সুমনপাল ভিক্ষু
'নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ শ্রুতিজাতম
সদ্যয় হৃদয়দর্শিত পশুশতম
কেশবধৃত বুদ্ধ শরীর
জয় জগদীশ হরে।
কবি জয়দেব। গীত গোবিন্দের দশাবতার স্তোত্র।
বৌদ্ধ তন্ত্রমার্গী সাধনা ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের সঙ্গে মিশে গেল। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য দেবায়তনের প্রভেদ কমে গেল। ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্ম ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে মিশে গেল। বিহারে ও সংঘারামে হাজার হাজার ভিক্ষু আর দেখা গেল না নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী মহাবিহার তুর্কি আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেল। হাজার হাজার বৌদ্ধ পুঁথি আগুনে পুড়ে গেল। যাঁরা এ আক্রমণ হতে রেহাই পেলেন তাঁরা নিজেদের উপাস্য দেবদেবী ও পুঁথি সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন নেপাল, তিব্বত ও অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলে। (উৎস: বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্ম, ১৯৬৬, অনুকুল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)।
খ্রীষ্টপূর্ব ২ শতাব্দী হতে খ্রীষ্টিয় ৩ শতাব্দী পূর্ব দক্ষিণাপথের কৃষ্ণ এবং গুন্টুর জেলায় বৌদ্ধ ধর্মের সমৃদ্ধির অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। কৃষ্ণনদী তীরে অমরাবতী এবং নাগার্জুনকোন্ডা তথা অমরাবতী হতে অনতি দূরে জগ্গ্যমপেট ও নাগার্জুনকোণ্ডা নিকট শ্রীশৈল (শ্রী পর্বত) বৌদ্ধধর্মের মূলকেন্দ্র ছিল। সাতবাহন রাজাদের সদ্ধর্মের প্রতি আনুগত্য বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়। বাসিষ্ঠীপুত্র শ্রী পুলুমাবীর সময়কালের একটি অভিলেখতে চৈতিকীর নিকায়ের পরিগ্রহতে মহাচৈত্যের সত্তা সূচিত করে। অমরাবতীর এই মহাচৈত্যের রচনা, বিবর্ধন এবং পরিস্কার খ্রীষ্টপূর্ব ২ শতাব্দী হতে খ্রীষ্টিয় ২ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালের গণ্য করা হয়। এপিগ্রাফিকা ইন্ডিকা গ্রন্থে (এইচ, ফোগল, পৃঃ ২০, খণ্ড ১৫) এই পুলুমাবীকে আচার্য নাগার্জুনের সমকালীন সাতবাহন রাজা রূপে উল্লেখ করেছেন। এই প্রদেশে সাতবাহনের উত্তরাধিকারী ইক্ষাকু বংশের শাসক'এর কথা নাগার্জুনকোণ্ডা হতে প্রাপ্ত অনেক অভিলেখতে পাওয়া যায়। বাসিষ্ঠীপুত্র শান্তমূল প্রথম, বৈদিক ধর্মের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু মাঠরীপুত্র বীর পুরুষ দত্ত'র সময়কালে সদ্ধর্মের সমৃদ্ধি হয় তথা জগ্গ্যমপেট এবং নাগার্জুনকোণ্ডার মহাচৈত্য'র নির্মিতি, সংস্কার এবং বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হয়েছিল। বীর-পুরুষ দত্ত'র এক রাণী 'বপিসিনিকা'র একটি অভিলেখতে নাগার্জুনকোণ্ডার মহাচৈত্য নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়া