Tuesday, February 10, 2026

শূন্যতা (Śūnyatā)

 

ভূমিকা

শূন্যতা (Śūnyatā) সম্পর্কিত বিতর্ক ঐতিহাসিকভাবে, বৌদ্ধ চিন্তায় "শূন্যতা" শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায় নিকায়  সূত্রগুলিতে (Nikāyas)— অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের প্রায় দুই শতাব্দী পরের গ্রন্থসমূহে। সেখানে এটি ব্যবহার হয়েছে বস্তুসমূহের অনিত্যতা এবং আত্মার অনুপস্থিতি (অনাত্মা) বোঝাতে। পরবর্তীকালে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে রচিত প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রগুলিতে (জ্ঞানপারমিতার উপদেশাবলী) এই ধারণা আরও প্রসারিত হয় এবং সকল জিনিসকেএমনকিধর্ম, অর্থাৎ অস্তিত্বের মৌল উপাদান, যেগুলিকে পূর্ববর্তী অভিধর্ম ঐতিহ্যে সত্য সারবত্তাময় হিসেবে ধরা হত- তাদেরওঅসারবাশূন্যবলা হয়।

এইশূন্যতাবিষয়ক উপদেশকে সবচেয়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন ভিক্ষু পণ্ডিত নাগার্জুন (১৫০-২৫০ খ্রিস্টাব্দ) তিনি পূর্বের প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রসমূহে থাকা শূন্যতার ধারণাগুলিকে একত্র করে রচনা করেন মূলমাধ্যমককারিকা (Mūlamādhyamakakārikās)যা "মধ্যপন্থার মূলসূত্র" নামে পরিচিত। এই গ্রন্থটি মাধ্যমিক দর্শনের মুখ্য ভিত্তি গঠনের পাশাপাশি নাগার্জুন তাঁর অনুগামীদের রচনার সামগ্রিক ধারার অংশ। মূলমাধ্যমককারিকায়, নাগার্জুন এক প্রকার যুক্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন যাকে বলা হয়প্রসঙ্গ’ (prasaṅga) বা যুক্তির মাধ্যমে বিপর্যস্ততা নির্দেশের কৌশল (reductio ad absurdum) এই পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি দেখান, যেকোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা ধারণা যা বাস্তবতাকে বর্ণনা করার দাবি করে, সেগুলির কোনো স্বতন্ত্র স্বভাবতন্ত্র নেইঅর্থাৎ সেগুলি অন্তঃস্থ সারবস্তু থেকে শূন্য (śūnya)—এবং এই কারণে, প্রকৃত অর্থে, তাদের অস্তিত্ব নেই। নাগার্জুনের এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত দুটি পূর্ববর্তী চিন্তাধারার প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়ার ফল: . অভিধর্ম বৌদ্ধধারার এবং তাদের 'ধর্ম' (মৌল অস্তিত্ব বা উপাদান)-এর সারবস্তুময় ব্যাখ্যার প্রত্যাখ্যান; . এবং প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রসমূহে প্রতিফলিত বোধ (জ্ঞান) অনুশীলনের প্রতি তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, যেখানে শূন্যতার উপলব্ধিকে আধ্যাত্মিক মুক্তির মূল পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাগার্জুনের প্রধান কৃতিত্ব কেবলমাত্র "শূন্যতা" গুরুত্বে জোর দেওয়াই নয়, বরং তিনি "শূন্যতা"কেপ্রতীত্যসমুত্পাদঅর্থাৎ পরস্পর নির্ভর উৎপত্তির সঙ্গে একাকার করে দেন। তিনি একে বুদ্ধের মৌলিক ধর্মোপদেশরূপে বিবেচনা করেন।

শূন্যতা বা শূন্যতার দর্শন আসলে শূন্যতার বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেমন রামানন তাঁরনাগার্জুনের দর্শনবইটিতে বলেন: “এই সম্পূর্ণ কাজটিকে বলা যেতে পারেমূল মৌলিক ধারণা শূন্যতার বিভিন্ন অর্থ উন্মোচনের একটি প্রয়াস।এই কারণে, গৌতম বুদ্ধের চার আর্যসত্যের শিক্ষার একটি অনুবর্তী সংযোজন হিসেবে নাগার্জুনের দর্শনের একটি সারাংশের মাধ্যমে শূন্যতার অর্থ গুরুত্ব অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে।

চার আর্যসত্যের ভিত্তিতে শূন্যতা বোঝাপড়াটি তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়অবিদ্যা (Ignorance), অন্তর্দৃষ্টি (Insight) এবং জ্ঞান (Knowledge)

প্রথম আর্যসত্য: দুঃখ আছে; জগৎ অনিত্য। আমাদের ভাষায়, এটি বোঝায়প্রচলিত বাস্তবতার মতে, সমস্ত সত্তাই স্বভাবত শূন্য; তারা নির্ধারিত আপেক্ষিক। কিন্তু আমরা যখন তাদের স্থায়ী স্বতঃসিদ্ধ মনে করি, তখনই দুঃখ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় আর্যসত্য: দুঃখের কারণ আছে। দুঃখের কারণ হল আপেক্ষিককে পরম হিসেবে আঁকড়ে ধরা, নির্ধারিতকে অনির্ধারিত ভেবে নেওয়া, অবস্তুতকে বাস্তব রূপে দেখা। প্রকৃত শূন্যতা (emptiness) বা সত্ত্বার শূন্য-প্রকৃতিকে না বোঝাএই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় বিভ্রান্তি এবং তার থেকেই আসে  সমস্ত দুঃখ।

