Sunday, June 28, 2026

তন্ত্র ভূমিকা

 ভূমিকা

সুমনপাল ভিক্ষু

তন্ত্র বলতে বিশেষ ধরণের শাস্ত্রকে বোঝায়। 'তন্ত্র' শব্দের মূলগত অর্থ হল মুক্তি বা ত্রান। যে শাস্ত্র অনুযায়ী সাধন করলে জীবের মোক্ষ বা মুক্তি লাভ হয়, সাধারণভাবে তাকেই তন্ত্র বলে। (বাংলাপিড়িয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৩২, সিরাজুল ইসলাম) তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে, সাধনার মাধ্যমে জীব উন্নতস্তরে উপনীত হতে পারে। টীকাকার কল্লুক ভট্ট শ্রুতি বা জ্ঞানকে বৈদিক এবং তান্ত্রিক এই ২ ভাগে বিভক্ত করেছেন।

কারিগরী 'বিদ্যা, পশুপালন, কৃষি, বয়নশাস্ত্র, রসায়ন চিকিৎসা তন্ত্রের আদি বিষয়বস্তু। সুতরাং তন্ত্রের বিষয়বস্তু হল প্রাচীন জ্ঞান এবং জাগতিক জ্ঞানের সমন্ময় যা সাধারণ মানুষের দ্বারা সম্ভবপর হয়েছিল, তাই স্বাভাবিক অর্থে তন্ত্রের প্রকৃতি হল লোকায়ত। পুরাণ সমূহে তন্ত্রশাস্ত্রকে অবৈদিক এবং বেদবাহ্য বলা হয়েছে তথা নানাবিধ উপাসনা পদ্ধতির উল্লেখ প্রসঙ্গে ও তান্ত্রিক উপাসনা এবং বৈদিক উপাসনা স্বতন্ত্রভাবে নির্দিষ্ট আছে। সৌন্দর্য লহরী গ্রন্থে টীকাকার লক্ষ্মীধর তন্ত্রকে অবৈদিক বলেছেন। (তন্ত্রকথা, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, পৃ. ১১) যাজ্ঞবল্ক সংহিতায় বলা হয়েছে যে, তন্ত্রদীক্ষায় দীক্ষিত ব্যক্তির পক্ষে বৈদিক শ্রাদ্ধাদি নিষিদ্ধ। (প্রাগুক্ত, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, পৃ. ১২) কুলার্ণব তন্ত্রগ্রন্থে তন্ত্রের গৌরব প্রদর্শনের নিমিত্তে তন্ত্রকে কূলবধূর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (ইয়ন্ত শান্তবী বিদ্যা গোপ্যা কূলবধুরিব। তথ্যসূত্র : তদেব) আবার কোনও কোনও পুরাণের মতে, জনসাধারণকে বিভ্রান্ত এবং প্রতারিত করার জন্য তথা বেদ বহিস্কৃত পতিত ব্যক্তিবর্গের জন্য তন্ত্রশাস্ত্র প্রণীত হয়েছিল। বিষয়গত দিক হতে তন্ত্রশাস্ত্র মূলতঃ ৩টি শ্রেণীতে বিভক্ত আগম, যামল এবং তন্ত্র।

প্রাচীন তান্ত্রিক বিশ্বাসে মানবদেহের সাধনার উপর সবার্ধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং ধ্যান ধারণায় দেহাতিরিক্ত আত্মার কোনরূপ কল্পনা একেবারেই অনুপস্থিত। এ কারণে পরবর্তীকালের ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে অন্যান্য সম্প্রদায়ের চিন্তাশীলেরা, বিশেষভাবে আত্মবাদী অধ্যাত্মবাদীরা এ লোকায়ত তান্ত্রিক দেহাত্মবাদকেই বিশেষভাবে সমালোচনা করেছিলেন। (৫. মো. গোলাম সারওয়ার, পৃ. ৮৭)

পাল শাসনকাল হতে বঙ্গদেশে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটেছিল। অষ্টম-দ্বাদশ শতাব্দী (খ্রী.) পর্যন্ত সোমপুর, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারের বৌদ্ধ আচার্যদের দ্বারা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম পুষ্টি লাভ করে এবং অনতিবিলম্বে এই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম ভারতবর্ষের গন্ডী অতিক্রম করে তিব্বতে উপস্থিত হয়েছিল।

প্রকৃত অর্থে অষ্টম শতাব্দীর সময়কালে বঙ্গদেশে মহাযান মতাদর্শের তান্ত্রিক ভাবধারা পরিস্ফুট হতে শুরু করে। এই সময় এক শ্রেণীর বৌদ্ধ আচার্যগণ মহাযানের নব্য-ধ্যান ধারণা গড়ে তুললেন, যেখানে মন্ত্র'ই হল মূল এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হল ধারণী ও বীজ। প্রকৃত অর্থে এই মতাবাদই হল মন্ত্রযান। (ড. মো. গোলাম সারওয়ার, পৃ. ৮৯)।