তথা সেখানে অপরমহাবন শৈলীয়'র কেন্দ্রকে সূচিত করে। তবে 'বুড্ডিষ্ট স্তূপ অফ অমরাবতী অ্যান্ড জগ্গ্যমপেট' গ্রন্থে (পৃ: ১১) এই স্থান মহিশাসক সম্প্রদায়ের প্রতি প্রদত্ত বিহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বীর পুরুষ দত্ত'র ১৪ বর্ষ শাসনকালের একটি অভিলেখ শ্রীপর্বতে তাম্রপর্নীর স্থবির আচার্যের পরিগ্রেহ নিমিত্তে একটি চৈত্যগৃহের উল্লেখ করে। এখানে গান্ধার, কাশ্মীর, চীন, চিলাত, তোসলি, অপরান্ত, বঙ্গ, বনবাসী, যবন (?), দ্রাবিড় (?), পলুর (?) এবং তাম্রপর্নী দ্বীপ'এর প্রসাদক স্থবিরের (?) উল্লেখ পাওয়া যায়। যে উপাসিকা বোধিশ্রী এই চৈত্যগৃহ নির্মাণ করেছিলেন তাঁর অন্যান্য দানের মধ্যে একটি "সিংহল বিহার"এ বোধিবৃক্ষ প্রাসাদের নির্মাণ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অরল্লু'র একটি ভগ্ন স্তম্ভ অভিলেখতে পূর্ব শৈলীর আচার্যদের উল্লেখ রয়েছে। বীর পুরুষ দত্তের পুত্র এহুবুল শান্ত মূলের শাসনকালে বহু শ্রুতীয় আচার্যদের নিমিত্তে মহাদেবী ভটিদেবা নাগার্জুনকোণ্ডাতে একটি বিহার স্থাপন করেছিলেন।
ইক্ষাকু'র মৃত্যুর পর বৃহৎফলায়ন এবং পল্লবদের শাসনকালে বৌদ্ধদের এই সমৃদ্ধি ক্ষীণ হয়ে পড়ে। ৭ম শতাব্দীতে শুয়াং জাঙ (হিউয়েন সাং) অন্ধ্রপথে বিহার এবং চৈত্য ভিক্ষু শূন্য অবস্থায় পরিত্যক্ত দেখেন। অমরাবতীর মহাচৈত্য ও বিনষ্ট হয়ে পড়েছিল। ভগবান বুদ্ধ এখানে রূপকায় দ্বারা চিত্রিত ছিলেন, প্রতীক দ্বারাও, যা এই স্তূপ নির্মাণের দীর্ঘ অবধিকে সূচিত করে। কথিত আছে মহাসাংঘিকের প্রভাবের ফলে চৈত্যপূজা অন্ধ্রদেশে বিশেষভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। তথা অন্যান্য সাক্ষ্য দ্বারা এই তথ্য পাওয়া যায় যে সদ্ধর্মের মহাযানে রূপান্তর এই প্রদেশ (অন্ধ্রদেশ) এবং সাতবাহন যুগে সম্পন্ন হয়েছিল। অমরাবতী শিল্পকলাতে বুদ্ধমূর্তির নির্মাণ তথা অন্যান্য ইঙ্গিত মথুরা এবং গান্ধার শিল্পকলার প্রভাবকে সূচিত করে।
মহাযানের উৎপত্তি তথা দেশকালকে নির্ধারণ করার প্রশ্নে এইরূপ তথ্য পাওয়া যায় যে দ্বিতীয় বৌদ্ধ মহাসঙ্গীতি কালে বিনয়'এর প্রশ্নে শিথিল এবং অর্হত্বগণের সমালোচক ভিক্ষুগণ মহাসাংঘিক নামে পরিচিত হন। উত্তরকালে অনেক শাখাতে বিভক্ত হয়ে মুখ্যরূপে অন্ধ্রপথ তথা সুদূর উত্তর পশ্চিমে প্রসারিত হয়।
কথাবত্থুর সর্বাধিক অন্তিম অংশে মহাসাংঘিক'এর পরিনতম রূপ বৈতুল্যক শাখার সিদ্ধান্তের উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু মহাযান মতবাদের কোনরূপ উল্লেখ নেই। কথাবত্থু রচনার সময়কাল অন্তিম পালি ত্রিপিটক'এর সঙ্গে খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর পূর্বে তথা মোগ্গলিপুত্ত দ্বারা প্রারম্ভে রচিত হওয়ার কারণ সম্রাট অশোকের পরবর্তী সময় রূপে গণ্য করা উচিত। ফলতঃ বৈতুল্যক শাখাকে খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর স্বীকার করাই শ্রেয়।
