Tuesday, February 10, 2026

পরমকল্যানমিত্র প্রশান্ত ব্যানার্জী


সুমনপাল ভিক্ষু 

শ্রী প্রশান্ত ব্যানার্জী, বাহান্ন সালের আঠারোই জানুয়ারি (১৮.০১.১৯৫২) ৫, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুর থানার অন্তর্গত আটঘড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মোহিনী মোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা অমলা বন্দ্যোপাধ্যায়। আট ভাই বোনের ছিলেন বড়ো দাদা এবং সারাটা জীবন দাদার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে ICCR -এ কর্মজীবন শুরু করেন। পরিশ্রম, ভালোবাসা, নিয়মানুবর্তিতার জন্য সমস্ত কলিগ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে প্রবাসে "পিতা" বলে মনে করতেন, ছেলেমেয়েদের দীর্ঘদিন ধরে টাকাপয়সা আটকে আছে জানতে পারলেই সঙ্গে সঙ্গে প্রতিকার করতেন, ভালোবাসাও পেয়েছেন প্রচুর। 

তিনি না হলে আমার পি. এইচ. ডি. করাই হতো না। আজকে যা কিছুই আমার বলে বলতে পারছি তাঁর অকৃত্রিম দান, আর ভালবাসা, শ্রদ্ধা। ২০০১ সাল থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সেই বছর এম. এ -তে আই.সি.সি.আর স্কলারশিপ লাভ করি। তিনি আই.সি.সি.আর এর উচ্চ আধিকারিক হলেও পর তিনি সকলের সঙ্গে আপন কাছের বন্ধু, দাদা হিসেবে ব্যবহার করতেন ডাকলে খুশি হতেন, প্রীতি অনুভব করতেন। তাঁর মধ্যে দেখেছি নিরহংকারিতা ও নিরপেক্ষতা সর্বোপরি অন্যকে এগিয়ে দিয়েছেন এবং বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি নিজেকে অকাতরে অন্যের সাহায্যে। ২০০৩ সালে শেষ এম. এ. আমার। ২০০৪ সালে আবার এপ্লাই করি পি. এইচ. ডি. জন্য সে বছর হলো না। যথা সময়ে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল কোন নির্দেশনা পাই নি। তাঁর কাছে ছুটে যাই তিনি বলেছেন যার কাছে এসেছিল তারা ইনফর্ম করেনি। তিনি বললেন আবার করো, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী আবার করলাম, ২০০৫ সালে সে বছরও একই অবস্হা প্রায়। কোনক্রমে অন্য আধিকারিকের থেকে অফিসিয়াল দায়িত্ব তাঁর কাছে হস্তান্তরিত হয়। তিনি ফাইল খুলে দেখেন আমার আই.সি.সি.আর এপ্লিকেশন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে ডাকেন আই.সি.সি.আর অফিসে। তিনি বললেন এই লেটার নিয়ে এক্ষুনি গিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কাছে যেতে। তিনি বললেন এটা আজকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সাইন করিয়ে আনতে হবে, তখন সেটা নিয়ে ছুটলাম যথাসময়ে এপ্রুভ করিয়ে এনে তাঁর হাতে দিলাম। অফিস থেকে ফেরার সময় তিনি বললেন দেশে গিয়ে একটা লেটার পাবে এমব্যাসিতে সাবমিট করবে। তিনি তখনও বলেননি কীসের চিঠি। তাঁর কথা মতো বি.ডি. গিয়ে চিঠি পেলাম। চিঠি পেয়েই বুঝলাম দাদা এসব করেছেন আমার জন্য। এই প্রথম দেখলাম কোন সরকারি উচ্চ আধিকারিক নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন। এটা আমার ক্ষেত্রেই করেছিলেন কিন্ত অন্য আরো হাজার ছাত্রছাত্রী, গবেষক বিভিন্ন দেশের থেকে এসেছেন সবার নানা রকম অফিসিয়াল সমস্যা, ভিসা, ব্যাংক একাউন্ট, ঘর রেন্ট কোথায় পাবে, কোথায় সুবিধা হবে সব তিনি তাঁর অফিসিয়াল কাজের ফাঁকে ফাঁকে করে দিতেন। 

২০০৬ সালে স্কলারশিপ পেয়ে কোলকাতা এসে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে এনরোল্টমেন্ট করি। ২০১১ সালে যথারীতি শেষ করি। এরই মধ্যে তিনি গুয়াহাটির আই.সি.সি.আর'র রিজিওনাল ডাইরেক্টর হিসেবে যোগদান করেন। সেটা ২০০৯ সাল, এর মধ্য বি.ডি. তে আমি অতিরিক্ত থাকার দরুন অর্থ্যাৎ ভিসা পেতেই বিলম্ব হওয়াতে আমার অনেক স্কলারশিপ কেটে নেন ২০১১ সালে শুরুতে তিনি কোলকাতা রিজিওনাল ডাইরেক্টর হিসেবে ফিরে এসে যোগদান করেন। তাঁকে তা অবগত করালে বললেন, এটা অফিসিয়াল হয়ে গেছে কিছু করার নেই। তিনি তখন আনঅফিসিয়ালি বললেন এনারা এগুলো কেন করেন আমার জানা নেই। এগুলো সরকার দিচ্ছেন, আমার ঘর থেকে এনে দিচ্ছি না এগুলো কাটার কোন মানে হয় না। তখন তাঁর মধ্যে দেখেছি ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দরদ আর প্রীতি।

