ঝাড়খণ্ডে বৌদ্ধ প্রত্নক্ষেত্র, পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষা
- সুমনপাল ভিক্ষু
প্রাককথন :
পালি ত্রিপিটক এবং তার অট্ঠকথা সমূহে বুদ্ধকালে জ্ঞাত ভারত দেশের ক্ষেত্রে 'জম্বুদীপ' নাম প্রয়োগ করা হয়েছে। সিংহলের পালি ইতিহাস গ্রন্থ, বিশেষতঃ মহাবংস এবং চূলবংস, তে জম্বুদ্বীপকে সীহল দ্বীপ (সিংহল দ্বীপ) এবং তম্বপন্নি (তাম্রর্পনী দ্বীপ) হতে, এই উভয়ের তাৎপর্য বর্তমান লংকাদ্বীপ'এর সঙ্গে সম্পৃত্ত, ভিন্ন দেশ বলা হয়েছে। 'জম্বুদ্বীপ নামককরণের এই কারণ যে এই ভূখণ্ডে জম্বু (বাতাবী) নামক বৃক্ষ, যাকে বৃহদাকার (অতিশয় বৃহৎ) রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, অধিকতর, পাওয়া যায় বা দৃষ্ট হয়। এই কারণে 'জম্বুসন্ড' বা 'জম্বুবন'ও বলা হয়।
'জাতক' হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে তাম্রপর্নী দ্বীপের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বুদ্ধযুগে ও বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তা সমুদ্র পথে দ্বারাই সংগঠিত হত, দক্ষিণ ভারত হতে স্থল মার্গ দ্বারা উক্ত অঞ্চলে উপনীত হওয়ার উল্লেখ 'মহাবংস' গ্রন্থে পাওয়া যায় না। সংযুক্ত নিকায়ের উদায়ি-সুত্ত, সেদক-সুত্ত এবং জনপদ-সুত্ততে সুস্ত (সুহম) জনপদের উল্লেখ রয়েছে যাকে আমরা বর্তমান হাজারীবাগ এবং সাঁওতাল পরগনা জেলা (ঝাড়খণ্ড) বলতে পারি। পালি পরম্পরা অনুসারে অধুনা ঝাড়খণ্ড রাজ্যে বৌদ্ধ প্রভাব বিদ্যমান ছিল তা স্পষ্ট ভাবেই প্রতীয়মান হয়।
জাতকট্ঠকথা'তে বলা হয়েছে যে, "মধ্যম দেশের পূর্বে কজঙ্গল নামক জনপদ ছিল। অতএব শালবৃক্ষের অরণ্য এবং সীমান্ত প্রদেশ।" এই বিবরণ হতে স্পষ্টতর হয় ভগবান বুদ্ধের জীবনকালে মধ্যদেশের পূর্বসীমা কজঙ্গল নামক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দীঘ নিকায় 'এর অট্টকথা (সুমঙ্গল বিলাসিনী) এবং কিছু জাতকে (জাতক, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২২৬ এবং ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৩১০) এই বিষয়টি সমর্থন করা হয়েছে ভগবান বুদ্ধের সময়কালে কজঙ্গল একটি সমৃদ্ধশালী (দব্বসম্ভারসুলভা) জনপদ এবং সুন্দর কুশ'এর জন্য সুপ্রসিদ্ধ ছিল। কজঙ্গলে একটি বেণু বণ বা সুবেণুবন নামক একটি সুরম্য স্থান ছিল এবং অপর একটি অরণ্য, যার নাম মুখেলুবন ছিল।
মজ্ঝমনিকায়'এর ইন্দ্রিয় ভাবনা সুত্তের উপদেশ ভগবান বুদ্ধ কজঙ্গল অঞ্চলের মুখেলবনে প্রদান করেছিলেন, এর অপর নাম ছিল সুবেণুবন। মিলিন্দ পঞ্হতে কজঙ্গলকে একটি ব্রাহ্মণগ্রাম (কজঙ্গলং নাম ব্রাহ্মণগামো, পৃ. ৯) বলা হয়েছে। বৌদ্ধ সংস্কৃত গ্রন্থ 'অবদান শতক'এ কজঙ্গল এর নাম 'কচঙ্গল' প্রদত্ত হয়েছে।
কজঙ্গল' জনপদে চীনা বৌদ্ধ পর্যটক শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাং) ৭ম শতাব্দী (খ্রী.) উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি উক্ত জনপদটি চম্পা'র পূর্বে ৪০০ 'লী' অর্থাৎ প্রায় ৬৭ মাইল দূরে অবস্থিত বলেছেন। শুয়াং জাঙ্ কজঙ্গল অঞ্চলের চীনা রূপান্তর 'ক-চু-বেন-কি-লো' অথবা 'কি-চু-খি-লো' করেছিলেন।
বর্তমানে আমরা বলতে পারি শুয়াং জাঙ্ যে 'ক-চু-বেন-কি-লো' বা 'কি-চু-খি-লো' জনপদের কথা উল্লেখ করেছেন তা বুদ্ধকালীন 'কজঙ্গল' ছিল। কানিংহাম'এর মতে এই কজঙ্গল নামক জনপদটি রাজমহল হতে ১৮ মাইল দক্ষিণে বিহার রাজ্যের জেলা সাঁওতাল পরগণা (অধুনা ঝাড়খণ্ড রাজ্য) অঞ্চলে অবস্থিত।
মধ্যদেশ'এর দক্ষিণ-পূর্বে প্রাচীন সললবতী নদী বহমান ছিল। এই নদীর বর্তমান নাম সিলাই, যা ঝাড়খণ্ডের হাজারি বাগ এবং পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা হতে প্রবাহিত হয়েছে।
মজ্ঝিম দেশের পূর্ব সীমা যা কজঙ্গল নামক জনপদ পর্যন্ত পালি ত্রিপিটকের প্রাচীনতম অংশ বিনয় পিটকের মহাবগ্গতে উল্লেখিত হয়েছে, তা মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন'এর মতে সুহম জনপদ একটি অংশ। যা বাস্তবিক অর্থে সঠিক বলেই প্রমাণিত হয়েছে। পালি ত্রিপিটকে মধ্যদেশ'এর পূর্ব সীমান্তে কজঙ্গল অঞ্চলটিকে মগধ জনপদের একটি বর্ধিত অংশ বলা হয়েছে।
ঋগ্বেদের একটি শ্লোকে (৩১.১৫৩,১১৪) কীকট প্রদেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই কীকট প্রদেশ (বৈদিক ইনডেক্স, পৃ. ১১৬) মূল অর্থে ছিল বুদ্ধকালীন 'সুহম' জনপদ। এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে ব্রাত্য অর্থাৎ বৈদিক সংস্কৃতি বহির্ভূত বলা হয়েছে।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন 'বুদ্ধচর্যা' (পৃ. ৩৭১, পদ-সংকেত ৫) গ্রন্থে বলেছেন বর্তমান হাজারিবাগ জেলা এবং সাঁওতাল পরগনা সুহ্ম জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৫. লাহা'র মতানুসারে সুহম জনপদের বিস্তৃতি আধুনিক মেদিনীপুর (পূর্ব-পশ্চিম) জেলার সমান ছিল (ইন্ডিয়া এজ ডেসক্রাইব ইন আলি টেক্সট অফ বুড্ডিজম অ্যান্ড জৈনজিম্, পৃ. ৫১)।
সুহম' জনপদের সেতক, সেদক বা দেসক অঞ্চলে ভগবান বুদ্ধ বিহার করেছিলেন এবং এই অঞ্চলে তিনি সংযুক্ত নিকায় 'এর উদায়ি সুত্ত, সেদক সুত্ত এবং জনপদ সুত্তের উপদেশ প্রদান করেছিলেন (পৃ. ৬৬১, ৫৯৫-৬৯৬)। তেলপত্ত জাতকের উপদেশ ও তিনি এই স্থানে প্রদান করেছিলেন।
ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে অন্তিম ২৫তম বর্ষাবাস অতিবাহিত করার সময়কালে যে সকল জনপদে বিহার করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সুহম (সুম্ভ) জনপদের সেদক, সেতক বা দেসক এবং কজঙ্গল।
মোহানা নদীর ইতিহাস এবং বৌদ্ধ ধর্ম :
বর্তমান ঝাড়খণ্ড অঞ্চল বিহার রাজ্যের পাশ্ববর্তী রাজ্য হওয়ার কারণে বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রূপে পরিগণিত হয়েছিল একথা অস্বীকার করার উপায় বা অবকাশ কোনটাই নেই কেননা এই অঞ্চল হতে প্রাপ্ত বৌদ্ধ অবশেষ গুলি তার উজ্জ্বল উদ্ধার। অতএব এই উজ্জ্বল উদ্ধারের অনুসন্ধানে একসময় আমি বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ, পুরাতত্ত্বের জার্ণাল এবং বৌদ্ধ মূর্তি প্রতীক ইত্যাদি পাঠ পূর্বক ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের বৌদ্ধ অবশেষ সম্পর্কিত বিষয়গুলিকে স্বচক্ষে অবলোকনের তাড়নায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং এমনবস্থায় আমি ২০১৯, ২০২৩ এবং ২০২৫ এই সময়কালে উক্ত অঞ্চল হতে আবিস্কৃত বৌদ্ধ পুরাতত্ব গুলিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। যদিও এই বিষয়টি ছিল আমার কাছে যথেষ্ট শ্রমসাধ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও আমি বুদ্ধের ইতিহাস সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলাম।
ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের বেশ কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে কাটকামসান্ডি ব্লকের সদরের আগে এবং বলবল উষ্ণপ্রসবণের সন্নিকটে মোহনা নদী অবস্থিত। লোকশ্রুতি মতে ভগবান বুদ্ধ এইস্থানে ভিক্ষুসংঘ সহ বিহার করেছিলেন। এই স্থানের কাটকামসান্ডি, দাতো খুর্দ এবং ইটখোরী অঞ্চলে বহু বৌদ্ধ নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছি। জি. হান্টার থম্পসনের মতে (১৮৫৮-৫৯ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ রাজস্ব নিরীক্ষক) চম্পা এবং কেন্দির সীমানায় ১৩০ ফুট উলপ্রপাত সহ মোহনা নদীর উৎপত্তি, স্যার এডুউইন আর্ণলড (দ্য লাইট অফ এশিয়া পরিচ্ছেদ নং ৬) বলেছেন ভগবান বুদ্ধ মোহনা নদী সন্নিকটে স্থিত তামাসিন ও ইটখোরী হয়ে বুদ্ধগয়ার পথে গমন করেছিলেন।