ড. গোবিন্দ চন্দ্র পান্ডে'র মতে, 'মহাযান এবং বজ্রযান অদ্বয়বজ্র অনুসারে তিন যান হয়, শ্রাবক যান, প্রত্যেক যন তথা মহাযান। চার স্থিতি বৈভাষিক, সৌত্রান্ত্রিক, যোগাচার এবং মাধ্যমিক। এর মধ্যে শ্রাবক এবং প্রত্যেক যানের ব্যাখ্যা বৈভাষিক স্থিতি দ্বারা হয়। মহাযান দ্বিবিধ পারমিতা নয় এবং মন্ত্র নয়। পারমিতা নয়'এর ব্যাখ্যা সৌত্রান্ত্রিক, যোগাচার এবং মাধ্যমিক স্থিতি দ্বারা হয়, মন্ত্রনয়'এর ব্যাখ্যা যোগাচার এবং মাধ্যমিক স্থিতি দ্বারা। (অদ্বয় বজ্র, ভূমিকা, পৃ. ১২) মন্ত্রনয় অত্যন্ত গম্ভীর এবং এর অধিকার শুধুমাত্র তীক্ষেনন্দ্রিয় পুরুষ দ্বারাই সম্ভব। মহাসাংঘিকের' বিদ্যাধর পিটক' অথবা 'ধারণীপিটক'এ মহাযানিক মন্ত্রনয়কে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের নিশ্চিত অবতারণা মনে করা উচিত।

তারনাথ অনুসারে ৩০০ বর্ষ পর্যন্ত তন্ত্রের পরম্পরা অত্যন্ত গুপ্ত ছিল, এরপর অর্থাৎ আচার্য ধর্মকীর্তির পরে বিশেষতঃ পালযুগে, এর শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। (তারনাথ, অণুঃ সীফনার, পৃ. ২০১) অপরদিকে গুহ্যসমাজ'এর তান্ত্রিক পরম্পরা'র উদ্ভব কদাচিটত ৩'য় শতাব্দীতে হয়েছিল তথা ৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত এর গুপ্ত প্রচার হয়েছিল। ৭ম শতাব্দীতে গুহ্যসমাজ অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।

কালচক্রযানের উদয় ১০ 'ম শতাব্দীর পূর্বে মনে করা উচিত। কালচক্রতন্ত্র এবং তার বিমলপ্রভা টীকা'এর প্রমাণ ভূত গ্রন্থ। কালচক্রকে আদি বুদ্ধ বলা হয়েছে। একথা স্মরণীয় যে আদিবুদ্ধ'র কথা কারন্ডব্যূহ'তে পাওয়া যায়। সর্বোপরি অসঙ্গ ও এর উল্লেখ করেছেন। বিমলপ্রভা'র টাকা গ্রন্থ 'সেকোদেশ' (নঙ্-নাদ বা নারো-পা রচিত)। মঞ্জুশ্রীকে এই তন্ত্রের প্রবর্তক তথা সুচন্দ্রকে বিমলপ্রভা'র রচয়িতা বলা হয়েছে। বৌদ্ধ তন্ত্রের অন্তিম সিদ্ধান্ত 'সহজযান'। সরহ অথবা লুইকে সিদ্ধ পরম্পরার প্রবর্তক বলা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে কাল অথবা ক্রম নির্ণয় করা সম্ভব নয়। (প্রবোধ চন্দ্র বাগচী, স্টাডীজ ইন দি তন্ত্রজ, পৃ. ৩-৪)।

তন্ত্রের কথা' গ্রন্থ সম্পর্কে শ্রী দীনেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য (পূর্বাভাষ) বলেছেন, "তন্ত্র শাস্ত্রের প্রায় অসংখ্যা বিষয় বস্তুর মধ্যে এ গ্রন্থে যে কয়টির সবিশেষ আলোচনা হইয়াছে তাহাদের মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে, ১. তত্ত্ব-অংশ, ২. দেবার্চন-অংশ, এবং ৩. সাধনা অংশ।

পণ্ডিতদের মতে, তন্ত্রের অনেক স্থলে সাংখ্য ও বেদান্তদর্শনের প্রতিফলন লক্ষও করা যায়, যেমন, সাংখ্যের 'পুরুষ'ই তন্ত্রের 'শিব', প্রকৃতিতন্ত্রের, 'শক্তি'।

ইতিহাস অনুসরণে আমরা দেখিতে পাই, অষ্টাদশ শতাব্দীর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও সাধক রামপ্রসাদের কাল হইতে অদ্যাবধি প্রবৃত্তি মার্গের তান্ত্রিক পূজার প্রচলন ও সমাদর বাঙালী হিন্দুর সমাজে ক্রমেই বৃদ্ধিলাভ করিতেছে, সেই অনুপাতে (বামাচার বা 'নিবৃত্তি' মার্গের) শব-সাধনা, ভৈরবী চক্র ইত্যাদি অনুষ্ঠান অনাদর ও অবজ্ঞার বিষয় লইয়া ক্রমে প্রায় বিস্মৃতির গর্ভেলীন হইয়াছে।

