার প্রেক্ষিতে রচিত *"প্রয়োজনের শেষপ্রান্তে রক্তকরবী"* কবিতাটি *শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু সুমন পাল ভান্তেজি'র* সৌজন্যে বিরচিত।
__________________
*Preface:*
Inspired by Rabindranath Tagore’s play Raktakarabi and its philosophical tension between desire and liberation, this poem explores the fragile boundary between necessity and obsession. Through images of hunger, longing and inner awakening, it reflects on how human beings move from the limits of need toward a quieter, boundless freedom.
_______________________
 *At The Edge Of Need: Raktakarabi* 
*Nirmal Kumar Samanta* 

When rice on the plate turns cold,
A human being first learns—
Even hunger one day bows its head.
When the last sip pauses in a glass of water,
Breath whispers softly,
'This is enough, no more.' 

Yet another door opens within the mind,
Where hunger keeps no accounts,
Only the arithmetic of invisible want…
Hands fill with demands,
Eyes search for a nameless light. 

The path of need is short—
Bound between morning and evening.
But the path of intoxication is longer,
It creates night after night within the dark.
Sometimes it is the sound of gold,
Sometimes the exultation of power,
Sometimes the echo of one’s own name—
Calling again and again,
'Farther still, farther away.' 

Like the oleander of blood-red bloom, that desire—
A crimson flower from afar,
Yet warm with poison when touched.
Its petals carry colour,
Its roots sleep with restless blood. 

When a human being stands
At the edge of endless want—
Hands filled with everything,
Yet an inner wind of emptiness blows.
Then one learns,
The body finds peace because food has an end,
But the mind loses its way
Because intoxication knows none. 

*One evening, in a quiet breeze*,
*Slowly all desires are laid down*.
*One sees*—
*The sky has no demands*,
*Yet it is full*,
*The river has no obsession*,
*Yet it is infinite*. 

*Then the human walks silently*,
*Crossing the garden of raktakarabi*—
*Touching the edge of need*
*And moving toward the free light beyond necessity*. 
__________________________ 
11.02.2026 * Night 11-15 * Prafulla Dhwani  
________________________ 
Composed in the philosophical context of *Rabindranath Tagore's play "Raktakarabi"*, reflecting on the ideas of *'Desire and Liberation'.*  The poem  *'At The Edge Of Need: Raktakarabi'* is created with the gracious inspiration of *Venerable Bhikkhu Sumanapal Bhanteji.* 






ভূমিকা চন্দ্রকুমার জাতক

 ভূমিকা

চন্দ্রকুমার জাতক

 

ক্ষুদ্রক নিকায়-এর জাতক কাহিনীগুলি শুধুমাত্র পদ্যে রচিত। এটি নিশ্চিত যে এই গাথাগুলির সঙ্গে একটি মৌখিক ভাষ্য রয়েছে যেখানে কাহিনীগুলি গদ্যাকারে পরিবেশিত হয়েছেকারণ কাহিনীগুলি ছাড়া গাথাগুলি বোধগম্য নয়। এই কাহিনীগুলি জাতক অট্‌ঠকথা-য় পাওয়া যায় নাযা জাতক পালির ভাষ্য এবং Fausboll-এর সম্পাদিত সংস্করণে কাহিনীর সংখ্যা ৫৪৭, “কিন্তু এই সংখ্যাগুলির মধ্যে অনেকগুলি কাহিনী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং অন্যান্যগুলিতে শুধুমাত্র পরবর্তী জাতকগুলির উল্লেখ রয়েছে। ৫৪৭ সংখ্যাটি কাহিনীর যথার্থ সংখ্যার সঙ্গে মেলে না। সুত্তনিপাতের পারাযণবগ্গের ভাষ্য চুল্লনিদ্দেস অনুসারে জাতকের সংখ্যা ৫০০। ফা-শিয়েনও ৫০০ জাতকের ছবির কথা বলেছেন যা তিনি শ্রীলঙ্কায় দেখেছিলেন।

                একথা মনে রাখতে হবে পালি জা-এর প্রামাণিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পালি জাতক-এ মূল পালিশাস্ত্রে রচনার অন্তর্গত প্রাচীন জাতকগুলি নয় শুধুমাত্র জাতক ভাষ্যের অংশবিশেষ রয়েছে এমন ধারণা সুপরিচিত। জাতকগুলি যে মূলত পদ্যে রচিত লোককাহিনী একটি স্বাভাবিক অনুমানের বিষয় এবং শুধু তাই নয়, এটিকে পণ্ডিতেরা অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন। এছাড়াও একটি স্বতন্ত্র পদ্যে রচিত জাতক রচনার অস্তিত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যেও যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে। সিংহলীয় ঐতিহ্যে আরও বলা হয়েছে জাতক-এর ভাষ্য থেকে প্রাচীন সিংহলীয় ভাষায় অনুবাদের প্রক্রিয়াটি এবং সিংহলী থেকে পালি ভাষায় তার পুনরানুবাদের সময় গদ্যভাষাটি পরিবর্তিত হয় কিন্তু পালি ভাষার গাথাটি অপরিবর্তিত থাকে। শুধুমাত্র গাথাগুলি সংকলিত হয়েছিল তখনই এদের মূল পালিশাস্ত্র রচনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