এই অঞ্চল হতে গুপ্ত এবং পাল যুগের বহু বৌদ্ধ মূর্তি এবং শিল্পকলার অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। বর্তমানে সেগুলি ইটখোরী সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে। মূর্তি ও স্থাপত্য তথা শিল্পকর্ম গুলি বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত। মূর্তি সমূহের গঠন আঙ্গিক প্রমাণ করে যে এগুলি মূলত ৪-১১ শতাব্দীকালে (গুপ্ত এবং পাল) নির্মিত হয়েছিল।
৭ম শতাব্দীর টেনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজক শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাং) এর যাত্রা বিবরণে মোহনা নদী এবং ইটখোরী অঞ্চলের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি এই নদীটির নাম 'মোহ' লিখেছিলেন, কাণিংহাম'এর মতে এই মোহ নদী মূল অর্থে মোহনা নদী। শুয়াং জাঙ্ বুদ্ধগয়া হতে পূর্বদিকে 'কুককুট পাদ' পাহাড়ে পৌঁছানোর জন্য জঙ্গল এবং নদীপথ অতিক্রম করার কথা উল্লেখ করেছেন।
মোহানা নদী যেখানে ১নং জাতীয় সড়ক অতিক্রম করেছে সেখানে ভালুয়া গ্রাম হতে কুকুকট পাদ পাহাড় দেখা যায়। শুয়াং জাঙ্-এর মতে মহাকাশ্যপ মহাস্থবির এই পাহাড়ের চূড়াতেই নির্বাণ সমাধি লাভ করেছিলেন। এ কুকুকট পাদ (গুরপা) পাহাড়ের চূড়ায় বৌদ্ধ সম্রাট ধম্মাশোক (অশোক) নির্মিত একটি বৌদ্ধ স্তূপ বিদ্যমান। স্তূপটির গঠন শৈলী অতি চমৎকার কিন্তু পাহাড়টির চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি এবং গভীর উপত্যকার কারণে এই স্থানে উপনীত হওয়া অতীত দুস্কর তথা কষ্টসাধ্য। হাজারিবাগ'এর উত্তর পশ্চিমে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এর অবস্থান।
ইটখোরীর ইতিহাস ও মোলাপো:
ইটখোরীর বর্তমান নাম 'ভদ্রাকালী'। প্রথমদিকে বিষয়টি আমার বোধগম্য হয়নি। কেননা শুয়াং জাঙ্ একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি ভিক্ষু ভদ্ররুচি। আমার ধারণা তিনি ভদ্রবাহু। যিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পরামর্শদাতা ছিলেন। শুয়াং জাঙ্ এর মতে এই ভদ্ররুচি বা ভদ্রবাহু 'পশ্চিম ভারতের একজন ভিক্ষু ছিলেন। তবে তথ্য অনুসন্ধান দ্বারা এই সত্যে উপনীত হওয়া যায় যে ভদ্রবাহু'র মূল জন্মস্থান ছিল তামাসিনের পশ্চিমদিকে, অর্থাৎ ইটখোরীর পশ্চিমে প্রায় ১২ মাইল দূরের কোটেশ্বরী। বর্তমান ইটখোরীর বিভিন্ন অংশে বৌদ্ধ নিদর্শন বিদ্যমান। অপর দিকে মোহ নদীর ওপর তামাসিনের নদী খাত অঞ্চল, এখানেই নদীটি একটি জলপ্রপাত সৃষ্টি করে উত্তর দিকে বিহার রাজ্যের গয়ার সমতল ভূমির দিকে প্রবাহিত হয়েছে। তামাসিনের নদীখাতের দক্ষিণে একটি গুহাকন্দর বৌদ্ধ সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
মনে হয় ভদ্রবাহুর বাসস্থান ছিল কোটেশ্বরী, শুয়াং জাঙ্ যাকে বলেছেন রাজধানীর (ইটখোরী) উত্তর-পশ্চিমে ব্রাহ্মণের নগর। এই অঞ্চলটি জৈন স্থাপত্যে পরিপূর্ণ। তবে নবম শতাব্দী তে তৈরী কালো পাথর দ্বারা নির্মিত বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী 'তারা'র একটি পূর্ণ মূর্তি (১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে আবিস্তৃত এবং পাল যুগীয় রাজা দ্বিতীয় মহেন্দ্র পালের সমসাময়িক) যা বর্তমানে 'ভদ্রকালী' নামে এই মন্দির শহরে বিরাজমান। ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে স্যার অরেল স্টাইন এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ও জৈন মূর্তি তথা স্থাপত্য গুলি পরিদর্শন করেছিলেন।
ভদ্ররুচি বা ভদ্রবাহু মূল অর্থে ছিলেন জৈন তীর্থিক। শুয়াং জঙ্ বর্ণিত ভিক্ষু ভদ্ররুচি এবং এই ব্যক্তি এক নয়। কেননা তামাসিনের 'অবরোহন-কুন্ড'এর সন্নিকটে যে সকল প্রাচীন নিদর্শন গুলি আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলি জৈন সাক্ষ্য বহন করে। ইটখোরীর বৌদ্ধ নিদর্শন যুক্ত ২৩টি স্থানের যেসকল বৌদ্ধ স্থাপত্য গুলি আমি প্রত্যক্ষ করেছিল সেগুলি মূল হতে ৬-৯ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) সময় কালের কিন্তু সীতাগাড়া হতে প্রাপ্ত বুদ্ধ মূর্তিটির গঠন শৈলী প্রমান করে যে এটি ১০ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) কালের।
ইটখোরি প্রত্নস্হল
একসময় গৌতম বুদ্ধ এখানে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তিনি "ইতি খোই" মন্তব্যটি করে স্থানটি ত্যাগ করেন; পালি ভাষায় যার অর্থ হলো—"আমি তাঁকে এখানেই হারিয়ে ফেললাম"। পরবর্তীতে, এই স্থানটি 'ইটখোরি' নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ইটখোরিতে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় ১২০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ের বিভিন্ন বৌদ্ধ পুরাবশেষ বিদ্যমান। এখানে একটি 'স্তূপ'-সদৃশ স্থাপনা রয়েছে, যার প্রতিটি দিকে ১০৪ জন বোধিসত্ত্ব এবং চারজন প্রধান বুদ্ধের মূর্তি খোদিত আছে। সারা বছর ধরেই বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ ও জৈন ভিক্ষুরা ইটখোরি পরিদর্শনে আসেন।
ইটখোরিতে দশম জৈন তীর্থঙ্কর শীতলনাথের পদচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। ইটখোরিতে একটি জৈন মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
নবম শতাব্দীতে নির্মিত ' ভদ্রকালী মন্দির'-এ বেশ কিছু প্রাচীন দেব-দেবীর মূর্তি রয়েছে; যার মধ্যে হিন্দু দেবী ভদ্রকালী এবং বৌদ্ধ দেবী তারার মূর্তি অন্যতম। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে 'ইটখোরি মহোৎসব'-এর আয়োজন করা হয়।
ধারণা করা হয় যে, সিদ্ধার্থ গৌতম ইটখোরি থেকে বুদ্ধগয়ায় গমন করেছিলেন এবং সেখানেই তিনি বোধিলাভ করেছিলেন। ইটখোরির অদূরে 'বিহারী' নামক একটি গ্রামে খননকার্যের ফলে অসংখ্য বৌদ্ধ ও হিন্দু ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এই অঞ্চলে কূপ খনন বা অনুরূপ কাজের সময় আরও অনেক ভাস্কর্য খুঁজে পাওয়া গেছে। ইটখোড়ি জাদুঘরে বেশ কিছু মূল্যবান ভাস্কর্য সংরক্ষিত আছে।
ভারতের আর্কিওলজিকাল জরিপ (এএসআই) ঝাড়খণ্ডের হাজারীবাগ জেলার একটি পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত একটি গ্রামে একটি ঢিবির নিচে সমাধিপ্রাপ্ত একটি বৌদ্ধ বিহারটি আবিষ্কার করেছে, যা কমপক্ষে ৯০০ বছরের পুরানো বলে মনে করা হয়। সবেমাত্র ১০০ মিটার গভীরে একই ঢিবিটির নিচে সমাহিত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কারের দু'মাস পরে এই সন্ধানটি পাওয়া গেছে, ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া গেল বুদ্ধ ও দেবী তারার মূর্তি। কিছুদিন ধরে, এএসআই-এর পাটনা শাখার একটি পর্যবেক্ষণ দল জেলা সদর হাজারীবাগ থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সীতাগরী পাহাড়ের জুলজুল পাহাড়ের নিকটবর্তী বুরহানী গ্রামে দেবী তারা ও বুদ্ধের ১০ টি পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেছিলেন যে এই বিহার টি সারনাথ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বারাণসী যাওয়ার পুরান পথে রয়েছে, যেখানে বুদ্ধ তাঁর প্রথম ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। তারা বলেছেন যে তারা দেবদেবীর মূর্তির উপস্থিতি এই অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান রূপের সম্ভাব্য বিস্তার দেখায়।
