Sunday, June 28, 2026

নারায়ণ সান্যাল জীবনপুরের পথিক

 নারায়ণ সান্যাল জীবনপুরের পথিক

 

-        সুমনপাল ভিক্ষু

 

"রবে না কাহার ও মনে

-এই শিখা দিত কত আলো।

আনুগত্য তথ্য যদি ফঅইলে না মিলে

প্রমান হবে না - তুমি কোনদিন ছিলে

এই দুনিয়ায়!

হায়!

ভয় হয় তাই

আপন অস্তিত্বখানি কখন হারাই!

অনাগত যুগে কোন গবেষক এসে

 ফুটনোট কণ্টকিত থিসিসের শেষে

কহিবে কর্কশ কণ্ঠে: শোন! সবে শোন!

নারান সান্যাল নামে

দুনিয়ার কেউ কভু ছিল না কখনও।" – নারায়ণ সান্যাল।

"বঙ্গভাষা আজ আর উপেক্ষিত নহে বাঙ্গালী বলিয়া যাঁহারা গর্ব করেন, তাঁহাদের নিকট বঙ্গভাষা বরং অপেক্ষিত যখন বাঙ্গালীর ছেলে, বঙ্গভূমির বক্ষের উপর দাঁড়াইয়া বাঙ্গলা ভাষায় কথা বলা, বা বাঙ্গলা ভাষায় গ্রন্থ অধ্যয়ন করাকে লজ্জাজনক, কতকটা বা প্রত্যবায়জনক মনে করিতেন, সে দুর্দিন কাটিয়া গিয়াছে, সে মোহ ভাঙ্গিয়াছে।

মহাকবি কৃতিবাস হইতে কবিবর রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বহু মনস্বী বঙ্গসন্তান বঙ্গবাণীর স্বর্ণমন্দির রচনায় সাহায্য করিয়াছেন, রাজা রাম মোহন, প্রাতঃ স্মরণীয় বিদ্যাসাগর, অমর বঙ্কিমচন্দ্র, চিন্তাশীল অক্ষয় কুমার প্রভৃতি বহু প্রতিভাশালী সারস্বতগণ সেই মন্দির গাত্র নানাবিধ শিল্পসৌন্দর্যে খচিত করিয়াছেন। বঙ্গভাষা এখন বাঙ্গালির একটা প্রকৃত স্পর্ধার সামগ্রী হইয়া দাঁড়াইয়াছে।" (আশুতোষ মুখোপাধ্যায়)।

যে জাতির নিজের পরিচয়যোগ্য ভাষা নেই, বা নিজের জাতীয় সাহিত্য নাই, সে জাতির বড়ই দুর্ভাগ্য। (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিবিধ প্রবন্ধ, ১ম খণ্ড)।

বর্তমান সময়ের কালখণ্ডে সাহিত্যিকের আনুগত্য সাহিত্যের চেয়েও অনেক অনেক বেশী নীরস বাস্তব পৃথিবীর প্রতি, যে পৃথিবী ধর্ষিত এবং লাঞ্ছিত হয়ে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এক্ষেত্রে সাহিত্য হবে তীব্র কুঠার।

কর্কশ এবং ধারালো, তাতে থাকবে না কোনরকম পোশাকি শব্দ কিম্বা আঁতলামি সম্বল কথামালা।

"....একথা মনে হতে পারে, যখন চারিদিকে ভাঙনের ছবি দেখি। পুরানো পোকায় খাওয়া সমাজ এখন থরথর করে কাঁপছে, এমন কি যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই দেশে শুধু শোষণ ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করে চলেছে, মনে হয় প্রচণ্ড ভূমিকম্প বুঝিবা তাকে ও সম্পূর্ণ গ্রাস করবে বলে মাটির নীচে চাপা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে চাইছে। কিন্তু মাটির ওপর থেকে বিস্ফোরণকে ত্বরান্বিত করার কোনো প্রস্তুতিই কোথাও নেই।" (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

যদি আমাদের মধ্যে একজন ও বিদ্যাসাগর, মাইকেল কিম্বা অনুসন্ধিৎ সু কথাকার উপস্থিত থাকতেন, তাহলে তিনি অভিশাপ দিতেন হয়তো।.... আজকে পুনঃরায় নতুন করে ভাবনা-চিন্তার সময় উপস্থিত হয়েছে। সৎ সাহিত্য বিচারের কী রীতি, মনুষ্যত্বকে ফুটিয়ে তোলা সাহিত্যের মূল অর্থাৎ প্রধান লক্ষণ কিনা, বিবেকের কাছে হৃদয়ের কাছে আবেদন না অবিবেকী সত্তার নিকট আত্মসমর্পন হবে লেখকের বিচার্য নারায়ণ সান্যালের রচনার প্রেক্ষিতে এ সকল মূল্যায়ন আজকে একান্তভাবে জরুরী। নতুবা অসীম মুর্খতা আমাদের গ্রাস করতে বাধ্য করবে।

এ প্রসঙ্গে উঠে এল এন জুলফিকার মহাশয়'এর নারায়ণ সান্যাল সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ এপিটাফ-

"...ওঁর সেই পল্লবগ্রাহিতার কল্যাণে উপকৃত হয়েছি আমরা, সাধারণ পাঠক সমাজ। ডুবুরির মতো সাগরতল থেকে নিপুণ সন্ধানে তুলে এনেছেন মণি মুক্তা, সংগ্রহ করেছেন হিরে জহরত সাহিত্য সেবার প্রয়োজনে, পাঠকদের কাছে পরিবেশনের উদ্দেশ্যে। সে খোঁজায় তাঁর ক্লান্তি ছিল না কোনও, নিষ্ঠায় ছিল না ছেদ জীবনের শেষ পর্যন্ত। ফাঁকিবাজি বা 'সৌখিন মজদুরি' ছিল না তাঁর লেখায়।

নারায়ণ সান্যাল বলেছেন, "আশ্চর্য এই উদ্‌দ্বাস্তুদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কেউ কিছু লিখল না। পঞ্চাশ লক্ষ লোক ঘর-বাড়ি, সমাজ-সংসার ছেলে চলে এল।.... দশ-পনেরো বছর ধরে স্রোতের জলে ভেসে ভেসে বেড়ালো শিকড় গাড়ল না কোথাও। নতুন জমিতে, নতুন করে ওরা বাঁচতে চায় কী তীব্র ওদের বাঁচার আকাঙ্খা।... অন্ধকারে ওরা জীবনকে খুঁজছে।"

নারায়ণ সান্যাল অনুভব করেছিলেন বাস্তচ্যুত মানব জমিনের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, আত্মীয়, পরিজনের সমবেত আর্তনাদ, ব্যাথাতুর জীবন, আরও কত কি.....। দেশ ভাগের বিপর্যয়'এর প্রভাবে নৈতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক ভাঙন প্রভাবে ব্যক্তি মানসে সৃষ্ট নৈরাজ্য, ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা। মনে হয় পৃথিবী গভীর হতে গভীরতম ব্যাধিতে আক্রান্ত। নারকীয় পারিপাশ্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে কথাকার 'এর মানব পঠে।

ধূসর আকাশ

ভাষাহীন, নিঃস্তব্ধ পাথরের মতো

দীর্ঘ রাত্রি

ক্লান্ত পথিকের মুখোশে নিঃসঙ্গ।

স্বপ্ন

প্রেমহীন এলোমেলো

আজও মেয়েটা কাঁদে

নবকুমারের অপেক্ষায়।

তখন

আমার অন্ধকারে আমি

নির্জন শহরের বুকে, নিঃসঙ্গ।

নিথর

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এখানে জীবন একটা ফুলের মতো, যার পাপড়ি গুলি এক এক করে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। মানুষের হৃদয়াবেগের কোমলতম এবং সব থেকে মূল্যবান অনুভূতি গুলি ধর্মমোহের অবক্ষয়ী গ্রাসে হারিয়ে গেছে। ফুটে উঠেছে মৃত্যুর কলবর আর অসহায়ত্বের ছায়া। মনে হয় মৃত শবের অসহনীয় গন্ধে, শেষহীন শব্দের পাশে আসন্ন রাত্রির পদক্ষেপে স্তব্ধ লালনের গান আর সমবেত কীর্তন। নারায়ণ সান্যালের উপন্যাসে পাই উদবাস্তুদের পটচিত্র:

আবার একপাক ঘুরল মহাকালের রথচক্র ….

"-ছিন্ন মলিন বসন। ওদের কাঁধে রাইফেল নেই, কাঁখে কঙ্কালসার শিশু। ওদের মনে যুদ্ধ জয়ের প্রেরণা নেই আছে জীবন যুদ্ধে পরাজয়ের গ্রানি। ফেলে আসা, অতীতের বিভীষিকা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওরা এসে গেল দলে দলে। হাজার হাজার উদ্বাস্তু পরিবার।" (বকুলতলা পিত্রল, ক্যাম্প)

আমাদের দেশভাগের, দেশত্যাগের ইতিহাস নেই, আছে স্মারক, হাজার হাজার। উদ্বাস্তু কলোনি, ক্যাম্প, বস্তি, ফুটপাথ।

সুধীর চক্রবর্তী এক স্মৃতিচারণ মূলক লেখায় তাঁর 'নারাণদা' সম্পর্কে লিখেছেন, "নারাণদা ছিলেন জীবনরসিক এবং শিল্প সাহিত্য প্রেমী। বস্তুত লিখতে এত ভালোবাসতেন যে তার প্রমাণ শতোত্তীর্ণ নাকি একশো পঁচিশের ও বেশি বইয়ের সংখ্যা, আর সেইসব বই লেখার জনে বিপুল পাঠের পূর্ব প্রস্তুতি, নোটস তৈরি করা। ...তাঁর লেখার পরতে পরতে আছে... মেধা ও মননের দ্যুতি। পাণ্ডিত্য আছে, কিন্তু তার ভার নেই।"

বকুলতলা পিত্রল, ক্যাম্প'এর মধ্যে অদ্ভুত ভাবে উঠে এসেছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়'এর একটি কবিতা:

নেভানো উনুনের ওপর পড়ন্ত আলোয়

যেন

ফাঁসির দড়িতে ঝুলছে

কাল বিকেলের মাজা ভাতের হাঁড়ি।

- একটি লড়াকু সংসার, ফুল ফুটুক।

..... ভিটে মাটি খাঁ খাঁ করছে।

সাম্প্রদায়িক লখের আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে কামিনী আর কুসুমের জীবন।

ঘরের মানুষ হয় মৃত নয়তো বা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।

স্বাধীন দেশ তাদের নাগরিক মনে করেনি। অনেকেই দেশত্যাগী। ভাঙ্গা উনুনের পাশে পড়ে আছে সেই কবেকার বেওয়ারিশ কাঠকুটো, ভাঙা টিনের থালা।

পচে যাওয়া খুঁটি পাশে আড়ি পেতেছে শ্মশানের বামাচার। জেলেপাড়া, মালোপাড়া, যুগীপাড়া এখন মহেঞ্জোদরো হরপ্পা। কেউ নেই কোথাও। মানুষের নিকোনো উঠোন, সন্ধ্যারতি, অদ্ভূত ভাতের গন্ধ কিম্বা হানিফ মিঞা ডিঙা....।

আঁকাবাঁকা পথে ছায়ার মিছিলে ওরা হাঁটে নিরুদ্দেশের কালখণ্ডে। কুপার্স ক্যাম্প হতে রাজমহল অথবা দণ্ডকারণ্যের পথ ধরে ওরা

হাঁটে। তবুও কোথাও যেন জীবন নেই।

তখন বিকর্ণের দিনলিপিতে উঠে আসে এইসব বোবা যুদ্ধের বিষন্ন ছবি।

অন্ধকার নামে শুকনো তুলসী মঞ্চ আর পাগলা সুফি'র মাজারে। পিছনে করুণ মূর্তি পথের অন্ধকারে বিসফারিত। আলো চাই আলো কিন্তু কে দেবে তাঁকে। বাতাসে ভেসে আসে চাপা দীর্ঘশ্বাস।

অবিরত শত শত কুপথ কুকর্মে রত

           ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম হয়ে বিবর্জিত

ধনাশা পূরিত চিত্ত বিষয় মদেতে মত্ত

           ভুলিয়া পরমতত্ত্ব হিত।

বিষয় বাসনা বশে            পরে আত্ম ভ্রান্তিদোষে

আছে ভ্রান্ত হইয়া নিতান্ত

বিষয় বাসনা দেখি           বসুমতী হাস্যমুখী,

হাস্য মুখ হয়েছে কৃতান্ত। - নববাবু বিলাস, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

লেলিন' একসময় বলেছিলেন, যেসব বুদ্ধিজীবী হয়েছেন, তাঁদের যথাযোগ্য মর্যাদা অবশ্যকর্তব্য। পুঁজির দাসত্ব না করে জনসাধারণের স্বার্থে বিজ্ঞানকে উন্মোচন করার কাজে ব্রতী মানবিক মূল্যবোধের প্রতি আত্মসচেতন, কর্তব্য-কর্মে দায়বদ্ধ, গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিদের প্রতিনিধি নারায়ণ সান্যাল সম্পর্কে লেলিনের এই উক্তি কি প্রযোজ্য নয়?

