Sunday, June 28, 2026

মধ্যযুগীয় বাংলায় আচররগত বৌদ্ধ তন্ত্র

 মধ্যযুগীয় বাংলায় আচররগত বৌদ্ধ তন্ত্র


- সুমনপাল ভিক্ষু


প্রাককথন:

প্রাচীন বাংলায় পাল যুগে তন্ত্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা শুরু হয় বৌদ্ধ মতাদর্শনে বিশ্বাসী পাল

রাজাদের শাসনতন্ত্র পর্যায় ক্রমে প্রায় ৪০০ বৎসর স্থায়ী হয়েছিল। বৌদ্ধ রাজতন্ত্রের এই দীর্ঘকালীন

শাসনে সমগ্র বাংলায় তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম দর্শন সাধনার অন্যতম কেন্দ্র বিন্দু রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিষ্টীয়

৮ম থেকে ১২ শতাব্দী পর্যন্ত সোমপুর, বিক্রমশিলা এবং ত্তদন্তপুরী ইত্যাদি বৌদ্ধ বিহার এবং আচার্যদের

দ্বারা তন্ত্রযান পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং অচিরেই এই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ প্রমুখ

আচার্যদের দ্বারা তিব্বতে বিস্তার লাভ করে।

ড. মো. গোলাম সারওয়া; এর মতে, মূলত অষ্টম শতাব্দী থেকে বাংলায় মহাযান মতবাদের তান্ত্রিক

রূপান্তর ঘটতে থাকে। প্রাচীন মহাযানী ধ্যান ও চিন্তা, মাধ্যমিকবাদ বা শূণ্যবাদ, যোগাচারবাদ বা

বিজ্ঞানবাদ ক্রমেই অল্প সংখ্যক পণ্ডিতদের চর্চার বিষয় হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের দ্বারা যোগাচার ও

মাধ্যমিকবাদের গভীর তত্ত্ব ও সাধনমার্গের বিচিত্র স্তর উপলব্ধি সহজ ছিল না। আর সেই সাধারণ

মানুষের জন্য এক শ্রেণীর বৌদ্ধ আচার্যরা মহাযানের নতুন ধ্যান ধারণা গড়ে তুললেন, সেখানে মন্ত্রই মূল

প্রেরণা এই মতবাদই হলো মন্ত্রযান। বাংলায় মন্ত্রযান হলো মহাযানের বিবর্তনের প্রথম স্তর।” (প্রাচীন

বাংলায় ধর্ম-প্রসঙ্গ পৃ: ৮৮-৮৯)।

তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্মের পরম্পরা হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে মাধ্যমিক দর্শনের ব্যাখ্যাতা আচার্য

নাগার্জুনকে মন্ত্রযানের প্রবক্তা রূপে গণ্য করা হয়েছে। কথিত আছে নাগার্জুন পুণ্ড্রবর্ধনের প্রসিদ্ধ

সিদ্ধাচার্য সরহপাদ; এর নিকট হতে মন্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তবে একথা সত্য যে মন্ত্রতন্ত্র, গুহ্যশক্তি

ইত্যাদি বিষয়গুলি এই অঞ্চলের সভ্যতার সঙ্গে অতীত কাল হতে সম্পৃক্ত ছিল এর প্রতিফলিত রূপ

হলো তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম বা তন্ত্রযান।

মন্ত্রযানের পর তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধনা, ধর্ম ও দর্শনের বিকাশ সম্পর্কিত নানাবিধ অভিমত পাওয়া যায়। ড.

বিনয়তোষ ভট্টাচার্য পরবর্তী বৌদ্ধমত; এর বিভাজন বজ্রযান, কাল-চক্রযান এবং সহজযান এইভাবে

করেছেন। এর অতিরিক্ত কিছু অন্য যান ও রয়েছে যার সম্পর্ক তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেমন-

তন্ত্রযান, মন্ত্রযান, ভদ্রযান ইত্যাদি। সংক্ষেপে সম্প্রদায়-বিভাজন'এর মতকে এইভাবে প্রস্তুত করা যেতে

পারে-

১। কাজী দবাসন দুপ:

মন্ত্রযান: ১. ক্রিয়াতন্ত্রযান, ২. চর্যাতন্ত্রযান, ৩. যোগতন্ত্রযান: ৩.১. মহাযোগতন্ত্রযান, ৩.২.

অনুত্তরযোগতন্ত্রযান ৩.৩. অতিযোগযন্ত্রযান

২। ৬. শশীভূষণ দাশগুপ্ত:

মন্ত্রযান: ১. ক্রিয়াতন্ত্রযান + ২. চর্যাতন্ত্রযান: নিম্নতন্ত্র, অনেকপ্রকার বিধিবিধান দ্বারা যুক্ত, দেবতা

এবং দেবীর পূজা এবং অন্য বাহ্য পূজা বিধান দ্বারা যুক্ত


৩. যোগঅস্ত্রযান + ৪. অনুত্তরযোগতন্ত্রযান: উত্তমমন্ত্র, পরমসত্য’র সাক্ষাৎকার করার ক্ষেত্রে

সাধনার প্রধাণতা, পরম সত্যের প্রকৃতির প্রতি বিচার এবং ধ্যান

অতিযোগতন্ত্রযান’কে কাজী দবাসম দুপ মহাশয় সর্বোত্তম বলেছেন। এই সিদ্ধান্ত মূল অর্থে শূন্যতাবাদী।

সংসার এবং নির্বাণের শূণ্যতাকেই সাধকের চরম সিদ্ধি মনে করা হতো। ড. দাশগুপ্ত দ্বারা প্রস্তুত

বিভাজনে অনুত্তর যোগতন্ত্রযান অন্তিম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রূপে পরিগণিত হয়েছে। প্রস্তুত বিভাজনে যে

নিম্নতন্ত্র এবং উত্তমমন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়, তার দ্বারা উভয় ক্ষেত্রে বাহ্য সাধনা এবং অন্তসসাধনার

পার্থক্য স্পষ্টতর হয়।

এই যানের অতিরিক্ত কালচক্র যানের ও উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত কালচক্রযান পূর্বে স্বতন্ত্র মত

ছিল কিন্তু উত্তরকালে তান্ত্রিক বৌদ্ধ সমাজ দ্বারা সম্মিলিত করা হয়েছিল। ড. ভট্টাচার্য কালচক্রযানকে

বজ্রযানের পরবর্তী সিদ্ধান্ত বলেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র মতে পারস্পরিক দৃষ্টিকোণ অনুসারে

শ্রীকালচক্র মূলতন্ত্রের বিবরণ ‘অভিনিশ্রয়ণ সূত্র’তে পাওয়া যায়। ভারতে এর সূত্রপাত সম্ভবত ৯৬৫