এএসআই-এর পাটনার তৃতীয় খননকারী শাখার সহকারী প্রত্নতাত্ত্বিক নিরাজ কুমার মিশ্র বলেছেন গত বছরের ডিসেম্বরে তারা জুলজুল পাহাড়ের পূর্ব পার্শ্বে একটি কৃষিজ জমির নিকটে তিনটি কক্ষ বিশিষ্ট একটি বৌদ্ধ বিহার পেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন যে কেন্দ্রীয় গর্ভগৃহে তারার মূর্তি রয়েছে এবং দুটি সহায়ক মন্দিরের বুদ্ধের মূর্তিও রয়েছে। তিনি বলেন, “এর আগে প্রসঙ্গটি পরিষ্কার ছিল না,” তিনি আরও জানান, তাদের মনোযোগ দ্বিতীয় ঢিবিতে স্থানান্তরিত হয় এবং ৩১ জানুয়ারি খননকাজ শুরু হয়েছিল। মিশ্র বলেছেন, “আমরা জুলজুল পাহাড়ের পাদদেশের কাছে একটি ঢিবিতে মনোনিবেশ করেছি যেখানে আমরা বৌদ্ধ বিহার-মন্দিরের অবশেষ দেখতে পেয়েছি যেখানে পাশের ঘর এবং একটি উন্মুক্ত উঠান রয়েছে,” মিশ্র বলেছিলেন, “আমরা বরদ মুদ্রায় তারা দেবীর চারটি মূর্তি পেয়েছি [ভুমিস্পর্শ মুদ্রায় বুদ্ধের ছয় মূর্তি [হাতের অঙ্গভঙ্গি ডান হাতের পাঁচটি আঙ্গুল দেখিয়ে পৃথিবীর দিকে বুদ্ধের আলোকিত প্রতীক দেখিয়েছে]। সুতরাং এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধান হিসাবে দেবী তারার মূর্তিগুলির অর্থ এটি বৌদ্ধ ধর্মের বজ্রযান সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
বজ্রযান হ'ল তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের একটি রূপ যা ষষ্ঠ থেকে একাদশ শতাব্দীতে ভারতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। মিশ্র বলেছেন, এএসআই এখনও কাঠামোগত বৈজ্ঞানিক ডেটিং করেন নি, তবে এটি পূর্বের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পাল সময়কে উপস্থাপন বা স্বীকৃতি দান করে।
“২০১৯ সাল খননকালে এএসআই বলছেন- "আমরা চার-পাঁচটি শব্দের একটি লিপি পেয়েছি এবং এএসআই মহীশূরকে ঐতিহাসিক পান্ডুলিপিগুলির জন্য প্যালিওগ্রাফিক ডেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছিলাম। তারা বলেছিল এটি একটি নাগরী লিপি এবং তারা এটি খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে তারিখ করেছিল। নাগরী দেবনাগরী লিপির পূর্ববর্তী সংস্করণ এবং শব্দগুলি বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষঙ্গকে নির্দেশ করে। এবারও আমরা তারা মূর্তিতে নাগরী লিপি পেয়েছি। ”
এএসআই পাটনার তত্ত্বাবধায়ক প্রত্নতাত্ত্বিক রাজেন্দ্র দেহুরী বলেছেন: “এটি ঝাড়খণ্ডে বৌদ্ধধর্মের প্রসারের দিক থেকে একটি উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধান। তবে এটি গবেষণা এবং আরও অনুসন্ধানের বিষয় ”
প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত করেছেন যে বাহরনপুর একটি বিহার সহ একটি উন্নত শহর ছিল।
ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের প্রত্নতত্ত্ববিদ বীরেন্দ্র কুমার পার্থ বলেছেন যে দলটি মৃৎশিল্প, দেয়াল, সিঁড়ি এবং সরঞ্জামের মতো অন্যান্য নিদর্শনগুলি খুঁজে পেয়েছে।
“সাবধানতা সহকারে বুদ্ধ মূর্তি তোলার চেষ্টা চলছে। মুখটি ১০ ইঞ্চি লম্বা তাই আমরা আশা করি এটি একটি বড় ভাস্কর্য। স্থানটিকে একটি প্রধান গর্ভগৃহ হিসাবে নিশ্চিত করে পার্থ বলেছিলেন যে এএসআই দল একটি বসে থাকা অবস্থাতেই বুদ্ধ মূর্তিও পেয়েছে।
বৌদ্ধ ভিক্ষু ভন্তে তিসওয়ারো বাহরনপুর সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশিত হওয়ার পরে এএসআই সেই স্থানে কাজ শুরু করেছিলেন, যা তার সময়ে ব্যাপকভাবে একটি বিহার হিসাবে বিবেচিত হত। এলাকার অনেক বাসিন্দা তাদের ঘর তৈরি করার সময় ওই অঞ্চলে প্রাচীন মূর্তিগুলি খুঁজে পেয়েছিলেন এবং যা কিনা জায়গাটি আবিষ্কারের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
এএসআই প্রথমে ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রত্নস্হলটি খনন শুরু করেছিল, তবে লকডাউনের কারণে এটি কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। এএসআইকে নভেম্বরে ২০১৮ সালে বাহরনপুরের ঢিবিগুলি খনন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, এরপরে তারা বৌদ্ধ ভিক্ষু ভন্তে তিশওয়ারো বাহরনপুরের বিবরণ করার পরে তারা সেই জায়গায় কাজ শুরু করেছিলেন, যা কিনা সেই যুগে একটি জনপ্রিয় বিহার হিসাবে বিবেচিত হত। তিশওয়ারো একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মানচিত্রের ভিত্তিতে এই জায়গাটি আবিষ্কার করেছিলেন যার মধ্যে বহরনপুরের বিশদ ছিল। তার উদ্যোগে এএসআই ঘটনাস্থলে খননকাজ শুরু করেন।
এএসআই গৌতম বুদ্ধ এবং মার্বেল সাদা বেলেপাথরের তৈরি বেশ কয়েকটি মূর্তি পেয়েছেন। এটি বিবেচনা করা হত যে বাহরনপুরেও পাল রাজবংশের মতো কাঠামো ছিল যা নবম শতাব্দীতে এই অঞ্চল শাসন করত। কুমার বলেছেন, “আমরা এই দীর্ঘতম মূর্তিটি বের করার চেষ্টা করছি। প্রতিমার যাতে কোনও ক্ষতি না হয় সেজন্য আমাদের সতর্কতার সাথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ” তিনি বলেছেন যে ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে বাহরনপুর প্রত্নস্হল হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি ব্যক্তি প্রত্নস্হলটি পরিদর্শন করছেন।
কুককুটপাদ পাহাড়ের বৌদ্ধ স্তূপ:
কুককুটপাদ পাহাড়কে এখন গুরপা (গুরুপাদ) পাহাড় নামে স্থানীয়রা অভিহিত করে। বর্তমানে গুরুপাদ বা গুরুপা পাহাড় ব্রাহ্মণ্যধর্মের কোন এক তথাকথিত দেবী 'গুরুপাসিনি মা' নামে পূজিত হয়। এখনে ঘন অরণ্যে পরিপূর্ণ একটি পথ পাহাড়ের ওপর হতে নিচের দিকে নেমে গেছে কিন্তু এই পথটি পাথর খন্ড দ্বারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, অন্য দিকে আরও একটি পথ ২৮টি সিঁড়ি অতিক্রম করে একটা সুবিশাল পাথরের ওপর এনে দাঁড় করায়। এর পাশেই একটি পাথর খন্ডের নীচে স্থিত কবর হতে ৬ ফুট দীর্ঘ এক মনুষ্য কংকাল পাওয়া গেছে। মনে করা হয় এটি ভিক্ষু মহাকাশ্যপ স্থবিরের, যিনি প্রথম বৌদ্ধ মহা সঙ্গীতির সভাপতি ছিলেন।
এই গুরপা পাহাড়ে আসতে হলে (বিহার-ঝাড়খণ্ডের সীমান্ত) হাওড়া থেকে গুরপা হল্ট অথবা গুঝান্ডি কিম্বা কোডারমা জংশনে নেমে বাসে গুরপা। পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত সর্বমোট সিঁড়ি ১৬৮০টি।
ইটখোরীর অনতি দূরে বিহারী গ্রাম হতে অবলোকিতেশ্বর'এর একটি সুন্দর ভাস্কর্য পাওয়া গেছে, এই স্থানটি হাজারিবাগ হতে খুব দূরে নয় এবং ইটখোরী বৌদ্ধ ক্ষেত্রের মধ্যেই অবস্থিত। লমবাটে একটি সবুজ পাথরের ওপরে রিলিফের কাজ, ডান পদটি পদ্মের ওপরে এবং চারপাশে নাগকূল।
বহরনপুর (বুরহানপুর) ঢিবি - বৌদ্ধ সংযোগ:
হাজারিবাগ শহরের সন্নিকটে সীতাগাড়া পাহাড়ের পূর্বদিকে একটি বিরাট অঞ্চল হতে বেশ কিছু বৌদ্ধ নিদর্শন পাওয়া গেছে। অঞ্চলটি আদিবাসী অধ্যুষিত এবং স্থানীয় নাম 'জুলজুল'। সীতাগাড়া হতে ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগ বৃহৎ একটি বুদ্ধ মূর্তি, একটি তারা দেবীর মূর্তি এবং সেই সঙ্গে একই দেবদেবীর বহু ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র মূর্তি আবিস্কার করেছে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কোনরূপ চিহ্ন এই স্থানে উপস্থিত নেই এবং সরকারীভাবে এই অঞ্চল (জুলজুল বা বহরনপুর) টি ৯-১০ শতাব্দীর সময়কালের বৌদ্ধ প্রভাবিত জনপদ। মূল অঞ্চলটি হল বহরনপুর টিলা, ওই নামের গ্রামের বিপরীত দিকে। বর্তমানে এই স্থানটি আইকোমস (ইন্টার ন্যাশনাল কাউসিল অন মনুমেন্টস্ অ্যান্ড সাইটস্) প্যারিস (২০০৪) এবং সিক্রেন্ট সাইটস্ ইন্টারন্যাশনাল, ইউ.এস.এ (২০০৫) কর্তৃক প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শন রূপে তালিকা ভুক্ত রয়েছে।