তৃতীয় আর্যসত্য: দুঃখের অবসান সম্ভব। কারণ, শূন্যতাও শূন্য; আপেক্ষিকতা নির্ধারিততাও পরম নয়তাই দুঃখও চূড়ান্ত নয়। যদিও নির্ধারিত সত্তার প্রচলিত প্রকৃতি হল তার নির্ধারিততা, তথাপি তার পরম প্রকৃতি হলতা অনির্ধারিত সত্যের অংশ। যদিও পরম সত্য জগতের নির্ধারিত বিভাজনের বাইরে, তথাপি তা নির্ধারিত সত্তার থেকেও সম্পূর্ণভাবে আলাদা নয়বরং সেটিই নির্ধারিত সত্তার প্রকৃত স্বরূপ। আমরা অনির্ধারিত বাস্তবতার সঙ্গেই অভিন্নএই উপলব্ধির মাধ্যমেই আমরা মুক্ত হতে পারি, এবং যে বিভ্রান্তি ধরে রেখেছিলাম তার অবসান ঘটিয়ে দুঃখমোচন করতে পারি।

চতুর্থ আর্যসত্য: দুঃখ থেকে মুক্তির পথ আছে। এই পথ হল মধ্যমার্গএকটি অননির্বাচনবাদী পথ, যা আপেক্ষিকতাকে পরম বলে আঁকড়ে ধরার অজ্ঞানতা দূর করে। সমালোচনামূলক যুক্তির মাধ্যমে, চরমপন্থাগুলিকে সাংঘর্ষিক হিসেবে প্রমাণ করা হয়যার ফলস্বরূপ সমস্ত সত্তার শূন্যতা (śūnyatā) প্রকাশ পায়। পরিশেষে, এমনকি শূন্যতা বা আপেক্ষিকতাকেও যদি পরম মনে করি, তবে তা- বাতিল হয়কারণ পরম সত্য হল সেই অনির্বচনীয়, অনির্ধারিত বাস্তবতা যা আমাদের এবং সমস্ত সত্তার চূড়ান্ত স্বরূপ।

তারপর ভদন্ত আনন্দ ভগবান (Blessed One)—এর নিকটে গিয়ে, তাঁকে প্রণাম জানিয়ে, এক পাশে বসেন। বসে তিনি ভগবানকে জিজ্ঞেস করেন,

ভগবান, বলা হয়পৃথিবী শূন্য (empty), পৃথিবী শূন্য।কী অর্থে বলা হয় যে পৃথিবী শূন্য?”

ভগবান বলেন, “যেহেতু এতে আত্মা বা আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছুই নেই, সেই দিক থেকেই বলা হয়, আনন্দ (ভদন্ত), যে পৃথিবী শূন্য। এবং কী শূন্য আত্মা বা আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু থেকে? চোখ শূন্য আত্মা বা আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু থেকে। রূপ... চোখ-চেতনা... চোখ-স্পর্শ শূন্য আত্মা বা আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু থেকে।

"কান শূন্য... "নাক শূন্য... "জিহ্বা শূন্য... "দেহ শূন্য..."মন শূন্য আত্মা (self) বা আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু থেকে। ভাবনা... মন-চেতনা... মন-স্পর্শ শূন্য আত্মা বা আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু থেকে। এভাবেই বলা হয় যে পৃথিবী শূন্য।সুঞ্ঞ সুত্ত, সংযুক্ত নিকায় ৩৫.৮৫, মধ্যম নিকায় সংযুক্ত নিকায়- বুদ্ধ শূন্যতা (Śūnyatā) ব্যাখ্যা করেছেন। মহা শুন্নতা সূত্র (মধ্যম নিকায় ১২২)-তে বুদ্ধ ধ্যানের অভ্যন্তরীণ শূন্যতামূলক অবস্থান তৈরি, তা বজায় রাখা এবং বোধি বা জাগরণ পর্যন্ত তা এগিয়ে নেওয়ার সময়কার বিভিন্ন ব্যবহারিক বিষয়ে মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন।