অন্ধ্রক মহাসাংঘিকের একটি শাখা পূর্বশেলীয় ছিল। কথিত আছে যে এই সম্প্রদায়'এর নিকট প্রাকৃত নিবদ্ধ প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র ছিল। ফলে প্রজ্ঞাপারমিতার উদ্ভব দক্ষিণাপথ হওয়টাই স্বাভাবিক। এই সকল তথ্য হতে প্রতীয়মান হয় যে অন্ধ্রদেশীয় মহাসাংঘিকের পূর্বশৈলীয় এবং বৈতুল্যক শাখার মধ্য হতে খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে মহাযান বাদের জন্ম হয়েছিল। একথা স্মরণযোগ্য যে মহাযানের অধিকাংশ আচার্য দক্ষিণাপথের ছিলেন। একটি বৌদ্ধ অনুশ্রুতি অনুসারে 'সদ্ধর্ম' লোপাভিমুখ হওয়ার পর সাতবাহন নামক দাক্ষিণাত্য রাজা মহাযানের বৈপুল্য সূত্রের প্রচার তথা ধর্ম রক্ষা করবেন। (কম্প্রিহেনসিভ হিস্ট্রি, পৃঃ ৩৭৭, নাগার্জুন ও সাতবাহন) অন্ধ্রপথ হতে মহাযান মগধের দিকে যাত্রা করেছিল। কারণ মহাসাংঘিকের প্রাচীন কেন্দ্র ছিল মগধ। পুনশ্চ অন্ধ্র হতে উত্তরগামী মার্গ পদ্ধতি মগধাভিমুখ ছিল।
শূন্য সিদ্ধান্তের দার্শনিক সিদ্ধান্তের রীতিবদ্ধ দার্শনিক প্রতিপাদন সর্বপ্রথম নাগার্জুন করেছিলেন। কুমারজীব অনুসারে নাগার্জুন দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি প্রথম জীবনে বেদজ্ঞ ছিলেন এবং অন্য অনেক বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। একসময় তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষু হন এবং হিমালয় প্রদেশ হতে এক স্থবির ভিক্ষুর সহায়তার ফলে মহাযান সূত্র লাভ করেন। শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাঙ) এর মতানুসারে দক্ষিণ কোসল'এর রাজধানীর অনতিদূরে মহামতি অশোক দ্বারা নির্মিত একটি প্রাচীন স্তূপ ছিল। এই স্তূপের নিকটবর্তী সংঘারামে আর্য নাগার্জুন বোধিসত্ত্ব নিবাস করতেন। সেই সময় সাতবাহন নাগার্জুন দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই সাতবাহন রাজা নাগার্জুনের নিমিত্তে একটি সংঘারাম নির্মাণ ও করেছিলেন। একথা স্মরণ যোগ্য যে জগ্গ্যয়পেট স্তূপের নিকট হতে প্রাপ্ত একটি লেখ'তে ভদন্ত নাগার্জুনাচার্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
যদি এই সকল তথ্যগুলিকে আলোচনা করা হয় তাহলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে নাগার্জুন সম্ভবত দ্বিতীয় শতাব্দী (খ্রীষ্টিয়)র সময়কালীন ছিলেন, তথা কনিষ্ক এবং সাতবাহন রাজার সমকালীন ছিলেন। তাঁর মূল স্থান অন্ধ্রপথে সম্ভবতঃ ধান্যকটকের সমীপ অথবা শ্রীপর্বত হওয়া উচিত।
আচার্য আর্যদের অথবা দেব নাগার্জুনের প্রধান শিষ্য ছিলেন। কুমারজীব তাঁর (আর্যদেব) জীবনীর চীনা অনুবাদ প্রায় ৪০৫ খ্রীষ্টাব্দে সম্পন্ন করেছিলেন। আর্যদেব'এর বিষয়ে বলা হয় যে তিনি দক্ষিণাপথের ব্রাহ্মণ ছিলেন। চন্দ্রকীর্তি অনুসারে আচার্য আর্যদেব সিংহলে উৎপন্ন হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি জম্বুদ্বীপের দক্ষিণ অঞ্চলে এসে আচার্য নাগার্জুনের শিষ্য হন। তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল মাধ্যমিক চতুঃশতিকা এবং জ্ঞানসাগর সমুচ্চয়।
