ভূমিকা
হীনযান বৌদ্ধধর্ম: প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মের দর্শন মূর্ত হয়ে ওঠে হীনযান বা বৌদ্ধধর্মের অপ্রধান শাখার মধ্যে যেটি পরিণতি লাভ করে বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর থেকে খ্রীষ্টাব্দের শুরু পর্যন্ত সময়ে এবং তারপর হীনযানী দর্শনকে নতুন উদ্ভূত মহাযানী দর্শনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়। হীনযান সম্প্রদায়গণ নিজেরাও কোনওভাবেই সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ছিল না কারণ বুদ্ধের পরিনির্বাণের অল্প কিছু সময় পরেই তা অনেকগুলি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে যারা পূর্ববর্তী দর্শনের পৃথক পৃথক ব্যাখ্যা দিয়েছিল। হীনযান শাখার আঠারোটি শাখার মধ্যে মাত্র দুটিকে বর্তমানকালে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই দুটি হল স্থবিরবাদী (বা পালি থেরবাদী) এবং দ্বিতীয়টি হল সর্বাস্তিবাদী।
প্রথমটি সম্ভবত সেই সম্প্রদায় যা প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের দর্শনগুলির সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। এটি শীঘ্রই ভারতবর্ষে তার প্রভাব হারায় কিন্তু সিংহল, ব্রহ্মদেশ ও শ্যামদেশে তার প্রভাব বজায় রাখে। সর্বাস্তিবাদীরা ছিলেন আরো পাণ্ডিত্যপূর্ণ। তাঁরা বৌদ্ধধর্মকে একটি সম্পূর্ণ এবং ধারাবাহিক দর্শনে পরিণত করেছিলেন, এবং ধ্রুপদী সংস্কৃতে তাঁদের গ্রন্থগুলিকে রচনা বা অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত সরল স্থবিরবাদীরা তাদের পূর্ববর্তী কথ্য, জনপ্রিয় এবং অমার্জিত পালি ভাষাকে অপরিবর্তিত রেখেছিলেন। মনে হয় খ্রীষ্ট জন্মের কিছু সময় পূর্ব থেকে ভারতবর্ষে সর্বাস্তিবাদীরা প্রাধান্য বিস্তার করেছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে হীনযানী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায় ছিল। অধিকাংশ হীনযানী রচনা যা চৈনিক ও তিব্বতীয় প্রভৃতি বিদেশী ভাষায় রচিত হয়েছিল তা এই সম্প্রদায়ের অর্ন্তগত ছিল এবং যদিও একটি স্বতন্ত্র হিসেবে এটি ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের অবলুপ্তির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অর্ন্তহিত হয়েছিল। তবুও পরবর্তী যে সম্প্রদায়গুলি টিকে গিয়েছিল তাদের দার্শনিক বিকাশের উপর এর এক গভীর প্রভাব ছিল। প্রকৃতপক্ষে সর্বাস্তিবাদই ছিল হীনযানের অপর এক প্রধান শাখা।
এমন কি প্রাচীনতর স্থরিববাদী সম্প্রদায় যারা শাক্যমুনির শিক্ষাকে অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করার জন্য গর্ব অনুভব করত তারা অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সংযুক্ত করেছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল এটি পূর্ববর্তী বিশ্বাসের অজ্ঞেয়বাদকে বাস্তবে পরিত্যাগ করেছিল এবং ইন্দ্রিয় সংবেদনের উপর নির্ভর করে বিষয়গত বাহ্যজগৎকে বিন্যস্ত করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, এইভাবে এটি কিছুটা সংশোধিত রূপে ভারতবর্ষের প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্বকে তার ভূগোল, জ্যোর্তিবিজ্ঞান এবং বাহ্যিক জগতের সংযুক্তি এবং বিযুক্তির বর্ণনা সহ গ্রহণ করেছিল। প্রাচীন