শূন্যতা (emptiness) নিজেই কী, তা ব্যাখ্যা করতে হলে গ্রন্থের অন্যত্র দৃষ্টি দিতে হয়।শূন্যশব্দের অর্থ হলো অনাবৃত। শূন্যতার অনুভূতি বলতে সাধারণভাবে আমরা একঘেয়েমি বা বিষণ্ণতা বুঝি। কিন্তু বৌদ্ধ দর্শনে এই শব্দের অর্থ অনেক গভীর এবং অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। বুদ্ধ তাঁর বহু ধর্মদেশনায় শূন্য শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং মজ্ঝিম নিকায়ে একটি নির্দিষ্ট সূত্রও রয়েছে যার নাম "চূলশূন্যতা সূত্র", যেখানে বুদ্ধ তাঁর শূন্যতা সম্পর্কিত ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন। এই সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন যে তিনি শূন্যতায় অবস্থান করেন। প্রশ্ন হলো- বুদ্ধ কি নির্বাণেকে শূন্যতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন? অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন, হয়তো তিনি তাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ বুদ্ধ যে শূন্যতার কথা বলেছেন, তা মূলত জগত জীবনের আত্মা এবং সারসত্ত্বার অভাবের ইঙ্গিত বহন করে। বুদ্ধ নির্বাণের চূড়ান্ত পর্যায়কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন সামঞ্ঞফল সূত্রে (দীঘ নিকায়ে), এবং সেখানে তিনি নির্বাণকে শূন্যতার সঙ্গে তুলনা বা এমনকি উল্লেখও করেননি। অপরদিকে চূলশূন্যতা সূত্রে বুদ্ধ যে শূন্যতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা হলো জীবনের অসারতা- যে সবকিছুই সংসর্গজাত কারণ পরিণামের দ্বারা গঠিত এবং তাই স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সত্তা থাকতে পারেনা। এই সূত্রে বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের উপদেশ দেন যেন তারা মানুষ সমাজের দিকে নয়, বরং প্রথমে বনভূমির দিকে এবং তারপর পৃথিবীর দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে। কারণ মানুষ সমাজ ইন্দ্রিয়ভোগে পূর্ণ, কিন্তু বনভূমি পৃথিবী তেমন নয়। বুদ্ধ চান যে ভিক্ষুরা এমন বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিক, যা স্ব-হীন এবং সারশূন্য, যা তাদেরকেঅকলুষিত বিশুদ্ধ শূন্যতার দিকে অবগমন হতেসাহায্য করবে। বুদ্ধ চূলশূন্যতা সূত্রে কোথাও নির্বাণের উল্লেখ করেননি, একইভাবে তিনি সামঞ্ঞফল সূত্রে শূন্যতার উল্লেখ করেননি, যেখানে শুধু নির্বাণের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে।শূন্যশব্দটির উল্লেখ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থেও পাওয়া যায়, যেমন- মহাশূন্যতা সূত্র (মজ্ঝিম নিকায়ে), সুত্তনিপাত, এবং কাচ্চায়নগোত্ত সূত্র (সংযুক্ত নিকায়ে) এই সূত্রগুলোতেও বুদ্ধশূন্যশব্দটি ব্যবহার করেছেন মূলত বস্তুগত জগতের অস্থায়িত্ব বোঝানোর জন্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সকল ব্যাখ্যা বা সূত্রের মধ্যে কোথাও নির্বাণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। একইভাবে "শূন্য" শব্দটির সূত্রপিটকে নির্বাণের বর্ণনা বা ব্যাখ্যার কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

বৈদিক সাহিত্যেশূন্যতাশব্দটি বুদ্ধ প্রদত্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, কিংবা মহাযান যেভাবে পরবর্তীকালে তা তত্ত্বায়িত করেছে, তাও সেখানে অনুপস্থিত। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূত্রে সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়ে একটি কবিতা রয়েছে, যা আমরা পূর্বে একাদশ অধ্যায়ে (সৃষ্টি বিষয়ক অধ্যায়ে) উল্লেখ করেছি। সেখানে বলা হয়েছে- প্রারম্ভে ছিল না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্ব; ছিল না সূর্য, ছিল না চন্দ্র। প্রকৃতপক্ষে এর অর্থ হতে পারে যে, শুরুতে কিছুই ছিল না। এই একটিমাত্র উল্লেখ ছাড়া বেদে অস্তিত্বসংক্রান্ত শূন্যতার তত্ত্ব নিয়ে কোনো গভীর ধারণা প্রকাশ পায়নি।

তবে পশ্চিমী দার্শনিকরা, বিশেষ করে যোগাচার এবং মধ্যমক দর্শনের ব্যক্তিগণ "শূন্যতা" ধারণা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে প্রাচ্যের দার্শনিকগণ যেমন চতুর্থ শতকে আসঙ্গ প্রমুখ শূন্যতার ধারণা বিকাশ করেছিলেন, তার বহু শতাব্দী পরে উনবিংশ শতকে পশ্চিমী দার্শনিক যেমন ফ্রেডরিক নিটশে এবং মার্টিন হাইডেগার এই ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নৈরাশ্যবাদ, সত্তা এবং অস্তিত্ব সম্পর্কিত তাঁদের নিজস্ব তত্ত্ব গড়ে তোলেন।

নাগার্জুনওশূন্যশব্দটি বুদ্ধের সমার্থে ব্যবহার করেছিলেন। নাগার্জুনের সময়, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে, সর্বাস্তিবাদ নামক বৌদ্ধ সম্প্রদায় তাদের দর্শনে বাস্তববাদী ধারণা গ্রহণ করেছিল। তাঁরাস্বভাবধারণা প্রবর্তন করেন, যা হলোসকল ধর্মের মধ্যে একটি চিরন্তন সত্তা বিদ্যমান। এটি ছিল বৌদ্ধবাদের বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তর হিসেবে গঠিত একটি মতবাদ। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিলযদি ধর্মগুলির মধ্যে কোনো আত্মা বা মৌলিক সত্তা না থাকে, তবে কর্মের জন্য দায়ী হয় কে এবং পুনর্জন্ম লাভ করে কে?