সাধনা অংশে স্থান পাইয়াছে কুখ্যাত তান্ত্রিক আচার বা ক্রিয়া কলাপের শাস্ত্রানুগ বর্ণনা ও গ্রন্থকারের স্বকীয় মন্তব্য। গ্রন্থকারের ভাষায় বাঙালী, 'ঘোর তান্ত্রিক', বাঙালীর যাবতীয় ক্রিয়াকর্ম, পূজা অর্চনা কিভাবে তন্ত্রনির্ভর, বিশেষতঃ তাহার চিত্তবৃত্তিও কিভাবে তান্ত্রিক সংস্কার দ্বারা প্রভাবিত, সপ্তম অধ্যায়ে তাহা গ্রন্থকার তাঁহার সাবলীল ভঙ্গীতে দেখাইয়া গ্রন্থ শেষ করিয়াছেন।"

পরিতাপের বিষয় এই যে শ্রী দীনেশচন্দ্র মহাশয় বৌদ্ধতন্ত্রের কোনরূপ উল্লেখ করেন নি। তন্ত্রের ইতিহাস তথা অনুসন্ধানের প্রশ্নে বৌদ্ধ এবং হিন্দুতন্ত্রকে সমানভাবে গুরুত্বপ্রদান করা একান্তভাবে আবশ্যক নতুবা বিষয়টি পক্ষপাতের পঙ্কে নিমজ্জিত হতে বাধ্য। যাইহোক, সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় প্রণীত 'তন্ত্রের কথা' নামক গ্রন্থটি সর্বমোট ৭টি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং প্রতিটি অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, 'স্যার জন উভরক্ষ স্বনামে এবং ছদ্মনামে (আর্থার এভানল) তন্ত্রশাস্ত্রের সবিশেষ চর্চা করেছেন। তাঁর মতে, (উভরফ) ভারতীয় সবকটি ধর্মশাস্ত্রেরই জন্ম হয়েছে বেদ থেকে, বেদেরই যুগোপযোগী নব নব ব্যাখ্যায়। কলিযুগের পক্ষে উপযোগী হয়েছে বেদের তান্ত্রিকী ব্যাখ্যায়।"

পাশ্চাত্য পণ্ডিত উইনটারনিজ বলেছেন, তন্ত্রের জন্মভূমি বাঙলা সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়েছে আসামে (কামরূপ)। তারপর বৌদ্ধতন্ত্রের হাত ধরে তা ভারতবর্ষের সীমা অতিক্রম করে উপস্থিত হয়েছে নেপাল, তিব্বত এবং চীনে। তবে সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় তন্ত্রের জন্ম এবং তার লীলাভূমি প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেশ করেছেন। যেমন

"গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা, মৈথিলে প্রবলীকৃতা।
ককচিৎ ককচিন্মহারাষ্ট্রে গুর্জরে প্রলয়ং গতা।"

অর্থাৎ, গৌড়ে তন্ত্রবিদ্যার জন্ম হয়েছে, মিথিলায় ঘটেছে তার প্লাবন, মহারাষ্ট্রে'এর প্রভাব কিছু কিছু উদ্ভাষিত হয়েছে, আর এ বিদ্যা গুজরাটে নয় পেয়েছে।

তন্ত্রশাস্ত্রের রূপ দ্বিবিধ, অর্থাৎ বৌদ্ধ এবং হিন্দু তন্ত্র। 'মহানির্বাণ' তন্ত্রের ভূমিকায় ৩ শ্রেণীর তন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধ তন্ত্র হিন্দু তন্ত্রের পূর্ববর্তী এবং এই মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, "পালিভাষায় লেখা বৌদ্ধধর্মের তত্ত্বকথার মধ্যে এমন কিছু কিছু চিহ্ন রয়েছে যা তান্ত্রিক আচার ও চিন্তাধারারই শালিল। অবশ্য 'তন্ত্র' কথাটা উচ্চারিত হয়নি। কারে কারে মতে 'পঞ্চকায় গুণাদিটঠধম্ম নির্ব্বাণবাদ' কথাটা বুদ্ধদেবেরই মুখনিঃসৃত বাণী। তবে বুদ্ধদেবের স্বমুখনির্গত বাণীরও পরবর্তীকালে কদর্থ হওয়া কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।"

সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়'এর অভিমত অনুসারে এই তথ্য পাওয়া যায় যে ৩-৪ শতাব্দী কালে রচিত বৌদ্ধ তন্ত্র গ্রন্থ 'গুহ্যসমাজ' মূল অর্থে প্রথম বিধিবদ্ধ গ্রন্থ।.... বৌদ্ধতন্ত্র হিন্দুতন্ত্রের অগ্রজ। বুদ্ধে জীবিত কালেই বৌদ্ধ তন্ত্রের সূচনা হয়েছে, বৌদ্ধতন্ত্রের প্রথমরূপ 'সংগীতি'। 'গুহাসমাজ' বৌদ্ধতন্ত্রের মূল সূতিকা গৃহ।

গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু 'তন্ত্রের আশ্রয়'। এই অধ্যায়ে উঠে এসেছে বৌদ্ধধর্মের বিবর্তন বাদ। ভগবান বুদ্ধ ৪৫ বর্ষ ব্যাপী সদ্ধর্ম প্রচার করার পর ৪৮৩ খ্রীষ্ট পূর্বাদ্ধে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা প্রকৃতির ব্যক্তিবর্গ বৌদ্ধধর্মে সম্মিলিত হয়ে পড়ে, ধর্মে নানা পরিবর্তন ফুটে উঠতে থাকে। এইভাবে ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের ১০০ বর্ষ পরে, বৈশালীর সঙ্গীতির সময়, বৌদ্ধধর্ম, স্থবিরবাদ এবং মহাসাংঘিক নামক ২টি নিকায়ে (সম্প্রদায়) বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ১৫০ বর্ষ পরে ১৮টি নিকায় উদ্ভূত হয়, যার বংশবৃক্ষ, পালি কথাবত্থু'র অট্ঠকথাতে দেখতে পাওয়া যায়।

ভগবান বুদ্ধের জীবৎকালে তাঁর ভিক্ষুসংঘ ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন জনপদে উপস্থিত হয়েছিলেন। অশোকের সময়কালে (খ্রী. পূর্ব ৩'য় শতাব্দী) বৌদ্ধধর্ম বিশ্ব ধর্ম রূপে খ্যাতি লাভ করেছিল। উত্তরকালে বৌদ্ধতন্ত্র কিভাবে বিকশিত হয়েছিল তা এখানে প্রদান করা হল। যেমন- 
মহাসাংঘিক (চৈত্যবাদী)


অন্ধক
সম্মিতীয় (খ্রী. পূর্ব ৩'য় শতাব্দী)
বৈপূল্য (খ্রী. পূর্ব ১ম শত্বাদী)
পূর্ব শৈলীয়
অপর শৈলীয় রাজগিরিক
সিদ্ধার্থক (খ্রী. পূর্ব ৩-১'ম শতাব্দী)
মহাযান (খ্রী. ১ম শতাব্দী)
যোগাচার
বিজ্ঞানবাদ
ক্রিয়াতন্ত্র
চর্যাতন্ত্র
বজ্রযান (শূন্য, বিজ্ঞান এবং মহাসুখ)
যোগতন্ত্র
অনুত্তর যোগতন্ত্র
কালচক্রযান (মহাপাল'এর শাসনকাল)
মন্ত্রযান
সহজযান
-তথ্যসূত্র : পুরাতন্ত্র নিবন্ধাবলী, পৃ. ১২৭-১২৮।


সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়'এর মতে, বজ্রযানের মধ্য দিয়েই তন্ত্রের মূল আদর্শ এবং তান্ত্রিক চর্যা বৌদ্ধ সমাজে অঙ্গীভূত হয়েছে। এই বজ্রযান'ই হল তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম, যাকে বৌদ্ধ ধর্মের অপচ্ছায়া বা অপভ্রংশ ব্যতীত আর কিছুই বলা চলে না।

খ্রীষ্টিয় ২-৩ শতাব্দীর সময়কালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে পৌরাণিকতা এবং মূর্ত দেব দেবীর অনুপ্রবেশ ঘটতে শুরু করে। এর পরিপূর্ণতা আমরা দেখতে পাই ৮-৯ শতাব্দীতে। এই সময় দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গদেশে বৌদ্ধ রাজ বংশ খড়গ এবং চন্দ্র শাসকদের শাসন কাল বিশেষভাবে উল্লেখ্যনীয় ছিল। সমাজে শৈব ধর্ম এবং কাপালিক মতের চর্চা ব্যাপকতা লাভ করেছিল। চর্যাপদে কাপালিক সাধন তত্ত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। সিদ্ধাচার্য বলছেন-

কইসনি হালো ভোম্বী তোহোরি ভাবরিআলী।
অন্তে কুলিনজন মাঝে কাবালী।।

তইলো ডোম্বী সঅল বিটালিউ।
কাজন কারণ সসহর টালিউ।।

কেহো কেহো তোহোরে বিরুতা বোলই।
বিদুজন লোঅ তোরে কন্ঠ না মেলঙ্গ।।

তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে তন্ত্রপ্রধান অঞ্চল ও তান্ত্রিক বিধান। বৌদ্ধধর্মের অন্তিম পরিণতি ছিল 'তন্ত্র'। এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম তদানীন্তন পূর্বাঞ্চলে (অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ এবং প্রাগজ্যোতিষপুর) দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল। ১২'শ শতাব্দীকালে তুর্কী মুসলমানদের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে বঙ্গদেশ হতে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়। বঙ্গদেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুরাণ এবং হিন্দু তন্ত্রের জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেল।

