Monday, February 2, 2026

অধ্যাপক পণ্ডিত শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির

 

সুমনপাল ভিক্ষু 

ভারত বাংলা উপমহাদেশের বৌদ্ধ দর্শন এবং সংস্কৃতি চর্চা বিষয়ে যাঁরা গবেষণারত, তাঁদের কাছে মহাপণ্ডিত অধ্যাপক শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির এক অতি পূজ্য একটি নাম। কেবল বাঙালি বৌদ্ধ শুধু নয় ভারত-বাংলার বিদ্বৎসমাজে তিনি অত্যন্ত ও সমাদৃত তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও অনুবাদ সাহিত্য রচনার জন্যে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রীর অধিকারী না হয়েও বৌদ্ধ দেশ শ্রীলংকা ও বার্মা (মায়ানমার) ত্রিপিটক শাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করে স্বদেশে এবং ভারতের মাটিতে বুদ্ধের ধর্মদর্শন ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে কি অবদান তা নিশ্চয়ই বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম জানা প্রয়োজন। ভারত-বাংলায় বৌদ্ধধর্মের ক্রমবিকাশে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করার আগে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে অবহিত হওয়া অবশ্য কর্তব্য।

বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলাধীন ধর্মপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের জন্ম গ্রহণ করেন ২৭ জুলাই ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। পিতা পণ্ডিত হরচন্দ্র বড়ুয়া এবং মাতা পুণ্যশীলা প্রাণেশ্বরী বড়ুয়া ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যু হলে ২৬ জুন দীক্ষাগুরু শ্রীমৎ ধর্মকথিত মহাস্থবিরের নিকট শ্রামণ্যধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে দার্শনিক বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে গিয়ে ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ২৬ নভেম্বর পশ্চিম বিনাজুরী শান্তি নিকেতন বিহারের শুভ উপসম্পদা গ্রহণ করে ভিক্ষু ধর্মাধার নতুন নাম ধারণ করেন। ধর্মপ্রাণ উপাসক ডা. চাইলাপ্রু চৌধুরী পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২৮ খ্রিঃ উচ্চ শিক্ষার্থে বৌদ্ধ দেশ সিংহলে যাত্রা করেন। সিংহলে সদ্ধমোদয় পরিবেশের মহাচার্য শ্রীমৎ উপসেন মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে অবস্থান এবং দ্বিতীয়বার উপসম্পদা গ্রহণ করেন। ক্রমাগত পাঁচ বছর ত্রিপিটক শাস্ত্রের নানা বিষয় শিক্ষা করে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন সেখানে। সেখান থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে সংঘরাজ ভিক্ষু মহামণ্ডলের প্রধান সচিব এবং পাহাড়তলী সংঘরাজ মহানন্দ বিহারে পালি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বহু ভিক্ষু-শ্রামণদেরকে পালি শিক্ষা দানের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা সহ বিভিন্ন বৌদ্ধ পল্লী থেকে আগত ভিক্ষু শ্রামণ নিয়ে ত্রিপিটক শাস্ত্র চর্চার সুব্যবস্থা করেন। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কোলকাতা বঙ্গীয় সংস্কৃত এসোসিয়েশনের অধীনে তিনি অভিধর্ম উপাধি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন চট্টগ্রামে তখন সাংগঠনিক এবং কলেজে দায়িত্ব দেওয়া দরুণ ড. বি.এম. বড়ুয়ার আহ্বান রক্ষা করতে না পারলেও বিনয়াচার্য শ্রীমৎ বংশদীপ মহাস্থবিরকে উক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তখন এশিয়ার প্রথম ডি. লিট ডিগ্রী প্রাপ্ত ড. বি. এম. বড়ুয়া সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং পরবর্তীকালে বঙ্গীয় সংস্কৃত এসোসিয়েশনের প্রশ্নকর্তা নির্বাচিত হন। ড. বি. এম. বড়ুয়া তাঁকে তখন বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর অবস্থান করার জন্য প্রস্তাব রাখেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে বিনয় পিটকের উপাধি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথমস্থান লাভ করেন, তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয়ে পেয়ে তাঁকে মানিকছড়ি মালবাজার রাজগুরু পদে এবং চট্টল ভিক্ষু সমিতি প্রতিষ্ঠিত করে সংস্থার প্রধান সচিব পদের গুরুদায়িত্বভার প্রদান করেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘরজ ভিক্ষুমহামণ্ডল গঠন এবং প্রধান সচিব পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার সহ-সভাপতি এবং বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারের অধ্যক্ষ পদে বরিত হন। তাছাড়া নালন্দা বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