সৌত্রান্তিক বৌদ্ধ সম্প্রদায় "স্বভাব" ধারণার বিপরীতে তাদের নৈরাশ্যবাদী মতবাদ উপস্থাপন করেছিল। তাদের মতে ধর্মসমূহের উদয় বিলুপ্তির মাঝে অস্তিত্বের কোনো পর্যায় নেই। ধর্ম জন্ম নেয় এবং অতি দ্রুত বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু কোনো কালে টিকে থাকে না। এই ধারণাকে নৈরাশ্যবাদী বলা হয়েছে। নাগার্জুন তাঁর মূলমাধ্যমিককারিকা গ্রন্থে এই তত্ত্বগুলিকে খণ্ডন করার পাশাপাশি আরও নানা মতবাদের বিরোধিতা করেছেন। এই প্রসঙ্গগুলো বিস্তারিতভাবে ২৫তম অধ্যায়ে আলোচিত হবে।

নাগার্জুন তাঁর "মূলমাধ্যমিককারিকা" উপসংহারী শ্লোকে এবং "কাচ্ছায়নগোত্ত সূত্র"-এর (যেখানে প্রতীত্যসমুত্পাদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে) উল্লেখ করে স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে তাঁর সমগ্র তত্ত্বের ভিত্তি হচ্ছে প্রতীত্যসমুত্পাদ। এই সূত্রে মধ্যমার্গের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, যেখানে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের চরমপন্থা এড়িয়ে "প্রতীত্যসমুত্পাদ"-এর ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

মহাযান ধর্মতত্ত্ব, বিশেষত শূন্যবাদীদের দর্শনের একটি বিশ্লেষণ, যা যোগাচার দর্শনের থেকে ভিন্ন। "শূন্যতা", "অশরীরতা", এবং "পরম শূন্যতা" — এই পরিভাষাগুলির বহুল ব্যবহারের উপরই নাগার্জুনের দার্শনিক কাজ বিশ্বদৃষ্টির ভিত্তি গঠিত।

শূন্যতা দর্শনের একটি মতবাদ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মের মূল কেন্দ্রে অবস্থান করে। এটি বুদ্ধদেব প্রদত্ত তৃতীয় আর্যসত্যদুঃখের নিরোধ বা দুঃখ-নাশের আর্যসত্যের মূলে নিহিত। অতীন্দ্রিয় প্রজ্ঞায় সূন্যতার বোধ আমাদের সমস্ত জাগতিক ঘটনাকে প্রত্যতিৎসমুৎপাদ বা পারস্পরিক নির্ভরতাভিত্তিক উৎপত্তির আলোকে দেখতে সহায়তা করে, যেখানে প্রতিটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, এবং যা কোনো ধরণের গোঁড়ামি বা কঠোর মতবাদ গড়ে তোলার সুযোগ দেয় নাএমন মতবাদ যা অবশেষে আসক্তি দুঃখের জন্ম দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সূন্যতা মতবাদটি বুদ্ধের মধ্যমপথ (মধ্যম প্রতিপদ)-এর শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেটি নাগার্জুনের মূলমাধ্যমককারিকা- নিম্নোক্ত শ্লোক দ্বারা সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত:

'যঃ প্রত্যিত্যসমুৎপাদঃ শূন্যতাং তাং প্রচক্ষ্মহে

সা প্রজ্ঞপ্তিরুপাদায় প্রতিপৎ সৈব মধ্যমা'

(আমরা বলি যে যেটি প্রত্যিত্যসমুৎপন্ন, সেটিই শূন্যতা।

সেটিই নির্ধারিত হয় পারস্পরিক অভিযোজন দ্বারা। সেটিই হলো মধ্যমার্গ।

শূন্যতার মতবাদটি নাগার্জুন বা কোনো মাধ্যমিক দার্শনিকের সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্ভাবনা নয়। প্রকৃতপক্ষে, পালি সূত্রসমূহে 'শূন্যতা (Suññatā)' সম্পর্কে বহু উল্লেখ এবং ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা এই তত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয় যে বুদ্ধ স্বয়ং বিভিন্ন প্রসঙ্গে শূন্যতার মতবাদ প্রচার করেছিলেন, যদিও ইংরেজিতে ‘Emptiness’ হিসেবে অনুবাদটি অনেক সময়েই পর্যাপ্ত নয়। তবু, আচার্য নাগার্জুন সহ মাধ্যমিক দার্শনিকদেরই প্রকৃত কৃতিত্ব প্রাপ্য, যাঁরা সূন্যতা বিষয়ে একটি সুসংবদ্ধ সুসংহত দার্শনিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন। নাগার্জুন-পূর্ব যুগে শূন্যতার তত্ত্বটি সহজেই ভুলভাবে শুধুইঅস্তিত্বহীনতাবানৈরাশ্যবাদহিসেবে চিহ্নিত হতোযা কোনো অমনোযোগী সমালোচক বা অপরিপক্ক ব্যাখ্যাকারীর পক্ষে সহজ ছিল। তত্ত্বটি নিজে নাস্তিক্যবাদী ছিল না, বরং এটিকে দার্শনিক দৃঢ়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করার জন্য তখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এই প্রেক্ষিতে নাগার্জুনের শূন্যতা মতবাদ গঠনের ভূমিকা নিম্নরূপভাবে উপস্থাপন করা যায়:

. শূন্যতা তত্ত্বকে নাস্তিক্যবাদ হিসেবে অপপ্রচারের সকল প্রচেষ্টাকে চূড়ান্তভাবে খণ্ডন করা।

. একটি উৎকৃষ্ট, অদ্বৈততাভিত্তিক দার্শনিক ব্যবস্থা নির্মাণ করা, যা আজও যুক্তিসংগত ভাবনার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

. জাগতিক পরম বাস্তবতার মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করাএমনভাবে যাতে পরম সত্য বা নির্বাণের অতীন্দ্রিয় বৈশিষ্ট্যকে ব্যাহত না করে এবং চিন্তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

. শূন্যতা, প্রত্যিত্যসমুৎপাদ এবং মধ্যমার্গএই তিনটি বিষয়ের সমার্থকতা প্রতিষ্ঠা করা, যা পূর্ববর্তী দর্শনশাস্ত্রগুলোর (যেমন সর্বাস্তিবাদীদের) কাছে ছিল জটিল এবং অসংগঠিত।

. বাস্তবতার একটি স্তরবিন্যাস সংজ্ঞায়িত করা, যার প্রতিফলন আমরা শঙ্করাচার্যের তত্ত্বেও খুঁজে পাই।

 

 

 

. তিলকরত্নে (২০০১)- মতে নাগার্জুন তাঁর "কারিকা"-য় ইঙ্গিত করেছেন যে মধ্যমার্গ, প্রতীত্যসমুত্পাদ এবং শূন্যতা- এই তিনটি বিষয় একই সত্যকে নির্দেশ করে। নাগার্জুন বলেন, যেভাবে সমস্ত ধর্ম প্রতীত্যসমুত্পন্ন (অনুসঙ্গে উদ্ভূত), সেভাবেই তারা শূন্য।

তবে কিছু চিন্তাবিদ (যেমন- টি.আর.ভি. মূর্তি, ১৯৫৫) মনে করেন, নাগার্জুনের শূন্যতা হচ্ছে এক প্রকার অতীন্দ্রিয় সত্য। তাদের মতে চূড়ান্ত বাস্তবতা হলো শূন্যতা এবং শূন্যতা নিজে বাস্তবতার এক অংশ। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ সঠিক নয় তার কারণ, নাগার্জুন শূন্যতাকে নতুন কোনো মতবাদ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাননি; বরং তিনি এটিকে ব্যবহার করেছিলেন সকল মতকে খণ্ডন করার এক মাধ্যম হিসেবে। কালুপাহানা (২০০৮)- মতে, নাগার্জুনের শূন্যতা তত্ত্ব বাস্তবতায় নতুনরূপে কোনো সংযোজন আনেনি। ভদন্ত নাগার্জুন নিজেই "কারিকা"-তে বলেছেন যে, কেউ যদি শূন্যতাকে আলাদা কোনো মতবাদ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, তবে সে অনারোগ্য রোগে আক্রান্ত।

ডি. জে. কালুপাহানা (২০০৮) মনে করেন যে নাগার্জুনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধধর্মে প্রবেশ করা বাস্তববাদী নৈরাশ্যবাদী মতসমূহের ত্রুটিপূর্ণতা প্রমাণ করা, এবং একইসঙ্গে অন্য যেসকল মত বুদ্ধের ধর্মদেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলোকেও খণ্ডন করা।