প্রসঙ্গত স্মরণ যোগ্য যে বঙ্গদেশে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি কোনভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি। এর মূল কারণ বঙ্গদেশের জনগন দেবী পূজার উপাসক। লেখক এই অধ্যায়ে বৌদ্ধ এবং হিন্দু তন্ত্রের মুখ্য অষ্টসিদ্ধি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করেছেন যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক ও বটে।

শাক্ততন্ত্রের মূল ধারক এবং বাহক হল আদ্যাশক্তি মহামায়া। ২টি রূপে তিনি বঙ্গদেশে পূজিত বা প্রতিষ্ঠিত, ১. চন্ড (দুর্গা), ২. কালী। তবে এই ২ দেবীর মধ্যে কালী অধিক জনপ্রিয়।

প্রকৃত অর্থে 'তন্ত্রের মর্মবাণী' কি?

এ প্রশ্নের উত্তরে লেখক সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, "তন্ত্রের লক্ষ্য হল 'পরমহংসত্ব' লাভ বা জ্ঞামুক্তি বা পাশমুক্তি। উপনিষদে যার অর্থ অজ্ঞান, তন্ত্রে তাকেই বলা হয়েছে 'পাশ' অর্থাৎ পশু জীবনের যতকিছু বন্ধন। লক্ষ্য দুটি পন্থারই এক।"

তন্ত্রশাস্ত্র বাস্তববাদী, এই বস্তুতন্ত্রকে মেনে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তান্ত্রিক সাধড়ার বিধি রচিত হয়েএছ। এ বিধির মুখ্যকথা, 'ভোগো যোগয়তে' (ভোগো যোগায়তে সাক্ষাদ দুস্কৃতি, সুকৃতায়তে, মোক্ষায়তেহি সংসার, কুলধর্মে মহেশ্বরি)।। অর্থাৎ ভোগকে অতিক্রম করে ভোগবর্জিত যোগের মধ্যে যেতে হবে ভোগকে এড়িয়ে নয়, আস্বাদ করে।

হিন্দুতন্ত্র
দক্ষিণাচারী (প্রবৃত্তিমার্গ)
বামাচারী (নিবৃত্তিমার্গ)
সিদ্ধান্তচারী
অঘোরচার
যোগাচার
কৌলাচার


পঞ্চম অধ্যায়ের বিষয়বস্তু তান্ত্রিক আচার, পঞ্চ 'ম'-কার সাধনা। দীক্ষা কাকে বলে?

সহজ অর্থে বিষয়টিকে ইষ্টমন্ত্রদান বলে। লেখকের মতে বিষয়টি দৈবশক্তির প্রতীক। তিনি স্পষ্টভঅবে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, দীক্ষার মাধ্যমেই 'পাশমুক্তি' সম্ভব হয়, জ্ঞানের দ্বারা তা অর্জন করা হয় না। (দীক্ষৈব মোচয়ত্যুধ্বং শৈবং ধাম নয়ত্যপি) দীক্ষাদানের ক্ষেত্রে শুভ তিথি, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করা গুরুর ক্ষেত্রে আবশ্যক কর্তব্য, নতুবা মন্ত্রজপ এবং মন্ত্রপূজা বিধি নিষ্ফল হয়। তন্ত্রজগতে পঞ্চ ম-কার সাধনা এক চিরকুহেলিকাময় রাজ্য। এই গূঢ় সাধনার আড়ালে তন্ত্র একদিকে যেমন পরম রহস্যময় হয়েছে, তেমনি সুস্পষ্ট কারণে তাকে বহুস্থানে ঘৃণ্য এবং অপাংতেয় করে রেখেছে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। যেমন

মদ্যং মাংসঞ্চ মৎস্যশ্চ মুদ্রা মৈথুনমেব চ।
ম-কার পঞ্চকং দেবি! দেবতাপ্রীতিকারকম্।। - কুলার্ণবতন্ত্র।


১৪'শ শতকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কালী তন্ত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর তন্ত্রসাধনার তরীতে উঠে এল তিনটি পাল ষষ্কর্ম, অষ্টসিদ্ধি এবং পঞ্চ ম-কার। তন্ত্রে বেদাচার, দক্ষিণাচারের উল্লেখ থাকলেও তান্ত্রিক দেব দেবী ও উপাসনা পদ্ধতি লৌকিক ধারারই ধারক বাহক। তন্ত্রে আর্যও আর্যেতর ধারার সংমিশ্রণ ঘটেছে। আদিমতর জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে মাতৃপূজার যে ধারা ছিল, যার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল বেদ, পুরাণেতারই একটি সুসংহত রূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে তন্ত্রে। তন্ত্রের একদিকে যেমন বলা হয়েছে

যদুক্তং পরমং ব্রহ্ম নির্বিকারং নিরঞ্জনম্।
তস্মিন প্রমদনং জ্ঞানং তন্মাদ্যং পরিকীর্তিতম।।