মহাসাংঘিক মত এবং বোধিসত্ত্ব :
মহাসাংঘিক মতানুসারে বুদ্ধের রূপকায়কে অনন্ত এবং অনাস্রব স্বীকার করা হয়েছে। লোক অর্থাৎ পৃথিবীতে দৃশ্য তাঁর কায় বাস্তবিক নয়, শুধুমাত্র নির্মাণকায়। তাঁর বাস্তবিক রূপকায় অমর এবং তাঁর আয়ু অনন্ত। মহাসাংঘিক বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বকে 'উপপাদুক' স্বীকার করত। বুদ্ধ সকল দিশাতে স্থিত তথা সকল দ্রব্যে বিদ্যমান থাকেন।
মহাযান সূত্র এবং বুদ্ধের বর্ণনা :
লংকাবতার সূত্রে ধর্মতা বুদ্ধ, নিষ্যন্দ বুদ্ধ তথা নির্মাণ বুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়েছে যে চিত্তমাত্রতার বোধ হলে নির্মাণের লাভ হয়। নির্মাণকায় কর্ম প্রভব নয় এবং তাতে না তো ক্রিয়া অথবা সস্কার বিদ্যমান থাকে। নির্মাণকায় বল, অভিজ্ঞা এবং বশিত্ব দ্বারা যুক্ত হয়। নির্মাণকায় দ্বারাই বুদ্ধ দেশনারূপ তথাগত কৃত্য সম্পাদিত করে। মহাযান সূত্রে বুদ্ধত্ব এবং বোধিসত্ত্ব অলৌকিক তথা চমৎকারী সত্তা রূপে প্রকাশিত করা হয়েছে।
দক্ষিণাপথ এবং বুদ্ধকালীন ভারতীয় ভূগোল :
বুদ্ধকালীন ভারতীয় ভূগোলে দক্ষিণাপথ অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভগবান বুদ্ধের জীবনকালে, দক্ষিণাপথ রূপে দক্ষিণ ভারতের শুধুমাত্র সেই অংশের জ্ঞান প্রারম্ভিক পালি পরস্পরার ছিল যা গোদাবরী এবং অস্সক অলক জনপদের কিয়দংশ রূপ প্রযুক্ত হয়েছিল। 'অপদান'এ দক্ষিণ ভারতের অন্ধকা (অন্ধ্র), সবরা (শবর), দমিলা (তমিল) এবং কোলকা (চোল) ইত্যাদি অঞ্চলের জনগণের উল্লেখ পাওয়া যায়। 'জাতকে' দক্ষিণ রট্ঠ এবং চোল রট্ঠ, কিন্তু দোগাবরী অঞ্চলের পরবর্তী দক্ষিণ প্রদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সাক্ষ্য ভগবান বুদ্ধের জীবনকালে পাওয়া যায় না। তবে সম্রাট অশোকের সময়কালে মহারট্ঠ বা মহারাষ্ট্র (শিলালেখ পঞ্চম এবং ত্রয়োদশ)'র সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের সত্যপুত্র, কেরল পুত্র, চোল এবং পান্ড্য (শিলালেখ দ্বিতীয়) ইত্যাদি প্রদেশ ও সুবিখ্যাত ছিল, এইরূপ উল্লেখ তাঁর (অশোক) অভিলেখ হতে পাওয়া যায়। সুতরাং এই অর্থে অবগত করা যায় যে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে মগধের সম্পর্ক সম্রাট অশোকের শাসনকালেই সম্পূর্ণ হয়েছিল।
শুয়াং জাঙ'এর বিবরণ এবং দক্ষিণাপথ :
শুয়াং জাঙ (হিউয়েন সাং) এর যাত্রা বিবরণে দক্ষিণাপথের বিভিন্ন জনপদ, বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ইত্যাদির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। আন্ধ্র (অন্ধ্র) দেশের রাজধানী ছিল বেঙ্গীপুর। রাজ্যতে ২০'এর অধিক সংঘারাম এবং উক্ত সংঘারাম সমূহে ৩ হাজার'এর অধিক ভিক্ষু নিবাস করতেন।
