Thursday, October 8, 2026

ধর্ম-বিচয়-সম্বোজ্জঙ্গ

ধর্ম-বিচয়-সম্বোজ্জঙ্গ
সুমনপাল ভিক্ষু

'ধর্ম-বিচয়-সম্বোজ্জঙ্গ' বা 'ধর্ম-বিচারের মাধ্যমে বোধিপ্রাপ্তির অঙ্গ' হলো মূলত সেই একই মানসিক গুণ বা প্রজ্ঞা-চেতসিক (pañña-cetasika), যা সবকিছুকে অনুধাবন করতে সক্ষম এবং যা নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর মধ্যেও সহজাতভাবে অন্তর্ভুক্ত :

বিমংসা-ঋদ্ধিপাদ (অনুসন্ধানমূলক ঋদ্ধিপাদ বা সিদ্ধির ভিত্তি)
প্রজ্ঞেন্দ্রিয় (বোঝার ক্ষমতা)
প্রজ্ঞাবল (বোঝার শক্তি)
সম্যক-দৃষ্টি (মার্গ-অঙ্গ বা পথের উপাদান)। একে এমনভাবে প্রশিক্ষিত, বিকশিত ও পরিমার্জিত করা যায় যা পূর্ণ বোধি বা আলোকায়ন ঘটায়!
যদি বোধিপ্রাপ্তির মূল কারণ হিসেবে কোনো একটি গুণের কথা উল্লেখ করতে হয়, তবে তা হলো এই 'ধর্ম-বিচয়-সম্বোজ্জঙ্গ' বা ধর্ম-বিচারের মাধ্যমে বোধিপ্রাপ্তির অঙ্গটিই!

বুদ্ধ একবার বলেছিলেন : কোন মানসিক আস্রব বা ক্লেশসমূহ (āsava) অনুশীলনের মাধ্যমে জয় করা উচিত? যদি কোনো ভিক্ষু সতর্ক ও যৌক্তিক মনোযোগের সঙ্গে নির্জনতা, বৈরাগ্য ও নিরোধের ওপর ভিত্তি করে এবং পরিশেষে সর্ব-ত্যাগ বা আসক্তি-মুক্তির লক্ষ্যে 'ধর্ম-বিচয়-সম্বোজ্জঙ্গ'কে বিকশিত করেন, তবে তাঁর মধ্যে কোনো আস্রব, কোনো দাহ (মানসিক জ্বালা) বা কোনো অসন্তোষ কখনোই আর উৎপন্ন হতে পারে না। মধ্যম নিকায়, ২য় খণ্ড, ১১।

এভাবে সচেতন থেকে তিনি সেই গুণটিকে তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে পরীক্ষা, বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করেন। এভাবে সচেতন অবস্থায় নিবিড় অনুসন্ধান, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যখন পূর্ণ স্বজ্ঞাত বোধ বা উপলব্ধি অর্জিত হয়, তখন এই 'ধর্ম-বিচয়-সম্বোজ্জঙ্গ' জাগ্রত হয়ে ওঠে। তিনি একে বিকশিত করেন এবং তাঁর ক্ষেত্রে এটি বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। মধ্যম নিকায, ১১৮, ৩য় খণ্ড, ৮৫।

ধর্ম-বিচারের ক্ষমতা বলতে বোঝায় কোনো নির্বাচিত বিষয়কে পরীক্ষা, পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা; আর যখন এই ক্ষমতা অটল ও অব্যর্থ হয়ে ওঠে, তখন তা 'ধর্ম-বিচারের শক্তি'তে (বা প্রজ্ঞাবলে) পরিণত হয়! গভীর ও আগ্রহপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, সমস্ত কিছুই কারণ ও শর্তের ওপর নির্ভরশীল; অর্থাৎ এগুলি কেবলই যৌগিক গঠন বা এমন সব অবস্থা যা উৎপত্তি, স্থিতি ও লয়ের—অকল্পনীয় দ্রুত মুহূর্তের (প্রায় ১০⁻৪৫ সেকেন্ড)—মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়! পরপর দুটি মুহূর্তেও কোনো কিছুই 'একই' বা 'স্থির' থাকে না। এই সর্বজনীন পরিবর্তনশীলতা বা প্রবাহকে অনুধাবন করা ধীরে ধীরে তৃষ্ণা ও আসক্তিকে শিথিল করে দেয়। তাই কোনো কিছুকেই (বিশেষ করে 'নিজেকে'!) অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না। বরং সর্বদা যাচাই-বাছাই করুন এবং যা সন্দেহজনক বা অস্পষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। ভালোভাবে যাচাই না করে কোনো তাড়াহুড়ো করা সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না!