কুলকুন্ডলিনী শক্তিদেহিনাং দেহধারিণী।
তয়া শিবস্য সংযোগো মৈথুনং পরিকীর্তিতম্।। বিজয়তন্ত্রম।

উপাসনা পদ্ধতি যাই হোক না কেন, তন্ত্রে মাতৃশক্তির একচ্ছত্র প্রভাব বিদ্যমান। তন্ত্রের ধ্যান, জ্ঞান, স্তবস্তুতি, জপ, হোম, মন্ত্র, মন্ডল সব কিছুরই মূল লক্ষ্য শক্তি দেবী (জগৎমাতা)।

হ্লাদিনী যা মহাশক্তি: সর্ব্বশক্তি বরীয়সী।
তৎসার ভাবরূপেয়মিতি তন্ত্রে প্রতিষ্ঠাতা।। রাধা প্রকরণ।

শক্তিদেবী এবং তাঁর উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিকতা ও ভাবুকতা, অন্যদিকে আছে তামসিক আচারের বাহুল্যতা।

ভ্রুকুটিকুটিলাংতস্যা ললাটফলকাদদ্রুতম্।
কালী করালবদনা বিনিষ্ক্রান্তাসিপাশিনী।।

বিচিত্র খট্টাঙ্গধারা নরমালা বিভূষণা।
দ্বীপিচর্ম পরিধানা শুষ্কমাংসাতিভৈরবা।।
অতিবিস্তার বদনা জিহ্বাললনভীষণা।
নিমগ্নরক্তনয়না নাদাস্পুরিতদিম্মুখা।। জ্ঞানর্ণব তন্ত্র (উঃ চঃ ৭ম অধ্যায়)।

তান্ত্রিক সাধনার মূল লক্ষ্য হল মূলাধারে শিবশক্তিকে অর্থাৎ কুলকুন্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে, এর কুন্ডলীভাব ঘুচিয়ে, একে উর্ধ্বমুখী করে শিবচক্রে পরমশিবের সঙ্গে মিলিত করা, আবার কুলকুন্ডলিনী শক্তিকে মূলাধারে ফিরিয়ে আনা।

এই লক্ষ্যভেদের সহায়তা করে যোগসাধনা। (তন্ত্রের কথা, পৃ. ৭৮)।

মুদ্রার ব্যুৎপত্তিগত বা মর্মগত অর্থ কি?

এ প্রসঙ্গে লেখক সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত অর্থবহ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, শিবচক্রে বা সহস্রদল কমলে যে পরমাত্মার অবস্থান তাঁরই সম্যক জ্ঞানের নাম মুদ্রা। তবে মহানির্বাণ তন্ত্রের ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা একটু ভিন্ন ধরনের। হৃদয় স্থিত আশা, তৃষ্ণা, লজ্জা, প্রভৃতিকে জ্ঞানাগ্নির সহায়তায় 'ভঙ্গনকরা' অর্থাৎ বশীভূত করার নামই হল 'মুদ্রা'।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে 'তন্ত্রের দেবদেবী'। এই অধ্যায়ের এইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বৌদ্ধ মূর্তিশাস্ত্রের মূল ভিত্তি প্রকৃত অর্থে একটি তন্ত্রগ্রন্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। গ্রন্থটি নাম 'সাধনমালা'। এই গ্রন্থটি সম্পর্কে শ্রীযুক্ত বিনয়তোষ ভট্টাচার্য মহাশয় বলেছেন, "সাধনমালার যতগুলি পুঁথি পাওয়া গিয়াছে তাহার মধ্যে একখানি সর্বাপেক্ষা পুরাতন। এই পুঁথিখানি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিশালায় রক্ষিত আছে। পুঁথিখানির একটি পাতায় নেবারী সংবতে গ্রন্থসংগ্রহের তারিখ দেওয়া আছে। এই তারিখটি ২৮৬ নেবারী সংবত, অর্থাৎ ১১৬৫ খ্রীষ্টাব্দ। সাধনমালায় ৩১২টি সাধনায় অগণিত দেবদেবীর বর্ণনা, মুর্তির ধ্যান এবং পূজাপদ্ধতি, মন্ত্র ও মন্ত্র প্রয়োগাদি দেওয়া আছে।"

আর ও একটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁথির নাম নিষ্পন্ন যোগাবলী। এই গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছিলেন একজন বাঙালী পণ্ডিত। তাঁর নাম অভয়াকর গুপ্ত। তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারে গবেষণার কার্য করতেন এবং অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর সময়কাল ১১৩০ খ্রীষ্টাব্দের নিকটবর্তী কোন এক সময়ে। এই গ্রন্থ অর্থাৎ পুঁথিতে প্রায় ৬০০ দেবদেবীর বিবরণ পাওয়া যায়।