                জাতক অট্‌ঠকথা থেকে একটি স্বাধীন পালি জাতক-এর অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। অনেকগুলি ক্ষেত্রে এটি রচনাটিকে তার ভাষ্য থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে। গাথাগুলিতে পাওয়া কাহিনীগুলির ভাষা মধ্যে অনেকগুলি পৃথক। আগেই দেখানো হয়েছেভাষ্যগুলিতে কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু কিছু ওসানগাথার উল্লেখ পাওয়া যায়এই গাথাগুলিতে কাহিনী উপস্থাপিত হয়ে না গিয়ে এগিয়ে চলে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে ওসানগাথাকে একটি প্রাচীনতর উৎস তথা পালি জাতক থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। গ্রন্থটি ও তার ভাষ্য ২২টি নিপাতে বিভক্ত। নিপাতের নিয়ম অনুসারে প্রথমে একটি মাত্র পংক্তিতারপরে দুটিতিনটি ইত্যাদি। Winternitz দেখিয়েছেন যে ভাষ্যে আমরা এমন অনেক কাহিনী পাই যেগুলি তাদের নিপাত শিরোনাম লাভের যোগ্য নয়। উদাহরণস্বরূপএক নিপাতে এমন কাহিনীও রয়েছেযার পাঁচটি স্তবক রয়েছে। এরকম প্রতিটি দৃষ্টান্ত নির্দেশ করে Winternitz এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে কাব্যে রচিত একটি স্বতন্ত্র জাতক গ্রন্থ ছিল।

                যদিও আমরা পালি জাতক ও জাতক ভাষ্য-গুলির মধ্যে পার্থক্য করিএটি লক্ষ করার মত বিষয় এই যে সমস্ত কাহিনী না হলেও তাদের একটি বৃহৎ অংশ পালি জাতক-এ পাওয়া গাথাগুলির মতই প্রাচীন। এই গদ্যকাহিনীগুলি ছাড়া গাথাগুলি অসম্পূর্ণ ও অপ্রাসঙ্গিক। নিকায়গুলি ও বিনয়গ্রন্থগুলিতে প্রাপ্ত জাতক জাতীয় কাহিনীগুলি দ্বারা এই কাহিনীগুলির প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয়। রিজ ডেভিডস্ সুত্তন্ত জাতক’-এ জাতক অট্‌ঠকথা-র কাহিনীগুলির সঙ্গে অভিন্ন দেখেছেন। অপরদিকে গদ্যে প্রাপ্ত দৃশ্যগুলির বর্ণনা ভারহুত ও সাঁচির সৌধগুলিতে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষেভারহুতে জাতকগুলির শিরোনাম নকশার উপর খোদাই করা আছে। মিলিন্দপঞহ-এ জাতকগুলির উল্লেখ রয়েছে এবং এটি স্পষ্ট যে মিলিন্দপঞহ-এ যাকে প্রাক্ ভাষ্যরচনার মধ্যে স্থান দেওয়া হয়, তার সংকলনের সময়ে জাতক কাহিনীগুলির অস্তিত্বের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে।

                ভাষ্যের প্রতিটি জাতকের মধ্যে নিম্নলিখিত অংশগুলি রয়েছে ১) পচ্চুপন্নবত্থু (বর্তমান কাহিনী) অংশটি বুদ্ধ যখন তাঁর শিষ্যদের কাছে সংশ্লিষ্ট জাতকটির কাহিনী বলেছেনসেই প্রসঙ্গের কথা বর্ণনা করে, ২) অতীতবত্থু (অতীত কাহিনী) অংশে বুদ্ধের পূর্বজন্মের একটি কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, (৩) গাথা, (৪) ব্যাকরণ (গাথাগুলির উপর সংক্ষিপ্ত ভাষ্য) এবং (৫) সমাধান-এ পচ্চুপন্নবত্থুর কাহিনীগুলির চরিত্রের অতীতবত্থুর কাহিনীর চরিত্র হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে।

                প্রকৃত জাতক কাহিনিটি অতীতবত্থুর মধ্যে রয়েছে এবং পচ্চুপন্নবত্থু তার একটি ভূমিকা বলে মনে হয়। আরও মনে হয় যে অধিকাংশ বর্তমান কাহিনী’ হল পরবর্তীকালের উদ্ভাবন এবং সেগুলি অতীতের কাহিনীর মত ততটা মূল্যবান নয়। অতীত কাহিনীগুলি গাথাটিকে প্রসঙ্গের মধ্যে রাখে এবং তাদের বোধগম্য করে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ভাষ্যটির গাথাগুলিকে পালি জাতক-এর অংশ বিশেষ বলে মনে করা হয়। ব্যাকরণ অংশে প্রকৃত ভাষ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এটি গাথাগুলির ব্যাখ্যাসমস্ত কাহিনীটি কেন্দ্রস্থল।