চূলশূন্যতা সূত্রে (মজ্ঝিম নিকায়ে) বুদ্ধ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবেঅকলুষিত বিশুদ্ধ শূন্যতার দিকে অবগমনকরতে হয়, এবং তিনি এটিও বলেছেন যে তিনিশূন্যতায় অবস্থান করেন।কিন্তু নাগার্জুন শূন্যতাকে এমন একটি অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি, যেখানে কেউ অবগমন করতে পারে বা অবস্থান করতে পারে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে- তাহলে কি তাঁরা একই বিষয়ে কথা বলেছেন? তবে যদি ধরা হয় বুদ্ধেরঅবগমনঅবস্থানকথাগুলি ভিক্ষুদের প্রতি মধ্যমার্গ অবলম্বনের উপদেশ মাত্র, এবং যদি মধ্যমার্গ শূন্যতার সমার্থক হয় যেমনটি নাগার্জুন বলেছেন, তবে "চূলশূন্যতা সূত্র"- বুদ্ধের বক্তব্য "কারিকা"-য় নাগার্জুনের বক্তব্যের মধ্যে কোনোরকম তারতম্য নেই। নাগার্জুন কেবল বুদ্ধের উক্ত ধারণাটিকে বিশদভাবে ব্যক্ত করেছেন মাত্র।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নাগার্জুনের শূন্যতা সম্পর্কিত ধারণাগুলি ক্রমে এক স্বতন্ত্র বৌদ্ধ দর্শনধারার রূপ নিয়েছিল- মাধ্যমিক সম্প্রদায়, যা প্রথমে দক্ষিণ ভারতে প্রসারিত হয়, পরে চীন তিব্বতে বিস্তার লাভ করে। . তিলকরত্নে (২০০১) এই বিদ্যালয়ের বিকাশের চারটি ধাপ নির্দিষ্ট করেছেন। এই ধাপগুলি হলো- ) নাগার্জুন (খ্রিস্টীয় ১ম২য় শতক) তাঁর নিকট শিষ্যরা "শূন্যতাবাদ" সম্পর্কিত প্রাথমিক গ্রন্থসমূহ রচনা করেন, ) দুজন ভিক্ষু- বুদ্ধপালিত (৫ম৬ষ্ঠ শতক) ভাববিবেক (৬ষ্ঠ শতক) "কারিকা"- ওপর টীকা রচনা করেন, ) ভদন্ত চন্দ্রকীর্তি (৭ম শতক) "প্রসন্নপাদ" রচনা করেন এবং বুদ্ধপালিতের মতাদর্শকে সমর্থন করেন, ) ভিক্ষুদ্বয় শান্তরক্ষিত এবং কমলশীল, মাধ্যমিক যোগাচার দর্শনকে একত্রিত করার অভিপ্রায়ে নতুন ধারণা বিকাশের কাজ শুরু করেন।

ভদন্ত নাগার্জুনের দুই শিষ্য, যাঁরা তাঁর গ্রন্থসমূহের ভিত্তিমূলক ব্যাখ্যা রচনা করেছিলেন, তাঁরা হলেন ভদন্ত আর্যদেব ভদন্ত নাগবোধি। ভদন্ত আর্যদেব বোধিসত্ত্ব তত্ত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর প্রধান গ্রন্থ চতুঃশতক- যেখানে তিনি সমকালীন দর্শনপ্রণালীর নানা মত যেমন- সাংখ্য, বৈশেষিক, জৈন ঈশ্বরবাদ- প্রতিপাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলিকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছিলেন। অপর শিষ্য নাগবোধিও প্রজ্ঞাপারমিতার ওপর ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং মধ্যমক দর্শন প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রসমূহের মধ্যে একটি সংযোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন, যা মূলত মহাযান গ্রন্থ।

মধ্যমক দর্শনের বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে বুদ্ধপালিত (৪৭০৫৪০ খ্রি.) এবং ভাববিবেক (৫০০৫৭০ খ্রি.)- তাঁদের রচিত ব্যাখ্যাগুলি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বুদ্ধপালিত "কারিকা"- বিরুদ্ধে তোলা সমালোচনাগুলিকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন এবং মধ্যমক দর্শনধারার "প্রাসঙ্গিক" সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। অপরদিকে ভাববিবেক আরেকটি সম্প্রদায় গড়ে তোলেন, যাকে বলা হয় "স্বাতন্ত্রিক" তিনিও "কারিকা"- ওপর ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাঁর মতে, বুদ্ধপালিতের "প্রাসঙ্গিক" পদ্ধতি যথেষ্ট নয়, কারণ কেবল অন্যের মতাদর্শ খণ্ডন করাই যথেষ্ট নয়। "কারিকা"-কে দৃঢ় করতে হলে তাঁর নিজস্ব মতাদর্শও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। এজন্য তিনি দিগনাগ ধর্মকীর্তির (দর্শনশাস্ত্রের ২৬তম অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত) মতো চিন্তাবিদদের দ্বারা বিকশিত যুক্তির পদ্ধতি গ্রহণ করেন।

মধ্যমক দর্শনের বিকাশের তৃতীয় পর্যায়ে ভদন্ত চন্দ্রকীর্তির বিখ্যাত ব্যাখ্যা "প্রসন্নপাদ" রচিত হয়, যা ভদন্ত বুদ্ধপালিতের "প্রাসঙ্গিক" পদ্ধতিকে সমর্থন করে। এই ব্যাখ্যার মধ্যে "কারিকা"- প্রথম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটির উপর বিস্তৃত আলোচনা অন্তর্ভুক্ত আছে, যেখানে বলা হয়েছে, “আসলে কোথাও এমন কোনো সত্তা প্রতীয়মান নয়, যা নিজের থেকে, অন্যের থেকে, উভয়ের থেকে, অথবা কারণ ব্যতীত উদ্ভূত হয়েছে।

এই দীর্ঘ বিশ্লেষণে চন্দ্রকীর্তি ভাববিবেকের "স্বাতন্ত্রিক" পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। আরও তিনি স্পষ্টভাবে বুদ্ধপালিতের "প্রাসঙ্গিক" পদ্ধতিকেই "কারিকা"- যথার্থ মূল্যায়নের সেরা পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করেন। "প্রাসঙ্গিক" মতবাদ পরবর্তীতে তিব্বত মঙ্গোলিয়ায় মধ্যমক দর্শনধারার একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল (. তিলকরত্নে, ২০০১)

