Sunday, July 20, 2014

জাতকে সামাজিক চেতনা

                                                                            শুভাশিস বড়ুয়া 

‘জাতকে’ – পালি “ত্রিপিটকে’র” সুত্ত পিটকের অন্তর্গত ‘ক্ষুদ্দকনিকায়ের’ দশম গ্রন্থ। ‘জাতক’- মূলত একটি কথাসাহিত্য। এতে বৌদ্ধ পরম্পরানুসারে বুদ্ধের পূর্ব জন্মের ঘটনাবলী আলোচিত হয়েছে। জাতক মূলত গাথায় রচিত। পরবর্তীকালে এই জাতক গদ্যাকারে রচিত হয়েছে। যে কোন সাহিত্য উদ্দেশ্যহীন ভাবে রচিত হয় না এবং সাহিত্য রচনার সেই প্রচেষ্টাও কখনোই ব্যর্থ হয় না। এই সাহিত্য সৃষ্টির পশ্চাতে যেমন সেই যুগের প্রক্ষাপট এক মহান ভূমিকা রূপে কাজ করে; তেমনি অন্যদিকে সাহিত্যিক তথা লেখকদের সমাজের প্রতি যে কর্তব্য তারও প্রকাশ ঘটে এই সাহিত্য রচনারই মধ্য দিয়ে।

সাহিত্যের ভিত্তি ভূমি মূলত জীবনের পটভূমিকায় তৈরী হয়। সাহিত্য যেহেতু সমাজের দর্পণ, সেহেতু সাহিত্যিক যখন সাহিত্য রচনায় ব্রতী হন তখন তিনি তাঁর জীবন অভিজ্ঞতার সাথে সমাজ-জীবনের চিত্রকে মিশিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেন। অতএব সাহিত্যকে মর্মস্পর্শি হতে গেলে যা অপরিহার্য তা হল মানুষ এবং সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা; তাঁর সামাজিক চেতনার প্রখরতা, এবং বহমান সমাজের প্রতি সে উন্মুখ সমাজের জন্যই সে সমর্পিত। জাতকের জীবনস্পর্শি স্বরূপকে উদ্‌ঘাটিত করার উদ্দেশ্য সামাজিক চেতনার প্রখরতা সকলের সামনে উন্মোচন করা। 

          উপরে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কোন মহান সাহিত্যের সৃজন উদ্দেশ্য বিহীন হয় না। জাতকের রচনাও উদ্দেশ্য বিহীন নয়; বরং ঐ রচনার পটভূমিতে সমাজের প্রতি এক মহান দায়িত্ব ও ভাবনার প্রভাব রয়েছে। সে ভাবনার দুটি মূল উদ্দেশ্য হল- এক. সেই সময়কার মানবীয় এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলাকে মানব সমাজে সুপরিচিত করানো। এই বিশৃঙ্খলা থেকে সচেতন করা। দুই. তথাগত বুদ্ধের বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পূর্বে তাঁর পূর্ব জন্মের বৃত্তান্ত এবং তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীর দ্বারা মানবজীবন ও সমাজের কার্যনীতি নির্ধারণ করা। এই সমস্ত কার্যাবলী সম্পাদন করার জন্য মানুষকে সামাজিক ভাবে উৎসাহিত করা।

জাতক চেতনার মূলকেন্দ্রঃ মানব এবং সমাজঃ-  

           জাতকের রচনা কবে হয়েছিল তা নিয়ে বিদ্বৎজনদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এর চেতনার মূলে যে সমাজ তা খ্রীষ্ট পূর্ব পঞ্চম বা ষষ্ঠম শতাব্দীকালীন সমাজ, সেই সমাজ নিজের বিচার বুদ্ধির বিবৃতির কারণে মৌখিক ভাষায় আকন্ঠ ডুবে থাকতো এবং আত্ম-বিস্মৃত হওয়ার জন্য তার থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ দেখতো না। বস্তুত লালসা এবং ভোগবাদের পর্দা দিয়ে নিজেদের চোখ বাঁধা থাকতো। যেমন অন্ধ মানুষ বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য অন্যের উপর নির্ভর করে থাকে, তেমনি এরা আরও পাপের গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে যেত; ‘নিশ্চয়ত’- জাতক কথায় বলা হয়েছে যে, মানুষের এই চিত্র রচনা কোন রচনাকারীর কল্পনা প্রসূত নয়, বরং এর পশ্চাতে তৎকালীন সমাজেরও প্রভাব রয়েছে। পরিস্থিতির প্রভাব সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। মানুষের বিবৃতি ও সমাজ বিশৃঙ্খলাকেই এ গ্রন্থ গভীর ভাবে ভাবায়।

          জাতক গ্রন্থে তৎকালীন সমাজের ... পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া যায়। বস্তুত পাশ্চাত্যকালীন সমাজের মানুষের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। সতন্ত্রতা, মানবিকতা, ভয়, মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস এবং ঈর্ষা ও সংঘর্ষের বীজ এই বিকল্পনীয় চেতনার মধ্যে মানুষ আবদ্ধ থাকতো। ফল স্বরূপ নিজের অস্তিত্বকে বিস্মৃত হয়ে সুস্থ ভাবে বাঁচার পরিবর্তে যুদ্ধ, কলহ, ও সন্ত্রাসের জীবন বেছে নিয়েছিল। সেখানে স্বার্থ, লিপ্সা ও বিশ্বাসঘাতকতা এত বেশী জটিলতা সৃষ্টি করেছিল যে চারিত্রিক পরিস্থিতির দৃষ্টিকোন থেকে এ দশা পশুদের থেকেও ঘৃণ্যতম হয়ে পড়েছিল। “সচ্চকির জাতক”- বিশ্বাসঘাতক রাজকুমার এই সমস্ত মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করতো। যে ঘোর বিপত্তির সময় সামনে উপস্থিত নিজের উপকারী তপস্বীকেও নিজের ইছার আগুনে দগ্ধ করতেও পিছুপা হত না। যখন ঐ বিপদের সময় সঙ্গে থাকা অন্যান্য প্রহরীরাও নিজেদের উপকারীর উপকার শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতো। ফল সরূপ মানুষের ইচ্ছায় উপকারী তপস্বীর দ্বারা এই সত্য ঘোষিত হয়েছিল যে –
“সচ্চং কিরেক্মাহংসু নরা একচ্চিয়া ইধ।
কটঠং বিপ্লবিতং সেয়্‌য়ো নত্ববেকোচ্চিয়েন নরো”।।
গরহিত জাতক এই সমস্ত মানুষের কলহ ও সংগ্রাম পূর্ণ জীবনের স্বার্থক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যেখানে বাঁদেরর মুখে বর্ণনাকরে জাতক রচনা-সার মানব জীবনকে পশুর চেয়েও হীনরূপে দেখিয়ে তার যথার্থরূপ প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন। জাতকে যেখানে মানব জীবন ঈশ্বর বা প্রকৃতির দান বলে বর্ণনা করা হয়নি বরং মানুষই সর্বেসর্বা। সমাজের রচনা স্বয়ং মানুষের দ্বারাই হয়। তৎকালীন সমাজের অধীন মানুষ স্বয়ং নিজের দ্বারা এই সামাজিক ও আর্থিক ও ধর্মীয় বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেছিল। যেখানে স্বয়ং আপন সৃষ্টি কর্তাকে নিজের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছে। জাতক কথাকে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে জানা যায় যে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত বিস্ফোরক ছিল। এই বিশৃঙ্খল অবস্থা সমাজের সর্বত্র ব্যপ্ত হয়েছিল। সমাজে জাতপাত ও বর্ণ বিদ্বেষ যত বাড়ছিল; মানবতা বোধ ততই ক্ষুন্ন হচ্ছিল। রাজতন্ত্রের কালো ছায়ায় সমস্ত সমাজ আচ্ছাদিত ছিল। রাজনৈতিক, আর্থিক উৎপীড়ন ও তার সঙ্গে আত্মমর্যাদা বোধের প্রভাবের বীজ সামান্য মানুষ রূপে হীন ভাবনায় বেঁচে ছিল। ধর্মের নামে নিরর্থক কর্মকান্ড, নৈতিকতার নামে মূর্খতা এবং বিশ্বাসের প্রচলন তথা সুসংগত সামাজিক বিধানের স্থান বর্জন ও নিয়ন্ত্রণ জাতক কালীন সমাজের ত্রাস ছিল। লোকের চিন্তন-চেতনা-ভাবনা এতটাই বিকার গ্রস্থ এবং দূষিত হয়ে গিয়েছিল যে তাদের ভিতরে বিচার্য উদারতার স্থানে সংকীর্ণতা এবং অনুদারতা ভাব নিজেদের মধ্যে পোষণ করত। জাতি ভেদ শ্রেণী ভেদ তথা জন্ম গ্রহণের উপরেও স্পৃশ্য-অস্পৃশ্যের দূষিত ভাবনা সমাজের একতা ভাব দ্বিখন্ডিত করে দিয়েছিল। অবশ্য পরিণতিতে সহস্র জাতি এবং উপজাতিদের সংকীর্ণতা বোধ সমাজকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার দিকে অগ্রসর করেছিল। সমাজে জন্মের কারণে বর্ণের অধীন মানুষদের উপর শ্রেণী জাত বিভাজনের প্রভাব পড়ত। যেখানে ক্ষত্রিয় কুলে জন্ম নেওয়া মানুষদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলে স্বীকৃতি দেওয়া হত। ব্রাক্ষ্মণদের স্থানও অনেক উপরে ছিল। ব্রাক্ষ্মণ কুলে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি ব্রাক্ষ্মণের আধিপত্য বজায় রাখত অথবা রাখত না। যদি সে মূঢ় হত তবে সে লোভের দ্বারা পরিচালিত হয়ে অথবা নিজের জীবিকার জন্য অত্যন্ত নিচ কাজ করার থেকেও পিছুপা হতনা। তখন কেবল মাত্র ব্রাক্ষ্মণ কুলে জন্ম নেওয়ার জন্য সে বহু আদর ও শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে পরিচিত হত। উল্লেখ করা যায় যে, এই বর্ণ এবং শ্রেণী গত বিভেদ তৎকালীন সমাজে শুধুমাত্র প্রভাবিত ছিল। সমাজে শূদ্র অথবা দলিত কুলে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের স্থান অত্যন্ত নীচে ছিল। ‘দীন জাতি’ সম্বোধনে সম্বোধিত এই দলিত বর্গ অসীম অত্যাচার সহ্য করত, দলিতদের অত্যন্ত ঘৃনিত কাজ করতে হত। এদের না ছিল কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠা, না দেওয়া হত কোন সামাজিক স্বীকৃতি। উচ্চ বর্ণিয় জাতিদের এদের সঙ্গে খাওয়া-দেওয়া, ওঠা-বসা, স্পর্শ করা নিষিদ্ধ ছিল। সংভূত জাতক তথা মাতঙ্গ জাতক দলিত শূদ্র এবং চন্ডালদের শোচনীয়, মর্মস্পর্শী চিত্র বর্ণিত হয়েছে। পুনরায় সমাজে প্রতিষ্ঠা নিয়ে বর্ণের মধ্যে কেবল শ্রেষ্ঠ এবং হীন এই ভেদ ছিল না বরং পুরুষ এবং নারীর ভেদাভেদ অত্যন্ত প্রবল ছিল। জাতক কথায় সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। যেখানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য নারীদের সব সময় হেয়্য দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা ছিল। এই সমাজে নারীকে শারীরিক ভোগ এবং সাময়িক উপভোগের বস্তু হিসেবে দেখা হত। নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে বজায় রাখার জন্য পুরুষ প্রধান সমাজে নারীদের বিশ্বাসঘাতক, অবিশ্বাসী এবং ধূর্ত রূপে প্রতিপন্ন করার জন্য সবসময় চেষ্টা করত। যাদের অশান্ত মন, তর্ক এবং দুর্জন প্রবৃত্তর কথা বিভিন্ন জাতকে পাওয়া যায়। কুণাল জাতক নারীর প্রতি পুরুষদের হেয়্য দৃষ্টির তীব্রতা প্রদর্শন করানোর জন্য নিম্ন বর্ণিত লোক জাতির উদাহরণ পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট রূপে প্রতীয়মান হয় যে, জাতকে বৌদ্ধ ধর্মের আলোকে দেখা যাচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মে মানবতাবাদী চেতনার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। উপরের বিবেচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে জাতক কালীন সমাজ অঘটনের পথে সঞ্চারিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে সক্রান্তি কালীন মূল্য বিস্ময়কতা এবং এই সময় মানবতার সংরক্ষণ তথা এর পরম্পরা.. মূল্য স্থাপন কেবলমাত্র উপেক্ষিতই ছিল না বরং অনিবার্য ছিল। মানুষের সতন্ত্রতা ও বিবেকপূর্ণ সহযোগিতার জ্ঞান দেওয়া অনিবার্য ভাবে প্রকাশিত ছিল। এর থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় যে – এই বোধ শক্তির মধ্যেই মানব অস্তিত্বের বাস্তবতা নিহিত ছিল। প্রসঙ্গত, স্মরণীয় সতন্ত্রতা ও বিবেকপূর্ণ সহযোগ ঐক্যমত স্থাপনে সাহায্য করে। যে ঐক্য সৎ, যার অস্তিত্ব আছে, এই অস্তিত্বের উদ্দেশ্য জাতক চেতনার অন্তর্গত মানব এবং সমাজের মানবতাবাদী আদর্শ নিরোপিত হয়েছে।