চীন-ভারত লঙ্ মার্চ' নারায়ণ সান্যালের অন্যরকম একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে লেখক বলেছিলেন:

"ভবিষৎ কালের কাছে এ বইটি একটা দলিল হয়ে থাকবে ১৯৭২-৭৩ সালে, প্রাক-এমার্জেন্সি-যুগের কংগ্রেস সুশাসন আমলে ভারতে একজন বাঙালী কথাসাহিত্যিকের মানসিকতা কী অবস্থায় ছিল, তিনি কতটা মনের ভাব প্রকাশ করতে ভরসা পেতেন তা এক থেকে বোঝা যাবে।

'শেষ কথা' শীর্ষক ১৯ পরিচ্ছেদের সূচনা পর্বে নারায়ণ সান্যাল বলেছেন 'লঙ মার্চের তুলনা ভারতবর্ষে নেই, একথা আগেই স্বীকার করেছি। কিন্তু মে-ফোর্থ আন্দোলন? কিয়াংসি সোভিয়েত? চিঙখানশান পাহাড়ের গেরিলা বাহিনী? সাংহাইয়ের নির্মম হত্যাকাণ্ড? তাদের কোনো উপমান কি খুঁজে পাওয়া যায় এ উপাদীপে?... স্বীকার করতেই হবে- ব্যাপ্তিতে তাদের কোনো উপমার কি খুঁজে পাওয়া যায় এ উপদ্বীপে?.... স্বীকার করতেই হবে ব্যাপ্তিতে, বিশালতায়, সংখ্যাতত্বে কিংবা সাফল্যের নিরিখে সমান্তরাল চিত্র নেই কিন্তু সেটাই তো শেষ কথা নয়। শেষ কথা আন্তরিকতা আর আত্মদানের নিরিখে উপমান হয়তো আছে।'

লাল নিশানের নীচে উল্লাসী মুক্তির ডাক

রাইফেল আজ শত্রুপাতের সম্মান পাক। - পদাতিক।

নারায়ণ সান্যাল দেখেছিলেন ৪৭'এর ব্যর্থ স্বাধীনতা, দেশভাগ, নিরন্ন এবং অসহায় মানুষের হাহাকার। রাজা এসেছে। আবার চলে ও গেছে নিয়ম মেনে। তবুও শাসন শোষনের দিন বদলায় নি।

'অহিংসা পরম ধর্ম'- মহান বুদ্ধের এই মানবিক চিন্তাধারাকে নস্যাৎ করে চীনের জনগণের উপর চেপে বসেছে সামাজবাদী আগ্রাসন।

অহিংসা পরমো ধর্ম নীলবর্ণ শৃগালের দলে।

টাকার টংকারে শুনি: মায়া এ পৃথিবী।

জীবের সুলভ মুক্তি একমাত্র স্বস্তিকার নীচে।

সংগ্রাম নিশ্চিত, তবু মাসুতুতে ভা'য়েরা

বিষম সন্ধিতে আজ কী চক্রান্ত চৌদিকে ফেঁদেছে।

আজকে এপ্রিল মাস (চৈত্র না ফাল্গুনে?)

ভ্রষ্ট নোগুচির ন্দি চাড়াইয়েরা ভনে। - পদাতিক।

বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ' লাল চীন'এর চিত্কা পাহাড়ের অগ্নিশিখা তেলেঙ্গানা, তেভাগার পথ ধরে উপস্থিত হল নকশাল বাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থানে। নারায়ণ সান্যালের কলম এখানে বেয়নটের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, চেয়ারম্যান মাও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল কৃতি ছাত্র শ্রেণীহীন সমাজের চির বাসনায় ভারতবর্ষের বুকে ক্রান্তিকাল আনতে চেয়েছিল। শাসক দলের মতে ওরা ছিল লুভে রাইট বা ভ্রান্ত পথের পথিক। তাই নেমে এল নিষ্ঠুর নির্মম দমন নিপীড়ন। কিন্তু বিপ্লবের কি মৃত্যু আছে....।

তবু জানি, কালের গালির গর্ভ থেকে বিপ্লবের ধাত্রী

যুগে যুগে নতুন জন্ম আনে,

তবু জানি,

জটিল অন্ধকার একদিন জীর্ণ হবে চূর্ণ হবে ভস্ম হবে

আকাশ গঙ্গা আবার পৃথিবীতে নামবে - সমর সেন, ঘরে-বাইরে।

নারায়ণ সান্যাল বিশ্বাস করতেন, কবি সাহিত্যিক যদি অবক্ষয়ের চেতনা'কে আঁকড়ে ধরে থাকেন তাহলে মধ্যবিত্ত জীবনের গলিত স্থবির এবং নপুংসক দিকটাই কেবল তার চোখে পড়বে। ফলে সে হয়ে উঠবে স্বপ্নভীরু ক্লীব। কবির ভাষায় সর্বাঙ্গে ভুলের নামাবলী।'

ইতিহাস কি?

ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের মূলগত সম্পর্কই বা কি? এর একটি চমৎকার এবং যুক্তি গ্রাহ্য উত্তর পাওয়া যায়। ইতিহাসের মূলগত ভিত্তি হল মানুষ। একটা বিশেষ লক্ষ্যে এই মানুষের ক্রিয়াশীলতাই মূলঅর্থে ইতিহাস। তবে কার্য কারণ তত্ত্ব ব্যতীত ইতিহাসের কোন মূল্য সেই অর্থে নেই।

যদি দার্শনিকের ভাষায় বলতে হয় তাহলে বিষয়টিকে এইভাবে বলা যেতে পারে।

প্রকৃত অর্থে ইতিহাস কিছুই করে না, এ (ইতিহাস) 'কোন বিরাট সম্পদের অধিকারী ও নয়', এ (ইতিহাস) 'কোন সংগ্রাম ও পরিচালনা করে না'। এটা কেবল মানুষ, বাস্তব, জীবন্ত মানুষ যে সব কিছু করে, যে সব কিছুর অধিকারী এবং যে সংগ্রাম করে, 'ইতিহাস' কোন বিচ্ছিন্ন সত্তা নয় যে মানুষকে নিজের লক্ষ্য সাধনে ব্যবহার করে, ইতিহাস নিজস্ব লক্ষ্যসাধনে মানুষের ক্রিয়া কর্ম ছাড়া আর কিছুই নয়।

"ক্ষেত্র কর্ষন পরিশ্রম সাধ্য কার্য হইলেও, সেই কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ-বপন ও উপযুক্ত সেচনাদির দ্বারা অঙ্কুরিত বীজের রক্ষণ এবং পরিবর্ধন অধিকতর পরিশ্রম সাধ্য ও বিবেচনা সাপেক্ষ। অঙ্কুরিত শয্যের আপদ অনেক। সেই সমস্ত আপদ হইতে রক্ষা করিয়া শষ্যকে ফলোম্মুখ করিয়া তোলা বড়োই দক্ষতা সাপেক্ষ। যে সময়ে জল সেচনের প্রয়োজন তখন জল, যখন আতপ নিবারণের প্রয়োজন। তখন ছায়ার ব্যবস্থা আবশ্যক। এই সমুদয়ের কোনো একটির অভাবেই কষিত ভূমি শস্যশালিনী হইতে পারে না।" (আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বঙ্গ দর্পন, পৃঃ ৫২২) ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে ও এই বিষয়টি আবশ্যক হয়। নতুবা উপাদানগুলি আবর্জনাজনিত ক্ষারদাহে দন্ধীভূত হতে বাধ্য।

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল (১৯২৪-২০০৫ খ্রীঃ) একজন গদ্যকার হলেও এক অর্থে ইতিহাসকার। তাঁর ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপট জীবনবোধের মূল্যায়ন এবং সমাজভুক্ত মানুষের ক্রিয়াশীলতা। এখানে বস্তুবাদী উপাদানের উপায় ও উপাদানের সম্পক মুখ্যত ক্রিয়াশীল। এই সত্যকে কোন ভাবে অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু এই প্রয়োজন কেবলমাত্র ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে নয়, সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রযোজ্য। তবে একথা বলতে কুণ্ঠা বোধ করা উচিত নয় যে কেবলমাত্র ভাববস্তু এবং মনোভঙ্গির ক্ষেত্রেই নয়, প্রকরনগত দিক থেকেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ও লক্ষ্যণীয় ভাবে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। গদ্যরীতির প্রবর্তন, শব্দের ব্যবহার, রূপক প্রতীক প্রয়োগ এবং প্রকরণ গত বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের এই উত্তরণ ঘটেছিল। নারায়ণ সান্যালের গদ্যরীতিতে এই প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। মনে হয় তিনি জীবনানন্দের ভাষাতে'ই বলতে চেয়েছেন -

স্বপ্ন নয় - শান্তি নয় - ভালবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়।

আমি তারে পারি না এড়াতে। - ধূসর পাণ্ডুলিপি।

সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী 'সাহিত্য বাস্তব ও কল্পনা' প্রবন্ধে প্রগতি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছেন বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির সঙ্গে ঐতিহাসিক ভবিষ্যতের গতিপথে স্থিরলক্ষ্য কল্পনার শুভদৃষ্টিক।

তাঁর ভাষায়, 'সাহিত্যিক সামাজিক অগ্রগতির কাজে সহায়তা করতে পারেন যদি তিনি সার্ব্বজনীন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কাল্পনিক দৃষ্টিকোনকে সংযুক্ত করে ইতিহাসের সমগ্র রূপের সঙ্গে তার সামজ্ঞস্য স্থাপন করেন।' (সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯৯১ : ৪৭)

সুতরাং এই অর্থে যদি নারায়ণ সান্যালের সাহিত্যের লক্ষ্য এবং প্রধান লক্ষণ গুলিকে বিশ্লেষণ করা হল তাহলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি উঠে আসে। যেমন

১। নারায়ণ সান্যালের সাহিত্য হল দেশকাল এবং সমাজ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন অর্থাৎ সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

২। তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে রয়েছে গনমানুষের জীবন।

৩। তাঁর সাহিত্যের মর্মবস্তুতে নিহিত রয়েছে শুভত্বময় রূপান্তরের আদর্শ।

৪। তাঁর সাহিত্যে জীবন ও জগৎকে দেখানো হয়েছে প্রগতিশীল বিশ্ববিক্ষার আলোকে।

ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়'এর মতে, তথ্য পরিবেশনায় থাকবে বিজ্ঞানমনস্কতা, ঘটনা উপস্থাপিত হবে সেই কালধর্ম নির্ভর বাস্তবতার নিরিখে..... আর দৃষ্টিভঙ্গিতে থাকবে সেই মূল্যজ্ঞান যাতে নিহিত 'ভাল ভাবে এবং আরো ভাল ভাবে জীবন চালাবার ইচ্ছা।' (প্রাগুক্ত, ১৯৯১: ১-৬)।

এই অন্ধকার আমাকে কী করে ছোঁবে?

পাহাড়ের ধূসর স্তব্দতায় শান্ত আমি,

আমার অন্ধকারে আমি

নির্জন দ্বীপের মতো সুদূর.....। - সমর সেন, মুক্তি।

অনুসন্ধিৎসু কথাকার নারায়ণ সান্যাল তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার প্রশ্নে ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্রের অনুসারী। প্রসঙ্গত স্মরণ যোগ্য যে বৌদ্ধ যুগ ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ এবং এই যুগ ব্যতীত ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা তথা মূল্যায়ন করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। সর্বোপরি এই যুগ ভারতীয় উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর ইতিহাসকে ও নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।

নারায়ণ সান্যাল 'আনন্দস্বরূপিনী' উপন্যাস (রচনাকাল ১৯৭৭ এবং গ্রন্থপ্রকাশ ১৯৭৮ খ্রীঃ) বৌদ্ধ যুগের পটভূমিতে রচিত। মূল অর্থে ভারতের ইতিহাসে সুবর্ণযুগ অর্থাৎ গুপ্ত যুগ এবং চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন'এর ভারত আগমনকাল (৩৭০-৪১৩ খ্রীঃ)।

এই উপন্যাসের মূল কান্ডারী ভারতের ইতিহাসে ব্রাত্যজন, বিস্মৃত এবং অপাংতেয়। এর মূল কারণ আমাদের অজ্ঞতা ও অযোগ্যতা। এই অযোগ্যতার বিষয় সর্ম্পকে নারায়ণ সান্যাল খেদেক্তি করেছেন আমি তো মনে করি.... বিগত দ্বিসহস্রাব্দীতে যে পরিব্রাজকটির নাম স্মরণে আসা সঙ্গত, তিনিই আমার কাহিনীর ইতিহাস উপেক্ষিত নায়ক যাঁর নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে দ্বিধায় সঙ্কোচে মধ্যপথে নেমে পড়েছি।

ঔপন্যাসিক নারায়ণ সান্যাল আরও বলেছেন,... ভারতের ইতিহাস চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন যতটা সমুজ্জল মহাভিক্ষু কুমার জীব ততটা স্বীকৃতি পাননি। কাব্যে-উপেক্ষিত-র মতো সেই ইতিহাস উপেক্ষিত কুমারজীবকে এ কাহিনীর প্রধান চরিত্র বা নায়ক করতে চেয়েছিলেন। কী জানি হয়তো তাঁর অপেক্ষা অক্ষুমতীই বেশি প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

কবির ভাষায় এইভাবে বলা যেতে পারে হয়তো -

এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,

প্রত্যেক নিভূত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি।

কাহিনীর স্থান - মূল রেশম সড়ক (কেন্দ্রীয় সিল্ক রুট), কুটী নগর এবং কাশগড় অঞ্চলের মধ্যবর্তী অংশ।

তাকলামাকান মরুভূমির উত্তর সীমান্তলীন পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত তারিম নদীর উত্তর উপকূল। তবে ভারত এবং চীনের মিলনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা সব থেকে বেশী। তবু ও অসংখ্য প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে ভগবান বুদ্ধ প্রবর্তিত সন্ধর্মের বর্তিকা উপস্থিত হয়েছিল চীনে।

ন হি বেরেন বেরানি, সম্মন্তীধ কুদাচনং।

অবেরেন চ সম্মন্তি, এস ধম্মো সনন্তনো ।।৫।। - ধম্মপদ, যমকবর্গো পঠমো।

ভগবান বুদ্ধের ধর্ম কখনই শোনিতের প্রবাহ ধারায় আশ্রিয় হয়ে বিশ্বের আঙিনায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। এর মূল কারণ সদ্ধর্মের প্রতি অনুশাসন। 'দীর্ঘনিকায়' এর সঙ্গিতী সুত্তম্ভ'তে ভগবান বুদ্ধ চিত্তশুদ্ধির চতুমার্গের কথা বলেছেন মৈত্রী, করণা, মুদিতা এবং উপেক্ষা।

মহাকবি অশ্বঘোষ বিরচিত 'বুদ্ধরচিত' কাব্যের ১৩তম সর্গ, ললিত বিস্তর কাব্যের ২১তম অধ্যায় এবং জাতক নিদান কথা'র অবিদুর নিদান'এ ভগবান বুদ্ধের মারবিজয় কাহিনী অসামান্য কাব্য সুষমায় পরিপূর্ণ।

এরপর মোক্ষ শত্রু পুষ্পধনু কামদেব তাঁর তিন পুত্র এবং তিন কন্যা সহ বোধিবৃক্ষতলে উপবিষ্ট বোধিসত্ত্বের ধ্যান বিনষ্ট করতে সসৈন্যে উপস্থিত হলেন। মার সৈন্যের ভয়ঙ্কর রূপ বোধিসত্ত্বের চিত্তকে বিচলিত করতে পারল না। অতঃ পরাজিত পুষ্পধনু (মার) সসৈন্যে পলায়ন করলেন। মার বিজয়ী বোধিসত্ত্ব প্রভাতের সূর্যের ন্যায় আলোকিত হলেন। (বুদ্ধচরিত, ১৩তম সর্গ)