বৌদ্ধধর্ম পরমতত্ত্বের অস্তিত্বকে গুরুত্ব দেয়নি এবং স্থরিববাদীরা পরম তত্ত্বের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছিল। প্রাচীন বৌদ্ধরা যে সমস্যাগুলিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে গুরুত্ব দেননি, স্থবিরবাদীরা সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দিয়েছিলেন, যদিও সেই সত্যগুলি পরম সত্যের পরিবর্তে আপেক্ষিক সত্যের কথাই বলেছিল। স্থবিরবাদী সম্প্রদায় কেবলমাত্র তিনটি চিহ্ন ও চারটি আর্য সত্য নিয়ে গঠিত ছিল।
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছিল সেটি হল অস্তিত্বের অংশের বিশ্লেষণ যেটিকে প্রথমে আলোচনা করা হয়েছিল মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষা ছিল অহং অস্তিত্বের পরিবর্তে ব্যক্তিত্ব পাঁচটি অংশ নিয়ে গঠিত হয় (স্কন্ধ) মন-রূপ (অর্থাৎ দেহ), বেদন (সংবেদন বা অনুভূতি), সংজ্ঞা (ধারণা), সংস্কার (এখানে এর অর্থ হল বিভিন্ন মানসিক বৈশিষ্ট্য) এবং বিজ্ঞান (চেতনা)। স্থবিরবাদী বা রূপ বা বাহ্য জগৎকে ২৭ বা ২৮টি অংশে, সংবেদনকে ৩ বা ৫টি অংশে, সংজ্ঞাকে ৬টি অংশে, মানসিক গুণকে ৫২টি অংশে এবং চেতনাকে ৮৯টি অংশে ভাগ করেছিলেন।
এই বিভাগগুলি ছিল অর্ন্তদর্শনমূলক বিশ্লেষণের ফলাফল কিন্তু এদের পরম ও চূড়ান্ত বলে মনে করা হত। এই বিভিন্ন বিভাগগুলি অস্তিত্বের অপরিবর্তনীয় উপাদান নিয়ে গঠিত ছিল যেখান থেকে সমস্ত বাহ্যিক বস্তুর উৎপত্তি হয়েছিল। এইভাবে বৌদ্ধধর্ম শুধুমাত্র দুঃখ এবং দুঃখ দূর করার দর্শনে বিশ্বাসী একটি অজ্ঞেয়বাদী এবং বাহ্য প্রত্যক্ষবাদী দর্শন থেকে ক্রমশ বাস্তববাদী ও জড়বাদী দর্শনে পরিণত হল। যদিও পরিবর্তনটি হয়েছিল ক্রমশ এবং সেই সময়ে সেটিকে একেবারেই বোঝা যায়নি, কারণ প্রাথমিক বৌদ্ধধর্ম বিষয়গত পর্যায়ের বিশ্লেষণের অনুমোদন দিয়েছিল। এবং স্থবিরবাদীদের অস্তিত্বের উপাদানগুলি শুধুমাত্র প্রাথমিক বৌদ্ধধর্মের বিভাগগুলিকে পুর্ণবিভক্ত করে ব্যাখ্যা করেছিল এবং একই সঙ্গে বিষয়গত ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে বজায় রেখেছিল।
প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে স্থবিরবাদীদের যে সম্পর্ক ছিল স্থবিরবাদীদের সঙ্গে সর্বাস্তিবাদীদের তাই সম্পর্ক ছিল। স্থবিরবাদীদের জড়বাদ ও বাস্তববাদকে আরও স্পষ্ট ও জোরালো করা হল; অজ্ঞেয়বাদী ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যটি থেকে দৃষ্টি সরে গেল। এইভাবে বৌদ্ধধর্ম একটি নির্দিষ্ট ও কঠোর দার্শনিক ব্যবস্থায় পরিণত হল এবং সেটি অধিবিদ্যাকে মান্য না করা কতগুলি সত্যের সংগ্রহ আর রইল না। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল যখন অস্তিত্বের উপাদানগুলিকে বাহ্যিক বিষয়গত এবং বিষয়ীগত উভয় দিক থেকে শ্রেণীবিভাগ করা হত। প্রাথমিক শ্রেণীবিভাগটি বজায় ছিল (যদিও প্রতিটি স্কন্ধের উপবিভাগ স্থবিরবাদীদের উপবিভাগের থেকে কিছুটা পৃথক ছিল), কিন্তু শ্রেণীবিভাগগুলিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছিল যে এরা বাহ্যিক বিশ্বজগতের এক সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ গঠন করেছিল।
অভিধর্ম কোষ অনুসারে এই উপাদান (বা ধর্মগুলি) গুলি সংখ্যায় ৭৫টি এবং এদের নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণীবিভাগ করা হয়:-