খ্রিষ্টাব্দে হয়েছিল। ড. ভট্টচার্য প্রমাণ করেছেন যে বৌদ্ধতন্ত্রকে ক্রিয়াতন্ত্র এবং চর্যাচন্ত্রকে দক্ষিণাচার

তথা যোগতন্ত্র এবং অনুত্তর যোগতন্ত্রকে বামাচার’এর অন্তর্গত বলা যেতে পারে। ৭ম শতাব্দীর বৌদ্ধ

সাধনায় বামাচার’এর পঞ্চমকারসমন্বিত সাধনার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বৌদ্ধ সিদ্ধাচর্যের

লোকভাষা এবং সহজ সিদ্ধান্তের প্রতিপাদক রচনায় ভাব সাধনা বা দিব্য সাধনার প্রতি ইঙ্গিত করে।

আলো ভোম্বির তোত্র সম করিবে ম সাঙ্গ।

নিঘিন কাহ্ন কাপালি জোই লাগ

তুলো ভোম্বির হাউঁ কপালী।

তোহোর অন্তরে মোত্র ঘলিলি হাড়ের মালী।।

“আলো ভোম্বী, তোর সঙ্গে আমি করব সঙ্গ এই কারণে নিঘৃণ্য কাহ্ন হয়েছে নগ্ন কাপালী, যোগী। ....তুই

ভোম্বী, আমি কাপালী, তোর জন্য আমি গ্রহণ করেছি হাড়ের মালা।“ এখানে লক্ষ্যণীয় যে সহজিয়ার

অভ্যন্তরে কাপালিক সিদ্ধান্ত প্রচলিত ছিল। অন্য একটি পদে কাহ্নপাদ সহজ যোগের বর্ণনা প্রসঙ্গে

কাপালিক যোগীর চমৎকার বর্ণনা প্রদান করেছেন। যেমন

নাড়ি শক্তি দিঢ় ধরিঅ খট্টে।

অহনা ডমরু বাজাই বীরনাদে।।

কাহু কপালী যোগা পইঠ অচারে।

দেহ নঅরী বিহরই একাকারেঁ।। - চর্যাপদ, ১১।

“নারীশক্তি খাটে দৃঢ় কোরে ধরা হলো, অনহত ডমরু বীরনাদে বাজে। কাহ্ন কাপালী যোগী আচারে

প্রবেশ করল, এবং দেবনগরী একাকারে বিহার করে।


হেবজ্রতন্ত্র’ নামক গ্রন্থে কাপালিক পরম্পরার মধ্যে সিদ্ধাচার্য জালন্ধরপাদ এবং কৃষ্ণপাদ’এর উল্লেখ

পাওয়া যায়। লামা তারনাথ (তারানাথ) এর মতে সকল সাধনা গুপ্ত বিধান মতে প্রচলিত ছিল। সম্ভবত

৭ম শতাব্দীর অন্তিম সময়ে বৌদ্ধতন্ত্র সাধন পদ্ধতিতে রহস্যবাদ প্রবেশ করেছিল। এই দৃষ্টিকোণ

অনুসারে সাধনমালা এবং সাধন সমুচ্চয় গ্রন্থদ্বয় (দেবী দেবতা, চিহ্ন, অস্ত্র-শস্ত্র, মণ্ডল, বসন-ভূষণ

ইত্যাদি) অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উত্তম তন্ত্রের ক্ষেত্রে গুহ্যসমাজতন্ত্র অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। এই গ্রন্থে তান্ত্রিক

বৌদ্ধধর্ম তথা বজ্রযান’এর বিভিন্ন পক্ষীয় তথ্য দৃষ্ট হয়। কালচক্রযান বস্তুতঃ আদিবুদ্ধ মত। এই যানকে

মহাযানবাদের স্বাভাবিক বিকাশ রূপে গণ্য করা হয়। অতীশ তিব্বতে কালচক্র মতের প্রচার

করেছিলেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে কাল কথার অর্থ ‘বিনাশ’ বা ‘লয়’। কালচক্রের অর্থ বিনাশচক্র

এবং তদনুসারে যান (মার্গ) দ্বারা সংযুক্ত হওয়ার কারণে এর অর্থ হবে কাল বা বিনাশের চক্র হতে

রক্ষাকারী মার্গ। (মর্ডান বুড্ডিজম অ্যান্ড ইটস্ ফলোয়ার্স ইন ওড়িসা, নগেন্দ্রনাথ বসু, পৃঃ ৮)

সেকোদ্দেশ’ টীকাতে রে অর্থ ভিন্ন রূপে প্রদান করা হয়েছে - এখানে ‘কা’ এর অর্থ শান্ত কারণ, ‘ল’ এ

লয়, ‘চ’ এর অর্থ ‘চঞ্চল চিত্ত’ তথা চিত্তের সাথে পরম শান্ত কারণ (আদিবুদ্ধ) এ প্রাণের লয় (বিনাশ)

কে কালচক্র বলে। (ককারাৎকারণে শান্তে লকারাপ্লয়ো অত্র বৈ। চকারাচ্চলচিত্তস্য

ক্রকারাৎক্রমবন্ধনৈঃ।। সেকোদ্দেশ ঢাকা, পৃ: ৮) আদি বুদ্ধের কল্পনা করুণা এবং শূণ্যতার মূর্তি রূপে

করা হয়েছে। (করুণাশূণ্যতা মূর্তিঃ কাল সংবৃত্তিরূপিণী। শূণ্যতা চক্র মিত্যুক্তং কা চক্রোহদ্বয়োক্ষরঃ।।

বৌদ্ধ দর্শন মীমাংসা, পৃঃ ৪৫৬)।

সহজযানের নাম করণ এবং তার স্বতন্ত্র সত্তা সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। মন্ত্রযান অথবা

মন্ত্রমার্গের চর্চা প্রসঙ্গে গোপীনাথ কবিরাজ বলেছেন বজ্রযান, কালচক্রযান তথা সহজযান ক্রমশঃ

মন্ত্রমার্গ হতে আবির্ভূত হয়েছে। মন্ত্রনয়’এর ৩ ধারা পরস্পর মিলিত হয়ে বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধর্ম সৃষ্টি করেছে।

(ভারতীয় সংস্কৃতি এবং সাধনা, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৫২৮) ড. বিনয়তোষ ভট্টচার্যের মতে বজ্রযানের একটি

শাখা সহজযান। চর্যাপদের বিভিন্ন স্থানে পঞ্চ তথাগতের উল্লেখ (তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম) পাওয়া যায়। এই

পঞ্চ বুদ্ধই রূপ, বেদনা, সংজ্ঞ, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পঞ্চ স্কন্ধের অধিষ্ঠাতৃদেবতা। এই পঞ্চবুদ্ধ হলেন