চীনে সদ্ধর্ম প্রবেশের পর ফা-হিয়েন, সুয়াঙ জ্যাঙ (হিউয়েন সাঙ), ই-সিং সদ্ধর্মের শিক্ষালাভের অভিপ্রায়ে অতি দুর্গম পথ অতিক্রম করে ভারতে উপস্থিত হয়েছিলেন। অপরদিকে ভারত হতে চীনে গিয়ে ছিলেন ধর্মরত্ন, কুমারজীব, বুদ্ধভদ্র, ধর্মগুপ্ত, বজ্রবোধি প্রমুখবিদ এবং পরিব্রাজক বিস্মৃত প্রায়।

কাহিনীর সূত্রপাত রেশম পথের মাধ্যমে কুচি এবং কাশাগড় অঞ্চল। গুপ্তযুগে কাশ্মীর রাজার ব্রাহ্মণ অমাত্যের পুত্র কুমার নারায়ণ সংসার জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভগবান বুদ্ধের সদ্ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই সময় মহাযান মতাদর্শ ভারতীয় বৌদ্ধভিক্ষুদের একাংশের হাত ধরে তিব্বত এবং চীনে উপস্থিত হয়েছিল। এক সময় কুমার নারায়ণ কুশীজনপদের রাজা পো-সান্তের ভগিনী জীবার পানি গ্রহণ করেন। এই বিষয়ে নারায়ণ সান্যাল লিখেছেন -

.....এর পরের প্রকৃত ইতিহাস হারিয়ে গেছে, কিন্তু পরিনাম দেখে অনুমান করা যায়, মার বিজয়ীর রাজ্যে পঞ্চশর পুনরায় সফলকাম হয়েছিলেন।

কুমার নারায়ণ এবং জীবা'র দাম্পত্য জীবন ছিল ক্ষণস্থায়ী। এক সময় জীবা'র কোল আলো করে উপস্থিত হয় একটি পুত্র সন্তান। পিতা-মাতার নাম অনুসারে সেই পুত্রের নামকরণ করা হয় কুমার জীব। কিন্তু সাংসারিক বন্ধন হতে মুক্তি লাভের বাসনায় কুমার নারায়ণ ভিক্ষু বুদ্ধ স্বামীর (কুচী'র সংঘারাম প্রধান) নিকট উপসম্পদা গ্রহণের যাচনা করলেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভগবান বুদ্ধের সেই অমোদ বাণী যা ধম্মপদ'এ সংরক্ষিত আছে -

পুম্ফানি হেব পচিনন্তৎ, ব্যাসত্তমনসৎ নরৎ।

সুত্তং গামং মহোঘো ব, মচ্চু আদায় গচ্ছতি।।৪৭।।

যেভাবে নদীর সুবিশাল জলপ্রবাহ নিদ্রারত গ্রামকে বয়ে নিয়ে চলে যায়, ঠিক সেইভাবে কামভোগরূপ পুষ্পকে চয়নকারী তথা তাতে আসক্ত পুরুষকে মৃত্যু ধরে নিয়ে যায়।

ফলে মারের বন্ধনকে ছিন্ন করে কুমার নারায়ণ স্বপরিবারে উপাসম্পদা গ্রহণ করলেন। জীবা তাঁর শিশু পুত্র কুমার জীব সহ আশ্রয় গ্রহণ করলেন ৎ-সিয়াও লী সংঘারামে। অতি শৈশবকাল হতে কুমার জীব অসাধারণ মেধা সম্পন্ন ছিলেন। তিনি মাত্র ৬ বৎসর কালে পালি এবং সংস্কৃত ভাষায় বৌদ্ধ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। কুমার জীব ২০ বৎসর কালে উপসম্পদা গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ৩০ বৎসর কুচী'তেই ধর্মজীবন অতিবাহিত করেন। একসময় তিনি ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন, ব্রাহ্মণ্যবাদী দর্শন, জৈন দর্শন এবং অন্যান্য ব্যবহারিক বিদ্যাশিক্ষা আয়ত্ব করেন।

অত্তা হি অত্তনো নাথো, কো হিনামো পরো সিয়া।

অত্তনা হি সুদন্তেন, নাথং লভবিদুল্লভং ।।১৬০।। - ধম্মপদ, অত্তবঙ্গো।

মনুষ্য স্বয়ংই নিজের স্বামী (উদ্ধারক)। অপর কেউই তার স্বামী হতে পারে না। সর্বপ্রথম নিজেকে উত্তম রূপে দমন করার পরেই সেই মনুষ্য দুর্লভ নাথকে (নির্বাণ) লাভ করতে পারেন।

কালের রথচক্র এগিয়ে চলে।

এক সময় কুমার জীব হয়ে ওঠেন মহাজ্ঞানী, মহাতাপস বৌদ্ধ অর্হৎ। তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন কুচী নগরে। কাশগড়ে ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ কালে ভিক্ষু আনন্দকে প্রদত্ত পিন্ডাচরণের (ভিক্ষাপাত্র) পাত্রটি আবিস্কৃত হয়। কাশগড় রাজা এই সংবাদে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। তিনি উক্ত ভিক্ষাপাত্রটি সংরক্ষণের নিমিত্তে স্তুপ নির্মাণ করলেন। রাজ আদেশে কুমার জীব ভিক্ষুকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি রাজী হন। যাত্রাকালে ভিক্ষু'র সঙ্গী হন ভিক্ষুণী জীবা, রাজকন্যা অক্ষুমতী এবং শ্রবণা। প্রত্যাবর্তন কালে তাঁরা তারিম নদীর উপনদী অক্ষু'র স্রোত ধারা অতিক্রম করেন। স্রোতধারার নাম জিজ্ঞাসা কালে কুমারজীব বলেন 'আত্মানং বিদ্ধি'। অর্থাৎ 'আত্মদর্পণ স্বরূপিনী'। এক্ষেত্রে আমরা কুমারজীব'এর বক্তব্যটি আমরা উদাহরণ রূপে গ্রহণ করতে পারি-

নদী ও নারী অভিন্ন আত্মা। অক্ষুনদীর আর অক্ষুমতীর তুলনা এক্ষেত্রে ত্রুটিহীন। এই নদীর স্রোতরেখা ধরে যদি চলতে থাক উপনীত হবে ব্রাঘাশকোল হ্রদের উপকূলে সেখানে পৌঁছে স্থির হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়বে অক্ষু।...তার অচঞ্চল জলে নির্মেঘ আকাশের সবটুকু নীলিমাই প্রতি বিম্বিত। নদী-নারীর সার্থকতাও মহাসঙ্গমেই। সুপ্রবুদ্ধতনয়ার সার্থকতা যেমন রাহুল মাতায়।

ভিক্ষু কুমার জীব'এর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না শ্রবণা। তখন কুমার জীব ভিক্ষুণী জীবার জীবনের তিনটি পর্যায়কে উল্লেখ করলেন যা অত্যন্ত গভীর এবং ইঙ্গিত পূর্ণ ও বটে।

যো চ বুদ্ধং চ ধম্মং চ, সঙ্ঘং চ সরণং গতো।

চত্তারি অরিয়সচ্চানি, সম্মপ্পঞঞায় পখতি।।

যিনি বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের শরণাগত হন, তিনি সম্যকপ্রজ্ঞা দ্বারা চার আর্যসত্যের সাক্ষাৎকার করেন।

কুচীর প্রধান সংঘারাম ওয়েন-সু এবং ভিক্ষুনী বিহারের দ্বায়িত্বে ছিলেন বুদ্ধ স্বামী মহাস্থবির। তাঁর পরিনির্বাণের পর কুমার জীব সেই পদে আসীন হন।

আনন্দ 'স্বরূপিনী' উপন্যাসের গতিপথ এক সময় অক্ষু নদীর ন্যায় হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে।

উপন্যাসকার রাজকন্যা অক্ষুমতী ও কাশ্মীরী রূপবান যুবক বুদ্ধযশা'এর প্রেম বিরহের কাহিনী অতিসুন্দরভাবে অঙ্কন করেছেন। এক্ষেত্রে 'পূর্বরাগ' কবিতাটি অবশ্যই স্মরণযোগ্য -

সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম

কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো

আকুল করিল মোর প্রাণ।।

 

অতি পরিচিত বলিয়া মনে হয়,

পরান পিঞ্জরীর যেন সোনা পায়।

কেবা সে রূপের আখি দেখাইল,

কেবা সে অঙ্গের গন্ধ শুকাইল,

 

আকুল করিল মোর প্রাণ।

সই কেবা শুনাইল শ্যান নাম।।

 

চন্ডীদাস কহে, রাধার পিরিতে,

সতত সে রসে ভোরা।

নারায়ণ সান্যাল বুদ্ধযশা এবং রাজকন্যা অক্ষুমতীর নিবিড় নৈকট্য প্রদানের নিমিত্তে প্রকৃতির বিরূপতার সহায়তা গ্রহণ করেছেন। প্রবল ভূ-আন্দোলনের প্রভাবে সমগ্র ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে, সহযোগী অশ্বসমূহের কোন চিহ্ন মাত্র নেই। তমসাচ্ছন্ন রাতে সন্ন্যাসীর একটি পার্বত্য গুম্ফা জেগে আছে। সেখানেই রাত্রি যাপনের সংকল্প করলেন অঙ্কুমতী ও বুদ্ধযশা। রাত্রির অন্ধকারে উদাসী নক্ষত্রের চিত্র.....।

ঘণীভূত হল রাত্রি। বাহিরে নীরন্দ্র অন্ধক্র। শুধু নির্মেঘ এ কোন নির্জন বাসর সজ্জা। ... লক্ষ লক্ষ দিব্যঙ্গনা। সব্বাই। উপন্যাসিক বিষয়টি অতি মনোজ্ঞভাবে উপস্থাপনের পথে এগিয়েছেন আকাশে অতন্দ্র প্রহরায় লক্ষ লক্ষ তারকা। যেন এ কোন পার্বত্য গুম্ফা নয় কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে প্রতীক্ষারত। স্বাতী, শ্রবণা, চিত্রা, রেবতী, অরুন্ধতী

কিন্তু মার উভয়কেই পরাভূত করতে অক্ষম। বুদ্ধশাসন বিজয়ী হল। রাজকন্যা অক্ষুমতী এবং বুদ্ধযশা বুদ্ধশাসনে প্রব্রজিত হলেন।

সময়কাল ৩৮২ খ্রীষ্টাব্দ।

ভারতে তখন গুপ্ত যুগ, শাসন কর্তা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। এই সময় কুমার জীব বৌদ্ধ দর্শন জগতের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র তখন তিনি বুদ্ধপ্রায়।

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।

তারি রথ নিত্যই উধাও

জাগাইতেছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,

চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।

ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল

জড়ায়ে ধরিশ মোরে ফেলি তার জাল-

তুলে নিল দ্রুতরথে

দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে

তোমা হতে বহুদূরে।

মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে

পার হয়ে আসিলাম

আজি নবপ্রভাতের শিখর চূড়ায়।

রথের চঞ্চল বেগ হওয়ায় উড়ায়।

আমার পুরানো নাম। (শেষের কবিতা)

পরথ থেরবাদী বৌদ্ধ সম্রাট ফু-কিয়েন মহাযান মতের ব্যাখ্যা শ্রবণের অভিপ্রায়ে মহাভিক্ষু কুমার জীবকে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্দেশ্যে কুচী রাজ দরবারে দূত প্রেরণ করলে কুচী রাজা সেই প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। কারণ বৃদ্ধ কুমার জীবের পক্ষে ভয়াবহ গোবি মরুভূমি অতিক্রম করা সম্ভবন ছিল না। চীনা সম্রাট ফু-কিয়েন তখন তাঁর বিপুল সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে রওনা করলেন। কুচীরাজ পো-সাঙ ও পরাক্রান্ত চীনা সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। অনিবার্য ক্ষয়ক্ষতি এবং রক্তপাত এড়াতে কুমারজীব তাঁর বেশ কিছু পুঁথি সহ কুচী ত্যাগ করলেন।

যথা বুদুলকং পসসে, যথা পসসে থরীচিকং।

এবং লোকং অবেকখন্তং, মজুরাজা ন পসসতি ।।১৭০।।

যদি সাধক এই সংসারকে জল বুদবুদের ন্যায় বিনাশী এবং মৃগমরীচিকা তুল্য ভ্রমাত্মক মনে করেন তাহলে এই রূপ পরম সাধকের প্রতি মৃত্যু দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারেন না।

কুমার জীব এই ঘটনার ১০ বৎসর পূর্বে অক্ষুমতী'তে ধম্মপদের এই গাথা শুনিয়েছিলেন।

কুমার জীব একসময় চীনের অবৌদ্ধ হন সেনাপতি হো-লুসুন নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে চীনে নিয়ে যেতে অনুরোধ করলেন এবং বন্দি ভিক্ষুদের মুক্ত করতে বললেন। তখন সেনাপতির নির্দেশে কুমার জীব'এর প্রতি অমানবিক লাঞ্ছনা। তিনি পার্বত্য উপত্যকা দেখলেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমি এক ভয়াবহ বুচ্যুৎসবে নিশ্চিহ্ন।

এই স্থানে ঔপন্যাসিক বলেছেন, কুয়াশাচ্ছন্ন কুমার জীবের সংগৃহীত ইতিহাসে বর্বর হুন সেনাপতির হাতে তাঁর দৈহিক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ নেই। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে......

