Monday, February 2, 2026

ভদন্ত বোধিপাল ভিক্ষু অক্লান্ত পথিক

 

সুমনপাল ভিক্ষু

বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত ভদন্ত বোধিপাল ভিক্ষু সমগ্র বাঙালি বৌদ্ধ সমাজ তথা সমগ্র বৌদ্ধ সমাজের যে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁর অকাল প্রয়াণে সমগ্র বৌদ্ধ সমাজের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাঁর চিন্তা চেতনা কতো যে সুদূর প্রসারি ছিল তা তাঁর সান্নিধ্য ছিলেন তারাই অনুধাবন করতে পারছেন এবং পারবেন। বোধিপাল ভন্তের প্রয়াণে তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধগণ তাঁর উদ্দেশ্যে স্মৃতিচারণা প্রমাণ করে যে তিনি সকলের কতটা কাছের মানুষ ছিলেন। বৌদ্ধভিক্ষু সুলভ মৈত্রী, করুণা, মুদিতা গুণই ক্রিয়াশীল ছিল তা নয়, ছিল কঠিন অথচ অন্তরের কোমল হৃদয়, আপামরকে কাছে টেনে নিতে পারতেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত চোখের চাহনি আর তাঁর সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন তাঁরাই তাঁকে বুঝতে পারবেন।

১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর মেঘালয়ের শিলং-এ প্রয়াত শ্রী প্রদীপ রঞ্জন বড়ুয়া এবং প্রয়াত শ্রীমতি কুমকুম বড়ুয়ার ঘরে স্বপন কুমার বড়ুয়া নামে জন্মগ্রহণ করেন ভিক্ষু বোধিপাল। তিনি ছিলেন  প্রয়াত শ্রদ্ধেয় ধর্মপাল মহাথেরোর শিষ্য। তিনি শিলং-এ সেন্ট পিটার্স স্কুল এবং ব্রুকসাইড অ্যাডভেন্টিস্ট হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে এবং পরে রেইড লাবান কলেজে পড়াশোনা করে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করেন। ১৯৯২ সালে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং ২৪ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় বৌদ্ধ শ্রমণ হিসেবে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন। এর এক বছর পর, ১৯৯৩ সালের ২২ জুন তিনি পূর্ণাঙ্গ বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে দীক্ষা লাভ করেন।