বেঙ্গীপুরের নিকট একটি সুবিশাল সংঘারাম ছিল। সংঘারামের সম্মুখে একটি সুউচ্চ প্রস্তর স্তূপ এবং সংঘারামের অভ্যন্তরে বুদ্ধ মূর্তি বিরাজমান ছিল। সংঘারাম হতে অনতিদূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি অশোক স্তূপ সেই স্থানে নির্মিত হয়েছিল, যেখানে তথাগত উপদেশ প্রদান করেছিলেন, দিব্য শক্তি প্রদর্শন করেছিলেন এবং অসংখ্য ব্যক্তিজনকে উপসম্পন্ন করেছিলেন।
অর্হত সংঘারাম হতে দক্ষিণ পশ্চিমে একটি পর্বতে অনেকগুলি প্রস্তর স্তূপ ছিল। বোধিসত্ত্ব দিঙ্নাগ 'হেতু বিদ্যা ভাষ্য' এই স্থানে প্রতিপাদন করেছিলেন।
ধান্যকটক রাজ্যে অনেকগুলি সংঘারাম জরাজীর্ণ প্রাপ্ত হয়ে পড়েছিল। শুধুমাত্র ২০টি সংঘারাম (মহাসাংঘিক সম্প্রদায়'এর) সুরক্ষিত ছিল এবং ১ হাজার ভিক্ষু উক্ত সংঘারাম সমূহে নিবাস করতেন। রাজধানী'র পূর্ব দিকে পূর্বশিলা সংঘারাম এবং পশ্চিমের পর্বতে অবর শিলা সংঘারাম বিদ্যমান ছিল। উভয় সংঘারাম এই রাজ্যের পরিনিবৃত রাজা ভগবান বুদ্ধের নিমিত্তে নির্মাণ করেছিলেন। চোল রাজ্যের রাজধানী হতে অনতিদূরে দক্ষিণ পূর্বে সম্রাট অশোক দ্বারা নির্মিত একটি স্তূপ এবং সংঘারাম ছিল। তবে ভিক্ষু সংখ্যা অধিক ছিল না। দ্রাবিড় রাজ্যের রাজধানী কাঞ্চীপুরে ১০০ অধিক সংঘারাম এবং প্রায়ঃ ১০ হাজার ভিক্ষু (স্থবিরবাদী সম্প্রদায়) নিবাস করতেন। রাজা বৌদ্ধ মতের পৃষ্টপোষক ছিলেন। মলকূট অঞ্চলের অধিকাংশ সংঘারাম পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিল এবং কিছু সংখ্যক সুরক্ষিত অবস্থায় ছিল। এই রাজ্যের রাজধানীতে ভিক্ষুর সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। রাজধানী'র পূর্ব দিকে একটি প্রাচিন সংঘারাম (অশোকের কণিষ্ট ভ্রাতা দ্বারা নির্মিত) এবং অশোক নির্মিত একটি স্তূপ ভগ্নাবস্থায় বিদ্যমান ছিল। মলকুট'এর দক্ষিণে সমুদ্রতটে মলয় পর্বত এবং তার পূর্বে দুর্গম পোতলক পর্বত বিদ্যমান। এই পর্বতের একটি শৈল গৃহতে বোধিসত্ব অবলোকিতেশ্বর নিবাস করতেন। পোতলক পর্বত হতে উত্তর পূর্বে সমুদ্র তীরে একটি সমৃদ্ধ নগর ছিল, এই নগর হতে সমুদ্র পথে সিংহল বাণিজ্য কর্ম চলত। (শুয়াং জাঙ ও প্রাচীন ভারত, পৃ. ২৯৮-৩০৫)।
সুয়াং জাঙ'এর যাত্রা বিবরণ তথা ভারত ভ্রমণ সম্পর্কিত তথ্য হতে (৬০০?-৬৬৪ খ্রীষ্টাব্দ) হতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে দক্ষিণা পথ অর্থাৎ দক্ষিণ ভারত সেই সময়কালেও বৌদ্ধ প্রভাবিত ছিল।
তাহলে এখন এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে দক্ষিণ ভারতে বিদ্যমান তিরুপতি বালাজী নামক হিন্দু মন্দির'টির প্রকৃত উৎস কি? এইটি কি কোন হিন্দু মন্দির নাকি মহাযান বৌদ্ধ উপাসনা ক্ষেত্র। কারণ মন্দিরের গঠন শৈলী কোনভাবেই হিন্দু মন্দিরের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়। এমনকি মন্দিরে স্থিত তথাকথিত বালাজী অর্থাৎ বিষ্ণু মুর্তিটি মূল অর্থে ভগবান তথাগত (মহাযান পরম্পরা)।