বুরহানপুর (বহরমপুর) এবং সম্পূর্ণ সীতাগড় কিম্বা উত্তর ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের হাজারিবাগ তথা ইটখোরী অঞ্চলের সঙ্গে আমি পাল যুগের যোগাযোগের বিষয়টি সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছিলাম, এমতবস্থায় পুনঃরায় আমি ইটখোরীর সংগ্রহশালায় উপস্থিত হই এবং সেটা ছিল ২০১৯, ২০২৩, ও ২০২৫ (খ্রীষ্টাব্দ)। কেননা ফা-শিয়েন'এর বর্ণনা অনুসারে তিনি নালন্দা থেকে চম্পা হয়ে বাংলার তমলুকে (প্রাচীন তাম্রলিপ্তি) গিয়েছিলেন। বহরনপুর ঢিবি ও সমগ্র সীতাগড় পাল শাসনাধীন ছিল, এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। কেননা, আর.সি. মজুমদার (ইম্পিরিয়াল হিস্ট্রি অফ কনৌজ, পৃ. ৪৬) এবং বেদপালের মুঙ্গের অভিলেখ' প্রমান করে অবিভক্ত বঙ্গ এবং বিহার 'উত্তরাপথ' স্বামী ধর্মপালের নিয়ন্ত্রণ ছিল।
উত্তর ঝাড়খণ্ডের ঠিক কোন কোন অঞ্চল বৌদ্ধ তীর্থক্ষেত্রে পরিনত হয়ে ছিল, তা আজ আমরা অনুমান করতে পারি মাত্র। এই অঞ্চলের পাহাড় অরণ্য এবং সমতল ক্ষেত্র গুলিতে এখনও যদি সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা যায় তাহলে বহু বৌদ্ধ ক্ষেত্র পাওয়া যাবে এটা স্বাভাবিক। ২০১৯ (খ্রীষ্টাব্দে) আমি যখন বহরনপুর গ্রামে আমি তখন আমি দেখেছি গ্রামবাসীরা বিশেষ কোন গুরুত্ব ব্যতীত বৌদ্ধ ভাস্কর্যের অংশ বিশেষ সংগ্রহ করে গৃহের প্রাচীর সজ্জার কাজে ব্যহার করে চলেছে।
বহরনপুর ঢিবি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হতে প্রাপ্ত বৌদ্ধ মূর্তিগুলি রাজমহলের কালো পাথরের সূক্ষ্ম নির্মাণ এবং রচনাশৈলী পাল (৮-১১ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে) যুগের। সীতাগাড়া, ক্যানারী পাহাড় এমনকি বর্তমান সময়ের বহুগ্রাম (সেখা, বারসি এবং লোহারি) আমি পরিভ্রমণ করে বৌদ্ধ ভগ্নাবশেষ দেখতে পেয়েছি।
এই অঞ্চলের বৌদ্ধ ইতিহাস তথা স্থাপত্য, বিশেষত রাজমহল পাহাড়ের পাথর হতে নির্মিত ভাস্কর্য গুলি প্রায় ৭ম শতাব্দীর বলে চিহ্নিত করা গেছে। বৌদ্ধ পাল রাজত্বের সঙ্গে ভাস্কর্য গুলির সম্পর্ক এবং বর্তমান ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে এদের সাম্রাজ্য টিকে ছিল প্রায় দ্বাদশ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) অবধি।
হাজারিবাগের বহরনপুর (বুরহানপুর) এবং পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বহরমপুর'এর মধ্যেকার সম্পর্ক এবং বৌদ্ধ তীর্থপথ অনুসন্ধান :
হাজারিবাগ অঞ্চলের সীতাগাড়া পাহাড়ের বহরনপুর ঢিবি হতে একটি বৃহৎ পাহারের তিন চতুর্থাংশ অংশ জুড়ে খোদাই করা অবলোকিতেশ্বর'এর মূর্তি পাওয়া গেছে। এর কাছেই পাওয়া গেছে। এর কাছেই পাওয়া গেছে ৩ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটা ভারী পাথরে খোদাই করা তারা'র মূর্তি।
২০১৯ খ্রীষ্টাব্দে আমি ইটখোরীর সন্নিকটে বেহারি'তে (করমা খুর্দ) একটি সবুজ পাথরে খোদিত লম্বাটে ধরণের অবলোকিতেশ্বর'এর মূর্তি দেখেছিলাম। মূর্তিটির গঠন শৈলী হুবহু হাজারিবাগের বহরনপুরের মতো। মূর্তিটির ডান পদ একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপরে নামানো এবং তার চারপাশে রয়েছে নাগকূল (নাগদেবতা)। আমি বহরনপুরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরের মধ্যেকার একটা আন্ত সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে সচেষ্ট ছিলাম। কেননা প্রাচীন কর্ণ সুবর্ণ ছিল (বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর) বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক শশাঙ্কের রাজধানী এবং চৈনিক পরিব্রাজক শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাং) তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে এই অঞ্চলের বিবরণ প্রদান করেছিলেন। ফা-শিয়েন' মতে পরিব্রাজকেরা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধগয়া অথবা মথুরা গমনের উদ্দেশ্যে চীনদেশ হতে এখানেই নৌকাযোগে আসতেন। অন্যদিকে কর্ণসুবর্ণ অঞ্চলটি ছিল ভাগীরথী সংলগ্ন। ফলে এই অঞ্চল হতে তাম্রলিপ্ত ও বুদ্ধগয়া, রাজগীর এবং নালন্দা অবশই যোগাযোগের পথ ছিল। শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাং) কর্ণসুবর্ণ অঞ্চলে 'সম্মীতীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়'এর বিহার, বৌদ্ধ মূর্তি অবলোকন করেছিলেন।
ছোটনাগপুর (ঝাড়খণ্ড) মালভূমি হতে একটি পথ বাঁকুড়া, পুরুলিয়া হয়ে তাম্রলিপ্তি (বর্তমান তমলুক) বন্দরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অপর দিকে ইটখোরী, বুদ্ধগয়া, নালন্দা এমনকি মথুরায় সংযোগের জন্য আরও একটি পথ ছিল। যা সুদুর পশ্চিমে হর্ষবর্ধনের রাজত্বের সীমানায় বারাণসী পর্যন্ত যোগাযোগ রক্ষা করত। পঞ্চম হতে দ্বাদশ শতাব্দী কালে কর্ণসুবর্ণ হতে বণিকরা (সার্থবাহ) তাম্রলিপ্তি বন্দরে ভাগীরথীর পথ ধরে আসতেন। এছাড়া মালদার খুব কাছেই বিহার রাজ্য। স্বাভাবিক নিয়মে বিহার হতে কর্ণসুবর্ণ নগরে উপনীত হওয়ার পথ (মার্গ) অবশ্যই ছিল।
শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাং)'এর বর্ণনানুসারে ইটখোটীর মন্দির মালার মধ্যেই হাজারিবাগ অঞ্চলটিকেও যুক্ত করা যেতে পারে। কেননা বহরনপুর টিবিটাকে সীতাগড় বৌদ্ধ বিহারের সঙ্গে বাংলার পাল রাজত্বের বৌদ্ধ ধর্মের উন্মেষের একটি সম্পর্ক সূত্র অবশ্যই রয়েছে। এখন আজ হতে ১৫০০ শতাব্দীর পূর্বে বিহার বঙ্গের রাজমার্গের একটা মানচিত্র কল্পনা করা যাক, তাহলে বিষয় পরিস্কার হবে। তৎকালীন চীনা পরিব্রাজকদের ভ্রমণ পথ বর্তমান সুবর্ণরেখা নদী বরাবর পুরুলিয়ার বরাবাজার হয়ে মানভূম অঞ্চলে, যেখানে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্যা বৌদ্ধ মূর্তি এবং স্থাপত্যের ভগ্নাবশেষ। এই পথ ধরে আরও দক্ষিণে ওড়িশার বরাগোড়া থেকে সিমলিপাল হয়ে কটকের দিকে গেলে বৌদ্ধধর্মের আরও প্রাচীন ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যাবে। কটক হতে সম্পলপুর পর্যন্ত মহানদী, মারাগুডা এবং জঙ্কনদীর আশেপাশে বহু বৌদ্ধ নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে।
৭ম শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) কালে যখন গুপ্ত সাম্রাজ্য অস্তমিত প্রায়, সেই সময় চীনা পরিব্রাজক শুয়াং জাঙ্ বুদ্ধগয়া এবং নালন্দায় উপস্থিত হন। তারপরেও বৌদ্ধ ধর্ম নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ৬-৭ দশক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল, ৯ শতাব্দীাকালে গুর্জর প্রতিহাররা রাজগীর নালন্দা দখল করে নেয়। সেই সময়কালেই ইটখোরীতে তারা দেবীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল।
ঝাড়খণ্ডের দিকে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা বরাবর ভাগীরথী, অজয়, ময়ূরাক্ষী, দামোদর, দ্বারকেশ্বর, তারকেশ্বর, কাঁসই-শিলাই, কংসাবতী এবং সুবর্ণরেখা নদী বিদ্যমান। ঝাড়খণ্ডের এই অঞ্চল সিংভূম হয়ে ওড়িশার সঙ্গে যুক্ত, আবার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত মুর্শিদাবাদ এর কর্ণসুবর্ণ থেকে পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুরের সীমানা বরাবর। ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এই অঞ্চলটাই ছিল মগধের সঙ্গে উত্তরভারতের পূর্ব অংশের প্রধান বাণিজ্য পথ। ৮ম শতাব্দীর উদয়মানের শিলালিপিতে (কানিংহাম, পৃ. ৩৪৩) এই তথা পাওয়া যায়। এই পথ (মার্গ)টি কোডারমার দুধপানি ঘাট থেকে (গয়া-কোডারমা) গুরপা (কুককুটপাদ) পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
ছোটনাগপুর মালভূমি এবং দক্ষিণ মগধ অঞ্চলে প্রাক-পাল যুগীয় বৌদ্ধ ভাস্কর্য :