'ধর্ম-বিচয়' বা অবস্থার স্বরূপ অনুসন্ধান—যা বোধোদয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ—হলো সেই তলোয়ার,
যা নানাবিধ মতবাদের জঙ্গল ভেদ করে প্রকৃত বোধ ও সত্য জ্ঞানের পথে নিয়ে যায়।

এই সাতটি বিশুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্যে শেষ পাঁচটি ধাপে (৩য় থেকে ৭ম) এই অনুসন্ধানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে :
১: শীল-বিশুদ্ধি (নৈতিক আচরণের বিশুদ্ধি)।
২: চিত্ত-বিশুদ্ধি (মনের বিশুদ্ধি)।
৩: দৃষ্টি-বিশুদ্ধি (দৃষ্টিভঙ্গি বা মতের বিশুদ্ধি)।
৪: কাঙ্খা-বিতরণ-বিশুদ্ধি (সন্দেহ নিরসনের মাধ্যমে বিশুদ্ধি)।
৫: পথ ও অপথ বিষয়ক জ্ঞান ও দর্শনের মাধ্যমে বিশুদ্ধি।
৬: এই পথে অগ্রগতির জ্ঞান ও দর্শনের মাধ্যমে বিশুদ্ধি।
৭: জ্ঞান-দর্শন-বিশুদ্ধি (জ্ঞান ও দর্শনের বিশুদ্ধি)।  
এই তিনটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ অনুদর্শনের মধ্যেই অনুসন্ধান নিহিত রয়েছে : অনিত্যতা-অনুদর্শন (aniccānupassanā), দুঃখ-অনুদর্শন, (dukkhānupassanā), অনাত্মা-অনুদর্শন, (anattānupassanā)

অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিম্নলিখিত নয় প্রকারের প্রকৃত বিপশ্যনা-জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টি লাভ হয় :
১. উদয়-ব্যয় জ্ঞান (udayabbayānupassanā-ñāna)
২. ভঙ্গ-জ্ঞান বা ক্ষণস্থায়ী বিলয়ের জ্ঞান (bhangānupassanā-ñāna)
৩. ভয়-উপস্থান জ্ঞান বা ভীতিপ্রদ রূপের জ্ঞান (bhayatūpatthānā-ñāna)
৪. আদীনব-জ্ঞান বা বিপদের জ্ঞান (ādīnavānupassanā-ñāna)
৫. নির্বেদ-জ্ঞান বা বিরাগ-উৎপাদক জ্ঞান (nibbidānupassanā-ñāna)
৬. মুঞ্চিতুকাম্যতা-জ্ঞান বা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা-বিষয়ক জ্ঞান (muccitu-kamyatā-ñāna)
৭. প্রতিসংখ্যান-জ্ঞান বা পর্যালোচনা-বিষয়ক জ্ঞান (patisankhānupassanā-ñāna)
৮. সংস্কার-উপেক্ষা-জ্ঞান বা সকল সংস্কারের প্রতি সমভাবের জ্ঞান (sankhārupekkhā-ñāna)

৯. সত্য-অনুলোমিকা-জ্ঞান বা পরম সত্যের অনুকূল অভিযোজন-জ্ঞান (saccānulomika-ñāna)। 

No comments:

Post a Comment