মানব আদর্শঃ- নিজের ও সকলের মুক্তিঃ-

      নিজের ও সকলের সমৃদ্ধি মানুষের আদর্শ জাতকের সামাজিক চেতনার মূল উৎস। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ ধর্মের মূল চেতনার সম্প্রসারনে জাতকে মানুষের আদর্শের প্রাপ্তিতে “ব্যক্তি নিজের এবং তার আত্মনিষ্ঠতা”কে অতিক্রম করন কখনই স্বীকৃত হয়নি। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে কি নিজের প্রতি সঠিক “দৃষ্টি” সংবরণ করা উচিত। আরও জানা যায় যে, আত্মনিষ্ঠতা এক আন্তরিক অবস্থান এবং এক সচেতন আন্তরিক জীবন, যা মানুষের জীনের ভিন্ন পরিস্থিতির উপর বিচার-বিশ্লেষণ করে তাকে বিবেচনার পথে নিয়ে যায়, সাথে সাথে এই বিচারের আধারের উপর জীবনের নানা বিধ ক্রিয়াবিধি রূপান্তরিত করার পথও দেখায়। যা আত্মনিষ্ঠ মানবতার ‘স্ব’ (নিজের) চিন্তন পথে নিয়ে যায়। নিশ্চয়তঃ জাতকে এই ‘স্ব’ নিজের বিষয়টি মহত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু জাতকে ‘স্ব’ বলতে কিছুই নেই। ‘স্ব’ যখন ‘মোহ’ এর রূপ গ্রহণ করে নেয় তখন সেই পরিস্থিতে সকল মানব জাতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে পড়ে। এই মোহের গহ্বরে অহংকার আছে আর সেই অহংকারের ‘অস্তিত্ব’ ও ‘ব্যক্তি’র মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়। এই অহংকারের কারণে ব্যক্তি নিজের ‘স্ব’ সব কিছু মেনে নিয়ে আপনার ‘অস্তিত্ব’কে ভুলন্ঠিত করে ফেলে। জাতকের মূল চরিত্র বোধিসত্ত্বের আবির্ভাব মানুষের নিজের অস্তিত্বকে এই বিশালতার অভিজ্ঞান প্রদান করার উদ্দেশ্যেই রচিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে জাতক দ্বারা মানুষের সভ্যতার অভিজ্ঞতা প্রদান করা হয়েছে। যে অহংকারের মোহ ক্ষণিক কাল। অহং’এর কারণে যদি কোন মোহ গ্রস্থ ব্যক্তির চেতনা নিমজ্জিত হয় তথাপি যা সত্য তা হল এর নিরর্থকতাকে চিনে অহংকার বিসর্জন দেওয়াই চরম সত্য, জাতক থেকে বোঝা যায় যে এই চেনার ও যা চেনা হয়ে যায় তার ‘অহং’ এর নিরর্থকতার ‘স্ব’ বিলুপ্ত হয়, আর তখন ‘স্ব’ সমগ্র এর সাথে জুড়ে যায়। নিজের ও সকলের সাথে যার যোগাযোগ অস্তিত্বের বিশালতার কারনেই সম্ভব হয়, এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তি জগতের ‘নশ্বরতার’ অন্তর্নিহিত বিরাট চেতনার দর্শণ ও এর ‘নিপ্রয়াস প্রজ্ঞা’ প্রাপ্ত হয়। জাতক দৃষ্টিতে বোধিসত্ত্ব এবং পরবর্তীকালে বুদ্ধের চেতনায় এই হল নিঃশ্রেয়স প্রজ্ঞা।
         উপরের আলোচনা হতে স্পষ্ট হয় যে, জাতক দৃষ্টিতে ‘স্ব’ বোধ মানুষের শ্রেষ্ঠতম লক্ষণ। একে বিশৃঙ্খলিত করা যায় না, আবশ্যকতা যদিও আছে তবু এর বিকাশ উন্নত করা একান্ত জরুরী। যে কারণে নিজের কথার মূল নায়ক বোধিসত্ত্ব নিজের পরিকল্পনামত জাতকে মানুষের ‘স্ব’ সংরক্ষিত রাখার জন্য এর পরমার্থ মূলক আদর্শ অনুসরণ করা হয়। বোধিসত্ত্বে সকল মানুষের প্রতি উপদেশ হল ‘ব্যক্তি সুখ’ নয় বরং ‘সামাজিক সুখ’। যেখানে সামাজিক সুখ কল্যাণময়ী অর্থের পরিচায়ক। এর মধ্যে জাতক কথার সেবা, প্রেম, ত্যাগ, উদারতা প্রভৃতি পরার্থ মূলক আদর্শের অনুসারী হয়। কেননা জাতক দৃষ্টিতে যে পরমার্থ মূলক আদর্শ মানবের আত্মচেতনার উত্থানে বিশেষ সহায়ক, যার সাথে সকলের পরম একাত্মতার পথে নিয়ে যায়, যখন মানুষ নিজেকে বিস্মৃত করে তখন এই বোধ হয় যে বর্তমানে পতিত হওয়ার চেয়ে কোথাও অধিক বিশাল কিছু আছে। তখন তার নৈতিক চেতনার জ্ঞান প্রাপ্ত হয়। তখন আপন অস্তিত্বের মর্ম বুঝতে পারে, স্বভাবতই তার বোধ শক্তির পরিবর্তন হয় এবং তার কামনার পরিবর্তন হয়। এবং তখন সে কেবল মাত্র নিজের জন্য বাঁচে না বরং তখন তার জীবন সকল মানুষের মুক্তির জন্য সমর্পিত হয়। তখন তার জীবনের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কেননা তখন ‘সুখ’ ও ‘কল্যাণের’ সাথে এই ভেদাভেদের জ্ঞান প্রাপ্ত হয় যে কল্যাণময় জীবন সকলের প্রাপ্ত হওয়া উচিত। সুখের সঙ্গে মানুষের তখনই সম্পর্ক স্থাপিত হয় যখন কল্যানের সঙ্গে তার সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। জাতক কথার মূল নায়ক বোধিসত্ত্ব এই মানব আদর্শের সাক্ষাৎ এক মূর্তি। বোধিসত্ত্বের স্বয়ং .... হলেন যা নিজের নির্বাণ গতিকে স্থাগিত করে নেয় যতক্ষন না মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হতে না চায়। ততক্ষণ সকল জীবের নির্বাণের প্রতি অভিমুখ না হয়। তার পূর্ব জ্ঞান তথা প্রজ্ঞা পাওয়ার জন্য তাঁকে অনেক জন্ম এই জন্য নিতে হয় যে জীবের দুঃখ নিবৃত্তি পথ তৈরী করে তাদের পথ দেখায় ও লোক কল্যাণে নিয়োজিত থাকে।