এমনকি কোন ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ আটকে থাকলে, ঠিক মতো অফিসে ইনফর্ম না করলে তিনি ব্যাক্তিগতভাবে খোঁজ নিতে ছুটে যেতেন। কারো স্কলারশিপ যাতে অফিসিয়াল মতো আটকে না থাকে তা তিনি সুরাহা করে দিতেন। ছাত্রছাত্রীদের এস্কারসনে যেতে হলে কে কোথায় যাবে, কে কোথায় গেলে তার, তাদের গবেষণার সুবিধা হবে তার তদারকি তিনি আনঅফিসিয়ালি তিনি করে দিতেন। 

শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী ইন্দো-টিবেটান বিভাগে তাঁকে বলার সঙ্গে সঙ্গে সেমিনার ফান্ড এর ব্যবস্থা করে দেন তিনি। বিভাগীয় প্রধান তখন ছিলেন ড. সঞ্জীব কুমার দাস। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগেও সেমিনার ফান্ড মঞ্জুর করে দেন ২০১২ আমি অনুরোধ করতেই। পালি বিভাগের অধ্যাপকদের বিদেশে সেমিনার যোগদান করতে টি.এ.ডি.এ. তিনি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন অনেকবার। শুধু পালি বিভাগ নয় অন্যান্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক- অধ্যাপিকাদেরও করে দিয়েছিলেন। 

২০১২ সালের সংস্কৃত কলেজে পালি বিভাগে একজন বি.ডি. থেকে স্কলারশিপ পেয়েছিলেন সেটাও কলিকাতা ডেপুটি রেজিস্ট্রার অফিস থেকে ছাড়েনি। তিনি আবার আমাকে ডেকে বললেন এটা নিয়ে গিয়ে এক্ষুনি সাইন করে নিয়ে আসতে হবে। আমি যথারীতি তাঁর কাছ থেকে ফাইল নিয়ে ডাইরেক্ট কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে যাই তখন ড. বাসব চৌধুরী মহোদয় সেটা সই করে দিয়ে বললেন রেজিস্ট্রেশন সেকশন গিয়ে ফাইল নম্বর বসিয়ে আপনি নিয়ে যান আমি বলে দিচ্ছি। রেজিস্ট্রার কথামতো তা করেই আই.সি.সি.আর অফিসে প্রশান্ত দা-র কাছে নিয়ে গেলাম। তার এক সপ্তাহের মধ্যে বি.ডি. সেই স্কলার ছাত্র কোলকাতা চলে আসে। তার নাম এপেলো চাকমা। এরপর আরো দুজনের হয়েছিল কিন্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন অধ্যাপকদের কারনে তা পূর্ণতা আসেনি। তারা হলেন আনন্দ আর নিপুন। দুর্ভাগ্য আমাদের প্রশান্ত দা'র মতো ছাত্র দরদী লোক আর রইল না। তাঁর অনন্তলোকে প্রস্হান ও আনাপান বায়ু স্তিমিত হয় ২০/০১/২০২৬।

প্রশান্ত দা-কে ২০০৯ সালে বিদর্শন শিক্ষা কেন্দ্রের কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত করি, তিনি আমার ডাকে সারা দিয়েছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা হলে তাঁকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করলে তিনি উপস্থিত হয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে আমার একটি বই তাঁকে উদ্দেশ্য করে সমর্পণ করি। ২০১৭ সালে মহাবোধি সোসাইটিত একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার তাঁকে আমন্ত্রণ করি। সেই অনুষ্ঠানে তাঁকে নালন্দা পত্রিকার পক্ষ থেকে সম্মান স্মারক প্রদান করা হয়। তাঁকে যখনই ডেকেছি তিনি সারা দিয়েছেন। তাঁর কাছেও আমি গেছি ৩ বার একবার তাঁর মায়ের শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে, আর একবার তাঁর নাতিদের পৈতে প্রদান অনুষ্ঠানে। আর একবার এমনি সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। আমি যখন ২০১৩ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি বিভাগে ও বিদেশি ভাষা শিক্ষা বিভাগে যোগদান করি অতিথি অধ্যাপক হিসেবে তখন তিনি আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এই প্রথম আমি আমার সামনে কাউকে দেখলাম একটা পজিশনে পৌঁছানোর, সবাই তো যে যার মতো ফিরে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি যখন বি. ডি. গিয়েছিলেন আমার বাবাকে ফোন করে নিজে থেকেই সাক্ষাৎ করে এসেছিলেন। তিনি এমন মানুষ কাকে কিভাবে কাছে টেনে নিতে হয়, কিভাবে সম্মান জানাতে হয়, সেইসব বিষয় ছিল তাঁর সুতীক্ষ্ণ ও গভীর মমত্ববোধের পরিচায়ক।

বরাবর ছিলেন পরোপকারী, সমাজসেবক, এবং খেলা পাগল মানুষ। নিজের পাড়া গ্রাম এর জন্য ছিলো অসম্ভব ভালোবাসা। গ্রামের ফুটবল ক্লাবের জন্য প্রাণপাত করেছেন। দীর্ঘদিন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা'র ফুটবল এসোসিয়েশন এর সেক্রেটারি ছিলেন। কিন্ত তাঁর শেষ দেখা দেখতে পেলাম না। তাঁর অনন্তলোকে যাত্রার ১মাস আগে আমাকে তিনি দান পাঠিয়েছিলেন। এখন সারাজীবন তাঁর কাছে ঋণী থেকে গেলাম।

No comments:

Post a Comment