বিহার রাজ্যের বৌদ্ধধর্ম নিয়ে যেরূপ আলোচনা হয়েছে, ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের বৌদ্ধধর্ম স্থাপত্য বিষয়ে সেরূপ আলোচনা নেই। এমন কি বঙ্গীয় বৌদ্ধদের মধ্যেও সেইরূপ উৎসাহ চোখে পড়ে না। আমি বারংবার এই বিষয়টি নিয়ে সচেষ্ট হয়েছি, এর মূল কারণ হল ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে আবিষ্কৃত হওয়া একাধিক বৌদ্ধ ক্ষেত্র।
গুপ্ত যুগের সময়কাল হতে মন্দির শহর ইটখোরী (ঝাড়খণ্ড) এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি বৌদ্ধ পরিব্রাজকদের নিকট যথেষ্টভাবে পরিচিতি লাভ করেছিল। খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে ভগবান বুদ্ধ যে এই অঞ্চলে তাঁর পদচিহ্ন রেখেছিলেন তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কারণ তিনি এই অঞ্চল হতে বুদ্ধগয়াতে (বোধিলাভের নিমিত্তে) উপস্থিত হয়েছিলেন। বুদ্ধগয়া বর্তমানে পৃথিবীর সকল বৌদ্ধদের একটি আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্র রূপে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করেছে।
এ প্রসঙ্গে ইটখোরীর কথা বলতেই হয়। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য দ্বারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে এই স্থান হতে ভগবান বুদ্ধ মোহানা নদীর গতিপথ ধরে বুদ্ধগয়ার পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি যে ঝাড়খণ্ডের এমন অসংখ্য বৌদ্ধ ক্ষেত্র রয়েছে যা সরকারী তত্বাবধানের অভাবে আজও উপেক্ষিত রয়েছে।
এবার ইতিহাসের পাতার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করা যাক, শৈব মতালম্বী বাংলার রাজা শশাঙ্ক (৬০৬-৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ) তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন পশ্চিমে রোহতাস (বর্তমান বিহার) অঞ্চলের শোন নদী পর্যন্ত, ফলে স্বাভাবিক নিয়মে ইটখোরী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি তাঁর নিয়ন্ত্রনাধীন ছিল একথা কোন মতেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর শশাঙ্কের উত্থান কোন অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। পাল যুগে (৮-১২ শতাব্দী) শশাঙ্কের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূর্তি নিমার্ণের (রিলিফ কৌশল) পদ্ধতি বৌদ্ধ চিন্তায় পর্যবসিত হয়। যদিও শশাঙ্কের সময়কালের ভাস্কর্যের অভ্যন্তরে গুপ্ত যুগীয় স্থাপত্য রীতি নিহিত ছিল।
এই অঞ্চলে (ইটখোরী) গুপ্ত যুগের (৪র্থ-৬ষ্ঠ শতাব্দী) বৌদ্ধ ভাস্কর্য পাওয়া গেছে, সেগুলি মূলত বেলে পাথরের তৈরী। এখানেই সেই বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী 'তারা'র মূর্তিটি দেখা যায়। বর্তমানে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মূর্তিটিকে 'ভদ্রকালী' নামে পূজা-অর্চনা করে চলেছেন। এই মূর্তিটি বৌদ্ধ পাল রাজা মহেন্দ্রপাল'এর শাসনামলে (৮ম শতাব্দী) নির্মিত। 'সুসান এল হাটিংটন তার গবেষণা পত্রে লিখেছেন, "এই স্থাপত্য শৈলী'র সঙ্গে গয়া জেলার মূর্তি নির্মাণ কৌশল মিলে যায়, বিশেষ করে বুদ্ধগয়ার। ইটখোরী যেহেতু বুদ্ধগয়া হতে খুব দূরে নয়, এই একই শিল্পশৈল্পীর বৃত্তটা সম্ভবত ইটখোরীকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিল।"
ইটখোরী হতে ৫ মাইল দূরে, তারা দেবীর একটি কালো পাথরের ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়(১৮-২০ ইঞ্চি), শশাঙ্কের শৈলীর অনুরূপ। তথ্য অনুসন্ধানে অবগত হওয়া যায় যে, মূর্তিটি দাইহার গ্রামে স্থিত বর্তমান 'কমলেশ্বরী' মাতার মন্দিরের নিকটস্থ একটি পুরাতন কূপ হতে অন্যান্য ব্রাহ্মণ্যবাদী মূর্তি (শিব) সহ পাওয়া গেছে। আমি যে সময়কালে এই অঞ্চল পুনঃ পরিভ্রমণ করেছিলাম, সেই সময়টা ছিল ২০২৩ সালের মার্চ'এর প্রথম দিক।
আমি ইটখোরী অঞ্চল হতে প্রাপ্ত ভাস্কর্য গুলিকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি যে, মূর্তি গুলির সিংহভাগই ৪র্থ-৬ষ্ঠ শতাব্দী কালের। এর মধ্যে বেশ কিছু বুদ্ধমূর্তি রয়েছে যা গ্রীক (হেলেনীয়) প্রভাব মুক্ত। ১৯৯১ সালে প্রথম ইটখোরীর বেলেপাথরের যে সকল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছিল, ইটখোরীর সংগ্রহশালার ভাস্কর্যগুলি মূল অর্থে তারই অংশ।
ইটখোরী হতে আরও যা আবিস্কৃত হয়েছে, তা হল ২০০০'এর ও অধিক হলদে বেলে পাথরের চতুষ্কোণ খণ্ড এবং ভাস্কর্য, যেগুলো মগধ শৈলীতে নির্মিত ও সময়কালের নিরিখে অজাত শত্রু এবং বিম্বিসারের শাসনামলের। অন্যান্য ভাস্কর্যের অংশগুলিতে জৈন ও বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি দুই'ই রয়েছে। রাজমহলের কালো পাথর দ্বারা নির্মিত বৃহৎ তারা দেবীর মূর্তি প্রমাণ করে যে পালযুগে এই অঞ্চল বৌদ্ধ তান্ত্রিক সম্প্রদায়'এর কুক্ষিগত ছিল। বর্তমানে মূর্তি এবং স্থাপত্য সমূহ ইটখোরীর সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে।
ভগবান বুদ্ধের ইতিহাস ও মগধ-রাজগীর-হাজারিবাগ মালভূমি:
ভগবান বুদ্ধ সম্পর্কিত যে সকল মৌখিক অথচ মূল্যবান ইতিহাস আজও ইটখোরী অঞ্চলে বিদ্যমান রয়েছে তার সমর্থন ৪র্থ শতকে ফা-শিয়েন এবং ৭ম শতকে শুয়াং জাঙ্'এর যাত্রা বিবরণে পাওয়া যায়।
শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাং) মোহানা নদীকে বলেছেন 'মোহ' এবং স্যার কানিংহাম নিশ্চিত করেছিলেন এই 'মোহ'ই বর্তমান 'মোহানা' নদী। বুদ্ধগয়ার নৈরঞ্জনা'র পূর্ব দিক দিয়ে এর গতি প্রবাহ। এই দুই নদী একত্রে মিলিত হয়ে 'ফল্গু' নাম নিয়ে গিরিয়েক গ্রাম অতিক্রম করে পাটনার দক্ষিণে মিলিত হয়েছে।
বুদ্ধগয়া হতে ৫০ মাইল পূর্বে শুয়াং জাঙ্ বর্ণিত বিখ্যাত 'কুক্কুট' পাদ (গুরপা) পাহাড় (বর্তমান কক্-ফুট-মাউন্টেন)। যেখানে কোলকাতা দিল্লী ব্রডগেজ রেল লাইনের ওপর কোডার মা এবং গয়া জংশন'এর মাঝে ২টি ছোট রেল ষ্টেশন গুরপা ও গুরপা ও গুঝান্ডি বর্তমান। এই গভীর উপত্যকা অরণ্যময় এবং বৌদ্ধ সাক্ষ্য বহন করে। গুরপা বা কুক্ক ট পাদ পাহাড়ের একটি সুরঙ্গের অভ্যন্তরে ৮ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বুদ্ধের ভূমিস্পর্শ মুদ্রার মূর্তি বিদ্যমান এবং বেশ কিছু স্তূপ ও রয়েছে। পাহাড়ের ওপরে রয়েছে বৃহৎ ইট দ্বারা নির্মিত ২টি বৌদ্ধ বিহার, পাহারের ওপরে ২টি বৃহৎ পদ চিহ্ন, এবং একাধিক বুদ্ধ মূর্তি, শিলালিপি, নিবেদন-স্তূপ, বুদ্ধ ও তারা'র নানাবিধ ভাস্কর্য। ফা-শিয়েনের বিবরণে এই পাহাড় এবং ভিক্ষু মহাকাশ্যপের উল্লেখ পাওয়া যায়।
হাজারিবাগের অরণ্যের গভীরে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বহু বৌদ্ধমূর্তির অবশেষ রয়েছে যার সময়কাল কুষাণ যুগের সমসাময়িক। পরিতাপের বিষয় সরকারী ঔদাসিন্যতার কারণে এই সকল মূল্যবান স্থাপত্য ভাস্কর্য গুলি আজ বিস্মৃতির অতল গর্ভে নিমজ্জিত হয়ে চলেছে। সীতাগাড়া বৌদ্ধ ক্ষেত্র হতে হাজারিবাগের বৌদ্ধ পুরাতত্ব বিষয়ে আমার মূল অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চল, যেমন- টাটিঝরণা, খোয়ার পাহাড়, কান্দার, সিদপ্পা, উরদা, সিসাই, বরকাগাঁও, বরসোপানি, বাদাম, পারোয়াদি, পুংখরি, মারওয়াতেরী, ক্যানারি, জালমা, ইছাক, কাটকামসামন্ডি, কোলেশ্বর, চাতরা, ইটখোরী, মেজগাওয়া, চৌপারন, সাতগাঁওয়া এবং বাঘলাতা পরিভ্রমণ করি। এই সকল অঞ্চলে বৌদ্ধ স্থাপত্যের সংখ্যা প্রচুর। সীতাগড় পাহাড় শ্রেণী জুড়ে পশ্চিমে কান্দার এবং রাহাম থেকে পূর্বে বরসোপানি, বারোয়াদি, পুংখরি পর্যন্ত বৌদ্ধ চিহ্ন সমূহের উপস্থিতি বিদ্যমান।
