Monday, February 2, 2026

গ্রীক বৌদ্ধধর্ম


সুমনপাল ভিক্ষু

গ্রীক বৌদ্ধধর্ম বা গ্রেকো বৌদ্ধধর্ম হল হেলেনীয় সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে সেই সংমিশ্রন যেটি বিকশিত হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের খ্রী. পূর্ব: ৪র্থ শতক এবং খ্রীষ্টীয় ৫ম শতকের মধ্যবর্তী সময়। এটি ছিল আলেকজাণ্ডারের সময় থেকে ভারতবর্ষে বিভিন্ন গ্রীক আক্রমণের ফলে তৈরী বিভিন্ন আদানপ্রদানের দীর্ঘ শৃঙ্খলের ফলাফল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালে তারপর ম্যাসিডনীয় ক্ষত্রপগুলি মৌর্য সম্রাজ্যের আক্রমণে পরাভূত হয়।

অশোকের শিলালিপি থেকে জানা যায় যে মৌর্য সম্রাট অশোক সেখানকার মানুষকে বৌদ্ধধর্ম দীক্ষিত করেছিলেন। মৌর্য সম্রাজ্যের পতনের পর গ্রীক বৌদ্ধধর্ম গ্রীক- ব্যাষ্ট্রিয় রাজ্য, ইন্দো- গ্রীক রাজ্য এবং কুষাণ সাম্রাজ্যে সমৃদ্ধিলাভ করতে থাকে। বৌদ্ধধর্ম খ্রীষ্ট্রীয় প্রথম শতকে মধ্য ও উত্তর পূর্ব এশিয়ায় গৃহীত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত-চীন, কোরিয়া, জাপান, সাইবেরিয়া ও ভিয়েতনামেও প্রচারিত হয়।

হেলেনীয় গ্রীকের প্রবর্তন শুরু হয় যখন আলেকজাণ্ডার ৩৩৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আকামেনিড সাম্রাজ্য ও মধ্য এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল জয় করেন। তারপর আলেকজাণ্ডার পাঞ্জাব (পঞ্চ নদের দেশ) এ আসেন যেটি পূর্বে দারায়ুস দ্বারা বিজিত হয়েছিল। আলেকজাণ্ডার সিন্ধু নদ ও ঝিলাম নদী অতিক্রম এবং তারপর পুরুকে হিদাসপিসের যুদ্ধে পরাজিত করে তাঁকে সেখানকার ক্ষত্রপ নিযুক্ত করেন। নন্দ সাম্রাজ্যের শক্তির মুখোমুখি হয়ে আলেকজাণ্ডারের কাহিনী বিদ্রোহ করে এবং পাঞ্জাবকে সম্পূর্ণভাবে দখল না করেই বিয়াস নদী বরাবর পশ্চাদপসরণ করে। আলেকজাণ্ডার আমু দরিয়া এবং ব্যাক্ট্রিয়া অঞ্চলে একাধিক শহর প্রতিষ্ঠা করেন এবং গ্রীক উপনিবেশ খাইবার গিরিপথ, গান্ধার (তক্ষশীলা দ্রষ্টব্য) এবং পাঞ্জাবে বিস্তৃত হয়। ৩২৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের ১০ জুন আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর দিয়াদোচি বা উত্তরসূরীরা তাঁদের নিজস্ব রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। সেনাপতি সেলুকাস আনাতোলিয়া ও মধ্য এশিয়ার সেলুসিড সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেটি ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মৌর্য সাম্রাজ্য প্রথমে নন্দ সাম্রাজ্য দখল করে। তারপর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য যুদ্ধে  সেলুসিড সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন। এর ফলে সিন্ধু উপত্যকা ও গান্ধরারের ম্যাসিডনীয় ক্ষত্রপরা মৌর্য সাম্রাজ্যে স্থানান্তরিত হন। এছাড়াও সেলুকাসের কন্যার সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের বিবাহের ফলে কূটনৈতিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়। এছড়াও এই দ্বন্দ্বের ফলে মৌর্য সাম্রাজ্য থেকে সেলুসিড সাম্রাজ্যে ৫০০টি রণহস্তী স্থানান্তরিত করা হয়, সম্ভবত এর উদ্দেশ্য ছিল প্রাণনাশ ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

মৌর্য সম্রাট অশোক ভারতবর্ষে সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন কলিঙ্গ যুদ্ধের পর। সম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করে অশোক তার পরিবর্তে মানবতাবাদী সংস্কারের নীতি গ্রহণ করেন। অশোকের নির্দেশনামা অনুসারে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র বৌদ্ধধর্মকে ধম্ম হিসেবে প্রচার করেন। অশোক দাবি করেছেন যে তিনি জনগণসহ বহু মানুষকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেন।

এখানে রাজার রাজত্বে, গ্রীক, কম্বোজ, নভক, নভপমকিট, ভোজ, পিটিনিকা, অন্ধ্র এবং পালিদাস সকলেই ধর্ম সম্পর্কে দেবানাম পিয়ের অনুশাসনকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। শুঙ্গ রাজবংশের দ্বারা মৌর্য রাজবংশের পতন এবং সেলুসিড সাম্রাজ্যে ব্যাক্ট্রিয়ার বিদ্রোহের ফলে (১৮০ খ্রী. পূর্ব ১০ খ্রী.)। যদিও এই অঞ্চলটিকে ইন্দো- সাইথিয়রা ও কুষাণরা জয় করেছিল (খ্রীষ্টীয় ১ম থেকে ৩য় শতক), তবু বৌদ্ধধর্ম সমৃদ্ধিলাভ করেই চলেছিল। ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম বহু শতাব্দী ধরে প্রধান ধর্মরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল যতদিন না খ্রীষ্টীয় ৫ম শতকের আশেপাশে একটি বৈদিক ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে। এর ফল স্বরূপ বৌদ্ধধর্ম কেবলমাত্র বাংলাদেশের মত কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে ইসলামী আক্রমের সময় প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান : 

উত্তর ভারত ও মধ্য এশিয়ার গ্রীক অস্তিত্বের দৈর্ঘ্য কেবলমাত্র শৈল্পিক নয় ধর্মীয় স্তরেও আদানপ্রদানের সুযোগ করে দিয়েছিল। ব্যাক্ট্রিয়া ও ভারতবর্ষে আলেকজাণ্ডার দ্যা গ্রেট (৩২১ খ্রী. পূর্ব ৩২২ অব্দে আলেকজাণ্ডারের ভারতবর্ষ অভিযানের পর প্রস্তুত হয়। সোজা দিকে নাইক দ্বারা আলেকজাণ্ডারের রাজমুকুট ধারণ বিপরীত দিকে আলেকজাণ্ডার হাতীর পিঠে চড়ে পুরুকে আক্রমণ করছে। (রৌপ্য মুদ্রা : ব্রিটিশ মিউজিয়াম)।

যখন আলেকজাণ্ডার ব্যাক্ট্রিয়া ও গান্ধার আক্রমণ করেন তার পূর্বেই সেই সমস্ত এলাকা বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মত শ্রামণ্য ধর্মের প্রভাবাধীন ছিল। পালি কিংবদন্তী অনুসারে ব্যাক্ট্রিয়ার কামসোভোগের দুই বণিক ভাই তপস্সু ও ভল্লিক গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাকে প্রচার করেন। ৩২৬ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে আলেকজাণ্ডার ভারতবর্ষের উত্তরাংশ অধিকার করেন এবং তক্ষশীলার রাজা অভি বৌদ্ধধর্মের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র সেই নগরটিকে আলেকজাণ্ডারের কাছে সমর্পণ করেন। আলেকজাণ্ডার ৩২৬ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে হিদাসপিসে পাঞ্জাবের পুরুর বিরুদ্ধে একটি মহাকাব্যিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।

মৌর্য সম্রাজ্য (৩২২ খ্রী. পূর্ব-১৮৩ খ্রী. পূর্ব) :

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ভারতীয় সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশেপাশে ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম অংশের সেই সমস্ত অংশগুলি পুর্ণবিজয় করেন যেগুলি আলেকজাণ্ডার দ্বারা বিজিত হয়েছিল। তবে, সেলুসিড সাম্রাজ্যে তাঁর গ্রীক ইরাণীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে তিনি সংযোগ রক্ষা করেছিলেন। সম্রাট প্রথম সেলুকাস নিকেটর একটি শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে একটি সামরিক চুক্তি করেন এবং ঐতিহাসিক মেগাস্থানিসের মত অনেক গ্রীক মৌর্য রাজসভায় অবস্থান করতেন।

মৌর্য সম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্রে খ্রী. পূর্ব ৩য় শতকে। চন্দ্রগুপ্তের নাতি অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন থেরবাদী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজন ক্ষমতাবান প্রচারকে পরিণত হন। তিনি মানুষ ও পশুর প্রতি অহিংসা এবং সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে শীল পালনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর প্রস্তরে খোদিত আদেশনামা অনুসারে যার কয়েকটি গ্রীক এবং কয়েকটি আকামেনিদের রাষ্ট্রভাষায় আরেমিক রচিত তিনি এশিয়ার ও গ্রীক সুদূর অঞ্চলে ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারকদের প্রেরণ করেন। তাঁর আদেশনামায় হেলেনীয় যুগের প্রতিটি রাজার নাম উল্লেখ রয়েছে।

এখানে সীমান্তে ধম্ম বিজয়প্রাপ্ত হয়েছে, এমনটি দৃশ যোজন (৪০০০ মাইল) দূরে ও যেখানে গ্রীক রাজা অ্যাক্টিওকাস শাসন করে থাকেন এবং সেই অঞ্চল ছাড়িয়ে যেখানে টলেমি (তুরমায়া), অ্যান্টিগোনাস (অন্তকিনি), মগ (মক) এবং আলেকজাণ্ডার রাজত্ব করেন (আলিকাসু [ন] দারা) রাজত্ব করেন। সেখানেও ধম্ম প্রচারিত হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ ভারতে চোল পাণ্ড্য থেকে শুরু সুদূর তাম্রপন্নি পর্যন্ত ধম্ম প্রচারিত হয়েছে।

অশোক এই দাবিও করেছেন যে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের গ্রীক প্রজাদের বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেছেন : এখানে রাজার রাজত্ব গ্রীক, কম্বোজ, নাভাক, নভপামকিত, ভোজ, পতিনিকা, অন্ধ্র, এবং পালিদাস সর্বত্র মানুষ ধর্মের ক্ষেত্রে দেবানামপ্রিয়ের অনুশাসনকে অনুসরণ করে চলেছে। পালি ইতিবৃত্ত অনুসারে শেষ পর্যন্ত, বিখ্যাত ধর্মরক্ষিতের মত অশোকের কয়েকজন রাজদূতকে, প্রধান গ্রীক রাজদূতের হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারের সক্রিয় ছিলেন (মহাবংশ ১১) এবং তাঁরা বৌদ্ধধর্মের ধর্মগুপ্তিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ব্যাক্ট্রিয়া গ্রীক উপস্থিতি (৩২৫খ্রি. পূর্ব ১২৫ খ্রী. পূর্ব) গ্রীক ব্যাক্ট্রিয়া নগরী আইখানুম (আনুমানিক ৩০০ -১৪৫ খ্রী. পূর্ব) ভারতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত ছিল। আলেকজাণ্ডার  ব্যাক্ট্রিয়াতে অনেকগুলি নগরীর (আইখানুম, বাগরাম) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এদের শাসনব্যবস্থা সেলুসিড সাম্রাজ্য, এবং এদের শাসনব্যবস্থা সেলুসিড সাম্রাজ্য, এবং ব্যাক্ট্রিয়া রাজ্যের অধীনে দুই শতকেরও বেশী সময় স্থায়ী হয়েছিল এবং ভারতবর্ষের সঙ্গে এদের একটি স্থায়ী সম্পর্কও ছিল। গ্রীকরা মৌর্য সম্রাটদের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন, যেমন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালে ঐতিহাসিক মেগাস্থানিস, এবং পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজত্বকালে ডাইমেকুস। তাঁরা ভারতবর্ষে সত্যতা সম্পর্কে একটি বিশদ বিবরণ দিয়েছিলেন। মেগাস্থানিস ভারতীয় ধর্মগুলি সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিলেন এবং এই প্রতিবেদনটি গ্রীক ও ল্যাটিন জগতে শতকের পর শতক ধরে প্রচারিত হয়েছিল।

মেগাস্থানিস দার্শনিকদের মধ্যে ভিন্নভাবে শ্রেণীবিভাগ করেছিলেন। তাঁর মতে এরা দু'ধরনের ব্রাহ্মণ ও শ্রমণ। strabo xv I.58-60[13]. গ্রীক ব্যাক্ট্রিয়রা ভারতের দ্বারপ্রান্তে সে দেশে মৌর্য শাসনের যুগে একটি শক্তিশালী হেলেনীয় সংস্কৃতি বজায় রেখেছিলেন যার প্রমাণ পাওয়া যায় আইখানুনের প্রত্ন অঞ্চল থেকে। ১৮০ খ্রী. পূর্বে যখন শুঙ্গদের হাতে মৌর্য বংশের পতন হয়, তখন গ্রীক ব্যাক্ট্রিয়রা ভারতবর্ষে বিস্তৃত হল। যেই সমস্ত অঞ্চলে তারা ইন্দো-গ্রীক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করল, যেখানে বৌদ্ধধর্ম সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।

ইন্দো- গ্রীক রাজত্ব ও বৌদ্ধধর্ম (১৮০-১০ খ্রী. পূর্ব) গ্রীক দেবতা ও ধর্মচক্র। বামদিকে : জিউস নাইক ধরে রয়েছেন। তিনি ধর্মচক্রের উপর বিজয়মাল্য পরাচ্ছেন। (দ্বিতীয় মিনান্দারের মুদ্রা) ডানদিকে দেবতাগণ chlamys এবং petasus পরিহিত হয়ে ধর্মচক্র ঠেলছেন। সেখানে লিখিত আছে, "তিনি যিনি ধর্মচক্রকে গতিশীল করছেন। (Teltya Tape Buddhist - coin)

প্রধান নিবন্ধ ইন্দো গ্রীক রাজত্ব :

গ্রীক ব্যাক্ট্রিয়গণ ১৮০ খ্রী. পূর্ব থেকে উত্তর ভারতের অংশবিশেষ জয় করেছিলেন, যেখানে তাঁরা ইন্দো-গ্রীক নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা ১০ খ্রী. পর্যন্ত উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। ইন্দো-গ্রীক রাজাদের অধীনে বৌদ্ধধর্ম সমৃদ্ধিলাভ করেছিল এবং বলা হয়ে থাকে যে তাদের ভারতবর্ষের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধধর্মকে (১৮৫ খ্রী.- ৭৩ খ্রী. পূর্ব) অত্যাচার থেকে উদ্ধার করা যারা মৌর্যদের মতাচ্যুত করেছিল। Zarmanochegas ছিলেন একজন শ্রমণ (বৌদ্ধ নাও হতে পারেন) যিনি strabo ক্যামিয়াস ডিও ও দামাসকাসের নিকোলাসের মত প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতে অ্যান্টিওক ও এথেন্সে গমন করেছিলেন যখন অগাস্টাস রোম সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন।

আফগানিস্তান থেকে মধ্য ভারত প্রাপ্ত  ইন্দো গ্রীক রাজা প্রথম মিনান্দারের মুদ্রার (১ম রাজত্বকাল ১৬০ খ্রী. পূর্ব -১৩৫ খ্রী. পূর্ব) সম্মুখভাগে গ্রীক ভাষায় 'পরিত্রাতা রাজা মিনান্দার' এই কথাগুলি খোদিত রয়েছে। মিনান্দারের পর অনেক গ্রীক রাজার যেমন Zoilas I, strato I, Heliocles II, Theophilas, Peukolaos, Menander II, এবং Archebius এর মুদ্রায় প্রাকৃত ভাষায় খরোষ্ঠী লিপিতে 'মহারাজধার্মিকা' (ধর্মের রাজা) এই উপাধি খোদিত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় মিনান্দারের কয়েকটি মুদ্রার মধ্যে আটটি স্পোকযুক্ত বৌদ্ধ চক্র রয়েছে যেটি গ্রীক বিজয় প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত হয় বিজয়ের পাম, নয়ত বিজয়মাল্য যেটি হস্তান্তর করেন দেবী নাইকি। মিলিন্দ পঞ্হ অনুসারে রাজত্বের শেষে প্রথম মিনান্দার অর্হত্ব লাভ করেছিলেন, এটিও প্রতিষ্ঠাবান করেছেন প্লটার্কও, যিনি ব্যাখ্যা করছেন যে তাঁর ধাতুগুলি বন্টিত হয়েছিল এবং পূজিত হত।

ধর্মচক্র ও তাল পাতাসহ প্রথম মিনান্দার (১৬০ খ্রী পূর্ব - ১৩৫ খ্রী. পূর্ব) এর একটি মুদ্রা : 

ইন্দ্রো - ভারতীয় মুদ্রার সর্বত্রবিরাজমান হস্তী প্রতীকটি Anti aleidas ও দ্বিতীয় মিনান্দারের মুদ্রার সাদৃশ্যতার ইঙ্গিত অনুসারে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে সেখানে Antialcidas এর মুদ্রার হাতীর জিউস ও নাইকের যা সম্পর্ক, হাতীর সঙ্গে ধর্মচক্রেরও তাই সম্পর্ক বলে মনে করা যেতে পারে। যখন খ্রীষ্টীয় প্রথম শতকে জরত্রুস্ট্রীয় ইন্দো পার্থিব রাজা ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। তারা ইন্দো-গ্রীক প্রতীকতত্বের একটি বৃহৎ অংশকে গ্রহণ করেন। কিন্তু হাতীকে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন।

যার অর্থ হল এই যে এটির অর্থ কেবল ভৌগোলিক নয়। ইন্দো-গ্রীক মুদ্রার বিতর্ক ভঙ্গিমা উপরে Divinitus Tyche এবং Zeus নীচে ইন্দো-গ্রীক কান্না নিসিয়াম ও দ্বিতীয় মিনান্দারের বিবরণ। শেষে বলা যায়, প্রথম মিনান্দারের রাজত্বকালের পর অনেক ইন্দো-গ্রীক শাসক যেমন Amyntas Nikakar, Nicias, Poukolaos, Hermaeus, Hippostratos এবং দ্বিতীয় মিনান্দার তাদের মুদ্রার নিজেদের ও গ্রীক দেবতাদের যে চিত্র অঙ্কন করেছিলেন সেখানে দেখা যায় যে তাঁরা তাদের দক্ষিণ হস্তদ্বারা এমন একটি ভঙ্গিমা করেছেন যেটি বৌদ্ধ বিতর্ক মুদ্রার মত (বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনী একত্রিত অন্যান্য আঙ্গুলগুলি প্রসারিত)। বৌদ্ধধর্মে এটি বুদ্ধের শিক্ষার স্থানান্তরণের প্রতীক। টলেমির মতে উত্তর ভারতে গ্রীক নগরগুলি ব্যাক্ট্রিয়দের দ্বারা প্রতিষ্ঠত  হয়েছিল। মিনান্দারর সাগল (আধুনিক শিয়ালকোট পাঞ্জাব) এ তাঁর রাজধানী স্থাপন করেছিলেন যেটি বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তক্ষশীলার নিকটে শিরকাপের- প্রত্নস্থলে ডিমিস্ট্রিয়াস দ্বারা নির্মিত ও মিলিন্দার  দ্বারা পুর্ননির্মিত একটি বিশাল গ্রীক নগরী উৎখনন করা হয়েছিল সেখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরের সঙ্গে বৌদ্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছে যা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় সমন্বয়বাদের উদাহারণ।