অসংস্কৃত ধর্ম বা সরল উপাদানগুলিকে এই নাম দেওয়া হয় কারণ এরা অন্যান্য পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হয় না। এরা সংখ্যায় ৩টি যাদের মধ্যে দুটি হল স্থান এবং নির্বাণ।
সংস্কৃত ধর্ম বা জটিল উপাদানগুলিকে এই নাম দেওয়া হয় কারণ যদিও এরা সরল ও স্থায়ী কিন্তু এরা অন্যান্য পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়। এদের যৌগ থেকে বিশ্বজগৎ তৈরি হয়। এগুলি সংখ্যায় ৭২টি এবং নিম্নবর্ণিত ভাগে বিভক্ত:
১) বস্তুগত পদার্থ: সংখ্যায় ১১টি।
২) মন, সংখ্যায় ১টি।
৩) মানসিক গুণাবলী যেমন ভালবাসা, ঘৃণা, সংখ্য
৪) বিবিধ উপাদান, যেমন জীবন, মৃত্যু ইত্যাদি সংখ্যায় ১৪টি।
উনবিংশ শতকে বিজ্ঞানীরা আশিটির বেশী পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। এই পদার্থগুলিও অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী। বর্তমান পরিস্থিতিতে আশা করা হয় সমস্ত বস্তুই অস্থায়ী ও অস্থিতিশীল হবে কিন্তু এগুলি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল ও অপরিবর্তনীয়।
হীনযান থেকে মহাযানের উত্তরণ: সম্পূর্ণ অবস্থায় হীনযান তিনটি নিয়মের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। এগুলি হল (১) প্রতিটি মানুষের উচিত অর্হত্ব লাভবা জীবন ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিলাভের জন্য প্রচেষ্টা করা (এটি ছিল ধর্মীয় দিক)। (২) প্রতিটি বাহ্যবস্তু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক স্থিতিশীল মৌলের অস্থিতিশীল যৌগ (এটি ছিল দার্শনিক দিক)।
এই দুটি সম্প্রদায়ের কোনটিই প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের নীতিগুলিকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেনি। প্রথমটির ক্ষেত্রে অর্থাৎ হীনযানের অর্হৎ যিনি শুধুমাত্র নির্বাণ বা মুক্তি অর্জন করেছিলেন তাঁর সঙ্গে বুদ্ধ যিনি ইতিমধ্যেই পরম মুক্তি অর্জন করেছিলেন একটি পার্থক্য করা হয় বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে তিন প্রকার পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে (১) অর্হত্ব বা নিছক মুক্তিলাভ, (২) প্রত্যেক বুদ্ধত্ব বা ব্যক্তিগত বুদ্ধত্ব, বা শুধুমাত্র নিজের জন্য পরম জ্ঞানলাভ, (৩) যথার্থ বুদ্ধত্ব, পৃথিবীর সকল প্রাণীকে মুক্তিলাভ করার জন্য পরম জ্ঞান। হীনযান অনুসারে প্রতিটি বিভাগের মধ্যে যে এক বিশাল পার্থক্য রয়েছে শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের পক্ষে শুধুমাত্র অর্হত্ব লাভ করা সম্ভব; দশ লক্ষের মধ্যে মাত্র একজন প্রত্যেক বুদ্ধত্ব লাভ করতে পারেন এবং অনেকগুলি চক্রে মাত্র একজন বুদ্ধত্ব অর্জন করতে পারেন। প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মে পক্ষান্তরে বুদ্ধ ও তাঁর মুক্তিকামী শিষ্যদের মধ্যে শুধুমাত্র পরিমাপের পার্থক্য এবং সকলেই পরম লক্ষ্য লাভ করতে সক্ষম।