সামাজিক আদর্শঃ মঙ্গল, শান্তি, আনন্দঃ

       জাতকের সামাজিক আদর্শ সামাজিক মূল্যবোধের ‘প্রাপ্তি’ তে কেন্দ্রিভুত আছে। যা সর্বদা দ্রষ্টব্য যে ‘প্রাপ্তি’ তখনই সম্ভব হয় না যতক্ষন মানুষের স্ব-চেতনা, অহংকারের ভাবনা, স্থুল জাগতিক বাসনা অতিক্রম করে ‘সমগ্রের’ সাথে একাত্ম হতে না পারে। যা মহত্বপূর্ণ হয় তা হল ‘অহংকার বিহীন প্রজ্ঞা’। এই প্রজ্ঞায় স্থিত ব্যক্তির সামাজিক জীবন মঙ্গল,আনন্দ আর শান্তিময় হয়ে যায়। নিজের সঙ্গে সমগ্রের মিলন হওয়ার পর নিজের ও সমগ্রের চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামাজিক মৈত্রী, করুণা ও লোকত্তর ভাবনায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর তখন সকল সামাজিক বাতাবরণ মিত্রতায় গড়ে ওঠে। সামাজিক ব্যক্তিদের জীবন মঙ্গল, শান্তি ও আনন্দোৎসবে ভরে উঠে। তখন ঐ সামাজিক ধাঁচের অন্তর্গত মৈত্রী ভাবনা বুদ্ধিকে অতিক্রম করে হৃদয়ে প্রবেশ করে ও ঐ মৈত্রী পূর্ণ হৃদয় করুণার আধাঁরে পরিণত হয়। তখন মানব ঐ রাজার মিত্র হয়ে যায়, যে নিজের স্বর্বস্য ত্যাগ করে ইচ্ছিত সত্যক্রিয়া প্রার্থনা করার মাধ্যমে লোক করুণার ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং এই সত্যক্রিয়ার প্রভাব যেন আমার দ্বারা কারোর মন বা শরীর যেন কষ্ট না পায়।
      মনে রাখা দরকার যে, করুণা হল প্রচেষ্টা সাপেক্ষ মনোবৃত্তি। এই প্রচেষ্টার মূল মার্গ হল মঙ্গল, শান্তি, আনন্দ, করুণা, জীব সহ মানুষ মঙ্গলময় হয়ে থাকেন। কিন্তু যে লোক মাঙ্গলিক কার্যাদি সম্পন্ন করেন তার কোন বন্ধন থাকে না। তিনি সুখেও আত্মতুষ্ট হন না দুঃখেও ভেঙ্গে পড়েন না। ফল স্বরূপ সে উভয়কে অতিক্রম করে যায়। ফলে দ্বন্ধাতীত ব্যক্তির কাছে সকল কিছুই আনন্দমুখর হয়ে উঠে। এই আনন্দকালে স্থিত প্রজ্ঞা ব্যক্তি সুখ ও দুঃখের মধ্যে সমভাবে অবস্থান করেন। এই আনন্দময় ব্যক্তির প্রজ্ঞা প্রশান্ত হয়ে ওঠে। মনে রাখা উচিত সুখ-দুঃখের চেতনা প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে দুটি ভিন্নভাবে তরঙ্গ রূপে সঞ্চারিত হয়, এই ভাবে সামান্য চেতনা কম্পায়মান হয়ে ওঠে। এছাড়া আত্মচেতনায় একাত্ম হওয়া ব্যক্তি মহা শান্তির অনুভূতিতে আচ্ছাদিত হয়ে ওঠে। এই আনন্দকালীন মানুষদের নিয়ে যে সমাজ গঠিত হয় তা মঙ্গল, শান্তি আর আনন্দের আধারে পরিণত হয়। শান্তিমূলক সমাজে পরিণত হয়।

সমতা মূলক সামাজিক প্রয়োজনীয়তাঃ  

       জাতকে নিজের ও সকলের মুক্তি কামনার আদর্শ ও মঙ্গল, শান্তি, আনন্দ ও সামাজিক আদর্শের কথা জাতকে পাওয়া যায়। এই আদর্শের উৎকর্ষতা এক সমতা মূলক সমাজ ব্যবস্থাতেই সম্ভব। যা সর্বদা লক্ষণীয় যে, কোন উদার সামাজিক ব্যবস্থায় কুষিদ তথা বুনিয়াদি প্রেরণা যা হয় তার অন্তর্গত মানুষ মনুষ্যত্বের বহু অজানা বিকাশকে কিছু কাল পর্যন্ত সম্ভব হয় এবং তার সামাজিক সুবিধাও পাওয়া যায়। মানুষকে মানসিক আধ্যাত্মিক অথবা সামাজিক আর্থিক স্থিতির মধ্যে থেকে একে আমরা মানবীয় সামাজিক ব্যবস্থা বলিনা। বস্তুত মানবীয় সামাজিক ব্যবহারের অর্থই হল, এক এমনি ব্যবস্থা যা মানুষের চেতনার বিকাশের জন্য উপযুক্ত বাতাবরণ তৈরী করে। মানুষ যে কিনা এক সামাজিক প্রাণী এই প্রকার সামাজিক ব্যবস্থা থেকে লোকের কল্যাণের আদর্শের অনুশীলন করে নিজেকে উদ্‌ঘাটনের সম্ভাবনার এবং আপন শক্তির চরম বিকাশ সাধন করে। এই সামাজিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণতা এক সমতা মূলক সামাজিক ব্যবস্থাতেই সম্ভব, এমন ব্যবস্থা যার অবাধ লক্ষ্য হল যে এর সাংসারিক লক্ষের কারণ এই প্রকার সামাজিক উদ্যোগের বিকাশ করা যেখানে জনসাধারণের নীতি, বৌদ্ধিক ও ভৌতিক জীবনে এই পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে সকলের ভাল আর শান্তির অনুকূল হয়, কেননা যে অবস্থায় প্রতিটি ব্যক্তির নিজের জীবন এবং নিজের স্বতন্ত্রতার বাস্তবিক রূপ দিতে সাহায্য করে। জাতকের সামাজিক চেতনায় এই সমতামূলক সামাজিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। এই প্রবর্তনের পটভূমিতে একদিকে তৎকালীন সামাজিক বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ মুক্তিরই পথ খুঁজছিল; অন্যদিকে মহত্বপূর্ণ হল- বুদ্ধ ধর্মের চেতনার মধ্যে প্রভাবশালী মানবতাবাদী বল। যা সর্বদা লক্ষ্যণীয় যে জাতক কথায় বৌদ্ধ ধর্মের সম্পূর্ণ ছাপ রয়েছে তথা সম্পূর্ণ ধাঁচ বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক আদর্শের অনুসারী। সেই নৈতিকতা যা মূলত মানবতাবাদী চেতনাকে অনুপ্রাণীত করে, জাতক রচনাকারদের সামনে ছিল তৎকালীন বিশৃঙ্খলীত সমাজ কিন্তু এর অন্তরচেতনায় ছিল সেই আদর্শ সমাজ যেখানে মমতা মূলক সমাজ ব্যবস্থার নিদর্শণ সেই ব্যবস্থা জাতি শ্রেণী ও বর্ণের এমন কোন বন্ধন ছিল না যে মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। সেই ব্যবস্থায় স্বয়ং বুদ্ধের এই উপদেশ সার্থক হয় যে, জাতির কথা জিজ্ঞাসা না করে তার আচরণের কথা বল, কাঠ থেকে আগুন সৃষ্টি হয়, নীচু কুলের পুরুষ ও কৃতিমান, জ্ঞানী ও পাপ রহিত মুণি হতে পারে ১৩ এটা এক এমন ব্যবস্থা যেখানে জন্মের পর মানুষের উঁচু-নীচু বিভেদ হয় না। যা আগ্রাসন ইত্যাদি পাওয়ার জন্য ক্ষত্রিয়কুল, ব্রাক্ষ্মণকুল, বৈশ্যকুল জন্মানোর প্রধান অন্তরায় হয় না বরং যে মানুষের মধ্যে তার শ্রেষ্ঠতা, সৌমনতা ও অন্য সদ্‌গুণই প্রধান। ১৪ পুনরায় যে ব্যবস্থায় নারীকে কেবলমাত্র বাসনা পূরণের বস্তু হিসেবে দেখা হত না, বরং যেখানে নারীকে পুরুষের সহধর্মিনী রূপে দেখা হত, “মহাউন্মগ জাতকে” মহোসধের সেই বুদ্ধমুর্তি ভার্যার মত যে নিজের পতিকে প্রতিটি বিপদ থেকে মুক্তি দিয়ে রক্ষা করে তার জীবনকে সুগম ও সার্থক করে তুলেছিল।১৫ উল্লেখনীয় যে, কখনো কখনো দেখা যায় জাতক সমাজে নারীকে ব্যাভিচারিনী ও দুঃশ্চরিতা রূপে দেখার প্রবণতা ছিল, আবার “সম্বুল জাতকে” বর্ণিত নারীর সতিত্বের একটা গুণ হল- যে নিজের তেজের দ্বারা নিজের স্বামীকে ঘৃণ্য থেকে ঘৃণ্যতর ব্যাধি থেকে মুক্ত করে একটি সুস্থ সুন্দর জীবন এনে দিত।১৬ আবার ঐ ব্যবস্থায় যেখানে আর্থিক বিভেদে মানুষ মানুষের দাস নয়। সারাংশত কোন সমতা মূলক ব্যবস্থা যার আধার স্বতন্ত্র, সৌমনতা ও বন্ধুত্ব।

      কিন্তু বিশ্বে এমন সব সমাজ ব্যবস্থা থাকা কি সম্ভব যেখানে কেবল আদর্শের উড়ান মাত্র নেই? নিশ্চয়ই নেই! ব্যবহারিক পৃথিবীতে যে ব্যবস্থা সম্ভব, তার শর্ত হল মানুষ যে আত্ম-বঞ্চনাতে নিজেকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে যেখানে ছুটে পালিয়ে যাওয়া যায়, জাতক কথায় বর্ণিত বুদ্ধের উপদেশের যে সর্বদা সুব্যক্ত হয়, সে যদি মানবতাকে এই লক্ষ্যে প্রাপ্ত করে তাহলে মানুষকে নিজের মধ্যে বিদ্যমান শত্রুতা, ঘৃণা ও হিংসা অবলুপ্তি হবে। আর এর জন্য যেটা গুরুত্বপূর্ণ পথ তা হল মিত্রতা এবং মৈত্রীর পথ। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ্‌ এস. রাধাকৃষ্ণন- বলেন যে যখন আমরা ভালোবাসী তখন আমাদের ঘৃণা ও শত্রুতার লেশমাত্র থাকে না১৭ সেই কারণে “রাজোবাদ জাতকে”- কাশী নরেশের মহান গুণাবলী দেখে জনসাধারণকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে ক্রোধের চেয়ে ক্ষমার, শত্রুতার চেয়ে মিত্রতার, তথা লোভের চেয়ে উদারতার মহৎ গুণ জানা চাই।১৮ বস্তুত জাতক চেতনায় যে ভাব অপরিসীম মৈত্রীতে মানুষ মানুষের সাথে একাকার হতে পারলে তবেই উদাত্ত সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় এবং এর জন্য অপরিহার্য হল যে, কেবলমাত্র মানুষের জন্য নয় সকল জীবের জন্যই প্রেম সেবা ও ত্যাগের ভাবনা বিকশিত হওয়া উচিত। রাধাকৃষ্ণান বলেছেন সত্যিকারের জীবন নিজের প্রেমকেই অভিব্যক্ত করে এবং এর লক্ষ্য হয় মানুষকে একাত্ম করে স্থাপন করা।১৯ যে কারণ হল যে, “ঋকবেদ”-এ সমস্ত মানব জাতির উদ্দেশ্যে উপদেশ দিয়েছে-
                            “ সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং
                              সং বো মনাংসি জানতাম্‌।
                             সমানো ব আকৃতিঃ, সমানো হৃদয়ানি বঃ
                             সমানমস্তু ব মনো
                             যথা ব সুরাহাসতি”।
অর্থাৎ মিলে মিশে বলো, মিলে মিশে কথা বলো। তোমার মন একই রূপ জানে। তোমার প্রচেষ্টা ও বল সাথে সাথে আছে, তোমার হৃদয় একমত হোক। তোমার মন সংযুক্ত হোক, যেখানে আমরা সবাই সুখী হতে পারি।
        উপসংহারে বলা যায় যে, জাতকে তৎকালীন মানুষের সামাজিক স্থিতি এবং সমাজের বিশৃঙ্খলীত রুপের প্রতি দমন মূলক দৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়া। এই ভাবনায় প্রভাবিত এক এমন সমাজ ব্যবস্থার নির্মাণ যেখানে মানবতা সুরক্ষিত। যেখানে মানবতার সামাজিক আর্থিক এবং ধার্মিক চেতনার বিকাশের জন্য উপযুক্ত বাতাবরণের ভূমিকা বহন করে। অহিংসা, মানব সাতন্ত্রতা, সৌমনতা, সহঅস্তিত্ব এবং বন্ধুত্বের মহৎ আদর্শের উপর অবস্থিত এই সমাজ ব্যবস্থায় জাতকের পরিকল্পনা বাস্তবতার মানবতাবাদী আকাঙ্খারই প্রতীক।
        