এই পর্বে গ্রীক ও বৌদ্ধ ভাবনার ধর্মীয় আদানপ্রদানের প্রত্যক্ষ প্রমাণের মধ্যে রয়েছে প্রথম মিনান্দার ও বৌদ্ধ নাগসেনের মধ্য অনুষ্ঠিত পালি ভাষাও প্লেটোশৈলীতে রচিত ধর্মালোচনা 'মিলিন্দপঞ্হ'। মহাবংশ অনুসারে শ্রীলঙ্কার অনুরাধপুরের Ruwanwelisaya কে উৎসর্গ করেছিল ১৩০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ নাগাদ ককেশাসের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আগত ৩০০০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি যোন প্রতিনিধিদল।

মহাবংশের ২৯ তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে মিনান্দারের রাজত্বকালে মহাধর্মক্ষিত নামে একজন গ্রীক থের (প্রবীণ ভিক্ষু) ৩০০০০ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে 'আলেকজান্দ্রিয়া গ্রীক নগরী (সম্ভবত আজকের আফগানিস্তানের কাবুল থেকে প্রায় ১৫০ কিমি (৯৩ মাইল উত্তরে) ককেসাস পর্বতের উপর অবস্থিত আলেকজান্দ্রিয়াতে একটি বৌদ্ধ স্তূপ উৎসর্গ করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন যার অর্থ হল মিনান্দারের রাজত্বে বৌদ্ধধর্ম সমৃদ্ধিলাভ করেছিল এবং গ্রীকরা এসবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। গ্রীকদের দ্বারা অনেকগুলি উৎসর্গ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেমন থিওডোরাম নামে একশত একটি প্রদেশের গ্রীক শাসক যিনি খরোষ্টি ভাষায় বর্ণনা দিয়েছেন যেমন করে তিনি বুদ্ধের নিদর্শনকে মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন। লিপিটি পাওয়া গিয়েছিল একটি দানিতে একটি স্তূপের মধ্যে যার তারিখ হল মিনান্দার বা খ্রী. পূর্ব প্রথম শতকে তাঁর কোন উত্তরসুরীর রাজত্বকাল। শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ ঐতিহ্যে মিনান্দারকে  মহামতি অশোক ও কনিষ্কের মত বৌদ্ধধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকরূপে স্বীকার করা হয়েছে। গ্রীক অক্ষরে রচিত বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি আফগানিস্তানে পাওয়া গিয়েছে সেখানে বিভিন্ন বুদ্ধ এবং লোকেশ্বর বুদ্ধের মহাযানী মূর্তির প্রশস্তি বুদ্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই পুঁথিগুলি খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের পরবর্তী- বলে মনে করা হয়।

কুষাণ সাম্রাজ্য (১ম-৩য় খ্রীষ্টাব্দ) :

 ইউজিদের পাঁচটি উপজাতির অন্যতম কুষাণরা ১২৫ খ্রী. পূর্বাব্দ নাগাদ ব্যাক্ট্রিয়াতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে গ্রীক ব্যাক্ট্রিয়দের অপসারিত পরে। তারা প্রথম খ্রীষ্টাব্দ থেকে পাকিস্তান ও ভারতবর্ষের উত্তরাংশ আক্রমণ করতে শুরু করে। সেই সময়ের মধ্যেই তারা শতকের বেশী সময় ধরে গ্রীক সংস্কৃতি ও ইন্দো-গ্রীক রাজ্যগুলির সংস্পর্শে এসেছিল। তারা তাদের ভাষা লেখার জন্য গ্রীক লিপি ব্যবহার করত যার প্রমাণ মেলে তাদের মুদ্রা ও গ্রীক বর্ণমালা গ্রহণ থেকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের হেলেনীয় সংস্কৃতি : 
গ্রীক পোশাক, মৃৎপাত্র, সুরা ও সঙ্গীত :
 চাখিল-ই- ঘৌউন্ডি স্তূপ, হাড্ডা, গান্ধার খ্রীষ্টাব্দের প্রথম শতাব্দী : 

কুষাণরাজ কণিষ্ক যিনি  জরথ্রুস্টীয়, গ্রীক ও ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীদের এবং বুদ্ধকেও সম্মান করতেন এবং ধর্মীয় সমন্বয়বাদের জন্য বিখ্যাত ছিলেন সর্বাস্তিবাদী ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ করার জন্য ১০০ খ্রীষ্টাব্দের আশেপাশে কাশ্মীরে চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতি আহ্বান করেন। কনিষ্কের কয়েকটি মুদ্রায় হেলেনীয় রীতিতে বুদ্ধের প্রাচীনতম চিত্র রয়েছে সেখানে গ্রীক লিপিতে 'বুদ্ধ' কথাটি লেখা রয়েছে। ১২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কনিষ্ক মূল গান্ধারী প্রাকৃত মহাযানী সূত্রগুলিকে সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করিয়েছিলেন যেটি বৌদ্ধ সাহিত্যিক রচনার বিবর্তনের মোড় ঘুরিয়েছিল। কনিষ্কের পিটক যেটি কনিষ্কের রাজত্বের প্রথম বছরে ১২৭ খ্রীষ্টাব্দের সেটিকে স্বাক্ষর করেন আজোসিলাস নামে একজন গ্রীক শিল্পী যিনি কনিষ্কের স্তূপ (চৈত্য) নির্মাণের কাজ দেখাশোনা করেছিলেন এবং এর দ্বারা প্রমাণিত হয় এমন একটি পরবর্তী সময়েও গ্রীকরা বৌদ্ধদের নির্মাণকাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।

দার্শনিক প্রভাব : 

পুরো, আনাক্সারকুস এবং অনেসিক্রিটাসসহ অনেক গ্রীক দার্শনিক আলেকজান্ডারের পূর্ব দিক অভিযানে সঙ্গী হয়েছিলেন। যে আঠের মাস তাঁরা ভারতবর্ষে ছিলেন, তাঁরা জিমনোলজিস্ট (নগ্ন দার্শনিক) নামে ভারতীয় সন্ন্যাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করেছিলেন। পিরো গ্রীসে ফিরে গিয়ে সংশয়বাদের প্রথম পাশ্চাত্য সম্পদায় প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রীক জীবনীকার Diogenes Laertus ব্যাখ্যা করেন যে পৃথিবীর প্রতি পিরোর উদাসীনতা ও নিলিপ্ত ভারববর্ষে অর্জিত হয়েছিল। তাঁর দর্শনের বিকাশে পিরো সরাসরি বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন যার ভিত্তি ছিল অস্তিত্বের তিনটি লক্ষণ সম্পর্কে পিরোর ব্যাখ্যা। স্ট্যাবো বলেছেন যে এই দার্শনিকদের একজন ছিদ্রান্বেষী onesieritus ভারতবর্ষে নিম্নবর্ণিত শিক্ষাটি লাভ করেছিলেন। মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে তা ভাল বা খারাপ কিছুই নয়। মতামত হল স্বপ্নমাত্র। শ্রেষ্ঠ দর্শন হল তাই যা মানুষের মনকে দুঃখ বা আনন্দ থেকে মুক্ত করে। কেউ কেউ মনে করেন যে cyrene নগরী সেখানে cyrene এর megas রাজত্ব করতেন সেখানকার দার্শনিক হেগেসিয়াম অশোকের প্রেরিত প্রচারকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

শৈল্পিক প্রভাব : 

গ্রীক বৌদ্ধ শিল্পের অনেকগুলি নিদর্শন গান্ধারের মত সৃষ্টিকেন্দ্রে গ্রীক ও বৌদ্ধ প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে। গান্ধার শিল্পের বিষয়বস্তু নিঃসন্দেহে বৌদ্ধ তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল উপাদনের উৎসাহ পশ্চিম এশীয় বা হেলেনীয়। বুদ্ধকে মারের আক্রমণ, খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতক, অমরাবতী গ্রাম, গুণ্ঠুর জেলা, ভারতবর্ষে যদিও কিছু বিতর্ক আছে তবু বুদ্ধের প্রথম দেবমূর্তিকে গ্রীক বৌদ্ধ সংযোগের ফলাফল বলে মনে করা হয়। এই উদ্ভাবনের পূর্বে বৌদ্ধ শিল্প ছিল শুধুমাত্র প্রতীকী, বুদ্ধকে দেখা হত বিভিন্ন প্রতীকে (একটি শূন্য সিংহাসন, বোধিবৃক্ষ, বুদ্ধের পদচিহ্ন, এবং ধর্মচক্র) এর মাধ্যমে। বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণের প্রতি অনীহা এবং এটিক এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চিহ্নযুক্ত প্রতীকের বিকাশ (এমনকি কাহিনীর সেই সমস্ত দৃশ্যে যেখানে অন্যান্য মনুষ্য চরিত্রগুলি আবির্ভূত হয়) সম্ভবত দীঘনিকায়ে বুদ্ধের বাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত যেখানে যিনি তাঁর পরিনির্বাণের পর তাঁর মূর্তি নির্মাণ করতে নিরুৎসাহিত করেছেন।

সম্ভবত এই সমস্ত বিধিনিষেধে আবদ্ধ না মনে করে এবং তাদের প্রথাকে অনুসরণ করে গ্রীকরাই প্রথম বুদ্ধমূর্তির ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিল। প্রাচীন পৃথিবীর অনেক অংশে গ্রীকরা মিশ্রিত দেবদেবীদের বিকাশ ঘটিয়েছিল, যেটি পরবর্তীকালে বিভিন্ন ঐতিহ্যের জনগোষ্ঠীর সাধারণ ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। একটি সুপরিচিত দৃষ্টান্ত হল  সেরাপিস, যাকে প্রথম মিশরে প্রচলিত করেছিলেন প্রথম টলেমি সোটার। এই দেবতা গ্রীক ও মিশরীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। ভারতবর্ষেও গ্রীকদের পক্ষে গ্রীক দেব রাজা (অ্যাপলো বা সম্ভবত ব্যাক্ট্রিয়ার ইন্দো গ্রীক রাজত্বের দেবত্বে উন্নীত প্রতিষ্ঠাতা) মূর্তির সঙ্গে বুদ্ধের ঐতিহ্যশালী দৈহিক বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি সাধারণ দেবতার সৃষ্টি করা স্বাভাবিক ছিল।

দণ্ডায়মান বুদ্ধ, গান্ধার, খ্রীষ্টীয় প্রথম শতক :

 বুদ্ধের রক্ষক হিসেবে বজ্রপানির হারকিউলিয় উপস্থাপনা (ডানদিক), খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতক গান্ধার, ব্রিটিশ মিউজিয়াম বুদ্ধের উপস্থাপনের অনেক শৈলিক উপাদান গ্রীক প্রভাব নির্দেশ করে: সোজা মূর্তিগুলির contrapposto ভঙ্গিমা যেমন ১ম ও ২য় শতকের গান্ধার দণ্ডায়মান বুদ্ধ, শিল্পে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে কোঁকাড়ানো চুল এবং উষ্ণীষ, চুল যেগুলির সমষ্টিকে রচনা করা হয়েছে একটি শক্তিশালী শৈল্পিক বস্তুতন্ত্রবাদের সাহায্যে। বৌদ্ধ ও বিশুদ্ধ হেলেনীয় ও মূর্তিতত্বের সংমিশ্রণ অনুসরণ রচিত প্রচুর পরিমাণে ভাস্কর্য উৎখনন করা হয়েছে আফগানিস্তানের আধুনিক প্রত্নস্থল হাড্ডা থেকে। বুদ্ধের কোকড়ানো চুলকে বৌদ্ধ সূত্রগুলিতে তাঁর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের বিখ্যাত তালিকায় বর্ণনা করা হয়েছে। ডানদিকে ঘুরে থাকা কুচকানোযুক্ত চুল প্রথম বর্ণনা পালি সাহিত্যে এবং দশসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতায় এই একই বিবরণ খুঁজে পাই।

গ্রীক শিল্পীরাই সম্ভবত বুদ্ধের এই সমস্ত প্রাথমিক উপস্থাপনার রচয়িতা বিশেষত দণ্ডায়মান মূর্তিগুলি যেগুলি প্রদর্শন করে। ভাঁজের একটি বাস্তবমুখী ব্যবহার যেটি গ্রীক শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য। এটি ধ্রুপদী বা হেলেনীয় গ্রীক এটি ব্যাক্ট্রিয়া বা পারস্য দ্বারা হস্তান্তরিত অপ্রচলিত প্রাচীন গ্রীক বা সুস্পষ্ট বোমান নয়। বুদ্ধবাদের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম দ্বারা বর্ণিত বোধিলাভের চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি অত্যন্ত সুগম, বোধগম্য ও আকর্ষণীয় দর্শনের সুযোগ দেয়।

উত্তর পশ্চিম ভারতে আবির্ভাব গান্ধার শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল যে এটি ধ্রুপদী গ্রীক শৈল্পির স্বাভাবিকদ্বার স্পষ্টভাবে প্রভাবিত। এই কারণে যদিও এই মূর্তিগুলি সেই অভ্যন্তরীণ শান্তির প্রকাশ ঘটায় যা আসে বুদ্ধের শিক্ষাকে অনুশীলন করা থেকে, তারা সেই মানুষদের ও উপস্থাপিত করে যারা আমাদের মত হাঁটে, কথা বলে ও ঘুমোয়। আমার মনে হয় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মূর্তিগুলি অনুপ্রেরণা দান করে কারণ তারা কেবল নির্দেশ করেনা। এই ভাবটিতে নির্দেশ করে যে আমাদের মত মানুষেরা চেষ্টা করলে সফল হতে পারে। পরবর্তী শতকগুলিতে বুদ্ধের এই দেবমূর্তি বৌদ্ধ শিল্পের রীতিকে সংজ্ঞাায়িত করে। কিন্তু ক্রমশ ভারতীয় ও গ্রীক উপাদানের অন্তর্ভুক্ত করার পথে বিবর্তিত হয়।

হেলেনীয়ভূত গ্রীক দেবদেবী : 

প্রথম কণিষ্কের একটি বৌদ্ধ মুদ্রা যার বিপরীতদিকে গ্রীক লিপিতে বুদ্ধ কথাটি লেখা। আরও অনেক বৌদ্ধ দেবদেবী গ্রীক দেবদেবীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে। উদাহারণস্বরূপ, ব্যাক্ট্রিয়ার প্রথম ডিমিস্ট্রিয়াসের রক্ষক দেবতা সিংহ চর্মাবৃত হেরাস্পেস বুদ্ধের রক্ষক বজ্রপানির শৈল্পিক প্রতিরূপ হিসেবে কাজ করেছে। জাপানে এই প্রকাশকে রূপান্তরিত করা হয়েছে বুদ্ধের রাগত ও পেশীবহুল অভিভাবক দেবতাদের মধ্যে যারা আজকে অনেক বৌদ্ধ মন্দিরের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জাপানের চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাতসুমি তানারের মতে, বজ্রপানি ছাড়াও গ্রীক প্রভাব আরো দেখা যায় মহাযান ধর্মের আরো অনেক দেবদেবীদের মধ্যে যেমন গ্রীক বৌদ্ধ ওয়ার্ডোর মাধ্যমে গ্রীক দেবতা বেরিয়েস থেকে অনুপ্রাণিত মাতৃদেবী হারীতি। এছাড়াও, মালবহনকারী দেবদূত, দ্রাক্ষাকুঞ্জ, অর্ধমানব, অর্ধঅশ্ব ও ত্রিশূল এগুলি ছিল হেলেনীয় শিল্পকলার অংশ যেগুলির প্রবর্তন করেছিলেন কুষাণ রাজসভায় নিযুক্ত থাকা গ্রীক রোমক শিল্পীরা। ইয়েসে গান্ধারীয় ধর্মান্তরণ, গ্রীক বৌদ্ধ ভিক্ষুজীবন এবং পূর্বএশীয় ভিক্ষুকে শিক্ষাদানরত নীল নয়ন মধ্য এশীয় ভিক্ষু। বেজেকলিকের সহস্র বৌদ্ধ গুহা থেকে একটি ফ্রেস্কো, যার সময়কাল নবম বা দশম শতক (কার- খোজ রাজ্য) গ্রীক ভিক্ষুগণ বৌদ্ধধর্মের উচ্চস্তরে এবং তার প্রাচীন প্রচারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। মহাবংশ অনুসারে গ্রীক ব্যাক্ট্রিয় রাজা প্রথম মিলিন্দের (১৬৫ খ্রী. পূর্ব ১৩৫ খ্রী.) এর রাজত্বকাল মহাধর্মরক্ষিত (মহান শিক্ষক/ধর্মের-রক্ষক রূপে আক্ষরিকভাবে অনূদিত) ছিলেন একজন গ্রীক (পালি যোন, আক্ষরিক আয়নীয়) বৌদ্ধ প্রধান ভিক্ষু যিনি ৩০০০০ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আলাসান্দ্রার গ্রীক নগরী থেকে থেকে (বর্তমান আফগানিস্তানের কাবুল থেকে ১৫০কিমি দূরে ককেসাসের আলেকজান্দ্রিয়া) অনুরাধপুরে মহাস্তুপের উৎসর্গের জন্য শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন। ধর্মরক্ষিত (সংস্কৃত) বা ধর্মরক্খিত (পালি) (অনুবাদ-ধর্ম দ্বারা রক্ষিত) ছিলেন। বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য সম্রাট অশোক দ্বারা প্রেরিত বৌদ্ধ প্রচারকদের অন্যতম। মহাবংশে তাঁকে স্পষ্টভাবে গ্রীক (পালি সংস্কৃত, আক্ষরিক আসনীয়) রূপে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাঁর কাজকর্ম বৌদ্ধধর্মের শুরুর শতকগুলিতে হেলেনীয় গ্রীকদের জড়িত থাকার শক্তি প্রকাশ করে। বাস্তবিকই প্রথম মিনান্দার নাগসেন দ্বারা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন যিনি গ্রীক বৌদ্ধ ভিক্ষু ধর্মরক্ষিতের শিষ্য ছিলেন। কথিত আছে প্রথম মিনান্দার নাগসেনের, তত্ত্বাবধানে অর্হত্ব লাভ করেছিলেন এবং তিনি বৌদ্ধধর্মের এক মহান পৃষ্ঠপোষকরূপে পরিচিত। গ্রীক রাজা প্রথম মিনান্দার (পালি মিলিন্দ) ও ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে কথোপকথন পালি বৌদ্ধ রচনা মিলিন্দ পঞ্হের বিষয়বস্তু।