উত্তরকালীন তন্ত্রযান মতানুসারে ধান্যকটকে স্বয়ং তথাগত দ্বারা তৃতীয় ধর্মচক্র প্রবর্তন বজ্রযানের প্রশ্নে প্রদত্ত হয়েছিল। (সেকোদদেশ টীকা, পৃঃ ৩-৪: তৃতীয় ধর্মাচক্র প্রবর্তনের একটি ভিন্ন পরম্পরা-বু'তোন, খন্ড-২, পৃ: ৫১-৫২) এই তথ্য মত অনুসারে দক্ষিণাপথ মূল অর্থে মহাসাংঘিক সম্প্রদায়ের অন্ধ্রক (আন্ধ্রক) এবং বৈতুল্যক শাখার মূলকেন্দ্র ছিল। বৈতুল্যক মত কথাবত্থুতে উল্লেখ হওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে প্রায়ঃ এই সময়কালে (খ্রীষ্টিয় প্রথম শতাব্দী) বৌদ্ধধর্মে মূর্তি নির্মাণের উদ্ভব হয়।
হিউয়েন সাঙ (শুয়াং জাঙ) সহ অন্য চৈনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজকের বর্ণনায় তিরুপতি পাহাড়ে হিন্দু মন্দিরের কোনরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমন কি সাতবাহন রাজাদের ইতিহাসে ও এই হিন্দু মন্দির নির্মাণের কোন উল্লেখ বা বিবরণ ও প্রাপ্ত হয় না।
তিরুপতির ভেঙ্কটেশ্বরকে স্থানীয় ভাষায় তিরুপতি বালাজী নামে অভিহিত করা হয়। এই মন্দিরটি তিরুপতি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। মন্দির ক্ষেত্রটি দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রসিদ্ধ বিষ্ণু ক্ষেত্র রূপে পরিচিত। ভেঙ্কটেশ্বর'এর মূর্তিটিকে অনেকে মহাদেব (শিব), অনেকে স্কন্ধ বলে মনে করেন এবং অনেকে হরিহর ও মনে করেন। কিন্তু বৌদ্ধ ইতিহাস প্রমাণ করে এইটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ স্থল। সেখানে বিদ্যমান কালো পাথরের মূর্তিটিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ভেঙ্কটেশ্বর বা বিষ্ণু রূপে প্রচার করে চলেছেন, তা হল মূলতঃ বুদ্ধমূর্তি।
ব্রাহ্মণ্য আক্রমণের প্রভাবে যখন বৌদ্ধধর্ম অস্তমিত প্রায়, সেই সময় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এই বিহারটি দখল করে নেয় এবং বিহারটিকে ব্রাহ্মণীকরণ করার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধ মূর্তিটিকেও ব্রাহ্মণীকরণ করে নিয়েছিল। মূর্তিটিকে বিকৃত করে বিষ্ণু'র রূপ প্রদান করা হয়েছে।
ইতিহাসের প্রতি অবলোকন করলে দেখা যায় যে বৌদ্ধময় ভারতকে ধ্বংস করার মূলে ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের সত্যতা সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ পুস্তক ও রচিত হয়েছে। বিখ্যাত এই পুস্তকটির (তিরুপতি বালাজী ওয়াজ এ বুড্ডিষ্ট স্রাইন) রচয়িতা ইতিহাস গবেষক ড. কে. জমনাদাস। তাঁর লিখিত এই পুস্তকের বিরুদ্ধাচারণ করার সাহস কোন ব্রাহ্মণ্যবাদী আজও পর্যন্ত করতে পারেন নি।
বৌদ্ধ মহাপণ্ডিত, ঐতিহাসিক এবং গবেষক রাহুল সাংকৃত্যায়ন (১৮৯৩-১৯৬৩ খ্রীষ্টাব্দ)'এর মতে ভারতবর্ষে যতগুলি নাম যুক্ত মন্দির বা বিহার রয়েছে, সবই হল প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার বা বৌদ্ধ তীর্থ ক্ষেত্র। সেগুলির মধ্যে উল্লেখ্যনীয় হল কেদারনাথ, বদ্রীনাথ (উত্তরাখণ্ড), জগন্নাথ (উড়িষ্যা), সোমনাথ (গুজরাত), গোরক্ষনাথ (উত্তরপ্রদেশ), পশুপতিনাথ (নেপাল), আদিনাথ (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রমুখ।