এক্ষেত্রে তিনি বলেছেন -

....আপনারা অনুমতি করলে 'নানা কারণে' কীভাবে তিনি 'চীনা সেনাপতির বিশ্বাসভাজন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন' তার কল্পিত চিত্র আঁকতে পারি।

উপন্যাসে একসময় উপস্থিত হন ভারতে প্রথম পরিব্রাজক ফা-হিয়েন। ঔপান্যাসিক নারায়ণ সান্যালের মতে, ফা-হিয়েন সদ্ধার্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে ভারতকে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের দৃষ্টিকোণ অনুসারে দেখেছিলেন।

প্রখ্যাত মার্কসবাদী কথাসাহিত্যিক সত্যেন সেন 'কুমারজীব' নামক একটি উপন্যাস (১৯৬৯ খ্রীঃ) লিখেছিলেন। চীন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ এইরূপ ভারতবর্ষ বৌদ্ধধর্মের জন্মভূমি। বিরাট দেশ, বিপুল তার জনসম্পদ। এই বিরাট শক্তির আধার বলেই ভারতবর্ষ তাঁর ধর্মকে তাঁর চতুর্দিকের দেশগুলিতে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।... এই ধর্ম তাঁর বিশুদ্ধ রূপ নিয়ে যদি চীনের মধ্যে সু-প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তবে এখান থেকে ও হাজার হাজার প্রচারক নিকট ও দূরের দেশগুলির মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারবে। সেই সুদিনের কথা মনে করে দেখ এবার, সেদিন ভারতবর্ষ আর চীন এই দুই সূর্যের আলোয় সমস্ত পৃথিবী উদ্ভাষিত হয়ে উঠবে।

মহা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন (৪১৩ খ্রীঃ) তখন কুমারজীব'এর বয়সকাল ৯১। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে কুমারজীব পরিব্রাজকের প্রত্যাবর্তনের বছরের পরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। কবির ভাষায় শতাব্দীর সূর্য হল অস্তমিত, কালের অমোঘ নিয়মে....।

আনন্দ স্বরূপিনী কি ভগবান বুদ্ধের প্রিয় শিষ্য ভিক্ষু আনন্দের প্রতিরূপ?

না কি কুমার জীব'এর প্রিয় শিষ্যা ভিক্ষুনী অক্ষুমতী'র জীবনালেখ্য? এর উত্তর অনুসন্ধানের দ্বায়িত্ব ঔপন্যাসিক পাঠকের হাতেই তুলে দিয়েছেন।

অজন্তা-অপরূপা

বৌদ্ধ-স্থাপত্য ইতিহাস অনুসন্ধানের এক কালজয়ী সাহিত্য চিন্তা। অজন্তার উপাখ্যান সম্পর্কে নারায়ণ সান্যাল বলেছেন-

অজন্তা দেখে এসে 'অপরূপা অজন্তা' রচনা করতে আমার তিন বছর সময় লেগেছিল। যে গ্রন্থের ভূমিকায় আমি কৈফিয়তে বলেছিলাম, দেবদূতরা ও সেখানে সন্তপর্ণ পদ সঞ্চারে সঙ্কুচিত, সেখানে কেন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছি, তার কৈফিয়াৎ দিতে বসে প্রথমে সেই দেবদূতদেরই কৈফিয়াৎ দাবি করার ইছে জাগছে। পৃথিবী যদি আজ ভারতকে জিজ্ঞাসা করে, তোমার ওখানে কোন স্থাপত্য কীর্তি দেখতে যান?

তাহলে জবাব আসবে অজন্তা-ইলোরা....। পৃথিবী তাই দেখতে আজও ভারতে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, সেই অজন্তাকে দেখবার, বোঝাবার কোনো আয়োজন আমরা করিনি। অজন্তায় প্রতি বছর লক্ষাধিক দর্শক আসেন, অজন্তার নামে সরকার লক্ষাধিক মুদ্রা প্রতি বছর ব্যয় করেন, তবু অজন্তা বিষয়ে প্রকৃত গাইড বই আজও ছাপা হয় নি।

- ভুল তথ্যে ভরা কিছু নিম্নমানের পুস্তিকামাত্র অজন্তার কাছে পিঠে পাওয়া যায়। ইউনেস্কোর এ্যালবাথে কিছু ভালো ছবি আছে, কিন্তু তাদের কোনো পরিচয় নেই।

জাতক কাহিনীগুলির সাথে ঐ চিত্রগুলির কি সম্বন্ম, কোথায় তাদের অবস্থিতি, তা উপলব্ধি করা যায় না।

প্রথমদিকে বইটির নাম 'অপরূপা-অজন্তা' হলেও পরবর্তীতে নাম পরিবর্তিত হয়ে 'অজন্তা-অপরূপা' হয়। বইটির ইংরাজী অনুবাদটির নাম 'ইমমর্টাল অজন্তা'। 'অজন্তা-অপরূপা'র সর্বমোট পরিচ্ছেদ সংখ্যা-১১, অজন্তা সম্পর্কিত নারায়ণ সান্যালের নিজের অংকন ১২৪টি। প্রথম পরিচ্ছেদ'এ রয়েছে অজন্তার পরিচয়।

দ্বিতীয় হতে সপ্তম পরিচ্ছেদ'এ অজন্তার বিভিন্ন গুহা বৌদ্ধ বিহার সম্পর্কিত বর্ণনা প্রদত্ত হয়েছে। অষ্টম পরিচ্ছেদ'এ রয়েছে অজন্তার স্থাপত্যের ক্রমবিবর্তন, চিত্র বিশ্লেষণের বিবরণ রয়েছে নবম পরিচ্ছেদ'এ।

দশম পরিচ্ছেদ'এর বিষয়বস্তু প্রাচ্য স্থাপত্য শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে অজন্তা অন্তিম অর্থাৎ একাদশ পরিচ্ছেদ 'অন্তিম প্রনাম'।

আমার এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় অজন্তা আলেখ্য বিনির্মান।

বুদ্ধকালীন ভারতীয় ভূগোল হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাব এবং তাঁর প্রবর্তিত ‘ধম্ম’ তৎকালীন ষোড়শ মহাজন পদ এর শ্রেণী চরিত্র তথা আর্য সামাজিক পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণ অর্থে পরিবর্তন করেছিল। ফলে এক সময় বৌদ্ধ ধর্ম রাজানুগ্রহ লাভ হতে বিঞ্চিত হয় নি। বৌদ্ধ ধর্মের জনপ্রিয়তা ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পকে চরম সীমায় উন্নীত করেছিল। অপর অর্থে এই স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষতাকে বৌদ্ধ স্থাপত্যকলার যুগ ও বলতে পারি।

মহামতী অশোকের সময়কালে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণের সেইরূপ কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। এর মূল কারণ ছিল থেরবাদী পরম্পরা অর্থাৎ মূলবুদ্ধ বচনের সিদ্ধান্ত। এই সময় ভারতীয় স্থাপত্যে বিমূর্ত ভাবধারা ফুটে ওঠে। যেমন বোধিবৃক্ষ, স্তুপ, চৈত্য ইত্যাদি। মহাযান মতবাদ প্রচারিত হওয়ার ফলে ভারতীয় স্থাপত্যের চরিত্র ও ক্রমশ পরিবর্তিত হতে থাকে গান্ধার শিল্পকলা হতে বাংলার পাশ যুগ এর উজ্জ্বল উদ্ধার। তক্ষশিলা, নালন্দা, বিক্রমশিলা, জগদ্দল, সোমপুর এবং পাহাড়পুরে গড়ে ওঠে বিহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়। মগধ শিল্পকলার যুগে সাঁচী, লেনী এবং মহারাষ্ট্র অঞ্চলে নির্মিত হতে থাকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপাসনা কক্ষ, বুদ্ধ মূর্তির জীবন্ত স্থাপত্য। অজন্তা’এর মধ্যে এক বিস্ময়কর স্থাপত্যকলা। যা এক কথায় কল্পলোকের স্বর্গরাজ্য। গুহার মধ্যে নির্মিত হয়েছে স্তুপ, চৈত্য, বিহার। সঙ্গে রয়েছে মনোমুগ্ধকর বৌদ্ধ চিত্রকলা। এই চিত্রকলা এবং স্থাপত্য সমূহ ভগবান বুদ্ধের জীবন সম্পর্কিত ঘটনাবলীকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

হঠাৎ বৃষ্টির দিনে ঘুরে দেখি অজন্তা আকাশ

এমন সৌন্দর্য আমি কখন ও দেখিনি

এমন সহজভাবে বৃষ্টির ঝাপটাখোলা হাসি

আর কারও ঘর ভ’রে ছড়ায়?

ঘর নয় আকাশ?

এ সেই আকাশ, যাকে কখনও দেখিনি আগে - অপরূপা অজন্তা, জয় গোস্বামী।

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের পশ্চিম দিকে অবস্থান করছে ইন্দ্রাদি পর্বত শৃঙ্খলা। পর্বতের অনেক নীচে সর্পিল গতিতে এগিয়ে চলেছে বাঘোরা নদী। তাকে বেষ্টন করে পাহাড়ের নির্জন কোলে বিদ্যমান ৩০টি কৃত্তিমভাবে নির্মিত বৌদ্ধ গুহা। যা এক সময় ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ এই অমোঘ বাণীর আলোক ছড়িয়ে দিত নিখিল বিশ্বে। এই বৌদ্ধ গুহার মধ্যে রয়েছে ৪টি গুহা চৈত্য (নং-৯, ১০, ১৯ এবং ২৬) অর্থাৎ উপাসনাকক্ষ

সুবিশাল গৃহ (আকৃতি লম্বা ক্যাপসুলের ন্যায়), গৃহের অন্তিম প্রান্তে একটি নিমগ্ন স্তুপ এবং অবলোকিতেশ্বর স্বয়ং বিরাজমান। অবশিষ্ট গুলি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শ্রমণদের কক্ষ সর্বমোট ২৬টি।

অপরূপা অজন্তার সূত্রধর নারায়ণ সান্যাল স্বয়ং।

কারণ তিনি যেভাবে বৌদ্ধ শিল্পকলার ইতিহাসকে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন তা এককতায় অনবদ্য।

৪টি চৈত্য এবং ২৬টি বিহার এতেই পরিপূর্ণই অজন্তার ইতিহাস। যা নারায়ণ সান্যালের কলমের ছোঁয়ার হয়ে উঠেছে জীবন্ত। বর্ণনা প্রদান প্রসঙ্গে উঠে এসেছে থেরবাদ এবং মহাযান যুগের বৌদ্ধ বিহারের মধ্যেকার পার্থক্য। নারায়ণ সান্যাল উপস্থাপন করেছেন তপন অর্থাৎ সূর্য গবাক্ষের কথা, বিম-বরগা, স্তম্ভ এবং অলংকরণের বিবর্তন, স্থাপত্য অনুযায়ী যুগ বিভাগ।

দীপবংস’র পরম্পরা অনুসারে বৈশালীর বজ্জিপুত্তক ভিক্ষুগণ দ্বিতীয় সঙ্গীতির সংঘ নির্ণয়কে অস্বীকার করেন এবং স্থবির অর্হত ব্যতীত অন্য একটি সভা দ্বারা নিজেদের অনুকূল স্বতন্ত্র মত প্রতিষ্ঠা করেন। উত্তরকালে এই ভিক্ষুগণ ‘মহাসাংখিক’ নামে পরিচিত হন। বৌদ্ধকলার প্রাচীন বিষয় হল বিহার এবং স্তুপ। বিনয়’তে পঞ্চবিধ ‘লয়ন’ অথবা শয়নাসনের উল্লেখ পাওয়া যায়। যাকে বিহার, অর্ধযোগ, প্রাসাদ, হ্য এবং গুহা বলা হয়েছে। (চুল্লবগ্ন, পৃঃ ২৩৬)। বস্তুতঃ বিহার হল ভিক্ষুদের সংবাস, প্রাকৃতিক গুহাবাসের প্রয়োজন একান্তচর্যা ছিল। কৃত্তিম গুহাত্মক বিহার কালান্তরে আবাসিকতা তথাএকান্তচর্যার সমাধানকে সম্পূর্ণ করে ছিল। এই প্রক্রিয়াতে ক্রমশঃ প্রস্তর-কলার বিকাশের বিষয়টি ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। স্তূপ মহাপরিনিবৃত তথাগতের প্রতীক, অতএব স্তূপ অথবা চৈত্যের উপাসনা প্রচলিত হওয়ার পর কালান্তরে চৈত্যগৃহ নির্মাণ শুরু হয়। বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে থেরবাদী মতাদর্শের অনুসারী সম্রাট অশোক ৮৪ হাজার স্তূপ এবং বহুসংখ্যক বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেছিলেন। চীনা পরিব্রাজকগণ ভারতের নানা স্থানে স্তূপ এবং বিহার পর্যবেক্ষণ পূর্বক সেগুলি অশোক দ্বারা নির্মিত বলেছেন।

সুয়াঙ জ্যঙ (হিউয়েন সাঙ) এর বর্ণনায় অজন্তার ভিত্তি চিত্র এবং গুহাবাসের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর মতে অপরান্তক অঞ্চলের অর্হত ভিক্ষু 'অচল'এর তত্ত্বাবধানে এই গুহা নির্মিত হয়েছিল। গুহার দেওয়ালে চিত্রিত বোধিসত্ত্বের লীলা চৈত্যে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধের প্রতি প্রত্যক্ষ সংকেত করে।

মহাসাৎথিকরা কালক্রমে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। মহাযান পরম্পরা মূলঅর্থে ভক্তিমার্গী মহাসাংথিক সম্প্রদায়'এর বিবর্তিত রূপ। এই সম্প্রদায় বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বকে দেবোপম লোকোত্তর রূপে চিত্রিত করেছিল এবং গান্ধার তথা মথুরাতে গ্রীক ও ভারতীয় কলার সম্পর্ক তথা ভক্তির আগ্রহ দ্বারা বুদ্ধ প্রতিমার আবির্ভাব ঘটেছিল। অজন্তার স্থাপত্য এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে।

নারায়ণ সান্যাল বিরচিত 'অপরূপা-অজন্তা'র প্রাণ ভোমরা লুকায়িত আছে দ্বিতীয় হতে নবম পরিচ্ছেদে, স্তাপত্য ভাস্কর্য এবং চিক্রকলার মৌলিক পরিচয়ে। অজন্তার স্থাপত্য মূল অর্থে যে বৌদ্ধ বিদ্যার পরিনাম এবং একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা, তা হয়তো অনেক মানুষই অবগত নন। তাই এই বৌদ্ধ গুহাগুলি নিছক ক্ষেত্র হিসেবেই রয়ে গেছে, ফলে বৌদ্ধ স্থাপত্যের বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়নি।

অজন্তা অপরূপা'র অন্তিম পর্যায়টি সম্পূর্ণ অর্থে ভিন্ন চিত্র বহন করে। নারায়ণ সান্যালের মতে বিষয়টি 'পূর্বদিকে মুখ করে স্থাপনা।' অজন্তা'র অনুভূমিক চিত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে উপলব্ধি করা যাবে যে তা মূল অর্থে অল্প ক্ষুরাকৃতি আকৃতির। অর্থাৎ প্রতিটি গুহা, চৈত্য বা বিহার, তার প্রতি সম অক্ষ বরাবর রেখাগুলি আসলে অভিসারী। ফলে বিহার বা চৈত্য গুলি একেবারে নিখুঁত অঙ্ক কষে নির্মিত হয়েছে। কোন ভুল সেই অর্থে খুঁজে পাওয়া দুস্কর।