দ্বিতীয় বিষয়টি সম্পর্কে বলা যায় যে প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মের অনিত্যতার দর্শন বিশ্বজগতের সমস্ত অংশের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এমন ধরে নেওয়া হত। সমস্ত কিছুই এমন কি কোন সত্তার অংশকেই সর্বদা প্রবাহমান বলে মনে করা হত যার ফলে স্থির ও অপরিবর্তনীয় উপাদানের সংখ্যার দর্শন যা পরম সত্তা গঠন করে তাকে জীবনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুতি বলে মনে হয়। আধ্যাত্মিক স্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ধর্ম বা উপাদানগুলিকে জটিল, কার্যকারণ সম্পর্কযুক্ত, শর্তাধীন ও পরিবর্তনের অধীন বলে মনে করতে হবে।
এই দুটি বিষয়েই মহাযানীরা হীনযানীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এবং মূল বৈশিষ্ট্যটিকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিল। তারা দাবী করে যে তাদের শিক্ষা আরও নিখুঁতভাবে বুদ্ধের শিক্ষার অর্থকে প্রকাশ করে। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে সংস্কারের এই ইচ্ছার ফলে ধর্ম দর্শনের এক নতুন সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়েছিল। এটি পূর্ববর্তী বিশ্বাসের কিছু মূল নীতিকে বজায় রাখলেও তার দর্শনের সামান্য অংশকেই স্বীকার করত। উদাহরণস্বরূপ, বুদ্ধের আদর্শের সর্বজনীনতাকে নেওয়া হলে বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের পার্থক্যও লোপ পাবে।
মহাযান যা আবেগ ও ভক্তিমূলক উপাদানকে বেশী প্রভাবিত করেছিল তা অর্হত্বের আদর্শকে স্বার্থপর বলে মনে করেছিল। এটি আত্মোৎসর্গের আদর্শ দ্বারা এতটাই অনুপ্রাণিত হয়ে একথা ঘোষণা করেছিল যে যারা আত্মমুক্তি বা শুধুমাত্র নিজের জন্য বোধিজ্ঞান লাভের চেষ্টা করছেন তাঁদের লক্ষ্য হতে পারে। শুধুমাত্র অর্হত্ব বা প্রত্যেক বুদ্ধত্ব কিন্তু তারা এই দাবী করেছিল যে তাদের অনুগামীরা নিম্নস্তরীয় আকাঙ্খাকে পরিত্যাগ করা পছন্দ করবে, যাতে করে তারা সকলের রক্ষক বুদ্ধ হতে পারেন। একবার এই দর্শনটি উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং আমরা অনেক রচনার অংশ পাই যেখানে মহত্তম নিঃস্বার্থপরতার কথা বলা হয়েছে।
প্রারম্ভিক মহাযান অনুসারে সমস্ত অনুগামীদের বলা হত বোধিসত্ত্ব বা ভাবী বুদ্ধ এর বিপরীতে হীনযানের অনুগামীদের বলা হত শ্রাবক, যাদের লক্ষ্য হল নিছক অর্হত্বমাত্র।
পরবর্তীকালের মহাযান বা তথাকথিত প্রকৃত মহাযানীরা আদর্শটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেলেন, এবং এই মত প্রচার করেন যে পরমজ্ঞান (বুদ্ধত্ব) হল সকলের জন্যই চূড়ান্ত লক্ষ্য। বিখ্যাত মহাযানী ধর্মসাহিত্য সদ্ধর্মপুণ্ডরিক সূত্রের প্রথমার্ধে দেখানো হয়েছে যে বাস্তবে একটিমাত্র পথই রয়েছে অবশিষ্ট লক্ষ্যগুলি হল উপায় মাত্র এবং সেই পথেই বুদ্ধগণ পৃথিবীর মানুষকে জড়বাদ ও ইন্দ্রিয় সুখের জগৎ থেকে মুক্ত করেন।
মহাযান যদিও বুদ্ধত্ব অর্জনের দ্বার সকলের জন্য উন্মুক্ত করেছিল কিন্তু অদ্ভুতভাবে মহাযান বুদ্ধগণের মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রভাব তথা অলৌকিকতা প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছিল। হীনযানে বুদ্ধগণ বিশুদ্ধ, সাধারণ মানুষ, কিন্তু মহাযানে তাদের স্বর্গীয় অবতার বলে মনে করা হয় বা সর্বব্যাপী বুদ্ধের সেই পার্থিব প্রকাশ বলে মনে করা হয়।