বৌদ্ধ তন্ত্র মত অনুসারে সৃষ্টির আদি এবং অকৃত্রিম উৎপত্তিস্থল একমাত্র শূণ্য। এই শূণ্যের মূলভূত অর্থ সৎ বিজ্ঞান ও মহাসুখ, অর্থাৎ শূন্য চিৎসদৃশ এবং আনন্দস্বরূপ। এই শূন্য রূপ ঘণীভূত হয়ে প্রথমে শব্দ রূপ দৃশ্য হন এবং পরে শব্দ হতে পুনরায় ঘণীভূত হয়ে দেবতারূপ গ্রহণ করে থাকেন। (বৌদ্ধদের দেবদেবী, বিনয়তোষ ভট্টাচার্য, পৃ. ৪)

'শূন্য' কে বজ্রযানে 'বজ্র' আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তার মূল কারণ হল শূন্য বজ্রের ন্যায় দৃঢ়, সারবান, ছিদ্ররহিত, অচ্ছেদ্য, অভেদ্য, অদাহী এবং অবিনাশী। শূন্যের নাম বজ্র এবং যে মার্গে শূন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে যায় তাকে শূন্যযান বা বজ্রযান বলে।

'আদিবুদ্ধ' প্রকৃত অর্থে বৌদ্ধ দেবমণ্ডলের আদি দেবতা। ইনি সৃষ্টির আদি কারণ শূন্য বা বজ্র। আদি দেবতা। ইনি সৃষ্টির আদি কারণ শূন্য বা বজ্র। আদি বুদ্ধ হতে পঞ্চধ্যানী বুদ্ধ বৈরোচন, রত্নসম্ভব, অমিতাভ, আমোঘসিদ্ধি এবং অক্ষোভ্য।

বজ্রযান দেবসংঘে গৌতমবুদ্ধের স্থান প্রায় নেই বললেই চলে। যদি তাঁকে কখনও প্রতিমূর্তিত করা হয় তাহলে তিনি অক্ষোভ্যের ন্যায় দেখতে হন। তখন তাঁর নাম হয় বজ্রাসন। নিষ্পন্ন যোগাবলীতে দুর্গতি পরিশোধন মন্ডলেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে ভগবান বুদ্ধকে "শ্রীশাক্যসিংহো ভগবান মহা বৈরোচনঃ" অর্থাৎ বৈরোচন রূপে কল্পনা করা হয়েছে। (বৌদ্ধদের দেবদেবী, বিনয়তোষ ভট্টাচার্য, পৃ. ৬)।

সংখ্যাতীত তন্ত্রগ্রন্থে লক্ষ লক্ষ মহাশক্তির উল্লেখ রয়েছে 'শত লক্ষ মহাবিদ্যা তন্ত্রাদৌ কথিতা প্রিয়ে।' এর মধ্যে প্রধান ১০ মহাবিদ্যা -

কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী।
ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধমাবতী তথা।।

বগলা সিদ্ধবিদ্যা চ মাতঙ্গী কমলাত্বিকা।
এতা দশমহাবিদ্যাঃ সিদ্ধবিদ্যাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।। চামুন্ডা তন্ত্র।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের বিখ্যাত গ্রন্থ 'তন্ত্রসার'। এই মহামূল্যাবান গ্রন্থে তিনি 'কালীতন্ত্রে'র উল্লেখ করেছেন। "করালবদনাং ঘোরাং" চতুর্ভুজাং, মুন্ডমালা বিভূষিতাং, মহামেঘ প্রভাং শ্যামাং, পীনোন্নত পয়োধরং, শ্মশানালয়বাসিনীং, কালীং, সর্বকাম সমৃদ্ধিদাম।"

বৌদ্ধতন্ত্রের দেবী তারার বিবর্তিত রূপ হল কালী, সরস্বতী এবং ভদ্রকালী। সরস্বতী'র মন্ত্রের মধ্যে নিহিত আছে তন্ত্রের বিধান। সপ্তম অর্থাৎ অন্তিম অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় বস্তু 'বাঙালীর তান্ত্রিকতা ও তন্ত্র ব্যাখ্যান।

মনে রাখতে হবে যে বাঙালীর জীবন দর্পণে যে সকল দেবদেবী পূজিত হয়ে আসছে (কালী, চন্ডী, দুর্গা, সরস্বতী এবং শিব অথবা মহাকাল) তার সকলই তান্ত্রিক আচার-আচরণ যুক্ত। বঙ্গদেশে ইসলামী আগ্রাসনের পূর্ব সময়কাল পর্যন্ত বৌদ্ধতন্ত্র টিকে ছিল। এরপর হিন্দু পৌরাণিককতা এবং লোকায়ত ধর্মের মধ্যে বৌদ্ধতন্ত্র বিলীন হয়ে যায়। ১৫-১৬ শতাব্দীকালে 'তন্ত্রসার' গ্রন্থটি অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই গ্রন্থের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাগীশ্বরী বা বাগদেবতার কথা।

বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী হয়গ্রীবের একটি মুখ অশ্বের মুখের ন্যায়। দেহখানি শরৎকালের পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় স্নিগ্ধ। দেবীরূপ বর্ণনা এইভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে-

