সুমনপাল ভিক্ষু
"যথা হি চোরঃ সহ তথা হি বুদ্ধ স্তথাগতং নাস্তিকমন্ত্র বিধিহ।
তস্মাদ্ধি যঃ শাক্যতমঃ প্রজানাম,
স নাস্তিকে নাভি মুখো বুধঃ স্যাত্।। (অযোধ্যা কান্ড)", বাল্মিকী রামায়ণ, ২-১০৯-৩৪।
বৈদিক তথা ব্রাহ্মণবাদী সিদ্ধান্তের প্রতি নির্ভরশীল 'রামায়ণ' নামক মহাকাব্যে বুদ্ধের প্রতি অবজ্ঞা তথা নিন্দাসূচক অপশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। "যেমন চোর বা তস্কর দণ্ডনীয় হয়, ঠিক সেইভাবে (বেদ বিরোধী) বুদ্ধ (বৌদ্ধ মতাবলম্বী) ও দণ্ডনীয়।" রামায়ণের এই বক্তব্য প্রমাণ করে বুদ্ধ কখনই বৈদিক এবং হিন্দু ধর্মের সংস্কারক বা প্রচারক ছিলেন না।
বুদ্ধ এবং তাঁর ধর্মকে যদি বিশুদ্ধভাবে অধ্যয়ন এবং গবেষণা করা যায় তা হলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, যারা বৌদ্ধধর্মকে হিন্দু ধর্মের একটি আধুনিক এবং বিকশিত রূপ বলেছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত অদার্শনিক, ঐতিহাসিক তথ্য বিরুদ্ধ, অসত্য এবং অবিবেচনা হীন ও বটে। এই মুর্খতাপূর্ণ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নলিখিত তর্ক প্রস্তুত করা যায়। যেমন-
১। বৈদিক ধর্ম বেদ আশ্রিত এবং বৈদিক মতাবলম্বী বেদকে আপ্তবাক্য অর্থাৎ ঈশ্বরকৃত মনে করেন। বুদ্ধ কখনই বেদকে আপ্তবাক্য (ঈশ্বরকৃত) রূপে স্বীকার করেন নি। এই কারণে হিন্দু মতালম্বী বুদ্ধকে বেদ নিন্দুক অর্থাৎ নাস্তিক বলেছেন।
২। বেদ সর্বদা জগৎ'এর অন্তিম সত্তা শাশ্বত এবং অপরিবর্তনশীল বলেছেন। বুদ্ধ জগৎ'এর সত্তাকে ক্ষণিক এবং পরিবর্তনশীল বলেছেন।
৩। বেদ আত্মার সত্তাকে স্বীকার করে, বেদ অনুসারে আত্মা অমর এবং শাশ্বত। বুদ্ধ আত্মার সত্তাকে কখনই স্বীকার করেন নি। এই কারণে বুদ্ধের সিদ্ধান্তকে অনাত্মবাদ নামে অভিহিত করা হয়।
৪। বেদ ব্রহ্ম এবং ইশ্বরের সত্তার প্রতি আস্থাশীল। বুদ্ধ ব্রহ্ম এবং ঈশ্বরকে কাল্পনিক বলেছেন।
৫। বেদে প্রদত্ত যজ্ঞ এবং তাতে প্রদত্ত জীব হত্যা (বলি)র বিষয়টিকে বুদ্ধ তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছেন, তাঁর মতে বিষয় অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক ও বটে।
৬। বেদ বর্ণ ব্যবস্থা এবং আশ্রম ব্যবস্হাকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। বুদ্ধ বর্ণ ব্যবস্থা এবং আশ্রম ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অর্থে নস্যাৎ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান। তিনি সংঘে নারীদের ও প্রবেশাধিকার প্রদান করেছিলেন। শূদ্র, চন্ডাল ইত্যাদি সকল শ্রেণী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ এবং ভিক্ষু সংঘে প্রবেশের কোন বিধি নিষেধ ছিল না। আজও হিন্দুধর্ম বর্ণ ব্যবস্থা, জাতিবাদ এবং অস্পৃশ্যতাকে বিশ্বাস করে, অপরদিকে বৌদ্ধধর্মকে সমানাধিকার রয়েছে।
৭। বৈদিক এবং হিন্দুধর্ম অহিংসবাদী নয়, কিন্তু বৌদ্ধধর্ম অহিংসার নীতিতে বিশ্বাসী।
৮। বৌদ্ধধর্ম সকল জীবের প্রতি মৈত্রী এবং করুণা ভাব পোষণ করে। বৈদিক বা হিন্দু ধর্মে এই সিদ্ধান্ত নেই।
বেদ এবং বুদ্ধের পূর্বে উপনিষদে 'মধ্যম মার্গ' (বুদ্ধ প্রবর্তিত)'এর অনুশীলন পরিলক্ষিত হয় না। সর্বোপরি চার আর্য সত্য, অর্থাৎ দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধের মার্গ অর্থাৎ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের প্রতিপাদন রয়েছে। বুদ্ধের ধর্ম বৈজ্ঞানিক, যা প্রজ্ঞার প্রতি নির্ভরশীল। প্রতীত্যসমুৎপাদ, যাকে এক অর্থে কারণ কার্যের নিয়মও বলা যায়, যা বৌদ্ধধর্মের বৈজ্ঞানিকতা প্রমাণ করে। বুদ্ধের পূর্বে বেদ তথা উপনিষদে এইরূপ প্রজ্ঞা পূর্ণ, মানবীয় এবং নৈতিকতার প্রতি নির্ভরশীল ধর্ম অংশমাত্র উল্লেখ পাওয়া যায় না। এই কারণে যে সকল তথাকথিত পণ্ডিত প্রাণপনে বৌদ্ধধর্মকে হিন্দুধর্মের বিকশিত এবং পরিস্কৃত রূপ বলেছেন, ওঁদের চিন্তা মিথ্যা এবং প্রবঞ্চনাপূর্ণ। কেননা বৌদ্ধ ধর্মদর্শন কোন বৈদিক গ্রন্থে পাওয়া যায় নি।
বেদ বর্ণনানুসারে মনু মানবকুলের আদি পুরুষ, ইনিই ভূমি কর্ষণ এবং অগ্নি উৎপাদন করে মনুষ্যের ইষ্টসাধন করেন। শতপথ ব্রাহ্মণে এর একটি বিস্ময়কর আখ্যায়িকা (১ম, ৮, ১) আছে, সেটি খ্রীষ্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট' বর্ণিত মহাপ্রলয় বৃত্তান্তের ন্যায়। শতপথ (১ম, ৭ এবং ৪, ঐতরেয় ৩য়, ৩৩ ইত্যাদি) ব্রাহ্মণে উল্লেখিত আছে, যে, সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি স্বদুহিতার প্রণয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন, এবং তা হতেই যাবতীয় জগৎ সংসার উৎপন্ন হয়েছে। ব্রাহ্মণোক্ত এই উপ্যাখ্যানটি আবার রূপান্তরিত করে পুরাণকর্তাগণ ব্রহ্মাকে তাঁর নিজ দুহিতার প্রেমাভিলাষী রূপে বর্ণনা করেছেন। আবার কুমারিল ভট্টের মতে সূর্যের অপর নাম প্রজাপতি। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে (১ম, ১, ৩) জগৎ সৃষ্টি সম্পর্কিত একটি আখায়িকা আছে যে, সৃষ্টির প্রারম্ভে কেবল দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি এবং তন্মধ্যে ভাসমান একটি পদ্মপত্র ভিন্ন আর কিছুই ছিল না। প্রজাপতি বরাহস্বরূপ হয়ে সেই জলরাশিতে প্রবেশ করে মৃত্তিকা উত্তোলন করেন, এই মৃত্তিকা চারিদিকে বিস্তৃত করে প্রস্তর খণ্ড দ্বারা দৃঢ় পূর্বক জগৎ সৃষ্টি করলেন। সৃষ্টির এই বিবরণ পরবর্তীকালে পুরাণকর্তাগণ 'বরাহ অবতার' সম্পর্কিত ভিন্ন ধারণা প্রস্তুত করেছেন।
ঋগ্বেদে 'অসুর' শব্দের অর্থ বলবান এবং এই শব্দটি দেবদিগের বিশ্বেষণ রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রাহ্মণগ্রন্থে 'অসুর'রা দেবদ্বেষী অর্থাৎ শত্রু। শতপথ ব্রাহ্মণে (২য়, ১, ১, ৮) বলা হয়েছে, দেব এবং অসুর গণ সকলেই 'প্রজাপতি' হতে সমুদ্ভূত হয়ে স্ব-স্ব প্রাধান্য স্থাপনের জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল।
মহাকাব্য-বর্ণিত সময়ে এই সমুদয় উপাখ্যান এবং নানাবিধ কাল্পনিক কথাগুলি বৈদিক যুগে প্রচলিত ঈশ্বরবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নতুন নামে প্রতীয়মান হয়। শতপথ ব্রাহ্মণে ইন্দ্রের অর্জুন নাম প্রদত্ত হয়েছে। ঋগবেদে প্রভজ্ঞানের পিতা, অগ্নিরূপী বজ্র রুদ্র দেবতা। মহাকাব্য যুগে তিনিই আবার দস্যুতস্কর দিগের অধিদেবতা কপার্দী, জীবগণের পালনকর্তা রূপে পশুপতি অরুণ। তবে মহাদেব'এর পৌরাণিক বিবরণ 'ব্রাহ্মণ' গ্রন্থ সমূহের কোথাও উল্লেখিত হয়নি, রুদ্রকে কোথাও দুর্গা বা কালীর পতি রূপে বর্ণনা করার বিষয়টি দেখা যায় না। অর্থববেদের মুন্ডক উপনিষদে সাতটি অগ্নি জিহ্বার নাম যথাক্রমে কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধুম্রবণা, স্ফুলিঙ্গিনী এবং দেবী বিশ্বরূপা। অথচ এরা রুদ্রের পত্নী নয়।
শতপথ ব্রাহ্মণের অন্তিম অধ্যায়ে (১৪/১/১) বিষ্ণুর প্রাধান্য লাভ এবং ইন্দ্র কর্তৃক তাঁর মস্তক ছিন্ন হওয়ার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ছান্দোগ্য ঔপনিষদে (৩/১৭/৬) দেবকী পুত্র কৃষ্ণ দেবতা রূপে পরিগমিত হন নি। তিনি ঋষি আঙ্গিরসের একজন শিষ্য রূপে বর্ণিত হয়েছেন।