আফগানিস্তানের গান্ধার অঞ্চলের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যেখানে গ্রীক বৌদ্ধধর্ম সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল পরবর্তীকালে উত্তর এশিয়াতে বৌদ্ধদর্শনের বিকাশ ও স্থানান্তরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। লোকসীমা ( ১৭৮খ্রী.) মত গ্রীক বৌদ্ধ কুষাণ ভিক্ষুরা চৈনিক রাজধানী লোয়াং এর দিকে যাত্রা করেছেন যেখানে তাঁরা বৌদ্ধধর্ম শাস্ত্রের প্রথম চৈনিক অনুবাদকে পরিণত হয়েছেন। তারিম অববাহিকায় প্রাপ্ত Bezeklik Thausand Buddha caves থেকে জানা যায় যে খ্রীষ্টীয় দশম শতকের আশপাশ পর্যন্ত মধ্য এশীয় ও পূর্ব এশিয়া বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শক্তিশালী আদান প্রদান বজায় রেখেছিলেন। কিংবদন্তীতেও পরবর্তী কালে জেন বৌদ্ধধর্মে পরিণত ছেন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক এবং শাওলিন কুং ফুর সৃষ্টি করেছিল সেই বোধিধর্মকে তাঁর প্রথম চৈনিক উল্লেখে বৌদ্ধ ভিক্ষু রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ৫৪৭ খ্রী. তে (Yan Xnan- zhi)। সমগ্র বৌদ্ধ শিল্পকলাজুড়ে বোধিধর্মকে একজন বদমেজাজি, দাঁড়িওয়ালা এবং বড় বড় চোখযুক্ত বর্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং চৈনিক ছেন গ্রন্থে তাঁকে নীল নয়নযুক্ত বর্বর রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। ৭ম শতকের চৈনিক ইতিবৃত্ত লিয়াং শু অনুসারে গান্ধার থেকে পাঁচজন ভিক্ষু কুসাং (সমুদ্রের ওপারে একেবারে পূর্বদিকের একটি দেশ, সম্ভবত পূর্ব জাপানে) এ যাত্রা করেন যেখানে তাঁরা বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন।

ফুসাং চীনদেশের পূর্বে তা হান প্রদেশের ২০,০০০ (আধুনিক জাপানের ওয়া রাজ্যের ১৫০০ কিমি) পূর্বে অবস্থিত। পূর্বকালে ফুসাং এর মানুষরা বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানত না, কিন্তু সিং রাজবংশের তা সিং এর রাজত্বকালে দ্বিতীয় বছরে (৪৮৫ খ্রী.) পাঁচজন ভিক্ষু কিপিন (গান্ধারের কাবুল অঞ্চল) থেকে জাহাজে চড়ে ফু সাং আসেন। তাঁরা বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন, ধর্মশাস্ত্র ও অঞ্চল বিতরণ করেন এবং মানুষকে পার্থিব আসক্তি ত্যাগ করতে উপদেশ দেন।

গান্ধারের দুজন সৎ ভাই অসঙ্গ ও বসুবন্ধু বা (৪র্থ শতক) মহাযান বৌদ্ধধর্ম যোগাচার সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন যেটি তার প্রধান গ্রন্থ লঙ্গাবতার সূত্রের মাধ্যমে মহাযানের বিশেষত জেন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠে। খ্রী পূর্ব ৩য় শতকে সম্রাট অশোকের পশ্চিম কান্দাহারে গ্রীক বৌদ্ধধর্মের দ্বিভাষিক শিলালিপি (গ্রীক ও আরামীয়) এই আদেশনামাতে ধর্ম বোঝাতে গ্রীক শব্দ ইউসেবেরিয়া ব্যবহার করে godliness গ্রহণের পক্ষে সওযাল করা হয়েছে। কাবুল জাদুঘর রোমানদের রেশমপ্রিয়তা নিশ্চিত হয়েছে সেই সময় রেশম পথ বরাবর তীব্র পশ্চিমমুখী বাহ্যিক বিনিময় দ্বারা (খ্রী. পূর্ব ১ম শতক যার ফলে রোমান সিনেট অর্থনৈতিক ও নৈতিক কারণে রেশম পরিধামের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে ব্যর্থ হয়। অন্তত তিনজন লেখক এটির যথাযত নিশ্চিত করেছেন স্ট্রাবো (৬৩/৬৪খ্রী. পূর্ব ২৪ খ্রী.) কনিষ্ঠ সেনেকা (খ্রী. পূর্ব ৬৩-৬৫ খ্রী.) এবং জ্যেষ্ঠ যিনি (২৩ খ্রী.- ৭৯খ্রী.)। পূর্বোক্ত স্ট্রাবো এবং প্লটার্ক (৪৫খ্রী. ১২৫ খ্রী.) ও ইন্দো-গ্রীক রাজা মিলিন্দার সম্পর্কে লিখেছিলেন এনং তারা নিশ্চিত করেছিলেন যে ইন্দো গ্রীক বৌদ্ধদের সম্পর্কে তথ্য হেলেনীয় জগতের সর্বত্র প্রচারিত হচ্ছে।

Zarmanochegas (zarmarus) ছিলেন শ্রমণীয় (সম্ভবত একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু নিশ্চিতভাবে নন) যিনি প্রাচীন ঐতিহাসিক স্ট্রাবো ও ডিও ক্যাসিয়াসের মতে অগাস্টাস (মৃত্যু ১৪খ্রী.) রোম সাম্রাজ্যের নিকোলাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ঠিক তারপরই নিজেকে অগ্নিদন্ধ করে আত্মাহুতি দেন। তাঁর কাহিনী ও সমাধি এক শতাব্দী পর এথেন্তেন বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ব্লুটার্ক (মৃত্যু ১২০ খ্রী.) তার আলেকজান্ডারের জীবন এ আলেকজান্ডারের দেখা ভারতবর্ষের কালানুস (কালানোর) এর অগ্নিতে আত্মাহুতি আলোচনা করার পর লিখেছেন এর বহুপরে একই কাজ করেছিলেন একজন ভারতীয় যিনি সিজারের সঙ্গে এথেন্সে এসেছিলেন এবং যেখানে তারা আজও দেখায় ভারতীয় সমাধি মন্দিরের যেটি হল এথেন্সে Zarmanochegas এর সমাধি মন্দির। 

আর এক শতক পর খ্রীষ্টীয় গীর্জার পাদ্রী আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লিমেন্ট (মৃত্যু ২১৫ খ্রী.) তাঁর স্ট্রোমাটায় (Bk I, ch -xv) নাম ধরে বুদ্ধকে উল্লেখ করেন ভারতীয় রাও বহুসংখ্যায় রয়েছেন এবং রয়েছেন অন্যান্য বর্বর দার্শনিকেরা। এবং এদের মধ্যে রয়েছে দুইটি শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ। এদের মধ্যে শ্রমণদের বলা হয় হাইলোবি যার নগরে থাকেন না, বা তাদের মাখার উপর ছাদ থাকেনা, তারা গাছের বাকল পরে থাকেন, বাদাম খান এবং নিজের হাতে জল পান করেন। বর্তমান যুগের তারা বিবাহ করতেন না, সন্তান উৎপাদন করতেন না। ভারতীয়দের মধ্যে কেউ কেউ বুদ্ধকে মান্য করতেন যিনি অসাধারণ পবিত্রতার কারণে দেবতাদের সমতুল্য সম্মান লাভ করেন।

টলেমির যুগে ভারতের কবরের পাথর মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াতে পাওয়া গিয়েছে। এই সময়ে আলেকজান্দ্রিয়াতে বৌদ্ধদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পর্ববর্তীকালে ঠিক এইখানে খ্রীষ্টধর্মের কয়েকটি সক্রিয় কেন্দ্র প্রতিষ্টিত হয়েছিল। প্রাক খ্রীষ্ঠীয় সন্ন্যাসী সম্প্রদায় Theraputae সম্ভবত পালি শব্দ বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেরবাদের একটি অপভ্রংশ ছিল এবং সেই আন্দোলন প্রায় সম্পূর্ণভাবে বৌদ্ধ ভিক্ষু ধর্মের শিক্ষা ও আচার অনুষঠান থেকে প্রেরণা লাভ করে থাকতে পারে। তারা এমনকি পশ্চিমে প্রেরিত অশোকের ধর্মপ্রচারকদের উত্তরসূরী হতে পারে।

আফগানিস্তানের বৃহত্তম দন্ডায়মান স্তুপ: 

পিছন দিক থেকে দেখা তোপদারা স্তূপ (পশ্চিমমুখী)। তোপদার স্তূপের ইতিহাস এখনও অজ্ঞাত। তবে প্রাচীন নগরী কপিশা (বর্তমানে বেগ্রাম একটি ছোট রাজার শহর যেটি নিকটবর্তী বিমানঘাঁটির জন্য পরিচিত) অবস্থান থেকে জানা যায় যে এটি ২০০খ্রী.- ৪০০ খ্রী. মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। কাবুলের উত্তরের গম্বুজ আকৃতির বৌদ্ধ মন্দির তোপদার স্তূপকে ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ অভিযাত্রী চার্লস ম্যাসন এই সমস্ত দেশের এই ধরনের সৌধের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে সম্পূর্ণ বলে বর্ণনা করেছিলেন। ১৮৩৩ সালে ম্যাসনের আগমনের পর থেকে তোপদারা স্তূপে খুব পর্যটক এসেছিল এবং শেষ পর্যন্ত এটি অবহেলার শিকার হয়েছে সাম্প্রতিক কাল অর্থাৎ ২০১৬ সাল পর্যন্ত যখন একটি আফগান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংগঠন তাদের সংরক্ষণ ও খননকার্য শুরু করেছিল। যখন ২০১৯ সালের বসন্তে AAN এর জেলেনা জেলিকা ঐ স্তূপটির সৌন্দর্য ও জাঁকজমক অনেকটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই প্রতিবেদনে তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক নথিপত্র (জোলিয়ন লেসলির সহায়তায়) থেকে স্তূপটির ইতিহাস একত্রিত করেছেন।

তোরপাড়া স্তূপ ভিতরে খনন যদি কেউ কাবুল থেকে প্রধান সড়ক দিয়ে পারওয়ানের প্রাদেশিক রাজধানী চারিকাবের দিকে অগ্রসর হয়ে তাহলে কোহে-সাফি পর্বতের পটভূমিকায় বাঁদিকে তোপদারা স্তূপটিকে দেখ যাবে। তোপদারা গ্রামের উপরে একটি উচ্চ ভূমিতে স্তূপটি একটি মুকুটের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে ফলের বাগান ও বালির ক্ষেত ও পরিবেষ্টিত হয়ে। এপ্রিল মাসের প্রথম দিকের একটি সকালে যখন AAN পরিদর্শনে যায় তখন Afghanistan cultural heritage consulting organisations (Actico) এর কর্মীরা ঐস্থানে সংরক্ষণ ও খননকার্য চালাচ্ছিল।

ঐ স্তূপটিকে Achco কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। তিন বছর পর যখন AAN পরিদর্শনে এসেছিল স্তূপের গম্বুজাকৃতি উপরের অংশটি মেরামত করে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং স্তূপের প্রায় সম্পূর্ণ ভিতেই খননকার্য চালানো হয়েছিল। তবে কাঠামোটি এখনও ঢাকা দেওয়া রয়েছে কারণ সংরক্ষণের কাজ এখনও চলছে। গম্বুজাকৃতি উপরের অংশটিকে নষ্ঠ করেছিলেন Masson যখন তিনি ঊনবিংশ শতকে এটিকে উন্মুক্ত করেছিলেন। তোপদারা প্রধান গঠন হল পাথরের স্তূপ ও তার গম্বুজাকৃতি উপরিভাগ, আড়াআড়ি এটির পরিমাপ ২৩ কি.মি এবং এটি চারপাশে ঘিরে থাকা জমি থেকে প্রায় ৩০ কিমি উঁচুতে। স্তুপের উপরিভাগটি দুটি S আকৃতির বক্ররেখার দ্বারা অলঙ্কৃত এখানে গোলাকৃতি খিলানে ঘেরা ৫৬ টি অভিন্ন কুলুঙ্গী রয়েছে।

ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ তথ্যসূত্র স্তুপকে সাধারণত 'টোপ' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেটি টিলা বা উচ্চভূমি টপ্পা বোঝাতে যে দাড়ি শব্দটি ব্যবহৃত হয় তার থেকে উৎপন্ন হতে পারে আবার নাও হতে পারে। গ্রামটি ও স্তূপটির নাম টোপদারা অর্থ হতে স্তূপের উপত্যকা। উদাহারণসরূপ ইংরেজ প্রাচ্যবিদ H.H.wilson (1786-1860) Arana Antiea (1841) গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে কাঠামোগুলি সাম্প্রতিকালে উত্তর পশ্চিমে ভারত ও আফগানিস্তানের এতবেশী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে যেগুলি সাধারণভাবে টোপ নামে পরিচিত। এই শব্দটি সংস্কৃত শব্দ স্তূপ থেকে এসেছে অর্থযুক্ত। (Arana Antica pp.28-29) ঐ একই গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ম্যাসনের ব্যাখ্যা অনুসারে টোপ শব্দটির আলোচনার অধীনে থাকা আরো বিখ্যাত ও আকর্ষনীয় কাঠামোগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বোঝায় দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশযুক্ত দুটি অংশকে একটি ভিত ও তার উপরে থাকা একটি লম্বাকৃতি অংশকে। দ্বিতীয়টি কিছুটা উপরে উঠে গম্বুজের চেহারা নেয়। কখনও কখনও এত নেমে যায় যে উপরিতলের সামান্য স্ফীতি প্রকাশ করে কিন্তু অধিকাংশ সময়ে একটি শঙ্কুর আকার গ্রহণ করে।

তাঁর পরীক্ষা করা তিনটি স্তূপের একটি তোপদার স্তূপ সম্পর্কে মন্তব্য করে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন কাবুলের উত্তরে এবং কো দামান ও কোহিস্তান জেলায়। ম্যাসন লিখেছেন পরবর্তী স্তূপটি রয়েছে কাবুল থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল দূরে দাবাতে এবং এটিই সম্ভবত এ দেশের এই ধরনের সৌধগুলি সবচেয়ে সুন্দর ও পরিপূর্ণ এবং এটি বৃহত্তম স্তূপগুলির অন্যতম। তোপদারা স্তূপটি কে তৈরি করেছিলেন এবং করে এবং কীভাবে এটি নির্মিত হয়েছিল এবং এটি কেমনভাবে এটি ব্যবহৃত হত খুবই কমই আছে। আফগানিস্তানে পুরাতাত্বিক গবেষণা বিছিন্নভাবে হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী ইরান ও পাকিস্তানের তুলনায় এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন কম হয়েছে। আফগানিস্তানের উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন শুরু হয়েছিলেন কেবলমাত্র ১৯২২ সালে Deligaton Archeaolagique Francaise en Afghanistan সৃষ্টির পর থেকে, যে সংগঠনটি দেশের তদানীন্তন শাসক আমানুল্লার কাছ থেকে একচেটিয়া লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং১৯৭৮ থেকে আফগানিস্তানের ৪০ বছর দ্বন্দ্বের কারণে পরবর্তীকালে গভীর প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অতএব ঊনবিংশ শতক থেকে ম্যাসনের লিখিত বিবরণী এখনও আফগানিস্তান ও তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলের দূর অতীত সম্পর্কে আমাদের অমূল্য অন্যদৃষ্টি দান করে।

চার্লস ম্যাসন (১৮০০-১৮৫৩) অভিযাত্রী ও মুদ্রা সংগ্রহক : 

চার্লস ম্যাসন ১৮০০ সালে জেমস লুইস নামে অল্ডারম্যানবেরীতে জন্মগ্রহণ করেন যেটি বর্তমানে লন্ডন নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। তিনি ইটালীয় ও ফরাসী অভিবাসীদের একটি মিশ্র এলাকায় বড় হন। যদিও তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তিনি ল্যাটিন ও গ্রীক দুইটি ভাষা শিখতে আরম্ভ করেছিলেন। ২০১৭ সালের ব্রিটিশ যাদুঘরের প্রকাশনায় মন্তব্য করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে তাঁর ভাষাশিক্ষার প্রবণতা ছিল। পরবর্তীকালে যিনি হিন্দুস্থানী ও পারসিক ভাষাও শিক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। পাস্তো ভাষাও তিনি কিছুটা রপ্ত করেছিলেন। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে জেমস লিউস ১৮২১ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদাতিক বাহিনীতে যোগ দেন। তিনি জাহাজে করে বাংলায় আসেন এবং সেখানে তিনি প্রথম ব্রিগেডের তৃতীয় বাহিনীতে ১৮২৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন যেটি বেঙ্গল ইউরোপীয়ান আর্টিলারি নামে পরিচিত ছিল। সেই সময় তাঁর বাহিনী আগ্রায় মোতায়েন ছিল এবং তিনি সৈন্যবাহিনী থেকে পালিয়ে চার্লস ম্যাসন ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। তাঁর এই ছদ্মনামের আড়ালে আত্নগোপন করে তিনি পদব্রজে আগ্রা থেকে রাজস্থানের মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ১৮২৮ সালের জুন মাসে তিনি পেশোয়ারে পৌঁছেন এবং সেখান থেকে কয়েক মাস পরে তিনি একজন অজ্ঞাতনামা পাঠান বন্ধুর সঙ্গে যাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে আফগানিস্তানে পৌঁছান।

আফগানিস্তানে থাকাকালীন তিনি প্রধানত মুদ্রার খোঁজে স্তূপগুলিতে অনুসন্ধান জানান। উনবিংশ শতকের প্রথমদিকে মুদ্রাতত্ত্ব অর্থাৎ মুদ্রার অধ্যয়ন ও সংগ্রহ মাধ্যমে ইতিহাসের পাঠাদ্ধোর গ্রেট ব্রিটেনে জনপ্রিয় ছিল। ম্যাসন আফগানিস্তানের প্রথম যে বৌদ্ধ স্থানটিতে ভ্রমণ করেছিলেন সেটি ছিল বামিয়ান এবং বামিয়ানে তিনি একবার মাত্র এসেছিলেন। ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৫ এর মধ্যে তিনি কাবুল ও জালালবাদের আশেপাশে প্রায় একশটিরও বেশি প্রত্নস্থল সমীক্ষা ও নিবন্ধন করেন কাবুল নদী বরাবর এবং ওয়ারডাকে। আফগানিস্তানের দূর ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের ৩০০০০ মুদ্রা তিনি সংগ্রহ করেন এবং স্তূপগুলির বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। শ্যামেরা লুসিভার (একটি মন্ত্র যেখানে একটি প্রিজমের দ্বারা আলোকে প্রতিফলিত করা হয় একটুকরো কাগজের উপর যার থেকে আঁকা যায়।)