বৈরোচন, রত্নসম্ভব, অমিতাভ, অমোঘসিদ্ধি এবং অক্ষোভ্য। বৈরোচন রূপস্কন্ধের দেবতা, রত্নসম্ভর

বেদনার, অমিতাভ সংজ্ঞার, অমোঘ সিদ্ধি সংস্কারের এবং বিজ্ঞানের দেবতা। চর্যাপদের ১৩ সংখ্যাক

পদ এইরূপ -

পঞ্চতথাগত কিতা কেদুআল।

বাহতা কাতা কাহিল মায়াজাল।।

চিআ কয়হার সুনত মাঙ্গে।

চলিল কাহ্ন মহাসুহ সাঙ্গে।।

অর্থাৎ, পঞ্চ তথাগতকে ‘কেচুয়াল’ (দাঁড়) করে, হে কাহ্ন, কায়রূপ মায়াজাল বাত্ত। চিত্ত কর্ণধার

শূণ্যতার পথে, কাহ্ন মহাসুখের সঙ্গে (সঙ্গ লাভের নিমিত্তে) চললেন।

অনুরূপ তথ্য ৮ নং পদে দৃষ্ট হয়। যেমন-

মাঙ্গত চড়হিলে চউদিস চাহতা।


কেনুয়াল নাহি কে কি বাহবকে পারতা।।

অর্থাৎ, (সাধন মার্গে প্রবেশ করলে) চতুর্দিক অবলোকন কর। কেচুয়াল (দাঁড়) না থাকলে কে পারে বেয়ে

যেতে? এখানেও কেচুয়াল থাকা শব্দের তাৎপর্য হলো পঞ্চতথাগত তত্ত্বে প্রতিষ্ঠা।

অদভূতা ভবমোহরে দিসই পর অল্পনা।

এ জগ জলবিম্বাকারে সহজে সুন অপনা।। - চর্যাপদ, ৩৯।

অদ্ভুত এই ভবমোহ যতপর ও আপন; এই জলবিম্বাকার রূপ জগতে সহজে প্রতিষ্ঠিত শূণ্য স্বরূপই আত্ম

স্বরূপ তাই শুধু আপনার। বৌদ্ধ তন্ত্রের অভ্যন্তরে চতুঃশূণ্যের মতবাদ দৃষ্ট হয়, নাগার্জুনপাদের ‘পঞ্চক্রম’

নামক তান্ত্রিক গ্রন্থে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত মহাশূণ্য এবং চতুর্থ স্তর পরম শূণ্য। আলোচনা রয়েছে। প্রথম

স্তর শূণ্য, দ্বিতীয় স্তর অতিশূণ্য, তৃতীয় স্তর

সোনে ভরিতী করুণা নাবী।

রূপো থোই নাহিক ঠাবী।। - চর্যাপদ, ৮

উপরিউক্ত তথ্যের কোথাও বৌদ্ধ কাপালিক তন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে তান্ত্রিক ধর্মকীর্তি এবং

জালন্ধর পাদ উভয়ই ‘হেমজুতন্ত্র’ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কারণ জালন্ধরপাদ সরহপাদ’এর

হেবজ্রসাধন সম্পর্কিত গ্রন্থের একটি টীকা (শুদ্ধিবজ্রপ্রদীপ) রচনা করেছিলেন এবং কৃষ্ণপাদ ও

হেবজ্রতন্ত্র গ্রন্থের একটি টীকা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার নাম যোগরত্নমালা অথবা হেবজ্রপঞ্জিকা। এই

বিবরণ হতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে ১. জলন্ধরপাদ এবং কৃষ্ণপাদের সম্পর্ক হেবজ্রতন্ত্রের সঙ্গে ছিল। ২.

তাঁদের সম্পর্ক সরহপাদ দ্বারা প্রবর্তিত যানের সঙ্গে ছিল। ৩. হেবজ্রসাধনে মহামুদ্রার সাধনার কথা ব্যক্ত

করা হয়েছে। তবে কৃষ্ণপাদের চর্যাপদ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে তিনি বৌদ্ধ কাপালিক তন্ত্রে বিশ্বাসী

ছিলেন।

আমিল কালি ঘণ্টা নেউর চরণে।

রবি শশি কুগুল কিউ আভরণে।।

রাগ দ্বেষ মোহ লাউতা ছার।

পরম মোখ লবত্র মুক্তিহার।। - চর্যাপদ, ২।

কৃষ্ণপাদ এই চর্যাপদে কাপালিক সাধনাকে আর ও অধিক স্পষ্ট করা প্রসঙ্গে বলেছেন, এই কাপালিক

আচারে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে নাড়ী সাধনাই প্রধান। বিষয়টিকে এক অর্থে অন্তসাধনা ও বলা হয়।

ভবনির্বাণে পড়হ মাদলা।

মন-পবন বেনি করও করও কসালা।।


জন্ম জন্ম দুন্দুভি সাদ উছলিয়া।

কাহ্ন ভোম্বি বিবাহে চলিআ।। - চর্যাপদ, ৪।

কৃষ্ণপাদ ভব এবং নির্বাণে অভেদভাবনা করেছেন এবং মনের অভ্যন্তর হতে বৈষম্যভাবকে বিলুপ্ত করে

তাকে মহাসুখোৎপাদক রূপে গ্রহণ করেছেন অথবা তার সহায়তা দ্বারা বুদ্ধবত্নকরণ্ডক রূপী গৃহকে

ধারণ করেছেন।

ডেভিড্ এন. লরেনজেন ‘দ্য কাপালিক অ্যান্ড কালামুখাজ’ গ্রন্থে বলেছেন ৮ম শতাব্দীকালে (খ্রিষ্টাব্দ)

শ্রী শৈল অঞ্চল কাপালিক তন্ত্রের মুখ্য কেন্দ্র ছিল। অপরদিকে বানভট্টের হর্যচরিত গ্রন্থে শ্রী পর্বত সহ

দক্ষিণের অধিকাংশ অঞ্চলে কাপালিক সাধনার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলা যদিও বৌদ্ধ তন্ত্রের

মুক্তাঞ্চল ছিল তবে কাপালিক সম্পর্কিত তথ্য শুধুমাত্র কাহ্নপাদ’এর চর্যায় পাওয়া যায়। দক্ষিণ ভারত

কাপালিক সাধনার বিদ্যমানতা ৭-১০ শতাব্দী (খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত ছিল। যদি ৯ শতাব্দীতে (খ্রিষ্টাব্দ) কৃষ্ণপাদ

বিদ্যমান থাকেন তাহলে দক্ষিণ ভারতের কাপালিক মত তাঁকে অবশ্যই প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু

কিভাবে বৌদ্ধতন্ত্রে কাপালিক তত্ত্ব বিস্তার লাভ করেছিল এই বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য দৃষ্ট হয় না।

পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায় বৌদ্ধ দর্শন মীমাংসা (পৃঃ ১২৬) গ্রন্থে বৌদ্ধ তন্ত্রের বিকাশ ক্রম এইভাবে

করেছেন:

মহাসাংঘিক (চৈত্যবাদী)

সম্মিতীয় (খ্রিঃ পূঃ ৩ শতাব্দী)

অন্ধক

বৈপূল্য (খ্রিঃ পূঃ ১ম শতাব্দী)

পূর্বশেলীয়

অপরশৈলীয়

(খ্রিঃ পূঃ ৩-১ শতাব্দী)

রাজগিরিক

সিদ্ধার্থক

মহাযান

খ্রিঃ ১ম শতাব্দী)

বজ্রযান কালচক্র যান তন্ত্রযান সহজযান


(খ্রিঃ ২-৯ শতাব্দী)

মন্ত্রযান ভদ্রযান

(খ্রিঃ ৯-১০ শতাব্দী)

নীহার রঞ্জন রায় মহাযানের বিবর্তন (বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ: ৬৬৭) প্রসঙ্গে বলেছেন, “....অষ্টম

ও নবম শতকে মহাযান বৌদ্ধধর্মে নূতনতর তান্ত্রিক ধ্যান কল্পনার স্পর্শ লেগেছিল এবং তার ফলে দশম

শতক হতে বৌদ্ধ ধর্মে গুহ্য সাধনতত্ত্ব, নীতি পদ্ধতি ও পূজাচারের প্রসার দেখা দিয়েছিল।... অসঙ্গের

সময় হতে হয়তো বৌদ্ধ ধর্মে এই রূপান্তরের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু তা হোক বা না হোক, সন্দেহ নেই যে,

বাঙলা-বিহারের, এক কথায় পূর্ব ভারতের বৌদ্ধ ধর্মে এই ধরণের রূপান্তরের একটা গতি অষ্টম-নবম

শতকেই ধরা পড়েছিল।“

উপরিউক্ত তথ্যের ভিত্তিতে মহাযান বাদের ক্রমবিবর্তনের পর্যায়টিকে আমরা এইভাবে দেখতে পারি।

(চার্লস এলিয়ট, বুজ্জিজম্, পৃঃ ১১৮)।

মহাযান পন্থ

শূণ্যবাদ ও বিজ্ঞানবাদ

যোগাচার ও মাধ্যমিক বাদ

মন্ত্রযান

বজ্রযান

সহজযান

সহজিয়া ধর্ম

তন্ত্রযান

কালচক্রযান

কৌলমার্গ

নামধর্ম

তিব্বতী বৌদ্ধধর্ম

অবধূত মার্গ

বাউলমার্গ


সেন রাজবংশের অবশেষ যখন পূর্ববঙ্গে অধিষ্ঠিত তখনও বৌদ্ধধর্ম একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি।

মধুকোশ টীকার রচয়িতা ছিলেন বিজয় রক্ষিত এবং তিনি বৌদ্ধ ছিলেন। এই বিজয় রক্ষিতের

সময়কাল ১৩ শতকের দ্বিতীয় পাদ। এর কিছুকাল পরে বিশ্রুতকীর্তি গৌড়ীয় বৌদ্ধ কবিভারতী

রামচন্দ্রের আবির্ভাব। কবি কর্ণপুর চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটকে (১৪ শতক, খ্রিঃ) দাক্ষিণাত্যের বৌদ্ধগণকে

পাষণ্ড বলেছেন। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বুদ্ধাবতার বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন,

‘ধরিয়া পাষণ্ডমত, নিন্দা করি বেদপথ, ....। বোঝা যায় যে ১৫ শতক নাগাজ বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম

সম্প্রদায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।


হেবজ্রতন্ত্র’ অনুসারে তান্ত্রিক তত্ত্বের সন্ধান:


পূর্ব বিবেচন হতে স্পষ্টতর হয় যে তান্ত্রিক সাধন, দর্শন ইত্যাদির ক্ষেত্রে ‘হেবজ্রতন্ত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ

যোত রূপে স্বীকার করা যায়। এই গ্রন্থের ৩য় পরিচ্ছেদে তন্ত্রের যে লক্ষণ নিরুপণ করা হয়েছে, তার প্রতি

ভিত্তি করে তান্ত্রিক এবং কাপালিক লক্ষণের সন্ধান করা যেতে পারে। সরহপাদ ইত্যাদি সিদ্ধাচার্য

ছিলেন। তিনি বৌদ্ধতন্ত্রকে যেভাবে প্রচার করেছিলেন এবং তার ব্যবস্থিত শাস্ত্রীয় নিরূপণ করেছিলেন

তা সত্যই কৌতুহলাদ্দীপক। এই দৃষ্টিতে সরহপাদ রচিত হে বজ্রতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। হে বজ্রতন্ত্রে

উপাস্য, উপাসক, যোগিনী, সাধনাস্থল, সাধনতত্ত্ব ইত্যাদি সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্ব পাওয়া যায়। যেমন

১। হেরুকারেণ মহাকরুণা বজ্রং প্রজ্ঞা চ ভন্যতে।

প্রজ্ঞোপায়াৎমকং মন্ত্রং তন্মে নিগাদিতং শ্রুণু।।

৩। প্রথমং ভাবয়েন্বতকং ধর্মধাৎবাৎমকং বিদুঃ।

যোগী তস্যোপরি স্থিত্বা হেরুকত্বং বিভাবয়েত।।

উদ্ধৃত অংশে ক্রমশঃ হেবজ্রস্বরূপ, বৌদ্ধ যোগতন্ত্র ১। মণ্ডল রচনা, ২। নাম’এর স্বরূপ, ৩। আধ্যাত্মচিন্তা,

৪। আচরণ, মুদ্রা ইত্যাদির মূল ব্যাখ্যা প্রস্ফুটিত হয়েছে। (শক্তি সাধনা ও তন্ত্র, পৃঃ ১৬২)।


আশ্চর্যচর্যাচয়’ এর টাকাতে প্রাপ্ত কাপালিক তত্ত্ব:


কাপালিক সাধনার তত্ত্ব সম্পূর্ণ তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধন এবং দর্শনে বিদ্যমান রয়েছে। কাপালিক তত্ত্বের

সন্ধান কৃষ্ণপাদের চর্যায় দৃষ্ট হয়। অপভ্রংশ চর্যাপাদের সংস্কৃত টীকাতে এমন অনেক অংশ রয়েছে,

যেখানে তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধনাতে কাপালিক তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। (প্রাচীন ভারতীয় তান্ত্রিক সাধনা