                মনে করা হয়স্বয়ং বুদ্ধ যে জাতকগুলি দেশনা করেছিলেন। নবঙ্গ বিভাগের মধ্যে একটি হল জাতক ঐতিহ্যগত দিক থেকে যাই দাবী করা হোক না কেন বুদ্ধঘোষের সংকলন বলে বর্ণিত বর্তমান ভাষ্যটি হল কিংবদন্তী ও লোককাহিনীর সংগ্রহ। কোন কোন কাহিনী অতি প্রাচীন ও বেদের সমসাময়িক। বুদ্ধ স্বয়ং জাতক বা জাতক জাতীয় কাহিনীগুলি দেশনা করেছিলেন এই অনুমানের সারবত্তা থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে ভাষ্যগুলিতে প্রাপ্ত সমস্ত কাহিনীই বুদ্ধদেশিত। নিশ্চিতভাবে এগুলির মধ্যে পরবর্তীকালের উদ্ভাবন ও কিংবদন্তী রয়েছে। প্রথমে সর্বাস্তিবাদী ও পরে থেরবাদীরা জাতক এবং অবদানগুলির মাধ্যমে ধর্মকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্বের দাবিদার। পালি শাস্ত্রগুলিতে আমরা এমন অনেক জাতক কাহিনী খুঁজে পাই যা বর্তমান জাতক সংকলনটিতে পাওয়া যায় না। মিলিন্দপঞ্‌হ-তেও এমন অনেক জাতক কাহিনী রয়েছে যা বর্তমানে সংকলনে নেই। যে জাতকগুলিকে ভাষ্যে পাওয়া যায় না সেগুলি সংস্কৃত বৌদ্ধসাহিত্যে পাওয়া যায়। সংকলনটি স্পষ্টতঃই অসম্পূর্ণ। এটির মধ্যে খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতকে সংকলিত হবার সময়ে সেই সময়ে প্রচলিত সবকটি জাতক কাহিনী নেইথাকা সম্ভবও নয়। এর মধ্যে ভারহুত ও সাঁচি বৌদ্ধ নকশায় বর্ণিত সবকটি ঘটনাও নেইশুধু তাই নয়, এর মধ্যে পালি শাস্ত্ররচনায় প্রাপ্ত সবকটি জাতক জাতীয় কাহিনীও অনুপস্থিত।

                Winternitz দেখিয়েছেন যে জাতক কাহিনীগুলি মহাযান ও থেরবাদ উভয়প্রকার বৌদ্ধধর্মেরই অংশ। নিঃসন্দেহে এগুলি সমস্ত বৌদ্ধদেশের সমস্ত বৌদ্ধ রচনার সাধারণ ঐতিহ্য। এগুলি বৌদ্ধধর্ম প্রচারের প্রধান বাহনজনপ্রিয় বৌদ্ধধর্মের প্রধান সাক্ষী। নলিনাক্ষ দত্ত মন্তব্য করেছেন, “অত্যন্ত আশ্চর্যজক বিষয় এই যে সমস্ত জাতক ও অবদান চরিত্রগত দিক থেকে অবৌদ্ধচিত। বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষার সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই। এখানে কার্যকারণ তত্ত্বঅনাত্মস্কন্ধপ্রতীত্যসমুৎপাদ সম্পর্কে একটি শব্দও পাওয়া যায় না। এই কাহিনীগুলি সাধারণভাবে নৈতিকতার কথা বলে কিন্তু পিটকগুলিতে বর্ণিত শীল সম্পর্কে কোন আলোচনা করে না। এটি ভিক্ষু জীবনের প্রশংসা করলেও গৃহী জীবনের নিন্দা করে না। বরং এই কাহিনীগুলি মূলতঃ গৃহীদের সামাজিক জীবন নিয়েই বেশী আলোচনা করে ভিক্ষুদের সমাজ বহির্ভূত জীবন নিয়ে নয়। এগুলি ভিক্ষু বা বিহারকেন্দ্রীক জীবন নিয়ে কোন কথাই বলে না।” বোধিসত্ত্ব’ শব্দটি ব্যবহার না হলে কাহিনীগুলিকে বৌদ্ধসাহিত্যের অংশরূপে সনাক্ত করা সম্ভব হত না। এটি প্রকৃতই একটি গণসাহিত্য যেগুলি সর্বব্যাপী নৈতিক নিয়ম নিয়ে আলোচনা এবং অনেকগুলি কাহিনী প্রাক্ অশোকযুগের ভারতবর্ষের সাধারণ ঐতিহ্যের অংশ। এই কাহিনীগুলি বৌদ্ধদের দ্বারা অনুশীলন করা নঞর্থক নৈতিকতার তুলনায় অধিকতর পরার্থপর নৈতিকতার শিক্ষা দেয়।

                ‘জাতক শব্দটি জাত’ শব্দ থেকে এসেছে। জাত শব্দের অর্থ হল জন্মউৎপন্নদ্ভূত ইত্যাদি। যিনি জাত বা জন্মগ্রহণ করেছেনতাকে বলা হয় জাতক। বৌদ্ধসাহিত্যে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনকাহিনিগুলি জাতক’ নামে পরিচিত। বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের ধর্মোপদেশ দেওয়ার সময় ঘটনা প্রসঙ্গে উপদেশ দিতে গিয়ে তাঁর অতীত কাহিনি বর্ণনা করতেন। গৌতম বুদ্ধ বোধিজ্ঞান লাভ করার জন্য ৫৫০ বার বিভিন্ন প্রাণী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এসব জন্মে তিনি কখনো মানুষকখনো পশুপাখিকখনো দেবতারূপে জন্মগ্রহণ করেন। বুদ্ধের এ অবস্থাকে বলা হয় বোধিসত্ত্ব। বোধিসত্ত্বরা সাধারণত বোধিজ্ঞান লাভের জন্য সাধনা করে থাকেন। বোধিসত্ত্ব অবস্থায় দানশীলনৈষ্ক্রম্যবীর্যক্ষান্তিমৈত্রীসত্যভাবনাঅধিষ্ঠান ও উপেক্ষা এই দশ প্রকার পারমিতা চর্চা করে চরিত্রের চরম উৎকর্ষ সাধন করেন। এর ফলে শেষ জন্মে পূর্ণ প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়ে বোধিজ্ঞান লাভ করেন এবং সম্যক সম্বুদ্ধ নামে অভিহিত হন। জাতক কাহিনিগুলোতে বোধিসত্ত্ব কোনোটিতে প্রধান চরিত্রেকোনোটিতে পার্শ্বচরিত্রে কোনোটিতে গৌণ চরিত্রে আবার কোনোটিতে তিনি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। তবে অধিকাংশ জাতকে তাঁকে মুখ্য ভূমিকায় দেখা যায়।