তরুণশকলমিন্দোর্বিবভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ কুচভরণমিতাঙ্গী সন্নিষন্না সিতাজে।

তন্ত্রসার' মূল অর্থে তান্ত্রিক আচার-আচরণ পদ্ধতির উল্লেখ্যনীয় গ্রন্থ। কর্মই জীবের জন্ম-কারণ, 'দেহঃ কর্মাত্মকঃ প্রোক্তঃ, 'সর্বকর্মাত্মকং'। শারদাতিলকে আছেঃ 'পূবর্বকর্মানুরূপেন মোহপাশেনযন্ত্রিতঃ। কশ্চিদাত্মা তদা কস্মিন জীবভাবং প্রদত্যতে।।' (১/১৩) মোহগ্রস্ত জীবের বর্ণনাও তন্ত্রে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেমন হল-

স্বদেহ-ধন-দারাদি-নিরতাঃ সর্ব্বজন্তবঃ।
জায়ন্তে চ প্রিয়ন্তে চ হাহাতাহজ্ঞানমোহিতাঃ।। শাক্তানন্দতরঙ্গিনী।

তন্ত্রের বহুপদে দেবীবর্ণনার রূপ দৃষ্ট হয়। 'তন্ত্রসার' গ্রন্থে তা এইভাবে বর্ণিত হয়েছে। মূল ধ্যানের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত-

বালার্কমন্ডলাকার লোচনত্রয়ভূষিতাম। জ্বলচ্চিতামধ্যানগতাং ঘোরাদংষ্ট্রাং করালিনীম্।। অক্ষোভ্যো দেবী মুর্দ্ধন্যাস্ত্রিমূর্ত্তি নাগরূপধূক।

সাবেশস্মেরবদনাং স্থালংকারবিভূষিতাম্।
বিশ্বব্যাপকতোয়ান্ত শ্বেতপদ্মোপরিস্থিতাম্।।

এই ধ্যানের সঙ্গে শিবচন্দ্র রায় বিরচিত 'নীরবরণী নবীনা রমনী।

নাগিনী জড়িত জটাবিভূষণী পদটি তুলনীয়।

সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়'এর মতে 'মঞ্জুঘোষ চন্দ্রের ন্যায় শ্বেতবর্ণের। তাঁর হাতে খড়গ এবং পুঁথি। এর দেহকান্তি অপরূপ এবং শান্তমূর্তি। ইনি পদ্মপলাশলোচন, সাধকের কুমতি দূরীভূত করেন। বৌদ্ধ তন্ত্রের মঞ্জুঘোষ মূর্তিতে মঞ্জুশ্রী একমুখ ও দ্বিভুজ। ইনি সর্বালঙ্কার ভূষিত। একটি সিংহের উপর উপবিষ্ট থাকেন এবং হস্ত দ্বয়ে ব্যাখ্যান বা ধর্মচক্র মুদ্রা প্রদর্শন করেন। বামপার্শ্বে একটি উৎপল থাকে। এর দক্ষিণে সুধনকুমার এবং বামে যমান্তক দন্ডায়মান অবস্থায় থাকেন।

পঞ্চাঙ্গ শুদ্ধি ব্যতীত সমস্ত পূজাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। লেখকের মতে এই পঞ্চাঙ্গের অঙ্গগুলি হল আত্মা, স্থান, মন্ত্র, দ্রব্য এবং দেবতা। 'তন্ত্রসার' গ্রন্থে এই বিষয়গুলি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তন্ত্রসার গ্রন্থের পর সতীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় 'মহানির্বাণতন্ত্র' সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটি ১৪টি উল্লাস অর্থাৎ পরিচ্ছেদে বিভক্ত। তন্ত্রের একদিকে যেমন বলা হয়েছে-

মদ্যং মাংসং তথা মাৎস্যং মৈথুনমেব চ।
ম-কারাং পঞ্চ দেবেশি শীঘ্রং সিদ্ধিপ্রদায়কম্।।

মহানির্বাণতন্ত্র।

এইভাবে সম্পূর্ণ গ্রন্থে তন্ত্রের 'সম্পূর্ণ' ইতিহাস, বিধি বিধান ইত্যাদি অতি সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ভাব না কালী ভাবনা কিবা।
ওরে মোহমীয় রাত্রি গতা সম্প্রতি প্রকাশে দিবা।।

অরুণ-উভয়কাল ঘুচিল তিমিরজাল।
ওরে কমলে কমল ভাল, প্রকাশ করেছে শিবা।।

গ্রন্থটি বিশ্ববিদ্যালয়'এর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীগণের নিকট সহায়ক গ্রন্থরূপে যে অপরিহার্য হয়ে দেখা দেবে তা নয়- বাংলা সাহিত্য ও বাঙালীর জাতীয় জনজীবনে এই গ্রন্থখানি যে প্রচুর সমাদর লাভ করবে সে বিষয়ে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।

No comments:

Post a Comment