ও সাহিত্য, পৃ: ৮৪) হউ কাপালিক: চর্যাধরশ্চ। কং তব সুখং পালিতুং সমর্থঃ। (ইতি কাব্যলিকঃ)।

উপায়কুশল পরম গুরু আমার,

সর্বধর্মের স্বভাব এক বলে দেখিয়েছেন তিনি

ধাতু ও বিদ্যার সম্বয়ে

আর সুখ-দুঃখ বলে কিছু নেই। - চুরাশি সিদ্ধ, ১০৭।


মঙ্গলকাব্য এবং মধ্যযুগীন তন্ত্রসাহিত্য:


ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে বাংলায় পুনঃরায় ধর্মীয় বিবর্তন শুরু হয়। এর মূল কারণ ছিল বৌদ্ধধর্মের

বিপর্যয়, হিন্দুধর্মের অবাতরবাদ ও লোকায়ত দেবদেবীর উদ্ভব, ইসলাম ধর্মের আপ্রাসন। নিম্নশ্রেণীর

হিন্দুরা ছিল লৌকিক সংস্কৃতির পৃষ্টপোষক, তার সঙ্গে বৌদ্ধ তান্ত্রিক আচার আচরণের সংমিশ্রণ

ইতিপূর্বেই সম্পৃক্ত হয়েছিল। ইসলামী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিপর্যয় প্রাপ্ত বৌদ্ধ সংস্কার গুলিকে

অবতারবাদের মোড়কে হিন্দুরা আত্মসাৎ করে নেয়। ফলে অনেক তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেব-দেবী

ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পুষ্ট হয়ে হিন্দু দেব দেবীতে পরিণত হয়। এই সকল দেব দেবীই প্রকৃত

তথাকথিত ‘মঙ্গলদেবী দেবতা। তাঁদের মহিমা ও পূজাপ্রচারের কাহিনীর সঙ্গে লোকায়ত চিন্তা এবং হিদু

পুরাণের অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটেছে। ‘মঙ্গলকাব্য’ মূল অর্থে এই সকল উপখ্যান’এর এক বিচিত্র অধ্যায়।

মঙ্গলকাব্য গুলির মধ্যে মুখ্য মনসা মঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ইত্যাদি।

মঙ্গলকাব্যে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেব-দেবী এবং লৌকিক আচার পদ্ধতি হিন্দু পৌরাণিকতার মাধ্যমে উদ্ভাষিত

হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, চন্ডীমঙ্গলের চন্ডী পৌরাণিক হলেও খুল্লনা পুজিত মঙ্গলচণ্ডী ‘কমলে কামিনী’

বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী তারা। মনসাদেবীর মধ্যে ও এইরূপ সংমিশ্রণ ঘটেছে। তিনি বৌদ্ধ জাঙ্গুলী তারা এবং

মহাভারতীয় আস্তিক মাতার বিবর্তিত রূপ। ধর্মমঙ্গলের চণ্ডীদেবী তানিত্রক তারা, হারিতী, মাতঙ্গী।

মধ্যযুগে গৌড়বঙ্গের ব্রাহ্মণগণ বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনাকে নব্য সাধনার মোড়কে মাতৃপূজার যে পৌরাণিক

পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন, মঙ্গলকাব্যের দেবী পূজার ক্ষেত্রে তারই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।

তবে ‘চৌতিশা’ স্তবগুলিতে বৌদ্ধ তন্ত্রোক্তস্তব কবচের প্রভাব রয়েছে। বিপ্রদাসের ‘মনসামঙ্গলে’ও

তান্ত্রিক যোগের কথা বলা হয়েছে।

কেন ত্রিভূবণনাথ আপনা বিস্ময়।

‘মন পবনেতে জীব পরিচয় কর।।

দশমী দুয়ারে বাপু খসাও কপাট।

আসুক পরমহংস ভ্রমুক সুবাট।।

এখানে ‘হংস’ বাক্যটি যোগের দিক হতে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

বিদ্যাসুন্দর প্রণীত ‘কালিকামঙ্গল’ কাব্যে তন্ত্রোক্ত বামাচার সাধনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যান্য

মঙ্গল কাব্যের তুলনায় কালিকামঙ্গল কাব্যে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবীর প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

ঘোরতর নিশিশেষ

ধরি কালী নিজ বেশ

সবিশেষ কহেন স্বপন।।

ভাব কেন ওরে ভক্ত

আমি তব অনুরক্ত


সেও তো আমার দাসী বটে।

পরম রূপসী সেই একান্ত জানিবে এই

তরুণী তোমার তরে ঘটে।। - রামপ্রসাদ সেন।

কালিকামঙ্গল কাব্যে বামাচার সম্মত শবসাধনা, চিতা সাধন প্রভৃতির প্রভাব ও রয়েছে। এই কাব্যে

মশানে ‘চৌতিশা’ স্তবে সুন্দরের দেবী আধারনার কথা আছে। সুন্দরের এই সাধনা যে মূল অর্থে শ্মশানে

বীরচারী তান্ত্রিকের শবসাধনা, শাক্ত কবি রামপ্রসাদ সেন’এর কালিকামঙ্গলেও স্পষ্টতর হয়েছে।

‘গৌতমীয় তন্ত্র’ মধ্যযুগীয় তন্ত্রসাধনার একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এই গ্রন্থে বীজমন্ত্রের সাধন সম্পর্কিত দীক্ষা

সহ যে সকল নির্দেশ প্রদত্ত হয়েছে, তার মূলাধার তন্ত্র।

হ্লাদিনী যা মহাশক্তিঃ সর্ব্বশক্তি বরীয়সী।

তৎসার ভাবরূপেয়মিতি তন্ত্রে প্রতিষ্ঠাতা।। - উজ্জ্বল নীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী।

সহজিয়া সাধনার অভ্যন্তরে শাক্ত এবং তন্ত্র কুলাচারের প্রভাব প্রবল ভাবে বিদ্যমান। বজ্রযানী বৌদ্ধ

আচার্য রচিত বৌদ্ধতন্ত্র অপেক্ষা বৌদ্ধ সহজিয়া পন্থী সাধক বিরচিত দোহা এবং চর্যাপদগুলির সঙ্গে

মঙ্গল কাব্য (ধর্মমঙ্গল ইত্যাদি) ও শাক্ত তন্ত্রের রূপসাদ্দশ্য বেশী। এই দিক হতে শাক্ত পদাবলী সাহিত্য

যেন চর্যাপদ এরই বিবর্তিত রূপ। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টিকে পরিস্ফুট করা যেতে পারে -