মহাভারতের শান্তিপর্বে (১৮৮ অধ্যায়) জাতিভেগের উৎপত্তি সম্পর্কিত সন্ধিচার দৃষ্ট হয়। যেমন "রক্তবর্ণ দ্বিজেরা ভোগবিলাসী, তেজস্বী, ক্রোধী, হঠকারী, বৈদিক আচার ভ্রষ্ট হয়ে অবশেষে ক্ষত্রিয় শ্রেণীভুক্ত হল। লোহিত বর্ণ দ্বিজেরা গোচারণ ও কৃষিকার্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ এবং বৈদিক আচার পরিত্যাগ করাতে বৈশ্য শ্রেণীভুক্ত হল। কৃষ্ণবর্ণ, অশুচি, মিথ্যাবাদী ও ক্রুরস্বভাব দ্বিজেরা নীচ বা হীন উপায়ে জীবিকা গ্রহণের কারণে তাঁর শূদ্রশ্রেণীভূক্ত হলেন।"
বায়ুপুরাণে লিখিত আছে, "যাঁরা সাহসী বীরপুরুষ, অপরকে রক্ষা করতে পারতেন, ব্রহ্মা তাঁদের ক্ষত্রিয় শ্রেণীভুক্ত করলেন। যে সকল সত্যবাদী, বেদাধ্যায়ী নিঃস্বার্থ ব্যক্তি ক্ষত্রিয়ের সহচর ছিলেন, ব্রহ্মা তাঁদের ব্রাহ্মণ করলেন। যে সকল দুর্বল ব্যক্তি কৃষি ও বাণিজ্যে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করত, তাঁর বৈশ্য হল। যাঁরা পরসেবা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত, তাঁর শূদ্র শ্রেণীভুক্ত হল।"
রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের ৭৪ সর্গে লিখিত আছে "কৃত যুগে শুদ্ধ ব্রাহ্মণেরা তপস্যা করতেন। ত্রেতা যুগে ক্ষত্রিয়রা প্রথম উৎপত্তি হন, তখন বর্ণভেদ সৃষ্টি হয়।" বিষ্ণু পুরাণে (৪/৮) আছে, "গৃৎসমদ বংশে শৌণকের জন্ম। শৌণক চারিবর্গের নিয়ম সৃষ্টি করেন। গৃৎসমদের পুত্রের নাম শুনক। এই শুনক হতে শৌনক। এই বংশে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের উৎপত্তি।"
মৎস পুরাণ এবং বায়ুপুরাণে বলা হয়েছে বলী রাজা চার জাতি বা চার বর্ণের নিয়ম প্রথম প্রবর্তন করেন। হরিবংশে ও (৩১ অধ্যায়) এই কথার পুনরুক্তি হয়েছে। বিষ্ণুপুরাণ মতে (৪/১৯) কম্ববংশীয়রা জাতি প্রথার সৃষ্টি করেছিলেন।
ঋগ্বেদে দেবতা কারা? কারণ এর প্রতি সূক্ত সম্পর্কেই একজন দেবতার নামোল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদের একাধিক স্থানে দেবতাদের সংখ্যা সম্বন্ধে উল্লেখ আছে। দুটি ঝকে (৩/৯/৯) এবং (১০/৫২/৬) এই দেবতাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়েছে ৩৩/৩৯। কিন্তু ঋগ্বেদের সমস্ত সূক্ত গুলিতে যাঁদের দেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদের সকলকে একত্রিত করলেও এই সংখ্যা পাওয়া যায় না। আবার ঋগ্বেদেই আরেক স্থানে (৮/২৮/১) ৩৩টি দেবতার কথা রয়েছে। কাজেই বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ অনুসারে এই সমস্ত সংখ্যার দ্বারা ঈশ্বর তত্ত্ব প্রমাণিত হয় না।
ঋগ্বেদের অন্যতম দেবতা 'দ্যৌ'কে বিশ্বের পিতা বলা হয়েছে। তবে ঋগ্বেদ রচনার ক্রমেই এই দেবতার প্রাধান্য লুপ্ত হয়েছিল। ইন্দ্রকে যুদ্ধ, বজ্র এবং বৃষ্টির দেবতা বলেও বর্ণনা করা হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে ইন্দ্র ছিলেন দুর্ধর্য 'অসুর' বৃত্র বধের ও নায়ক। তিনি নিহত বৃত্রের দেহ থেকে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করলেন। ভারত-তত্ত্ববিদ ব্যাশম-এর মতে ঋগ্বেদে ইন্দ্র সম্পর্ক এই কল্পনার সঙ্গে ব্যাবিলনীয় দেবতা 'মারডুক্'এর কল্পনার মিল রয়েছে।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের কয়েকটি সুক্তে সৃষ্টিকর্তা বা সৃষ্টি কর্ত্রী রূপে কতিপয় নতুন দেবতার উল্লেখ রয়েছে। এরা হলো হিরণ্যগর্ভযার থেকে নির্গত হয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ড, তারপর বিশ্বকর্মা এবং দুইজন দেবী বাক্ এবং কাল। পরে হিরণ্যগর্ভ ও বিশ্বকর্মাকে যুক্ত করে সমস্ত সৃষ্টির কর্তা প্রজাপতি'র কল্পনা করা হয়। আবার এই দশম মণ্ডলেই (সুক্ত ১২৯, পৃঃ ৬২৪) বলা হয়েছে যে, একটি বিরাট দৈত্য 'পুরুষ' যার আকৃতি ছিল বর্তমান ব্রহ্মাণ্ড থেকেও বৃহৎ। এই দৈত্য'ই ছিল প্রথম এবং একমাত্র অস্তিত্ব। এই প্রথম অস্তিত্বটি একাকী বোধ করার কারণে একসময় নিজে দ্বিখণ্ডিত হয়ে একটি নারী অস্তিত্ব 'বিরাজ' সৃষ্টি করেছিলেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি শ্লোক অনুযায়ী পুরুষ এবং বিরাজের মিলনের ফলে দ্বিতীয় পুরুষ সৃষ্টি হল এবং তারপরে দেবতারা। ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বের এই পূর্বাবস্থাতেই দেবতাগণ তাঁকে পিতার নিকট উৎসর্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল এবং উৎসর্গের জন্য দ্বিতীয় পুরুষকেই নির্বাচন করল। অতপর তাকে হত্যা করা হল এবং তার দেহ হতে ব্রহ্মাণ্ড ও মানব সৃষ্ট হল। একই সুক্তে হিন্দু সমাজের যে বর্ণভেদ অর্থাৎ চতুবর্ণ তারও সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যায়।
পুরুষের দেহের বিভিন্ন অংশ হতে চারটি বর্ণের মানব সৃষ্ট হল যা পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে বর্ণভেদের ভিত্তি স্থাপন করল। পুরুষ সম্পর্কিত এই কাহিনীটি নিতান্তই অর্বাচীন বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হল মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। এই মনুস্মৃতি'র রচনাকাল সম্পর্কিত কোনরূপ সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে মনুস্মৃতির সম্ভাব্য রচনাকাল খ্রীষ্টিয় ২-৩ শতাব্দীর মধ্যে। সে ক্ষেত্রে এটি বৈদিক যুগোত্তর একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী গ্রন্থ। (প্যাট্রিক অলিভেল, মনুস কোড় অফল, পৃ. ২৪-২৫)।
মনুস্মৃতি' অনুসারে সৃষ্টির উদ্ভব এবং সমাজের বর্ণ বিভাজন হল এইরূপ ".. সূর্য ও চন্দ্র বিরাট পুরুষ সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের চক্ষুদ্বয়, নক্ষত্ররাজি আর আকাশের সৃষ্টি তাঁর নাভিমূল থেকে, এবং ব্রাহ্মণ তাঁর মস্তক, রাজা তাঁর বাহুদ্বয়, বৈশ্য তাঁর উরু ও শূদ্র তাঁর পদযুগল..." (প্যাট্রিক অলিভেল, মনুস কোড্ অফল, পৃ. ১৪)।
ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যাখ্যায় ব্রাহ্মণই সমাজের প্রকৃত চালক অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিনিধি। যার নির্দেশ ধারণ করে ক্ষত্রিয় রাজা শাসন করেন, বৈশ্য তার উপর ন্যস্ত দ্বায়িত্ব পালন করেন এবং শূদ্র সকলের সেবা কর্মে নিযুক্ত থাকেন। ঋগ্বেদের পুরুষ সুক্তে ঈশ্বর তত্ত্ব এবং বর্ণাশ্রম সম্পর্কিত যে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে, মনুস্মৃতিতে হুবহু তা প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকের মতে দীর্ঘ সময় ধরে ব্রাহ্মণদের যৌথ প্রচেষ্টায় স্মৃতিধর্মী মনুস্মৃতি রচনার কাজ সাঙ্গ হয়েছে। সমস্ত দিক খুঁটিয়ে দেখে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য নিশ্চিত করা, আর্য অভিজাতদের স্বার্থ বজায় রাখা, দৈবরোষ এবং রাজরোষের ভয় দেখিয়ে শূদ্রসমাজকে দাসত্ববৃত্তিতে বাধ্য করা, নারীর ব্যক্তিসত্তাকে উপেক্ষা করা এবং শূদ্র ও নারীকে প্রায় একই বন্ধনীতে রেখে তাদের পণ্যায়িত করা সবটাই করা হয়েছে ধর্মের অজুহাতে এবং সর্বোপরি প্রজাপতি ব্রহ্মার পুত্র মনুর (?) নামে। সুতরাং এই অর্থে বলা যায় যে, মনুস্মৃতি হল মূল অর্থে বৈদিক আর্য যুগের শোষণ ভিত্তিক আর্য-সামাজিক ব্যবস্থাকে কঠোর এক ধর্মীয় অনুশাসনে টিকিয়ে রাখার নির্দেশিকা মাত্র।
মনুস্মৃতির ১.৯১ তম শ্লোকে শূদ্রের প্রতি কোন কর্মের ভার প্রদান করা হল দেখা যাক "প্রভূ (বিধাতা) শূদ্রের জন্য একটিমাত্র কর্মই নির্দিষ্ট করলেন, তা হল বিনম্রভাবে অবশিষ্ট তিন বর্ণের সেবা করা।" শ্লোক-১.৯১। (একমেব তু শূদ্রস্য প্রভুঃ কর্ম সমাদিশং। এতেযামেব বর্ণানাং শুশ্রূাযাম্-অনসূয়য়া)।।