 

জাতকের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব:

জাতক কাহিনিগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল— গল্প বলার মাধ্যমে শ্রোতাদের সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করা। গল্পের মাধ্যমে নৈতিক ও মানসিক গুণাবলির বিকাসাধন জাতক কাহিনীগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে। গল্পের মাধ্যমে বর্ণিত বিষয় মানুষের অন্তরের গভীরে রেখাপাত করে। বুদ্ধ ধর্মদেশনার সময় প্রসঙ্গক্রমে তাঁর অতীত জীবনের গল্পগুলোর মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক গুণাবলি প্রকাশ করতেন। এর প্রভাবে তাঁর শিষ্যরা আদর্শ জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ হতেন। উল্লেখ্যজাতক কাহিনিগুলিতে অতিপ্রাকৃতের কিছুটা ছাপ থাকলেও জাতকের ঘটনাগুলো একান্তভাবে জীবনসম্পৃক্ত। জাতকের কোনো চরিত্রে বোধিসত্ত্বকে মানবিক চরিত্রের পূর্ণপ্রতীক রূপে প্রতীয়মান হয়। তিনি কোথাও অতি মানবরূপে চিত্রায়িত হননি। জাতকে কোথাও অবান্তর বিষয়ের অবতারণা করা হয়নি। জাতকের গুরুত্ব বিভিন্নমুখী। জাতক সাহিত্য পাঠে ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসরাজনীতিসমাজনীতিঅর্থনীতিশিল্পকলাপ্রাচীন প্রসিদ্ধ জনপদ ইত্যাদি বিষয়ে জানা যায়। বিশ্বসাহিত্য ভান্ডারে গল্পউপন্যাসনাটকউপাখ্যানছোটগল্প প্রভৃতি রচনার উৎস হিসেবেও জাতকের ভূমিকা আছে বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। এজন্য জাতককে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

                দশবিধ-রাজধম্ম (শাসকের দশগুণ গুণ) হল বৌদ্ধধম্মের মধ্যে একটি যা মানুষসংগঠনকোম্পানিঅফিসদেশ বা অন্যান্য সংস্থার শাসকদের ধারণ করার উদ্দেশ্যে করা হয়। এটি সুত্তপিটকখুদ্দকনিকায় ও জাতক গ্রন্থে পাওয়া যেতে পারেযেখানে বলা হয়েছে

দানং সীলং পরিচ্চাগং অজ্জবং মদ্দবং তপং

অক্কোদং অভিহিংস চ খন্তিঞ্চ অভিরোধনং

                দশবিধা-রাজধম্ম গঠিত

                ১. দান (দান) জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য নিজের আনন্দ ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকাযেমন অন্যদের সমর্থন বা সহায়তা করার জন্য নিজের জিনিসপত্র বা অন্যান্য জিনিস দান করাযার মধ্যে জ্ঞান দান করা এবং জনস্বার্থে সেবা করা অন্তর্ভুক্ত।

                ২. শীল (নৈতিকতা) শারীরিক ও মানসিক নীতি অনুশীলন করা এবং অন্যদের জন্য ভালো দৃষ্টান্তস্থাপন

                ৩. পরিচ্ছাগ (পরোপকার) উদার হওয়া এবং স্বার্থপরতা এড়িয়ে চলাপরোপকার অনুশীলন করা।

                ৪. অজ্জবং (সততা) অন্যদের প্রতি সৎ ও আন্তরিক হওয়াঅন্যদের প্রতি আনুগত্য ও আন্তরিকতায় নিজের কর্তব্য পালন করা।

                ৫. মদ্দবং (ভদ্রতা) কোমল স্বভাবের অধিকারীঅহংকার এড়িয়ে চলা এবং কখনও অন্যের নিন্দা না করা।

                ৬. তপং (আত্মনিয়ন্ত্রণ) আবেগকে ধ্বংস করা এবং আলস্য ছাড়াই কর্তব্য পালন করা।

                ৭. অক্কোধং (ক্রোধহীন) ঘৃণা থেকে মুক্ত থাকা এবং বিভ্রান্তির মধ্যেও শান্ত থাক।

                ৮. অভিহিংস (অহিংসা) অহিংসা অনুশীলন করাপ্রতিহিংসাপরায়ণ না হওয়া।

                ৯. খন্তি (সহনশীলতা) জনস্বার্থে ধৈর্য অনুশীলন করা এবং কম্পিত হওয়া।

                ১০. অভিরোধনং (সরলতা) অন্য ব্যক্তির মতামতকে সম্মান করাপক্ষপাত এড়িয়ে চলা এবং জনসাধারণের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

                উপরের দশটি উপদেশকে দশ রাজধর্ম’ বা দশবিধ কর্তব্য’ বলা হয়। রাজা উক্ত দশরকম উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও সৎভাবে জীবনযাপন করতেন এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে রাজকাজ পরিচালনা করতেন।

                এই জাতক পঞ্চাশক গ্রন্থে মোট জাতকের সংখ্যা পঞ্চাশটি। জাতকগুলি অতি দীর্ঘ। প্রত্যেক জাতক বুদ্ধের দশবিধ পারমীর মধ্যে যে কোন একটা পারমী পূরণেরই অত্যাশ্চার্য জনক ঘটনাবলীতে সমৃদ্ধ। এ জাতক পঞ্চাশক গ্রন্থের প্রকাশক বার্মা ভাষায় গ্রন্থকারের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান করেছেনঅনুসন্ধিৎসু জনগণের ঔৎসুকার্থ এখানে তা বার্মা ভাষা থেকে যথার্থ বঙ্গানুবাদ করে এখানে দেওয়া হল।