অজন্তার সপ্তদশ গুহার নির্মাণকাল হিসেবে ধরা হয় ৪৭০ থেকে ৪৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কে। এই দুটি তথ্য এবং আরো কিছু সূত্র মাথায় রেখে নারায়ণ সান্যাল বলেছিলেন-

এই সময়কালের প্রায় সত্তর-আশি বছর পূর্বে গুপ্তসম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য স্বীয় কন্যা প্রভাবতী গুপ্তার সঙ্গে বাকাতক নৃপতি রুদ্রসেনের বিবাহ দিয়েছিলেন। অজন্তার ওই যুগের শিল্পীরা বাকাতকি রাজাদের অনুগ্রহভাজন ছিলেন এ-কথা মনে করা স্বাভাবিক, আর প্রভাবতী দেবীর সঙ্গে গুপ্ত সম্রাটের রাজসভার কয়েকজন বিশিষ্ট সভাসদ যে বাকাতক রাজসভায় এসেছিলেন তারও ঐতিহাসিক নজির আছে। সুতরাং যদি বলি, যে শিল্পী ওই দৃশ্যটি এঁকেছিলেন তিনি মহাকবি কালিদাসের স্বমুখেই এই শ্লোকটি শুনেছেন, তাহলে অন্তত 'অ্যানাক্রনিজম' দোষে সে উক্তিটি দুষ্ট হবে না।

নারায়ণ সান্যাল এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন সপ্তদশ গুহায় আঁকা দেবরাজ শক্রের সঙ্গী-সাথী অনুচরবৃন্দ নিয়ে আকাশপথে মর্তে আসার দৃশ্যটির কথা (চিত্র ৬৬)। তবে সেটি শুধু নয়, অজন্তার অনেক ছবিতেই চরিত্রদের ভাবে-ভঙ্গিমায়-চেহারায়-অবস্থায় কালিদাস ও তৎকালীন কবিদের সাহিত্যের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। যায়।

নারায়ণ সান্যাল একজন দক্ষ বাস্তকার ছিলেন। তিনি নানাভাবে অজন্তার স্থাপনাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং খুঁজে পেয়েছিলেন সেই গাণিতিক তত্ত্ব, যার মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল 'অজন্তা-অপরূপা'। যা আজও বিস্ময় কর।

অজন্তা যেন সেই রূপকথার রাজকুমারী।

সহস্র বছরের নিদ্রা ভেঙে সভ্য জগতের দিকে

চোখ মেলে তাকালো....।

নারায়ণ সান্যাল কখনই একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যের ঘরনায় আবদ্ধ থাকেন বা আবদ্ধ থাকার চেষ্টা ও করেন নি। 'এক' দুই তিন' মূল অর্থে রাজনৈতিক ইতিহাস। স্পষ্ট অর্থে বলা যায় যে এই বইটি মূল অর্থে একটি রাজনৈতিক ম্যানিফেষ্টো। যার উৎস্থল ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত একটি উপন্যাস 'র‍্যানিম্যাল ফার্ম' বা পশু খামার। লেখক 'জর্জ অরওয়েল'।

'এখন বলা হচ্ছে, কমরেড গণ।'

আমাদের জীবনের ধরণটা কি রকম? সোজাসুজি বলতে গেলে আমাদের আয়ু অল্প, প্রচন্ড খাটুনী, দুর্দশার অন্ত নেই। আমরা জন্মালাম? তারপর আমাদের জন্য যে খাদ্য বরাদ্দ হয় তাতে কোনরকমে ধড়ের সঙ্গে প্রাণটুকু ধুক ধুক করে টিকে থাকতে পারে। সেই আহার্যের জোরে যারা বেঁচে থাকে তাদের জোর খাটিয়ে নেওয়া হয়। আর যে মুহুর্তে আমরা অকেজো হয়ে পড়ি সেই মুহুর্তে নিষ্ঠুরভাবে আমাদের হত্যা করা হয়। কী ভয়ঙ্কর কথা?.... পশুর জীবন মানেই দাসত্ব আর দুর্দশা এই হচ্ছে খাঁটি কথা।'

'য়‍্যানিম্যাল ফার্ম' অবলম্বনে 'পশুখামার' নামক নাটক। রচনাকার 'অর্পিতা ঘোষ'। কিন্তু সে তো মূল কাহিনীর অনুবাদ। নারায়ণ সান্যাল কিন্তু এপথে হাঁটেন। এক্ষেত্রে তাঁর অভিমতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-

যে ইতিহাস আমাদের শেখানো হয়েছে তার বাহিরে স্বাধীনতা উত্তর ভারতের প্রকৃতি ইতিহাসটা কী?..... আমরা পরাধীন। স্বাধীন দেশের পতাকা আছে, জাতীয় সঙ্গীত আছে, সংবিধান আছে তবু দেশের নিরন্ন মানুষ কেন এমন চরম অবমাননাকর জীবনযাপনে বাধ্য?....

এরপর লেখক তার কিছুই বলেন নি। কারণ আমাদের ব্যর্থতার ইতিহাস।

সমাজের ছাপ পড়ে শিল্প-সাহিত্যে।

না।

জলে যেমন ছায়া পড়ে, ঠিক তেমনি?

শিল্প-সাহিত্য সমাজের অকর্মণ্য ছায়া নয়।

ভষ্মলোচনের গল্প জানো?

ভষ্মলোচন যা কিছু দেখতো, তাই পুড়ে যেতো। যেদিন সে

ছায়ার মধ্যে নিজেকে দেখলো, সেদিন নিজেই সে পুড়ে গেলো। - সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

'এক' 'দুই...তিন... যেন ছায়া মানুষ। নিজেকে নিজের মধ্যে খুঁজছে বারং বার। এই নাটক বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অনুসন্ধান।

 

অজন্তার গুহা চিত্র একটি আলোকিত অধ্যায়

এই গুহা চিত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় জাতক। ইশানচন্দ্র ঘোষ'এর মতানুসারে 'মহাবস্তু' নামক গ্রন্থে ৮০টি জাতক কথা পাওয়া যায়। থেরবাদী (সিংহল, শ্যাম, মায়ানমার, ইন্দোচীন ইত্যাদি দেশের বৌদ্ধ) পরম্পরা অনুসারে জাতক সংখ্যা ৫৫০।

মূল জাতকে ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্ম সম্পর্কিত গাথা বিদ্যমান আছে। 'জাতকটঠ কথা'তে সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবন গাথা তো আছে, এর সাথে তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধের (বুদ্ধ বংস) জীবন গাথা ও রয়েছে।

মানবকে জাতক কথা'তে দয়নীয় প্রাণী মনে করা হয়েছে। সে যদি পাপী হয়, তাহলে সে তার পূর্বজন্মের অবিদ্যাজনিত সংস্কারের কারণে। এই অবিদ্যাজনিত সংস্কার জন্ম-জন্মান্তর মানব-জীবনের পশ্চাৎ'এ ধাবিত হয় এবং অনন্ত জন্ম পর্যন্ত চলতে থাকে। এর থেকে মুক্তিলাভ করা অত্যন্ত কঠিন, যতক্ষণ আমরা সচেতন না হব। আমরা কিভাবে সচেতন হব তা ভগবান বুদ্ধ ব্যক্ত করেছেন। জাতক'এর মূল চরিত্র দেবতা (?), যক্ষ, নাগ, প্রেত (?) ইত্যাদি'র অতিরিক্ত প্রায় সকল প্রাণী এই পৃথিবীর সাধারণ জীব। সাধারণতঃ জাতকের সকল জীব এক সূত্রে আবদ্ধ। 'মৈত্রী ধর্ম'র তাৎপর্য শুধু মানবের সঙ্গে মানবের নয়, সকল পশু পক্ষীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযুক্ত হয়েছে। এটাই ভগবান বুদ্ধের মূল শিক্ষা বা সিদ্ধান্ত।

যদিও জাতক' কথা এখানে আলোচনার বিষয় নয়। যেহেতু জাতকের সঙ্গে অজন্তা এবং বাঘ গুহার সম্পর্ক রয়েছে তাই প্রসঙ্গ ক্রমে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।

সমস্ত গুহা বিহারের দেওয়াল ও ছাদে (গুহার সিলিং'এ) অনবদ্যভাবে চিত্রায়িত হয়েছে অনবদ্য সব চিত্র জাতক কথা। নবম অধ্যায়ে (অজন্তা অপরূপা) নারায়ণ সান্যাল বিশ্লেষণ করেছেন অজন্তা চিত্রকে। সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি একেবারে সূক্ষ্ম স্থাপত্য সমালোচক এবং অনুরাগী রূপে অজন্তার গুহাচিত্র গুলিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আলোচনা প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ে গেল

শিল্পের জন্য শিল্প, না কি মানুষের জন্য....। জাতক' কথার আঙ্গিকে যদি বলতে হয় তাহলে বলব মানুষের জন্য, পৃথিবীর সকল প্রাণীর জন্য। অজন্তা'র চিত্রকলা মধ্যভারতীয় উৎকীর্ণ চিত্র পরম্পরার একটি বিকশিত এবং পরিস্কৃত রূপ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। এখানে ভগবান বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বের চরিত্র অঙ্কিত আছে তথা নিরূপণ বিধি সদৃশ্য কারণ সমান আলেখ্য প্রবেশে অনেক ঘটনার চিত্র তথা সামনে পেছনে'র বস্তুকে অযথার্থ রূপে নীচে উপরে প্রদর্শিত করা হয়েছে। ভিত্তি'তে 'চিত্রের' বিভাজন প্রায় বিচিত্র ব্যক্তির কেন্দ্রের প্রতি অভিমুখ দ্বারা সুচিত হয়। পশু বৃক্ষের চিত্রে প্রকৃতির প্রেম তথা জনসংকুল এবং উল্লেসিত জীবনের অভিব্যক্তি সাঁচীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অজন্তা'র গুহাচিত্রে নগরের বিভিন্ন দৃশ্য এক আধ্যাত্মিক আশায় দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র এবং স্তরে বোধিসত্ত্বের আদর্শ অনুসরণ সম্ভব এবং এর দ্বারা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির অভিষ্ট হতে পারে। গুহার দেওয়ালে চিত্রিত বোধিসত্ত্বের লীলা চৈত্যান্তে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধের প্রতি প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত করে।

চিত্রাঙ্কনের পূর্বে গুহার শিলাময়ী স্থানে গোময়, শিলাচূর্ণ, তুষ ইত্যাদির মিশ্রণ অত্যন্ত মসৃণভাবে লেপন করা হোত। এর উপর চুণের লেপ তথা আলেখনের পূর্বে জল দ্বারা সিক্ত করা হোত। গৈরিক বর্ণ দ্বারা রূপরেখা টেনে কালোরঙ দ্বারা তাকে আবশ্যক অনুসারে সংশোধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। উন্মীলনে উপযুক্ত রঙ যা'ই হোক না কেন সেখানে লাল এবং নীল রঙ মুখ্য ছিল। বলা হয়েছে "রেখাং প্রমংসন্ত্যাচার্যা"। অর্থাৎ আচার্যগণ রেখার সহায়তার চিত্র অঙ্কন করতেন। ওহাভিত্তিক বিপূল ভূমিতে যে নির্বাধ, নিশশঙ্ক এং নির্দোষ রূপে রেখা অঙ্কন করা হয়েছে এবং তার সহায়তায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবের ব্যঞ্জনা প্রদর্শিত হেেছ, তার সমুচিত বর্ণনা এবং প্রশংসা করা এককথায় অসম্ভব। "পতিত হয়েছে অননয়ন, নয় বিনু বাণী"। যদিও িেশয়ার চিত্র কলাতে সর্বত্র রেখাঙ্কনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অজন্তা রেখাঙ্কনে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কবির ভাষায় অজন্তার চিত্র এক অর্থে স্বতন্ত্র একটি মহাকাব্য যা রামায়ণ মহাভারতের বিপুল জনপ্রিয়তাকেও হার মানায়।

বৌদ্ধ চিত্রকলার ক্ষেত্রে অজন্তা ছিল একটি শাশ্বত প্রেরণা। মধ্য এশিয়াতে দন্দান, উলিক, কিজিল, মিরান এবং তুন ত্বংগ পর্যন্ত রে প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই নয় জাপানের বৌদ্ধ বিহারে বিনষ্ট ভিত্তি চিত্রে অজন্তার পরম্পরা উদ্ভাসিত হয়েছে। নারায়ণ সান্যালের মতে, চিত্র কাহিনীগুলি অধিকাংশই জাতকের গল্প। গৌতম বুদ্ধ পূর্ব পূর্ব জন্মে যে সব লীলা করেছেন, সেই জাতিস্মর মহাপুরুষ-কথিত সেই সব কাহিনীই জাতকের গল্প নামে পরিচিত।

সর্ব সমেত পাঁচশ'র উপর জাতকের গল্প আছে। এক এক রূপ নিয়ে বুদ্ধদেব ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন-

তাঁরা পূর্ণ বুদ্ধ নন, তাঁরা বোধিসত্ত্ব। বুদ্ধত্ব লাভের পথে বিভিন্ন জন্মচক্রের মধ্য দিয়ে তাঁরা চলেছেন এ মর্ত্যভূমে নানান লীলা করে, মহাপরিনির্বাণের পথে।

নারায়ণ সান্যাল তাঁর আলোচনা প্রসঙ্গে গ্রিফিব সাহেবের কথা উল্লেখ করেছেন। গ্রিফিব সাহেব লিখেছিলেন-

নারীচিত্র অঙ্কনে অজন্তার শিল্পী বিভিন্ন ও বিচিত্র ভঙ্গির পরিকল্পনা করেছেন। অনেকগুলি নারীচিত্র বিবসনা অথবা সেগুলি এত স্বল্প বস্ত্রাবৃত যে তাদের দেহসৌষ্ঠব সম্যক উপলব্ধি করা যায়। এমন কি পশ্চাৎ থেকে ও সম্পূর্ণ নারী দেহকে আঁকা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। এ চিত্র গুলি অধিকাংশই নষ্ট হয়ে এসেছে।

অজন্তার শিল্পী মহাজনক জাতক'এর কাহিনীর সারবস্তুকে অবলম্বন করে অপরূপ একটি চিত্র কাহিনী (১/২ক-১/ঙ) দেওয়ালে অঙ্কন করেছেন, তা নারায়ণ সান্যালের মনে হয়েছে একটি পঞ্চাঙ্ক নাটক।

.....তুমি কলমের জাদুকর অতি অল্প কথায় লাবন্য যোজনার মর্মকথা ভারি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-

রূপকে যেমন পরিমিতি দেয় প্রমাণ, যথোপযুক্ত এবং যথাযথ মনোহর একটি সীমার মধ্যে আসিয়া, তেমনি লাবন্য পরিমিতি দেয় ভাবের কায়কে বা ভঙ্গীকে অদ্ভূত ও উচ্ছৃঙ্খল ভঙ্গী হইতে নিকস্ত করিয়া। ভাবের তাড়নায় ভঙ্গী ছুটিয়া চলিয়াছে উন্মত্ত অশ্বের মতো অসংযত উদ্দাম অসহিষ্ণু এমনকি অশোভন রূপে প্রমাণের সীমা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া, লাবন্য আসিয়া তাহাকে শান্ত করিতেছে....। এ অজন্তা-শিল্পীর কোন প্রয়োগ, কৌশলের কৃতিত্ব নয় এ নারায়ণ সান্যাল বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন বারংবার। তাঁর মতে ওঁদের ধ্যানের ধন, সহজাত জ্ঞানচক্ষুর দৃষ্টি!