ভারতের বাইরে মধ্যমক দর্শনের বিকাশ প্রধানত চীন তিব্বতে ঘটে। ভদন্ত কুমারজীব এই দুই দেশে মধ্যমক দর্শন প্রচারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

এই আলোচনাগুলির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক প্রশ্ন হলো- ভদন্ত নাগার্জুনের উদ্দেশ্য কি ছিল শূন্যতার ধারণাকে কেন্দ্র করে একেবারে নতুন কোনো দর্শনধারা প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মে উল্লিখিত ছিল? উপরোক্ত চিন্তক দার্শনিকরা, যারা নতুন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটিয়েছেন, তাঁরা কি সঠিক কাজ করেছেন? তাঁদের পদক্ষেপ কি ন্যায়সঙ্গত? -এই প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে "মূলমধ্যমিককারিকা" আসলে কোনো নতুন দর্শন প্রচার করেছে কিনা। গ্রন্থের ২৭টি অধ্যায়ে প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মের মৌলিক মতবাদগুলো যেমন- প্রতীতি, স্কন্ধ, ধাতু ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। . তিলকরত্নে (২০০১) এর মতে, এই ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণের মধ্যে কোনো আন্তঃসম্পর্ক নেই এবং নতুন দর্শন গঠনের উদ্দেশ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট এবং সুসংহত তত্ত্বও উপস্থাপন করা হয়নি। তবে ডি. জে. কালুপাহানা (২০০৮) মনে করেন যে বিভিন্ন অধ্যায়ের আলোচনার মধ্যে কিছুটা ধারাবাহিকতা আছে, যদিওবা তিনিও মনে করেন নাগার্জুনের উদ্দেশ্য ছিল না এত গভীরভাবে নতুন কোনো দর্শন গঠন করা, যা থেকে একটি পৃথক বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

যা একেবারে স্পষ্ট তা হলো- নাগার্জুন "কারিকা"-তে বৌদ্ধধর্মে প্রবেশ করা চরমপন্থী বাস্তবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি- উভয়ই শাশ্বতবাদী নৈরাশ্যবাদী- খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন। এই ভ্রান্ত মতবাদগুলি মূলত পুদ্গলবাদ, সর্বাস্তিবাদ এবং সৌত্রান্তিক প্রভৃতি বিভিন্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কার্যকলাপের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মে প্রবেশ করেছিল। তিনি এই মতবাদসমূহে অবস্থিত অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেন এবং দেখান যে, তাদের যুক্তিগুলি মূলত অসার বা শূন্য। একইসঙ্গে তিনিচতুষ্কোটীবা চারটি কোণ বিশিষ্ট যুক্তিকে খণ্ডন করেন, যা সেই সময়ের অনেক বাস্তববাদী দার্শনিকেরা তাদের তত্ত্বকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার করতেন। তাঁর মূল বক্তব্য হলো- কোনো মতবাদ বা দর্শনের সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ হওয়া উচিত নয়, যা মূলত শূন্য এবং নিজস্ব সারসত্ত্বা থেকে বঞ্চিত। ব্রহ্মজাল সূত্রে (দীঘ নিকায়) বুদ্ধ স্পষ্ট করেছেন- বিভিন্ন মতবাদে আসক্তি নির্বাণের পথে গুরুতর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

কালুপাহানা (২০০৮) বলেন, “কারিকা প্রথম কুড়িটি শ্লোক নাগার্জুনের প্রতিপক্ষের সমালোচনা এবং বিশেষভাবে শূন্যতা সম্পর্কিত তার দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে লেখা। বাকি প্রায় ৪৮০টি শ্লোক প্রতিপক্ষের যুক্তিকে উল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে গঠিত। কালুপাহানার মতে, এই খণ্ডনের ফলস্বরূপ যে দর্শন উন্মোচিত হয়, তা হলোপ্রতীত্যসমুত্পাদভিত্তিক বুদ্ধের শূন্যতার ধারণা।

কালুপাহানা আরও মনে করেন যে, চন্দ্রকীর্তি "কারিকা"য় নাগার্জুনের মূল উদ্দেশ্যকে বিকৃত করেছিলেন এবং তিনি নাগার্জুনকে এক ধরনের মহাযান দার্শনিক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। চন্দ্রকীর্তি তাঁরপ্রসন্নপাদভাষ্যে দাবি করেন যে, নাগার্জুন বলেছেন- “প্রতীত্যসমুত্পাদনিজেই শূন্য। এর ফলে তিনি এমন একটি ধারণাকে সমর্থন করেন, যেটির আদিভিত্তি নাগার্জুনের ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের রচনায় নিহিত- যে সবকিছুই শূন্য, এমনকি চেতনও কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রাখে না।