১৮৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ গভর্ণর জেনারেল লড অ্যালেনবরো ম্যাসনের জন্য রাজসভার অনুরোধ জানান করাণ তাঁকে আফগানিস্তানের অনুসন্ধানের পক্ষে উপযোগী মনে করা হয়েছিল এবং এই দেশটি সম্পর্কে ব্রিটেনে আগ্রহী ছিল। ঐ বছরই পরবর্তীকালে ম্যাসনকে বাদক্ষমা প্রদর্শন করা হয়। অ্যালেনবরোর আবেদনে ম্যাসনকে নিম্নলিখিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞানী এবং তাঁর ক্ষমতা রয়েছে। তিনি সিন্ধুনদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ ও এলাকাগুলির সম্পর্কে অনেক মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করেছে এবং বর্তমানে তিনি হিন্দু উত্তরাংশে রাজনৈতিক নয় বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানের কাজে ব্যবহৃত আছেন। এই ব্যক্তি যার ব্যক্তিগত চরিত্র কেবলমাত্র সৈন্যবাহিনী পরিত্যাগের অপরাধ ছাড়া নিষ্কলঙ্ক বলে মনে হয় সেই অপরাধের জন্য প্রাচীন ইতিহাস ও সিন্ধু নদের আশেপাশে রাজ্যগুলির সম্পর্কে জ্ঞানের থেকে প্রয়োজনীয় অবদানের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত করার চেষ্টা করতে ইচ্ছুক হবেন। আফগানিস্তানের ম্যাসনের প্রাচীন স্থানগুলিতে ম্যাসনের অনুসন্ধানে অর্থসাহায্যের বিনিময়ে তাঁর সমস্ত আবিষ্কার ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে চলে যেত। ম্যাসন দ্বারা আবিষ্কৃত এই নিদর্শনগুলি লন্ডনের ভারতীয় জাদুঘরে পাঠানো হয়েছিল। ১৮৭৮ সালে যখন এই অনুসন্ধান শেষ হয় তখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও মুদ্রার একটি অংশ দিয়ে দেওয়া হয়।

স্তূপগুলি সম্পর্কে ম্যাসনের বিবরণ :

ম্যাসনের তাঁর অনুসন্ধানগুলি সম্পর্কে লিখিত বিবরণ থেকে স্তূপগুলির ইতিহাস সম্পর্কে অত্যন্ত সামান্য তথ্যই পাওয়া যায়। কিন্তু তবু তাঁর কাজ ছিল পথপ্রদর্শকের মিশরের সমসাময়িক ফরাসী অনুসন্ধানের মতই এটি প্রত্নতত্বের একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রায় চল্লিশ বছর এগিয়েছিল। ১৮৩৩ সালের জুন মাসে ম্যাসন প্রথম চারিকারে আসেন। ২০১৭ সালে ম্যাসন সম্পর্কে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রকাশনায় লেখা হয়েছে। কোহিস্তানে তাঁর ঘোরাঘুরির একটি প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটার উপনিবেশ Alexander ad caucasum আবিষ্কার করা বা ম্যাসনের ভাষায় এমন কোন চিহ্ন আবিষ্কার করা যাকে আমরা Alexander ad caucasum বলে উল্লেখ করতে পারি এবং আমরা জানতে পারি এবং নিশ্চিত যে এই বিষয়ে যে স্থানটির জন্য এই এলাকায় হিন্দুযুগের আশেপাশে খুঁজতে হবে।

চারিকারে এসে তিনি শীঘ্রই তোলপাড়া স্তূপ আবিষ্কার করলেন। তাঁর ১৮৪২ সালের বেলুচিস্তানের আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন যাত্রা সম্পর্কে বিবরণীতে তিনি মন্তব্য করেছেন কাবুলের ৫৮ কিমি উত্তরে চারিকারের ৫ কিমি দক্ষিণে পশ্চিমে আমরা তোপদারের সঙ্গে একই রেখায় এলাম, যেটি তাঁর জাঁক ঝমক স্তূপের জন্য বিখ্যাত গ্রামের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে তারা স্তূপটির দিকে গেলেন, এবং কিছু সময় ধরে তিনি স্তূপটির ছবি আঁকলেন। সৌধটির চারপাশে ছিল অনেক ক্যাপার গাছ যার প্রজাতি ছিল বল্খ আর বদকশানের পাহাড়ের প্রজাতির মত। দাবার উপরে আর একটু এগিয়ে যার নীচ দিয়ে একটি ছোট নদী বইছিল এবং যার জলের পরিমাণ গত (১৮৩২) সালের ভূমিকম্পের ফলে যথেষ্ট বেড়ে গিয়েছিল। 

প্রথমবার গিয়ে ম্যাসন কেবল স্তূপের একটি চিত্র অঙ্কন করেছিলেন এবং সমভূমির উপরকার পাহাড় থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। ঐ একই বছর তিনি স্তূপটি খুলেছিলেন। Araia Antica তে তিনি লিখেছিলেন (পৃষ্ঠা ১১৬-১১৭) ১৮৩৩ সালে আমি এটিকে পরীক্ষা করেছিলাম এবং মাঝখানে একটি ছোট প্রকোষ্ঠ আবিষ্কার করেছিলাম যেটি শ্লেঠ পাথরে নির্মিত এবং তার মধ্যে ইমারতটি যা দিয়ে তৈরী তাই ছিল : তাদের মধ্যে আমি হাড়ের একটি খন্ডিত অংশ দেখেছিলাম। কিন্তু তাতে কোন কার্যকরী ফল হয়নি: শ্লেট পাখরের ভিতরের উপরিতলাটি ঢাকা ছিল লাল ঢাকনা দিয়ে (সম্ভবত: লাল খয়ের)। 

২০১৭ সালের ব্রিটিশ জাদুঘরের প্রকাশনায় বলা হয়েছে যে ম্যাসন গম্বুজে সুড়ঙ্গ তৈরি করে প্রবেশ করেছিলেন একটি বিন্দুতে যেটি ড্রামের মোটামোটি উপরের দিকেই এবং এটি তিনি করেছিলেন দৃশ্যমান গর্তের মধ্যে দিয়ে যা খিনান ও আয়তকার স্তম্ভের তোরণকে ভেদ করা যায়। ছিদ্রগুলিকে Achco মেরামত করেছে। যদিও Ariana Antia সম্পর্কে ম্যাসনের অধ্যায়ে এই বিষয়ে স্তূপটি সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক তথ্য নেই তবু এখান থেকে আফগানিস্তানের এই সমস্ত কাঠামো সম্পর্কে কিছু মূল্যবান সাধারণ পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেছেন স্তূপগুলিকে অবশ্যই পূরমুখী বলে মনে করতে হবে, কারণ সেই বিন্দুতে তাদের ভূগর্ভেস্ত কক্ষে পৌছানোর জন্য একধাপ সিঁড়ি দেওয়া হয়েছে। এবং অন্যগুলিকে তাদের আলঙ্কারিক বলয়ের উপর পূরমুখী কুলুঙ্গী রয়েছে। তাদের মধ্যেকার থেকে একথা প্রায় নিশ্চিত যে এই কুলুঙ্গীগুলিতে একসময় বুদ্ধমূর্তি রাখা থাকত। যেমন দেখা যায় বামিয়ানের গুহা ও মন্দিরের ক্ষুদ্রতর কুলুঙ্গীগুলি থেকে এখনও সেগুলির খন্ডিত ধ্বংসাবশেষ থেকে আমরা জানতে পারি যে এগুলিতে মূর্তি রাখা হত।

তোপদারা স্তূপের গম্বুজের নীচের অংশ সজ্জিত হয়েছে দুটি ও আকৃতির বক্ররেখা দ্বারা যেটি এটিকে গোলাকৃতি খিলানদ্বারা পরিবেষ্টিত ৫৬ টি একই ধরনের কুলুঙ্গী দ্বারা অলঙ্কৃত করে। ম্যাসন এটিও লক্ষ্য করছেন যে স্তূপগুলি নির্মিত হয়েছে উচ্চভূমির উপর যার নীচে উপত্যাগ রয়েছে। তিনি লিখেছেন: এলাকাটি এবং এই নির্মাণের কাঠমোটি মনোযোগ দাবী করে। এগুলির জন্য প্রিয় স্থানগুলি হল পাহাড়ের আশেপাশের জায়গা যেগুলি উচ্চভূমির উপর অবস্থিত এবং উপত্যকার দ্বারা পরস্পরের থেকে পৃথক। কাবুল, চাহারবাগ (জালালবাদের পশ্চিমে) এবং হিস্কা (শুদ্ধ হাড্ডা) পরস্পরের সাপেক্ষে তাদের অবস্থানের সুস্পষ্ট প্রকৃতির জন্য উল্লেখযোগ্য। তিনি আরও লক্ষ্য করেন (Arina Antia pp. 48-9) যে স্তূপগুলি ও তার পাশ্ববর্তী এলাকার আশেপাশে সবসময় জল খুঁজে পাওয়া যায় এবং মনে হয় এগুলির স্থান নির্বাচনের একটি প্রদান শর্ত ছিল এই যে কাছাকাছি জল খুঁজে পেতে হব। অবশ্যই এটি নির্জন গুহায় বসবাসরত মানুষদের সুবিধার জন্য এবং তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য ছিল: এবং এটিও প্রয়োজন ছিল যে ঐ জল হবে বিশুদ্ধ ও তা পাথর থেকে প্রবাহিত হবে। ম্যাসন তাঁর প্রথম আগমনের সময় উল্লেখ করেছেন যে তোরপাড়া স্তূপটি একটি পাহাড়ি নদীর নিকটে অবস্থিত ছিল। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে যখন আমরা সেখানে গিয়েছিলাম তখন সেই কোলাহলমুখর পাহাড়ী নদীটি আশেপাশের শৃঙ্গ গুলির বরফগলা জলে ফুলে উঠে নিকটবর্তী অনুর্বর চালগুলির মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে প্রবাহিত হচ্ছিল। তোপদারা স্তূপটির সেটির গৌরবময় দিনে নিঃসন্দেহে একটি ধ্যানমগ্ন ও শান্তিপূর্ণ স্থান ছিল।

আফগান বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষের ইউরোপীয় আবিষ্কার ও অনুসন্ধান :

ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে ম্যাসনের বৌদ্ধ স্থানগুলির আবিষ্কার সম্ভবত ছিল আফগানিস্থানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রথম অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত বিবরণ। প্রকৃতপক্ষে ইউরোপীয়রা সম্ভবত ম্যাসনের আগমনের এক দশক আগে অর্থাৎ ১৮২০ দশকের আফগানিস্তানের বিশেষত খাইবার গিরিপথের মধ্যে দিয়ে বিশেষত পেশোয়ার এবং কাবুলের মধ্যেকার প্রধান পথের নিকটে ব্যাপক বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে অবহিত ছিলনা। যে সমস্ত পর্যটক এই সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থলগুলির সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পশু চিকিৎসক ও সুপারিন্টেন্ডেন্ট উইলিয়াম মুরক্রফট (১৭৬৭-১৮২৫) এবং ভূগোলবিদ ও নকশাকারী জর্জ ট্রেবেক যারা একসঙ্গে ঘোড়ার প্রজাতির সন্ধানে অভিযানে বের হয়েছিলেন। প্রায় দশ বছর পরেও আফগানিস্তানের বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে তখনও প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল। উদাহরণস্বরূপ ১৮৩৩ সালে Great Game এর সঙ্গে যুক্ত এবং প্রথম ইঙ্গ আফগান যুদ্ধে কাবুলে নিহত ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও কূটনীতিক আলেকজান্ডার বার্ণস (১৮০৫-৪১) Jownal of Ajiale Sacity তে বামিয়ান বুদ্ধ বিষয়ক একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ঐ বিশাল মূর্তিগুলির উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দান করেন। তিনি লিখেছেন প্রাচীন এশিয়ায় এমন কোন নিদর্শন নেই যা বামিয়ানের বিশাল মূর্তিগুলির মত পন্ডিতদের মধ্যে এত বেশী কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। কথিত আছে যে এগুলিকে খ্রীষ্ট জন্মের পর একদল কাফের (বিধর্মী) মাটি খুঁড়ে বের করেছিলেন এবং এগুলি হল সলসল নামে একজন রাজাও তাঁর স্ত্রীর মূর্তি যিনি একটি দূরদেশে রাজত্ব করতেন এবং তাঁর মহানতার জন্য পূজিত হতেন। হিন্দুরা একথা জোর দিয়ে বলে যে মূর্তিগুলিকে পান্ডুরা খনন করে উদ্ধার করেছেন এবং এদের কথা তাঁদের মহাকাব্য মহাভারতে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নিশ্চিত যে আজকে হিন্দুরা এই মূর্তির পাশ দিয়ে গেলে হাত তুলে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। যদিও তারা মূর্তিটিকে পূজা দেয় না। এটি হয়ত ইসলামের উত্থানের পর থেকে অব্যবহৃত হয়ে পড়েছে। অনুমান করা হয় মূর্তিটি বৌদ্ধদের এই মূর্তিটি দীর্ঘ দানের জন্য সম্ভাবনা যথেষ্ট বলে মনে করা হয়।

এমনকি ১৮৪১ সালেও আফগানিস্তানের বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষকে বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষরূপে পুরোপুরি সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নৌবাহিনীর আধিকারিক জন উড (১৮১১-৭১) যিনি ১৮৩৬ সালে আলেকজান্ডার বার্ণস পরিচালিত একটি অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রন্থ A Jowwrney to the Saurce of the Ruir Oxas গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন বামিয়ানের পথ ঘোরালো হলেও একজন আগন্তুককে বিশাল মূর্তি গুহার দ্বারা অজানা ইতিহাস বা ঐতিহ্যের এক জনগোষ্ঠীর মানুষের ইঙ্গিত দেয়। যখন গ্রন্থটি১৯০৬ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়।

শুয়াং জাঙ নামে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর Si-Yuki বা Recard of the wastern countries শিরোনামের বর্তমান আফগানিস্তানের ও পাকিস্তানের বৌদ্ধ স্থানগুলিকে চীন থেকে ষষ্ঠ শতকে ভ্রমণ বৃত্তান্ত ইউরোপীয়দের কাছে শেষপর্যন্ত নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছিল যে বামিয়ানের মূর্তিগুলি ছিল বুদ্ধের। শেষ পর্যন্ত কার্যত চার্লস ম্যাসনের প্রচেষ্ঠাতেই আফগানিস্তানের বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ মূলত আবিষ্কার হয়েছিল। যদিও শিখ দপ্তরের অধীনে অস্ট্রো হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের একজন চিকিৎসক, জোয়ান মার্টিন হনিগবার্জার ১৮৩০ এর দশকে তাঁর খননকায়ের জন্য প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা যায় সেগুলি তেমন বড় মাপের নয়। বর্তমানে আবিষ্কৃত নথিপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি সাতটি স্তূপে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন যদিও তিনি দাবী করেছিলেন যে ২০ টি স্তূপে পরীক্ষা করেছিলেন। ম্যাসনের অনুসন্ধান ক্ষেত্রের সংখ্যা আরও বেশি এবং সেগুলির বিবরণ আরও ভালভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ Arina Antica তে তিনি ৪৮ টি প্রধান স্থানের সামান্য চিত্র প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ২০১৭ সালের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রকাশনা অনুসারে এটি ব্রিটিশ লাইব্রেরি ভারতীয় সংগ্রহের অধীনে রক্ষিতি অপ্রকাশিত নথিপত্রের রিতলমাত্র।

H.H.Nilson তাঁর Auaina Antia তে মন্তব্য করেছেন, দুজন মানুষ স্তূপ সম্পর্কিত তাদের গবেষণার জন্য সবচেয়ে বেশী পরিচিত। তারপর তিনি আফগানিস্তানের আবিষ্কৃত স্তূপগুলিকে বিশ্লেষণ করে তদানীন্তন বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্তূপগুলির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সকলে এই বিষয়ে একমত যে স্তূপগুলি হল সোধ যেটি বৌদ্ধধর্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, সেখানে কিছু পার্থক্য রয়েছে তবে সেগুলি খুব বেশি উল্লেখযোগ্য নয়। লেফটেন্যান্ট কাণর্স, মিঃ ম্যাসন এবং মসিয়ে কোর্ট এদেশের মানুষদের মধ্যে প্রচলিত ধারণাটিকে গ্রহণ করে এগুলিকে রাষ্ট্রীয় ভাস্কর্য বলে মনে করেছেন। কিন্তু মি: আরস্টাইন এবং মি: হজসনের সঙ্গে একমত এবং সেই সমস্ত হতানী পন্ডিত যারা বিষয়েটি নিয়ে ইউরোপে আলোচনা করেছেন তাঁদের মত মনে করি এতুলি ছিল বিশাল স্তূপ অর্থাৎ মন্দির যেখানে কিছু পবিত্র নিদর্শন যেগুলিকে শাক্য সিংহ বা তাঁর কোন নিম্নস্তরের প্রতিনিধি বা বোধিসত্ব বা স্থানীয়দের কাছে পবিত্র কোন লামার সম্পত্তি বলে মনে করা হয়। যদিও এই দাবীর কোন ভিত্তি নেই বললেই চলে।

তোপদারা প্রায় ২০০ বছর দৃষ্টির বাইরে :

DAFA আফগানিস্তানের আনুষ্ঠানিক খননকার্য শুরু করে ১৯২৬ সালে, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল জালালাবাদের নিকটবর্তী হাড্ডা। সেখানে ১৯২৬ থেকে ১৯২৮ এর মধ্যে জুলস বার্থউস এমন একটি স্থানে কাজ করেছিলেন যেখানে ৮টি মঠ ও প্রায় ৫০০টি স্তূপ ছিল। খননকার্যের ফলে প্রায় ১৫০০০ ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছিল যেগুলির অপেক্ষাকৃত সামান্য অংশই কাবুলের জাতীয় জাদুঘর ও প্যারিসের গুইমেঠ যাদুঘরে পাওয়া গিয়েছিল। অন্যান্য ভাস্কর্যগুলি হাড্ডার একটি মুক্ত জাদুঘরে রাখা হয়েছিল এবং সেগুলি সোভিয়েত দখলদারি (১৯৭৯-৮৯) র যুগে ধ্বংস ও লুন্ঠিত হয়েছিল। তোপদারা DAFA এর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল না। তবে ১৯৫৩ সাল থেকে Afghan Historical Society (Aiynman e-Tarikh-e Afghanistan) এর প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় জাদুঘর (স্থাপিত ১৯৩১) এর তদানীন্তন কিউরেটর আহমদ আলি কোহজাদ (১৯০৭-৮৩) এই স্থানটির কথা উল্লেখ করেছেন। কোহমাদ লিখেছেন যে ১৯২১ ও ১৯২২ সালের খননকার্যের ফলে স্থানীয় ধর্ম ও বেগ্রামের কুষাণযুগের সভ্যতার পর্বতের অভিভাবক ছোট হাতীর মূর্তিসহ নতুন প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তিনি বলেছেন এই পর্বতটি কপিশার পশ্চিমদিকে অবস্থিত। বৌদ্ধ যুগে পাহাড়ের পাদদেশে এখানে একটি বৌদ্ধ মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং M. Fouche এর মতে এটির ধ্বংসাবশেষ এখনও তেহরিকারের সামনে তোপদারাতে রয়েছে।