বৌদ্ধধর্ম এবং কুর্মিগ্রামের সোহরাই চিত্র:
সোহরাই শিল্পরীতিতে সে সকল প্রতীক চিহ্নগুলিকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা'র সকলই বৌদ্ধ উপাসনায় ব্যবহৃত পবিত্র চিহ্ন সমূহ। এই বিষয়টি প্রথমে অবাক করার মতো হলেও পরবর্তী সময়ে উপলব্ধি করেছিলাম যে অতীত সময়ে এই অঞ্চলটি ছিল বৌদ্ধ প্রধান ক্ষেত্র।
বৌদ্ধধর্মের অষ্ট মঙ্গল চিহ্ন: ধৰ্ম্মচক্র, বিজয় ধ্বজ, রত্নখচিত ছত্র, অনন্তগিঠ, পদ্ম, পূর্ণ কুম্ভ, সুবর্ণ মৎস এবং শঙ্খ। বৌদ্ধধর্মের সপ্তবিধ রাজকীয় প্রতীক সিংহ, হস্তি, অশ্ব, নাগ, ময়ূর, গরুড় এবং বৃষ। এই সকল চিহ্নগুলি কুর্মিগ্রামের সোহরাই চিত্রকলায় স্পষ্টত দেখা যায়, এমন কি অ-বৌদ্ধ সহস্রাব্দ অতিক্রম করে যাবার পরেও। সোহরাই শিল্পের পদ্মটা হল বিমূর্ত তান্ত্রিক বৌদ্ধ চক্র, যার প্রকৃত তাৎপর্য কী এখনও আমি তা উপলব্ধি করতে পারিনি। বোধিবৃক্ষ এখানে বুদ্ধের প্রতীক এবং পুর্নকুম্ভ সমৃদ্ধির প্রতীক চিহ্ন হয়ে উঠেছে।
বৌদ্ধদের শুভ প্রতীকচিহ্ন গুলি কুর্মিদের গ্রামের সোহরাই চিত্রে যেভাবে দেখা গেছে তা সর্বপ্রথম ভারতেই দেখা যায়, পরবর্তী
সময়ে গ্রীসে তা বিকাশ ঘটেছিল এবং অজন্তা ও সিংহলের (শ্রীলংকা) ফ্রেস্কো ছবিতে ও প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
সমগ্র হাজারিবাগ জেলা বৌদ্ধ ভগ্নাবশেষ এবং স্থাপত্যে পরিপূর্ণ। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে এই অঞ্চলের মূল নিবাসী জনগণের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক চিন্তার অভ্যন্তরে বৌদ্ধ প্রভাব থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক কিছু নয়। সম্প্রতি দাতোয়া অঞ্চলের একটি গ্রাম হতে কালো পাথরের তারা মূর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। মূর্তিটির বাম হাতে রয়েছে পদ্ম।
এই ভারতীয় উপমহাদেশে ভগবান বুদ্ধকে বিমূর্ত অর্থে ধম্মচক্র, বোধিবৃক্ষ এবং পদ্মের প্রতীক চিহ্ন দ্বারা শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়েছে। কেবলমাত্র তাঁর সময়ের কিছু কাল পরে তাঁর (বুদ্ধ) অবয়ব ব্যাকট্রিয় গ্রীক প্রভাবিত ভাস্কর্যে দেখা যেতে শুরু করে এবং তা অবশ্যই মৌর্য যুগের বৌদ্ধ ভাস্কর্যের প্রভাবে।
গুপ্ত যুগে, ৩২০-৩৫০ খ্রীষ্টাব্দে বৌদ্ধ শিল্পশাস্ত্র খুবই উল্লেখ্যস্থান অধিকার করতে সমর্থ হয়েছিল এবং ভগবান বুদ্ধের ৩২টি প্রধান লক্ষণ স্থাপত্য গুলিতে মূল কেন্দ্র বিন্দুরূপে নির্মিত হয়ে ছিল। এই ঐতিহ্য থেকে ধার নিয়ে উত্তরকালে সোহরাই চিত্র গড়ে উঠেছিল। কোনো সন্দেহ নেই যে যেসকল উপজাতি রীতিনীতি কুথি এবং অন্যান্য মূল নিবাসী সম্প্রদায় ঝাড়খণ্ডে আজও পালন করে তা প্রকৃত অর্থে বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক ট্রাডিশন।
হাজারিবাগের সোহরাই শিল্পের দেওয়াল চিত্রে যে সকল বৌদ্ধ চিহ্নগুলি বিমূর্ত ভাবে পাওয়া যায়। (উদাহরণ স্বরূপ সীতাগাড়া পাহাড়ের পূর্বদিকের মারওয়াতেরির বৌদ্ধক্ষেত্র, উত্তর পশ্চিমে ইটখোরী, দক্ষিণপূর্বে মোগলমারী (পূর্ব মেদিনীপুর), দক্ষিণে ওড়িশার কপিলেশ্বর সর্বত্রই বৌদ্ধ প্রতীক চিহ্নে পরিপূর্ণ) তার সম্পূর্ণ সোহরাই চিত্র শিল্পে বিদ্যমান।
ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগ অঞ্চলের বৌদ্ধক্ষেত্র সমূহ :
হাজারিবাগের বৌদ্ধ ক্ষেত্র গুলি প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০ সাল হতে (সীতাগাড়ার মারওয়াতেরী ক্ষেত্র) সাম্প্রতিক কালে আবিস্কৃত পাল ও সেন যুগের বৌদ্ধ তারা বা হিন্দু সূর্য মূর্তি (হাজারিবাগ'এর সেখা বরাসি ক্ষেত্র) পর্যন্ত বিস্তৃত।
হাজারিবাগের বিভিন্ন অঞ্চল সমূহের যে সকল প্রাকৃত নাম দৃষ্ট হয় তা প্রাচীনকাল হতে চলে আসা বৌদ্ধ প্রভাব প্রমাণ করে। প্রসঙ্গগত মনে রাখা প্রয়োজন হাজারিবাগ পাল ও সেন যুগে তাঁদের সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের অংশ ছিল। এর সীমানায় মগধ এবং ভগবান বুদ্ধের সময়কালে বুদ্ধগয়ার সেই গ্রাম, যার তৎকালীন নাম 'সোনানী'। গয়ার সন্নিকটে হাজারিবাগের উত্তর-পশ্চিম অংশ বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষের একটা মূল ক্ষেত্র। এই অঞ্চল (যেমন ইটখোরী), হতে জি.টি. রোডের ওপর চম্পারন খুব একটা দূরে নয়। দেখা যাবে হাজারিবাগের বহু গ্রামের প্রাকৃত (মান্দাইর, ইছাক, নাগওয়া ইত্যাদি) নাম রয়েছে।
বুদ্ধগয়া এবং হাজারিবাগের প্রাচীন তীর্থপথটা মোহানিয়া বরাবর বুদ্ধগয়া হতে ভালুয়া পর্যন্ত এসেছিল। তারপথ বিখ্যাত রাজপথ জিটি রোড। তবে এই রাজপথটা ভগবান বুদ্ধের সময়কালেও বিদ্যমান ছিল, এবং উত্তর ভারত তথা চীনদেশের মধ্যে প্রধান বাণিজ্য ও যাতায়াতের পথ ছিল। এই রাজপথ ভারতের উত্তরের 'সল্করুট'এর সঙ্গে দক্ষিণের রেশম পথকে যুক্ত করেছিল এবং চীনদেশের বৌদ্ধ পরিব্রাজক শুয়াং জাঙ্ এই পথটি ব্যবহার ও করেছিলেন। এই তীর্থ পথটি মোহনিয়া ধরে কোলুয়া এবং ইটখোরী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, অতঃপর চাতরার দিকে চলে গিয়েছিল। ভালুয়া হতে অপর একটি পথ (মার্গ) চৌপারন হয়ে ইটখোরীতে এসেছিল। বর্তমানে এই মার্গটি এশিয়ান হাইওয়ে নামে খ্যাত। প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থপথটি মোহানিয়া নদী ধরে প্রথমে দাতো, অতপর কাটকামসামন্ডি হয়ে হাজারিবাগ। এই মার্গটি মান্দাইর হয়ে ইছাক এবং তারপর হাজারিবাগ হয়ে সীতা এসে দামোদরের গতিপথ বরাবর মেদিনীপুরের দিকে চলে যায়, অবশেষে বঙ্গোপসারের তীরে তমলুকে (তাম্রলিপ্তি) গিয়ে শেষ হয়।
হাজারিবাগ অঞ্চলে কালো পাথরে নির্মিত অনেকগুলি বৌদ্ধ তান্ত্রিক 'তারা' দেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে, সেই সঙ্গে পদ্মপানি, সিংহ এবং বৃষ বাহন সহ 'হর-পাবর্তীর মূর্তি (সেন যুগ) ও আবিষ্কৃত হয়েছে। মহান বৌদ্ধ পণ্ডিত স্যার এডুইন আর্নল্ড মনে করেন ভগবান বুদ্ধ অবশ্যই হাজারিবাগ অঞ্চলে এসেছিলেন।
নিম্নে হাজারিবাগ অঞ্চলের বৌদ্ধ ক্ষেত্র সমূহের একটি তালিকা প্রদান করা হল-
১। সীতাগাড়া - সীতাগাড়া পাহাড়ের পূর্বদিকের অববাহিকা এবং বর্তমান হাজারিবাগ শহর হতে ৮ কি.মি. দূরে মেদিনীপুরের দিকে যাওয়া প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থপথের নিকট মারওয়াতেরি অবস্থিত। এই অঞ্চলে অনেক প্রাচীন স্থাপত্য এবং মূর্তি সমূহ পাওয়া গেছে।
যেমন-
ক) লাল বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত ৩ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি নিবেদন স্তূপ, এই স্তূপে ভগবান বুদ্ধের ধ্যানরত এবং আর্শীবাদক মুদ্রায় ৪ রকম মূর্তি উৎকীর্ণ রয়েছে।
খ) রাজা হর্ষবর্ধনের সময়কালের (৬ষ্ঠ শতাব্দী), কালো ব্যাসান্ট পাথর দ্বারা নির্মিত অপসরা মূর্তির উর্দ্ধাংশ।
গ) একটি স্তম্ভের ওপর যক্ষী মূর্তি।
ঘ) ভগবান বুদ্ধের অর্ধাবয়ব মূর্তির একটি অংশ।
ঙ) চার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট শিব মূর্তি।
চ) লৌহ সরঞ্জাম, পাথরের তৈরী স্তম্ভ।
সীতাগারার বুহরানপুর ঢিবি আবিস্কারের পর দেখা যায় যে এটি একটি ইট দ্বারা নির্মিত বৌদ্ধ স্তূপ এবং তার অভ্যন্তরে অনেকগুলি ভগবান বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে।
২। ইটখোরী- এই অঞ্চলটি হাজারিবাগের মূল বৌদ্ধ ভূমি বা ক্ষেত্র। এই স্থান হতে ৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট কালো পাথরে তৈরী 'তারা' দেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে, তাঁর বামহস্তে রয়েছে একটি পদ্মফুল। এই মূর্তিটি পাল যুগের অর্থাৎ ৯ম শতাব্দী কালের। এর পাশাপাশি হাজারি বাগ বৌদ্ধক্ষেত্রের অন্যান্য পরিচিত মূর্তি (অবলোকিতেশ্বর, পদ্মপানি ইত্যাদি) তা রয়েছেই। এই স্থানের সংগ্রহ শালায় কয়েক হাজার বৌদ্ধ মূর্তি এবং পাথরের শিল্প বস্তু সংরক্ষিত রয়েছে।