কিন্তু "কারিকা"য় নাগার্জুনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুদ্ধের শিক্ষাকে শাশ্বতবাদী নৈরাশ্যবাদী মতবাদগুলির বিকৃতি থেকে মুক্ত করা। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, সমস্ত মতবাদ, এমনকি বুদ্ধের নিজস্ব ধারণাগুলিও যেমনপ্রতীত্যসমুত্পাদএবংনির্বাণ”- শূন্য, অর্থাৎ এমন কোনো স্বরূপ নেই যা তাদের প্রতি অহংবোধপূর্ণ আসক্তিকে সমর্থন করতে পারে। চন্দ্রকীর্তি এবং অন্যান্যরা তাঁর দর্শনের ত্রুটিমূলক ব্যাখ্যা করেন এবং যুক্তিগুলোকে এমনভাবে বিকৃত করেন যে, মনে হয় নাগার্জুন নির্বাণকে শূন্যতার সমতুল্য বলে দাবি করেছেন।

যোগাচার সম্প্রদায় মধ্যমক দর্শনতত্ত্বকে নৈরাশ্যবাদ বলে সমালোচনা করেছিল। যোগাচার দর্শন একটি ভাববাদী দর্শন, যা দাবি করে যে সবকিছুই চেতনে বিদ্যমান। কিন্তু মধ্যমক দর্শন সেই সীমারও বাইরে গিয়ে ঘোষণা করে যে এমনকি চেতনও বিদ্যমান নয়। তবে নাগার্জুন নিজে হয়তো কথাটি বোঝাতে চাননি। তাঁর শিষ্যরা এবং পরবর্তী দার্শনিকরা, যেমন বুদ্ধপালিত এবং চন্দ্রকীর্তি, তাঁর তত্ত্বকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে সেটির ওপর ভিত্তি করে বৌদ্ধ দর্শনের একটি স্বতন্ত্র শাখার জন্ম হয়।

যোগাচারদের শূন্যতা সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। যোগাচার দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা অসঙ্গ, তাঁর "অভিধর্মসমুচ্চয়" গ্রন্থে শূন্যতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন- শূন্যতা হলো আত্মার অনস্তিত্ব এবং অনাত্মার অস্তিত্ব। দ্বৈততার অনস্তিত্বই হলো অনস্তিত্বের অস্তিত্ব, এটাই শূন্যতার সংজ্ঞা। এটি না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্ব; না ভিন্ন, না অভিন্ন।

পুদগলবাদী ব্যতীত প্রারম্ভিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলি (যেমন, মহাসাংঘিক এবং স্থবির সম্প্রদায়) মনে করত যে সকল ধর্মই শূন্য। সর্বাস্তিবাদীদের শূন্যতার ধারণা "প্রতীত্যসমুত্পাদ" ভিত্তিক। আদি থেরবাদ অভিধর্ম গ্রন্থ "পটিসম্ভিদামগ্গ" পাঁচটি উপাদানের শূন্যতা নিয়ে আলোচনা করে। মহাযান দর্শনের প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রগুলিও ঘোষণা করে যে সকল সত্ত্বা, এমনকি ধর্মও আত্মশূন্য। মোগ্গলীপুত্ততিস্স কর্তৃক রচিত এবং ত্রিপিটকে অন্তর্ভুক্ত কথাবত্থু গ্রন্থে এই ধারণার বিপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, শূন্যতা কোনো শর্তসাপেক্ষে ধারণা নয়।

প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শূন্যতা সম্পর্কে মূলত দুটি মত প্রচলিত রয়েছে। একদিকে বলা হয়েছে- শূন্যতার অর্থ হলো আত্মা বা কোনো স্থায়ী সত্ত্বার অনুপস্থিতি, যা সকল ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অপরদিকে, আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গিটি হলো- শূন্যতা একটি পরম সত্য, যা নির্বাণের সমতুল্য হতে পারে। প্রথম মতটি ধারণ করেছেন থেরবাদী তাঁদের ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠীসমূহ। অপরদিকে মধ্যমক শাখার মতে দ্বিতীয় ধারণাটিই সঠিক। চীন তিব্বতে বৌদ্ধ দর্শনের মৌলিক এবং সর্বব্যাপী যে দর্শনধারা দেখা যায়, সেটি আসলে নাগার্জুনের শিষ্যদের দ্বারা সূচিতশূন্যতাবাদ”, যা পরবর্তীতে বুদ্ধপালিত চন্দ্রকীর্তির মতো ভিক্ষুদের হাতে এক বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক দর্শনে পরিণত হয়। এই বিভাজন বর্তমান সময় পর্যন্তও স্থায়ী রয়েছে। যেমন, যে দেশগুলোতে থেরবাদ প্রচলিত (মূলত শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার কম্বোডিয়া) সেখানে প্রথম ধারণাটি দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান, অন্যদিকে চীনে যোগাচার মধ্যমক দর্শনের এক সংমিশ্রণকে চর্চা করা হয়। তিব্বতে আবার আরও নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে তা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বা তন্ত্রযানে রূপান্তরিত হয়েছে। চীন তিব্বতের ধর্মদর্শনেশূন্যতাবাদ”-এর প্রভাব প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়।

 

No comments:

Post a Comment