জাপানী, চীনাতত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ সাইচি মিজুনো ১৯৬৭ সালে এই স্তূপটির আলোকচিত্র গ্রহণ করেন এবং তিনিই ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বৌদ্ধ প্রত্নস্থলগুলির খনন কার্যের তত্বাবধান করেছিলেন। তবে তোপদারা স্তূপটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত কখনই যথাযথভাবে খননকার্য চালান হয়নি যখন Achco তাদের কাজ শুরু করে। kowzad এর অনুমানগত এই স্থানটিতে আবর্জনার তলায় একটি বিশাল বৌদ্ধ মন্দির লুকিয়ে রয়েছে কিনা সটাই এখন দেখার।

তোপদারা স্তূপের ইতিহাস এখনো অজানা। তবে প্রাচীন নগরী কপিশার (মোটামুটি এই স্থানে বর্তমানে বেগ্রাম অবস্থিত, এটি একটি ছোট বাজার শহর মূলত নিকটবর্তী বিশাল বিমানঘাঁটির জন্য পরিচিত) নিকটবর্তী হওয়ায় Achco এর মতে স্তূপটি নির্মিত হয়েছিল খ্রীষ্ট্রীয় ৪র্থ শতাব্দীর আশেপাশে বৌদ্ধধর্ম বহু শতাব্দী ধরে সমৃদ্ধিলাভ করেছিল এবং এর প্রমাণ মেলে এই অঞ্চলের বহু বৌদ্ধ সৌধের মধ্যে যার কয়েকটি খননকার্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালন হয়েছে এবং কয়েকটি হয়নি। মনে হয় তোপদারা হল কাবুল থেকে কপিশা নগরীর বর্তমানে বেগ্রাম যাওয়ার প্রধান সড়ক থেকে ১৫ কিমি উত্তরে তেপ ইস্কান্দর স্তূপ অবস্থিত এবং এই স্থানটি মীর বাচা কোট জেলা কেন্দ্রের ৩ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। তবে তোপদারা স্তূপের উন্নতর গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণাদি যুক্ত ইতিহাস এখন রচিত হয়নি।

Thomas Rutteg এবং Martni Van Biylert :

১ ) ২০১৭ সালের ব্রিটিশ জাদুঘরের প্রকাশনায় Charles Masson and the Buddhist sites Afghanistan Exploration, Excavation, Collections 1832-35 (সম্পাদনা এলিজাবেথ এরিংটন) তোপদারা স্তূপের ড্রামটিকে নিম্নলিখিতভাবে বর্নণা করেছেন, " ড্রামটি ঢালাই করা খিলানের তোরণ শ্রেণীদ্বারা ইন্দোকোরিন্থীয় ফিলাস্টারদ্বারা অলঙ্কৃত। প্রতিটি কিলানে মূর্তি যোগ করার জন্য একটি ছিদ্র রয়েছে। পূর্বদিকে ছাদের কারুকার্যের উপর রয়েছে একটি তিন লতিযুক্ত খিলান (চওড়া ৩৭ মি.) যেখানে এখনও প্রধান মূর্তির জ্যোর্তিবলসের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সম্ভবত এটি দন্ডায়মান বুদ্ধ যাঁর উভয়দিকে রয়েছে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মূর্তি।

২) H.H. Wilson এর মতে ভারতবর্ষের প্রথম স্তূপ যেটি ব্রিটিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটি আবিষ্কৃত হয়েছিল সারনাথে যেখানে একটি ১৭৯৪ সালে একজন স্থানীয় মানুষ একটি ভস্মাধার ও বুদ্ধমূর্তি আবিষ্কার করে। স্তূপটি উন্মুক্ত করা হয় ১৮৩৫ সালে। Wilson সিং হল (শ্রীলঙ্কা) তে অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করেছেন যার বিবরণ প্রকাশিত হয়১৭৯৯ সালে। আফগানিস্তানের স্তূপ সম্পর্কে উইলসন মন্তব্য করেছেন: এই ধরণের আকৃতির সৌধগুলির ক্ষেত্রে স্তূপ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল যখন এই শ্রেণীর পরবর্তী ইমারতটি উত্তর ভারতে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৮০৮ সালে মিঃ এলফিনস্টোনের নেতৃত্বাধীন রাজদূতের একটি দল ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তনের সময় সিন্ধু ও ঝিলানের মধ্যবর্তী স্থানে এসে উপস্থিত হন যেখানে কর্ণেল উইলফোর্ডের মতে আলেকজান্ডারের মিত্র তফস্পাইলের রাজধানী (যা বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত ও তক্ষশীলা নামে পরিচিত) অবস্থিত ছিল। প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধানে একটি দল শিবির ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় গেল এই মতের যথার্থতা নির্ণয়ে এবং মনিকলা স্তূপ নামে এই নিমার্ণের মুখোমুখি হল যেটি একটি গোলাকার কঠিন ইমারত যার উপরে রয়েছে একটি গম্বুজ এবং যেটি একটি কৃত্রিম নিম্নভূমির উপর দণ্ডায়মান।

৩) Honigberger ১৮৩৩ সালে আফগানিস্তানের প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত করেন। তিনি তাঁর যাত্রার এই অংশ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করেছেন তাঁর গ্রন্থে যেটি ইংরাজীতে প্রায় ৩৫ বছর নামে অনূদিত হয়। চিকিৎসাবিদ্যার, উদ্ভিদবিদ্যার, ঔষধবিদ্যা ইত্যাদির সাপেক্ষে যাত্রা, আবিষ্কার, পরীক্ষানীরিক্ষা এবং ঐতিহাসিক বিবরণ পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের সাপেক্ষে। তিনি কেবল মন্তব্য করেছেন কাবুল ও জালালবাদে। কিন্তু তিনি তাদের সঠিক অবস্থান উল্লেখ করেননি। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন তাঁর সেই সময়কার সংগ্রহ ১৮৫৩ সালে প্যারিসের এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রেরিত ও তাদের দ্বারা প্রকাশিত হয়। তাঁর সংগ্রহের আরেকটি অংশ যা ভিয়েনায় প্রেরিত হয় হারিয়ে গিয়েছিল। ২০১৭ সালের ব্রিটিশ যাদুঘরের প্রকাশনা অনুসারে Honijleerger দাবি করেছেন যে তিনি কাবুল ও দূরন্ত অঞ্চলে প্রায় ২০ টি স্তূপ খনন করেছেন কিন্তু নিদর্শনযুক্ত মাত্র সাতটি স্তূপ খননের বিবরণ পেশ করেছেন Shenakil, Kumari, Seh Top 2, Katpar, Barbad, Bimaran 35 ঐ প্রকাশনায় আরও বলা হয়েছে। তবে ম্যাসন আরও দশটি স্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন এবং সনাক্ত হওয়া Honlirger খননকার্যের সংখ্যা ১৭ তে দাঁড়িয়েছে, কাবুলের উত্তরের কো-ই-দমন এ কোরিন্দার ও তোপদার স্তূপ (ম্যাসন ১৮৪১, Topes pl. Ixe-d) শাখ বরন্ত চূড়ার দক্ষিণ দিকে গুলদারা এবং জালালাবাদের পশ্চিমে কোতপুর ৩ এর দূরন্ত স্থান কোতপুর ৩, পাস্সানি ২, বিমারণ ২, রহমান ২, মূর্খ স্তূপ এবং নন্দারা ১ ও ২।

৪) প্রাক ইসলামিক যুগে এই হস্তীমস্তকগুলিকে সংস্কৃত পিলো সারা এবং চৈনিক পিলো সোলো বলা হত। দারিও পাস্তো ভাষায় হাতী বলতে বোঝায় ফিল (কথ্য পিল)।

৫) যদিও আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্ম খ্রী.পূর্ব ২য় বা ৩য় শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারিখযুক্ত লিপি ও মুদ্রা রূপে স্পর্শযোগ্য কালানুক্রমিক প্রমাণ খ্রীষ্টীয় প্রথম শতকের আগে পাওয়া যায় না।

 গুলদারা স্তূপ আফগানিস্তানের কাবুল জেলায় গুলদারা উপত্যকার শেষে একটি উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় গুলদারা (গুলদারা বা গোল দারা গ্রাম থেকে বেশি তদূরে অবস্থিত নয় (পুষ্প উপত্যাকা)। মনে হয় এটি খ্রীষ্টীয় ২য় শতকের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেহেতু এখানে প্রথম কনিষ্কের পিতা কুষাণ রাজ বিম কদফিষের (১১৩ খ্রী.-১২৭ খ্রী.) ছয়টি স্বর্ণমুদ্রা এবং কণিষ্কের পুত্র যিনি ১৫০ খ্রী.থেকে ১৯০ খ্রী. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন বলে মনে করা হয়। কোন মুদ্রাই খুব বেশী পুরাতন বলে মনে হয় না, এবং বুবিষ্কের মূর্তি দুটি সবে মাত্র টাকশাল থেকে বের হয়েছে বলে মনে হয়। গুলদারা স্তূপটি কাবুলের ২২ কিমি বা ১৪ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এটি একটি বিশাল স্তূপ, কর্কশ অমসৃণ পাথরে তৈরী এবং যম্ভবত আফগানিস্তানের সবচেয়ে ভালভাবে সংরক্ষিত স্তূপ। প্রধান স্তূপের প্রতিরূপ হিসেবে একটি ক্ষুদ্র স্তূপ একটি পাহাড়ের একপাশে রয়েছে এবং নিকটে রয়েছে একটি সুরক্ষিত বিহারের ধ্বংসাবশেষ। বিহারটির দিকে মুখ করে রয়েছে একদল বিশাল দণ্ডায়মান মূর্তি খননকারীরা যেগুলির কেবল দুটি বিশাল পা খুঁজে পেয়েছেন কিন্তু যেগুলি তারপর থেকে হারিয়ে গিয়েছে। নিকটবর্তী শিওয়াকি গ্রামের পাশে রয়েছে আরেকটি স্তুপ ও বিহার। স্তূপটি দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বর্গাকার ভিত্তির উপর যার উপরে রয়েছে দুটি শম্ভু আকৃতির গম্বুজ এবং তার উপর আরও একটি গম্বুজ।

ভিতটি নকল করিন্থিয় স্তম্ভ দ্বারা অলঙ্কৃত যার তিনদিকে রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় কুলুঙ্গি এবং দক্ষিণ পশ্চিমদিকে রয়েছে একটি সিঁড়ি যা ভিতটির উপরে যাচ্ছে। একদা মূর্তিগুলি কুলুঙ্গিগুলি জুড়ে ছিল। প্রথম ড্রামটির অলঙ্করণ ভিতটির মতই, কিন্তু দ্বিতীয়টি আরও বেশী অলঙ্কৃত একটি ছদ্ম খিলান দ্বারা যেগুলির মধ্যে পরপর অর্ধবৃত্তাকার ও ট্রাপিজিয়ামকারের খিলান রয়েছে। খিলানগুলির মধ্যেকার ছবিটি একটি ছাতার মাস্তুল সাধারণত যেগুলি স্তূপের শীর্ষে থাকে। প্রাচীরগুলি কুষাণ কারিগরি বিদ্যার একটি সুন্দর উদাহরণ যেটি ডায়াপার মসৌরি নামে পরিচিত। এটি তৈরী হয়েছে সরু এবং পরিচ্ছন্নভাবে স্থাপিত স্তর দিয়ে যার মাঝে রয়েছে পাথরের বড় ব্লক। এই নির্মাণগুলি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় এবং ঘরলতার কারণে যবচেয়ে বেশী ফলপ্রদ। প্রথমে সমস্ত স্তূপই প্রথমে প্লাস্টার করা এবং লাল নকশা দ্বারা খয়েরি হলুদ রঙে রাঙানো।

গুলদারা নামে বা পুষ্প উপত্যকায় বা এই চালের বিপরীত দিকে একটি স্তূপ রয়েছে যেটিকে মমিয়ে হনিগ্রবার্জার পরীক্ষা করেছেন। যেহেতু তিনি কেবল ভূগর্ভস্থ কক্ষটিতে প্রবেশ করেছিলেন তিনি নির্দেশ দিয়ে যেটিকে যেই রেখায় উন্মুক্ত করিয়েছি যার উপর একটি উপরিকাঠামো রয়েছে। তাঁর অনুসন্ধান সফল হয়েছিল এবং কেন্দ্রে একটি কক্ষে ছাইমিশ্রিত অবস্থায় কদফিসেস ও অন্যান্য আগেকার রাজাদের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।

স্তূপে যাওয়ার পথের অর্ধেক বা তিন চতুর্থাংশ পথে একটি ক্ষুদ্র কক্ষ রয়েছে যেখানে সাধুদের স্মৃতিচিহ্ন ও কিছু ধনরত্ন রয়েছে। ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ অভিযাত্রী চার্লস ম্যাসন ঐ কক্ষটি উন্মুক্ত করেন এবং আটটি কুষাণ স্বর্ণমুদ্রা এবং আরো কয়েকটি স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করেন। উপরোক্ত স্বর্ণমুদ্রা ছাড়াও ব্রোঞ্জের গড়ে ২.১ যেমি ব্যারে ব্রোঞ্জের ফাঁসযুক্ত ৯৬টি সোনার বোতাম এবং সামান্য পরিমান ছাই এবং হাড়ের গুঁড়ো পাওয়া গিয়েছে।

প্রাক ইসলামিক যুগে বৌদ্ধধর্ম আফগানিস্তানের একটি প্রধান ধর্মীয় শক্তি ছিল। এই ধর্ম হিন্দুকুশ পর্বতের দক্ষিণে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বৌদ্ধধর্ম আফগানিস্তানে প্রথম আসে যখন গ্রীক সেলুসিড সাম্রাজ্য ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে। এর ফলশ্রতিতে গ্রীক বৌদ্ধধর্ম বর্তমান উত্তর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গ্রীক ব্যাক্ট্রিয় সাম্রাজ্য (২৫০ খ্রী. পূর্ব: ১২৫ খ্রী. পূর্ব) এবং পরবর্তীকালের ইন্দো গ্রীক সাম্রাজ্য (১৮০ খ্রী. পূর্ব ১০ খ্রী.)র অধীনে সমৃদ্ধিলাভ করে। গ্রীক বৌদ্ধধর্ম তার শীর্ষে আরোহণ করে কুষাণ সাম্রাজ্যের অধীনে যারা ব্যাক্ট্রিয় ভাষা লেখার জন্য গ্রীক বর্ণমালা ব্যবহার করত লোকক্ষেম (১৭৮ খ্রী.) যিনি চৈনিক রাজধানী লোয়াং-এ গিয়েছিলেন এবং মহাযানী বৌদ্ধশাস্ত্রের প্রথম চৈনিক অনুবাদক ছিলেন এবং মহাধর্মরক্ষিত যিনি মহাবংশ অনুযারে (অধ্যায় ২০২১) ৩০০০০ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে নেতৃত্ব দিয়ে গ্রীক নগরী আলাসান্দ্রা (ককেশাসের আলেজান্দ্রিয় বর্তমান আফগানিস্তানের কাবুলের প্রায় ১৫০ কিমি উত্তরে) থেকে অনুরাধাপুরের মহাস্তূপের উৎসর্গের সময় নিয়ে গিয়েছিলেন। গ্রীক ব্যাক্ট্রিয় রাজা প্রথম মিনান্দার (পালি মিলিন্দ) যিনি ১৬৫ স্ত্রী. পূর্ব থেকে ১৩৫ খ্রী. পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন বিখ্যাত বৌদ্ধ গ্রন্থ মিলিন্দ পঞ্হের মাধ্যমে অমর হয়ে রয়েছেন। নব বিহার নামে পরিচিত বিখ্যাত পারমিক বৌদ্ধ বিহার বহু শতাব্দী ধরে মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রীষ্টীয় ৭ম শতকে ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্ম দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে শেষ পর্যন্ত খ্রীষ্টীয় একাদশ শতকে গজনবিদদের হাতে আফগানিস্তানের বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটে। বহু শত বছর ধরে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনেক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মধ্য এশীয়া, দক্ষিণ এশীয়া ও মধ্য এশীয় ষংস্কৃতির মধ্যস্থলে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিখ্যাত রেশম পথ (যেটি পূর্ব এশীয়, ভূমধ্যসাগরীয় এবং মধ্যবর্তী সভ্যতাগুলিকে সংযুক্ত করেছে) স্থানীয় ঐতিহাসক সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। একটি অন্যতম প্রধান প্রভাব ছিল আলোকজান্ডারের ঐ অঞ্চলটি জয় করা এবং এর ফলে এলাকাটি কিছু সময়ের জন্য হেলেনীয় জগতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ৩০৫ খ্রীষ্টাব্দে সেলুসিড সাম্রাজ্য ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজের সঙ্গে মৈত্রীস্থাপন করে এবং এর ফলে মৌর্যরা ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে আসে এবং ১৮৫ খ্রীষ্টের পূর্বাব্দে ক্ষমতা হারানোর পূর্ব পর্যন্ত হিন্দুকুশ পর্বতের দক্ষিণ অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। আলেকজান্ডার এগুলি আর্যদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের উপনিবেশ স্থাপন করেন কিন্তু সেলুকাস যেগুলিকে সেন্ড্রোকোটাস (চন্দ্রগুপ্ত) কে অন্তঃবিবাহ ও ৫০০টি হাতীর বিনিময়ে দান করে দিয়েছিলেন।

 স্ট্রাবো ৬৪ খ্রী. পূর্ব  -- ২৪ খ্রী. :

এই সমস্ত ঘটনাগুলি ঘটার যময়ে এই অঞ্চলের বেশীরভাগ এলাকাই স্কাইথিয়ানসহ ব্যাক্ট্রিয় ও সোগদানিয়ার অর্ন্তগত ছিল, তারপর এখানে আসে বৌদ্ধধর্ম ও সবশেষে ইসলাম। অনেক মোঠ বর্তমান আফগানিস্তানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রমাণ দেয়। গ্রীক সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক প্রভাব বৌদ্ধ শিল্প ও গ্রীক বৌদ্ধধর্মের মধ্যে গবেষণা করা যেতে পারে। অতিরিক্ত ঐতিহাসক  তথ্য অনুসন্ধান করা যেতে পারে আফগানিস্তানের প্রাক ইসলামিক হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মধ্যে। সাসানিয় পারস্যিক রাজবংশ মুসলমানদের অধিকারে আধার ঠিক পরই (৬৫১ খ্রী.) বল্খের নব বিহার মুসলমান শাষণের অধীনে আসে। কিন্তু বিহারটি আরও অন্তত একশ বছর সক্রিয় থাকে। ৭১৫ খ্রীষ্টাব্দে বল্খের একটি অভ্যুত্থান আব্বাসিদ খলিফারা দমন করার পর বহু পারষিক বৌদ্ধ ভিক্ষু রেপম পথ বরাবর পলায়ন করে বৌদ্ধ রাজ্য খোটানে আশ্রয় নেন যেখানে একটি সম্পর্কত পূর্ব ইরানীয় ভাষা বলা হত এবং তারপর তাঁরা চীনে পাড়ি দেন। বিহারটি অধিকৃত হওয়ার পর বিহারের বংশানুক্রমিক প্রশাসক পারসিক কর্মাকিডরা বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করে ইষলাম ধর্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদের আব্বাসিদ খালিফাদের অধীনে শক্তিশালী উজিরে পরিণত হন। উজিরদের বংশের সর্বশেষজন জাফর ইবন ইয়াহিয়া আরব্য রজনীর অনেক কাহিনীর মুখ্য চরিত্র। লোককাহিনী ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে জাফরকে অতীন্দ্রিয়বাদ ভূতপ্রেত তাড়ানোর বিদ্যা এবং ইসলামের এলাকার বাইরের ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম উন্মেইদদের দ্বারা আফগানিস্তানের ইসলামিক জয় ও আব্বাসিদ খালিফাদের শাসনে টিকে ছিল। আফগানিস্তানের বৌদ্ধধর্মকে ফলপ্রসুভাবে নির্মূল করেছিল সাফারিদ, গজনবিদ ও ঘুরিরা।

