সুমিত বড়ুয়া
বাংলা বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রবারণা পূর্ণিমা ১৪৩২
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের শেষভাগে কাশ্যপ মাতঙ্গ প্রমুখের দ্বারা বৌদ্ধধর্ম চীনদেশে প্রথম প্রচারিত হয়ে প্রায় একশো বছরের মধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের শেষভাগে বৌদ্ধশাস্ত্রগুলির চৈনিক অনুবাদ-কার্য সূচিত হয়ে তা প্রায় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত চলে। ফলে থেরবাদের পালি সাহিত্য ব্যতীত এই ধারার অন্তর্গত সর্বাস্তিবাদ, মূলসর্বাস্তিবাদ, মহাসাংঘিক, মহীশাসক, কাশ্যপীয়, ধর্মগুপ্ত, হৈমবত প্রভৃতি ও মহাযান ধারার অন্তর্গত মাধ্যমিক, যোগাচার, বিজ্ঞানবাদ, বজ্রযান প্রভৃতি সমস্ত সম্প্রদায়ের বৌদ্ধশাস্ত্রই চৈনিক অনুবাদে সংরক্ষিত হয়েছে। সেই কারণে চৈনিক বৌদ্ধসাহিত্য থেকে আমরা প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের পরবর্তী পর্যায়ের যে ব্যাপক পরিচয় পাই তা অন্য কোনো দেশের বৌদ্ধসাহিত্য থেকে পাই না।
সুমনপাল ভিক্ষুর ‘চীনে বৌদ্ধধর্ম’ গ্রন্থটির সমৃদ্ধ সূচিপত্রের দিকে দৃষ্টি দিলেই বিষয়মাহাত্ম্য সম্পর্কে আঁচ করা সম্ভব। উপসংহার-সহ পাঁচটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত তথ্য ও বিশ্লেষণনির্ভর এই গ্রন্থে গ্রন্থকারের অধ্যবসায়ের চিহ্ন সর্বত্র স্বতঃপ্রকাশিত হয়েছে। চীনে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তন; চীনদেশে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ; চৈনিক বৌদ্ধ সাহিত্য ও শিল্প; চীনে ভারতীয় বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা এবং ভারতবর্ষের চৈনিক বৌদ্ধপণ্ডিত ও তীর্থযাত্রীগণ বিশেষত শুয়াং-জাঙ্ মূল আলোচনার বিষয় হলেও সাতটি পরিশিষ্ট সম্বলিত বৌদ্ধ ইতিহাসের কালপঞ্জী; চৈনিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়; চৈনিক বৌদ্ধদের উৎসবের দিন; চীনের বিখ্যাত বৌদ্ধবিহারসমূহ; চীনে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার; চৈনিক বৌদ্ধধর্ম সম্প্রদায়: একটি আলোচনা ও চীনের বৌদ্ধধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়, দেবদেবী এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত তথ্য সংকলনের গুরুত্ব বিদ্যোৎসাহীমাত্রেই স্বীকার করবেন।
‘চীনে বৌদ্ধধর্ম’ গ্রন্থটিতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের পূর্ববর্তী চীন ও বৌদ্ধসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ পরবর্তী চীনের তুলনামূলক চিত্রও চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। কুমারজীব, পরমার্থ, বোধিধর্ম, বজ্রবোধি, অমোঘবজ্র প্রমুখ ভারতীয় বৌদ্ধাচার্যেরা চীনকে কীভাবে বৌদ্ধধর্মের আলোয় দীক্ষিত করে তুলেছেন তার মূল্যবান আলোচনা গ্রন্থে রয়েছে। ভারতীয় বৌদ্ধপণ্ডিতেরা এবং ভারতবর্ষে আসা চৈনিক বৌদ্ধপণ্ডিত ও তীর্থযাত্রীদের ভাব বিনিময়ের মধ্যে দিয়েই চীনের সংস্কৃতির সর্বোচ্চ উন্মেষ ঘটেছে—গ্রন্থকার তা যুক্তিযুক্তভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। গ্রন্থে চীনে বৌদ্ধধর্মের বিস্তার সংক্রান্ত নানা কিংবদন্তি, কনফুসিওবাদ ও তাওবাদের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের মতবাদের তুলনামূলক আলোচনা অত্যন্ত মনোগ্রাহী রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। হান রাজবংশের অবনতি ও পতনের পরে কনফুসিয়বাদ রাষ্ট্রকাঠামোকে ধরে রাখতে পারিনি। চীনের রাষ্ট্রীয় শক্তি পুনর্গঠনে বৌদ্ধধর্মের নৈতিক শক্তি যে পথের সন্ধান দিয়েছে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গ্রন্থকার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। বৌদ্ধধর্মে উত্থান-পতনের কাহিনি, চৈনিক বৌদ্ধসংস্কৃতিতে বোধিসত্ত্বের ধারণার গুরুত্ব, মুক্তি বা নির্বাণের বিষয়ে চৈনিক বৌদ্ধভাবনার পথ অনুসন্ধান, প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে চীন-ভারতের সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব, পিওরল্যাণ্ড বুদ্ধিজমের দর্শনের মর্ম, ভারতীয় ও চৈনিক বৌদ্ধধর্মে দুঃখ পরিত্রাণ বিষয় ও ভক্তি সংক্রান্ত মনোভাবের পার্থক্য, চীনের সাহিত্য, স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চিত্রকলায় বৌদ্ধধর্মের অমোচনীয় চিহ্ন সম্পর্কে পাঠকের কুতূহলকে জাগ্রত করে রাখার ক্ষেত্রে আলোচ্য গ্রন্থটি বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করবে বলে আমরা আশাবাদী।
কেবল অতীতের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে নয়, বর্তমানের নিরিখে চৈনিক বৌদ্ধধর্ম নিজেকে কীভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে—সেই বিষয়েও গ্রন্থকার সুমনপাল ভিক্ষু নির্দেশ করেছেন। মধ্য-এশিয়া থেকে চীনে; চীন থেকে কোরিয়া, জাপানে পৌঁছে বৌদ্ধধর্মের নবতর রূপ গ্রহণের যাত্রাপথে চীনের অবদান গুরুত্বময়। বোধিপথের যাত্রা কাল থেকে কালোত্তরে নিত্য প্রবহমান। সেই ধারায় চীনপর্বের এক গুরুত্বময় সাংস্কৃতিক বিনিময়ের স্বল্পালোচিত দিকের অযুত সম্ভাবনার দিকে দিকনির্দেশ করে গ্রন্থকার বাংলায় চৈনিক বৌদ্ধধর্মের চর্চায় নবতর অধ্যায়ের সূচনা করলেন যা আমাদের বাঙালি সারস্বত চর্চার নলিনাক্ষ দত্ত, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, বিধুশেখর শাস্ত্রী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, সুজিতকুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সমৃদ্ধ ধারার ঐতিহ্যকেও স্মরণ করিয়ে দেবে।
সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু।
No comments:
Post a Comment