ব্রহ্মচর্য ও মানবসেবার জীবন গ্রহণের পাশাপাশি ভিক্ষু বোধিপাল শিক্ষাজীবনেও অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি বুদ্ধগয়ার মগধ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিহার সরকারের অধীনে বোধগয়া টেম্পল ম্যানেজমেন্ট কমিটির (বিটিএমসি) প্রধান ভিক্ষু হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধদের পবিত্রতম তীর্থস্থান মহাবোধি মন্দিরের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক। এরপর তিনি কোলকাতায় ফিরে আসেন এবং তাঁর প্রপিতামহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভিক্ষু হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৮ সালে এর সাধারণ সম্পাদক হন। এছাড়াও, তিনি আসামের ইন্টারন্যাশনাল বুদ্ধিস্ট ব্রাদারহুড অ্যাসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক এবং ট্রাস্টি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বোধিপাল ভন্তের সঙ্গে আমার প্রথমে পরিচয় হয় ১৯৯৫ সালে বুদ্ধগয়া আন্তর্জাতিক সাধনা কেন্দ্রে, সেই বছর আমি বুদ্ধগয়াতে উপসম্পদা গ্রহণ করি। পরে ১৯৯৭ সালে যখন কোলকাতা পড়তে আসি তখন থেকেই ভন্তের স্নেহাশীষ পেয়েছি অবারিত ধারায়। ভন্তের চিন্তা চেতনা ও প্রগতিশীলতা আধুনিক ধ্যান ধারনা ছিল অসাধারণ। তারপর প্রতিবছর বুদ্ধগয়া গেলেই ভন্তের সঙ্গে আলাপচারিতা হতো, নতুন কিছু ভাবতে শেখাতেন। বুদ্ধগয়া তিনি সকলের সঙ্গে সদাচারিতা রাখতেন, সকলে তাঁকে  আপন করে নিতেন, তিনিও আপন করে নিতে জানতেন। বুদ্ধগয়া মহাবোধি মহাবিহারের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আমূল সংস্কার করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বুদ্ধগয়াকে ভেটিকেন সিটির রূপে রূপায়ণ করবেন, সেখানেই সকলের চক্ষশূল হতে শুরু হল। বুদ্ধগয়া মূল মন্দিরের চূঁড়ায় স্বর্ণখচিত শোভিত হয় সেটা তাঁর প্রচেষ্টা ও চিন্তা চেতনার খনিত রূপ। সেই স্বর্ণ আমি এবং ভন্তে মিলে পি সি চন্দ্র জুয়েলার্স তৈরীর করিয়ে সেগুলি যথাসময় ফিলিংস করা হয়েছিল। বুদ্ধগয়া     মূল মন্দিরে বিশুদ্ধ পানীয় জলে ফিল্টারিং ফ্রিজ মেশিন প্রথম তিনি করেছিলেন।  তিনি আমাকে বলেছিলেন মূল মন্দিরে বড়ুয়াদের কোন দান নেই, তুমি বড়ুয়া বেকারীর  দীপক বড়ুয়াকে বলে একটা মেশিনের ব্যবস্থা করে দাও। তখন আমি দীপক বড়ুয়াকে প্রস্তাব করতেই তিনি সেই ফিল্টারিং মেশিনের জন্য ৩০০০০ টাকা দান করেন। এভাবেই ভন্তে ধীরে ধীরে নিজের কর্ম পরিধির পরিসর গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে প্রজ্ঞা জার্নাল প্রকাশ করা এবং রাষ্ট্রপাল মহাস্থবির স্মারক প্রকাশে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে ভন্তেকে আমি প্রস্তাব করেছিলাম সেমিনার লেকচার দেওয়ার জন্য। ভন্তে এক কথায় রাজি হয়েছিলেন অবশ্য যা যা অফিসিয়াল কাজ সেগুলি অধ্যাপক বেলা ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক মনিকুন্তলা হালদার করে দিয়েছিলেন। 

ভিক্ষু বোধিপাল ছিলেন একজন প্রখ্যাত লেখক। তিনি বেঙ্গল বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন জার্নালে বহু পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি দার্জিলিং ক্রনিকলের মতো গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্মেও নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তিনি বড়ুয়া বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিলংয়ে বেড়ে ওঠার কারণে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূলধারায় নিয়ে আসার পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সর্বজনীন বৌদ্ধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। অরুণাচল প্রদেশ থেকে সিকিম, দার্জিলিং থেকে আসাম, কোলকাতা এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত তিনি এই লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

ভিক্ষু বোধিপাল ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার ব্যক্তিত্ব অনেক দিক থেকেই তার ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ছিল। তিনি ছিলেন একজন ভ্রমণপিপাসু এবং বিশ্বাস করতেন যে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর ভূমিকা হলো পরিব্রাজকের। তিনি কখনোই নিজেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছানো। সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবন এবং নিজের প্রপিতামহ কৃপাশরণ মহাথেরোর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভন্তে বোধিপাল উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতের সর্বত্র ভ্রমণ করেন এবং থেরবাদ, মহাযান ও বজ্রযানসহ বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন ধারার অনুসারী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সংহতি স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি সহানুভূতি, সমবেদনা এবং মানবতার আদর্শ অনুশীলন করতে চেয়েছিলেন। জলপাইগুড়ির কালচিনি করুণা চ্যারিটেবল সোসাইটির সভাপতি হিসেবে বোধিপাল চা বাগানের প্রান্তিক ও দরিদ্র শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেছেন।