"একজন ব্রাহ্মণের নাম (নামের প্রথম ভাগ) হোক শুভ লক্ষণ যুক্ত, ক্ষত্রিয়ের (নাম) হোক পরাক্রম নির্দেশক, বৈশ্যের (নাম), হোক ধনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত, কিন্তু শূদ্রের (নাম) যেন হয় ঘৃণার্হ কিছু।" শ্লোক-২.৩১। (মঙ্গলাং ব্রাহ্মণস্য স্যাং ক্ষত্রিয়স্য বলান্বিতম্। বৈশ্যস্য ধনসংযুক্তং শূদ্রস্য তু জুগুস্পিতম্)।।
"(সৃষ্টিকালে) মনু নারীর জন্য যা যা বরাদ্দ করেছেন তা হল শয্যা, আসন ও অলংকার, অপবিত্র বাসনা, ক্রোধ, অসততা, অসুয়া (দ্বেষ) এবং খারাপ আচরণ।" শ্লোক-১/১৭। (শয্যা-অসনম্ অলংকারং কামং ক্রোধম্ অনার্যবম্। দ্রোহভাবং কুচযাং চ স্ত্রীভ্যো মনুর্তাকল্পয়ং।।)
"(নারীদের) যতই সযত্নে রাখা হোক না কেন, পুরুষে আসক্তি, অস্থিরমতিত্ব ও সহজাত হৃদয়হীনতার কারণে তারা তাদের স্বামীদের প্রতি অনুগত থাকে না।” শ্লোক-৯/১৫। (পৌঁশ্চল্যাচ্ চলচিত্তাচ্ চ-নৈম্নেহ্যাচ্ চ স্বভাবতঃ। রক্ষিতা যত্নতো অপি-ইহ ভর্তৃস্ব এতা বিকুর্বতো।।)
"যে রাজ্য শূদ্র ও নাস্তিকে পরিপূর্ণ এবং দ্বিজহীন, (সেই রাজ্য) অচিরেই দুর্ভিক্ষ ও ব্যাধিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।" শ্লোক-৮.২২। (যদ্ রাষ্ট্রং শূদ্র-ভূয়িষ্ঠং নাস্তিকাক্রান্তম্ অদ্বিজম্। বিনশ্যত্যাণ্ড তং কৃৎস্নং দুর্ভিক্ষ ব্যাধিপীড়িতম্।।)
প্রাচীন আর্য ঋষিগণের নিকট ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির বিষয়ে দুর্বোধ্য প্রহেলিকাবং প্রতীয়মান হোত। তাঁদের সৃষ্টি তত্ত্বালোচনা এবং নির্দ্ধারণ বিচিত্র ভাবপূর্ণ এবং অশেষ কল্পনা-রঞ্জিত। দুই-একটি দৃষ্টান্ত প্রদত্ত হল: ছান্দোগ্য উপনিষদের একস্থানে অন্যরূপ সৃষ্টি বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। যথা- "জগৎ উৎপত্তির পূর্বে কেবলমাত্র অদ্বিতীয় সৎস্বরূপ পরব্রহ্ম ছিলেন। এই পরব্রহ্ম হতে অগ্নি, অগ্নি হতে জল এবং জল হতে পৃথিবী উৎপন্ন হয়।' ঋগ্বেদ (১০ম, ১২৯)'এ বলা হয়েছে, "জগৎ সৃষ্টির পূর্বে সমস্তই জলরূপে বিদ্যমান ছিল। জল মূলস্বরূপ, জগৎ বৃক্ষরূপ, পরব্রহ্ম জনয়িতা, ভৌতিক পদার্থ জনিত। মহীদাস ঐতরেয় এইটি অবগত ছিলেন।"
বেদ বা উপনিষদ, সর্বত্রই আত্মার সত্তাকে স্বীকার করা হয়েছে। যেমন "স্বর্ণকার যেমন স্বর্ণখণ্ডকে অভিনব সুন্দর আকৃতি প্রদান করে, সেই রূপ আত্মা এই শরীর পরিত্যাগ করত পিতৃগণ, গন্ধর্বগণ, দেবগণের কিংবা প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রভৃতির অভিনব সুন্দর আকৃতি পরিগ্রহ করে।" (বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ৪র্থ, ৪)।
"জলৌকা যেমন যাসাগ্রভাগ আরোহণ পূর্বক যাসান্তর গ্রহণ পূর্বক পূর্ব্বাবলম্বন পরিত্যাগ করে, সেইরকম জীবাত্মা এই জড়দেহ পরিত্যাগ পূর্বক দেহান্তরে আশ্রয় গ্রহণ করে।"
"ব্রহ্মলোকে তার সরোবর, জেষ্টিহ পর্বত, বিজয়নদী, ইল্যাবৃক্ষ, সালয্যনগর, অপরাজিতা পুরী, এর দ্বার রক্ষণকার্য্যে ইন্দর এবং প্রজাপতি নিযুক্ত। বিভু নামক ব্রহ্মমন্দির, তন্মধ্যে অমিতৌজ। আসন পরিশোভিত বিচক্ষণা সিংহাসন; তদুপরি ছায়া স্বরূপা চক্ষুণী সমভিব্যাহারে প্রেমময়ী মানসী উপবিষ্ট হয়ে পুষ্পচয়নবং বিশ্বসংসারের নির্মাণকার্য্য করছেন।" আত্মা এইস্থানে ব্রহ্মদর্শন লাভ করে। (কৌষীতকী, ১২৬-১২৭)।
আত্মার পুনর্জন্ম সম্পর্কে উপনিষদে'র তথ্যটি এইরূপ: "মৃত্যুর পর প্রেতাত্মা চন্দ্রালোকে গমন করে, সেই স্থান হতে প্রেরিত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে।"
"মৃত্তিকাস্তূপের উপর পরিত্যক্ত সাপের খোসার ন্যায়, এই প্রাণবিহীন শরীর পশ্চাতে পড়ে থাকে, প্রমুক্ত অমর আত্মা ব্রহ্মেরই অংশ, জ্যোতির্ময়।"
মূল অর্থে বৈদিক ধর্ম তথা উত্তরকালীন হিন্দু ধর্মের সিদ্ধান্ত প্রায় একই, বেদ-উপনিষদ এবং ব্রাহ্মণগ্রন্থ ব্যতীত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ সমূহে ঈশ্বরতত্ত্ব, আত্মা এবং অবতারবাদের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। কেননা হিন্দু ধর্মের অনেকগুলি শাখা-উপশাখা রয়েছে। এই সকল শাখার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট রয়েছে। সকল শাখার মতে জগৎএ তিনটি মুখ্য দেবতা বিদ্যমান, ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর (মতান্তরে শিব)। ব্রহ্মা জগৎ'এর সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু জগৎ'এর পালন কর্তা এবং মহেশ্বর জগৎ'এর সংহারক বা বিনাশকারী।
হিন্দুধর্মের মতে যখন ধর্মের গ্লানি (পতন) হয়, তখন সাধুজন, সজ্জন এবং উত্তম পুরুষের পরিত্রানার্থে (কল্যাণ, হিত বা মঙ্গল) বিষ্ণু অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু পুরাণে সমানতা দৃষ্ট হয় না। কিছু পুরানে অবতারের সংখ্যা ১০ এবং কিছু পুরাণে ২০। তবে এই ধর্মের বেশ কিছু শাখাই মূর্তি পূজক তথা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা অর্চনার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
হিন্দু ধর্মে নিরাকার এবং সাকার-এই ২ অংশই বিদ্যমান। নিরাকার সম্প্রদায়ের মধ্যে আর্য সমাজ, কবীর, নানক এবং রেদাস (রবি দাস) অন্যতম, যারা ঈশ্বরকে নিরাকার, অজন্মা, অমর, কল্যাণকারী, অনন্ত ইত্যাদি মনে করেন। নিরাকার ঈশ্বর অবতাররূপে জন্মগ্রহণ করেন না। এর বিপরীতে ঈশ্বরকে সাকার, শরীরধারী, অবতার রূপে জন্মগ্রহণকারী বলে গণ্য করা হয়। যেমন-রাম, কৃষ্ণ, নৃসিংহ ইত্যাদি। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সকল শাখা সমূহের বিভাজন, পুনর্বিবিভাজন হয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছে। ফলে তাদের ধার্মিক সিদ্ধান্ত বিরোধাত্মক এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বৌদ্ধধর্মে নিরাকার বা সাকার, আত্মা-পরমাত্মা, জাত-পাত এবং বর্ণগোত্র (বর্ণাশ্রম) ইত্যাদি কোন বিষয়কেই স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি কেননা এই ধর্ম বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে অনেক বেদান্তবাদী (বিবেকানন্দ প্রমুখ) এবং ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ বৌদ্ধধর্ম এবং দর্শনকে হিন্দুত্ববাদের মোড়কে প্রতিস্থাপনের প্রাণবন প্রচেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁদের এই প্রচেষ্টা মূলঅর্থে অযৌক্তিক এবং অন্তসারশূণ্য। কেননা-
"যে ধম্মা হেতুপ্পভবা তেসং হেতুং তথাগতো আহ। তেসং চ যো নিরোধো ধম্মা এবং বাদী মহাসমনো।" অর্থাৎ যে ধম্ম কার্য কারণ হতে উৎপন্ন হয়েছে তার হেতু এবং তার নিরোধ তথাগত উপদেশ রূপে প্রদান করেছেন।
বুদ্ধ কর্মের সার মানসিক সংকল্প অথবা কর্ম সম্পাদনের মানসিক নির্ণয় বলেছেন, যাকে 'চেতনা' বলা হয়। "হে ভিক্ষুগণ। আমি চেতনাকেই কর্ম বলেছি, চেতনা-পূর্বক কর্ম সম্পাদিত হয়, শরীর দ্বারা বাণী দ্বারা, মন দ্বারা।” (সংযুক্ত নিকায়, খণ্ড-২, পৃঃ ৩৯) অভিধর্ম কোশ'এ ও কর্মের পরিভাষা 'চেতনা' এবং 'চেতয়িত্বাকরণ' বলা হয়েছে। আচার্য নাগার্জুন ও বলেছেন-
"চেতনা চেতয়িত্বা চ কর্মোক্তং পরমর্ষিনা।
তস্যানেকবিধো ভেদঃ কর্মণঃ পরিকীর্তিতঃ।।
তত্র যচ্চেতনেত্যুক্তং কর্ম তন্মানসং স্মৃতম্।
চেতয়িত্বা চ যভূক্তং তত্ত্ব কায়িকবাচিকম্।। মধ্যমক, ১৭.২-৩।
এই প্রসঙ্গে চেতনার অর্থ সংকল্প অথবা কর্মের মানসিক নির্ণয় রূপে গ্রহণ করা উচিত।