দ্যাখো -

পৃথিবীর সবকটি হাত

রস নিতে

আলোর পাখনা মেলেছে চতুর্দিক!

সাহিত্য প্রজ্ঞা এবং নারায়ণ সান্যাল

নারায়ণ সান্যাল এক অর্থে কাল-সমান্তর। তাই শুধুমাত্র নাগরিক ক্লান্তির জীবনমনস্কতাই নয়, তাঁর সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল ইতিহাস অনুসন্ধান এবং সমকাল-সচেতনতা। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্যে অভিযোজিত হয়ে উঠে এসেছে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ইতিহাস চেতনার সূত্র। বলতে গেলে, প্রগতিশীল সচেতনতা স্পষ্টভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে এবং এর মূলে রয়েছে তাঁর ব্যক্তি জীবনের সচেতন মূল্যবোধ।

নারায়ণ সান্যাল ছিলেন একজন প্রাণবন্ত মানুষ। এমন কোন বিষয় ছিল যাতে তাঁর আগ্রহের অভাব দেখেছি। অনেক সময় আমার সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আলোচনা করতেন। এক কথায়, আলোচনার বিষয়ের অন্ত ছিল না। জীবনের নানা বিচিত্র দিকে নারায়ণ বাবু আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁর সান্নিধ্য লাভ আমার জীবনে অমূল্য সম্পদ রূপে পরিগণিত হয়েছে। আমি নানা কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। 'নালন্দা' পত্রিকার লেখা সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। (২০০৩, ২০০৪ এবং ২০০৫) তিনি কোন 'ইজম্'কে আঁকড়ে ধরেন নি। এর মূল কারণ ছিল তাঁর সাহিত্য চেতনার প্রতি অতি সক্রিয়তা। আমার মনে হয় তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন-

মাথার উপরে আসন্ন পৃথিবীর

অন্ধকার বিরহিত সূর্য-সংস্কৃত আকাশ, - একটি বুদ্ধিজীবী, গ্রহণ।

আমার কেন জানি না বারংবার মনে হয়েছে তিনি একজন 'লোকায়ত-রাখাল'। অজন্তায় তিনি অনুসন্ধান করেছেন লোকায়ত জীবনের ছবি। বস্তুত, পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার অন্তর্নিহিত বিরোধগুলির দ্বান্দ্বিক প্রতিফলনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে সমাজ জীবন, সমকালীন রাজনীতি এবং মধ্যবিত্তের শ্রেণী চরিত্রের স্বরূপ তিনি অঙ্কন করেছিলেন তাঁর গদ্য সাহিত্যে। অপরদিকে তাঁর বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে 'আনন্দ স্বরূপিনী'র ইতিহাস রচনার অনুসন্ধানে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, সাহিত্য রচনার প্রথম পর্ব থেকেই নারায়ণ সান্যাল দ্বায়বদ্ধ সাহিত্যিকের অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং এখানেই ছিল তাঁর সফলতা।

 

সহায়ক গ্রন্থসূচী:

১। নারায়ণ সান্যাল, এক অনুসন্ধিৎসু কথাকার, সম্পাদনা, এন জুলফিকার সৃষ্টি সুখ, হাওড়া, ২০২৫।

২। বকুল তলা পি.এল. ক্যাম্প, বেঙ্গল পাবলিসার্স, কোলকাতা, ১৯৭৮।

৩। আনন্দ স্বরূপিনী, অমর সাহিত্য প্রকাশন, কোলকাতা, ১৯৭৮।

৪। অজন্তা অপরূপা, ভারতী বুক স্টল, কোলকাতা, ১৯৭৬।

৫। চীন ভারত লং মার্চ, এ মুখার্জী অ্যান্ড কোং, কোলকাতা, ১৯৮৭।

। অজন্তা সুন্দরী, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, স্পাউট, কোলকাতা, ২০২৪।

তন্ত্র ভূমিকা

 ভূমিকা

সুমনপাল ভিক্ষু

তন্ত্র বলতে বিশেষ ধরণের শাস্ত্রকে বোঝায়। 'তন্ত্র' শব্দের মূলগত অর্থ হল মুক্তি বা ত্রান। যে শাস্ত্র অনুযায়ী সাধন করলে জীবের মোক্ষ বা মুক্তি লাভ হয়, সাধারণভাবে তাকেই তন্ত্র বলে। (বাংলাপিড়িয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৩২, সিরাজুল ইসলাম) তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে, সাধনার মাধ্যমে জীব উন্নতস্তরে উপনীত হতে পারে। টীকাকার কল্লুক ভট্ট শ্রুতি বা জ্ঞানকে বৈদিক এবং তান্ত্রিক এই ২ ভাগে বিভক্ত করেছেন।

কারিগরী 'বিদ্যা, পশুপালন, কৃষি, বয়নশাস্ত্র, রসায়ন চিকিৎসা তন্ত্রের আদি বিষয়বস্তু। সুতরাং তন্ত্রের বিষয়বস্তু হল প্রাচীন জ্ঞান এবং জাগতিক জ্ঞানের সমন্ময় যা সাধারণ মানুষের দ্বারা সম্ভবপর হয়েছিল, তাই স্বাভাবিক অর্থে তন্ত্রের প্রকৃতি হল লোকায়ত। পুরাণ সমূহে তন্ত্রশাস্ত্রকে অবৈদিক এবং বেদবাহ্য বলা হয়েছে তথা নানাবিধ উপাসনা পদ্ধতির উল্লেখ প্রসঙ্গে ও তান্ত্রিক উপাসনা এবং বৈদিক উপাসনা স্বতন্ত্রভাবে নির্দিষ্ট আছে। সৌন্দর্য লহরী গ্রন্থে টীকাকার লক্ষ্মীধর তন্ত্রকে অবৈদিক বলেছেন। (তন্ত্রকথা, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, পৃ. ১১) যাজ্ঞবল্ক সংহিতায় বলা হয়েছে যে, তন্ত্রদীক্ষায় দীক্ষিত ব্যক্তির পক্ষে বৈদিক শ্রাদ্ধাদি নিষিদ্ধ। (প্রাগুক্ত, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, পৃ. ১২) কুলার্ণব তন্ত্রগ্রন্থে তন্ত্রের গৌরব প্রদর্শনের নিমিত্তে তন্ত্রকে কূলবধূর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (ইয়ন্ত শান্তবী বিদ্যা গোপ্যা কূলবধুরিব। তথ্যসূত্র : তদেব) আবার কোনও কোনও পুরাণের মতে, জনসাধারণকে বিভ্রান্ত এবং প্রতারিত করার জন্য তথা বেদ বহিস্কৃত পতিত ব্যক্তিবর্গের জন্য তন্ত্রশাস্ত্র প্রণীত হয়েছিল। বিষয়গত দিক হতে তন্ত্রশাস্ত্র মূলতঃ ৩টি শ্রেণীতে বিভক্ত আগম, যামল এবং তন্ত্র।

প্রাচীন তান্ত্রিক বিশ্বাসে মানবদেহের সাধনার উপর সবার্ধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং ধ্যান ধারণায় দেহাতিরিক্ত আত্মার কোনরূপ কল্পনা একেবারেই অনুপস্থিত। এ কারণে পরবর্তীকালের ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে অন্যান্য সম্প্রদায়ের চিন্তাশীলেরা, বিশেষভাবে আত্মবাদী অধ্যাত্মবাদীরা এ লোকায়ত তান্ত্রিক দেহাত্মবাদকেই বিশেষভাবে সমালোচনা করেছিলেন। (৫. মো. গোলাম সারওয়ার, পৃ. ৮৭)

পাল শাসনকাল হতে বঙ্গদেশে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটেছিল। অষ্টম-দ্বাদশ শতাব্দী (খ্রী.) পর্যন্ত সোমপুর, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারের বৌদ্ধ আচার্যদের দ্বারা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম পুষ্টি লাভ করে এবং অনতিবিলম্বে এই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম ভারতবর্ষের গন্ডী অতিক্রম করে তিব্বতে উপস্থিত হয়েছিল।

প্রকৃত অর্থে অষ্টম শতাব্দীর সময়কালে বঙ্গদেশে মহাযান মতাদর্শের তান্ত্রিক ভাবধারা পরিস্ফুট হতে শুরু করে। এই সময় এক শ্রেণীর বৌদ্ধ আচার্যগণ মহাযানের নব্য-ধ্যান ধারণা গড়ে তুললেন, যেখানে মন্ত্র'ই হল মূল এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হল ধারণী ও বীজ। প্রকৃত অর্থে এই মতাবাদই হল মন্ত্রযান। (ড. মো. গোলাম সারওয়ার, পৃ. ৮৯)।

ড. গোবিন্দ চন্দ্র পান্ডে'র মতে, 'মহাযান এবং বজ্রযান অদ্বয়বজ্র অনুসারে তিন যান হয়, শ্রাবক যান, প্রত্যেক যন তথা মহাযান। চার স্থিতি বৈভাষিক, সৌত্রান্ত্রিক, যোগাচার এবং মাধ্যমিক। এর মধ্যে শ্রাবক এবং প্রত্যেক যানের ব্যাখ্যা বৈভাষিক স্থিতি দ্বারা হয়। মহাযান দ্বিবিধ পারমিতা নয় এবং মন্ত্র নয়। পারমিতা নয়'এর ব্যাখ্যা সৌত্রান্ত্রিক, যোগাচার এবং মাধ্যমিক স্থিতি দ্বারা হয়, মন্ত্রনয়'এর ব্যাখ্যা যোগাচার এবং মাধ্যমিক স্থিতি দ্বারা। (অদ্বয় বজ্র, ভূমিকা, পৃ. ১২) মন্ত্রনয় অত্যন্ত গম্ভীর এবং এর অধিকার শুধুমাত্র তীক্ষেনন্দ্রিয় পুরুষ দ্বারাই সম্ভব। মহাসাংঘিকের' বিদ্যাধর পিটক' অথবা 'ধারণীপিটক'এ মহাযানিক মন্ত্রনয়কে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের নিশ্চিত অবতারণা মনে করা উচিত।

তারনাথ অনুসারে ৩০০ বর্ষ পর্যন্ত তন্ত্রের পরম্পরা অত্যন্ত গুপ্ত ছিল, এরপর অর্থাৎ আচার্য ধর্মকীর্তির পরে বিশেষতঃ পালযুগে, এর শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। (তারনাথ, অণুঃ সীফনার, পৃ. ২০১) অপরদিকে গুহ্যসমাজ'এর তান্ত্রিক পরম্পরা'র উদ্ভব কদাচিটত ৩'য় শতাব্দীতে হয়েছিল তথা ৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত এর গুপ্ত প্রচার হয়েছিল। ৭ম শতাব্দীতে গুহ্যসমাজ অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।

কালচক্রযানের উদয় ১০ 'ম শতাব্দীর পূর্বে মনে করা উচিত। কালচক্রতন্ত্র এবং তার বিমলপ্রভা টীকা'এর প্রমাণ ভূত গ্রন্থ। কালচক্রকে আদি বুদ্ধ বলা হয়েছে। একথা স্মরণীয় যে আদিবুদ্ধ'র কথা কারন্ডব্যূহ'তে পাওয়া যায়। সর্বোপরি অসঙ্গ ও এর উল্লেখ করেছেন। বিমলপ্রভা'র টাকা গ্রন্থ 'সেকোদেশ' (নঙ্-নাদ বা নারো-পা রচিত)। মঞ্জুশ্রীকে এই তন্ত্রের প্রবর্তক তথা সুচন্দ্রকে বিমলপ্রভা'র রচয়িতা বলা হয়েছে। বৌদ্ধ তন্ত্রের অন্তিম সিদ্ধান্ত 'সহজযান'। সরহ অথবা লুইকে সিদ্ধ পরম্পরার প্রবর্তক বলা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে কাল অথবা ক্রম নির্ণয় করা সম্ভব নয়। (প্রবোধ চন্দ্র বাগচী, স্টাডীজ ইন দি তন্ত্রজ, পৃ. ৩-৪)।

তন্ত্রের কথা' গ্রন্থ সম্পর্কে শ্রী দীনেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য (পূর্বাভাষ) বলেছেন, "তন্ত্র শাস্ত্রের প্রায় অসংখ্যা বিষয় বস্তুর মধ্যে এ গ্রন্থে যে কয়টির সবিশেষ আলোচনা হইয়াছে তাহাদের মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে, ১. তত্ত্ব-অংশ, ২. দেবার্চন-অংশ, এবং ৩. সাধনা অংশ।

পণ্ডিতদের মতে, তন্ত্রের অনেক স্থলে সাংখ্য ও বেদান্তদর্শনের প্রতিফলন লক্ষও করা যায়, যেমন, সাংখ্যের 'পুরুষ'ই তন্ত্রের 'শিব', প্রকৃতিতন্ত্রের, 'শক্তি'।

ইতিহাস অনুসরণে আমরা দেখিতে পাই, অষ্টাদশ শতাব্দীর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও সাধক রামপ্রসাদের কাল হইতে অদ্যাবধি প্রবৃত্তি মার্গের তান্ত্রিক পূজার প্রচলন ও সমাদর বাঙালী হিন্দুর সমাজে ক্রমেই বৃদ্ধিলাভ করিতেছে, সেই অনুপাতে (বামাচার বা 'নিবৃত্তি' মার্গের) শব-সাধনা, ভৈরবী চক্র ইত্যাদি অনুষ্ঠান অনাদর ও অবজ্ঞার বিষয় লইয়া ক্রমে প্রায় বিস্মৃতির গর্ভেলীন হইয়াছে।