একু দেব অঙ্গম দীসই।

অপণু ইচ্ছে ফুড় পড়িহাসই।। - সরহপাদ।

শাক্তপাদ কর্তা সেখানে বলেছেন,

প্রসাদ হাসিছে সরসে ভাসিছে বুঝেছি জননী মনে বিচারী।

মহাকাল কাণু, শ্যামা শ্যাম তণু, একই সকল বুঝিতে নারি।।

সিদ্ধাচার্যগণ তীর্থযাত্রা ইত্যাদি বহিঃকর্মকে তীব্র নিন্দা করেছেন, তাঁদের অভিমতে মোহযুক্ত জীব

তথাকথিত ইষ্ট লাভের অভিপ্রায়ে অনর্থক তীর্থভ্রমণ করে, কিন্তু মুক্তি তীর্থ বাইরে নেই, রয়েছে এই দেহে-

এঘু সে সরাসরি জমুর্ণা

এপু সে গঙ্গাসাতারু।

এঘু পআগ বনারসি

এথু সে চন্দ দিবাঅরু।। - সহর বজ্র, চর্যাপদ ৩৮।


এইখানেই সুর-সরিৎ যমুনা, এই খানেই গঙ্গাসাগর, এই দেহেই প্রয়াগ-বারাণসী, এইখানেই চন্দ্রসূর্য।

শাক্তপাদ কর্তার অভিমত ও অনুরূপ:

তীর্থ গমন মিথ্যা ভ্রমণ, মন উচাটন করো না রে।

ও মন, ত্রিবেণীর ঘাটেতে বৈস, শীতল হবে অন্তঃপুরে।।


মঙ্গলকাব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট


মঙ্গলকাব্য প্রসঙ্গে উত্তম পুরকাইত বলেছেন, (মঙ্গলকাব্য বাঙালীর পুরাণ ইতিহাস, পৃঃ ৫৭) “বাঙালী

গীতিপ্রবণ জাতি, বাংলা ভাষা আত্মপ্রকাশের পূর্বে যে ক’জন বাঙালী কবির কাব্যচর্চার নিদর্শন পাওয়া

গেছে তাঁরা সকলেই খণ্ড কবিতা বা গীতিকবিতাই রচনা করেছেন। ভারতীয় আখ্যান সাহিত্যের

পৌরাণিক ধারাটি যত বেশী সর্বভারতীয় (বিশেষত উত্তর ভারত) কাহিনীকে আশ্রয় করেছে, বাংলার

জনজীবন বা রাজন্যবর্গকে সেভাবে স্পর্শ করেনি।... বঙ্গ দেশের আখ্যান কাহিনী প্রধানত বৌদ্ধ

জাতকের গল্পে, লোককথা বা রূপকথায় খুঁজলে পাওয়া যাবে।”

পাল রাজন্যবর্গ বাংলা এবং বিহার অঞ্চলে প্রায় ৪০০ বৎসর কাল রাজত্ব করেছিলেন যা ইতিপূর্বেই

আলোচনা করা হয়েছে। এই যুগে বৌদ্ধ ধর্ম বিবর্তনের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

অপরদিকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অবতার বাদ এবং পৌরাণিক আখ্যান তথা লোকায়ত চর্চার মাধ্যমে

স্থিতিশীলতা অর্জন করেছিল। এই সময়কালে আদিম কৌথ সংস্কৃতি, বৈদিক এবং পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য,

অবৈদিক বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের বিবর্তিত রূপ বাংলায় প্রকট হতে শুরু করে।

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চন্দ্র বংশীয় শাসকেরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন কিন্তু তাঁদের শাসনামলে

ব্রাহ্মণ্য ধর্ম রাজকীয় আনুকূল্য লাভের মাধ্যমে রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন

করতে সক্ষম হয়েছিল। রাজা লডহচন্দ্র (আনুমানিক ১০০০-১০২০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং গোবিন্দচন্দ্রের

(আনুমানিক ১০২০-১০৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) ময়নামতিতে প্রাপ্ত লিপি সমূহে ব্রাহ্মণ প্রভাবের চিত্র (মঙ্গল-ওম্

নমঃ ভাগবতে বাসুদেব) লক্ষ্য করা যায়।

সেনযুগে ব্রাহ্মণ্য মতবাদের গোঁড়ামী’র প্রতিফলন স্বরূপ সহজিয়া, নামপন্থা প্রভৃতি উদার মতবাদ

বাংলার ব্রাত্যজনকে নাড়া দিয়েছিল। এই প্রতিক্রিয়ার প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করা যায় সরোজবজ্রের

দোহাকোষে। এখানে বলা হয়েছে যে, হোমাগ্নি মুক্তি প্রদান করে কিনা তা কেউ জানে না, তবে এর ধূম

নিশ্চিন্তভাবে চক্ষুকে পীড়া দেয়।

কজ্জে বিরহিতা হঅবহ হোথেঁ।

অক্খি উহাবিঅ কডুএঁ ধূমেঁ।।

সেন রাজাদের সম্পর্কে নীহার রঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ: ৫২৭) বলেছেন,

“পালবংশকে বাঙালী ভালোবেসে ছিল এবং তাঁদের গৌরবকে নিজেদের জাতীয় গৌরব বলে মনে

নিয়েছিল; বাঙলাদেশে তার প্রমাণ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। বল্লাল ব্যতীত সেন-রাজাদের একজনের সম্বন্ধে ও

একথা বলা চলে কিনা সন্দেহ। একটি লোকগীতিও সেন-রাজাদের কারও নামে রচিত হয় নি, বাঙলা

সাহিত্যের লোকস্মৃতিতে সেন-রাজারা বেঁচে নেই।”


তুর্কী বিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মধ্যযুগের সূচনা হয়। এই সময় বাংলার ধর্মীয় চিন্তায় নানাবিধ বৈপ্লবিক

পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এর মূল কারণ ছিল শক্তি ধর্মের তান্ত্রিক রূপান্তর, কায়াসাধনের প্রতি অনুরাগ

এবং সেই সাধনার রীতি-পদ্ধতি, শাস্ত্রচর্চা ও জ্ঞানচর্চায় বুদ্ধি এবং যুক্তি অপেক্ষা প্রাণধর্ম ও হৃদয়াবেগের

প্রাধান্য, ইসলাম ধর্ম-সংস্কৃতির সম্প্রসারণ ইত্যাদি।

বর্তমান বাংলার জনজীবনে বিচিত্র ধর্মানুষ্ঠানের গভীরে অবলোকন করলে দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে

দেবতার প্রভাব অপেক্ষা দেবীর প্রভাব এবং প্রতিষ্ঠা অনেকাটই বেশী। মধ্যযুগেও অনুরূপ অবস্থা ছিল।

এ প্রসঙ্গে নীহার রঞ্জন রায় বলেছেন, (বাঙালীর ইতিহাস, পৃঃ ৮৮২) “আদিম কৌম সমাজের

মাতৃকাতন্ত্রের দেবীদের প্রাধান্য কৌম সমাজে তো ছিলই, বিচিত্র নামে তাঁরা নানাস্থানে পূজা ও লাভ

