দশটি পূর্ণতার (পারমী) ব্যাখ্যা
সুমনপাল ভিক্ষু
দশটি পূর্ণতা (দশ পারমী) হলো:
প্রথম পূর্ণতা: দান (দান-পারমী):
উল্টে দেওয়া জলের পাত্র থেকে যেমন সমস্ত জল বেরিয়ে যায় এবং কিছুই আর ভেতরে থাকে না, তেমনি দান-পারমী হলো এমন এক গুণ—যেখানে সবকিছু উৎসর্গ করার পরেও যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা মায়া থাকে না।
দ্বিতীয় পূর্ণতা: নৈতিকতা বা শীল (শীল-পারমী):
ঝোপের মধ্যে লেজ আটকে গেলে চমরী গাই যেমন লেজ ছিঁড়ে ফেলার চেয়ে মৃত্যুকেও শ্রেয় মনে করে (অর্থাৎ লেজ বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেয়), তেমনি শীল-পারমী হলো সমস্ত নীতি ও প্রতিজ্ঞা পালনে অত্যন্ত সতর্ক থাকা এবং কোনো পরিস্থিতিতেই—এমনকি মৃত্যুর হুমকি সত্ত্বেও—সেগুলো ভঙ্গ না করা।
তৃতীয় পূর্ণতা: জাগতিক আসক্তি থেকে নিবৃত্তি বা ত্যাগ (নেক্খম্ম-পারমী):
কারাগারে বন্দী ব্যক্তি যেমন সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তেমনি নিবৃত্তি বা ত্যাগের পূর্ণতা হলো নশ্বর অস্তিত্বের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং একমাত্র এই ইচ্ছাই পোষণ করা: অনিত্য বিষয়গুলোকে বর্জন করা এবং চিরতরে তা থেকে মুক্তি পাওয়া।
চতুর্থ পূর্ণতা: প্রজ্ঞা বা বোধশক্তি (পঞ্ঞা-পারমী):
ভিক্ষাচর্যে রত কোনো ভিক্ষু যেমন কোনো বাড়িকেই উপেক্ষা করেন না এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই সব পরিবারের কাছে যান, তেমনি প্রজ্ঞা-পারমী হলো কোনো কিছু বাদ না দেওয়া বা কোনো ফাঁক না রাখা এবং নিজের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও জ্ঞানী ও উন্নত ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা।
পঞ্চম পূর্ণতা: উদ্যম বা বীর্য (বীর্য-পারমী):
সিংহ যেমন দাঁড়িয়ে, চলতে চলতে কিংবা বসে—সর্বাবস্থাতেই তার শক্তিকে সংহত ও প্রস্তুত রাখে, তেমনি উদ্যম ও উৎসাহপূর্ণ প্রচেষ্টার পূর্ণতা হলো এমন এক উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা যা লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম চলতে থাকে।
ষষ্ঠ পূর্ণতা: সহনশীলতা বা ক্ষান্তি (খন্তি-পারমী):
বিশাল পৃথিবী যেমন তার ওপর নিক্ষিপ্ত অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নোংরা জিনিসগুলোকেও গ্রহণ করে নেয়, তেমনি সহনশীলতার পূর্ণতা হলো নিন্দা, অপবাদ ও অসম্মানকে কোনো প্রকার বিদ্বেষ বা বিরক্তি ছাড়াই মেনে নেওয়া, সহ্য করা এবং সেগুলোকে নিজের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে না দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়া। সপ্তম পারমী: সততা বা সত্যবাদিতা (সচ্চ):
একটি নক্ষত্র যেমন তার নির্দিষ্ট কক্ষপথ থেকে কখনোই বিচ্যুত হয় না, তেমনি সত্যবাদিতার পারমী বা পূর্ণতা হলো—কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা না বলা এবং সামান্য কোনো লাভের আশায় প্রকৃত সত্য থেকে এক চুলও সরে না আসা।
অষ্টম পারমী: দৃঢ় সংকল্প (অধিষ্ঠান):
প্রবল ঝড়ের মধ্যেও একটি পর্বত যেমন অটল ও অবিচল থাকে এবং তাকে স্থানচ্যুত করা যায় না, তেমনি দৃঢ় সংকল্পের পারমী হলো—নিজের কল্যাণকর সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল থাকা এবং কোনো ভালো ও হিতকর কাজ করার সময় কোনো কিছুর দ্বারাই বিচ্যুত বা বিভ্রান্ত না হওয়া।
নবম পারমী: মৈত্রী বা বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব (মেত্তা):
জল যেমন কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই সৎ ও অসৎ—উভয় ধরনের মানুষকে সতেজ ও পরিচ্ছন্ন করে তোলে, তেমনি মৈত্রীর পারমী বন্ধু ও শত্রু—উভয়ের প্রতিই সমান মনোভাব পোষণ করে এবং কোনো প্রকার পার্থক্য, পক্ষপাত বা স্বজনপ্রীতি প্রদর্শন করে না।
দশম পারমী: সমভাব বা উপেক্ষা (উপেক্ষা):
বিশাল পৃথিবী যেমন তার ওপর পবিত্র বা অপবিত্র—যাই ফেলা হোক না কেন, তাতে কোনো বিকার বা বিরাগ প্রকাশ না করে অবিচল ও সমভাবাপন্ন থাকে, তেমনি সমভাবের পারমী হলো—সুখ বা দুঃখ—যাই আসুক না কেন, তাতে বিচলিত না হয়ে (অর্থাৎ কোনো কিছুর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বা বিকর্ষণ অনুভব না করে) সর্বদা শান্ত ও স্থির থাকা। এমনকি তীব্র সংঘাত কিংবা চরম সাফল্যের মুহূর্তেও অবিচল থাকা!
বুদ্ধত্ব লাভের ঠিক আগে বুদ্ধকে শেষ আহার্য প্রদানের মাধ্যমে সুজাতা তাঁর দানশীলতার পারমী পূর্ণ করেছিলেন!
এই ১০টি মানসিক পারমী (দশ পারমী) সম্পর্কে আরও তথ্য:
দশ পারমী (The Ten Perfections) / ১০টি মানসিক পারমী / ১০টি পূর্ণ গুণাবলি
উৎস: বুদ্ধবংস ২, শ্লোক ১১৭-১৬৬
গ্রন্থ: 'সিমিলিস অফ দ্য বুদ্ধ: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন' (Similes of the Buddha: An introduction), বিপি ৪২৭এস (BP 427S), লেখক: হেলমুট হেকার (Hellmuth Hecker)।
No comments:
Post a Comment