হীনযানী সূত্রগুলিতে ধর্মোপদেশদান করেছিলেন শাক্যমুনি। সাধারণভাবে বলতে গেলে উপদেশ দান করা হয়েছিল অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর ভাষায় যাতে করে শ্রোতা এক শান্ত দার্শনিকের উপস্থিতি অনুভব করে, যিনি বা যারা জীবনযুদ্ধে লড়াই করছে এমনভাবে উপদেশ দিচ্ছেন যে তিনি সবেমাত্র সেই যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন। কিন্তু পক্ষান্তরে মহাযানী সূত্রগুলিতে আমরা একজন রহস্যময় ও অতীন্দ্রিয় ব্যক্তির সন্ধান পাই যিনি সাধারণ মানুষের স্তর থেকে অনেক দূরে এবং যিনি অসংখ্য দেবতা, মানুষ ও দৈত্য দ্বারা পূজিত হন যারা তাঁর উপর পুষ্পবর্ষণ করে যখন তিনি তা বিস্ময়কর অলৌকিক কর্ম করে থাকেন।
উদাহরণস্বরূপ সদ্ধর্মপূণ্ডরিক সূত্রে শাক্যমুনি বহু যুগ ধরে ধ্যানমগ্ন রয়েছেন। তিনি হলেন সেই পরম শাসক যিনি স্বয়ং যুগ যুগ ধরে অসংখ্য মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে গিয়েছেন এবং যাঁর প্রকৃত অর্থে কোন জন্ম বা মৃত্যু নেই। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হল এই যে শাক্যমুনি বুদ্ধ, অন্যান্য বুদ্ধ এবং সর্বজ্ঞ বুদ্ধরা সকলেই এক ও অভিন্ন।
ভারতবর্ষে মহাযান বৌদ্ধধর্ম: মহাযান বৌদ্ধধর্মের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যগুলি বিকশিত হয়েছিল খ্রীষ্টের জন্মের কিছু সময় পরে, কিন্তু এর দার্শনিক বৈশিষ্ট্যগুলি তৈরি হয়েছিল খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে। মহাযানের দুটি পৃথক সম্প্রদায় ছিল। একটি হল নাগার্জুন ও আর্যদেব দ্বারা খ্রীষ্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক সম্প্রদায় এবং দ্বিতীয়টি হল খ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতকে অসঙ্গ ও বসুবন্ধু প্রতিষ্ঠিত যোগাচার সম্প্রদায়।
মাধ্যমিক সম্প্রদায় যেটি কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই মূলতঃ নিজেদের সেই দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় ব্যাপৃত রেখেছিল যেখানে তারা দাবী করেছিল যে হীনযানীরা বুদ্ধের মূল শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়েছিল-এটি ছিল কিছু কিছু স্থায়ী স্থিতিশীল উপাদানের অস্তিত্ব যা বিশ্বজগৎকে সৃষ্টি করেছিল। আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি যে এই নীতিকে স্বীকার করে হীনযান পরিবর্তন হওয়ার দর্শনের উপর গুরুত্ব দেওয়ার নীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছিল এবং পাশ্চাত্য দর্শনের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। এই ধর্মের মূল জীববৃত্তি ছিল অতিশয় শক্তিশালী তবে মাধ্যমিক দর্শনে চিরকালীন পরিবর্তন এবং অস্থায়ীত্বের দর্শনে প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল।
প্রাচীন বা অবিকশিত মহাযানের ভিত্তি ছিল শূন্য। পাশ্চাত্যে এই দর্শনটিকে প্রায়ই ভুল বোঝা হয়েছে এবং ধরে নেওয়া হয়েছে যে এটি বিশ্বজগতের অনস্তিত্ব বা বিশুদ্ধ নেতিমূলক আদর্শবাদ বোঝায়। প্রকৃতপক্ষে, শূন্য শুধুমাত্র এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় যে সমস্ত জিনিসেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে; এবং এমনকি প্রাথমিক পর্যায়তেও তারা যোগ এবং অস্থিতিশীল বস্তু। বর্তমান যুগের বিজ্ঞান বিশ্বাস করে বাহ্যিক মৌল যাদের কঠোর বলে মনে করা হয় তারা সর্বদা স্থায়ী হয় না এবং তারা ভেঙে যেতে পারে এবং তারা যৌগ বলে প্রমাণিত হতে পারে যাদের পরিবর্তন এবং