অভিসন্ধির্ভ কুঞ্চিকাঃ
১. ‘পালি সাহিত্য কা ইতিহাস’ ভরত সিংহ উপাধ্যায় পৃ. ৩৫১
২. সচ্চংকির জাতক, সংখ্যা- ৭১, ১ম খন্ড, অনু. (হিন্দি) ভদন্ত আনন্দ কৌযাল্যায়ন, পৃ.৪২০-
    ৪৩৫,
৩. প্রাগুক্ত, গরহিত জাতক, সংখ্যা-১১৯, ২য় খন্ড, পৃ.২৬২-২৬৩,
৪. শৃঙ্গাল জাতক, সংখ্যা-১১৩, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮-৫১
৫. তিত্তির জাতক, সংখ্যা-৩৭, ১ম খন্ড, পৃ. ২৮৭
৬. চিত্ত স্মভুত জাতক, সংখ্যা – ৪৬৮, প্রাগুক্ত, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ৫৬৮-৬০৮
৭. মাতঙ্গ জাতক, সংখ্যা- ৪৬৭, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৩-৫৬৭
৮. জাতক, সংখ্যা-৬১-৬৪, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ.৩৭৮-৩৯৯।
৯.কুনাল জাতক, সংখ্যা- ৩-৫, প্রাগুক্ত, ৫ম খন্ড, পৃ.৫১০
১০. কনহ জাতক, সংখ্যা- ৪৪০, প্রাগুক্ত, ৪র্থ খন্ড পৃ. ৩৩৫
১১. পালি সাহিত্য কা ইতিহাস, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৩৫
১২. প্রাগুক্ত, সুন্দ্রিক ভরদ্বাজ, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৩৪
১৩. প্রাগুক্ত, তিত্তির জাতক, সংখ্যা- ৩৭, জাতক ১ম খন্ড, পৃ.২৮৭-২৮৯,
১৪. প্রাগুক্ত, মহাউম্মাগ জাতক,৫ম খন্ড,
১৫. প্রাগুক্ত, সম্বুল জাতক, পৃ.১৫৩
১৬. ধর্ম; তুলনাত্নক দৃষ্টি মেঁ. এস.রাধাকৃষ্ণান, পৃ.৭৫,
১৭. রাজোবাদ জাতক, সংখ্যা- ১৫১, জাতক ২য় খন্ড, পৃ.১৬৬
১৮. অঁক্যাসেন্যাল স্পীচেজ এন্ড রাইটিংস্‌ ১৯৫৬-৬২, এস. রাধাকৃষ্ণান, পৃ.৩২১
১৯. ঋগ্বেদ, ১০-১৯১।   