ভগবান বুদ্ধের এই সিদ্ধান্ত বেদানুসারী অথবা অন্যান্য ধর্মমত (জৈন প্রমুখ) সম্পূর্ণ অর্থে ভিন্ন। বৈদিক মতে কর্মকে জীবরূপী কর্তার বিষয় এবং তাতে উৎপন্ন অদৃষ্ট শক্তি রূপে স্বীকার করা হয়। বৌদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুসারে কর্মকে কোন অনুবর্তমান কর্তার ধর্ম রূপে স্বীকার করা হয় নি। সংযুত্ত নিকায়'তে বলা হয়েছে 'কর্ম অনাত্মকৃত হয়।' 'না তো এ শরীর তোমার, না অপরের। শুধুমাত্র পুরাতন কর্মই সম্পাদিত হয়।' 'জীব এবং শরীরকে এক মনে করলে ব্রহ্মচর্যবাস সম্পন্ন হয় না, না তো ভিন্ন মনে করলে।' 'না তো এইটি আত্মকৃত, না পরকৃত। হেতুর সহায়তায় উৎপন্ন হয়, হেতু না থাকলে নিরুদ্ধ হয়ে যায়।' একথা স্পষ্ট যে ভগবান বুদ্ধ'র মতে কর্ম এবং কর্মফল একটি অনাদি এবং অবিচ্ছিন্ন পরস্পরা মাত্র। যেখানে কর্মের সম্পাদন এবং তার পরিনাম, উভয়েই সমান প্রবাহের পতিত ঘটনা। এই মতানুসারে কোন অনুগত এবং স্থায়ী কর্তা তথা ভোক্তার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি।
কর্মের মূল হল তৃষ্ণা, এবং তৃষ্ণা একদিকে অবিদ্যার প্রতি আশ্রিত, অপরদিকে সুখের অনুভবের প্রতি। সংযুক্ত নিকায় (খণ্ড ২, পৃ. ১৭৮) তে বলা হয়েছে "হে ভিক্ষুগণ। সংসার অনাদি। অবিদ্যা দ্বারা আচ্ছন্ন এবং তৃষ্ণা দ্বারা আবদ্ধ হয়ে একজন্ম হতে অপর জন্মে পরিভ্রমণ করে চলেছে।' আচার্য নাগার্জুন বলেছেন-
"পূর্বা প্রজ্ঞায়তে কোটি নেত্যুবাচ মহামুণিঃ।
সংসারোহনবরাগ্রো হি নাস্যাদির্নাপি সশ্চিমম্।।" মধ্যমক, ১১.১।
আচার্য চন্দ্রকীর্তি ও এই সূত্রের উদাহরণ প্রদান করেছেন। অভিধর্ম কোশ' এ স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, "অবিদ্যাযুক্ত স্পর্শ দ্বারা বেদনা উৎপন্ন হয়, অবিদ্যাযুক্ত বেদনা দ্বারা তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়।" (পৃ. ৩১-৩২)।
প্রতীত্যসমুৎপাদ'এর অন্তর্গত দ্বাদশ নিদান এইরূপ অবিদ্যা, সংস্কার, বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভব, জাতি এবং জরা-মরণ-শোক-পরিদেব-দুঃখ-দৌর্ মনস্য-উপায়াস। অবিদ্যাকে (অভিধর্ম কোশ, খণ্ড-২, পৃ. ৭১০) মোহ এবং তমঃ স্কন্ধও বলা হয়েছে। অবিদ্যার অর্থ প্রায়ঃ চার আর্য সত্যের অজ্ঞানতা বলা হয়েছে। বস্তুতঃ অবিদ্যা বুদ্ধির ভ্রান্ত বিকল্প অথবা মিথ্যা অধ্যাবসায় মাত্র নয়, প্রতুত অযথাভূত দর্শনের অনাদি অভ্যাস হয়। অনিত্য, দুঃখাত্মক এবং অনাত্মভূত চৈতসিক এবং ভৌতিক জগৎ'এ অহংকার মমকার পূর্বক সুখের সন্ধানে উদ্বিগ্ন থাকার কারণে আমাদের অভিনিবেশের মূলে একটি আবরণ থাকে যা চিত্তের স্বাভাবিক প্রভাস্বরতাকে ঢেকে রাখে। আর এটাই হল অবিদ্যা এবং এর নিবৃত্তি প্রতীত্যসমুৎপাদের সাক্ষাৎ ব্যতীত সম্ভব নয়। আচার্য নাগার্জুন'এর উক্তি দ্বারা এই বিষয়টি স্পষ্টতর হয়।
"পণর্ভবায় সংমকারানদ্যিানিবৃতস্তথা।
অভিসংস্কৃরূতে যাংস্তৈগতি গচ্ছতি কর্মভিঃ।।' মধ্যমক, ২৬/১।
বুদ্ধের সিদ্ধান্ত অনুসারে ধার্মিক এবং আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সকল স্ত্রী ও পুরুষের সমান যোগ্যতা এবং অধিকার রয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আজীবিকার ক্ষেত্রেও সকলের সমান অধিকারের কথা বলেছেন। তাঁর মতে একটি মানুষের সঙ্গে অপর একটি মানুষের ব্যবহার মানবতার দ্বারা সম্পন্ন করা উচিত, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি দ্বারা নয়। কারণ সকল প্রাণী সমান রূপে দুঃখী, অতএব সকলেই সমান। দুঃখের প্রহানই তাদের ধর্মের প্রয়োজন। অতএব সংবেদনা এবং সহানুভূতি এই সমতার আধারভূত তত্ত্ব তিনি (ভগবান বুদ্ধ) বলেছেন, যেমন সকল নদী সমুদ্রে মিলিত হয়ে নিজ নাম, রূপ এবং বৈশিষ্ট্যকে হারিয়ে ফেসে ঠিক সেইভাবে মানব মাত্র তাঁর সংঘে প্রবিষ্ট হয়ে জাতি, বর্ণ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট করে ফেলে এবং সকলেই সমান হয়ে যায়। নির্বাণই তাঁর ধর্মের একমাত্র রস।
বুদ্ধের মতে মানব জন্ম অত্যন্ত দুর্লভ। মনুষ্যের মধ্যে সেই বীজ নিহিত রয়েছে, যার কারণে সে যদি চায় তাহলে অভ্যুদয় এবং নিঃশ্রেয়স অর্থাৎ নির্বাণ এবং বুদ্ধত্বের ন্যায় পরম পুরুষার্থ ও লাভ করতে পারে। ঈশ্বর তত্ত্বের কোন অর্থ নেই। অতএব মনুষ্য তাঁর দাস নয়, অধিকিন্তু মনুষ্যের উদ্ধারের দ্বায়িত্ব মনুষ্যকেই গ্রহণ করতে হবে। এই কারণেই তিনি বলেছেন, হে ভিক্ষুগণ। বহুজনের হিতার্থে এবং সুখার্থে তথা মনুষ্যের কল্যানে লোকে (পৃথিবী) বিচরণ কর। ঋষিপত্তন মৃগদাব (সারনাথ) তে তাঁর প্রথম বর্ষাবাসের অনন্তর ভিক্ষুসংঘকে তাঁর এই উপদেশ মানবীয় স্বাধীনতা এবং মানব শ্রেষ্ঠতার অপ্রতিম উদ্ঘোষ রূপে পরিগণিত হয়েছে।
বুদ্ধের শিক্ষা অত্যন্ত বিজ্ঞান ভিত্তিক এবং ব্যবহারিক রূপেই প্রতিষ্ঠিত। তাঁর দর্শন অর্থাৎ সিদ্ধান্তে কোনরূপ রহস্য এবং আড়ম্বরের স্থান নেই। তাঁর চিত্তন প্রাণী সমূহের ব্যাপক দুঃখের কারণ দ্বারা শুরু হয়েছিল, না কি অন্য কোন নিগূঢ়, গুহাপ্রবিষ্ট তত্ত্বের সন্ধানের প্রতি। তিনি মহাপরিনির্বাণের পূর্ব পর্যন্ত দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কিত মার্গের কথা বলেছেন। তিনি এইরূপ প্রশ্নের উত্তর প্রদান হতে বিরত ছিলেন যেগুলি অব্যাকরণীয় (অব্যাখেয়)। যেমন লোক শাশ্বত না কি অশাশ্বত; এই লোক অনন্ত নাকি শান্ত অথবা তথাগত মরণের পর উৎপন্ন হন না হন না ইত্যাদি। তিনি বলেছেন, এইরূপ প্রশ্ন এবং তার উত্তর না তো যুক্তিসংগত, আর না তো ধর্ম সংগত। এই মিথ্যাদৃষ্টির কারণে মনুষ্য জন্ম, জরা, মরণ ইত্যাদি দুঃখ দ্বারা দুঃখী হয়, যার তিনি (বুদ্ধ) উপশমের মার্গ প্রদান করেছেন।
বুদ্ধ যে ধর্মচক্রের প্রবর্তন করেছেন অথবা যে মার্গের উপদেশ দিয়েছেন, যাকে 'মধ্যমা প্রতিপদা' (মধ্যম মার্গ) বলা হয়। পরস্পর বিরোধী দুটি অন্ত বা অতিকে নিষেধ পূর্বক ভগবান মধ্যম মার্গ প্রকাশিত করেছেন। মনুষ্যের স্বভাব হন সে অতি সহজেই কোন অস্তে পতিত হয়ে পড়ে এবং সেই অন্তকে ধারণ করে তার প্রতি আগ্রহশীল হয়। এই আগ্রহ শীলতাই সকল মানবীয় বিভেদ, সংঘর্ষ এবং দুঃখের মূলাধার। মধ্যম প্রতিপদা হল অনাগ্রহশীলতা এবং সমস্যা হতে মুক্তির সর্বোত্তম মার্গ। এর ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক এবং এই মার্গে অনন্ত সম্ভাবনা নিহিত আছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমাধান ও এর দ্বারা সম্ভব। শীল, সমাধি এবং প্রজ্ঞা বা দর্শনের ক্ষেত্রে এর প্রাচীন ব্যাখ্যা (মূল বুদ্ধবচন বা ত্রিপিটক) পাওয়া যায়।
শীল'এর দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিলাসিতা'র জীবন অতিবাহিত করার বিষয়টিকে 'কামসুখল্লিকানুযোগ' (প্রথমঅন্ত) তথা নির্বাণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং শরীরোপতাপক তপশ্চরন এর অনুষ্ঠান করা হল দ্বিতীয় অন্ত, যাকে 'আত্মব্রুমথানুযোগ' বলা হয়। ভগবান বুদ্ধ বীণার উপমা প্রদান পূর্বক বলেছেন যদি বীণার তার আলগা রাখা যায় তাহলে তা হতে মধুর ধ্বনি উৎপন্ন হয় না। যদি তাকে অধিক দৃঢ় করা হয় তাহলে সেই বীণার তার ছিন্ন হওয়ার প্রবল সমভাবনা থেকে যায়, অতএব তাকে অধিক আলগা আর না তো অধিক দৃঢ় করা উচিত নয়, তাহলেই মধুর ধ্বনি উৎপন্ন হবে। ঠিক সেইভাবে সমাধিতে নিমগ্ন সাধকের চিত্ত না তো অধিক শিথিল, আলস্য যুক্ত বা নিদ্রায় আচ্ছন্ন হওয়া উচিত আর না তো অত্যধিক উৎসাহ (দুরুৎসাহ) দ্বারা যুক্ত সমস্যা বা অশান্ত হওয়া উচিত। লীনতা এবং উদ্ভব (ঔদ্ধত্য) উভয়ই দোষ যুক্ত, যা সমাধির দৃষ্টিতে মধ্যম প্রতিপদা হয়।
