Thursday, October 8, 2026

প্রসঙ্গ রাহুল সাংকৃত্যায়ন

 প্রসঙ্গ রাহুল সাংকৃত্যায়ন 


"ফ্যাসিজম ধারণাটি উদ্ভব 'লাঠির বান্ডিল' থেকে। অনেকগুলি লাঠি মিলে একটি মুগুর তৈরী হয়। এ মুগুর যখন ভিন্নমতের মানুষদের মাথায় বাড়ি মারতে থাকে ,তখন তাকে ফ্যাসিবাদ বলে। শব্দটি এসেছে ইতালীয় 'ফ্যাসিকো' থেকে, যার অর্থ বান্ডিল। সমাজে বাস করা প্রতিটি মানুষ'ই লাঠি। এরা রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে একত্রিত হয়, এবং চড়াও হয় ভিন্নমতের মানুষের উপর, তখন বুঝতে হবে সমাজে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। পশুরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এর জন্য কোন করার আগে দেখা উচিত- আপনি ফ্যাসিবাদের লাঠি রূপে ব্যবহৃত হচ্ছেন কিনা। মানুষের বান্ডিলে অংশ নিচ্ছেন কিনা।" -অন্য চোখ।

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'আত্মবিস্মৃতি, আত্মহত্যা ও একজন লেখক ' (পৃ, ৪৮) নামক নিবন্ধে লিখেছেন, " বাঙালী আত্মবিস্মৃত জাতি। কথাটি আংশিক সত্য। বাকি আংশিক সত্য। বাকি অর্ধেক, যা বাঙালীর অন্য পরিচয়, তা হল আত্মহত্যার প্রতি এই জাতির প্রচণ্ড আকর্ষণ। অর্থাৎ বাঙালী যেমন নিজেকে ভুলে থাকে, তেমনি নিজেকে হত্যাও করতে চায়। তার মধ্যে যা শুভ, যা চিরন্তন, যা প্রকৃত অর্থে মূল্যবান, তাদের প্রতি সহজাত বিদ্বেষ অধিকাংশ বঙ্গ সন্তানই নিজের মধ্যে লালন করে।

প্রমাণ? বাঙালীর রাজনীতি।......
........আর, সর্বোপরি বাংলার ইনটেলেক্টচুয়ালগণ। টাকা ফেলুন, একটির পর একটি বুদ্ধিজীবীদের দেখবেন আপনার সামনে নতজানু, তখন তোতাপিখির মতো তারা সেসব কথাই বলবেন, যা আপনার শিখিয়ে দেওয়া।.........

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যে কোন কথা সাহিত্যিক অথবা কবি কিম্বা ইনটেলেক্টচুয়াল জায়েন্ট এর নাম উচ্চারণ, তার প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা নিবেদন করা তখন অপরের হাস্য কৌতুক এবং ঈষৎ বিদ্রুপ এড়ানোর প্রক্রিয়াতেই ইন্ধন প্রদান করবে বলে মে হয়। এই কারণেই হয়ত সমর সেন উচ্চারণ করেছেন-
আমরা বাঙ্গালী; মীরজাপরের অতীত মেকেলের শিক্ষা প্রাপ্ত। 
বিষবৃক্ষের ফল।
অনেকদিন ভেবেছি,
কখনো আকাশের খোলা মাঠে সূর্যের শেষ শিবির সন্ধ্যায়
কখনো বিনিদ্র রাতে নগরের স্তব্দতায়।

এখানে গোদার, বুনুয়েল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভ্রান্ত মধ্যবিত্ত বাঙালীর প্রতিনিধি। আর মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন? সে আবার কে! পিথেকানথ্রোপস নাকি মিসিং লিংক। হতে পারে এর কোনটার মধ্যে একটা অথবা বোবাযুদ্ধের সারথি।.......
তাই তাঁর মূর্তি উৎপাটন কিম্বা শ্মশানের শোভাযাত্রা বোধকরি একই জিনিস হতে পারে।.......বোধ হয় হীরক রাজা। না কি অন্য কেউ।
 
ইতিহাস বলে মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন একজন বহুআয়ামী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ইতিহাস, ধর্ম এবং দর্শন, সাহিত্য, পুরাতত্ব,ভাষাতত্ত্ব, যাত্রাবৃত্তান্ত, লিপিশাস্ত্র, কোশ, ব্যাকরণ, তথা বৌদ্ধ বার্মা ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক রচনা সম্পাদন কার্য করেছিলেন। তাঁর মৌলিক রচনা, অনুবাদ তথা সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৫০।

বৌদ্ধ বাঙ্ময় ইতিহাস অনুসন্ধান এবং সেই সকল পাণ্ডুলিপি সমূহ ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ এর প্রশ্নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এই কারণে তিনি (১৯২৯-৩৮ খ্রীষ্টাব্দ) তিব্বত হতে আচার্য দিঙনাগ'এর 'প্রমাণসমুচ্চয়' ব্যতীত অন্যান্য বৌদ্ধ সংস্কৃত গ্রন্থের প্রতিলিপি নিমার্ণ তথা অনুবাদ কার্য সম্পন্ন করেছিলেন। সর্বোপরি তিনি তিব্বতী পাঠাবলী, তিব্বতী ব্যাকরণ, সংস্কৃত পাঠাবলী, তিব্বতী- সংস্কৃত কোশ, তিব্বত-হিন্দি কোশ এর রচনা করেছিলেন। এই ভাবে বৌদ্ধ বিদ্যার ক্ষেত্রে রাহুল সাংকৃত্যায়ন একঅর্থে দিগন্তের অন্বেষণ। 

অথচ আমরা বিকৃত কিছু মানুষের নোংরা পচা প্রবৃত্তির পক্ষে ওকালতি কর এই মহান পণ্ডিতের মূর্তি উৎপাটন করে ইতিহাস বিকৃতির পথে হাঁটতে লাগলাম। আজ আমরা এতই অধপতিত যে বাজারে দালালের হাত ধরে নানা উৎকট আচরনে লিপ্ত। এবং এই আমরা ধর্মমোহের অহিফেন সেবন করে তথাকথিত ধর্ম বিপ্লবের প্রচারক হতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। সংস্কার মুক্ত কর্ম জীবনের পরিবর্তে আমরা গ্রহণ করেছি বিজাতীয় সংস্কৃতি।.......

নিষ্ফল দিন কাটে ক্ষয়রোগীর কামার্ত প্রার্থনায়।
তাই ঘরে বসে সর্বনাশের সমস্ত ইতিহাস 
অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো বিচলিত শুনি,
আর ব্যর্থ বিলাপের বিকারে বলি :
আমাদের মুক্তি নেই,....... ।

****সুমনপাল ভিক্ষু***

No comments:

Post a Comment