জাতকে প্রতিবিম্বিত ভারতীয় অর্থব্যবস্থা

শুভাশিস বড়ুয়া

    সম্পূর্ন বুদ্ধ বচন তিনটি পিটকে বিভক্ত, সূত্ত পিটক, বিনয় পিটক ও অভিধম্ম পিটক। সূত্ত পিটক আবার পাঁচটি নিকায়ে বিভক্ত। যথা – দীর্ঘ নিকায়, মজ্ঝিম নিকায়, সংযুক্ত নিকায়, অঙ্গুত্তর নিকায় ও খুদ্দক নিকায়। জাতকে খুদ্দক নিকায়ে সংগৃহীত ১৫ টি সতন্ত্র গ্রন্থের মধ্যে ১০ম ও মহত্বপূর্ণ গ্রন্থ। জাতক ৫৪৭ টি কথায় বর্নিত, যা বুদ্ধের পূর্বজন্ম সম্পর্কিত। যে কথা নৈতিক শিক্ষার সাথে সাথে তৎকালীন সমাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোন দেশের অর্থব্যবস্থা প্রকাশ করার জন্য তৎকালীন কৃষি, ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষা, পশুপালন ইত্যাদির আর্থিক বিষয়ের অধ্যয়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ। উক্ত ব্যবস্থার উপর দৃষ্টিপাত করলে দেশের আর্থিক অব্যবস্থার সম্পর্কে জানা যায়। অতএব, উক্ত প্রবন্ধে জাতকে বর্নিত ভারতীয় অর্থব্যবস্থায়  জাতককালিন ভারতীয় অর্থব্যবস্থা ও সমাজ চেতনা প্রকাশ করার জন্য শিল্প, ব্যবসা এবং সমাজ চেতনা ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়নের নিমিত্তে ব্রতী হয়েছি।
       জাতকে তৎকালিন অনেক শিল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সমস্ত শিল্পের মধ্যে কিছু কিছু শিল্প বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। এই শিল্পের মধ্যে ধাতু শিল্প অত্যন্ত উন্নত ছিল। জাতকে ধাতু গলিয়ে অত্যন্ত আর্কষনীয় বস্তু তৈরির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধাতু শিল্পের অন্তর্গত লোহা, সোনা, তামা, চাঁদি প্রভৃতি ধাতু শিল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত শিল্পীদের কর্মকার, স্বর্ণকার ইত্যাদি সংজ্ঞায় অভিহিত করা হত। ধাতু শিল্প ছাড়াও যষ্টি, মাটি, দাঁত, ফুল ইত্যাদির শিল্পও সে সময় প্রচলিত ছিল।
       জাতকের অধ্যয়ন থেকে জানা যায় যে, লৌহকে পিটিয়ে এক সুনিশ্চিত আকার দিয়ে তা থেকে বিভিন্ন প্রকার মজবুত দ্রব্য বানানো হত। যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র থেকে শুরু করে কবজ লৌহও বানানো হত। লৌহ, তামা, কাঁসার পাতকে কাটার জন্য লৌহরই করাত বানানো হত এবং ঐ করাতের ধারের দ্বারা পাতগুলিকে ছেদন করা হত। বাদ্য যন্ত্রের তারও লৌহ থেকে বানানো হত।
      জাতকে কর্মকার লৌহ গরম করার স্থানকে ‘অঙ্গার কপ্পার’ বলা হত। যেখানে জলন্ত কয়ালর আগুনের মধ্যে তীর বানানোর জন্য লৌহকে গরম করা হত এবং নুনের জলে অথবা ভাতের ফেনে ডুবিয়ে লৌহকে ঠান্ডা করা হত।৪   ভিতরে ব্জলতে থাকা এবং বাইরে লৌহকে দেখা না যাওয়া মতো করে গরম করা হত।
কর্মকারের কার্যক্ষেত্র খুব ব্যাপক ছিল। জাতক কথায় তাদের বসতি গ্রামকে কামার গ্রাম নামে উল্লেখ করা হত।৬  জাতকে তাম্র শিল্পেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। তামা ও কাঁসার বাসনপত্র, ঘরের অন্যান্য জিনিষপত্রও বানানো হত।এবং সেগুলোর ব্যবহার বহুল প্রচলিত ছিল। ক্ষারীয় দ্রব্য দিয়ে তামাকে পরিষ্কার করা হত।৮ 
জাতক গ্রন্থ অধ্যয়ন করে জানা যায় যে, সে সময় ভারতে বহুমূল্যবান ধাতু যেম্ন-সোনা, মণি ইত্যাদি দিয়েও নানান শিল্প সামগ্রী তৈরী হত।৯  এ সময় খাঁটি সোনার গহনা বানানো হত এবং ঐ গহনা বিক্রি করা হত। ঐ সমস্ত গহনা ব্যবসায়িক গুণের জন্য স্বর্ণকার বিভিন্ন প্রকার অলংকার বানানো সূচনা করেছিল। মাথার উপর ধারণ করার যোগ্য অলংকারও তৈরী করা হত।১০   পশুদের জন্যও অলংকার বানানো হত। রাজা নিজের হাতি, ঘোড়াদের জন্যও সোনা এবং অন্যান্য বহু মূল্যবান ধাতুর গহনা ও ঝালোর বানাতেন।১১
সোনা খনি থেকে পাওয়া যেত এবং অনেক সময় নদীর তট থেকেও পাওয়া যেত। জাতকে ‘সবহানি কিরননি’ শব্দের প্রয়োগের দ্বারা সোনার দোকানের নাম জানা যায় স্বর্ণকারদের মাদক দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। সোনা, রুপা, হীরা, মণি, স্ফটিক ও জহরতকে বহু মূল্যবান ধাতুর অন্তর্ভূক্ত ধরা হয়।১২
স্বর্ণকার সোনার মূর্তিও তৈরী করতেন। যা থেকে তার শিল্প নৈপুন্নের পরিচয় পাওয়া যেত।১৩ এ সময় সোনার থালা, বাটি, পেয়ালা ইত্যাদির প্রচলন ছিল। এ সমস্ত জিনিসগুলি খাওয়া-দাওয়ার অতি উত্তম পাত্র রূপে গন্য হত,১৬  জাতকে সোনার কলসী, রূপোর থালার উল্লেখ পাওয়া যায়।১৭
তৎকালীন যুগে উল, সুতি, রেশম তিন প্রকার বস্ত্রের উৎপাদন হত এবং সেগুলি পরিধান করা হত। বস্ত্র ও গহনার দ্বারা শরীর কে সুন্দর ও আর্কষনীয় ভাবে রূপ দেওয়া হত। ফলে গহনা তৈরী ও সেই সম্বন্ধীয় ব্যবসা অত্যন্ত উন্নত ছিল। রেশম বস্ত্রের উপর সোনার কাজ করার কথাও জাতকে পাওয়া যায়। রাজার টুপি সোনায় মুড়ে রাখা হত। “কাঞ্চন পট”১৮ যেখানে রাজকীয় হাতীকে রেশমের বস্ত্র ও সোনায় মুড়ে দেওয়া হত এবং হাতিগুলিকেও সোনার অলংকারে সাজানো হত, ‘নাগে হেমকপ্পনবাসে’।১৯
রাজ ঘরণীদের জন্য রেশমবস্ত্র সম্মান সূচক ছিল। তবুও সুতি বস্ত্রের ব্যবহার সীমিত মাত্রায় প্রচলিত ছিল। রেশমের মূল্যবান আর মোলায়েম সুতো দিয়ে কম্বল, আস্তরণ ও কার্পেট বানানো হত।২০ ঘরোয়া শিল্প হিসেবে সুতি শিল্পও বেশ উল্লেখযোগ্য ছিল। বস্ত্র ব্যবসায়ীদের ‘দুসিসক’ বলা হত।২১
সুতির কাঁথা মহিলাদের প্রধান ব্যবসা ছিল। একটি জাতকে মহিলাদের এ কাজকে “ ইত্থীন কপ্পাসপোত্থন ধনুলা “ বলা হয়েছে। মহিলারা সারাদিন সুতির কাঁথা তৈরী করত। এটাকেই তারা প্রিয় গৃহকার্য বলে মনে করত। ২২
‘বড়ই’ নামক ব্যক্তিরা সামুদ্রিক জাহাজ নির্মাণ করত। এই তথ্যটি ‘সমুদ্র বানিজ্য জাতকে’ পাওয়া যায়। ‘অনিল-চিত্ত-জাতক’ কাশির নিকট বড়ইদের এক গ্রাম ছিল ‘বডঢকীগাম’। বড় জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে যেত এবং সেখান থেকে গৃহ নির্মাণের উপযোগি কাঠ নিয়ে এসে এক এক্তলা, দুতলা বাড়ির ‘প্রতিরূপ’ তৈরী করত। তারপর নগরে গিয়ে সেই প্রতিরূপের মতোই কাঠের বাড়ি তৈরী করত। ২৩
নৌকা, জাঁহাজ, গাড়ী, রথ এই ধরণের যান নির্মাণ বড়িদের দ্বারা হত।২৪ এ সময় রথ নির্মাণকেও শিল্প ও কারিগরের অন্তর্গত বলে পরিগণিত হত। অপসরপপিটক২৫ কোবচ্ছ২৬ সিরিসাযান২৭ নানাবিধ উপকরণের উল্লেখ জাতকে পাওয়া যায়। এইসব নির্মাণ বড়ই’রা করতেন।
      জাতক থেকে আরো জানা যায় যে, সেই সময় হাতির দাঁতের শিল্পেরও সমাধিক প্রচলন ছিল। নগরে বিশেষ প্রকার বস্তিবাসী ছিল যাদের ‘দন্তকার বিথ’ বলা হত। যেখানে হাতির দাঁতের দ্বারা শিল্প প্রস্তুত কারকদের ঘর ছিল। সেখানে হাতির দাঁত দ্বারা নানান দ্রব্য প্রস্তুতকারীদের নিজেদের হস্ত শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।২৮ তারা আরও অনেক প্রকার ছোটোখাটো জিনিস প্রস্তুত করত। যেমন- হাতির দাঁতের চুড়ি, বাহুবন্ধ ইত্যাদি।২৯ হাতির দাঁতের তৈরী মূল্যবান চিত্রকারদের উপযোগী সামগ্রী, আয়নার আস্তরণ এবং রাজাদের রথ সাজানোর জন্য যা ব্যবহৃত হত।৩০ হাতির দাঁত সংগ্রহের জন্য হাতি শিকার করা হত এবং জীবিত হাতির দাঁত মৃত হাতির দাঁতের চেয়ে অতি মূল্যবান মনে করা হত।৩১
       জাতক থেকে আরো পাওয়া যায় যে, মাটির তৈরী বিভিন্ন পাত্র ও খেলনা বানানো হত। কুম্ভকার বাটি, সরা, ঘড়া এবং অন্যান্য ছোট বড় আকারের বাসনপত্র তৈরী করতেন, সাধারণের ঘরের এবং রাজবাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরী করতেন।৩২ তারা প্রায়ই শহর ও গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে বসবাস করত যা তাদের ব্যবসার জন্য অনুকূল ছিল। গ্রাম বা শহরের মধ্যে থাকলে তাদের ভালো কাঁচা মাটি পেতে কষ্টকর হত এবং স্থানাভাবের জন্য নিজেদের ব্যবসা প্রসার থেকে বঞ্চিত হত। সেই কারনে তারা তাদের বস্তীগুলি শহর বা গ্রামের বাইরে স্থাপন করত।৩৩ কুম্ভকারগণ তাদের উৎপাদন সামগ্রী বাজারে বিক্রি করত।৩৪
       জাতক থেকে জানা যায় যে, চর্মকার জুতো প্রস্তুত কৃত উদ্বৃত্ত চামড়া দিয়ে ব্যাগ ও ছাতা বানাতো। তলোয়ার রাখার খাপ, দড়ি, ফাঁদ ইত্যাদি বস্তুর নির্মাণ চর্মকারেরাই করত।৩৫
       জাতক পাঠ করে আরও জানা যায় যে, ঐ সময় ফুলের মালা, সুগন্ধি দ্রব্যের শিল্পের প্রচুর প্রচলন ছিল। মালাকার পুষ্পোদ্যান থেকে নানাবিধ ফুল তুলে আনত এবং নানারকমের মালা তৈরী করত। ৩৬ সেই সময় গন্ধক বিলাসী মানুষদের জনপ্রিয়তা খুব বেশী ছিল। দোকানে সুগন্ধী দ্রব্য সাজান থাকত। এই তথ্য জাতক থেকে পাওয়া যায়।৩৭ গন্ধক গ্রাহকদের সুগন্ধি দ্রব্য বিক্রি করত।৩৮ জাতকে চন্দনের মাহাত্মও প্রকাশ পায়। চন্দনসার নির্মাণের তথ্যও পাওয়া যায়।৩৯ জাতকে ধনী ব্যবসায়ীদের কথারও উল্লেখ পাওয়া যায়; যাদের ‘সেটঠি’ নামে অভিহিত করা হত। ঐ সময় ব্রাক্ষ্মণরাও যথেষ্ট সম্পন্ন ছিলেন। তাদের অনেক সম্পত্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।৪০ জাতক অধ্যয়ন করলে জানা যায় ঐ সময় ব্যবসায়ীরা দুটি পথ অনুসরণ করতেন।
১) সমুদ্র পথে বাণিজ্য, ২) স্থল পথে বাণিজ্য।
        পণ্ডারক জাতক থেকে পাওয়া যায় যে, ৫০০ ব্যবসায়ী যখন সামুদ্রিক পথে বেরিয়ে ছিলেন তখন জলযান ভেঙ্গে গেলে তাঁরা মাছের খাদ্যে পরিণত হত।৪১ ভারত ও ব্যাবিলনের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিবরণ ‘ বাবেরু জাতক’ থেকে জানা যায়।৪২
        জাতকে সামুদ্রিক ব্যবসার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। জাতকে বহু প্রসিদ্ধ বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে ...কচ্ছে৪৩ সৌবীর৪৪ কাবেরীপত্তন৪৫ কারম্বিয়৪৬ গম্ভীরা৪৭ সেবীর৪৮ ইত্যাদি ভারতীয় বন্দর ছিল।
        জাতক অধ্যয়ন করে জানা যায়, তৎকালীন ভারতে স্থল পথে বানিজ্য বেশী চলত। তৎকালীন ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে বারাণসী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখান থেকে প্রত্যেক দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক পথের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল।৪৯ পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার পথকে জাতকে ‘পুববন্তা অপরান্ত’ বলা হত।৫০ যা বস্তুত মহান মার্গের পরিচায়ক। যা অনেক প্রদেশকে সংযুক্ত করেছিল। পূর্ব ভারতের চম্পা এক বিশিষ্ট ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। চম্পা থেকে ব্যবসায়িকগণ সুবর্ণভূমিতে যাওয়ার জন্য রওনা হত যা স্থল পথের দ্বারা মিথিলার সাথে যুক্ত ছিল।৫১ জাতক থেকে জানা যায় যে, উত্তরা পথ থেকে তক্ষশীলা যাওয়ার জন্য দীর্ঘ পথ আছে। যা মধ্য এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্থাপন করার পক্ষে সহায়ক ছিল। যে পথ দিয়ে রাজপুতানা মরুভূমিতে যাওয়া যেত এবং তা ৬০ যোজন চওড়া ছিল ‘সট্‌ঠিযোজনক মরুকন্তারং’।৫২
       দৈনিক প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রি করার দোকানদারও ছিল। যাদের ছোট ব্যবসায়ী বলা হত। দৈনিক প্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন- মাংস, মদও রাখত। জাতক থেকে জানা যায় যে, বহু মূল্যবান দ্রব্য গাড়ী বোঝাই করে দেশের সুদূর স্থানে পৌঁছে দিত। এই দ্রব্যের অন্তর্গত কাশীর বস্ত্র, চাল ও ভিন্ন প্রকার সবজীও ছিল।৫৩ কাশীর রেশম কাপড় ৫৪, গান্ধারের উলের বস্ত্র৫৫, কোদুম্বরের সনের কাপড়ের আদানপ্রদান প্রচুর মাত্রায় হত। সূঁচ ও অন্যান্য লৌহর বস্তু তৈরী করে বিক্রি করার কাজ বহুল প্রচলিত ছিল,৫৭ ময়ূর ও অন্যান্য পাখির অবয়ব চিত্রিত হত।৫৮ সিল্ক, উত্তম মানের কাপড়, হাতির দাঁত এবং তার থেকে তৈরী জিনিষ, জহরৎ, সোনার অবয়ব রূপ তৈরী করা হত। উত্তর পাঞ্চালের চার দ্বারে প্রচুর সবজী বিক্রয় হত।৫৯ ফুলের বাজারেরও উল্লেখ পাওয়া যায় ৬০। নগরের বাইরে কসাইখানা ছিল যেখানে রাজা ও জনসাধারণ মাংস কিনত ৬১। সমস্ত দোকান মিলে এক্তা বাজারের আকার নিত। সকল বস্তুই বাজারে বিক্রি হত এবং ঐ সমস্ত দ্রব্য বাজারে জমা হত ৬২। তখন বারকোশ ও গাধার পিঠে করে দ্রব্য সামগ্রী বেচার জন্য নগরের রাস্তা ও গলিতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত।৬৩
উপসংহারঃ জাতক অধ্যয়ন করে জানা যায় ঐ সময় লৌহ শিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল; পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার শিল্পও উৎকর্ষতা লাভ করে। এর থেকে আরো জানা যায় যে, তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থাও উন্নতি লাভ করেছিল। পশুদের জন্যও সোনার গহনা বানানো হত। সোনার মূর্তি বানানোর উল্লেখ রয়েছে। যেখানে উন্নত কলার নিদর্শণ পাওয়া যায়। দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত থালা, বাটি, পেয়ালার মতো ব্যবহার্য জিনিসও সোনার গহনার মতো ব্যবহার হত। যা থেকে ঐ সময়ের উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। রেশমি বস্ত্র সোনার দ্বারা সুসজ্জিত করে রাজবাড়ির লোকজন ব্যবহার করতেন এবং হাতি, ঘোড়াকে ঐ সোনার তৈরী রেশমি বস্ত্র পরানো হত। যা ঐ সময়ের আর্থ-সামাজিক উন্নতির পরিচয়। জনসাধারণ সুতি বস্ত্র ব্যবহার করত যা ঘরোয়া শিল্প থেকে হত।
        যষ্ঠি শিল্পের অত্যধিক প্রচলন ছিল। ‘বড়ই’ যষ্ঠি দিয়ে ভিন্ন প্রকার সামগ্রী তৈরী করে নিজেদের শিল্প নৈপুন্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। জাতক অধ্যয়ন করে জানা জায় যে, ঐ সময় হাতির দাঁতের শৈল্পিক কারুকাজও প্রচলিত ছিল। হাতির দাঁত দিয়ে ভিন্ন প্রকার অলংকার বানানো হত। মৃৎ শিল্প ঐ সময় প্রচলিত ছিল; কুম্ভকারের তৈরী মাটির দ্রব্যাদি রাজবাড়ি তথা সর্বস্তরের মানুষ ব্যবহার করত।
     জাতক কালীন ভারতে স্থল ও জল পথে বানিজ্যের অপরিসীম প্রসার ঘটলেও সামুদ্রিক পথের তুলনায় স্থল পথে অধিক বানিজ্য চলত।     
   
