(ড.) সুমনপাল ভিক্ষু
অতিথি অধ্যাপক, পালি বিভাগ ও বৌদ্ধ বিদ্যা অধ্যয়ন বিভাগ,
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অতিথি অধ্যাপক,পালি বিভাগ, সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়।
চেয়ারম্যান, বোধি-নিধি সোস্যাল ওয়েলফেয়ার কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। চেয়ারম্যান, বোধি-নিধি ড. জিনবোধি সংঘারাম সন্হাগার ট্রাস্ট।
পূজারহে পূজয় তো, বুদ্ধ যদি ব সাবকে।
পপঞ্চসমতিক্কন্তে তিন্নসোকপরিদ্দবে
ধম্মপদ, গাথা- ১৯৫।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অথবা বিক্রমপুরের নাস্তিক ভট্টাচার্য বাঙালীর ব্যক্তিত্বের একজন প্রধান সহায়ক। ইনি বৌদ্ধ মতাবলম্বী ছিলেন, তাই লোকে তাকে নাস্তিক ভট্টাচার্য নামে জ্ঞান করত। শ্রীজ্ঞান অতীশ বা দীপঙ্কর তিব্বত সহ অন্যান্য অঞ্চলে পরিভ্রমণ পূর্বক বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিলেন। বাংলার বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ পূর্ব-এশিয়ায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে সচেষ্ট হয়েছিলেন; 'তাঞ্জুর' এ তার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়; দেখা যায় যে বৌদ্ধ বাঙ্গালীর কীর্তির অনেক পুঁথিপত্র সংরক্ষিত আছে। কারণ বৌদ্ধ ইতিহাস সত্য, কল্পনাবিলাস বা কুহকতাপূর্ণ নয়। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী বৌদ্ধ ভাস্করকে মিথ্যাদৃষ্টির আড়ালে আবদ্ধ করে রাখা সম্ভব হয়নি। তাই ১৯ শতকে বৌদ্ধধর্ম পুনঃরায় বাংলার ভাগ্যাকাশে উদিত হয়েছে। যা আজও গঙ্গা-পদ্মার ন্যায় বহমান।
দুল্লভো পুরিসাজঞ্ঞো, ন সো সব্বত্র জাযতি।
যত্থ সো জায়তি ধীরো, তং কুলং সুখমেধতি। ধম্মপদ, গাথা ১৯৩।
অর্থাৎ, এইরূপ পুরুষোত্তম জ্ঞানী এই সংসারে পরম দুর্লভ হয়। তিনি সর্বত্র উৎপন্ন হন না। যে কুলে এইরূপ ধৈর্যশালী পুরুষ আবির্ভূত হন সেই কূলের নিশ্চয় ই অভ্যুদয় (সুখসমৃদ্ধি) অবশ্যম্ভাবী হয়।
সাহিত্য শেখর তথা পণ্ডিত ভিক্ষু শরণানন্দ প্রণীত "বিনয়াচার্য পন্ডিত পূর্ণানন্দ মহাথেরো'র জীবনালেখ্য" নামক নিবন্ধটি মূল অর্থে নিবন্ধ নয়। আবার আঙ্গিকের আখ্যানে বিষয়টি রূপান্তরের পথ ধরে ক্রমশ...। ভিক্ষু শরণানন্দ'র নিবন্ধের মূল বিষয়বস্তু হল ভদন্ত পূর্ণানন্দ মহাথেরো'র কর্মজীবন, তাঁর ধর্মচিন্তার তাত্ত্বিক দিক তথা মনন ইত্যাদি নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন, বলেছেন পূর্ণানন্দ মহাথেরো-র কর্মচিন্তার অভ্যন্তরে ধর্মাচারের স্থিতি রয়েছে, কিন্তু সেই স্থিতি তাঁর কর্মপসত্বা হেতু নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা তিনি ব্যক্তি-মনীষার অসাধারণ বিশ্লেষণ। সহজ স্তব্দ শ্বাদ দারা অর্থাৎ যে শব্দে শিহরণ নেই নৈমিত্তিক ক্ষেত্র থেকে সত্য মূল্য দেওয়া। কিন্তু এই নিবন্ধে শব্দের সে পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে তা বোধকরি আমাদের বোধায়ত্ত।
উদাহরণ এ পর্যন্তই। অর্থাৎ এক কথায়, প্রকৃত পৈঙ্গলের ভাষায় এ যেন বিশেষ বিন্যাস মগ্ন চৈতন্যের মতো।
পাঠকের মনে অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি করা এবং সেই অনুসন্ধিৎসাকে তিনি অর্থাৎ ভিক্ষু শরণানন্দ আপন সত্যে স্বয়ংস্প্রত। কেননা তিনি সে অর্থে 'বিনয়াচার্য পন্ডিত পূর্ণানন্দ মহাথেরো'র কর্মজীবনকে অনুশীলন করেছেন বা মনন-চিন্তনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন তা এক অর্থে হয়ে উঠেছে মহান সাহিত্য। মনে হয় তিনি বলতে চেয়েছেন -
"অদ্য মে সফলং জন্ম সুলজ্জো মানুষোভবঃ।
অদ্য বুদ্ধ কুলে জাতো বুদ্ধাপুত্রো স্মি সাংপ্রতং।"
যে মহামানব সৃষ্টি না হলে হয়ত এই ভুবনে কিছুই সৃজন হত না, যাঁর পদাচারণায় ধন্য চট্টগ্রামের সমুদয় বৌদ্ধকূল। এক কথায় যাঁর চরিত্রের পুণ্যবৃত্তান্ত নিয়ে যদি আলোচনা করি তাহলে সন্দেহাতীতভাবে কলমের আঁচড় স্তব্ধ হয়ে যাবে কিন্তু সেই মহামানবের (পূর্ণানন্দ মহাথেরো) জীবন বৃত্তান্তের শুচি চরিত্রের কথাগুলোর ইতি টানা যাবে না। কেননা পূর্ণানন্দ মহাথেরোর মহত্ত্বতা, ধৈর্য্য, বিনয়ীতা, ন্যায়পরায়ণতা ও উদারতা বাংলার বৌদ্ধজাতির প্রেরণার এক অগাধ উৎসস্থল হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। তিনি বৌদ্ধজাতিকে সদ্ধর্মের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এককথায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন জ্ঞানদীপ্তি এবং মহাশান্তির মূর্ত প্রতীক।
হে মহা জীবন
এভূমে ফিরে এস আবার
হৃদসিঞ্চিত তব সুধা দাও তীর্থে ও চর্চার জ্ঞানধি তোমার আলোকপ্রপাত ধারা মোছাও অশ্রু ঘুম ভাঙানিয়া, ত্বরা।
আসমুদ্র হিমাচল হয়ে পৃথিবীর সন্তাপ শোক তাপ যত শোক দুঃখের
ব্যাথিতের কলরব
তুমি দিয়ে গেছো শেষ আশ্রয় সবে হৃদয় সন্নিভবে।
আশা করি ছোট্ট পুস্তিকাটি ভিক্ষু শরণানন্দের নতুনত্ব দান করেছে, করবে আগামীর ইতিহাস তথা শিক্ষাপ্রার্থীকে। অলং ইতি বিত্থারেন।
১৮ জানুয়ারি ২০২৬
২৫৬৯ বুদ্ধাব্দ
১৪৩১ বঙ্গাব্দ।
No comments:
Post a Comment