প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে শাশ্বতবাদ (নিত্যতার প্রতি আগ্রহ) হল প্রথম অন্ত এবং উচ্ছেদবাদ (এহিকবাদ) হল দ্বিতীয় অন্ত। এই উভয় অন্তের বিনাশই হল মধ্যম প্রতিপদা (মধ্যম মার্গ)। এই সিদ্ধান্ত ব্যতীত অভ্যুদয় এবং নিঃশ্রেয়স কোনরূপ পুরুষার্থ সিদ্ধ হয় না।
প্রতীত্যসমুৎপাদ হল সমগ্র বৌদ্ধ সিদ্ধান্তের মেরুদণ্ড। প্রতীত্যসমুৎপাদ হল জ্ঞানের বোধি এবং প্রজ্ঞাভূমি। চার আর্যসত্য, অনিত্যতা, দুঃখতা, অনাত্মতা, ক্ষণভঙ্গুরবাদ, অনাত্মবাদ, অনীশ্বরবাদ ইত্যাদি বৌদ্ধ দার্শনিক সিদ্ধান্ত এই প্রতীত্যসমুৎপাদের প্রতিফলন হয়।
বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শনের কর্ম সিদ্ধান্ত অন্যান্য ভারতীয় তথা বিশ্বের ধার্মিক পরস্পরা হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক। প্রায় সকল ব্যক্তি কর্মকে মূল মনে করে, অতএব কর্মের কর্তাকে সেই কর্মের ফল দ্বারা অন্বিত করার ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত চেতন বা ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে নেয়। তাদের মতে এইরূপ অতিরিক্ত চেতনের অভাবে কর্ম-কর্মফল ব্যবস্থা নির্মিত হবে না এবং সম্পূর্ণ ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে পড়বে। অপরদিকে বৌদ্ধ কর্মকে মূলাধার রূপে স্বীকার করে না। ভগবান বুদ্ধ কর্মকে 'চেতনা' বলেছেন (চেতনাহং ভিক্খবে, কম্মং বদামি, অঙ্গুত্তর নিকায়, খণ্ড-৩ পৃ. ১২০) কর্ম যেহেতু চেতনা, সে তার ফল (পরিনাম)কে স্বয়ং অঙ্গীকার বা আকৃষ্ট করে নেয়। চেতনার প্রবাহে কর্ম কর্মফল এর সমগ্র ব্যবস্থা সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়। এই কারণে ফল প্রদানের ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত চেতন বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করার কোন প্রয়োজন নেই। এই অর্থে বৌদ্ধ ধর্ম হল অনীশ্বরবাদী ধর্ম।
বুদ্ধ বলেছেন, নিজের সুখ-দুঃখের উত্তরদায়ী প্রাণী স্বয়ং। নিজ অজ্ঞানতা এবং মিথ্যা দৃষ্টি দ্বারাই সে স্বয়ং নিজের দুঃখ উৎপন্ন করেছে, অতএব কোন দ্বিতীয় শক্তি অর্থাৎ ঈশ্বর বা মহেশ্বর তাকে মুক্ত করতে পারে না। এক্ষেত্রে তাকে স্বয়ং প্রয়াস করতে হবে। কারও বরপ্রদান বা কৃপা দ্বারা দুঃখ মুক্তি সম্ভব নয়।
"মনোপুব্বঙ্গমা ধম্মা, মনোসেঠা মনোময়া। মনসা চে পদুটেঠন, ভাসতি বা করোতি বা।
ততো নং দুকখমন্বেতি, চককং ব বহতো পদং।।১।।" ধম্মপদ, যমকবঙ্গো।
বুদ্ধ আত্মা'র প্রতি বিশ্বাস এবং 'সংসরণ' অর্থাৎ 'আত্মা'র এক শরীর হতে অপর শরীরে গমন ইত্যাদি বিশ্বাসকে সর্বদা পরিত্যাগ করেছেন। তিনি 'আত্মা' বিষয়ক সকল প্রচলিত সিদ্ধান্তকে কোনভাবেই গুরুত্ব প্রদান করেননি। তিনি 'আত্মা'কে না তো শরীর বলেছেন, না বেদনা, না তো সংজ্ঞা বলেছেন, না সংস্কার আর না তো বিজান বলেছেন। আত্মা'র অস্তিত্বকে তিনি উপেক্ষা এবং সর্বদা নস্যাৎ করেছেন। ভিক্ষু নাগসেন রাজা মিলিন্দকে বলেছেন, "আমাদের অভ্যন্তরে কোন আত্মার অস্তিত্ব নেই।"
বুদ্ধের সম্পূর্ণ ধর্ম এবং দর্শন "অণিত্য, দুঃখ, অনাত্ম" তে সমাহিত হয়ে যায়। বেদ, উপনিষদ এবং সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র ব্রহ্ম, ঈশ্বর আত্মতত্ত্বকে শাশ্বত মনে করে। কিন্তু বুদ্ধের সিদ্ধান্ত মতে জগৎ'এ কোনরূপ শাশ্বত তত্ত্ব বিদ্যমান নেই। বুদ্ধ তত্ত্বের বিভাজন ৩ প্রকার করেছেন, যা ক্রমশঃ এইরূপ-১, স্কন্ধ, ২. ধাতু এবং ৩. আয়তন। স্কন্ধ ৫ প্রকার হয়-১. রূপ, ২. বেদনা, ৩. সংজ্ঞা, ৪. সংস্কার এবং ৫. বিজ্ঞান।
রূপ'এ পৃথিবী, জন্ম, অগ্নি এবং বায়ু এই ৪ মহাভূত সম্মিলিত রয়েছে। বিজ্ঞান হল চেতনা বা মন। বেদনা সুখ-দুঃখ ইত্যাদির অনুভব হয়। সংজ্ঞাকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞান বলে। সংস্কার মনে নির্মিত বাসনাকে বলা হয়। এইভাবে বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার-রূপ'এর সম্পর্ক দ্বারা বিজ্ঞান (মন) এর ভিন্ন-ভিন্ন স্থিতি তৈরী হয়। ভগবান বুদ্ধ এই স্কন্ধকে "অনিত্য সংস্কৃত (কৃত) প্রতীত্য সমুৎপাদ ক্ষয় ধর্মযুক্ত ব্যয় ধর্মযুক্ত... নিরোধ (বিনাশ) ধর্মযুক্ত" বলেছেন।
আয়তন ১২টি ৬টি ইন্দ্রিয় (চক্ষু, শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায়া এবং মন) এবং ৬'এর (ইন্দ্রিয়) বিষয় রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্প্রষ্টব্য এবং ধর্ম ( বেদনা, সংজ্ঞা এবং সংস্কার)।
ধাতু ১৮টি উপরোক্ত ৬ ইন্দ্রিয় এবং ৬ বিষয়, এবং এই ইন্দ্রিয় তথা বিষয়ের দ্বারা উৎপন্ন ৬ বিজ্ঞান ( চক্ষু বিজ্ঞান, শ্রোত্র বিজ্ঞান, ঘ্রাণ বিজ্ঞান, জিহ্বা বিজ্ঞান, কায় বিজ্ঞান এবং মন বিজ্ঞান)।
প্রসঙ্গত স্মরণযোগ্য যে, মহাভূত, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান মূল অর্থে অনিত্য এবং অনাত্ম। মনুষ্য তার ভ্রম, অবিদ্যা এবং অজ্ঞানতার কারণে এই অনিত্যকে শাশ্বত, অজর, অমর আত্মা মনে করে। যারা (মিথ্যা দৃষ্টি সম্পন্ন অন্য মতালম্বী) বুদ্ধকে বিষ্মর অবতার মনে করে এবং এ ও বিশ্বাস করে যে বুদ্ধ আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করতেন, তাদের বিষয়ে বুদ্ধের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সঠিক, কেননা তিনি বলেছেন, "রূপ বেদনা সংজ্ঞা সংস্কার... বিজ্ঞান (এই ৫ স্কন্ধ) নিত্য, এব, শাশ্বত, অমর নয়। এই রূপ ব্যাখ্যা প্রদানের পরও যারা উপলব্ধি করতে পারেন না, তারা.... (-মুখ) অন্ধ, অজ্ঞানী, মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন.... সেক্ষেত্রে আমি কী বা করতে পারি।"
রূপ (ভৌতিক পদার্থ পৃথিবী, জল, বায়ু, অগ্নি)এর ক্ষণিকতা তো অতি সহজেই উপলব্ধি করা যায়। বিজ্ঞান (-মন) আরও ক্ষণভঙ্গুর, এই প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেছেন, "হে ভিক্ষুগণ। অজ্ঞান... পুরুষ এই চার মহাভূত'এর কায়াকে আত্মা (নিত্য তত্ত্ব) মনে করে, কিন্তু চিত্তকে (এইরূপ মনে করা) সঠিক নয়, কারণ কি?....চার মহাভূতের এই কায়া.... বেশ কিছু বৎসর বিদ্যমান থাকে; কিন্তু যাকে 'চিত্ত', 'মন'কে 'বিজ্ঞান' বলা হয়, তা ক্ষণে ক্ষণে উৎপন্ন হয়, বিনষ্ট হয়ে যায়।" বুদ্ধ কার্য কারণকে নিরন্তর বা অবিচ্ছিন্ন সন্ততি স্বীকার করেন নি।
বুদ্ধ মিথ্যাদৃষ্টিধারী কেবট্টপুত্ত ভিক্ষুকে বলেছিলেন, "মূর্খ (মোঘ-পুরুষ)। আমি তো বিজ্ঞান (জীব) কে নানাবিধ ভাবে প্রতীত্যসমুৎপন্ন বলেছি প্রত্যয় (-বিগত) ব্যতীত বিজ্ঞানের আবির্ভাব সম্ভব নয়। মোঘ পুরুষ। তুমি সঠিকভাবে বিষয়টি উপলব্ধি না করে মিথ্যাদৃষ্টির দোষে দুষ্ট হয়েছ।"
পুনঃ ভিক্ষুগণের প্রতি বুদ্ধ বলেছেন, "হে ভিক্ষুগণ। যে যে প্রত্যয় দ্বারা বিজ্ঞান (জীব) চেতনা উৎপন্ন হয়, সেইটি তার সংজ্ঞা হয়। চক্ষুর নিমিত্ত দ্বারা (যে) বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, তা চক্ষুবিজ্ঞান'এর সংজ্ঞা হয়। (এইভাবে) শ্রোত্র, ঘ্রাণ, রস, কায়া-, মন বিজ্ঞান সংজ্ঞা হয়। যেমন যে যে নিমিত্ত (প্রত্যয়) দ্বারা অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়, সেইটি তার সংজ্ঞা হয় কাষ্ঠ অগ্নি তৃণ-অগ্নি.... তুষ অগ্নি...।
"....এই (৫ স্কন্ধ) উৎপন্ন হয় এইটি উত্তম রূপে প্রজ্ঞা দ্বারা উপলব্ধি করলে (আত্মা) বিষয়টি'র সন্দেহ বিনষ্ট হয়ে যায়। কেননা আত্মার অস্তিত্বই নেই।