                “১৯১১ বুদ্ধ পরিনির্বাণ বর্ষে মহাযোনক রাষ্ট্রের অন্তর্গত জাংমে’ নগরবাসী মহামান্য পালি ত্রিপিটক পারদর্শী মহাপণ্ডিত প্রবর “সারিপুত্র” নামক মহাস্থবির মহোদয় মহানিপাত প্রভৃতি বহু পুরাতন অর্থকথা সমূহ অবলম্বনে বুদ্ধাঙ্কুর প্রমুখ সৎপুরুষগণের পারমিতা পূরণ সংক্রান্ত কাহিনী বিচিত্র ভাষায় নানা ছন্দে অলঙ্কৃত করিয়া সাধুসজ্জনের জ্ঞান বিকাশের জন্য সুবিশুদ্ধ পালিভাষায় এ জাতক পঞ্চাশক প্রণয়ণ করেন। ইহা রেঙ্গুন নগরে হংসবতী’ মুদ্রালয় হতে মুদ্রিত হয়।” গ্রন্থকারের এই মাত্র পরিচিতি দিয়াই প্রকাশকের বক্তব্য শেষ করছেন।

                বার্মা ষষ্ঠ সঙ্গায়নে ত্রিপিটক শোধক প্রধান অগ্র মহাপণ্ডিত শ্রীমৎ প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির মহোদয়ের নিকট কানাইমাদারী বিদর্শনারামে সংগৃহীত বার্মা পালি জাতক পঞ্চাশক” নামক এই বৃহৎ গ্রন্থটি ছিল।

                ২৫১৮ বুদ্ধাব্দে এ জাতক পঞ্চাশক” গ্রন্থখানি অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন বিনয়াচার্য জিনবংশ মহাস্থবির। এক বৎসরে এটির অনুবাদ সমাপ্ত করেন। তা সংশোধন মানসে মহামান্য সাহিত্যরত্ন অষ্টম সংঘনায়ক পরমারাধ্য শ্রীমৎ শীলালঙ্কার মহাস্থবির মহোদয়কে প্রদান করেন। তিনি তা  কলেবরে অতিশ্রমে মহোৎসাহে সংশোধন করে দিয়েছিলেন।

                গৌতম বুদ্ধের অতীত জন্মের এই চন্দ্রকুমার জাতক বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয় ১৩১৫ বঙ্গাব্দে। এই চন্দ্রকুমার জাতক প্রথম অনুবাদ করেন পরিব্রাজক কালীকুমার মহাস্থবির।

 

     দুই

পরিব্রাজক ভিক্ষু কালীকুমার মহাস্থবির:

যুগসন্ধিক্ষণে জনকয়েক সত্যিকার মানুষের আবির্ভাব হয়। তাঁরা সংসারের কোলাহল থেকে দূরে থেকে আপন সমাজের তথা জগতের কল্যাণে এক মহৎ আদর্শের সাধনায় নীরবে জীবন উৎসর্গ করে যান। এই সমস্ত মহাপুরুষদের জীবদ্দশায় সম্যকভাবে বুঝতে না পেরে তাঁদেরকে উপযুক্ত সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে অবহেলা ঘটে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন তাঁদের অভাব অনুভব হলে কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা হয়তখনই তাঁদের সত্যরূপ ও অসামান্য ব্যক্তিত্বের প্রভাব আমাদের চোখের সামনে উজ্জ্বলতর হয়ে প্রতিভাত হয়। বুদ্ধের অপ্রমেয় আদর্শের বেদীতলে আত্মনিবেদিত প্রাণ কালীকুমার মহস্থবিরও ছিলেন এইরূপ একজন কর্মপরায়ণ সাধক ভিক্ষু । ১৯১৪ সালে কালীকুমার মহাস্থবির অনন্তলোকে প্রস্থান করেছিলেন। যে কোন মহাপুরুষের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনেতাঁর মৌলিক নিষ্ঠা ও ধর্মপ্রাণতার সংস্কার এবং জন্মভূমির নৈসর্গিক প্রভাব অনেকাংশে বিদ্যমান থাকে। যদিও বৌদ্ধধর্মে নির্দেশ আছে যে কোন ব্যক্তি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেতাঁর পূর্ব গৃহাশ্রমের পরিচয়ের কোন প্রয়োজন হয় না, তখন তিনি তাঁর মৌলিক গোত্রের অতীত এক নূতন জন্ম পরিগ্রহ করে থাকেন।

                কালীকুমার মহাস্থবির চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত শিলক গ্রামে ১৮৭৫ সালে এক মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সদ্ধর্মে প্রগাঢ় ভক্তিমাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে আগ্রহ ও উৎসাহ এবং বৌদ্ধোচিত নীতিপরায়ণতা এই বংশের একটা বৈশিষ্ট্য। কালের পরিবর্তনে অর্থ সম্পদে হীনল হলেও এখনও এই পরিবারে গৃহীবিনয়ে যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। স্থান-মাহাত্ম্য হিসেবে যদি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটা মূল্য দিতে হয়তাহলে কালীকুমার মহাস্থবিরের জন্মভূমি শিলক গ্রাম প্রকৃতির স্নিগ্ধ শ্যামশ্রীমণ্ডিত একটা পরিমণ্ডলের মধ্যেই অবস্থিত। এই গ্রাম তথা পল্লীর পা দিয়ে পুণ্যতোয়া কর্ণফুলী নদী প্রবাহিতআর একদিকে বিস্তীর্ণ মাঠের সীমান্ত রেখায় বনরাজি নীলাআর পূর্বদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনন্ত গিরিশ্রেণীর উদার গাম্ভীর্য। এক কোমল মধুর আবেষ্টনীর মধ্যেই শৈশবের খেলা-প্রাঙ্গণে কালীকুমারের হৃদয়ে বৈরাগ্যের বীজ উপ্ত হলে যৌবনের প্রারম্ভেই ভোগবাসনা বিসর্জন দিয়ে পরমার্থের সন্ধানে তিনি ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করেন।