  


  অভিসন্ধির্ভ কুঞ্চিকাঃ
১. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৪৫,
২. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ১১১, তৃতীয় ভাগ পৃ. ২৪২,
৩.জাতক, ব্বিতীয় ভাগ, পৃ. ২৪৮,
৪. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৬৬,
৫. জাতক, ষষ্ঠ ভাগ, পৃ. ১৮৯, বক্ষ্মারানা যথা উক্কা অন্তো ঝায়ন্তি নো বহি।
৬. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২৮১
৭. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ১১১,২৮৬,৮৬৪, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২৮১,২৮৫, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ১০৬,
    প্রথম ভাগ, পৃ. ৪৫,
৮. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৯৫,
৯. জাতক, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ২২৩, জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৪৩৮-৯
১০. জাতক, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ১৯১,
১১. জাতক, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ৪৮, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ৩৯৩,৪০৩-৪, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ২৫৮,৪০৬-৪,
১২. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ১৬৬, ৩৫১,৪৭৯, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ৬,
১৩. সো কম্মার জেট্টকং পল্কো সোপেত্বা বহুং সুবন্নং দত্বা একং ইত্থিরূপং করোহিতী সুবন্নং   
     গহেত্বা সযং ইত্থিরুপকং অকাসি। জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ২৮২,
১৪. সুবন্ন থাল, জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ.২২৪,
১৫. সুবন্ন পাতি, সুবন্নভিংকার, সুবন্নসরক। জাতক, দ্বিতীয় ভাগ পৃ. ৯০,৩৭১, তৃতীয় ভাগ, পৃ.
    ১০,২৬৬, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ৩৮৪, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৩৯,৫১০,
১৬. জাতক, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ৩৮৪,
১৭. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২২৪, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ২৬০,
১৮. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৩২২,
১৯. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৪০৪,
২০.জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২৮৯,
২১. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ১০৯,৩০৪, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ৬৮,২৭৪,
২২. জাতক, পৃ. ২৭৬,
২৩. যথাপি তন্তে বিততে
      যংযং দেবয়ুপ বিযতি
      অপকম্মং হোতি বেতব্বং, জাতক, পৃ. ২৬,
২৪. তেনবায উপরিসোতং গন্তবা অরঞেস গেহ সম্ভার
     দারুনি কোটেঠত্বা তত্থ এব এক ভূমিক দ্বিভূমিক
     ভিন্ন, দিভেদে, গেহে সজ্জেত্বা থম্ভতো পদঠায়
     সব্বদারুসু সঞঞং কত্বা..... নগরং আগন্ত্বা যে
     যাদিসানি গেহানি আকরংবন্তি। জাতক, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ১৮
২৫. তস্মাযন্তানি কারেন্তি রাজা ভয়তি বড্‌ঢকিং। জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ২৪২,
২৬. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২৩৫,
২৭. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৮০৬,
২৮. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৩৯৮, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২৬৪,
২৯. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৩২০, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ১৯৭,
৩০. প্রাগুক্ত,
৩১. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৩০২, ষষ্ঠ ভাগ, পৃ. ২২৩,
৩২. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৩২, দ্বিতীয় ভাগ পৃ. ১০৬, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৪৫৪, জাতক, পৃ ৬১,   ৩৩. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ২০৫, দ্বিতীয় ভাগ পৃ. ৮৯, তৃতীয় ভাগ, পৃ.   
      ৩৬৬,৩৬৮,৩৮৫,৫০৮, পঞ্চম ভাগ পৃ. ২৯১, ষষ্ঠ ভাগ, পৃ. ৫২১,
৩৪. জাতক, ষষ্ঠ ভাগ, পৃ. ৫২
৩৫. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ১৭৫, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ১৫৩, ষষ্ঠ ভাগ, পৃ.১১৬, চতুর্থ ভাগ,পৃ.
     ১৬২, পঞ্চম ভাগ, পৃ.৮৬,১০৬,৩৬৫, ষষ্ঠ ভাগ, পৃ. ৫১,
৩৬. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ.১২০, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ৩২১, তৃতীয় ভাগ পৃ. ৪০৫, চতুর্থ ভাগ, পৃ.
      ৮২, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ২৯২,
৩৭. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ৮১,
৩৮. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ.১২৯,২৩৮, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ৮২
৩৯. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ.১৬০,৫১২, পঞ্চম ভাগ, পৃ ১৫৬,৩০২,
৪০. ‘অসিতি কোটি বিভবো’, জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ.৩৪৯,৪৬৬,৪৭৮, তৃতীয় ভাগ, পৃ.
      ১২৮,৩০০,৪৪৪, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ১,৬,২৪,২৩৬,২৫৪,৩৮২,
৪১. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ.৭৫,
৪২. জাতক, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ১৩৮-৪২,
৪৩. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ১২৬-৭,১৮৮,১৯০, চতুর্থ ভাগ, পৃ. ১৩৬-৪২,
৪৪. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ৪৭০
৪৫. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ২৩৪
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ.৭৫
৪৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৯
৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১
৪৯. প্রি, বুড্ডিষ্ট ইন্ডিয়া, পৃ. ২২৫
৫০. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৯৮,৩৬৮, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ৫০৩, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৪৭১,৫০২,
৫১. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৩৪
৫২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৯,১০৮
৫৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৯
৫৪. জাতক, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ৪৪৩, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ১০, পঞ্চম ভাগ পৃ. ৪৯,৭৮,
৫৫. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ.৫০০
৫৬. প্রাগুক্ত,
৫৭. জাতক, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২৮২
৫৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬
৫৯. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৪৪২, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ১৭১, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২২, চতুর্থ ভাগ, পৃ.  
      ৪৪৫,৪৪৮,
৬০. জাতক, প্রথম ভাগ, পৃ. ১২০, চতুর্থ ভাগ, পৃ.৮২,২৭৬,
৬১. জাতক, তৃতীয় ভাগ, প্প্রি. ১০০,৩৭৮, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৪৫৮,৬২,২৭৬,
৬২. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ৩৫০, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ৪০৬,

৬৩. জাতক, পঞ্চম ভাগ, পৃ. ১১১,২০৪, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ. ৪২৪, তৃতীয় ভাগ, পৃ. ২১,২০৩।  

শিশুদের জন্য বৌদ্ধ শিক্ষা

-সুমনপাল ভিক্ষু

কোন কোন বিশেষ সময় পর্ব আছে যা বিকাশের বিভিন্ন দক্ষতা লাভের পক্ষে সবচেয়ে বেশী সহায়ক। কখনও কখনও এই পর্বকে বলা হয়, “সংকট পর্ব” কারণ বিকাশের দক্ষতায় যদি এই পর্বের মধ্যে দক্ষতালাভ করা না যায় তাহলে আন্য কোন সময়ে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পর্বে বৌদ্ধ অভিজ্ঞতা দানের মাধ্যমে বৌদ্ধ শিক্ষা তাকে পরিণত বৌদ্ধধর্ম বিশ্বাসীর গুণাবলী অর্জন করতে সাহায্য করে, তাকে বৌদ্ধ জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এক আদর্শ বৌদ্ধ চরিত্রে পরিণত হন যিনি আধ্যাত্মিক বিকাশ লাভ করেছেন।
     আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বৈত সত্তার এই পৃথিবীতে একটি সঠিক দিক নির্দেশ করতে ব্যর্থ হয় যা দৈনন্দিন জীবনে বোধকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারে না। এই নিবন্ধটি বৌদ্ধ শিশু শিক্ষাকে একটি আধ্যাত্মিক ও শিক্ষামূলক মানদণ্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে যা বোধ ও জীবনকে শিশু শিক্ষা বিষয়ক বৌদ্ধ আদর্শকে পরীক্ষার মাধ্যমে একত্রিত করবে।
বুদ্ধের শিক্ষায় শিশু শিক্ষায় শিক্ষণ পদ্ধতিঃ  
      বৌদ্ধ শিক্ষা শিশু শিক্ষাকে নিশ্চিতভাবে শিশুর বিকাশের পর্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব গড়ে তুলতেই হবে। শিশুর ধর্মীয় প্রকৃতি বা তাদের মূল্যবোধ গড়ে তোলা হল এমন এক লক্ষ্য যাকে তাদের বিকাশের পর্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করতে হবে। প্রকৃতিগত ভাবে শিশুরা বৌদ্ধ ধারনা ও তত্ত্বগুলিকে স্মৃতিতে রাখতে কঠিন বোধ করে এই কারণে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতে হবে। শিশুদের উপর বিমূর্ত ধারনা ও পরিভাষা চাপিয়ে দিলে তাদের ধর্ম কি সে সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা জন্মাবে এবং এমন একটা পর্যায়ে তাদের ধর্মীয় বিকাশকে বিঘ্নিত করবে যখন তারা পুরোপুরি পরিণত নয়। উপরন্তু, খুব তাড়াতাড়ি এবং অতিমাত্রায় শিশুদের ধর্মীয় ধারনার সামনে উন্মোচিত করলে তাদের সমালোচনামূলক ভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় এবং তাদের ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে। পরবর্তীকালে ধর্মীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে উচ্চতর চিন্তাভাবনার বিকাশে এটি বিঘ্ন ঘটতে পারে।
      বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষাকে অবশ্যই কোন অসাধারণ শিক্ষাক্রমের দিকে লক্ষ্য না রেখে দৈনন্দিন শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কারণ শিশুরা দার্শনিক চিন্তাভাবনা বা বিভিন্ন তত্ত্ব ব্যাখ্যার থেকে দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে দৃশ্য শ্রাব্য চেতনার থেকে বেশী শেখে। বৌদ্ধ শিক্ষার এই ধরণের নিরবিচ্ছিন্ন এবং সুসংহত শিক্ষাক্রমের পরিকল্পনা করা শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ নীতি প্রতীত্যসমুৎপদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষাকে অবশ্যই বৌদ্ধ নীতির উপর নির্ভরশীল হতে হবে। যখন বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার পাঠক্রমকে শিশুর বিকাশের পর্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং তা অনুসরণ করার পক্ষে সহজ হবে। এটি সর্বোপরি বৌদ্ধ রচনাগুলিকে শিক্ষার প্রধান উপাদান হিসাবে ব্যবহার করতে হবে, কারণ কোন মতাদর্শ ভিত্তিক ব্যাখ্যা বা শিক্ষার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গিকে সীমায়িত করতে পারে। বৌদ্ধ শিক্ষা শিশুদের মধ্যে একটি সঠিক ধর্মচেতনা প্রতিষ্ঠা করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় তাদের বৌদ্ধ ধারনা ও অভ্যাসের দিক নির্দেশ দিয়ে এবং একই সঙ্গে তাদের অন্তর্নিহিত ও সামাজিক প্রকৃতিকে উৎসাহিত করে যাতে তারা পৃথিবীর একটি স্বাধীন ও সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করতে পারে। অসংখ্য বৌদ্ধ তত্ত্বের মধ্যে শিশু শিক্ষার পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত হল আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, সামাজিক আচরণের চারটি নীতি, দশ পারমী এবং তিনপ্রকার প্রশিক্ষণ। নিম্নোক্ত তালিকাটি হল বিস্তারিত অভ্যাস অনুশীলনের একটি দৃষ্টান্ত যার ভিত্তি হল আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অন্যতম সম্যক কর্ম।
সম্যক কর্মঃ
কুশল শারিরীক কর্ম অর্থাৎ সর্বদা কুশলকর গতিবিধি বজায় রাখা। যে কর্ম নিজের বা অপরের ক্ষতি করে না অর্থাৎ শরীরের দ্বারা কুশল কর্ম সম্পাদন, অকুশল কর্ম থেকে বিরত থাকা যথা প্রাণীহত্যা এবং চুরি করা, জীবনকে শ্রদ্ধা করা এবং দয়া অনুশীলন করা।