হে ভিক্ষুগণ! এই (৫ স্কন্ধ) উৎপন্ন হয় এই (বিষয়) সম্পর্কে তোমরা সকল সময় সন্দেহ মুক্ত থাকবে।
ভগবা বুদ্ধের এই বক্তব্য দ্বারা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় যে তিনি আত্মার অস্তিত্বকে স্বীকার করেন নি।
বৌদ্ধধর্ম এবং হিন্দু ধর্ম সম্পূর্ণ অর্থে ভিন্ন। উভয়ের স্বতন্ত্র ইতিহাস তথা স্বতন্ত্র পরস্পরা বিদ্যমান। হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি হতে, অপরদিকে শ্রমণ-সংস্কৃতির ধারা হতে বৌদ্ধ মধর্মের উৎপত্তি। ঐতিহাসিক তথা গবেষণাকারী বিদ্বানদের মতে শ্রমণ-সংস্কৃতির মূল স্রোত সিন্ধু সভ্যতা, বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির স্রোত হল বেদ, উপনিষদ এবং অন্যান্য বৈদিক গ্রন্থ।
সূত্ত পিটকে উপলব্ধ ধর্ম-বিবরণ এইভাবে প্রদর্শিত করা যেতে পারে
ধর্ম (নিরাত্মক, স্বলক্ষণ)
অসংস্কৃত (নির্বাণ-নিরোধ)
বিজ্ঞান বেদনা সংজ্ঞা সংস্কার
সংস্কৃত (প্রতীত্য সমুৎপাদ)
নাম
রূপ
মহাভূত
উপাদায়রূপ
আধ্যাত্মিক আয়তন বাহ্য আয়তন
বাচিক কায়িক চৈতসিক
বৈদিক যুগের পূর্ববর্তী সময়ে ভারতবর্ষে (মহেঞ্জোদরে এবং হরপ্পা) শ্রমণ সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। শ্রমণ সংস্কৃতি আর্য সংস্কৃতি হতে অধিক সমৃদ্ধ, মানবীয় এবং সুসংস্কৃত ছিল। এই তথ্য সিন্ধু সভ্যতার সংস্কৃতি দ্বারা প্রমাণিত হয়। অপরদিকে শ্রমণ সংস্কৃতির বিপরীত আর্য সংস্কৃতি ঈশ্বর চিন্তা, যাগ-যজ্ঞ এবং বলি প্রথায় বিশ্বাসী ছিল। ভগবান বুদ্ধের সময়কালে ভৌতিকবাদ, অজ্ঞানবাদ, নিয়তিবাদ এবং নিগন্ধ (জৈন) শ্রমণ সংস্কৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া কালবাদ এবং নিয়তিবাদ সম্পর্কিত উল্লেখ অথর্বসংহিতা, শমপথ ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় আরণ্যক, শ্বেতাশ্বত রোপনিষদ, মৈত্রায়নীয়োপনিষদ্ তথা মহাভারতে দৃষ্ট হয়।
মহাভারতে চার্বাক মতের উল্লেখ রয়েছে। পানিনি (৪,৪,৬০) আস্তিক এবং নাস্তিক উভয় মত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ড. সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত উপনিষদের রচনাকাল ৭০০-৬০০ খ্রীষ্টপূর্ব বলেছেন। ইশ্ ইত্যাদি ১১ উপনিষদে ও চার্বাক মতের তত্ত্ব ইতস্ততঃ বিকীর্ণ রয়েছে। সন্দেহবাদ চার্বাক দর্শনের মূল তত্ব।
"যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যেহস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি ঠেকে। এতদ্বিদ্যামনুশিষ্টস্তবয়া হহং.....।।" কঠোপনিষদ, ১।১।২০।
তথা:
দৈবেরত্রাপি বিচিকিতিসতং পুরা ন হি সুজ্ঞেয়মনুরেষ ধর্মঃ।
কঠোপনিষদ, ১।১।২১।
উপরোক্ত বচনে শরীর হতে ভিন্ন আত্মার অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দেহ ব্যক্ত করা হয়েছে। ভগবান বুদ্ধ ও 'অনাত্মবাদী' ছিলেন। সুতরাং-এই দৃষ্টি কোণ অনুসারে ভগবান বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার অথবা হিন্দু মতালম্বী রূপে আখ্যা প্রদানের বিষয়টি মিথ্যা এবং তঞ্চকতাপূর্ণা কেননা শ্রমণ সংস্কৃতির পুরোধা হওয়ার কারণে ভগবান বুদ্ধকে মহাশ্রমণ বলা হয়। অপরদিকে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে বেদ, উপনিষদ এর তত্ত্বগুলি কোথাও আলোচনা করেন নি, এই অর্থে আচার্য ধর্মকীতির ভাষায় তথাকথিত হিন্দু পণ্ডিতদের প্রতি এই শব্দ উল্লেখ করা যায় "ধিগ্ ব্যাপকং তমঃ"। ভগবান বুদ্ধের সকল উপদেশ মানবীয় মূল্য অর্থাৎ প্রজ্ঞা, মৈত্রী, করুণা, সত্য, শীল, সমাধি এবং অহিংসার প্রতি নির্ভরশীল, ফসে বৌদ্ধ সংস্কৃতি সম্পূর্ণ অর্থে স্বতন্ত্র।
পালি সাহিত্যের বিভিন্ন স্থানে 'বোধিসত্ব' শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক পণ্ডিত বর্গের মতে শাক্যমুণি (বুদ্ধ)'র অসংখ্য পূর্বজন্ম জাতক সাহিত্য দ্বারা প্রসিদ্ধ লাভের পর বোধিসত্ব চরিত্র বিস্তৃত লাভ করেছিল। খুদ্দক নিকায় 'এর অন্তর্গত 'বুদ্ধবংস' গ্রন্থে শাক্যমুণি (বুদ্ধ)'র পূর্বে ২৪ বুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন দীপঙ্কর, কোগুণ্য, মঙ্গল, সুমন, রেবত, সোভিত, অনোমদসী, পদুম, নারদ, পদুমোত্তর, সুমেধ, সুজাত, পিয়দসী, অথদসী, ধম্মদসী, সিদ্ধত্থ, তিস্স এবং ফুস্স। দীঘনিকায়'এর মহাপদান সুত্ততে ৭ বুদ্ধের উল্লেখ রয়েছে। যেমন- বিপসী, সিখী, বেসভু, ককুসন্ধ, কোনাগমন এবং গৌতম। এই গ্রন্থে (দীর্ঘনিকায়) তাঁদের উৎপাদ সময় এবং তাঁদের জাতি, গোত্র, আয়ু, বোধি বৃক্ষ, শ্রাবক-যুগ, শ্রাবক-সন্নিপাত, অগ্ন-উপস্থাতা, মাতা-পিতা তথা জন্মস্থানের বর্ণনা দৃষ্ট হয়।
আচার্য বুদ্ধঘোষ জাতকঠবন্ননা নিদান কথাতে বোধিসত্বের বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান করেছেন। জাতকাদি সাহিত্যে 'দশ পারমী' (১০ পারমিতা) বর্ণিত হয়েছে। এই ১০ পারমিতা এইরূপ দান পারমী, সীল (শীল), নেকখম্ম, পঞঞা, বিরিয়, খস্তি, সচ্চ, অধিষ্ঠান, মেত্তা এবং উপেক্ষা। এই হল মূল অর্থে বুদ্ধ কারক ধর্ম। খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত চরিয়া পিটকে'র ৩৫ জাতকে পারমিতার ভাবনা
রয়েছে।
ড. ওয়েবার (অন্ দি রামায়ণ, পৃঃ ১২৬) এবং দীনেশচন্দ্র সেন (দ্য বেঙ্গলী রামায়ণস্, ভূমিকা)'এর মতানুসারে 'দশরথ জাতক'এর বিকশিত রূপই হল হিন্দু 'বাল্মিকী রামায়ণ'। কেননা সর্বপ্রথম 'রাম-কথা' দশরথ জাতকেই প্রকট হয়েছিল। ঘত জাতক এ (৪৪৫) কৃষ্ণ এবং কংসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঘত জাতক অনুসারে কৃষ্ণ দাসী পুত্র ছিলেন। এইভবে বকব্রহ্ম জাতক (৪০৫), নিগ্রোধ জাতক (৪৪৫), মট কুণ্ডলী জাতক (৪৪৯), মহাকণ্ঠ জাতক (৪৬৯), চন্দকিন্নর জাতক (৪৮৫), মিস জাতক (৪৮৮) সহ অন্যান্য জাতকে যক্ষ, কিন্নর, নাগ, গরুড়, রাক্ষস ইত্যাদি যে সকল চরিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় এগুলি মূল অর্থে ছিল প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠী। যাদের ব্রাহ্মণ্য বাদী পুরাণ গ্রন্থে হীন বা নীচ তথা কাল্পনিক ভাবে বিকৃত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে বৌদ্ধ বোধিসত্বের ধারণা হতে উত্তরকালে হিন্দু পুরাণে অবতার বাদের ধারণা বিকশিত হয়েছিল। জাতক সাহিত্য এর উজ্জ্বল উদ্ধার।
চীন দেশে বৌদ্ধ দর্শনের সংস্কৃত গ্রন্থের চীনা ভাষায় অনুবাদগণের মধ্যে আচার্য কুমার জীব (৩৪৪, ৪১৩ খ্রীষ্টাব্দ) 'এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখনীয়। এইরূপ মনে করা হয়ে যে 'আচার্য বোধিধর্ম' (৪৬৩-৫২৪ খ্রীষ্টাব্ধ), যাকে চীন দেশে 'চান' (ধ্যান) সম্প্রদায়ের প্রথম আচার্য রূপে। গণ্য করা হয়, স্বয়ং 'লংকাবতার সূত্র' চীনে নিয়ে এসেছিলেন। আচার্য ধর্মরক্ষ (৪১২-৪৩৩ খ্রীষ্টাব্দ) সর্বপ্রথম চীনা ভাষাতে এই গ্রন্থের অনুবাদ সম্পূর্ণ করেছিলেন কিন্তু বর্তমানে অনুবাদ গ্রন্থটি পাওয়া যায় না। এই গ্রন্থের চীনা অনুবাদ গুণভদ্র ৪৩৩ খ্রীষ্টাব্দে করেছিলেন। লংকাবতার সূত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং তথাগত গর্ভ সম্প্রদায় ও যোগাচার বিজ্ঞানবাদ সম্প্রদায় দ্বারা সমান রূপে সমাদৃত। গ্রন্থের মূল বিষয় বস্তু রাক্ষসাধিপতি রাবণ এবং ভগবান তথাগত (বুদ্ধ) কর্তৃক সদ্ধর্থ সম্পর্কিত উপদেশ।