অনেক ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে তিরুপতি বালাজী'র মন্দিরটির স্থাপনা কাল ৩'য় শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ)। দমিল রাজা খোন্ডাইমান এই মন্দিরের মূল ভিত্তি (প্রায় ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ) স্থাপন করেন। আবার অনেকের মতে পল্লবরাণী সামাবাই ৬৬০ খ্রীষ্টাব্দে মন্দিরের নির্মিত্তে ভূমি ও রত্ন দান করেছিলেন। ১৪-১৫ শতকে (রাজা কৃষ্ণদেব রায়) মন্দিরটির সংস্থার এবং উন্নতি বিধান সম্পন্ন হয়। উপরোক্ত তথ্যগুলিকে যদি সঠিক বলে মনে করা হয়। তাহলে এই প্রশ্ন আসে যে মূল মন্দিরটি ঠিক কোন সময়কালের? যদি ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ সময়কালকে ধরি।
তাহলে চৈনিক পর্যটকদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত (শুয়াং জাঙ প্রমুখ) তে এই মন্দিরের উল্লেখ অবশ্যই থাকত। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তার বিবরমে তিরুপতি বালাজীর উল্লেখ নেই। লামা তারনাথ'এর ভারত বিবরণে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ও পতনের ইতিহাস বিবৃত হলেও ভেঙ্কটেরশ্বর অর্থাৎ তিরুপতি মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে স্বাভাবিক রূপে মন্দিরটির স্থাপনাকাল অসঙ্গতিপূর্ণ।
অন্যদিকে বিষ্ণু বা ভেঙ্কটেশ্বর'এর মূর্তিটির নির্মাণ শৈল্য দাক্ষিণাত্যের হিন্দু মূর্তি নির্মাণরীতির (১০-১১ শতাব্দী) সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়। এল.এম. যোশীর মতে, '...শুধুমাত্র বৌদ্ধ পবিত্র স্থল এবং উপাসনালয়গুলিকে দখল করে হিন্দুতীর্থ ও দেবালয়'এ রূপান্তরিত করা হয় নি এবং এই অব্রাহ্মণীয় স্থান এবং পবিত্র স্থানগুলি দখলের বিষটিকে উদ্ভাবিত পৌরাণিক কাহিনী বা ছদ্ম ইতিহাস (পুরাণ) দ্বারা শক্তিশালী করা হয়েছিল, বরং বুদ্ধসহ বৌদ্ধ সংস্কৃতির সেরা উপাদান গুলিকেও আত্মসাৎ করা হয়েছিল....' (যোশী: ১৯৭৭: ৩৩৮)।
কুষাণ যুগের গান্ধার শিল্পকলা এবং মথুরা শিল্পকলা'র ইতিহাস ক্রমশঃ বিবর্তনের মাধ্যমে মহাযান ধর্মের আঙ্গিককে এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছিল। আর. ডি. ব্যানার্জীর মতে গান্ধার শিল্প ৫ শতাব্দী পর্যন্ত বিকশিত হয়েছিল এবং ক্রমশঃ তা ভারত তথা অন্য দেশের শিল্পকলাকে বিকশিত করেছিল। মধ্য এশিয়া হতে প্রাপ্ত ভারতীয় শিল্পকলার অবশেষ তথা কৃষ্ণা জেলার অমরাবতী অঞ্চল হতে প্রাপ্ত বৌদ্ধ অবশেষ গান্ধার শিল্পকলার দূরগামী প্রভাবের পরিচয়কে বহন করে।