সাধনা অংশে স্থান পাইয়াছে কুখ্যাত তান্ত্রিক আচার বা ক্রিয়া কলাপের শাস্ত্রানুগ বর্ণনা ও গ্রন্থকারের স্বকীয় মন্তব্য। গ্রন্থকারের ভাষায় বাঙালী, 'ঘোর তান্ত্রিক', বাঙালীর যাবতীয় ক্রিয়াকর্ম, পূজা অর্চনা কিভাবে তন্ত্রনির্ভর, বিশেষতঃ তাহার চিত্তবৃত্তিও কিভাবে তান্ত্রিক সংস্কার দ্বারা প্রভাবিত, সপ্তম অধ্যায়ে তাহা গ্রন্থকার তাঁহার সাবলীল ভঙ্গীতে দেখাইয়া গ্রন্থ শেষ করিয়াছেন।"

পরিতাপের বিষয় এই যে শ্রী দীনেশচন্দ্র মহাশয় বৌদ্ধতন্ত্রের কোনরূপ উল্লেখ করেন নি। তন্ত্রের ইতিহাস তথা অনুসন্ধানের প্রশ্নে বৌদ্ধ এবং হিন্দুতন্ত্রকে সমানভাবে গুরুত্বপ্রদান করা একান্তভাবে আবশ্যক নতুবা বিষয়টি পক্ষপাতের পঙ্কে নিমজ্জিত হতে বাধ্য। যাইহোক, সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় প্রণীত 'তন্ত্রের কথা' নামক গ্রন্থটি সর্বমোট ৭টি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং প্রতিটি অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, 'স্যার জন উভরক্ষ স্বনামে এবং ছদ্মনামে (আর্থার এভানল) তন্ত্রশাস্ত্রের সবিশেষ চর্চা করেছেন। তাঁর মতে, (উভরফ) ভারতীয় সবকটি ধর্মশাস্ত্রেরই জন্ম হয়েছে বেদ থেকে, বেদেরই যুগোপযোগী নব নব ব্যাখ্যায়। কলিযুগের পক্ষে উপযোগী হয়েছে বেদের তান্ত্রিকী ব্যাখ্যায়।"

পাশ্চাত্য পণ্ডিত উইনটারনিজ বলেছেন, তন্ত্রের জন্মভূমি বাঙলা সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়েছে আসামে (কামরূপ)। তারপর বৌদ্ধতন্ত্রের হাত ধরে তা ভারতবর্ষের সীমা অতিক্রম করে উপস্থিত হয়েছে নেপাল, তিব্বত এবং চীনে। তবে সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় তন্ত্রের জন্ম এবং তার লীলাভূমি প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেশ করেছেন। যেমন

"গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা, মৈথিলে প্রবলীকৃতা।
ককচিৎ ককচিন্মহারাষ্ট্রে গুর্জরে প্রলয়ং গতা।"

অর্থাৎ, গৌড়ে তন্ত্রবিদ্যার জন্ম হয়েছে, মিথিলায় ঘটেছে তার প্লাবন, মহারাষ্ট্রে'এর প্রভাব কিছু কিছু উদ্ভাষিত হয়েছে, আর এ বিদ্যা গুজরাটে নয় পেয়েছে।

তন্ত্রশাস্ত্রের রূপ দ্বিবিধ, অর্থাৎ বৌদ্ধ এবং হিন্দু তন্ত্র। 'মহানির্বাণ' তন্ত্রের ভূমিকায় ৩ শ্রেণীর তন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধ তন্ত্র হিন্দু তন্ত্রের পূর্ববর্তী এবং এই মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, "পালিভাষায় লেখা বৌদ্ধধর্মের তত্ত্বকথার মধ্যে এমন কিছু কিছু চিহ্ন রয়েছে যা তান্ত্রিক আচার ও চিন্তাধারারই শালিল। অবশ্য 'তন্ত্র' কথাটা উচ্চারিত হয়নি। কারে কারে মতে 'পঞ্চকায় গুণাদিটঠধম্ম নির্ব্বাণবাদ' কথাটা বুদ্ধদেবেরই মুখনিঃসৃত বাণী। তবে বুদ্ধদেবের স্বমুখনির্গত বাণীরও পরবর্তীকালে কদর্থ হওয়া কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।"

সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়'এর অভিমত অনুসারে এই তথ্য পাওয়া যায় যে ৩-৪ শতাব্দী কালে রচিত বৌদ্ধ তন্ত্র গ্রন্থ 'গুহ্যসমাজ' মূল অর্থে প্রথম বিধিবদ্ধ গ্রন্থ।.... বৌদ্ধতন্ত্র হিন্দুতন্ত্রের অগ্রজ। বুদ্ধে জীবিত কালেই বৌদ্ধ তন্ত্রের সূচনা হয়েছে, বৌদ্ধতন্ত্রের প্রথমরূপ 'সংগীতি'। 'গুহাসমাজ' বৌদ্ধতন্ত্রের মূল সূতিকা গৃহ।

গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু 'তন্ত্রের আশ্রয়'। এই অধ্যায়ে উঠে এসেছে বৌদ্ধধর্মের বিবর্তন বাদ। ভগবান বুদ্ধ ৪৫ বর্ষ ব্যাপী সদ্ধর্ম প্রচার করার পর ৪৮৩ খ্রীষ্ট পূর্বাদ্ধে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা প্রকৃতির ব্যক্তিবর্গ বৌদ্ধধর্মে সম্মিলিত হয়ে পড়ে, ধর্মে নানা পরিবর্তন ফুটে উঠতে থাকে। এইভাবে ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের ১০০ বর্ষ পরে, বৈশালীর সঙ্গীতির সময়, বৌদ্ধধর্ম, স্থবিরবাদ এবং মহাসাংঘিক নামক ২টি নিকায়ে (সম্প্রদায়) বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ১৫০ বর্ষ পরে ১৮টি নিকায় উদ্ভূত হয়, যার বংশবৃক্ষ, পালি কথাবত্থু'র অট্ঠকথাতে দেখতে পাওয়া যায়।

ভগবান বুদ্ধের জীবৎকালে তাঁর ভিক্ষুসংঘ ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন জনপদে উপস্থিত হয়েছিলেন। অশোকের সময়কালে (খ্রী. পূর্ব ৩'য় শতাব্দী) বৌদ্ধধর্ম বিশ্ব ধর্ম রূপে খ্যাতি লাভ করেছিল। উত্তরকালে বৌদ্ধতন্ত্র কিভাবে বিকশিত হয়েছিল তা এখানে প্রদান করা হল। যেমন- 
মহাসাংঘিক (চৈত্যবাদী)


অন্ধক
সম্মিতীয় (খ্রী. পূর্ব ৩'য় শতাব্দী)
বৈপূল্য (খ্রী. পূর্ব ১ম শত্বাদী)
পূর্ব শৈলীয়
অপর শৈলীয় রাজগিরিক
সিদ্ধার্থক (খ্রী. পূর্ব ৩-১'ম শতাব্দী)
মহাযান (খ্রী. ১ম শতাব্দী)
যোগাচার
বিজ্ঞানবাদ
ক্রিয়াতন্ত্র
চর্যাতন্ত্র
বজ্রযান (শূন্য, বিজ্ঞান এবং মহাসুখ)
যোগতন্ত্র
অনুত্তর যোগতন্ত্র
কালচক্রযান (মহাপাল'এর শাসনকাল)
মন্ত্রযান
সহজযান
-তথ্যসূত্র : পুরাতন্ত্র নিবন্ধাবলী, পৃ. ১২৭-১২৮।


সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়'এর মতে, বজ্রযানের মধ্য দিয়েই তন্ত্রের মূল আদর্শ এবং তান্ত্রিক চর্যা বৌদ্ধ সমাজে অঙ্গীভূত হয়েছে। এই বজ্রযান'ই হল তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম, যাকে বৌদ্ধ ধর্মের অপচ্ছায়া বা অপভ্রংশ ব্যতীত আর কিছুই বলা চলে না।

খ্রীষ্টিয় ২-৩ শতাব্দীর সময়কালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে পৌরাণিকতা এবং মূর্ত দেব দেবীর অনুপ্রবেশ ঘটতে শুরু করে। এর পরিপূর্ণতা আমরা দেখতে পাই ৮-৯ শতাব্দীতে। এই সময় দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গদেশে বৌদ্ধ রাজ বংশ খড়গ এবং চন্দ্র শাসকদের শাসন কাল বিশেষভাবে উল্লেখ্যনীয় ছিল। সমাজে শৈব ধর্ম এবং কাপালিক মতের চর্চা ব্যাপকতা লাভ করেছিল। চর্যাপদে কাপালিক সাধন তত্ত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। সিদ্ধাচার্য বলছেন-

কইসনি হালো ভোম্বী তোহোরি ভাবরিআলী।
অন্তে কুলিনজন মাঝে কাবালী।।

তইলো ডোম্বী সঅল বিটালিউ।
কাজন কারণ সসহর টালিউ।।

কেহো কেহো তোহোরে বিরুতা বোলই।
বিদুজন লোঅ তোরে কন্ঠ না মেলঙ্গ।।

তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে তন্ত্রপ্রধান অঞ্চল ও তান্ত্রিক বিধান। বৌদ্ধধর্মের অন্তিম পরিণতি ছিল 'তন্ত্র'। এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম তদানীন্তন পূর্বাঞ্চলে (অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ এবং প্রাগজ্যোতিষপুর) দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল। ১২'শ শতাব্দীকালে তুর্কী মুসলমানদের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে বঙ্গদেশ হতে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়। বঙ্গদেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুরাণ এবং হিন্দু তন্ত্রের জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেল।

প্রসঙ্গত স্মরণ যোগ্য যে বঙ্গদেশে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি কোনভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি। এর মূল কারণ বঙ্গদেশের জনগন দেবী পূজার উপাসক। লেখক এই অধ্যায়ে বৌদ্ধ এবং হিন্দু তন্ত্রের মুখ্য অষ্টসিদ্ধি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করেছেন যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক ও বটে।

শাক্ততন্ত্রের মূল ধারক এবং বাহক হল আদ্যাশক্তি মহামায়া। ২টি রূপে তিনি বঙ্গদেশে পূজিত বা প্রতিষ্ঠিত, ১. চন্ড (দুর্গা), ২. কালী। তবে এই ২ দেবীর মধ্যে কালী অধিক জনপ্রিয়।

প্রকৃত অর্থে 'তন্ত্রের মর্মবাণী' কি?

এ প্রশ্নের উত্তরে লেখক সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, "তন্ত্রের লক্ষ্য হল 'পরমহংসত্ব' লাভ বা জ্ঞামুক্তি বা পাশমুক্তি। উপনিষদে যার অর্থ অজ্ঞান, তন্ত্রে তাকেই বলা হয়েছে 'পাশ' অর্থাৎ পশু জীবনের যতকিছু বন্ধন। লক্ষ্য দুটি পন্থারই এক।"

তন্ত্রশাস্ত্র বাস্তববাদী, এই বস্তুতন্ত্রকে মেনে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তান্ত্রিক সাধড়ার বিধি রচিত হয়েএছ। এ বিধির মুখ্যকথা, 'ভোগো যোগয়তে' (ভোগো যোগায়তে সাক্ষাদ দুস্কৃতি, সুকৃতায়তে, মোক্ষায়তেহি সংসার, কুলধর্মে মহেশ্বরি)।। অর্থাৎ ভোগকে অতিক্রম করে ভোগবর্জিত যোগের মধ্যে যেতে হবে ভোগকে এড়িয়ে নয়, আস্বাদ করে।

হিন্দুতন্ত্র
দক্ষিণাচারী (প্রবৃত্তিমার্গ)
বামাচারী (নিবৃত্তিমার্গ)
সিদ্ধান্তচারী
অঘোরচার
যোগাচার
কৌলাচার


পঞ্চম অধ্যায়ের বিষয়বস্তু তান্ত্রিক আচার, পঞ্চ 'ম'-কার সাধনা। দীক্ষা কাকে বলে?

সহজ অর্থে বিষয়টিকে ইষ্টমন্ত্রদান বলে। লেখকের মতে বিষয়টি দৈবশক্তির প্রতীক। তিনি স্পষ্টভঅবে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, দীক্ষার মাধ্যমেই 'পাশমুক্তি' সম্ভব হয়, জ্ঞানের দ্বারা তা অর্জন করা হয় না। (দীক্ষৈব মোচয়ত্যুধ্বং শৈবং ধাম নয়ত্যপি) দীক্ষাদানের ক্ষেত্রে শুভ তিথি, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করা গুরুর ক্ষেত্রে আবশ্যক কর্তব্য, নতুবা মন্ত্রজপ এবং মন্ত্রপূজা বিধি নিষ্ফল হয়। তন্ত্রজগতে পঞ্চ ম-কার সাধনা এক চিরকুহেলিকাময় রাজ্য। এই গূঢ় সাধনার আড়ালে তন্ত্র একদিকে যেমন পরম রহস্যময় হয়েছে, তেমনি সুস্পষ্ট কারণে তাকে বহুস্থানে ঘৃণ্য এবং অপাংতেয় করে রেখেছে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। যেমন

মদ্যং মাংসঞ্চ মৎস্যশ্চ মুদ্রা মৈথুনমেব চ।
ম-কার পঞ্চকং দেবি! দেবতাপ্রীতিকারকম্।। - কুলার্ণবতন্ত্র।


১৪'শ শতকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কালী তন্ত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর তন্ত্রসাধনার তরীতে উঠে এল তিনটি পাল ষষ্কর্ম, অষ্টসিদ্ধি এবং পঞ্চ ম-কার। তন্ত্রে বেদাচার, দক্ষিণাচারের উল্লেখ থাকলেও তান্ত্রিক দেব দেবী ও উপাসনা পদ্ধতি লৌকিক ধারারই ধারক বাহক। তন্ত্রে আর্যও আর্যেতর ধারার সংমিশ্রণ ঘটেছে। আদিমতর জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে মাতৃপূজার যে ধারা ছিল, যার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল বেদ, পুরাণেতারই একটি সুসংহত রূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে তন্ত্রে। তন্ত্রের একদিকে যেমন বলা হয়েছে

যদুক্তং পরমং ব্রহ্ম নির্বিকারং নিরঞ্জনম্।
তস্মিন প্রমদনং জ্ঞানং তন্মাদ্যং পরিকীর্তিতম।।