এখানে রামায়ণের ঐতিহাসিকতা এবং কাল নির্ণয় সম্পর্কে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যেমন পণ্ডিত মোহন লাল মাহাতো 'বিয়োগী' (জাতক কালীন ভারতীয় সংস্কৃতি, পৃঃ ৮) বলেছেন, সংস্কৃত রামায়ণ তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় 'পণ্ডিত মোহন লাল'এর বক্তব্যটি সত্য, তাহলে রামায়ণে ভগবান বুদ্ধের উল্লেখ থাকার কথা নয়। দ্বিতীয়ত, অযোধ্যা নগরীয় প্রাচীন নাম 'সাকেত' (বুদ্ধকালীন ভারতীয় ভূগোল) কিন্তু রামায়ণে অযোধ্যার রাজা দশরথ বলা হয়েএছ। তৃতীয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বহুল জনপ্রিয় রামায়ণের সঙ্গে হিন্দু রামায়ণের স্থান কাল পাত্র নির্ণয় করা কঠিন। চতুর্থত, মৌর্য যুগের ইতিহাসে রামায়ণের কোনরূপ উল্লেখ নেই, এমনকি কুষাণ যুগেও নয়।
অপরদিকে লংকাবতার সূত্রের মলু সংস্কৃত গ্রন্থ মহাযান সূত্রের বিস্তার কালে রচিত হয়েছিল (সম্ভবত কুষাণ যুগে)। অনেকের মতে যোগাচার সম্প্রদায়ের প্রবর্তক অসঙ্গের সময়কালে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবে রামায়ণ বুদ্ধ পূর্ব যুগে না কি উত্তরাকালীন যুগে রচিত হয়েছিল এই বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। গুপ্তযুগে (৩-৬ শতাব্দী) ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম (বর্তমান হিন্দু ধর্ম) নানা আঙ্গিকে বিকাশ লাভ করেছিল এবং এই সময়কালে হিন্দু ধর্ম অবতারবাদের আলোকে (বিষ্ণু ইত্যাদি) পৃষ্ট হয়। ফলে পৌরাণিক আখ্যানধর্মী সাহিত্য বিকাশ লাভের বিষয়টি অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। কেননা ব্রাহ্মণ্যধর্মের উত্থানের যুগে ধর্মের অলৌকিকতা সম্পর্কিত গল্পরস দেবতার মাহাত্ম্য প্রচারের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। অপরদিকে সৃষ্টি, ধর্ম, আচার-ব্যবহার এবং বর্ণ ব্যবস্থার প্রতি ভিত্তি করে সংযোজিত হল তথাকথিত যুগ ধর্মের নতুন নতুন লক্ষণ। পুরাণের ৫টি লক্ষণ সর্গ, প্রতিসর্গ, বংশ (দেবতা এবং ঋষিগণের জন্ম বর্ণনা) মন্বন্তর, (মণুগণের বিবরণ), বংশানুচরিত (নৃপতি গণের বংশের ইতিহাস), ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ও ভাগবত পুরাণে আবার ১০টি করে লক্ষণের উল্লেখ রয়েছে (পঞ্চলক্ষণাক্রান্ত পুরাণ এবং দশম লক্ষণাক্রান্ত পুরাণ)। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের মূল বিষয় বস্তু সৃষ্টি, প্রলয়, চতুর্দশ মণুর গুণকীর্তন, হরির মাহাত্য এবং পৃথকরূপে দেবগণের গুণকীর্তন। মৎস পুরাণে এইভাবেই এসেছে বর্ণাশ্রম বিভাগ, ইষ্টাপূর্ব, দেব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।
বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাব এবং তার ব্যাপক বিস্তার বৈদিক ধর্মকে এক প্রকার খর্ব করেছিল। কেননা বৌদ্ধ ধর্ম দেবভাবনার পরিবর্তে কর্মবাদের দ্বারা বিশ্বধর্মে পরিণত হয়েছিল। এমতবস্থায় বৈদিক তথা উত্তরকালীন ব্রাহ্মণ্যধর্ম নিজ অস্তিত্বকে বজায় রাখার প্রশ্নে শুধু অলৌকিক শক্তিকে কল্পনা করা, তাঁকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা বা তাঁর মূর্তি নির্মাণ করে পূজা-অর্চনা করা ইত্যাদির মধ্যে সন্তুষ্ট রইল না, ফলে দেবতার নানারূপে আবির্ভাব'এর মাহাত্ম্য প্রচারের মাধ্যমটি ও মুখ্য হয়ে উঠল।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে বিষ্ণু পুরাণ এবং গরুড় পুরাণ ব্যতীত কোথাও বুদ্ধের উল্লেখ নেই। বিষ্ণু পুরাণে কোনারকের সূর্য মন্দিরের (যার নির্মাণ কাল ১২৪১ খ্রীষ্টাব্দ) উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই স্বাভাবিক অর্থে এই পুরাণ কখনই প্রাচীন নয়। অপরদিকে বৌদ্ধধর্মের প্রামাণিক গ্রন্থ ত্রিপিটক এবং অনুপিটক গ্রন্থে বিষ্ণু ইত্যাদি দেবতার কথা কিম্বা ভগবান বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার রূপে স্বীকার করার বিষয়টিও দৃষ্ট হয় না, সুতরাং বুদ্ধকে বিষ্ণুর নবম অবতার প্রত্যয়ের জন্ম কিভাবে হল? এইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এর সমাধান অত্যন্ত আবশ্যক। হিন্দু পুরাণ কল্কি অবতার মতে বিষ্ণু কল্কি রাজা (১০ম অবতার) রূপে এই ধরাতলে আবির্ভূত হবেন এবং কল্কির মুখ্য কাজ হবে নাস্তিক তথা বৌদ্ধদের হাত থেকে ধর্মকে রক্ষা করা।
হিন্দু পুরাণের বিরোধাভাগ তত্ব প্রমাণ করে যে বৌদ্ধধর্ম হিন্দুধর্ম নয়। শুঙ্গ রাজবংশের সংস্থাপক পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ছিলেন ঘোর বৌদ্ধ বিদ্বেষী, তাঁর সময়কালে এবং পরবর্তী শুঙ্গ শাসক গণ বর্ণ ব্যবস্থা, জাতপাত তথা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে প্রতিপাদন করেছিলেন। কেননা বৌদ্ধ ধর্ম এবং মহামতী অশোকের উত্থানে (মৌর্য যুগে) এক বৃহত্তর ভারতের ইতিহাস ব্রাহ্মণ্যধর্মের শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। উত্তরকালে অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদী শুঙ্গ যুগে হিন্দু অবতার বাদের উত্থানে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অবিশ্বাসী বুদ্ধ এবং বৌদ্ধস্তূপ তথা অন্যান্য বৌদ্ধ স্থাপত্য সমূহ কোথাও শিব লিঙ্গ, কোথাও বিষ্ণুর অবতার'এ পরিণত হয়।
পুষ্যমিত্র শুঙ্গের বৌদ্ধ বিরোধী কার্য কলাপ সর্বজন বিদিত। দিব্যাবদান (পৃ: ২৮২) এবং লামা তারনাথ (পৃ: ৮১) পুষ্যমিত্রকে বৌদ্ধ বিরোধী বলেছেন। বলা হয়েছে যে, পুষ্যমিত্র সদ্ধর্থ (বৌদ্ধ ধর্ম) বিনাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পাটলিপুত্রে'র কুককুটারাম বিনষ্ট করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর সময় কালে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা, স্তূপ তথা বিহার বিনষ্ট হয়েছিল।
খ্রীষ্টপূর্ব ২-৩ শতাব্দী পর্যন্ত পূর্ব দক্ষিণাপথের কৃষ্ণা এবং গুন্টুর অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। সাতবাহন রাজা ইক্ষাকুক্ষের পর বৃহৎফলায়ন এবং পল্লবদের শাসনকালে ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির পুনরুত্থানের কারণে বৌদ্ধ অবলোকিতেশ্বর ও বোধিসত্বকে বিকৃত করে বিষ্ণু তথা শিবের মূর্তিতে পর্যবসিত করা হয়। এই পরস্পরা পল্লব যুগে অধিক মাত্রায় বিকাশ লাভ করেছিল।
৫ম হতে ৭ম শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) কালে বৌদ্ধ এবং হিন্দু মতালম্বীদের অভ্যন্তরে দার্শনিক সংঘর্ষ চরমসীমায় উপনীত হয়েছিল। একদিকে বৌদ্ধদের প্রতি তৎকালীন শাসক বর্গের চরম অবহেলা তথা অপরদিকে হিন্দু বার্তিককার উদ্যোতকর এবং কুমারিল ভট্টের আবির্ভাব।
৮ম শতাব্দীতে গৌড় পাদ অদ্বৈত বেদান্তকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করলে তাঁর প্রশিষ্য শঙ্করাচার্য রাজানুগ্রহ লাভ পূর্বক বৌদ্ধ শাস্ত্রগুলিকে বিনষ্ট করে দেন। ৯ম-১০ম শতাব্দীতে (খ্রীষ্টাব্দ) বাচস্পতি মিশ্র, জগন্নাথ ভট্ট প্রমুখ আত্মবাদকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করলে ১২ শতাব্দীর অন্তিম লগ্নে উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্যভারত হতে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়।
লামা তারনাথের মতে (পৃ: ২০২-২৫৭) পালযুগে সদ্ধর্থ মগর্ব, ভঙ্গল-ওডিবিশ, অপরান্তক জনপদ, কাশ্মীর এবং নেপালে বিস্তৃতি লাভ করেছিল। তবে এই সময় সদ্ধর্থের রূপ (বৌদ্ধধর্ম) মূল অর্থে মহাযান এবং মন্ত্র নয় ছিল।