ভগবান বুদ্ধের দুই প্রধানশিষ্য সারিপুত্র ও মহামৌদ্গল্যায়নের পুতাস্থি ভারতে আগমন উৎসবে যোগদান এবং কোলকাতা রাজভবনে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সংস্কৃত শিক্ষা পরিষদের পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং আসাম সংস্কৃত বোর্ডের পরীক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে সঙ্গীতিকারক হিসেবে ব্রহ্মদেশে গমন করেছেন। ১৯৫৬ খ্রিঃ বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারে সার্ধদ্বিসহস্রতম বুদ্ধজয়ন্তী পালন করেন। ১৯ জানুয়ারি ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারে তিব্বতের ধর্মগুরু মহামান্য দালাই লামা ও পাঞ্চেন লামাকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। খঙ্গাপুর দীক্ষা সমারোহে সভাপতিত্ব করেন। ভারতীয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সহসভাপতি নির্বাচিত।

১৬ নভেম্বর ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মদেশের প্রধান মন্ত্রী উনুর উপসম্পদা অনুষ্ঠানে বুদ্ধগয়া যোগদান। ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বুড্ডিস্ট ইন্ডিয়া সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে নালন্দা পত্রিকা গোড়াপত্তন করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধগয়া আন্তর্জাতিক সাধনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ড. রাষ্ট্রপাল মহাস্থবির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহারে পবিত্র ভিক্ষু পরিবাসব্রত অনুষ্ঠান এবং তাঁর দ্বি-সপ্তত্তিতম জন্মজয়ন্তী উৎসব পালিত হয় দানবীর হেমেন্দু বিকাশ বড়ুয়ার একক প্রচেষ্টায়।

১৮ নভেম্বর ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার 'মহামান্য' সংঘরাজ পদে বরিত হন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধগয়া এবং বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারের পরমপূজ্য তংপুলু সেয়াড মহামান্য দালাইলামার সম্বর্ধনায় সভাপতিত্ব করেন। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ২৮ ডিসেম্বর নালনন্দা পার্কে মহাপণ্ডিত রাহুল সাংস্কৃত্যায়নের স্মৃতি সভায় সভাপতিত্ব করেন। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতাস্থ বিদর্শন শিক্ষা কেন্দ্র এবং ভারতীয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার উদ্যোগে পবিত্র ভিক্ষু পরিবাস অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ও সভাপতিত্ব করেন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই তাঁর ৮৯ তম জন্মজয়ন্তী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি কোলকাতা বিদর্শন শিক্ষা কেন্দ্রে দু'দিনে ব্যাপী ৯০তম জন্মজয়ন্তী মহাসমারোহে পালিত হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ১৫ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতিকে আর ভেঙ্কটরমনের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের ভূষিত। সেই অনুষ্ঠানে ড. সুকোমল চৌধুরী এবং ড. জিনবোধি মহাস্থবির উপস্থিত ছিলেন। প্রথম ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু যিনি এই বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন।

সাহিত্যসাধনা গ্রন্থবালী :
১. বৌদ্ধ বন্দনা-১৯৩৮ সাল, প্রথম সংস্করণ, চট্টগ্রাম।
২. ধর্মপদ-১৯৫৪ প্রথম সংস্করণ, ১৯৬৬ হয় সংস্করণ, ১৯৯১ সাল তৃতীয় সংস্করণ, কলিকাতা।
৩. বৌদ্ধদর্শন ১৯৫২ সাল প্রথম সংস্করণ, ১৩/৭/৮৪ সাল দ্বিতীয় সংস্করণ, কলিকাতা।
৪. মধ্যম নিকায় (দ্বিতীয় ভাগ)- ১৯৫৪ সাল অনুবাদ করেন। ১৯৫৯ সালে প্রথম সংস্করণ, রেঙ্গুন। ১৯৮৭ সাল দ্বিতীয় সংস্করণ, কলিকাতা।
৫. শাসনবংশ ১৯৫৪-৫৬ অনুবাদ করেন। ১৯৬২ সাল প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়, কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০৫ কলিকাতা, প্রকাশক, ড. সুমনপাল ভিক্ষু।
৬. মিলিন্দ প্রশ্ন ১৯৭৭ সাল প্রথম সংস্করণ, ১৯৮৭ সাল দ্বিতীয় সংস্করণ, কলিকাতা।
৭. অধিমাস বিনিশ্চয়-১৯৬৩ সাল প্রথম সংস্করণ, কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ড. সুমনপাল ভিক্ষু।
৮. সদ্ধর্মের পুনরুত্থান ১৯৬৪ সাল প্রথম সংস্করণ, কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০৯ কলিকাতা প্রকাশক ড. সুমনপাল ভিক্ষু।
৯. বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন ১৯৭৪ সাল প্রথম সংস্করণ, কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৯৪, কলিকাতা প্রকাশক, ড. সুকোমল চৌধুরী।

ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের প্রেক্ষাপটে নিয়ে তিনি তাঁর এক ভাষণে লিখেছেন। আপনারা অবিদিত নহে যে, ভারত সভ্যতার রাজনীতিতে, শিল্পে, বাণিজ্যে, সাহিত্যে সর্বোপরি, শান্তিতে পরিপূর্ণ হইয়াছিল। তখন যখন ভারত সাম্রাজ্য বৌদ্ধ সম্রাজ্য হইতে পাইয়াছিল। বিশ্বের দরবারে ভারতের দান বৌদ্ধ দর্শন; পৃথিবীর কাছে ভারত শ্রদ্ধাভাজন বৌদ্ধ আদর্শের জন্য, বৌদ্ধ সভ্যতার জন্য। এখনো সেই ভারত ও সেই বৌদ্ধধর্মই ধরণীবক্ষে বিদ্যমান। কিন্তু ভারত সাম্রাজ্য বৌদ্ধ সাম্রাজ্য; (১৯৩৮ ইং সাতবাড়িয়া বিহারের পঠিত অভিভাষণ-পৃ. ১)। ভারতের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ড. প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন। আরও কত কি পদ তিনি অলংকৃত করেছেন, বিনয় ছিল তাঁর ভূষণ। তিনি ছিলেন পরোপকারী, মৃদুভাষী, সদালাপী। সর্বজনের বান্ধব,...এ জগতে কাজ করতে করতে শতবর্ষ বাঁচার ইচ্ছা করে। এই উপদেশের মূর্ত উদাহরণ ছিলেন ধর্মাধার মহাস্থবির। জ্ঞান, কর্ম ও বুদ্ধ ভক্তির এক অপূর্ব (ধর্মাধার মহাস্থবির জন্ম বর্ষ-স্মরণ সংখ্যা নালন্দা-২০০১, পৃ. ৯৩)। পণ্ডিত ধর্মাধার সাহিত্য প্রতিভার সম্পর্কে অধ্যাপক ড. সুমঙ্গল বড়ুয়া লিখেছেন পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির একজন অনন্য প্রতিভার উত্তরাধিকারী শ্রেষ্ঠ কাল পুরুষ। ব্যক্তিজীবনের চেয়ে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা অনেক বেশি। অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী কালজয়ী এই মহাপুরুষের জ্ঞানভাণ্ডার যেন বোধিসত্বের ক্রমধারায় বিকশিত পারমী পূরণেরই বর্হিপ্রকাশ। তাঁর সাধারণ শিক্ষার হাড়েখড়ি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মূল্যায়ন সাধারণ মানুষের আয়ত্ত্বের বাইরে। ঊনবিংশ শতকের বৌদ্ধ রেনেসাঁর যুগে এ দৃষ্টান্ত বিরল। তাঁর মহাগুরু বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবিরকেও তিনি সাহিত্য সাধনায় ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর এই সাহিত্য প্রতিভা মহাপণ্ডিত রাহুল সাংস্কৃত্যায়নের সঙ্ইগে তুলনীয়। (বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯০)। তিনি তাঁর লেখার আর এক জাগায় লিখেছেন-পণ্ডিত ধর্মাধার একজন বিরল সাহিত্য প্রতিভার কৃতিবিদ্যা আদর্শ পুরুষ। বৌদ্ধ ধর্ম, ইতিহাসও সংস্কৃতিচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদ্ভাবনী প্রতিভার ব্যক্তিত্ব। বিগত একশত বছর ধরে বৌদ্ধ সাহিত্য বিকাশে তিনি অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। একজন গবেষক হিসেবেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও বলিষ্ঠ লেখনী আমাদের নিজেদের জানার ও পরকে উদ্বুদ্ধ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় লুকানো বৌদ্ধ ধর্মের নির্যাসকে বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করে বৌদ্ধ সাহিত্য তথা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এখানেই তাঁর সাহিত্য সাধনার কৃতিত্ব (নালন্দা স্মারক, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯২)।

ড. বি. এম. বড়ুয়া তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করে লিখেছেন- 'মহাস্থবির ধর্মাধারের বহুমুখী প্রতিভা দেখে আমি মুগ্ধ। বাস্তবিক একজন সত্যিকারের পণ্ডিত... তাঁর জ্ঞান গর্ভ প্রবন্ধ পড়ে আমি বিস্মিত হয়েছি। বস্তুতঃ এরূপ গবেষণামূলক প্রবন্ধ আমার পক্ষেও লেখা সম্ভব হত না।'

তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার থেকে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে লাভ করেছেন- 
'সার্টিফিকেট অব অনার, ১৯৯৮ সালে কোলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বি. সি. লাহা, 'স্বর্ণপদক' বঙ্গীয় সংস্কৃত পরিষদ থেকে ত্রিপিটক বিশারদ, অনাগারিক ধর্মপাল 'স্বর্ণপদক' মানরাজা থেকে রাজগুরু মহাপণ্ডিত, ভারতীয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা থেকে-সংঘরাজ এবং বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা থেকে-অগ্ন মহাপণ্ডিত উপাধি সহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন।

ড. অমল বড়ুয়া লিখেছেন- ভারতীয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার মহামান্য সংঘরাজ ভারত বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার প্রবীনতম ভিক্ষু পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির বিগত শতাব্দীর সঙ্গে নতুন শতাব্দীতে উত্তরণের এক প্রাচীনতম সেতুরূপে বাঙালী বৌদ্ধদের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রয়েছেন। তাঁর জীবনের সুদীর্ঘ যাত্রা পথে বহুবিধ সম্পদে সমৃদ্ধ। বৌদ্ধ জগতের তিনি এক অনন্য প্রতিভাশালী পণ্ডিত। তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতিকালের সীমানা ছাড়িয়ে আজ দেশ থেকে দেশান্তরে পরিব্যাপ্ত (নালন্দা স্মারক, পৃ. ১৯)। 

শ্রীমৎ প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাস্থবির তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন- পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির একজন সুদক্ষ সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি সংগঠন প্রিয়ও ছিলেন। তাই তারই প্রেরণা ও উদ্যোগে বহু বিহার ও সংগঠন সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষতঃ পশ্চিমবঙ্গে বৌদ্ধরা নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে। ধর্মকর্মের সুযোগ বেড়েছে। বৌদ্ধদর্শন ও সংস্কৃতি চর্চার ও তার যথাযথ পালনের পরিবেশ পরিবর্ধিত হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই বৌদ্ধসমাজ বিনির্মাণে এগুলি মূল্যবান ভূমিকা পালন করে চলেছে (নালন্দা স্মারক-প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭)।

পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবিরের জীবন দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল, একে অপরের কল্যাণে ভূমিকা রাখা। তথাগত বুদ্ধের মৌলিক শিক্ষাই ছিল বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়-তিনি আমৃত্যু বুদ্ধের এই মানবতাবাদী, মানবকল্যাণ চেতনাকে লালন করেছে এতে বিন্দুমাত্রই সন্দেহ ছিল না। চট্টগ্রাম এবং ভারতে গিয়ে তিনি অসংখ্য ভিক্ষু-শ্রামণ এবং তরুণ গৃহী উক্ত-শিক্ষার্থীদের আশ্রয় দিয়ে উচ্চ শিক্ষার সুব্যবস্থা করেছিলেন। জীবনে নানা উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি ছিলেন হিমালয় পাহাড়ে অটল ও অচল। ধৈর্য্য ও ক্ষমাগুণ ছিল তাঁর মধ্যে অতুলনীয়। ব্যবহার ছিল সুমধুর এবং আন্তরিকতা পূর্ণ, কিন্তু কৃতজ্ঞতার বর্হিঃপ্রকাশ দেখেছি প্রতিটি মুহূর্তে।

এই মহান পুণ্যপুরুষের শেষ জীবনের দুর্ঘটনা জনিত অসুস্থতার। (১৯৮৮-১৯৯৮ খ্রিঃ পর্যন্ত) সময় ক্রমাগত দশ বছর সেবা করেছেন ড. জিনবোধি মহাস্থবির। তাঁর অক্ষয় কীর্তি গাথাকে চিরঞ্জীব করে রাখার মানসে পৌঁনে ছয় কাঠা জমি ক্রয়ের সুব্যবস্থা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন ড জিনবোধি মহাস্থবির নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে। যার নামকরণ করা হয়েছে-'পণ্ডিত ধর্মাধার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট'।