কুলকুন্ডলিনী শক্তিদেহিনাং দেহধারিণী।
তয়া শিবস্য সংযোগো মৈথুনং পরিকীর্তিতম্।। বিজয়তন্ত্রম।

উপাসনা পদ্ধতি যাই হোক না কেন, তন্ত্রে মাতৃশক্তির একচ্ছত্র প্রভাব বিদ্যমান। তন্ত্রের ধ্যান, জ্ঞান, স্তবস্তুতি, জপ, হোম, মন্ত্র, মন্ডল সব কিছুরই মূল লক্ষ্য শক্তি দেবী (জগৎমাতা)।

হ্লাদিনী যা মহাশক্তি: সর্ব্বশক্তি বরীয়সী।
তৎসার ভাবরূপেয়মিতি তন্ত্রে প্রতিষ্ঠাতা।। রাধা প্রকরণ।

শক্তিদেবী এবং তাঁর উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিকতা ও ভাবুকতা, অন্যদিকে আছে তামসিক আচারের বাহুল্যতা।

ভ্রুকুটিকুটিলাংতস্যা ললাটফলকাদদ্রুতম্।
কালী করালবদনা বিনিষ্ক্রান্তাসিপাশিনী।।

বিচিত্র খট্টাঙ্গধারা নরমালা বিভূষণা।
দ্বীপিচর্ম পরিধানা শুষ্কমাংসাতিভৈরবা।।
অতিবিস্তার বদনা জিহ্বাললনভীষণা।
নিমগ্নরক্তনয়না নাদাস্পুরিতদিম্মুখা।। জ্ঞানর্ণব তন্ত্র (উঃ চঃ ৭ম অধ্যায়)।

তান্ত্রিক সাধনার মূল লক্ষ্য হল মূলাধারে শিবশক্তিকে অর্থাৎ কুলকুন্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে, এর কুন্ডলীভাব ঘুচিয়ে, একে উর্ধ্বমুখী করে শিবচক্রে পরমশিবের সঙ্গে মিলিত করা, আবার কুলকুন্ডলিনী শক্তিকে মূলাধারে ফিরিয়ে আনা।

এই লক্ষ্যভেদের সহায়তা করে যোগসাধনা। (তন্ত্রের কথা, পৃ. ৭৮)।

মুদ্রার ব্যুৎপত্তিগত বা মর্মগত অর্থ কি?

এ প্রসঙ্গে লেখক সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত অর্থবহ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, শিবচক্রে বা সহস্রদল কমলে যে পরমাত্মার অবস্থান তাঁরই সম্যক জ্ঞানের নাম মুদ্রা। তবে মহানির্বাণ তন্ত্রের ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা একটু ভিন্ন ধরনের। হৃদয় স্থিত আশা, তৃষ্ণা, লজ্জা, প্রভৃতিকে জ্ঞানাগ্নির সহায়তায় 'ভঙ্গনকরা' অর্থাৎ বশীভূত করার নামই হল 'মুদ্রা'।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে 'তন্ত্রের দেবদেবী'। এই অধ্যায়ের এইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বৌদ্ধ মূর্তিশাস্ত্রের মূল ভিত্তি প্রকৃত অর্থে একটি তন্ত্রগ্রন্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। গ্রন্থটি নাম 'সাধনমালা'। এই গ্রন্থটি সম্পর্কে শ্রীযুক্ত বিনয়তোষ ভট্টাচার্য মহাশয় বলেছেন, "সাধনমালার যতগুলি পুঁথি পাওয়া গিয়াছে তাহার মধ্যে একখানি সর্বাপেক্ষা পুরাতন। এই পুঁথিখানি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিশালায় রক্ষিত আছে। পুঁথিখানির একটি পাতায় নেবারী সংবতে গ্রন্থসংগ্রহের তারিখ দেওয়া আছে। এই তারিখটি ২৮৬ নেবারী সংবত, অর্থাৎ ১১৬৫ খ্রীষ্টাব্দ। সাধনমালায় ৩১২টি সাধনায় অগণিত দেবদেবীর বর্ণনা, মুর্তির ধ্যান এবং পূজাপদ্ধতি, মন্ত্র ও মন্ত্র প্রয়োগাদি দেওয়া আছে।"

আর ও একটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁথির নাম নিষ্পন্ন যোগাবলী। এই গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছিলেন একজন বাঙালী পণ্ডিত। তাঁর নাম অভয়াকর গুপ্ত। তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারে গবেষণার কার্য করতেন এবং অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর সময়কাল ১১৩০ খ্রীষ্টাব্দের নিকটবর্তী কোন এক সময়ে। এই গ্রন্থ অর্থাৎ পুঁথিতে প্রায় ৬০০ দেবদেবীর বিবরণ পাওয়া যায়।

বৌদ্ধ তন্ত্র মত অনুসারে সৃষ্টির আদি এবং অকৃত্রিম উৎপত্তিস্থল একমাত্র শূণ্য। এই শূণ্যের মূলভূত অর্থ সৎ বিজ্ঞান ও মহাসুখ, অর্থাৎ শূন্য চিৎসদৃশ এবং আনন্দস্বরূপ। এই শূন্য রূপ ঘণীভূত হয়ে প্রথমে শব্দ রূপ দৃশ্য হন এবং পরে শব্দ হতে পুনরায় ঘণীভূত হয়ে দেবতারূপ গ্রহণ করে থাকেন। (বৌদ্ধদের দেবদেবী, বিনয়তোষ ভট্টাচার্য, পৃ. ৪)

'শূন্য' কে বজ্রযানে 'বজ্র' আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তার মূল কারণ হল শূন্য বজ্রের ন্যায় দৃঢ়, সারবান, ছিদ্ররহিত, অচ্ছেদ্য, অভেদ্য, অদাহী এবং অবিনাশী। শূন্যের নাম বজ্র এবং যে মার্গে শূন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে যায় তাকে শূন্যযান বা বজ্রযান বলে।

'আদিবুদ্ধ' প্রকৃত অর্থে বৌদ্ধ দেবমণ্ডলের আদি দেবতা। ইনি সৃষ্টির আদি কারণ শূন্য বা বজ্র। আদি দেবতা। ইনি সৃষ্টির আদি কারণ শূন্য বা বজ্র। আদি বুদ্ধ হতে পঞ্চধ্যানী বুদ্ধ বৈরোচন, রত্নসম্ভব, অমিতাভ, আমোঘসিদ্ধি এবং অক্ষোভ্য।

বজ্রযান দেবসংঘে গৌতমবুদ্ধের স্থান প্রায় নেই বললেই চলে। যদি তাঁকে কখনও প্রতিমূর্তিত করা হয় তাহলে তিনি অক্ষোভ্যের ন্যায় দেখতে হন। তখন তাঁর নাম হয় বজ্রাসন। নিষ্পন্ন যোগাবলীতে দুর্গতি পরিশোধন মন্ডলেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে ভগবান বুদ্ধকে "শ্রীশাক্যসিংহো ভগবান মহা বৈরোচনঃ" অর্থাৎ বৈরোচন রূপে কল্পনা করা হয়েছে। (বৌদ্ধদের দেবদেবী, বিনয়তোষ ভট্টাচার্য, পৃ. ৬)।

সংখ্যাতীত তন্ত্রগ্রন্থে লক্ষ লক্ষ মহাশক্তির উল্লেখ রয়েছে 'শত লক্ষ মহাবিদ্যা তন্ত্রাদৌ কথিতা প্রিয়ে।' এর মধ্যে প্রধান ১০ মহাবিদ্যা -

কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী।
ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধমাবতী তথা।।

বগলা সিদ্ধবিদ্যা চ মাতঙ্গী কমলাত্বিকা।
এতা দশমহাবিদ্যাঃ সিদ্ধবিদ্যাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।। চামুন্ডা তন্ত্র।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের বিখ্যাত গ্রন্থ 'তন্ত্রসার'। এই মহামূল্যাবান গ্রন্থে তিনি 'কালীতন্ত্রে'র উল্লেখ করেছেন। "করালবদনাং ঘোরাং" চতুর্ভুজাং, মুন্ডমালা বিভূষিতাং, মহামেঘ প্রভাং শ্যামাং, পীনোন্নত পয়োধরং, শ্মশানালয়বাসিনীং, কালীং, সর্বকাম সমৃদ্ধিদাম।"

বৌদ্ধতন্ত্রের দেবী তারার বিবর্তিত রূপ হল কালী, সরস্বতী এবং ভদ্রকালী। সরস্বতী'র মন্ত্রের মধ্যে নিহিত আছে তন্ত্রের বিধান। সপ্তম অর্থাৎ অন্তিম অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় বস্তু 'বাঙালীর তান্ত্রিকতা ও তন্ত্র ব্যাখ্যান।

মনে রাখতে হবে যে বাঙালীর জীবন দর্পণে যে সকল দেবদেবী পূজিত হয়ে আসছে (কালী, চন্ডী, দুর্গা, সরস্বতী এবং শিব অথবা মহাকাল) তার সকলই তান্ত্রিক আচার-আচরণ যুক্ত। বঙ্গদেশে ইসলামী আগ্রাসনের পূর্ব সময়কাল পর্যন্ত বৌদ্ধতন্ত্র টিকে ছিল। এরপর হিন্দু পৌরাণিককতা এবং লোকায়ত ধর্মের মধ্যে বৌদ্ধতন্ত্র বিলীন হয়ে যায়। ১৫-১৬ শতাব্দীকালে 'তন্ত্রসার' গ্রন্থটি অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই গ্রন্থের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাগীশ্বরী বা বাগদেবতার কথা।

বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী হয়গ্রীবের একটি মুখ অশ্বের মুখের ন্যায়। দেহখানি শরৎকালের পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় স্নিগ্ধ। দেবীরূপ বর্ণনা এইভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে-

তরুণশকলমিন্দোর্বিবভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ কুচভরণমিতাঙ্গী সন্নিষন্না সিতাজে।

তন্ত্রসার' মূল অর্থে তান্ত্রিক আচার-আচরণ পদ্ধতির উল্লেখ্যনীয় গ্রন্থ। কর্মই জীবের জন্ম-কারণ, 'দেহঃ কর্মাত্মকঃ প্রোক্তঃ, 'সর্বকর্মাত্মকং'। শারদাতিলকে আছেঃ 'পূবর্বকর্মানুরূপেন মোহপাশেনযন্ত্রিতঃ। কশ্চিদাত্মা তদা কস্মিন জীবভাবং প্রদত্যতে।।' (১/১৩) মোহগ্রস্ত জীবের বর্ণনাও তন্ত্রে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেমন হল-

স্বদেহ-ধন-দারাদি-নিরতাঃ সর্ব্বজন্তবঃ।
জায়ন্তে চ প্রিয়ন্তে চ হাহাতাহজ্ঞানমোহিতাঃ।। শাক্তানন্দতরঙ্গিনী।

তন্ত্রের বহুপদে দেবীবর্ণনার রূপ দৃষ্ট হয়। 'তন্ত্রসার' গ্রন্থে তা এইভাবে বর্ণিত হয়েছে। মূল ধ্যানের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত-

বালার্কমন্ডলাকার লোচনত্রয়ভূষিতাম। জ্বলচ্চিতামধ্যানগতাং ঘোরাদংষ্ট্রাং করালিনীম্।। অক্ষোভ্যো দেবী মুর্দ্ধন্যাস্ত্রিমূর্ত্তি নাগরূপধূক।

সাবেশস্মেরবদনাং স্থালংকারবিভূষিতাম্।
বিশ্বব্যাপকতোয়ান্ত শ্বেতপদ্মোপরিস্থিতাম্।।

এই ধ্যানের সঙ্গে শিবচন্দ্র রায় বিরচিত 'নীরবরণী নবীনা রমনী।

নাগিনী জড়িত জটাবিভূষণী পদটি তুলনীয়।

সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়'এর মতে 'মঞ্জুঘোষ চন্দ্রের ন্যায় শ্বেতবর্ণের। তাঁর হাতে খড়গ এবং পুঁথি। এর দেহকান্তি অপরূপ এবং শান্তমূর্তি। ইনি পদ্মপলাশলোচন, সাধকের কুমতি দূরীভূত করেন। বৌদ্ধ তন্ত্রের মঞ্জুঘোষ মূর্তিতে মঞ্জুশ্রী একমুখ ও দ্বিভুজ। ইনি সর্বালঙ্কার ভূষিত। একটি সিংহের উপর উপবিষ্ট থাকেন এবং হস্ত দ্বয়ে ব্যাখ্যান বা ধর্মচক্র মুদ্রা প্রদর্শন করেন। বামপার্শ্বে একটি উৎপল থাকে। এর দক্ষিণে সুধনকুমার এবং বামে যমান্তক দন্ডায়মান অবস্থায় থাকেন।

পঞ্চাঙ্গ শুদ্ধি ব্যতীত সমস্ত পূজাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। লেখকের মতে এই পঞ্চাঙ্গের অঙ্গগুলি হল আত্মা, স্থান, মন্ত্র, দ্রব্য এবং দেবতা। 'তন্ত্রসার' গ্রন্থে এই বিষয়গুলি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তন্ত্রসার গ্রন্থের পর সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় 'মহানির্বাণতন্ত্র' সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটি ১৪টি উল্লাস অর্থাৎ পরিচ্ছেদে বিভক্ত। তন্ত্রের একদিকে যেমন বলা হয়েছে-

মদ্যং মাংসং তথা মাৎস্যং মৈথুনমেব চ।
ম-কারাং পঞ্চ দেবেশি শীঘ্রং সিদ্ধিপ্রদায়কম্।।

মহানির্বাণতন্ত্র।

এইভাবে সম্পূর্ণ গ্রন্থে তন্ত্রের 'সম্পূর্ণ' ইতিহাস, বিধি বিধান ইত্যাদি অতি সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ভাব না কালী ভাবনা কিবা।
ওরে মোহমীয় রাত্রি গতা সম্প্রতি প্রকাশে দিবা।।

অরুণ-উভয়কাল ঘুচিল তিমিরজাল।
ওরে কমলে কমল ভাল, প্রকাশ করেছে শিবা।।

গ্রন্থটি বিশ্ববিদ্যালয়'এর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীগণের নিকট সহায়ক গ্রন্থরূপে যে অপরিহার্য হয়ে দেখা দেবে তা নয়- বাংলা সাহিত্য ও বাঙালীর জাতীয় জনজীবনে এই গ্রন্থখানি যে প্রচুর সমাদর লাভ করবে সে বিষয়ে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।