                যুগধর্মের প্রভাবে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চট্টল বৌদ্ধসমাজ যখন একটা অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের সম্মুখবর্তীসেই যুগ সন্ধিক্ষণে কালীকুমারও গুণালঙ্কার মহাস্থবিরের আবির্ভাব। তাঁদের পরস্পরের জীবন এমনিই একটি সূত্রে গ্রথিত যে গুণালঙ্কার সম্বন্ধে উল্লেখ না থাকে তাহলে সেখানেও কালীকুমার মহাস্থবিরের দান উপেক্ষা করা যায় না। যদিও তা সামান্যকিন্তু তাই বলে অকিঞ্চিৎকর নয়আসামের অন্তর্গত মার্গেরেটায় অবস্থানকালে জাতকে বর্ণিত বুদ্ধের বোধিসত্ত্ব জীবন অবলম্বনে তিনি চন্দ্রকুমার জাতক কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থ পাঠ করলেতাঁর ভিতরও যে সহজ কবিত্বশক্তি ছিলতা অনায়াসেই হৃদয়ঙ্গম হয়। যদিও সরল পয়ার ছন্দে এই কাব্য গ্রন্থখানি লিখিত তাহলেও জনসাধারণের বুঝবার পক্ষে এর বিশেষ মূল্য আছে। আর পুরাতন পন্থা অবলম্বন করলেও তাঁর রচিত ছন্দে কোথাও আড়ষ্টতা নেইবেশ স্বচ্ছন্ন ও অনবদ্য। তিব্বত যাত্রীর পত্র নাম দিয়ে জগজ্জ্যোতি পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ধারাবাহিক ভ্রমণবৃত্তান্ত বেশ মনোরম ও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল।

                মহাস্থবির কালীকুমার ছিলেন খ্যাতিবিমুখ নীরব কর্মী। নীরব কর্মীর ভাগ্যে যা ঘটে থাকেকালীকুমারের ভাগ্যেও তাই ঘটেছিল। উচ্চ কোলাহলের মধ্যে জয়মাল্যের উগ্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কখনও বিচলিত করতে পারেনি। নীরবতার মধ্য দিয়ে বুদ্ধের আদেশ পালন করবার জন্য প্রহরীর মত সর্বদা জাগ্রত ছিলেন। বুদ্ধও বলেছেন

যো হবে দহরো ভিক্খুযুঞ্জতি বুদ্ধসাসনে,

সো ইমং লোকং পভাসেতি অব্ভামুত্তো'ব চন্দিমা

সংসারে যে ভিক্ষু (তিনি যতই ক্ষুদ্র হোন না কেন) বুদ্ধের আজ্ঞা পালনে সর্বদা নিযুক্ত থাকেনমেঘমুক্ত চন্দ্র যেমন পৃথিবীকে আলোকিত করেতিনিও সেইরূপ জগতকে জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করেন। বাস্তবিক এই উক্তির সত্যতা কালীকুমার মহাস্থবিরের জীবনের সঙ্গে বিশেষভাবে সঙ্গতি রক্ষা করেছে নিঃসন্দেহে।

                কালীকুমার মহাস্থবিরকে ভুলে গিয়েছিএই ভুলে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁর নয়আমাদের। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সত্যই একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেনবাঙালি বড়ই আত্মবিস্মৃত জাতি। বস্তুত তাঁর এই উক্তি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কারণ যারা আত্মবিস্মৃতআত্মদর্শন যাদের নেইতারা চিরকালই স্বেচ্ছাকৃত কর্তব্য অবহেলার জন্য প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করে থাকে। বর্তমান বাঙালি বৌদ্ধসমাজ কালীকুমার মহাস্থবিরের নিকট কতটা ঋণীতা বিচার করবার সময় এসেছে কিনা তা অবহিত করা নিষ্প্রয়োজন উত্তরকালে প্রাচীন ভারতে সাধক অর্হৎ ভিক্ষুগণের দেহাবশেষের উপর স্তূপ নির্মাণ করে পূজা করবার প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন প্রথমে বৌদ্ধেরাই। বড়ুয়া বৌদ্ধেরা সেই বীরপূজার প্রথা ভুলে গেছে। বীরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ কতটুকুই বা আছে। এখন সবাই কর্তব্যভ্রষ্টআত্মচেতনাহীন। বুদ্ধের উপাসক হয়ে আমরা ঞাতি ধম্মো (জাতি ধর্ম) পালন করতে ভুলে গিয়েছি। তাই আজও কালীকুমার মহাস্থবিরের পুণ্য স্মৃতির অক্ষয় অবদান আসামের গভীর অরণ্যে আত্মগোপন করে আছে।

                বুদ্ধের নির্দেশিত ভিক্ষুর আদর্শ প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করাই কালীকুমার মহাস্থবিরের জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এই প্রকৃত ভিক্ষুর আদর্শ এবং ভিক্ষুচর্যা সম্বন্ধে নির্ধারিত সংজ্ঞা প্রতিপন্ন করেইতাঁর চরিত্র-মাধুর্য উপলব্ধি করতে হবে। র্মপদ-এ বুদ্ধ বলেছেন