বামিয়ান বৌদ্ধ গ্রন্থাগার : 

বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলির মধ্যে অন্যতম প্রাচীন মহাসাংঘিক লোকোত্তরবাদের প্রাধান্য বামিয়ান এলাকায় ছিল বলে মনে হয়। চৈনিক পরিব্রাজক শুয়াং জাঙ খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকে আফগানিস্তানের বামিয়ানে একটি লোকোত্তরবাদী বিহারে আগমন করেছিলেন এবং যেই স্থানটি প্রত্নতান্তিত্বকদের দ্বারা আবিষ্কৃত হয়েছে। মহাযানী সূত্রগুলি সহ তালপাতা ও ভূর্জপত্রের পুঁজির সংগ্রহ স্থানটিতে আবিস্কৃত হয়েছে এবং বর্তমানে এগুলিকে Schoyen Collection এর অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। কয়েকটি পুঁথি গান্ধার ভাষায় খরোষ্ঠী লিপিতে রচিত এবং অন্যান্যগুলি খরোষ্টি ভাষায় গুপ্ত লিপিতে রচিত। ঐ বিহারের সংগ্রহে যে সমস্ত পুঁথি ও তাদের খণ্ডিতাংশ তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে সেগুলি হল- প্রাতিমোক্ষ বিভঙ্গ (মহাসাংঘিক লোকোত্তরবাদী)(MS2382/269) মহাপরিনির্বাণ সূত্র, আগম থেকে প্রাপ্ত(MS2179/44)চমগি সূত্র, আগম থেকে প্রাপ্ত(MS2376)  সূত্র বজ্রচ্ছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র, একটি মহাযানী সূত্র(MS2385) ভৈষজ্যগিরিসূত্র, একটি মহাযান সূত্র(MS2385) শ্রীমালাদেবী সিংহনাদ সূত্র, একটি মহাযান সূত্র(MS2378) প্রবরণ সূত্র, একটি মহাযান সূত্র(MS2378) সর্বধর্মপ্রবর্তিনির্দেশ সূত্র, একটি মহাযানী সূত্র(MS2378) অজাতশত্রুকৌকৃত্য বিনোদন সূত্র, একটি মহাযানী সূত্র, (MS2378) সারিপুত্র অভিধর্ম সূত্র শাস্ত্র(MS2375/08)।

বৌদ্ধ নিদর্শন : 

 ২০১০ সালের আগষ্ট মাসে একথা বলা হয়েছে আফগানিস্তানের লগার প্রদেশের মেষ আয়নাক্তে প্রায় ৪২টি বৌদ্ধ নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে যেটি কাবুলের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে কোন কোন বস্তু খ্রীষ্টীয় ২য় শতকের। গজনীতে কয়েকটি বৌদ্ধ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে। লোগারের বস্তুগুলির মধ্যে রয়েছে দুটি বৌদ্ধ মন্দির, বৌদ্ধ স্তুপ, ফ্রেস্কো, সোনা ও রূপার মুদ্রা ও মূল্যবান পুঁতি। যেখানে রয়েছে একটি মন্দির, স্তূপ, সুন্দর কক্ষ, ছোট ও বড় মূর্তি যাদের একটি দৈর্ঘ্য নয় মিটার ও অপরটির দৈর্ঘ্য সাত মিটার, সোনা ও কয়েকটি মুদ্রা দ্বারা অলঙ্কৃত রঙীন ফ্রেস্কো কোন কোন নিদর্শন খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতকের। এমন কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে যেগুলি প্রাক খ্রীষ্টীয় বা প্রাক ঐতিহাসক যুগের। এগুলিকে সংরক্ষণ করার জন্য আমাদের প্রয়োজন বিদেশী সাহায্যের এবং আরও খননকার্যের জন্য তাদের বিশেষজ্ঞের সহায়তা।

মহম্মদ নাদের রসৌলি, আফগান প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ তেপ নরেঞ্জ বা তেপ এ নিরাঞ্জ হল আফগানিস্তানের কাবুলের নিকটবর্তী খ্রীষ্টীয় ৫ম ও শতকের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থল।

ইতিহাস :
১৫৯০ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত জানুয়ারি টু দ্য ওয়েষ্ট নামক চৈনিক উপন্যাসে বিহারটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। এই উপন্যাসে বলা হয়েছে যে খ্রীষ্টীয় ৭ম শতকে ভারতবর্ষ থেকে ফেরার পথে বৌদ্ধ  ভিক্ষু তাং সাং জাং এই বিহারটিতে এসেছিলেন। এখানে উদ্ধার প্রাপ্ত মূর্তিগুলি থেকে এই অঞ্চলে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম চর্চার প্রমাণ মেলে। একথা বিশ্বাস করা হয় যে মুসলিম সৈন্যরা নবম শতকে বিহারটি ধ্বংস করে এবং সোভিয়েত আফগান যুদ্ধের পরবর্তী সময় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। 

স্থান : 
এই স্হানটির ভিত্তি প্রথম আবিষ্কৃত হয় Afghan Archealogical   Research Institute এবং Japan's National  Institute for Cultural Propertyর এক যৌথ গবেষণায়। এই স্হানটি একটি পাহাড় বরাবর অবস্থিত এবং এর দৈর্ঘ্য ২৫০ মি। এই স্হানটি কাবুলের দক্ষিণে Kaul-e - Highgate Khan এর দক্ষিণে একটি আধুনিক থানার নীচে আবিষ্কৃত হয়েছে। বিহারটিতে পাঁচটি ক্ষুদ্র স্তূপ রয়েছে ধ্যানের জন্য এবং পাঁচটি ভোজনালয়  রয়েছে। ২০০৫ সাল থেকে Afghan  Institute of Archealogy প্রতি গ্রীষ্মে এক মাস করে স্হানটিতে খনন চালিয়ে আসছে। ২০০৮ সালে এই স্হানটিকে ঝুঁকিতে থাকা ১০০টি স্থানের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ভয় :
স্হানটির উপাদান এবং এটি উন্মুক্ত থাকার কারণে এতে ক্ষয়ের যথেষ্ট সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মত ব্যাক্ত করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকগণ। এই স্হানে লিখিত ভাস্কর্য তৈরী হয়েছে বানাইতে ঠাসা কাদা দিয়ে এবং এটির ভিতরের ছাদে প্লাস্টার লেপন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ইত্যাদির লুন্টনকারী, সশস্ত্র দ্বন্ধ এবং অপর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান ইত্যাদির ফলে এই বিপদ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তিগুলি খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে তৈরী গৌতম বুদ্ধের দুটি বিশাল মূর্তি যেটি মধ্য আফগানিস্তানের হাজারজত অঞ্চলে (১৪০ মাইল) কাবুলের ২৩০কিমি উত্তর পশ্চিমে ২৫০০ মি (৮২০০ফুট) উচ্চতায় বামিয়ান উপত্যাকায় একটি পাহাড়ের পাশে খোদাই করা হয়েছিল। ৫০৭ (ক্ষুদ্রটি) খ্রীষ্টাব্দে এবং ৫৫৪ খ্রীষ্টাব্দে (বৃহৎটি) নির্মিত হওয়া এই মূর্তিগুলি গান্ধার শিল্পের ধ্রুপদী মিশ্রিত শৈলীর প্রতিনিধিত্ব করছে। এগুলি যথাক্রমে ৩৫মি ও ৫৩টি উচ্চ (১১৫ ফুট ও ১৭৪ ফুট)। প্রধান অংশগুলি বেলেপাথরের পাথরের পাহাড় থেকে সরাসরি কেটে নেওয়া হয়েছে কিন্তু অবশিষ্ট অংশ নির্মিত হয়েছে খড় মিশ্রিত মাটি দিয়ে যার উপরে প্লাস্টার লেপন করা হয়েছে। এই প্রলেপ, যার সবটুকু সম্ভবত বহু পূর্বে উঠে গিয়েছে মুখ, হাত ও পোশাকের ভাঁজকে স্পষ্ট করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। বড়টির রং ছিল উজ্জ্বল লাল এবং ছোটটিকে বহুবর্ণে চিত্রিত করা হয়েছিল। মূর্তিগুলির ধাতুর নিম্নতর অংশ তৈরী হয়েছিল কাদা ও খড়ের মিশ্রণ দ্বারা যা দাঁড়িয়েছিল তারের কুণ্ডলীর সাহায্যে। একথা বিশ্বাস করা হয় যে তাদের মুখমণ্ডলের উপরের অংশ তৈরী হয়েছিল বিশাল কাঠের মুখোশ থেকে। ছিদ্রের যে সারি আলোকচিত্রগুলিতে দেখা যায় সেখানে কাঠের গজাল ছিল যা বাইরের প্লাস্টারটিকে স্থিতিশীল রাখত। এই মূর্তিগুলি তালিবাল সরকার মূর্তি বলে ঘোষিত হবার পর তাদের নেতা মোল্লা মহম্মদ ওমরের আদেশ ২০০১ সালের মার্চ মাসে ধ্বংস করে ফেলা হয়। পরের সপ্তাহে আমেরিকায় গমনকারী একটি প্রতিনিধিদল জানায় যে এই মূর্তিগুলিকে ধ্বংস করা হয়েছিল মূর্তিগুলিকে রক্ষার জন্য আর্ন্তজাতিক প্রতিবাদের কারণে যখন আফগানিস্তানে দুর্ভিক্ষ হচ্ছিল কিন্তু আফগান বিদেশমন্ত্রী দাবী করেন যে ঐ ধ্বংস কার্যের কারণ ছিল কেবলমাত্র মুসলমানদের ধর্মীয় মূর্তিপুজা বিরোধিতা। আর্ন্তজাতিক মতামত কঠোরভাবে বুদ্ধমূর্তিগুলিকে ধ্বংসর নিন্দা করেছিল। 

বামিয়ান হিন্দুকুশ পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া রেশম পথের উপর বামিয়ান উপত্যকায় অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে রেশম পথ হল একটি ক্যারাভান পথ যা চীনের বাজারকে পাশ্চাত্য জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানে বহু বিহার ছিল এবং এটি ধর্ম দর্শন ও শিল্পকলার একটি সমৃদ্ধশালী কেন্দ্র ছিল। বামিয়ান পাহাড়ে খোদাই করা ছোট ছোট গুহায় ভিক্ষুরা বসবাস করতেন। অধিকাংশ ভিক্ষুই তাঁর গুহাগুলিকে ধর্মীয় উজ্জ্বল রঙের চিত্রদ্বারা অলঙ্কৃত করেছিলেন। খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুসলমান আক্রমণ পর্যন্ত এটি একটি বৌদ্ধ ধর্মস্থান ছিল। নবম শতকে মুসলমান সাফারিদদের দ্বারা বিজিত হওয়ার আগে পর্যন্ত বামিয়ান গান্ধার সংস্কৃতির অংশীদার ছিল।

মূর্তিগুলির বিভিন্ন মুদ্রা থেকে সনাক্ত করা যম্ভব হয়েছে যে সবচেয়ে প্রধান দুটি মূর্তি হল বুদ্ধ বৈরোচন ও বুদ্ধ শাক্যমুনির ভাস্কর্য। যে বুদ্ধটি 'সলসল' নামে জনপ্রিয় যেটি ৫৩টি উঁচু এবং শামামা নামে বুদ্ধটি ৩৫টি উঁচু যে কুলুঙ্গিগুলিতে মূর্তিগুলি ছিল নীচ থেকে উপরে যেগুলির উচ্চতা যথাক্রমে ৫৮মি ও ৩৮ মি। ২০০১ সালে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বে এগুলি ছিল দন্ডায়মান বুদ্ধমূর্তির বৃহত্তম উদাহরণ (অষ্টম শতকের লেশান জায়ান্ট বুদ্ধমূর্তিটি উচ্চতর, কিন্তু মূর্তিটি উপবিষ্ট অবস্থায় রয়েছে। ১৮২ মিটার (৫৯৭ ফুট) উঁচু ঐক্য স্ট্যাচুলুসান প্রদেশের Folushan Scenic Area র The spring Temple Buddha র (১২৮ মি ৪২০ ফুট) রেকর্ড ভেঙে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মূর্তির মর্যাদা লাভ করেছে। বামিয়ান বুদ্ধ ধ্বংসের অব্যবহিত পরই Spring Temple Buddha নির্মাণের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল এবং চীন আফগানিস্তানের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পরিকল্পনামাফিক ধ্বংসের নিন্দা করেছে।

একথা বিশ্বাস করা হয় যে বিশাল বুদ্ধমূর্তিগুলি খ্রীষ্টীয় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে বামিয়ানের পাহাড়ে খোদাই করা হয়েছিল যদিও ৩৮মি বুদ্ধ মূর্তিটি সহ পূর্ব দিকের গুহা চত্বর খ্রীষ্টীয় তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। একথা বিশ্বাস করা হয় ৫৫ মি বুদ্ধমূর্তিটি খ্রীষ্টীয় ৫ম থেকে ৬ষ্ঠ শতকে নির্মিত। ঐতিহাসক দলিল থেকে জানা যায় যে প্রতি বছর সেখানে উৎসবে বহু মানুষ আসত এবং বিশাল মূর্তিগুলির সামনে পূজা দেওয়া হত। সম্ভবত এগুলি ছিল এই এলাকায় সবচেয়ে বিখ্যাত দিকচিহ্ন এবং বামিয়ান উপত্যাকায় পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বরাবর এই অঞ্চলটি UNESCO র World Heritage Site এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সময়ের যঙ্গে সঙ্গে এটি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী ৬৩০ খ্রীষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল এই স্থানটিতে এসেছিলেন এবং তা থাং শু চু চি তে বামিয়ানে দশটি বৌদ্ধ বিহার ও এক হাজারের ও বেশী ভিক্ষু যুক্ত একটি সমৃদ্ধশীল বৌদ্ধ কেন্দ্র বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি অলঙ্কৃত (Wrigging 1995) অত্যন্ত কৌতূহলজনকভাবে শুয়াং জাঙ আরো একটি আরও বৃহত্তর অর্ধশায়িত বুদ্ধমূর্তির কথা উল্লেখ করেছেন। বামিয়ান শৈলীতে একটি বিশাল উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি চীনের কাং সু প্রদেশের পিং লিং মন্দিরে এখনও রয়েছে। বামিয়ান, বুদ্ধমূর্তির ধ্বংস অত্যাচারের একটি প্রতীকে, পরিণত হয় এবং ধর্মীয় মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বর্তমানে অধিকাংশ আফগান মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের অতীতকে আঁকড়ে ধরে ছিল এবং অনেক আফগান এই ধ্বংসে সন্ত্রস্ত ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। 

 বিশেষ অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিকভাবে রোগ নিরাময় করতে পারে।

সুমনপাল ভিক্ষু


একবার যখন ভিক্ষু গিরিমানন্দ অসুস্থ ছিলেন, তখন বুদ্ধ আনন্দকে বললেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গভীর সচেতনতার অভিজ্ঞতাটি কেমন? যখন একজন ভিক্ষু বনে, বা গাছের মূলে, বা একটি শূন্য কুটিরে গিয়ে, শরীর ও পিঠ সোজা করে, পদ্মাসনে বসে, নাসারন্ধ্রের চারপাশে সচেতনতা স্থাপন করেন, তখন কেবল সেই শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পর্কেই স্পষ্টভাবে সচেতন থেকে, তিনি শ্বাস গ্রহণ করেন, এবং তারপর কেবল সেই শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পর্কেই সম্পূর্ণরূপে সচেতন থেকে, তিনি শ্বাস ত্যাগ করেন...
১: দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে, তিনি জানেন, লক্ষ্য করেন এবং বোঝেন: আমি দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করছি।
২: সংক্ষিপ্ত শ্বাস গ্রহণ করে, তিনি জানেন, লক্ষ্য করেন এবং বোঝেন: আমি সংক্ষিপ্ত শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করছি।
৩: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: এই সম্পূর্ণ শরীরকে অনুভব করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
৪: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: সমস্ত শারীরিক কার্যকলাপ শান্ত করে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
৫: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: এক পরমানন্দময় আনন্দ অনুভব করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
৬: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: এক সুখকর তৃপ্তি অনুভব করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
৭: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: সমস্ত মানসিক কার্যকলাপ অনুভব করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
৮: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: সমস্ত মানসিক কার্যকলাপ শান্ত করে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
৯: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: বর্তমান মানসিক অবস্থা অনুভব করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১০: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: মনকে উৎফুল্ল ও আনন্দিত করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১১: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: মনকে একাগ্র ও নিবিষ্ট করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১২: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: মনকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১৩: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: অনিত্যতা বিবেচনা করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১৪: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: মোহমুক্তি বিবেচনা করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১৫: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: নির্বাণ বিবেচনা করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
১৬: তিনি এভাবে অনুশীলন করেন: ত্যাগ বিবেচনা করতে করতে, আমি শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করব।
ভগবান বুদ্ধের কাছ থেকে এই ১৬টি সহজ ধাপ শেখার ও মুখস্থ করার পর, ভিক্ষু আনন্দ ভিক্ষু গিরিমানন্দের কাছে গিয়ে তাকে এই ১৬টি ধাপ আবৃত্তি করে শোনান। এরপর ভিক্ষু গিরিমানন্দ যখন এই ১৬টি সহজ ধাপ এবং দশটি অভিজ্ঞতার কথা শুনলেন এবং অনুশীলন করলেন, তখন তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর অসুস্থতা উপশম হলো এবং তিনি বিছানা থেকে উঠে বসলেন। এভাবেই ভিক্ষু গিরিমানন্দ তাঁর রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করলেন।

সেই ৭টি ধারা কী, যা বোধি বা বুদ্ধাঙ্কুরের উন্মেষ?