উপরোক্ত আলোচনা হতে বৌদ্ধধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের আধার ভূত দার্শনিক প্রত্যয়কে এইভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন-
১। বৌদ্ধধর্ম অনুসারে জগৎ'এর প্রত্যেকটি তত্ত্ব ক্ষণে-ক্ষণে পরিবর্তনশীল। এই কারণে বৌদ্ধধর্ম ক্ষণিকবাদী।
২। সৃষ্টি এবং জগৎ'এর স্রষ্টা ইশ্বর এবং ব্রহ্মা ইত্যাদি নয়। সৃষ্টি মূলতঃ দ্বন্ধ তত্বের পরিনাম।
৩। বৌদ্ধ মতে ইশ্বর ইত্যাদি কর্মবাদের নির্ণায়ক নয়, কেননা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে তা সম্ভব নয়।
৪। বৌদ্ধ দর্শনে জ্ঞান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রমাণ প্রত্যক্ষ এবং অনুমানকে স্বীকার করা হয়, যা বৈজ্ঞানিক।
৫। বৌদ্ধ ধর্মকে শূদ্র এবং নারীদের প্রতি শোষণ উৎপীয়ন ইত্যাদি স্বীকৃতি নয়, কেননা বৌদ্ধধর্ম বর্ণাশ্রম প্রথায় বিশ্বাস করে না।
৬। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্ম গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে প্রাধান্যদেয় এবং কোনরূপ স্বৈরাচার বা দ্বিচারিতা'র বিষয়টিকে বৌদ্ধরা প্রাধান্য দেয় না।
৭। বৌদ্ধ ধর্মে সকল মানুষের শিক্ষা, নৈতিকতা এবং মহানুভবতার প্রতি সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। এই কারণে বৌদ্ধধর্মে অস্পৃশ্যতাকে স্বীকার করা হয় নি।
তথাকথিত হিন্দু অবতারের বিপরীত মহামানব ভগবান বুদ্ধ'র চরিত্র নিষ্কলঙ্কক ছিল। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুসারে শীল, মৈত্রী, করুণা এবং প্রজ্ঞা বিশ্বমানব জাতির মুক্তির একমাত্র পথ। তাঁর ধর্মে পঞ্চশীল, অষ্টশীল এবং ভিক্ষু-ভিক্ষুণীর ক্ষেত্রে বৌদ্ধ বিনয় নিয়ম অনুসরণ তথা পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভগবান বুদ্ধ সকল সময় জীবহত্যা এবং জীব হিংসার প্রতি বিরুপাচরণ করেছেন এবং বলেছেন "যেরূপ আমি সেইরূপই অন্যজীব, যেরূপ অন্যজীব, সেইরূপই আমি। এই কারণে আমি কোন জীব কে হত্যা, না তো হত্যা প্রদানের অনুমতি, সহমতি এবং আদেশ প্রদান করি না।"
মহামানব বুদ্ধের ধর্ম এতটাই সুস্পষ্ট যে পৃথিবীর বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলি সহ অনেক ইউরোপীয় পণ্ডিত হিন্দুধর্মের এই তথ্য স্বীকার করেন না। যে বুদ্ধ বিষ্ণু'র অবতার। কেননা প্রাচীন ভারতবর্ষের পুরাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য প্রমান করে একসময় এইদেশ (জম্বুদ্বীপ) বৌদ্ধধর্মের মূল ক্ষেত্র ছিল।
ভারতে উত্তরকালে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম দ্বারা যেভাবে ভগবান বুদ্ধের ঐতিহাসিক ক্ষেত্র তথা মূর্তি, স্তূপ, বিহার, চৈত্য ইত্যাদিকে যেভাবে হিন্দু দেব-দেবীর রূপ প্রদান করা হয়েছে বা হয়ে চলেছে তা পৃথিবীর কোন উন্নত দেশে সেভাবে হয় নি। বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র নালন্দা মহাবিহারে স্থির বুদ্ধ প্রতিমাকে অশুভ শক্তির প্রতীক 'ঢেলা বাবা' বলা হয়। ব্রাহ্মণগণ এই মিথ্যা তথ্য প্রচার করে চলেছে যে এই মূর্তিকে যদি মৃত্তিকা খণ্ড দ্বারা আঘাত বা নিক্ষেপ না করা হয়, তাহলে অনর্থ হবে। বর্তমানে এই বুদ্ধ মূর্ত্তিকে 'তেলিয়া বাবা' নামে অভিহিত করা হয়।
এইভাবে কুষাণ, চন্দ্র, হর্ষস্ক এবং পালযুগে নির্মিত বুদ্ধ মূর্ত্তি সহ অন্যান্য বৌদ্ধ প্রতীক সমূহ কালান্তরে বৌদ্ধ বিদ্বেষী রাজা তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির প্রবাহে বিনষ্ট করে দেওয়া হয়। মহান মৌর্য সম্রাট অশোক দ্বারা নির্মিত মহাবিহার, ৮৪ হাজার বৌদ্ধ স্তূপ এবং চৈত্য শুষ্ক যুগে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল। চৈনিক পর্যটক সুয়াঙ জাঙ (হিউয়েন সাঙ) এর বিবরণ হতে তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। বৌদ্ধ ধর্ম একটি বটবৃক্ষের ন্যায় সুবিশাল। যেভাবে বটবৃক্ষ অন্য কোন বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা হতে পারে না, ঠিক সেইভাবে বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দুধর্মের শাখা কখনই নয়। বৌদ্ধ ধর্ম মূল অর্থে সম্পূর্ণ একটি স্বতন্ত্র ধর্ম। পালি-পিটক সাহিত্য, অটঠকথা, সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্য, বংস-সাহিত্য ইত্যাদি বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহের কোথাও হিন্দু দেব দেবী তথা অবতার বাদ (বুদ্ধ বিষ্ণুর অবতার ইত্যাদি) সম্পর্কিত কোনরূপ তথ্যই পাওয়া যায় না। এমন কি বৌদ্ধ সঙ্গীতি সমূহে ভগবান বুদ্ধের ধর্ম দেশনা (মূল বুদ্ধ বচন) সমূহ বিনয়, সুত্ত এবং অভিধর্ম রূপে (ত্রিপিটক) সংকলিত করা হয়েছে। বৌদ্ধ শাস্ত্রের সম্পূর্ণ অংশে ঈশ্বরবাদ স্বীকৃত হয়নি। বুদ্ধ সকল সময় ঈশ্বরবাদকে মিথ্যাদৃষ্টি রূপে বর্জন তথা তিরস্কার করেছেন।
মহাপরিনির্বাণ সূত্রের মার্মিক অর্থ এই সত্যই প্রমাণ করে। ভগবান বুদ্ধ তাঁর মহাপরিনির্বাণ কালে ভিক্ষু সংঘ'র প্রতি এইরূপ দেশনা প্রদান করেছেন, "নতমানন্দ তথাগতসস ধম্মেসু আজরিয়মুটিঠ।... তস্মতিহানন্দ অন্তদীপা বিহরথ অত্তসরণা অনঞসরনাস ধম্মদীপা ধম্মসরণা অনঞসরণা।"
অর্থাৎ তথাগতের ধর্মে আচার্য মুষ্টি নেই। অতএব আনন্দ, আত্মদীপ হয়ে আত্মশরণ, অনন্যশরণ, ধর্মদীপ, ধৰ্ম্মশরণ, অনন্যশরণ হয়ে তোমরা বিচরণ কর। এই মার্মিক দেশনার মাধ্যমে বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের অদ্ভুত রূপ পরিস্ফুট হয়।
অপর অর্থে বলা যায় যে ভগবান বুদ্ধের ধর্ম দর্শন ত্রিশরণ, পঞ্চশীল, অষ্টশী, অষ্টাঙ্গিক মার্গ, চার আর্য সত্য, অনিত্যতার সিদ্ধান্ত, অনাত্মবাদ, অনীশ্বরবাদ, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা এবং সমানতার সিদ্ধান্ত দ্বারা স্থাপিত হয়েছে। ভগবান বুদ্ধের সকল উপদেশের সর্বোচ্চ সাধ্য হল দুঃখ হতে নিবৃতি এবং নির্বাণের প্রাপ্তি। এই হল মূল অর্থে ধম্ম। দীঘ নিকায়'এ বলা হয়েছে-
"খণ্ডী পরমং তপো তিতিকথা নিব্বানং পরমং বদন্তি বুদ্ধা। নহি পব্বজিতো পরূপধাতী সমনো হোতি পরং বিহেঠয়স্তো।।
সব্বপাপসস্ অকরণং কুসলস্য উপসম্পদা।
সচিত্তপরিয়োদপনং এতং বুদ্ধান সাসনং।।"
আকর্ষণ কুঞ্চিকাসূচী :
১। বৌদ্ধধর্ম বিকাশের ইতিহাস, ড. গোবিন্দ চন্দ্র পান্ডে, উত্তর প্রদেশ হিন্দু সংস্থান, লখনউ, ২০১৮।
২। বুদ্ধকালীন ভারতীয় ভূগোল, ভরত সিংহ উপাধ্যায়, সম্যক প্রকাশন, নতুন দিল্লী, ২০১৫।
৩। পালি সাহিত্যের ইতিহাস, ভরত সিংহ উপাধ্যায়, উত্তর প্রদেশ হিন্দি সংস্থান, লখনউ, ২০১২।
৪। সংস্কৃত বাঙময়'এর বৃহৎ ইতিহাস, বেদ, অধ্যাপক ফুলচন্দ্র জৈন এবং রামশংকর ত্রিপাঠী, উত্তর প্রদেশ সংস্কৃত সংস্থান, লখনউ, ২০০৭।
৫। প্রাগুক্ত, উপনিষদ এবং পুরাণ, ২০০৭।
৬। রামায়ণ, রামশংকর ত্রিপাঠী, উত্তর প্রদেশ সংস্কৃত সংস্থান লখনউ, ২০০৭।
৭। বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দু ধর্মের শাখা নয়, ড. ধর্মকীর্তি, সম্যক প্রকাশন, নূতন দিল্লী, ২০১৬।
৮। বৌদ্ধ ধর্ম দর্শন, আচার্য নরেন্দ্র দেব, বিহার হিন্দি গ্রন্থ একাডেমী, পাটনা, ১৯৮০।
৯। বৌদ্ধ সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস, ভারতীয় বুকস্, ভাগচন্দ্র জৈন 'ভাস্কর', লখনউ, ২০২২।
১০। বৌদ্ধ দর্শন, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, উত্তর প্রদেশ হিন্দি গ্রন্থ একাডেমী, বারাণসী, ১৯৯৮।
No comments:
Post a Comment