গান্ধার শিল্পকলার মুখ্য বিষয় হল ভগবান বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বের মূর্তি। অশোকের ন্যায় কনিষ্ক বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সময়কালে মধ্যএশিয়া, উত্তর-দক্ষিণ এবং পশ্চিম ভারতে বহু সংখ্যক বুদ্ধ মূর্তি, পুরাতন বিহার সংস্কার ও নতুন বিহার নির্মিত হয়েছিল। পরিনাম স্বরূপ বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণের ফলে বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে এক নতুন ধারা শুরু হয়। কুষান যুগে বুদ্ধ দেবত্ববাদের রূপ ধারণ করে।
সৌরভ কর্মকার ও রাজুশর্মা (উপাসক) অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ড. কে. জমনাদাস প্রণীত মূল্যবান পুস্তকটির বঙ্গাক্ষরে অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। যদিও বিষয়টি সহজসাধ্য ছিল না। তার কারণ এখানে ব্যাখ্যা করা নিস্প্রোয়োজন। কেননা যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এখানে আলোচনার শব্দজাল প্রস্তুত করা হয়েছে সেই বিষয়টি এই স্থানে গৌণ হয়ে পড়বে।
এই পুস্তকে'র অনুবাদক সৌরভ কর্মকার ও রাজু শর্মা (উপাসক) অত্যন্ত ব্যবস্থিত রূপে বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করার পটভূমি নির্মাণ করেছেন। কেননা ইতিপূর্বে পুস্তকটির বঙ্গাক্ষরে অনুবাদ সম্পন্ন হয়নি বা হয়ে ওঠে নি। ভদন্ত সুমনপাল ভিক্ষু পুস্তকটি অনুবাদের মাধ্যমে তিরুপতি মন্দিরের প্রকৃত সত্য ইতিহাস পাঠকসমাজের সম্মুখে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করেছেন।
চিন্তন মননের ব্যাপকতা, বিবিধতা এবং মানব মেধার অতুলনীয় অভিব্যক্তি সর্বদাই চর্চার বিষয়। বৌদ্ধধর্ম এই চিন্তন ক্ষেত্রের একটি বিশিষ্ট প্রভাব রূপে পরিগণিত হয়েছে। কালান্তরে এই চিন্তন ক্ষেত্রটিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কিভাবে বিকৃতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছিল তার উজ্জ্বল উদ্ধারের একটি নমুনা এই পুস্তকের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়াস করা হয়েছে।
পুস্তকটি কৃশকায় হলেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি'ই হল বিতর্কিত। এই আলোচনাতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে দক্ষিণ ভারতের বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়গুলি ক্রমান্বয়ে উঠে এসেছে। ফলে কৌতূহলী পাঠকের নিকট অনেক অজানা ইতিহাস উন্মোচন হবে।
পরিশেষে একথাই বলা যায় যে সৌরভ কর্মকার ও রাজু শর্মা (উপাসক) যেভাবে পুস্তকটি উৎসাহী পাঠকসমাজের প্রয়োজনে প্রস্তুত করেছেন তা অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কারণ মূল্যায়নের বিষয়টি তবে এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কেননা জীবন ইচ্ছাশক্তি দাবী করে। গ্রন্থটি সংশোধন করে দিয়েছেন ড. সুমিত বড়ুয়া, ড. সুমন কুমার গাঁতাইত, বহু স্বনামধন্য লেখক রাহুল মজুমদার, তাঁদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। অলং ইতি বিত্থারেন।
No comments:
Post a Comment