                                “ন তেন ভিক্ষু সো হোতি যাবতা ভিক্খতে পরেবিস্সং ধম্মং সমাদায় ভিক্‌খুসু হোতি ন তাবতা।

কেবলমাত্র পরের নিকট ভিক্ষা করলেলোকে তার দ্বারা ভিক্ষু হয় না। পার্থিব বিষয়ে লিপ্ত থেকে পাপধর্ম সাধন করে কেবল ভিক্ষাদ্বারা কেউ কখনও ভিক্ষু হয় না। যে সমস্ত ভিক্ষু নামের কলঙ্ক উদ্রুতহীন ভিক্ষু গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে উদরান্নের জন্য কেবল ভিক্ষার অন্বেষণে ঘুরে বেড়ায়তাদের সম্বন্ধেও বুদ্ধ কঠোর উক্তি প্রকাশে দ্বিধা বোধ করেননি। ধর্মপদ-এর আর একটি গাথায় তিনি দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করেছেন

সেয়্যো অবগুলো ভুত্তো তত্তো অগ্নিসিখুপমো যঞ্চে ভুঞ্জেয় দুস্সীলো রট্ পিণ্ডং অসঞ্ঞতো।

দুঃশীল অসংযতেন্দ্রিয় মিথ্যা ভিক্ষুর পরদত্ত ভিক্ষান্ন বা খাদ্যগ্রহণ করা থেকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখার মতো লৌহগোলক খাওয়া উচিত। কিন্তু ভিক্ষা হিসেবে ভিক্ষুত্বের গৌরব ও মর্যাদা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করে বিচরণকারী সর্বদাই বিশ্বের হিতের নিমিত্ত কুশলকর্ম সম্পাদন করে নিষ্কামভাবে ধর্ম সাধনায় রত থাকেন। এই সমস্ত মুক্তপুরুষ সম্বন্ধে ভগবান বুদ্ধ বলেছেন

যোধ পুঞ্ঞ্চপাপঞ্চ বাহেত্বা ব্রহ্মচরিয় বাসংখ্যায় লো চরতি সবে ভিক্খু তি বুচ্চতি।

যিনি ইহলোকে পুণ্য এবং পাপ অতিক্রম করে ব্রহ্মচার্যবান হনএবং পৃথিবীতে জ্ঞান পরায়ণ হয়ে বিচরণ করেনতিনি নিশ্চয় ভিক্ষু বলে কথিত হন। উপরোক্ত কঠাগুলি স্থিরচিত্তে অনুধাবন করে নিঃসংশয়ে বলা যায় কালীকুমার মহাস্থবির ভিক্ষু হিসেবে কতকাংশে সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং বঙ্গের বর্তমান বৌদ্ধভিক্ষুদের থেকে তাঁর বিশেষত কোথায়।

                কৃপাশরণ মহাস্থবিরের সময়ে বাঙলার বাহিরে বৌদ্ধধর্ম প্রচারকার্যে কালীকুমার মহাস্থবিরই অগ্রণী প্রচারক হিসেবে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব এই যে তিনি যেখানেই গেছেনসেখানকার ভাষা সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করে সেই ভাষাতেই তিনি বুদ্ধের সত্যবাণীসমূহ জনসাধারণকে বুঝিয়ে দিতেন। তিনি প্রায় আট-দশটি বিভিন্ন ভাষায় অনর্গল সুন্দরভাবে বক্তৃতা দিতে পারতেন। এর কারণ হল তিনি পরিব্রাজক হিসেবে যেখানেই গেছেনসেখানকার ভাষা শিখেছেন। এই কারণেই তিনি এতগুলি ভাষায় দেশনা করতে পারতেন। এতগুলি ভাষা আয়ত্ত করাও তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও মেধার পরিচায়ক। গুণালঙ্কার মহাস্থবিরের উল্লেখ ব্যতীত কালীকুমার মহাস্থবিরের জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁরা উভয়েই আত্মীয়বন্ধুসমসাময়িক ও একই গ্রামবাসী ছিলেন। একই উদ্দেশ্যে ভিন্ন পথে যাত্রা করলেও আজীবন তাঁদের মধ্যে প্রাণের একটা নিবিড় বন্ধন ও সখ্য ছিল। সত্যের অপলাপ না করে যদি বলতে হয়গুণালঙ্কারের অসামান্য প্রতিভাবিকাশের মূলে ছিলেন কালীকুমার মহাস্থবির। তিনি গুণালঙ্কারকে চট্টলের এক নিভৃত অজ্ঞাত কোণ হতে নিয়ে এসে বহির্জগতের মুক্তপ্রাঙ্গণে উপস্থিত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দেশজোড়া খ্যাতির সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন গুণালঙ্কার মহাস্থবির।