স্বাস্থ্য
সামাজিক কর্ম
প্রকাশ
বাক্য
অনুসন্ধান
শয়ন ধ্যান অনুশীলন
শিশুদের জন্য পঞ্চশীল অনুশীলন করা
মনঃসংযোগ ও ধ্যানের মাধ্যমে অনুভূতির সৃজনশীল প্রকাশ
কথা বলার  সঠিক ভঙ্গিমা
প্রাকৃতিক ঘটনায় আগ্রহের প্রকাশ
সঠিক হাঁটার ভঙ্গিমা
আবেগ ও আকাঙক্ষার নিয়ন্ত্রণ করা



সঠিক খাদ্যাভাস





    বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষাতে অতি অবশ্যই শিশুদের আগ্রহ জাগাতে হবে এবং শিক্ষাকে ক্রীড়ার সঙ্গে যোগ করতে হবে। প্রথম এবং সর্বপ্রধান হল বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার সমস্ত উপাদানের অতি অবশ্যই শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যোগ থাকতে হবে এবং শিশুদের স্বেচ্ছাকৃত কর্ম এবং অপরের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন ধারনা অর্জন করতে সাহায্য করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, বোধিসত্ত্ব চিত্তের মূল বৌদ্ধ ধারনা – করুণা এবং অপরের উপকার করে মানুষ নিজের উপকার করে এই বিশ্বাস- শিশুদের একথা বুঝতে সাহায্য করে যে ব্যক্তি সমাজের অংশ, তাই তারা যা শিক্ষা করে তার সম্পর্কে আন্তরিকভাবে আগ্রহী হয় এবং সেই শিক্ষাকে সংহত করে।
     শিশুদের বৌদ্ধ ধারনা গ্রহণ করতে সাহায্য করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল পরিবেশের বিষয়টি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে শিশুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয় কৃত্রিম নয় পরিচিত পরিবেশের মধ্যে আনন্দময় কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে। শিক্ষায় বর্তমান প্রবণতা যা আরো বেশী করে ‘খেলো ও শেখো, শেখো ও খেলো’ এই ধারনার উপর আরো বেশী গুরুত্ব আরোপ করেছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, বৌদ্ধ ধর্মে শিশুর ক্রীড়ার একটি প্রতীকী অর্থ রয়েছে, এটি হল জীবনে আদর্শ বৌদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ার একটি অংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনের প্রজ্ঞায় আলোকিত করে। শেষে, খেলাধুলার মাধ্যমেই শিশুরা উত্তম চরিত্রযুক্ত মনোরম সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বে পরিণতি লাভ করে।
     বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার কার্যক্রমগুলিকে অতি অবশ্যই সাধারণ পাঠক্রম, সমন্বয় সাধনকারী ধর্ম ও শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে হবে যাতে করে এরা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে। বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষকদের একটি সমীক্ষায়, অধিকাংশ এই মত প্রকাশ করেছেন যে তারা এমন একটি বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার পাঠক্রম দেখতে চাইবেন যা সাধারণ এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং বৌদ্ধ ধর্মকে শিক্ষার পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং বৌদ্ধ ধর্মকে শিক্ষার থেকে পৃথক না করে। সমীক্ষা থেকে আরো জানা যায় যে, শিশুদের মধ্যে কারো বৌদ্ধ প্রকৃতিকে পালন করার জন্য বিস্তারিত বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ধর্ম ও শিক্ষাকে পরস্পরের পরিপূরক ও যুক্তিসংগত হতেই হবে। এ ধরনের পাঠ্যক্রমকে অবশ্যই বর্তমান পাঠ্যসূচী, যার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ, সামাজিক কাজকর্ম, প্রকাশ, বাক্য, এবং অনুসন্ধিৎসা ইত্যাদি তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার পাঠ্যক্রমঃ   
    বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার শিক্ষণ পদ্ধতি বৌদ্ধ নীতির উপর ভিত্তি করে রচিত। বৌদ্ধ নীতির কেন্দ্রে রয়েছে এই বিশ্বাস যে প্রত্যেকেই বোধিসত্ত্ব হতে পারে কেননা প্রত্যেকের মধ্যেই বুদ্ধের প্রকৃতি রয়েছে। অন্য কথায় বলতে গেলে পরম শিক্ষণ বলতে কিছুই নেই। যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল এই স্বভাবকে সচ্চরিত্র হিসেবে প্রকাশ হতে অনুপ্রাণিত করা।
     নিম্নে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, দশ প্রকার পারমী এবং পঞ্চশীলকে বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষায় শিশুদের জন্য কি ভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে তার একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা হল, এদের প্রতিটি শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত বৌদ্ধতত্ত্ব। একটি উপযুক্ত শিক্ষণ পদ্ধতি হল জীবনের পদ্ধতির কর্মসূচী সম্পর্কে শ্রদ্ধা। বৌদ্ধ শিক্ষণ শুধুমাত্র মানুষের জীবনকেই মূল্যবান মনে করে না, বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর জীবনকেই মূল্যবান মনে করে। অতএব এটি মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর সহাবস্থানকেই উৎসাহিত করে। এ প্রসঙ্গে মানুষ এবং প্রকৃতি মূলত দুই নয় এক, এই বৌদ্ধধর্ম বিশ্বাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক মূল্য রয়েছে। প্রকৃতির সংস্পর্শে আসা, তাতে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া এবং তার সঙ্গে আদানপ্রদান করা এগুলিকেই বৌদ্ধধর্ম বিকাশের আদর্শ প্রক্রিয়া বলে মনে করে। চারপাশের পরিবেশের অন্যান্য সমস্ত ধারনা থেকে জীবনকে পৃথক করা যায় না। জীবনের কর্মসূচী সম্পর্কে শ্রদ্ধা (Respect for Life Programme) শিশুদের পক্ষে জীবন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ শিক্ষ পাওয়ার ক্ষেত্রে এক অমূল্য সুযোগ।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ
গুণাবলী
নির্দিষ্ট অভ্যাসের দিকনির্দেশ
বিকাশের পর্যায়
সম্যক ব্যায়াম
সম্যক ব্যায়াম হল আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের প্রধান কারণ এটি জীবন ও জগৎ যেমন তেমন করে উল্লেখ করে যার দ্বারা কোন একজন বস্তুর প্রকৃতি বুঝতে পারে।
সামাজিক বিকাশ দৈহিক বিকাশ
সম্যক চিন্তা
আমাদের কর্ম সম্পাদন করার পূর্বে সম্যক চিন্তা। সম্যক চিন্তা সেই মানসিক প্রক্রিয়ার কথা বলে যা আমাদের বৌদ্ধ নীতির সম্পর্কে সঠিক অনুমান ও তা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
ঞ্জান সম্বন্বীয় বিকাশ
সম্যক বাক্য
সম্যক বাক্যের অর্থ হল আত্মপ্রেম বা সত্যবাক্যের দ্বারা অপরের সঙ্গে সহযোগিতা এবং তাদের সাহায্য করা। এর মধ্যে রয়েছে মিথ্যা ভাষণ থেকে বিরত হওয়া এবং কেবলমাত্র সত্য কথা বলা। বৌদ্ধধর্ম সম্যক বাক্যকে চারটি ভাগে ভাগ করেছে – সত্য বাক্য, করুণা বাক্য, প্রশংসা বাক্য ও সমর্থন বাক্য।   
সামাজিক ও দৈহিক বিকাশ
সম্যক আজীব (জীবিকা)
সম্যক জীবিকার অর্থ যে মানুষকে ন্যায় সঙ্গত পথে জীবিকা অর্জন করতে হবে এবং সম্পদ আইন সম্মত উপায়ে লাভ করা উচিত। শিশুদের শিক্ষা দানের সময় এই ধারনাটিকে সরল করে এই অর্থ দান করা যেতে পারে যে তাদের প্রাণীহত্যা করা, চুরি করা, দুর্বলকে উত্যক্ত করা, মিথ্যা কথা বলা, অপরকে প্রবঞ্চনা করা, বন্ধুদের সঙ্গে লড়াই করা, রাগান্বিত হওয়া এবং অভিসম্পাত দেওয়া উচিত নয়।
সামাজিক ও দৈহিক বিকাশ
সম্যক প্রচেষ্টা
সম্যক প্রচেষ্টার আক্ষরিক অর্থ হল ন্যায়সঙ্গত পথে প্রচেষ্টা করাশিশুদের তাদের আচরণ সম্পর্কে চিন্তা করে অনুতপ্ত হওয়া, পরিস্কার মনে প্রচেষ্টা করা, কুআচরন বন্ধ করা, দরিদ্রদের সাহায্য করা, কষ্ট সহ্য করা এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা ইত্যাদির কথা বলে এই ধারনাটিকে ব্যাখ্যা করা যায়।
জ্ঞান সম্বন্ধীয় বিকাশ
সম্যক স্মৃতি