ধ্বংসের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি রয়েছে। একইভাবে শূন্য সম্প্রদায় মনে করত যে ধর্মগুলি (মৌল) অস্থায়ী এবং নিজস্ব কোন অস্তিত্ব নেই এবং এদের বিভিন্ন অংশে ভেঙে ফেলা যেতে পারে, সেই বিভাগগুলিকে বিভিন্ন উপবিভাগে এবং অনন্তকাল ধরে তাদের এইভাবে ভাঙা যায়। এই কারণে সমস্ত বাহ্যবস্তু পরম অস্তিত্ব নয়; সাপেক্ষ অস্তিত্ব রয়েছে মাত্র। সমস্ত জীবন একটিমাত্র অভ্যন্তরীণ প্রবাহে পরিণত হয়েছিল; যেটি ছিল অস্তিত্বের এক প্রবাহ যার একটি চিরন্তন পরিণত হওয়ার ছিল।
তাহলে এক কথায় শূন্যতার মাধ্যমিক দর্শন ছিল, যে কোন কিছুরই মূল অস্তিত্ব নেই, এবং এমন কোন কিছুই নেই যাকে অতীন্দ্রিয় অস্তিত্ব পর্যন্ত ভেঙে ফেলা যায়। এবং এই অতীন্দ্রিয় উপস্থিতি এমনই এক পরম অস্তিত্ব যে এটি আছে এবং এটি নেই দুটি বলাই ভুল। এই অর্ন্তনিহিত বিস্তার, বৃদ্ধি ও বিবর্তন সম্ভব হয়, না হলে যা অসম্ভব হত।
এটা দেখতে হবে যে এই চিরন্তন প্রবাহের প্রাথমিক ও অবিকশিত ধারণায় পরবর্তীকালে পরমতত্ত্বের ধারণার বীজ নিহিত ছিল। তবে মাধ্যমিক সম্প্রদায়ের নীতি ছিল মূলত নঞর্থক। এটি সমস্ত বিষয়কেই জীবনের সর্বদা পরিবর্তনশীল এক প্রবাহে পর্যবসিত করেছিল, কিন্তু এই জীবনের প্রবাহ সম্পর্কে এটি আমাদের সামান্য বলে বা একেবারে কিছুই বলে না।
দার্শনিক বিকাশের পরবর্তী ধাপে যা আমরা যোগাচার সম্প্রদায়ে দেখতে পাই, যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ফলে পরবর্তীকালে ভাববাদী দর্শনের এক অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। জীবনের প্রবাহকে মনের পরম বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হয়েছিল, এটি ছিল একটি প্রাথমিক মন পদার্থ যা ছিল স্থায়ী কিন্তু একইসঙ্গে মহাসাগরের মত সদা পরিবর্তনশীল। এর থেকে সমস্ত মৌল (পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের ৭৫টি বেড়ে যোগাচার সম্প্রদায়ে ১০০টি দাঁড়িয়েছিল) এবং তার ফলে সমস্ত বাহ্য জগৎ পাওয়া গিয়েছে। একে বলা হত আলয় বিজ্ঞান বা চেতনার আধার, কিন্তু এটিকে বস্তু বা মন কোন কিছুই মনে করা হত না, মনে করা হত সেই মূল শক্তি যা উভয়েরই মূলে রয়েছে।
এটি হল সমস্ত বাহ্যজগতের অন্তরালের অসংবেদন যোগ্য ও অজ্ঞেয় এবং বস্তুজগতের গুণাগুণ শূন্য। 'কুবোদা' বলেন, 'অস্তিত্বের অনুপত্তিযুক্ত জগতের বিপরীতে রয়েছে মনের প্রকৃত মূল বৈশিষ্ট্য। মনের মূল বৈশিষ্ট্যটি হল একটি অস্তিত্ব যা ধারণা বা বাহ্যজগৎ শূন্য এবং যা সর্বদাই সমান। এটি সমস্ত বস্তুর মধ্যে পরিব্যপ্ত, এটি বিশুদ্ধ এবং অপরিবর্তনীয় ... তাই এটিকে বলা হয় ভূত-তথতা-স্থায়ী বাস্তবতা।
মহাযান ও হীনযান নামের তাৎপর্য: ব্যুৎপত্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে 'মহাযান' শব্দের অর্থ হল মহান যান। 'হীনযান' শব্দের অর্থ হল ক্ষুদ্র যান। 