                চট্টল বৌদ্ধসমাজ সবেমাত্র যৌবনের জয়যাত্রার গান ধরেছে। তখন প্রাতঃস্মরণীয় পুণ্যশ্লোক কৃপাশরণের যুগ শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বের কেন্দ্রভূমি কলকাতা মহানগরীতে জীর্ণ খাঁচার গুরুর সমান’ কৃপাশরণ মহাস্থবির ভারতে লুপ্ত বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠাকল্পে মহাযজ্ঞের সূচনা করেছেন। সেই কাষায় চীবরধারী ভিক্ষুর বুকে অনির্বাণ দুর্জয় সঙ্কল্প এবং কণ্ঠে বুদ্ধের শ্বাশ্বত অমৃত বাণী। কৃপাশরণের এই মহৎ সাধুসঙ্কল্প জয়যুক্ত করবার জন্য গুণালঙ্কার মহাস্থবির ও স্বামী পূর্ণানন্দ প্রধান সহচর ও সহকর্মীরূপে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। এই তিনজন বৌদ্ধভিক্ষুর অপূর্ব সম্মিলন যেমন বঙ্গের বৌদ্ধ সমাজকর্মে-শক্তির প্রথম ত্রিবেণী সঙ্গম। তাঁদের এই সমন্বয় শক্তির উদ্বোধনে বাঙালী বৌদ্ধজাতির প্রাণে আপন স্বাতন্ত্র্য ও জাতীয়তাবোধ সঞ্জীবিত হয়ে উঠল।

                ধৃতব্রত পরিব্রাজক ভিক্ষু কালীকুমার মহাস্থবির যদিও যুক্তভাবে তাঁদের এই বৃহৎ অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেননিকিন্তু মনে হয়তিনি কৃপাশরণেই অগ্রদূতরূপে তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য প্রচারকল্পে দেশ-দেশান্তরে ভারতের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। কালীকুমার মহাস্থবিরের জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যেতিনি কখনও আপনাকে একটা সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রেখে স্থাণুর মত কালযাপন করেননি। বৃত্তম জগতের মাঝে আপনাকে বিলিয়ে দিবার জন্য ভিক্ষাপাত্র সম্বল করে উদাসীন বিরাগীর মত একাকী পথ ধরে চলেছেন নির্ভীক নির্বিকার চিত্তকোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেইমুখে প্রসন্ন হাসিআত্মভোলা সদানন্দ পুরুষআর কোথায় সেই গন্তব্যস্থানতজ্জন্যও কোন আকুলতা নেই। শতাব্দীর স্তব্ধতা ভেদ করে বুদ্ধের সেই উদ্‌ভাসিত বীরবাণী চরথ ভিক্‌খবে চারিকং বহু জন হিতায়বহুজন সুখায় লোকানুকম্পায় অত্থায়হিতায় সুখায় দেব-মনুসসানং তাঁর কর্ণরন্দ্রে যেন প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হয়ে উঠত। চলার আনন্দেই তাঁর ভ্রাম্যমান জীবনে বিশ্রামের কোন অবসর ছিল না। তাই বুদ্ধের অমৃতময় সত্যপ্রচারের জন্য হিমালয়ের অপর পারে বিঘ্নসস্কুল দুর্গম গিরি অতিক্রম করে সিকিমতিব্বত ও নেপাল পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেনআর আসামের গহন পার্বত্য প্রদেশে মার্গেরেটায় বিহার স্থাপন করে তথাকার অধিবাসীদিগকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। এই মার্গেরেটাই তাঁর অন্তিমজীবনের কর্মক্ষেত্র এবং এখানেই তাঁর কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ড. বি. এম. বড়ুয়ার লিখিত ছোট্ট পরিসর ও শিলক গ্রামের প্রখ্যাত অধ্যাপক মুনীন্দ্রলাল বড়ুয়া লিখিত নিবন্ধ থেকে তাঁর এই সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেছি। তাঁর রচিত চন্দ্রকুমার জাতক বৌদ্ধ নৈতিকতা ও ক্ষান্তি পারিমতার সাক্ষী বহন করে। তাঁর কর্তৃক পয়ার ছন্দে রচিত চন্দ্রকুমার জাতকের অনুবাদ ও জাতকের বর্ণনশৈলী সত্যিকার অর্থে অত্যন্ত উপাদেয় ও ভরপুর ইতিহাস সমৃদ্ধ। তিনি এছাড়াও দধর্ম সূত্র ও চার প্রত্যয়ের গদ্যানুবাদ করেছেন। দুষ্প্রাপ্য চন্দ্রকুমার জাতক শ্রীমান জনি বড়ুয়া সংগ্রহ করে আপামর বৌদ্ধ মুমুক্ষুজনের মহা উপকারসাধন করেছেন। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আর একজনকে কৃতজ্ঞতা জানাই কল্যাণমিত্র ও সুহৃদ ভ্রাতা ড সুমিত বড়ুয়াকে এই জন্য যে, আমার যেকোন কাজ তাঁর সাহায্য ও ত্রুটি সংশোধন ছাড়া এগোতে শুদ্ধিতার অপারগতা থেকে যায়।  এই গ্রন্থ প্রকাশের ব্যয়ভার গ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ করেছে কালীকুমার মহাস্থবিরের নাতি ঘরের পুতি শ্যামনগর নিবাসী শ্রীদীপককুমার বড়ুয়া। তিনি শিলক গ্রামেরই সন্তান, তাঁকেও আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই এই জন্য যে পূর্বপুরুষ তথা মহান পরিব্রাজক ভিক্ষুর নতুন করে জনসমক্ষে পরিবেশন করেছেন। তাঁর সর্বাঙ্গীন মঙ্গল ও আয়ু আরোগ্য কামনা করি। গ্রন্থটি সুচারুরূপে মুদ্রণ করার জন্য মুদ্রণ সংস্হার কর্ণধার ও কর্মীবৃন্দদের ধন্যবাদ জানাই। অলং ইতি বিত্থারেন।

 

সুমনপাল ভিক্ষু

অতিথি অধ্যাপকপালি বিভাগ ও বৌদ্ধ বিদ্যা অধ্যয়ন বিভাগকলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

অতিথি অধ্যাপকপালি বিভাগসংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়