ত্যাগী, সৃষ্টিশীল, ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের  সময়োপযোগী সময়ে মূল্যায়ন নিজের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির জন্য, অপরের জ্ঞানের মূল্যায়ন করি না। ধর্মীয়, সামাজিক চেতনাবোধ ও মানবতাবাদী একজন নির্ভীক শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে তিনি সমুজ্জ্বল। তাঁর সুদূরপ্রসারী জ্ঞান সমগ্র ভারতের বাঙালী বৌদ্ধজাতির পরিচয়ের মেলবন্ধন বড়ুয়া সম্মেলন, যা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ ডিব্রুগড়, আসাম।  পরবর্তীতে ২০২০ ফেব্রুয়ারিতে নবপ্রজন্মের পথনির্দেশনা-যুবসম্মেলন  শান্তিনিকেতন-আম্বেদকর বুদ্ধিষ্ট ওয়েলফেলার মিশন, শান্তিনিকেতন।

তাঁর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং করুণা সমাজ ব্যবস্থাকে উজ্জীবিত করেছে। তিনি পথের কাণ্ডারী ছিলেন। তাঁর মহানুভবতা চিন্তাচেতনা সামগ্রিক চেতনাবোধকে শুদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। ভারতের সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র কোলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা ১৩৫ বর্ষে পদার্পণ করেছে। আধুনিক ভারতের প্রথম বৌদ্ধ বিহারের প্রতিষ্ঠাতা কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবির (১৮৬৫-১৯২৬)। তিনি ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধসংস্কৃতির সামগ্রিক ঐতিহ্য অনুধাবন, সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে এই সভা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর মহাবিহারের ভিত্তি স্থাপনের পর ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে মহাবিহারের দ্বারোদঘাটন হয়। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার শাখা লক্ষ্মৌ বোধিসত্ত্ব বিহারের ভিত্তিস্থাপন করেন। একই বছরে সিমলা শৈল সমিতি নামে সিমলায় বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কর সভার শাখা স্থাপন হয়। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে গুণালঙ্কার মহাস্থবির ও সমণ পুন্নানন্দ স্বামীর যুগ্ম সম্পাদনায় 'জগজ্জ্যোতি' মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই বছর আসামের ডিব্রুগড়ে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার শাখা স্থাপিত হয়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারে গুণালঙ্কার লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা হয়।

 ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারের দ্বিতল নির্মিত ও কৃপাশরণ ফ্রি ইনস্টিটিউশন নামে অবতৈনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সভায় প্রথম বৌদ্ধ মহিলা সম্মিলনী স্থাপিত হয়। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে রাঁচিতে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার শাখা স্থাপিত হয়। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে নৈশ অবতৈনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এইবছরেই কোলকাতা পৌরসভার সাহায্যে ধর্মাঙ্কুরের সামনের রাস্তার নামকরণ হয় ১ বুদ্ধিস্ট টেম্পল স্ট্রিট। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে শিলংয়ে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার শাখা স্থাপন হয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিঙে ধর্মাঙ্কুরের শাখা বিহার নির্মিত হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে জামশেদপুরের টাটানগরে সভার শাখা স্থাপিত হয়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে কৃপাশরণ কলকাতার ধর্মাঙ্কুর সভার উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলন করেন। এইবছর ধর্মাঙ্কুর বিহারে ভিক্ষুসীমা এবং বুদ্ধধাতু স্তূপের ভিত্তিস্থাপন হয়। 

বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার প্রাক্তন সম্পাদক অধ্যাপক বেণীমাধব বড়ুয়া বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার সদস্যপদ লাভ করে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ সম্পাদকের পদে আসীন হন। বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার প্রাক্তন সভাপতি সাঙ্ঘিক ব্যক্তিত্ব ভদন্ত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির (১৮৭৯-১৯১৭) বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারত, পূর্ব-পাকিস্তান আর মায়ানমারে বৌদ্ধধর্মের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার প্রাক্তন বিহারাধ্যক্ষ পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক ছিলেন। তিনি পালি সাহিত্যে পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ 'রাষ্ট্রপতি সম্মান শংসাপত্র' লাভ করেন।

কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবিরের অন্যতম সার্থক উত্তরসূরী বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার লক্ষ্মৌ শাখার বোধানন্দ মহাস্থবির ও বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার প্রাক্তন সভাপতি জিনরতন মহাস্থবির। তাঁদের চেষ্টায় উত্তর ও পূর্ব ভারতে ধর্মাঙ্কুর সভার কার্যকলাপ ও আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক ধর্মপাল মহাথের। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ধর্মপাল মহাথের বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভাকে সব দিক থেকেই শ্রেষ্ঠত্বের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় ধর্মাঙ্কুর সভায় অতীশ দীপঙ্কর ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজগীরে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ধর্মপাল মহাথের মহাপ্রয়াণের পর সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেন হেমেন্দুবিকাশ চৌধুরী। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে সভাপতি হয়েছেন।

বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার সামগ্রিক বিকাশে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নিঃস্বার্থ অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিষ্ঠাতা কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবির থেকে ধর্মপাল মহাথের হয়ে ভদন্ত বোধিপাল ভিক্ষু পর্যন্ত ভিক্ষুদের ত্যাগ-তিতিক্ষায় ও পরিশ্রমের ফলেই ধর্মাঙ্কুর মহাবিহারের ঐতিহ্য আজও বর্তমান। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে স্বচ্ছ সাধারণ সম্পাদকের ভাবমূর্তি গঠনের প্রত্যাশায় ভদন্ত ভিক্ষু বোধিপালকে সাধারণ সম্পাদকের পদে আসীন হন। তিনি কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবিরের নাতির ঘরের পুতি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আধুনিক মানচিত্রে ভদন্ত বোধিপাল ভিক্ষু  দূরদর্শী সাংঘিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।  

তিনি কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবিরের আদর্শ তুলে ধরে যুবশক্তির উত্থানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যুবশক্তির প্রতি অবহেলা বৌদ্ধ সমাজের অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করতেন। বৌদ্ধসংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের জন্য যুবশক্তিকে বৌদ্ধ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে, সেইক্ষেত্রে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহার সহ সকল বিহারের বিশেষ যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। শিশুদের মধ্যে বৌদ্ধ চেতনার বিকাশে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের দায়িত্বের কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দিতেন। কিশোর ও যুবমনের সর্বাঙ্গীন বিকাশসাধনের লক্ষ্যে তিনি সাংগঠনিক প্রতিভার পরিচয় রেখেছিলেন। কৃপাশরণ মহাস্থবিরের উত্তরাধিকারী হলেন বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভায় সাধারণ সম্পাদক ভদন্ত বোধিপাল ভিক্ষু। কোলকাতার বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার সাধারণ সম্পাদক, মানবতাবাদী, ভিক্ষু বোধিপাল ও মানতাবাদী, Xianzhongshi করোনা কালীন সময়ে ভারতে এবং বাংলাদেশে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছিলেন।

ভিক্ষু বোধিপাল কলকাতায় আয়োজিত বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সম্মেলনে একটি পরিচিত মুখ ছিলেন এবং তিনি ইউনাইটেড ইন্টারফেইথ ফাউন্ডেশনের অংশ হিসেবে কাজ করেছেন, যা ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে ধর্মীয় সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করত। এই বছরের মার্চ মাসে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়, বেঙ্গল বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ভিক্ষু বোধিপাল সমাজের বিভিন্ন নিম্ন আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ সংগঠিত করা এবং বিতরণে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। কর্মময় জীবনের প্রতি তাঁর এমন নিবেদন ছিল যে, তিনি প্রায়শই নিজের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা উপেক্ষা করে অসহায় ও দরিদ্রদের মধ্যে বিভিন্ন খাদ্য ও অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের জন্য অবিরাম কাজ করে গেছেন। বোধিপাল ভিক্ষু মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে ২৭ জুলাই ২০২০ অকালে প্রয়াত হন।

No comments:

Post a Comment