সুমনপাল ভিক্ষু

এই সাতটি সেট পরস্পর সংযুক্ত, একে অপরের উপর নির্ভরশীল এবং ধারাবাহিকভাবে ও সমান্তরালভাবে কাজ করে! বুদ্ধ গৌতমের (৫৬৩-৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পূর্বে ছিলেন বুদ্ধ কাস্সপ, এবং তাঁর পূর্বে ছিলেন বুদ্ধগণ: কোণাগমন ও ককুসন্ধ, সকলেই এই বিশ্বজনীন মহাযুগের চক্রে! তাঁদের পূর্বে ছিলেন বুদ্ধগণ: বেস্সভূ, শিখী, বিপস্সী, ফুস্স, এবং তিস্স, সিদ্ধার্থ, ধম্মদস্সী, অত্তদস্সী, পিয়দস্সী, সুজাত, এবং সুমেধ, পদুমুত্তর, নারদ, পদুম, অনোমদস্সী, সোভিত, রেবত, এবং সুমন, মঙ্গল, কোণ্ডঞ্ঞ, দীপঙ্কর, শরণঙ্কর, মেধঙ্কর এবং তণ্হঙ্কর! এমনকি তাঁদের পূর্বেও ছিলেন অগণিত বুদ্ধ...। তাঁরা সকলেই বুদ্ধাঙ্কুর সৃষ্টিকারী এই ৭টি গুণের ধারা ব্যাখ্যা করেছেন! সেই সাতটি কী?

১: সচেতনতার চারটি ভিত্তি
২: চারটি সর্বোত্তম প্রচেষ্টা
৩: সাফল্য ও শক্তির চারটি উপায়
৪: পাঁচটি মানসিক ক্ষমতা
৫: পাঁচটি মানসিক শক্তি
৬: জাগরণের ৭টি সংযোগ
৭: আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ

ভবিষ্যতে মৈত্রেয় থেকে শুরু করে সকল বুদ্ধও এগুলো ব্যাখ্যা করবেন!
যারা এই ধর্মবিন্দুগুলো অধ্যয়ন করবে এবং মনোযোগ দেবে, তারা প্রতিটি ধারা সম্পর্কে এমনভাবে শিখবে যা তারা সহজে ভুলবে না। এভাবেই স্থায়ী অগ্রগতি নিশ্চিত হয়! যখন আয়নাটি পালিশ করা হয়, তখন এটি মূল পরম সত্তার একটি সম্পূর্ণ নিখুঁত প্রতিবিম্ব তৈরি করে... সুতরাং: এখানে লেগে থাকুন! কখনো হাল ছাড়বেন না! সকল সংবেদনশীল প্রাণী যেন এর মাধ্যমে চূড়ান্ত শান্তি, পরম বোধি এবং সর্বোচ্চ সুখ লাভ করে জাগ্রত হয়! হ্যাঁ!

পরবর্তী ভবিষ্যৎ বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব অজিত মৈত্রেয়, সাতটি সেট একটি একক অবস্থার চারপাশে ঘোরে: পরম বোধি!

৭টি ধারা..।

 সকল বুদ্ধ কর্তৃক পূর্ণ করা দশটি মানসিক পূর্ণতা!

সুমনপাল ভিক্ষু


একজন জ্ঞানপ্রাপ্ত সত্তার দশটি পূর্ণতা: মহৎ সত্তারা (মহসত্ত্ব = বোধিসত্ত্ব, যারা বুদ্ধত্ব লাভের জন্য নির্ধারিত) সর্বদা সকল জীবের কল্যাণে নিবেদিত থাকেন এবং কারো কোনো কষ্ট সহ্য করেন না, সকল জীবের জন্য তাদের নিজ নিজ সুখের অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে উপভোগ করার কামনা করেন... তাই সকল জীবের মঙ্গলের জন্য তারা বহু কল্প ধরে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অনুশীলন করেন:

১ম পূর্ণতা: কোনো বিশেষ পক্ষ অবলম্বন না করে, তারা সকলের প্রতি নিরপেক্ষভাবে অত্যন্ত উদার (দান) হন, তারা উপহারের যোগ্য কিনা তা বিবেচনা না করেই।

২য় পূর্ণতা: কোনো জীবকে হত্যা, আঘাত বা কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থেকে এবং চুরি, প্রতারণা, মিথ্যা বলা বা ভান করা থেকে বিরত থেকে, তারা নৈতিকতার (শীল) পবিত্রতা অনুশীলন করেন।

৩য় পূর্ণতা: নৈতিকতাকে নিখুঁত করার জন্য, তারা নির্জনবাসে (নেকখম্মা) যান।

৪র্থ পূর্ণতা: জীবের জন্য কী উপকারী এবং কী ক্ষতিকর সে সম্পর্কে পরম নিশ্চিত জ্ঞান অর্জনের জন্য, তারা তাদের বোধশক্তিকে (পঞ্ঞা) বিশুদ্ধ ও সম্পূর্ণ করেন।

৫ম পূর্ণতা: কেবল সকল জীবের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য, তারা সর্বদা তাদের অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ ও উৎসাহী শক্তিকে (বীর্য) জাগ্রত করেন এবং প্রয়োগ করেন।

৬ষ্ঠ পূর্ণতা: তারা ধৈর্য সহকারে এবং সহনশীলতা (ক্ষান্তি) পূর্ণ হয়ে অপমান সহ্য করেন।

৭ম পূর্ণতা: তারা কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না বা অসত্য কথা বলেন না (সচ্চ)।

৮ম পূর্ণতা: অটল সংকল্প (অধিষ্ঠান) নিয়ে তারা সকল সংবেদনশীল প্রাণীর নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য অবিরাম কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন।

৯ম পূর্ণতা: অত্যন্ত কোমল, দয়ালু, হিতৈষী এবং শুভ বন্ধুত্ব (মেত্তা) সহকারে তারা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে সকল প্রকার জীবকে শিক্ষা দেন, পথ দেখান, সেবা করেন এবং রক্ষা করেন।

১০ম পূর্ণতা: তাদের সুষম এবং অবিচল সমতার (উপেক্ষা) মধ্যে তারা বিনিময়ে কিছু আশা করেন না। কোনো জাগতিক কোলাহলও তাদের বিচলিত করতে পারে না...

উৎস: বিশুদ্ধিমগ্গ, ৯ম, ১২৪।

ত্যাগই মুক্তি এনে দেয়!

সুমনপাল ভিক্ষু

বুদ্ধ একবার বলেছিলেন:
ভিক্ষুগণ, আমি তোমাদের ত্যাগের অবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা দেব। অনুগ্রহ করে মনোযোগ দাও। আর হে ভিক্ষুগণ, সবকিছু ত্যাগ করে সবকিছুর উপর জয়লাভ করার অবস্থাটি কী? চোখ, রূপ, দর্শন-চেতনা, চক্ষু-সংযোগ, এবং দেখা থেকে উদ্ভূত যেকোনো অনুভূতি, তা সুখকর, বেদনাদায়ক বা নিরপেক্ষ যাই হোক না কেন, তা ত্যাগ করতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। কান, শব্দ, শ্রবণ-চেতনা, কর্ণ-সংযোগ, শোনা থেকে উদ্ভূত যেকোনো অনুভূতি, তা সুখকর, বেদনাদায়ক বা নিরপেক্ষ যাই হোক না কেন, তা ত্যাগ করতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। নাক, গন্ধ, ঘ্রাণ-চেতনা, নাসিকা-সংযোগ, গন্ধ থেকে উদ্ভূত যেকোনো অনুভূতি, তা সুখকর, বেদনাদায়ক বা নিরপেক্ষ যাই হোক না কেন, তা ত্যাগ করতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। জিহ্বা, যেকোনো স্বাদ, আস্বাদন-চেতনা, জিহ্বা-সংযোগ, এবং জিহ্বা-সংযোগ থেকে উদ্ভূত যেকোনো অনুভূতি, তা সুখকর, বেদনাদায়ক বা নিরপেক্ষ যাই হোক না কেন, তা ত্যাগ করতে হবে। শরীর, স্পর্শ, স্পর্শ-চেতনা, শরীর-সংযোগ, এবং শরীর-সংযোগ থেকে উদ্ভূত যেকোনো অনুভূতি, তা সুখকর, বেদনাদায়ক বা নিরপেক্ষ যাই হোক না কেন, তাও ত্যাগ করতে হবে।
মন, যেকোনো মানসিক অবস্থা ও ঘটনা, মানসিক-চেতনা, মানসিক-সংযোগ, এবং মানসিক-সংযোগকে উৎস করে উদ্ভূত যেকোনো অনুভূতি, তা সুখকর, বেদনাদায়ক বা না-বেদনাদায়ক-না-সুখকর যাই হোক না কেন, তাও অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে! এটিই হলো সমস্ত অনুভূতিকে পেছনে ফেলে সবকিছুর উপর জয়লাভ করার আমূল মুক্ত অবস্থা। যেমন বিশাল মহাসাগরের একটিই স্বাদ, লবণের স্বাদ, তেমনই এই ধর্ম ও শৃঙ্খলারও একটিই স্বাদ;
মুক্তির স্বাদ।

মধুর, নির্জন এবং শান্তিময় হলো অরণ্যানন্দ।

সুমনপাল ভিক্ষু

বনবাসী (অরণ্যবাসী) ভিক্ষু বনের অভিজ্ঞতার প্রতি গভীর মনোযোগ দেন। এর মাধ্যমে তিনি সমাধির আরও গভীর, অথচ অনধিগম্য স্তরে প্রবেশ করেন। এভাবে নির্জনে বাস করার ফলে তিনি কোনো তুচ্ছ অনুপযুক্ত ঘটনা দ্বারা বিভ্রান্ত হন না। তিনি সমস্ত উদ্বেগ ও চাপ থেকে মুক্ত থাকেন। এভাবে তিনি জীবনের প্রতি আসক্তিও ত্যাগ করেন! তিনি এই নির্জনতার আনন্দ এবং সেই নীরব মানসিক শান্তির স্বাদ উপভোগ করেন। তিনি নির্জনে ও একাকী বাস করেন। নীরব ও দূরবর্তী বাসস্থান তার হৃদয়কে আনন্দিত করে। যে ভিক্ষু বনে একা বাস করতে পারেন, তিনিও এই মধুর শান্তিময় আনন্দ লাভ করতে পারেন, যার মহিমান্বিত স্বাদ যেকোনো স্বর্গীয় উদ্যানের রাজকীয় আনন্দের চেয়েও ঊর্ধ্বে... এভাবেই বন তার সূক্ষ্ম বনবাসের স্বাচ্ছন্দ্যে স্থির হওয়া যেকোনো জ্ঞানী ব্যক্তিকে আনন্দিত করে।
উৎস: মজ্ঝিম নিকায, ১২১, অঙ্গুত্তর নিকায়, ৩য়, ৪৩৪, বিসুদ্ধিমগ্গ, ১, ৭৩।

একাকী : যে একা বসে থাকে ও বাস করে, এবং একা হাঁটে, সে অরন্যের নীরবতায় পরম আনন্দ খুঁজে পায়..., ধম্মপদ কাহিনী ৩০৫।

এমন একজন : যিনি কেবল তিনটি চীবর পরিধান করেন, যিনি শীর্ণ ও যার শিরাগুলো দৃশ্যমান, যিনি বনে একা ধ্যান করেন, তিনিই একজন পবিত্র ব্যক্তি..., ধম্মপদ কাহিনী ৩৯৫।

চার আর্য সত্য হলো বৌদ্ধধর্মের মূল ভিত্তি:

সুমনপাল ভিক্ষু

১: এটাই দুঃখ! দুঃখ তিন প্রকার:
ক: স্পষ্ট দুঃখ, যা হলো যেকোনো শারীরিক ব্যথা এবং যেকোনো মানসিক কষ্ট।
খ: পরিবর্তনের কারণে দুঃখের মধ্যে আনন্দদায়ক অনুভূতিও অন্তর্ভুক্ত, কারণ এটিও যখন অনিবার্যভাবে পরিবর্তিত হয়, ম্লান হয়ে যায় এবং বিলীন হয়ে যায়, তখন বেশ হতাশাজনক হয়ে ওঠে।
গ: গঠনজনিত দুঃখ হলো সেই সবকিছু যা শর্তাধীন, যেহেতু এই সবকিছুই পরে অনিবার্যভাবে ভেঙে পড়বে। এর মধ্যে এমন যেকোনো বস্তুও অন্তর্ভুক্ত, যা একটি নিরপেক্ষ অনুভূতি তৈরি করে। এই প্রথম আর্য সত্য, যা নির্দেশ করে যে সমস্ত জাগতিক জিনিস চূড়ান্তভাবে দুঃখ, তা সব দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতে হবে...।

২: তৃষ্ণাই দুঃখের কারণ! তৃষ্ণা তিন প্রকার:
ক: রূপ, শব্দ, গন্ধ, স্বাদ, স্পর্শ এবং মানসিক অবস্থার জন্য তৃষ্ণা।
খ: কিছু হওয়ার জন্য তৃষ্ণা। (যেমন: আমি যেন ধনী, আকর্ষণীয়, তরুণ, বিখ্যাত ইত্যাদি হই।)
গ: কিছু না হওয়ার জন্য তৃষ্ণা (যেমন: আমি যেন অসুস্থ, বৃদ্ধ বা মৃত না হই!)
দুঃখের কারণ সম্পর্কিত এই দ্বিতীয় আর্য সত্যকে নির্মূল করতে হবে...।

৩: তাই তৃষ্ণার অনুপস্থিতিই দুঃখের অবসান!
ক: কোনো ইন্দ্রিয় উদ্দীপনা বা কোনো ধরনের সংস্পর্শের জন্য তৃষ্ণা না করা...
খ: ভবিষ্যতে এই বা সেই রূপে কোনো ধরনের পুনর্জন্মের জন্য তৃষ্ণা না করা...
গ: কোনো কিছু না হওয়ার জন্য তৃষ্ণা না করা, বরং অনিবার্যভাবে আসা সমস্ত মন্দকে গ্রহণ করা...। দুঃখের অবসান সম্পর্কিত এই তৃতীয় আর্য সত্যকে অর্জন করতে হবে!

৪: আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই দুঃখ অবসানের পদ্ধতি! সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটানোর জন্য কোন আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গকে বিকশিত করতে হবে?
১: সম্যক দৃষ্টি (sammā-diṭṭhi)
২: সম্যক সংকল্প (sammā-saṅkappa)
৩: সম্যক বাক্য (sammā-vācā)
৪: সম্যক কর্ম (sammā-kammanta)
৫: সম্যক জীবিকা (sammā-ājīva)
৬: সম্যক প্রচেষ্টা (sammā-vāyāma)
৭: সম্যক স্মৃতি (sammā-sati)
৮: সম্যক সমাধি (sammā-samādhi)
দুঃখ অবসানের পথের এই চতুর্থ আর্য সত্যটি বিকশিত করতে হবে!

অল্প ও স্বল্প আনন্দ, কিন্তু দীর্ঘ ক্লেশ!

সুমনপাল ভিক্ষু

চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, শরীর অথবা মনের স্পর্শে প্রাপ্ত আনন্দ, সবকিছুই যখন তাদের সংস্পর্শ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই তাৎক্ষণিকভাবে বিলীন হয়ে যায়! এগুলো সবই: ক্ষুরের ধারে মধুর ফোঁটার মতো: স্বল্প আনন্দ, কিন্তু অনেক পরে ব্যথা! বিদ্যুৎ চমকে দেখা একটি প্রদর্শনীর মতো: ক্ষণিক এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত... পাতলা এবং স্বাদহীন পানীয়ের মতো: অসন্তুষ্ট, হতাশাজনক এবং হতাশাজনক! খাবারের মতো যা ভেতরে পচে যায় বা বিষাক্ত হয়: পরে কষ্ট দেয় এবং অনেক সমস্যা সৃষ্টি করে! টোপযুক্ত হুকের মতো: প্রথমে রসালো, পরে নির্যাতন এবং যন্ত্রণাদায়ক এবং অবশেষে মারাত্মক! ভেতরের কারাগারের মতো: আটকে রাখা, শাস্তি দেওয়া, বন্ধন করা, আসক্তি করা এবং সম্পূর্ণ উন্মাদ করা! শত্রুর গ্রামে ঘুমানোর মতো: বিপজ্জনক, বিপজ্জনক, বিশ্বাসঘাতক এবং ঝুঁকিপূর্ণ! জ্বলন্ত ফাঁপা গাছের মতো: ভেতরে উত্তেজিত, জ্বরে আক্রান্ত, উন্মত্ত এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক! শুকনো নগ্ন খালি হাড়ের শৃঙ্খলের মতো: কোনও পুষ্টি ছাড়াই কোনও ক্ষুধা নিরাময় করে না! অনেক দিন ধরে শুধু লবণাক্ত জল পান করার মতো: তৃষ্ণা আরও বেড়ে যাওয়া এবং পানি শূন্যতা! অনুগ্রহ করে অনুভূতির বিরতি লক্ষ্য করুন, যখনই আপনি অনুভব করবেন এবং এই বিপদটি মনে রাখবেন! এটিই হল ভাঙার প্রাথমিক বাধা, অতিক্রম করার প্রথম বন্যা: ইন্দ্রিয়-আকাঙ্ক্ষা!