সেই জমিতে বর্তমান তিন তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। এ ব্যাপারের প্রয়াত প্রিয়দর্শী বড়ুয়া তাঁর সন্তান দীপক বড়ুয়াসহ একখাটা জমির মূল্য অনুমান হিসেবে দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, মূল জমির মালিক শ্রী সুধীন্দ্র লাল বড়ুয়ার কাছ থেকেও এক কাঠা জমি দান হিসেবে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন ড জিনবোধি মহাস্থবির। তাছাড়াও শ্রীমতী শান্তিদেবী বড়ুয়া, জ্যোতিষময়ী বড়ুয়া, প্রদীপ বড়ুয়া, প্রমতেশ বড়ুয়া, মুকুন্দু বড়ুয়া, ননী গোপাল বড়ুয়া, কমলেন্দু বিকাশ বড়ুয়া, সুনীতি বড়ুয়া, রনেন্দু বড়ুয়া, অমূল্য রঞ্জন বড়ুয়া (পুরনো যিনি ভবন নকশা তৈরি ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, কীর্তিকা রঞ্জন বড়ুয়া), শ্রীমতী শীলাদেবী চৌরাশিয়া, প্রীতিময়ী বড়ুয়া, দীপিকা বড়ুয়া, দীপা বড়ুয়া, বিনয় ভূষণ বড়ুয়া, সুভূতি রঞ্জন বড়ুয়া, ভূপতি বড়ুয়া, শচীন্দ্র লাল বড়ুয়া, সুপ্রীতি রঞ্জন বড়ুয়া, রথীন্দ্রনাথ বড়ুয়া, ড. অমল বড়ুয়া, শ্রী অরুনাভ বড়ুয়া চৌধুরী, ড. ব্রহ্মাণ্ড প্রতাপ বড়ুয়া, প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সুবুদ্ধি, সুপরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা  কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমান ভবনের নক্শ তৈরীতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন সুকোমল চৌধুরী, অমল বড়ুয়া, সুমনপাল ভিক্ষু ও বন্যা ব্যানর্জী। সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানাই তৎকালীন ট্রাস্টের সম্পাদক ড. সুকোমল চৌধুরী।

ধর্মপ্রাণ উপাসক ও উপাসিকাদের আর্থিক অনুদান নিয়ে ধর্মাধার বৌদ্ধ প্রকাশনীয় মাধ্যমে দশ বছরে প্রায় ৩৫টি বই প্রকাশের জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন ড. জিনবোধি মহাস্থবির। নালন্দা পত্রিকা অনেক কষ্ট, শ্রম ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে স্মারক সংখ্যা হিসেবে বের করেছিলেন। বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তল নির্মাণের ব্যাপারে সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অনুদান গ্রহণ এবং থাই রাষ্ট্রদূতের সহায়তায় বুদ্ধমূর্তি আনায়ন ও পবিত্র বুদ্ধের ধাতু প্রয়াত ডা. কল্যাণ মিত্র বড়ুয়া (বেহালা) পরিবারের বদান্যতায় অনায়নের সুব্যবস্থা করে অত্র কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন ড. জিনবোধি মহাস্থবির। পবিত্র ধাতু করণ্ড ধর্মপ্রাণ উপাসক শ্রী রনেন্দু বড়ুয়া সৌজন্যে তৈরি করা হয়েছিল। পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির আত্মপ্রচার বিমুখ একজন আদর্শ বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষুগৃহী এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো বিনির্মাণে যা কাজ করে গেছেন তা কালের সাক্ষী হয়ে আছে। তাঁর জীবনে বড় আক্ষেপ ছিল আমি পেটে করেও এনেছি এবং পিটে করেও এনেছিলাম। দুর্ভাগ্য দুটোর মধ্যে একটাও গ্রহণ করার মত কাউকে খুঁজে পেলাম না। ধর্মাধার ধর্মাধারই, ধর্ম+আধার= ধর্মাধার। নামের সঙ্গে কাজের এবং কাজের সঙ্গে নামের এতই সামঞ্জস্যপূর্ণ অপূর্ব মিল দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া বিরল। তিনি যে কত মহান ক্ষান্তিবাদী পুণ্যপুরুষ ছিলেন এটাই প্রমাণ মেলে। তাছাড়া তাঁর বিশাল বর্ণাঢ্য জীবনে অন্তিম লগ্নে এসে আত্মত্যাগী নৈষ্টিক ব্রহ্মচর্য জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ভারতের শ্রেষ্ঠ রাজমুকুট রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পরিহিত অবস্থায় চলে গেলেন। ধর্মাধার বাঙালি জাতির ইতিহাসের গৌরবময় অত্যুজ্জল অধ্যায় ধর্মাধার। এপার-ওপার বাংলার বাঙালি বড়ুয়া বৌদ্ধ এবং গৃহী সমাজের বোধগম্যের উন্মেষ ঘটুক।

No comments:

Post a Comment