৩। দাতো - দাতো অঞ্চলের একটি মাঠ হতে ধূসর নীল বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত দন্ডায়মান তারা দেবীর মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে, তাঁর বাম হস্ত কনুই থেকে ভাঁজ করা, তার এই হস্তে পদ্ম ফুল বিদ্যমান। দন্ডায়মান মূর্তিটির কোমরে কোমর বন্ধনী, তাঁর কেশ একত্রে খোঁপা বাধা। দেবীর মস্তকের ওপরে একটি গোলাকৃতি পাথরের অংশে পাল যুগীন লিপি খোদিত রয়েছে। মস্তকের এই অংশ ব্যতীত মূর্তিটির উচ্চতা ২৪ ইঞ্চি। নালন্দা সংগ্রহশালায় রক্ষিত তারা দেবীর মূর্তির সঙ্গে এই মূর্তটির একটা অদ্ভূত সামঞ্জস্য রয়েছে। সম্ভবত তান্ত্রিক বৌদ্ধ ভাবনায় নির্মিত দেবী মূর্তির এটাই প্রাচীনতম রূপ এবং মূর্তিটি ৯ শতাব্দীর। ডান হস্তটি বরদা মুদ্রায় নীচের দিকে নামো, দেবীর পেথনে জ্যোতিপুঞ্জ, বাম হস্তে তিনি একটি প্রস্ফুটিত পদ্ম মৃণালসহ ধারণ করে আছেন। দেবীর ডান অংশে একটি উড়ন্ত নারীর অবয়ব, বাম দিকে ত্রিভঙ্গ মূর্তিতে বিষ্ণুর একটি ক্ষুদ্র মূর্তি।
৪। ক্যানারি পাহাড়- ক্যানারি পাহাড় হতে ১/২ কি.মি., পশ্চিমে, ৯ম শতকের একটি শক্ত ধূসর স্লেট পাথর দ্বারা নির্মিত ৪ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট দেবী মূর্তি ২০০০ সালে আবিস্কৃত হয়। এই অঞ্চলটি কুষাণ শাসনের বৌদ্ধ ক্ষেত্রে’র চিহ্ন বহন করে। মূর্তিটি কোমর হতে ভগ্ন, দুই পত্র যুক্ত একটি পদ্মের উপর উপবেশন রত।
৫। সেখা-বারাসি - সেখা গ্রামে বৌদ্ধ বিহার’এর ভগ্নাবশেষ হতে বহু মূর্তির খণ্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ, ক) ৫ ফুট উচ্চতা যুক্ত সূর্য মূর্তি, খ) প্রায় ৪ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট তারা দেবীর দন্ডায়মান মূর্তি, ভাঁজ করা বাম হস্তে মৃণাল সহ একটি পদ্ম, ডান হস্ত জ্যোতিবলয় সহ বরদা মুদ্রায় নামানো। বাম দিকে নিম্নে ক্ষুদ্র ত্রিভঙ্গ মুরারী মূর্তি, ডান স্কন্ধের উর্দ্ধে বৌদ্ধ স্তূপের রিলিফ। মস্তকের কেশ খাঁপা করে বাধা। পাল ও সেন যুগের স্থাপত্য (৯ম-১০ম শতক) কলার সঙ্গে এই মূর্তিটির শিল্পরীতির অদ্ভুত সামঞ্জস্য রয়েছে।
গ) উপবেশন রত হর-পাবর্তী’র ২৪ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট মূর্তি, বাহন সিংহ ও বৃষ। মূর্তিটির স্থাপত্যরীতি সেন যুগের। বর্তমানে এই মূর্তিটি এই স্থানের একটি নবনির্মিত হিন্দু মন্দিরে বিরাজমান। অপরদিকে তারা দেবীর মূর্তিটি অনুরূপ একটি মন্দির হিন্দুদেবী রূপে পূজিত হচ্ছেন।
৬। নরসিংহ স্থান - এই স্থানের একটি মাটির ঢিবি হতে নরসিংহ রূপী বোধিসত্ত্বের মূর্তিটি পাওয়া গেছে। এই মূর্তিটি এখন এখানকার একটি হিন্দু মন্দিরে বিষ্ণুর অবতার জ্ঞানে পূজা করা হয়। মূর্তিটির বয়স কাল ৬-৯ শতাব্দীর মধ্যে।
৭। ইছাক - ‘ইছাক’ হতে মৌর্য যুগের মুদ্রা এবং এই গ্রাম হতে কয়েক কিমি দূরে লোহারি হতে বৌদ্ধ মূর্তি, গহনা এবং ধাতব পাত্র পাওয়া গেছে।
৮। ইন্দ্রপুরী - নবাবগঞ্জের ইন্দ্রপুরীর নিকট একটি হিন্দু মন্দিরে তারাদেবী অবয়ব বিদ্যমান।
৯। বুড়হা মহাদেব - হাজারিবাগ শহরের মধ্যস্থলে ‘ছট পুকুর’ এর নিকট একটি বৌদ্ধ নিবেদন স্তূপকে হিন্দুরা বুড়হা মহাদেব (বুড়ো শিব) জ্ঞানে পূজা করে।
১০। মহাদেব পাহাড় - এই পাহাড়টি একাধিক বৌদ্ধ চৈত্য বিদ্যমান। পরবর্তী সময়ে হিন্দুরা এই বৌদ্ধ ক্ষেত্রটির নাম পরিবর্তন দ্বারা মহাদেব পাহাড় করেছে। কিন্তু এই পাহাড়ে কোন হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্য বা চিহ্ন পাওয়া যায় নি।
১১। পাঁকরি বারওয়াদি - একটি বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ, বোধিসত্ত্বের মূর্তি এবং ৪ প্রকার মুদ্রা যুক্ত ভগবান বুদ্ধের মূর্তি যুক্ত একটি নিবেদন স্তূপ এই স্থান হতে পাওয়া গেছে। এই অঞ্চলটির অবস্থান একটি পাথুরে টিলার ওপর।
১২। সিদপা - বেশ কিছু বৎসর পূর্বে এই স্থান হতে সাদাটে বেলে পাথরের ওপর খোদাই করা বেশ কিছু বৃহৎ পাহারের খণ্ড আবিস্কৃত হয়। মনে করা হয় যে এগুলি মৌর্য যুগের কোনো ইমারতের অংশ। কেননা ভগ্নাবশেষ গুলিতে যে ধরণের শিল্প কর্ম (সিংহের উপরে আসীন কোন এক দেবী মূর্তি, ঘোড়সয়ার ও হরিণ) পাওয়া গেছে তা মৌর্য শিল্পকলার অনরূপ। এই স্থান হতে অনতি দূরে সাত পাহাড় অঞ্চল গুহাচিত্রের জন্য বিখ্যাত।
১৩। কোলুয়া পাহাড় - এই পাহাড়টি হান্টারগঞ্জ হতে ৬ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। হাজারিবাগ মালভূমির উত্তর পশ্চিম প্রান্তে, গয়া সমভূমির দিকে এগিয়ে গেলে কোলুয়া পাহাড় দেখা যায়। এই স্থান হতে ৬ম-১১শ শতাব্দীর বহু বৌদ্ধ ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে।
১৪। সোহরা - ইটখোরী হতে ৫ কি.মি. দূরে দাইহার সংলগ্ন গ্রামটি হল সোহরা। এই স্থানে একটি হিন্দু মন্দির রয়েছে। মন্দিরটি 'সক্ষুমা মাতা'র মন্দির নামে খ্যাত। মন্দিরটি একটি প্রাচীন ঢিবির ওপর একটি পুস্করিনীর পাশে নির্মিত। মন্দিরের সম্মুখের চাতালে বেশ কিছু প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য, ভাঙা এবং ক্ষয়ে যাওয়া একটি অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি, বুদ্ধের খোদিত মূর্তি সম্বলিত একটি স্তূপের ভগ্নাংশ অনাদরে পড়ে আছে।
ইটখোরী অঞ্চলের বৌদ্ধ তথ্য :
আমি ইতিপূর্বেই আমার তথ্যবিবরণে আলোচনা করেছি যে ইটখোরী মূল অর্থে একটি প্রাচীন এবং প্রধান বৌদ্ধ ক্ষেত্র। এই অঞ্চলটির পুরাতাত্ত্বিক অবশেষের বয়সকাল নির্ধারণ করা হয়েছে মৌর্য যুগ হতে পালযুগ। এই অঞ্চলটিকে যদি সঠিকভাবে খনন কার্য করা হয় তাহলে হয়ত বুদ্ধগয়ার ন্যায় আরও একটি মুখ্য বৌদ্ধ ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
সরকারী ঔদাসিন্যতা এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে মৌর্য যুগের (খ্রীষ্টপূর্ব ৩'য় শতক) বেশকিছু বৌদ্ধ স্থাপত্য এবং পাল যুগের অনেক গুলি বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেব-দেবী (তারা, অবলোকিতেশ্বর ইত্যাদি) সব থেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
পুরাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে এই অঞ্চলটি পুরাতত্ত্বগতভাবে একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল এবং এর সংরক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন। এই অঞ্চলটি পরিভ্রমণ কালে প্রাচীন স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের তিনটি পর্যায় লক্ষ্য করেছি, যেমন-
১। মৌর্য যুগ (খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০ সাল) বৃহৎ ধূসর হলদে বেলেপাথরের খণ্ডে ফুলের কারু কার্য এবং বৌদ্ধ প্রতীক চিহ্ন।
২। গুপ্তযুগ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বৌদ্ধ অবয়ব, গোলাপি রঙের বেলে পাথরের ভাস্কর্য (৬০০ খ্রীষ্টাব্দ)।
৩। পাল সেন যুগ বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেব দেবীর মূর্তি (তারা ও অবলোকিতেশ্বর) এবং অন্যান্য বৌদ্ধ ও হিন্দু মূর্তি (৮০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দ)।
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, অত্যন্ত অযত্ন এবং অবহেলার কারণে এই সকল অমূল্য সম্পদ বিনষ্ট হতে চলেছে।
ইটখোরী ও চাতরা'র বৌদ্ধ অবশেষ :