বুদ্ধ প্রায়শই উল্লেখ করেছেন:

এই পৃথিবীতে সচেতন থাকাই সুখকর,
সমস্ত ইন্দ্রিয়-আকাঙ্ক্ষাকে জয় করাই সুখকর! উদান, ২, ১।

সংঘের অনন্য গুণাবলী নিয়ে ধ্যান 

সুমনপাল ভিক্ষু

বুদ্ধের আর্য শিষ্যদের এই মহৎ সংঘ সম্প্রদায় নিখুঁতভাবে প্রশিক্ষিত! সঠিক পথে, সত্য পথে, সৎ পথে, সরল পথে প্রশিক্ষিত! তাই এই আট প্রকার ব্যক্তি, এই চার জোড়া আর্য ব্যক্তি, উপহার, নৈবেদ্য, আতিথেয়তা এবং করজোড়ে শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিবাদনের যোগ্য, কারণ বুদ্ধের আর্য শিষ্যদের এই মহৎ সংঘ সম্প্রদায় এই জগতে, এই জগতের জন্য, সম্মান, সমর্থন, শ্রদ্ধা ও সুরক্ষার জন্য এক অতুলনীয় এবং চিরকাল অতুলনীয় পুণ্যক্ষেত্র...।

 বুদ্ধ বলেছেন: যতক্ষণ সে সংঘের এই বিশেষ গুণাবলীকে এভাবে স্মরণ করে, যা 'সৎ পথে প্রবেশকারী' হিসেবে সংজ্ঞায়িত, ততক্ষণ: সেই সময়ে তার মন লোভ দ্বারা আচ্ছন্ন হতে পারে না, বা ঘৃণা দ্বারা আচ্ছন্ন হতে পারে না, বা মোহ দ্বারা আচ্ছন্ন হতে পারে না; এই মহৎ সংঘ দ্বারা অনুপ্রাণিত হলে তার মনে এক অটল সততা বিরাজ করে (অঙ্গুত্তর নিকায, ৩:২৮৬)। যখন একজন ভিক্ষু এই সংঘ স্মরণে নিবেদিত হন, তখন তিনি সংঘের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও বিনীত হন। তিনি বিশ্বাসের পূর্ণতা লাভ করেন! তিনি অনেক সুখ ও আনন্দ লাভ করেন। তিনি ভয় ও আতঙ্ক জয় করেন। তিনি যন্ত্রণা সহ্য করতে সক্ষম হন। তিনি অনুভব করেন যেন তিনি সংঘের উপস্থিতিতেই বাস করছেন। সংঘের বিশেষ গুণাবলী স্মরণে মগ্ন থাকলে তার শরীর সত্যিই উপোসথ গৃহের মতো পূজনীয় হয়ে ওঠে, যেখানে সংঘ মিলিত হয়েছে। তার মন কেবল এই সম্প্রদায়ের বিশেষ গুণাবলী অর্জনের দিকেই ধাবিত হয়। অধিকন্তু: যখন তিনি কোনো লঙ্ঘনের সুযোগের সম্মুখীন হন, তখন তার বিবেক ও লজ্জাবোধ এতটাই স্পষ্ট থাকে যেন তিনি মহৎ সংঘের প্রবীণ স্থবিরদের মুখোমুখি হয়েছেন। এবং যদি তিনি এর চেয়ে উচ্চতর স্তরে পৌঁছাতে না পারেন, তবুও তিনি অন্তত একটি সুখী গন্তব্যের দিকেই ধাবিত হন। বিসুদ্ধি মগ্গ ১:২২১। এখন যখন একজন মানুষ সত্যিই জ্ঞানী, তখন তার অবিরাম কাজ হওয়া উচিত, সংঘের এই স্মরণ, যা এমন শক্তিশালী শক্তিতে আশীর্বাদপুষ্ট! বিসুদ্ধি মগ্গ ১:২১৮।

সম্প্রীতির উদ্ভব: বুদ্ধের আবির্ভাব আনন্দদায়ক। ধর্মের শিক্ষা আনন্দদায়ক। সংঘে শান্তি ও ঐক্য আনন্দদায়ক। তাতে একত্রিতদের সম্প্রীতি আনন্দদায়ক! ধম্মপদ গাথা, ১৯৪, অট্ঠকথা কাহিনী ১৯৪।
ধ্যান-৩। বুদ্ধের প্রকৃত শিষ্যরা সর্বদা জাগ্রত ও সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন। তাঁরা দিনরাত অবিরাম আর্য সংঘের উপর ধ্যান করেন। ধম্মপদ গাথা, ২৯৮, অট্ঠকথা কাহিনী, ২৯৬-৩০১।

 আত্মপ্রেম বনাম নৈর্ব্যক্তিকতার আনন্দ:

সুমনপাল ভিক্ষু


 ‘আমি আছি’ ধারণাটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি মিথ্যা অনুমান। ‘আমার’ ধারণাটি একটি গভীর আকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি মিথ্যা অনুমান। ‘এটিই আমার সত্তা’ ধারণাটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি মিথ্যা অনুমান।

অভ্যন্তরে বিদ্যমান, অদৃশ্য অথচ স্থিতিশীল, একই এবং স্বাধীন একটি সত্তার মানসিক নির্মিত ধারণা, যা ব্যক্তিকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার উপর কর্তৃত্ব করে, তা আত্মগুরুত্বের একটি স্ফীত মিথ্যা অভিজ্ঞতার মধ্যে নিহিত! এই মনগড়া ‘অহং’ একটি কাল্পনিক ‘সত্তা’কে ধারণ করে দ্রুত নিজের প্রেমে গভীরভাবে এবং মর্মান্তিকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে... এই ‘আত্ম-প্রেম’, যদিও এটি নিছক একটি কাল্পনিক ধারণা, তবুও এটি অবিরাম তৃপ্তি, প্রশংসা এবং সম্মান দাবি করে, এবং তাই তার অনুমিত অনন্য, অথচ কাল্পনিক মহিমার বিরুদ্ধে যেকোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ হুমকির প্রতি সহিংসভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়! তাই সমস্ত অহংকারের মূল শুরু হয় ঠিক তখনই যখন ‘আমি-আমার-নিজেকে-আমার পরিচয়-আমার ব্যক্তিত্ব’ এই ধারণাগত ধারণাটি তৈরি করা হয়... এর প্রভাবগুলো ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে, স্থানীয়ভাবে এবং বিশ্বব্যাপী, এখানে এবং এখন, পরে এবং অনেক পরবর্তী জীবনে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যয়কর বলে সুপরিচিত... সুতরাং একটি অহং-এর অনুমিত অস্তিত্ব যেকোনো জগতের যেকোনো সত্তার জন্য সবচেয়ে বড় অদৃশ্য বাধা এবং সবচেয়ে খারাপভাবে ঢাকা বিপর্যয়, তা সে ঐশ্বরিক বা মানব হোক, উচ্চ বা নিম্ন হোক, অতীত, বর্তমান বা যেকোনো সুদূর ভবিষ্যতেরই হোক না কেন... মূলত এই ‘আমি’-বিশ্বাসটি এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে গঠিত যে, হয় শরীর, অনুভূতি, উপলব্ধি, মানসিক গঠন, অথবা চেতনা নিজেই একটি অদৃশ্য এবং পর্যবেক্ষণ-অযোগ্য ‘সত্তা’-এর একটি ‘মূর্ত রূপ’... এই ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ অহং সত্তাকে তখন মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উন্নীত করা হয়... তবে, এই আত্ম-প্রতিচ্ছবিটি কেবল শারীরিক রূপ, সামাজিক অবস্থান, পেশাগত কাজ এবং তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত’ সম্পত্তির সাথে সাধারণ শনাক্তকরণ এবং সেগুলোর প্রতি আসক্তির একটি প্রকাশ, যা সবই ক্ষণস্থায়ী...। এটি একটি অত্যন্ত বিশ্বাসঘাতক, বিপজ্জনক, হাস্যকর এবং মর্মান্তিক অহং-প্রক্ষেপণ...।
সর্বদা এমন একটি ‘অহং-আমি-সত্তা’-কে তৃপ্ত করা যা আসলে অস্তিত্বহীন! প্রাথমিক আত্ম-প্রতারণা হলো "আমি আছি..."। তারপর আসে এই ধারণা "আমি এটা এবং/অথবা সেটা..."। অবশেষে যোগ করা হয় "আমি এর চেয়ে ভালো, খারাপ, বা সমান!" তবুও এই "আমি", যাকে এটা বা ওটা বলে ধরে নেওয়া হয়, তার কোনো অস্তিত্ব নেই...। নিঃস্বার্থপরতা বনাম অতিস্ফীত "আমি শ্রেষ্ঠ" অহংবাদ!

 বুদ্ধ বলেছেন: সবদিক থেকে, উপরে যেমন নিচেও, মুক্ত ও বিমুক্ত হয়ে, ‘আমি এটা বা ওটা’ এই ধারণার ঊর্ধ্বে উঠে, একজন তখন এমন একটি নদী পার হন যা আগে কখনও পার হওয়া হয়নি...এভাবে মুক্ত হয়ে, সে সত্তার কোনো চক্রাকার প্রক্রিয়াকে নতুন করে শুরু করে না। উদান – অনুপ্রেরণা: ৭ - ১।

একাকীত্ব তার জন্য আনন্দদায়ক যে সন্তুষ্ট, জ্ঞানী এবং যিনি ধর্মকে দেখেন। আরও আনন্দদায়ক হলো কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই সমস্ত প্রাণীর প্রতি অহিংসা। আরও বেশি আনন্দদায়ক হলো সমস্ত প্রকার ইন্দ্রিয়গত কামনা থেকে মুক্তি...কিন্তু, পরম আনন্দ হলো এই অতলস্পর্শী অহংকার ‘আমি আছি’-এর বিলুপ্তি!
উদান – অনুপ্রেরশন: ২ – ১
সব্বে ধম্ম অনত্তা - সমস্ত অবস্থা আত্মাহীন...।

অহং একটি অবাস্তব জগতে একা, যা লুকানো মিথ্যা অনুমান দ্বারা খণ্ডিত।
অনাত্মা (অনত্তা) বোঝার সর্বোত্তম উপায় হলো অনিত্যতা (অনিচ্চা) এবং দুঃখ (দুঃখ) পর্যবেক্ষণ ও প্রতিফলনের মাধ্যমে শুরু করা। তারপর অবশেষে একজন বুঝতে পারে: যা সর্বদা অন্যরকম এবং কখনও একরকম নয়, কখনও অভিন্ন নয়, তা কখনও কোনো পরিচয়, কোনো আত্মা হতে পারে না...
যা কিছু চূড়ান্তভাবে সর্বদা দুঃখ, তা কোনো আত্মার নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে না, কারণ যদি তা থাকত, তবে সেই আত্মা এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এটিকে আনন্দদায়ক ও সুখী কিছুতে পরিবর্তন করত। কিন্তু কোনো আত্মা তা করতে পারে না, কারণ এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই...যদি কোনো আত্মা এমনকি নিজেরও নিয়ন্ত্রণে না থাকে (সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত), তবে তা একটি প্রকৃত আত্মা হতে পারে না, বরং তা কেবল এমন কিছু পরিস্থিতি যা তাদের কারণ ও ফলাফল অনুযায়ী কাজ করে...
যেকোনো আত্ম-পরিচয় মিথ্যা...।

মহিমান্বিত হলো পুণ্য, যা সঠিক সময়ে সুসম্পন্ন হয়!

সুমনপাল ভিক্ষু

 বুদ্ধ ভালো কাজ করা সম্পর্কে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : এখানে এবং এখন পুণ্যকারী সর্বদা আনন্দিত হন... এমনকি মৃত্যুর পর এবং পুনর্ভবের পরেও, পুণ্যকারী কেবল আনন্দ ও সন্তুষ্টিই লাভ করেন...। সুতরাং এখানে এবং সেখানে উভয় স্থানেই জ্ঞানী ব্যক্তিরা সুসম্পন্ন পুণ্যের মাধ্যমে তাদের পূর্ববর্তী সৎকর্মের পবিত্রতা উপভোগ করেন। ধম্মপদ চিত্রণ ১৬ প্রেক্ষাপট কাহিনী ১৬।
মূল্যবান সম্ভাবনা : ঠিক যেমন একটি বড় ফুলের তোড়া থেকে অনেক রকমের তোড়া তৈরি করা যায়, তেমনি মানুষের মধ্যে যেকোনো মরণশীল ব্যক্তি বিভিন্ন সৎকর্ম করে অনেক ধরনের পুণ্য অর্জন করতে পারে। ধম্মপদ চিত্রণ ৫৩ প্রেক্ষাপট কাহিনী ৫৩।
সম্মানীয় যারা সম্মানের যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মান করেন : অর্থাৎ বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্যদের; যারা বাধাহীন, শোকমুক্ত এবং নির্ভীক, নির্বাণ লাভকারী; এমন যোগ্য ও সঠিক নির্দেশিত সম্মান থেকে অর্জিত পুণ্য কেউ অনুমান করতে পারে না...।
ধম্মপদ চিত্রণ ১৯৫-১৯৬ প্রেক্ষাপট কাহিনী ১৯৫+১৯৬।
পুণ্য মহিমান্বিত!

ক্রোধ, বিরক্তি এবং একগুঁয়ে বিরোধিতা!

সুমনপাল ভিক্ষু

অশুভ ও বিদ্বেষ হলো মানসিক বাধা, যা বিভিন্ন ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে এবং বিরোধিতা করে। ঝগড়া, সংঘাত, ঘৃণা, শত্রুতা এবং যুদ্ধের রূপে প্রকাশ পেলে এটি বেশ হিংস্র হতে পারে। বিদ্বেষ তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত সম্প্রীতি ও শান্তি নষ্ট করে দেয় এবং এর ফলে সুখের যেকোনো সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। চারটি অসীম দিব্য অবস্থার (চার ব্রহ্মবিহার) উপর ধ্যানের মাধ্যমেই এর নিরাময় সম্ভব।
প্রথম অগ্রাধিকার: অশুভ বিদ্বেষের উত্থানকে লক্ষ্য করাই—স্বয়ংক্রিয়ভাবে—তাকে বিলীন করে দেয় :
বুদ্ধ বলেছেন: যখন তার মধ্যে বিদ্বেষ উপস্থিত থাকে, তখন সে বোঝে:
"এখন আমার মধ্যে বিদ্বেষ আছে" এবং যখন বিদ্বেষ অনুপস্থিত থাকে, তখনও সে লক্ষ্য করে:
"এখন আমার মধ্যে কোনো বিদ্বেষ নেই"। সে বোঝে কীভাবে অনুৎপন্ন বিদ্বেষের উৎপত্তি হয়।
সে বোঝে কীভাবে যেকোনো উৎপন্ন বিদ্বেষকে পরিত্যাগ করতে হয়, এবং সে বোঝে কীভাবে পরিত্যক্ত বিদ্বেষ ভবিষ্যতে আর কখনও পুনরায় উৎপন্ন হতে পারে না। মধ্যম নিকায ১০।

কোন পুষ্টিদায়ক কারণ বিদ্বেষের জন্ম দেয়?
যেকোনো বস্তুর মধ্যে অপ্রীতিকর এবং বিরক্তিকর বৈশিষ্ট্য ও দিক থাকে, সেগুলিতে প্রায়শই অযৌক্তিক ও অবিবেচকের মতো মনোযোগ দেওয়াই হলো অনুৎপন্ন বিদ্বেষের উৎপত্তির পুষ্টিদায়ক কারণ, এবং ইতিমধ্যেই উৎপন্ন বিদ্বেষের বৃদ্ধি ও বিস্তারেরও পুষ্টিদায়ক কারণ। সংযুক্ত নিকায, ৪৬:৫১।

৩টি সন্দেহপ্রবণ চিন্তা যা ক্ষোভ ও ক্রোধকে প্ররোচিত করে:
১: সে আমাকে অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতি করেছে, করছে বা করবে!
২: সে আমার পছন্দের মানুষদের অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতি করেছে, করছে বা করবে!
৩: সে আমার অপছন্দের মানুষদের অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কোনো উপকার করেছে, করছে বা করবে!
কোন অনাহারী কারণ বিদ্বেষকে বিলুপ্ত করে?
সর্বজনীন সদিচ্ছা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে মনের মুক্তি লাভ করা যায়, প্রায়শই এতে যৌক্তিক ও বিচক্ষণ মনোযোগ দেওয়াই হলো অনুৎপন্ন বিদ্বেষের অনুৎপত্তির অনাহারী কারণ, এবং ইতিমধ্যেই উৎপন্ন যেকোনো বিদ্বেষের হ্রাস ও সংকুচিত হওয়ার অনাহারী কারণ। সংযুক্ত নিকায, ৪৬:৫১, কোন ওষুধ বিদ্বেষকে নিরাময় করে, যাতে এটি আর কখনও পুনরায় উৎপন্ন না হয়? সর্বজনীন বন্ধুত্বের (মেত্তা) উপর ধ্যান অনুশীলন করা উচিত! সর্বজনীন মৈত্রীর ধ্যানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমস্ত বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়। সকলের প্রতি করুণার ধ্যান অনুশীলন করা উচিত! সর্বব্যাপী করুণার ধ্যান নিষ্ঠুর ও তীব্র ক্ষতিকর সহিংসতাকে বিলীন করে দেয়। সহানুভূতিপূর্ণ পারস্পরিক আনন্দের ধ্যান অনুশীলন করা উচিত! পারস্পরিক আনন্দের ধ্যান অসন্তোষ, সমস্ত ঈর্ষা ও হিংসা দূর করে দেয়। স্থির সমতার ধ্যান অনুশীলন করা উচিত! অবিচল সমতার ধ্যান ক্রোধ ও বিদ্বেষকে শান্ত করতে পারে। মধ্যম নিকায: ৬২।
ফিরে আসার জন্য কিছু উপকারী ভাবনা: করাতের উপমাটি মনে রাখুন... পরম বুদ্ধ একবার বলেছিলেন: ভিক্ষুগণ, যদি দস্যুরাও তোমাদেরকে একটি দুই-হাতের করাত দিয়ে নির্মমভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলে, তবুও তোমরা তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হবে না, বরং আমার আদেশ পালন করবে: তাদের প্রতি এমন এক বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা দিয়ে পরিব্যাপ্ত থাকবে যা কেবল সর্বব্যাপী সদিচ্ছা, দয়া, সমৃদ্ধি, প্রসারতা এবং অপরিমেয়তায় পরিপূর্ণ। শত্রুতা থেকে মুক্ত, বিদ্বেষ থেকে মুক্ত। এই করাতের উপমাটি সর্বদা স্মরণ করাই হলো তোমাদের নিজেদেরকে প্রশিক্ষিত করার উপায়... মধ্যম নিকায: ২১, ক্রোধের মালিক হওয়াটা বেদনাদায়ক: জেনে রাখো যে প্রত্যেকেই তাদের সমস্ত কর্মের (কর্ম) পরিণতির মালিক, তা ভালো হোক বা মন্দ...
সর্বজনীন মৈত্রী (মেত্তা) অনুশীলনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ১১টি সুবিধা:
১: মানুষ সুখে ঘুমায়!
২: মানুষ সুখে ঘুম থেকে ওঠে!
৩: মানুষ কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখে না!
৪: মানুষ সমস্ত মানুষের কাছে প্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র হয়!
৫: মানুষ সমস্ত অ-মানুষ প্রাণীদের কাছেও প্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র হয়!
৬: মানুষ ঐশ্বরিক দেবতাদের দ্বারা সুরক্ষিত ও রক্ষিত হয়!
৭: মানুষ আগুন, বিষ বা অস্ত্রের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না!
৮: মানুষ দ্রুত সমাধির একাগ্রতা লাভ করে!
৯: মানুষের চেহারা শান্ত, স্থির ও সৌম্য হয়!
১০: মানুষ কোনো বিভ্রান্তি, হতবুদ্ধি বা আতঙ্ক ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে!
১১: যদি এর চেয়ে উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো না যায়, তবে আনাপান বায়ু স্তিমিত হওয়ার পর ধম্মলোকে পুনর্জন্ম হয়! অঙ্গুত্তর নিকায়, ভি , ৩৪২।
ঘৃণার (দোষ) লঘু রূপ হিসেবে ক্রোধ, বিরক্তি ও একগুঁয়েমি সম্পর্কে আরও:
ক্রোধ দমন, ক্রোধের অবসান, ক্রোধ ও বিরক্তি, নিষ্ঠুরতা ও প্রতিশোধপরায়ণতা নিরাময়ের উপায়, প্রতিশোধ নয়, ক্রোধ পরিহার ক্রোধ ও বিরক্তি নিরাময়ের উপায়, ক্রোধ প্রশমন, বিরক্তি দমন, বিদ্বেষ নিরাময়ের উপায় সমস্ত ক্রোধ উপশম...।