'যান' বলতে অন্তত দুটি জিনিস বোঝায়। প্রথমতঃ যানটি নিজে এবং দ্বিতীয়তঃ সেই পথিক যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে ঐ যানটির সাহায্য নেয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে 'যান' শব্দটি বোঝায় দর্শনকে এবং পথিক বলতে বোঝায় 'religieux' আবার 'মহাযান' ও 'হীনযান' শব্দ দুটিকে তুলনা করলে এক ধরনের অবনমন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত মেলে, এর মধ্যে প্রশংসা ও নিন্দার ইঙ্গিত রয়েছে। অন্য কথায় বলতে গেলে 'মহাযান' ও 'হীনযান' শব্দ দুটির মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যায় এবং 'মহা' এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে একটি সম্প্রদায়কে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়ের তুলনায় উৎকৃষ্ট বলে প্রশংসা করার জন্য, যেহেতু হীনযানের 'হীন' শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র এবং এটি নিকৃষ্টতা ও নিন্দা বোঝায়। তাই এই দুটি পরিভাষা স্বাভাবিকভাবেই একদিকে দর্শনের উৎকর্ষতা ও অবনমনতা বোঝায় এবং অপরদিকে 'religieux'-এর উৎকৃষ্টতা ও অবনমনতা বোঝায়। এই দুটি বিষয়কে যদি আরো ব্যাখ্যা করি তাহলে ঐ দুটি দর্শনের দুটি বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে, একটি হল 'শিক্ষা' ও দ্বিতীয়টি 'দর্শন'। প্রথম বৈশিষ্ট্যটিকে বর্তমানে সূত্র আকারে দেখা যায় যেখানে দর্শনকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি দর্শন (বা ধর্ম)। আবার 'religieux'-এর দুটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে; একটি হল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান এবং অপরটি হল মুক্তি। অতএব 'মহাযান' ও 'হীনযান' এই দুটি পরিভাষা স্বাভাবিকভাবেই এই চারটি বিষয়ের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্টতা ও অবনমনতার ইঙ্গিত বোঝায়।
বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে 'মহাযান' ও 'হীনযান' এই দুটি পরিভাষা নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় জাপানী বৌদ্ধ পণ্ডিত Dr Eyun Mayeda'-র মতে 'মহাযান' ও 'হীনযান' বলতে দর্শন সংক্রান্ত কোন পার্থক্য বোঝায় না, 'religiuex'-এর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশেষ সম্পর্ক বোঝায়। কিন্তু অন্যান্য অনেক পণ্ডিত এর সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। কিন্তু এই পরিভাষা দুটি বৈশিষ্ট্যের কথাই বলে; 'religieux' এবং দর্শন দুটি দৃষ্টিকোণ থেকেই। এবং ঠিক এই কারণেই 'মহাযান' সূত্র ও শাস্ত্রে আমরা আরো অনেক পরিভাষা পাই যেমন 'একযান', 'দ্বিযান', 'বুদ্ধযান' এবং 'বোধিসত্ত্বযান'। যখন দর্শনগত সম্পর্ক প্রকাশের প্রয়োজন হয়েছিল তখন 'মহাযান' বা 'হীনযান' এর পরিবর্তে 'একযান' বা 'দ্বিযান' ব্যবহৃত হয়েছে আবার যখন 'religieux'-এর কথা বলা হয়েছে তখন 'বুদ্ধযান', 'বোধিসত্ত্বযান' এবং 'অর্হৎযান' ও 'শ্রাবকযান' ব্যবহার করা হয়েছে যথাক্রমে 'মহাযান' ও 'হীনযান' এর পরিবর্তে।
'মহাযান' ও 'হীনযান'-এর বিষয়বস্তুর সম্পর্ক: পূর্ববর্তী বিভাগে ইতিমধ্যেই 'মহাযান' ও 'হীনযান' এই পরিভাষা দুটির উৎকৃষ্টতা ও অবনমনতা, প্রশংসা ও নিন্দা অর্থে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে আমাদের কর্তব্য হল এই দুটি পরিভাষা দ্বারা প্রকাশিত বিষয়বস্তুর সম্পর্ককে নির্ধারণ করা এবং একই সঙ্গে উৎকর্ষতা ও অবনমনতার ধারণার বিষয়ে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করা। এই দুটি পরিভাষা বুদ্ধের অনুভূতির দুই দিকের সম্পর্কের একটি প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
No comments:
Post a Comment