এই অঞ্চলের অসংখ্য বৌদ্ধ প্রতীক চিহ্ন, ভাস্কর্য ও অলংকার চিহ্ন, গুপ্ত যুগের সারনাথ শৈলীর একটি বিবর্তিত রূপ। পাল রাজা মহেন্দ্রপাল (৯ম শতাব্দী) এর সময়কালের স্থাপত্য, কড়ি বরগা, বৌদ্ধ স্তূপ, দেবী তারা'র মূর্তি এর উজ্জ্বল উদাহরণ। এর পাশেই হাজারিবাগের বৌদ্ধ ক্ষেত্র গুলি হতে বহু বৌদ্ধ মূর্তি, পাহারের শিল্পকর্ম ইত্যাদি পাওয়া গেছে। বর্তমানে এগুলি স্থানীয় সংগ্রহ শালায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই স্থাপত্য-ভাস্কর্য গুলি ৬ষ্ঠ শতকের। বর্তমানে ক্ষেত্রটি হিন্দু উপাসনা ক্ষেত্র। ইটখোরীর দক্ষিণ-পশ্চিমের কোলুয়া পাহাড় একটি প্রধান এবং প্রাচীন জৈন উপাসনা অঞ্চল। তবে একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে ইটখোরীর চারপাশের বৌদ্ধ ক্ষেত্রটি প্রায় ১৫০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত।
কাণিংহাম, বেগলার অথবা অরেলস্টাইন কেউই ইটখোরীর উল্লেখ করেন নি। এমন কি লিস্টার তাঁর গেজেটে এই অঞ্চলটিকে বৌদ্ধ ক্ষেত্র ও বলেন নি।
বহরনপুর (বুরহানপুর) এবং সীতাগাড়ার বৌদ্ধ ভাস্কর্য :
সীতাগাড়া পাহানের পূর্বদিকে বহরনপুর ঢিবিতে খননকার্য'র সময় একটা ইটের স্তূপ আবিস্কৃত (২০২০-২০২১ খ্রীষ্টাব্দ) হয়। পূর্বদিকে আরও ১০০ গজ এগিয়ে আরও একটা ঢিবি হতে বৌদ্ধ বিহারের অবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। বহরনপুর গ্রামের নিকট হতে তারা ও ভগবান বুদ্ধের অন্তত ১০টি মূর্তি পাওয়া গেছে। এই সালের (২০২১) মে মাসে বহরনপুর ঢিবি হতে ৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি অবলোকিতেশ্বর মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে।
এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা এর অবস্থান সারনাথ হতে তমলুক (তাম্রলিপ্ত) যাওয়ার প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থপথ এবং এই স্থানে পাল যুগে বজ্রযানের প্রভাব বিদ্যমান ছিল।
বহরনপুর হতে পাওয়া গেছে ভগবান বুদ্ধের একটি বৃহৎ মূর্তি, মূর্তিটির পেছনে ভারী চালচিত্র, যা পালযুগের শিল্প-শৈলী এবং বিভিন্ন মুদ্রায় বজ্রযানী দেবী তারার ৪টে মূর্তি ও ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় উপবেশন রত ভগবান বুদ্ধের ৫টি মূর্তি, যা তাঁর বোধিলাভের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। এই ক্ষেত্রটির পুরাতাত্ত্বিক সময়কাল ৯ম-১০ম শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ)।
ইটখোরীর বর্তমান ভদ্রকালী মন্দির হতে ৫ কিমি, দূরে দাইহার গ্রাম। এই গ্রামটি হাজারিবাগ জেলাতে অবস্থিত। এইস্থান হতে ৭ম শতাব্দী কালের একটি বৌদ্ধস্তূপ আবিস্কৃত হয়েছে।
আমি এই গ্রামে পর্যায়ক্রমে ২০১৯, এবং ২০২৩, ২০২৫ সালে গিয়েছিলাম। অনুসন্ধান করে দেখেছি এই গ্রামের অসংখ্য সমান্তরাল পলির অভ্যন্তরে বহু প্রাচীন কূপ রয়েছে, যে গুলোর বেশ কিছু পরিত্যক্ত, কিছু ব্যবহার যোগ্য, কয়েকটি শুকনো। কূপগুলির গঠন শৈলী বর্তমান সময়কালের নয়। এই কূপগুলি হতে পালযুগের নানা শিল্পকীর্তি, বৌদ্ধ মূর্তি ইত্যাদি পাওয়া গেছে। মূর্তিগুলির সিংহভাগই বিকৃত। সম্ভবত এই বৌদ্ধ অঞ্চল কোন এক সময়ে বহিরাগত শত্রু'র আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিল। বর্তমানে মূর্তিগুলি সহ অন্যান্য শিল্পকীর্তি ইটখোরী সংগ্রহশালায় বিদ্যমান।
হাজারিবাগের কর্মা-বিহারি (বেহারি) গ্রাম হতে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ শিল্প-ভাস্কর্য কীর্তির মধ্যে রয়েছে ভগবান বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব এবং নাগ-প্রতীক চিহ্ন সম্বলিত পুরুষ-নারী মূর্তি। মূর্তিগুলি বেশ অক্ষত এবং এগুলি রাজমহল পাহাড়ের কালো পাথর ও বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত। ভাস্কর্যগুলির সময়কাল গুপ্ত যুগ এবং পাল যুগ।
ইটখোরী হতে আবিষ্কৃত তারা দেবীর বিবরণ :
ইটখোরী অঞ্চল হতে প্রাপ্ত মূর্তিটি প্রকৃত অর্থে কোন হিন্দু দেবী নয়, কেননা মূর্তিটির আঙ্গিক এবং গঠন শৈলীর মধ্যে কোনরূপ হিন্দু (ব্রাহ্মণ্যবাদী) ধর্মের অবয়ব প্রস্ফুটিত হয় নি। যদিও বর্তমানে হিন্দুরা এই বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবীটিকে 'ভদ্রকালী' নামে পূজা করে থাকেন। মূর্তিটি নবম শতাব্দীর (রাজা মহেন্দ্র পালের অষ্টম বছর)।
বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীর মধ্যে নানাবিধ তারা মূর্তি দেখা যায়। যেমন-মহাচীন তারা, বজ্রতারা, খদিরবনী তারা ইত্যাদি। ইটখোরী হতে প্রাপ্ত তারা মূর্তিটি মূলত খদিরবনী তারা। ডানহস্ত বরদামুদ্রা এবং বামহস্তে মৃণাল সহ পদ্ম। এর দন্ডায়মান, বজ্রাসনে উপবেশন রত এবং ললিতাসনে উপবেশন রত মূর্তি রয়েছে। তারা দেবীর সঙ্গে আরও দুই জন দেবী অবস্থান করেন। ডানপার্শ্বে মারিচী এবং বামে থাকেন একজটা।
বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রের আবির্ভাব (৩য়-৬ষ্ঠ শতাব্দী, খ্রীষ্টাব্দ) হওয়ার পর এই সকল দেব-দেবীর মূর্তি প্রাভূর্ত হয়েছিল। যা পাল যুগে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
ইতিকথার পরের কথা :
আমি যেভাবে ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের বৌদ্ধ পুরাতত্ত্ব সমূহের অবশেষ, মূর্তি ইত্যাদি গুলিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম ঠিক সেই ভাবে তা প্রধান করার চেষ্ট করেছি। এক্ষেত্রে আমি আমার সীমিত ক্ষমতার মধ্যদিয়ে বিষয়গুলিকে উৎসাহী পাঠক, গবেষক, ইতিহাস পাঠরত ছাত্র-ছাত্রী এবং বৌদ্ধ জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। যেহেতু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তাই আমি ক্রমান্ময়ে আলোচনা করেছি। দাইহার গ্রামের পথে স্তূপাকৃত অবস্থায় পড়ে থাকা স্থাপত্য এবং মূর্তি দেখেছি। কৌতূহল বশত গ্রামের লোককে জিজ্ঞাসা করায় তারা বিরস বদনে বলেছে, 'কেউই জানে না, এগুলি কত বছর ধরে পড়ে আছে। এই গ্রামের অগমকুঁয়া হতে সংগৃহীত মূর্তিগুলি স্থানীয় একটি হিন্দু মন্দিরে দেবী রূপে পুজিত হচ্ছে। কর্মাবিহারীর পথে ঘাটে দুধারে ছড়ানো রয়েছে ভাঙা মূর্তির স্তূপ। এখানে সেখানে গড়ে উঠেছে মন্দির। বৌদ্ধ মূর্তিগুলি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হাত ধরে কোথাও ভদ্রকালী, কোথাও বুড়া বাবা।
সেকালের ভারতের এই বৌদ্ধ মূল স্রোত আজ নানা কারণে স্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। কেননা সর্বত্রই সংরক্ষণের অভাব এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ক্রমশই এই সকল প্রাচীন বৌদ্ধ অবশেষ তথা ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করে চলেছে। আমাদের বৌদ্ধ জাতির নিকট এটি একটি চরম লজ্জার বিষয়। আমি আমার সীমিত ক্ষমতার মধ্য দিয়ে তৎকালীন বৌদ্ধযুগের অবশেষ ইত্যাদি খোঁজ করেছি লিপিবদ্ধ করেছি নানান বিষয়, খুঁটিনাটি ইত্যাদি। সম্মুখীণ হয়েছি নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির। এই আলোচনায় আমি সেই পর্যবেক্ষণের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ প্রামাণ্য রূপরেখা তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি এই কাজে কতটা সফল হয়েছি বলতে পারি না, কেননা সেই ধৃষ্টতা আমার নেই। তবুও বলি, যখন দেখব অনেকেই উৎসাহী হয়ে বিষয়টিকে নিয়ে পর্যবেক্ষণ, গবেষণা করছেন অথবা এই বিস্মৃতির অতলে থাকা বৌদ্ধ ইতিহাসটিকে আন্তজার্তিক মঞ্চে তুলে ধরেছেন তখনই হয়তো আমার এই পরিশ্রম সার্থক হবে।
No comments:
Post a Comment