অন্তর্মুখী বিকাশ
সম্যক সমাধি
সম্যক সমাধি হল জীবনের একটি পথ যার দ্বারা বৌদ্ধরা তাঁদের মনকে শান্ত করেন, তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ধ্যান করেন, এর অর্থ একটি নিখুঁত চরিত্র তৈরী করে মন ও ইচ্ছাকে কেন্দ্রীভূত করে মন ও আত্মাকে শান্ত করা।                                
অন্তর্মুখী বিকাশ

প্রাক্‌ শিশু শ্রেণীতে বৌদ্ধধর্ম ভিত্তিক সুসংহত পাঠ্যক্রমঃ
      বৌদ্ধধর্ম ভিত্তিক সুসংহত পাঠ্যক্রম হল শিক্ষার একটি নির্দিষ্ট সরঞ্জাম যার উদ্দেশ্য হল কু-আচরনযুক্ত শিশুদের তাদের বৌদ্ধ প্রকৃতি উপলব্ধি ও প্রকাশ করতে সাহায্য করা। শিক্ষায় সুসংহত হওয়ার ধারণা আসে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যা সমস্ত মানুষকে একটি সুসংহত সমগ্র হিসাবে দেখে এবং কখন ও কখন ও মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জন ডিউই বলেন যে অভিজ্ঞতা হল প্রাণী ও তার পরিবেশের মধ্যে অবিভক্ত ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া, যখন ফ্রয়েবেল ঈশ্বর, প্রকৃতি ও মানবতার ঐক্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করে সংহতির ধারণাকে শিশু শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। এই পাঠ্যক্রমের লক্ষ্য হল ধর্ম নিরপেক্ষ পাঠ্যক্রম ও ধর্মীয় শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে সংযুক্ত করা যাতে করে শিশুদের বৌদ্ধিক জগৎ অনুসন্ধান করতে ও জীবনের মূল্যবোধকে শিক্ষা করতে সাহায্য করা যায়। সরল ভাবে বলতে গেলে, এটি হল সাধারণ ঞ্জান ও বিশ্ব সম্পর্কে বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়।
বৌদ্ধ অনুসন্ধান ও ভ্রমণের মাধ্যমে শিক্ষাঃ  
     বৌদ্ধ ঘটনাগুলিতে শিক্ষামূলক সক্রিয়তা শিশুদের বুদ্ধের শিক্ষার সঙ্গে অধিকতর পরিচিত হতে এবং বৌদ্ধ হিসেবে তাদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করে। এই ঘটনাগুলি প্রচারিত জটিল বার্তা দ্বারা অভিভূত না হয়ে বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে শিশুরা তাদের অভিজ্ঞতাকে স্পষ্ট ভাবে মনে রাখতে পারে, এবং যা তারা শিক্ষা করছে তা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করার জন্য পরিপাক করতে পারে।
    বৌদ্ধদের চারটি প্রধান উৎসবের দিন রয়েছে, বুদ্ধের জন্মদিন, মহাভিনিষ্ক্রমনের দিন, বোধিজ্ঞান লাভ করার দিন এবং পরিনির্বাণের দিন। এই দিনগুলি শিশুদের বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ হতে পারে।

বৌদ্ধ উৎসবের দিনগুলি
বুদ্ধের জন্মদিন
ভাবনাঃ বুদ্ধের জন্মদিবস পালন, বৌদ্ধ ধারণাঃ কর্ম সাদৃশ্য, ছয় প্রকার নিবেদন (চা, ধূপ, মোমবাতি, ফুল, ফল, খাদ্য) 
মহাভিনিষ্ক্রমণের দিন
ভাবনাঃ বৌদ্ধ পরিচয়ের উপর পুনরায় গুরুত্ব আরোপ করাঃ বৌদ্ধ ভিক্ষু/ভিক্ষুণীদের অনুশীলনের উপায়, শিশুদের জন্য পঞ্চশীল শিক্ষা ইত্যাদি  
বুদ্ধের বোধিলাভের দিন
ভাবনাঃ বুদ্ধ হওয়া, বৌদ্ধ ধারণাঃ বোধিলাভের অর্থ, বোধিসত্ত্ব আদর্শ, ধ্যান, দশ পারমী
বুদ্ধের পরিনির্বাণের দিন
ভাবনাঃ অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম উপলব্ধি করা, নির্বাণ, পুর্ণজন্মের চক্র

চার দেওয়ালের বাইরে কাজের দ্বারা শিশুরা বৌদ্ধ আচার অনুষ্ঠানের উপাদানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও মূর্ত সংযোগের দ্বারা শিশুরা মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এই ধরণের অভিজ্ঞতা বিশেষ ধরণের কারণ এগুলি শিশুদের বুদ্ধ প্রকৃতিকে অধিকতর গুরুত্ব দান করে, শ্রেণীকক্ষের বাইরের পরিবেশে। শিশুরা বিমূর্ত চিন্তা ও কর্মের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে বুদ্ধ মূর্তি, মন্দির, ঘন্টা প্রত্যক্ষ করে ও বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
শিক্ষণ পদ্ধতিঃ নির্দেশমূলক মাধ্যম এবং শিক্ষার পরিবেশঃ
    নির্দেশমূলক মাধ্যমের মধ্যে রয়েছে শিক্ষার পরিবেশের সমস্ত উপাদান যার মধ্যে রয়েছে সমস্ত ধরণের শিক্ষা / শিক্ষণের বস্তু, শিক্ষদানের কলা কৌশল ও শিক্ষণ পরিবেশ। বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষায় নির্দেশমূলক মাধ্যমের ধারণা শিশুর চিন্তা পদ্ধতির বিবেচনার মাধ্যমে শিশুর হৃদয়ে প্রধাণ বৌদ্ধ ধারণাগুলিকে প্রোথিত করার এক কার্যকারী উপায়। এটি বৌদ্ধ শিক্ষার সমস্ত উপাদানের যোগ্য সমন্বয় সাধনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে।
     শিক্ষা সংক্রান্ত কাজকর্মে অনেক মাধ্যম শিক্ষার বিকাশে ব্যবহৃত হয়। এই মাধ্যমগুলিকে সাধারণ ভাবে শিক্ষার উপাদান বলা হয়। এগুলিকে শিক্ষণের উপাদান, শিক্ষার যন্ত্র ইত্যাদিও বলা হয়। বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষায় ফলপ্রসূ নির্দেশমূলক মাধ্যম ব্যবহার করে শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপযুক্ত ভাবে বুদ্ধের শিক্ষাকে ব্যাখ্যা করা যায়। অন্য কথায় বলতে গেলে নির্দেশমূলক মাধ্যম শিশুদের জটিল সূত্র ও গভীর বৌদ্ধ ধারণাগুলিকে বুঝতে সাহায্য করে।
পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষাঃ  
    সফলভাবে শিক্ষা পদ্ধতি চালু রাখার পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। একইভাবে একটি বৌদ্ধ পরিবেশ হল বৌদ্ধ শিক্ষণ শিশু শিক্ষার এক অপরিহার্য উপাদান। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বৌদ্ধ মন্দিরের অভ্যন্তরে বা নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত হয় তাহলে শিশুরা সহজে বৌদ্ধ পরিবেশ লাভ করতে পারে। বৌদ্ধ পরিবেশের সহজ লভ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তি শৈশবেই গঠিত হয় এবং ঐ সময়ের ধর্মীয় ছাপ ও প্রভাব পরিণত বয়সেও জারী থকে। একটি কৃত্রিম বৌদ্ধ পরিবেশ তৈরী করা যেতে পারে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষের প্রবেশ পথে এবং বিশাল কক্ষগুলিতে বুদ্ধমূর্তি বা শিশু বুদ্ধমূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে, এবং বুদ্ধের প্রতিমূর্তির আলোক চিত্র দেওয়ালে টাঙিয়ে। অপর উপায় হল বুলেটিন বোর্ড ও জানলাগুলিকে বোধিসত্তের মূর্তি, পদ্ম ফুল, শিশু হাতী ও ধর্ম্মচক্র দ্বারা সজ্জিত করা। শিশুদের সঙ্গে পদ্ম লন্ঠণ তৈরী করা এবং শ্রেণীকক্ষের ছাদ ও অভ্যন্তরের দেওয়াল অপর একটি বিকল্প হতে পারে।
উপসংহারঃ
     ফলপ্রদ বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রয়োজন হল যে শিক্ষকদের বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। শিক্ষকরা যেন কখনই শিক্ষাদানকে একটি অভ্যাসগত কর্ম বলে মনে না করেন। তাঁদের জ্ঞান সম্পর্কে অহংকারী না হয়ে তাঁদের অবশ্যই শিক্ষা লাভের বাসনা ও কঠিন পরিশ্রম করার ইচ্ছা নিয়ে শিশুদের কাছে বৌদ্ধ শিক্ষার সুফল পৌঁছে দেবার জন্য শিক্ষার গভীরে নিয়ে গিয়ে পথ খুঁজতে হবে। বৌদ্ধধর্ম ভিত্তিক একটি সুসংহত পাঠ্যক্রমজীবন পাঠ্যক্রমের প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদি একটি সর্বাঙ্গীন ব্যক্তির বিকাশকে নিশ্চিত করবে। এই পাঠ্যক্রম শিশুদের মধ্যে জীবনের প্রতি শ্রদ্ধার বিকাশে সহায়ক হবে যাতে করে তারা মানব জীবনের অর্থ বুঝতে পারে এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে পারে। নির্দেশমূলক মাধ্যম ও সহায়ক শিক্ষণ পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষাকে জ্ঞানের স্থানান্তরণ ছাড়াও শিশুর সৃজনশীল চিন্তার বিকাশের দিকে অবশ্যই লক্ষ্য দিতে হবে।

      সর্বোপরি, বৌদ্ধ শিক্ষার শিক্ষকদের পরিবর্তনের ঢেউকে বোঝা ও তার সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করতে সক্ষম হতে হবে। উপরে উল্লেখিত পাঠক্রম ও নির্দেশমূলক মাধ্যমকে বুদ্ধি বিভিন্নতার তত্ত্ব (Multiple Intelligence Theory) এর মধ্যে প্রোথিত থাকতে হবে যা বিভিন্নতা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকেই সমতার তুলনায় বেশী পৃষ্ঠপোষকতা করবে তথ্যের এই নতুন যুগে শিক্ষকেরা বৌদ্ধ শিক্ষার কাজে এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচারের কাজে নতুন প্রযুক্তির সহায়তাও নিতে পারেন। শিক্ষার লক্ষ্য যাই হোক না কেন, পরিকল্পনা কর, কাজ কর এবং দেখ এই পদ্ধতি শিক্ষার প্রকৃত ফলপ্রদ উপায় হতে পারে যা প্রগতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।