করতেন। পরে যখন আর্য-ব্রাহ্মণ্য পুরুষ প্রকৃতি ধ্যান সুপ্রতিষ্ঠিত হল তখন সেই মাতৃকা তন্ত্রের দেবীরা

প্রকৃতি বা শক্তিরূপিনী বিভিন্ন দেবীর সঙ্গে, বিশেষভাবে তারার সঙ্গে মিলে মিশে এক হয়ে গেল।”

তিনি আরও বলেছেন, (প্রাগুক্ত, পৃ: ৮৮৩) “গোপন দেহযোগ বা কায়াসাধন, নারীসাধন, শবসাধন,

শূণ্যধ্যান, দেহতত্ত্বের অভিনব ব্যাখ্যা, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য উভয় ধর্মেরই শাক্ত তান্ত্রিক রূপে ভীষণ ও ভয়াল

সাধন পদ্ধতি প্রভৃতিতে সর্বত্রই অধ্যাত্ম জীবনের একটি বিশেষ ভক্তি বর্তমান, যা আর্য ব্রাহ্মণ্য ধর্মে

অনুপস্থিত।”

প্রসঙ্গত মনে রাখা প্রয়োজন যে মঙ্গল কাব্যের আখ্যান গুলি বাংলার জনজীবনে সুদীর্ঘকাল ব্যাপী

লালিত-পালিত হয়েছিল ব্রতকথা বা উপকথা মূলক আখ্যানের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ মধ্যযুগে

ধর্মীয় দ্বন্ধ এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে আপামর জনগণের নিকট প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে লৌকিক ও পোরাণিক

দেবদেবীর সমন্বয়ে যে সকল আখ্যান কাব্য উদ্ভূত হয়েছিল তা ‘ই’ ‘মঙ্গলকাব্য’। ব্রাহ্মণ্যবাদী পৌরাণিক

সাহিত্যের মূল অর্থাৎ প্রধান দেবতাগুলি হল ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর (শিব) কিন্তু মঙ্গল কাব্যে এই

সকল দেবতার উপস্থিতি গৌণ, এখানে প্রধান দেবী এবং দেবতা মনসা, চন্ডী এবং ধর্ম ঠাকুর। ফলে

পৌরাণিক দেবী দেবতার সঙ্গে এদের একাসনে বসানো যুক্তি সঙ্গত নয়।

মানিক রাম গাঙ্গুলী বিরচিত ধর্মমঙ্গল’ এর (অষ্টাদশ শতক) দিবন্দনাতে বিভিন্ন দেবদেবী এবং তন্ত্রচার

পীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়।

নাড়চে গ্রামে বন্দি শ্রীসর্বমঙ্গল।

ডাকিনী যোগিনী সঙ্গে অতি কুতুহলা।।

আনুড়ের বিশালায় বন্দি ভক্তি করি।

মড়াগড়া গ্রামের বন্দিব বানেশ্বরী।।

পদ্মাপুরাণ বা মনসামঙ্গল কাব্য মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম পুরাতন আখ্যান। মনসামঙ্গল কাব্যের

অভ্যন্তরে পৌরাণিকতার ছোঁয়া থাকলেও এর মূল উপাদান কিন্তু লৌকিক এবং বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী। এই

কারণেই দেবী মনসার সঙ্গে বৌদ্ধ দেবী জাঙ্গুলীর সম্পর্ককে কোনভাবেই ব্রাত্য করা সম্ভব নয়।


ড. মো. গোলাম সারওয়ার (প্রাচীন বাংলার ধর্ম প্রসঙ্গ, পৃঃ ২৫৫) এর মতে, “বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও

ধর্ম যুগে যুগে পরিবর্তন ঘটেছে। এদেশের সমাজে পরিবর্তনের মধ্যেও একটা চিরন্তন রূপ শক্তিশালী

ভাবে লক্ষ্য করা যায় তা হলো বাংলার উদারতাবাদ।“

ইতিহাস বিদ্যার এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আস্থা রেখেই আমরা মধ্যযুগে উদ্ভুত মঙ্গলকাব্যে সহিষ্ণুতা এবং

ধর্মীয় উদারতার বিষয়টি দেখতে পাই। মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা সম্পর্কে উত্তম পুরকাইত একটি সুন্দর

উদাহরণ প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, “প্রায় পাঁচশো বছরের বাঙালীর রাষ্ট্রিক, সামাজিক, পারিবারিক,

সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ভাবলোকের বিশিষ্ট পরিচয় লৌকিক দেবভাবনার আশ্রয়ে যেসব কাহিনী

গুলিতে পরিবেশিত হয়েছে সেগুলিকেই ‘মঙ্গলকাব্য’ বলা হয়। মোট কথা ‘মঙ্গলকাব্য’ বাঙালীর সমাজ

উদ্ভূত লৌকিক ও পোরাণিক দেবদেবীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক প্রকার আখ্যান কাব্য....।”

মঙ্গলকাব্যের দেব-দেবী ভাবনার মূল রূপ আবির্ভূত হয়েছে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের পতনের পর। এর সঙ্গে

যুক্ত হয়েছে বাংলার প্রকৃতি এবং তার প্রতিকুলতার পটভূমি। ফলে বিষহরি জাঙ্গুলী পৌরাণিক

আখ্যানের প্রভাবে নাগেশ্বরী বা মনসা রূপে আবির্ভূতা হলেন। এক্ষেত্রে তুর্কি বিজয়ের প্রভাবকে

কোনভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। উত্তরকালীন মঙ্গলকাব্য গুলিতে ধর্মীয় সংঘাত এই প্রভাবের

বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

মনসা মঙ্গল কাব্যে তান্ত্রিক আচার-আচরণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেহুলা কর্তৃক মনসাকে সন্তুষ্ট

করার প্রশ্নে পশুবলি এবং স্বয়ং দেবীর প্রতি খড়গ পূজা ইত্যাদি তন্ত্রীয় শাস্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়

রূপে গৃহীত হয়েছে। বৌদ্ধতন্ত্রে এইভাবে দেবদেবীকে তান্ত্রিক উপাচার প্রদানের উল্লেখ পাওয়া যায়।

শূণ্যপুরাণে বলা হয়েছে, ধর্মঠাকুর শূণ্যমূর্তি, তিনি ‘নিরঞ্জন’, ‘শূণ্য দেহ’। যে প্রতীকের পূজা-অর্চনা করা

হয় তা মূলত কুর্মাকৃতি শিলাখণ্ড বা শিলা নির্মিত কুর্মবিগ্রহ। শূণ্যবাদই মহাযান সম্প্রদায়ের মূল মন্ত্র এবং

বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা এই সম্প্রদায় ভুক্ত তান্ত্রিক ধর্মের অঙ্গপ্রতঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। রামাই

পণ্ডিত লিখেছেন -

নহি ছিষ্টি ছিল আব নহি সুর নর।

বস্তা বিষ্টুন ছিল ন ছিল আঁবব।।

সবগ মরত নহি ছিল সভি ধুন্ধকার।।

দসদিক পাল নহি মেঘ তারাগণ।

আউ মিও নহি ছিল জমব তাডন।।

সুন্নত ভরমন পরভূর সূন্নে করি ভব।

খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী অন্তিম লগ্নে (২য় ধর্মপাল) যে সকল বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেব দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল

রামাই পণ্ডিতের গ্রন্থে

ও অনুরূপ পুজা প্রণালী দেখতে পাই।


সূত্রে পূজ এ হরিচন্দ্র বিসাদ ভাবিআ মতি।

শূণ্য পুরাণে মহাকাল ধর্মানিরঞ্জনের দ্বারপাল রূপেই বর্ণিত হয়েছে।

পরভূত মালঞ্চ এ জাগস্তি নন্দি মহাকাল।

রামাই পণ্ডিত “ধর্মরাজ যজ্ঞনিন্দা করে” এইরূপ ঘোষণার দ্বারা সেই বুদ্ধ প্রসঙ্গই উথাপন করেছিলেন।

শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন’এর মতে, “ধর্মমঙ্গল কাব্য যে পুঁথিকে বেদ রূপে মান্য করেছে, সেই পুঁথির নাম

‘হাকণ্ডপুরাণ’। এইটি কোন হিন্দু পুরাণ বলে মনে হয় না।... এই লুপ্ত বৌদ্ধ পুরাণটি উদ্ধার হলে ধর্মমঙ্গল

সম্বন্ধে অনেক ঐতিহাসিক রহস্য উদঘাটিত হতে পারে।“ (সাহিত-পরিষদ পত্রিকা, ১৩ সাল, পৃ: ১৩)।

ধর্ম ব্রহ্মজ্ঞান বলে যে সৃষ্টি বীজ উৎপন্ন করেছিলেন, সে কথা রামাই পণ্ডিত বারংবার উল্লেখ করেছেন

চৌদ্দজুগ গেল পরভূব এক বস্তুগে আনে।

উত্তর-কালীন ধর্মমঙ্গল কবিগণ সকলেই এই উক্তির সমর্থন করেছেন। শূণ্যপুরাণ এবং ধর্মমঙ্গলে

শূণ্যতাই যেন মূল রূপে উদ্ভাষিত হয়েছে।

নিরাকার অঙ্গ ক্ষরি অছন্তি সমূলে।

প্রতি প্রতি কহি বাপু কহি দেবা তোতে।।

নিরাকার দক্ষিণরু বিপ্র হোত্র জাত।

উত্তর অঙ্গরু জান গোপাল সম্ভূত।।

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়’এর মতে, “ধর্ম” শব্দটি বোধ হয় প্রাচীন কোনও আস্ট্রিক শব্দের সংস্কৃত

রূপান্তর এবং বৌদ্ধ ত্রয়ীর মধ্যমশব্দ অর্থাৎ “ধর্ম” এবং তার পূজা মূলত আদিবাসী কোমের ধর্ম পূজা

হতে গৃহীত। রাজা হরিশ চন্দ্র এবং ‘ধর্ম’ রাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ধর্মের সম্বন্ধ ও একই উৎস হতে উদ্ভূত

বলে মনে হয়।“ (ধর্ম কর্ম ধ্যান-ধারণা, পৃঃ ৬১৯)


তন্ত্রশাস্ত্র: শক্তি পূজা


শক্তিপূজার মূল উৎস তন্ত্রশাস্ত্র। তন্ত্রশাস্ত্রে দেহতত্ত্বের ভাব, উপাস্য এবং উপাসনা-তত্ত্ব সহ (নানাবিধ

দেবী মুক্তির ধ্যান) পূজা ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। শাক্ত পদ কর্তাগণ ‘দেবী-রূপ’ কল্পনায় তন্ত্র ক্রীড়া যুক্ত

ধ্যান সমূহ গ্রহণ করেছেন। ‘তন্ত্রসার’ (বসুমতী সংস্করণ) গ্রন্থে তান্ত্রিক আচার সহ দেবী রূপে এইভাবে

বর্ণিত হয়েছে- “কালিকাদেবী (দক্ষিণা) করলবদনা, চতুর্ভুজা, ভীষণাকৃতি ও মুক্তকেশী। তাঁর গলদেশে মুণ্ডমালা,।

বামভাগে অধঃ করে সদ্য ছিন্ন মুণ্ড, উর্দ্ধকরে খড়গ এবং দক্ষিণভাগের অধঃ করে অভয় ও উর্ধ্বহস্তে

বরমুদ্র।... তিনি মহাকালের সঙ্গে বিপরীত রত্যাসক্তা, দেবীর মুখমণ্ডল সুপ্রসন্ন এবং হাস্যময়।“


তারা দেবীর বর্ণনার মধ্যে তন্ত্রযানের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেমন-

“দেবী প্রত্যালীঢ়পদা, ভীমাকৃতি, খর্বা ও লম্বোদরী। তাঁর গলদেশে নরমুণ্ডমালা ও কটিদেশে ব্যার্থচর্ম।

দেবী নবযুবতী রূপা এবং পঞ্চ মুদ্রা। (শ্বেতাস্থি-নির্মিত চারটি পট্রিশ ও নরকপাল) দ্বারা বিভূষিতা,

চতুর্ভুজা, মহাভয়ঙ্করী এবং বরপ্রদানশীলা।“

শ্রীকণ্ঠপাদ লাঞ্ছন ভবভূতির ‘মালতী মাধব’ নাটকে তন্ত্রাচারের ভয়াবহ চিত্র উদ্ভাসিত হয়েছে। “নৃত্যে

কম্পমালা পৃথিবী, ললাট ইন্দু, শতধাচূর্ণ, চূর্ণিত চন্দ্রমণ্ডলের সুধা পান করে নরমুণ্ডগুলি অট্যহাস্য

করছে, চক্ষু হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে,... সেই সঙ্গে তালবেতালাদি ভূত প্রেতগণ ভীষণ কোলাহল

করছে।”

বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী ‘একজটা’ সঙ্গে মধ্যযুগীন হিন্দু তান্ত্রিক দেবীর ‘তারা’র অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা

যায়। বৌদ্ধ ডাকিনী মূর্তি হিন্দু চামুণ্ডার অনুরূপ। ধ্যানে ও রয়েছে সাদশ্য, যেমন -

মণ্ডল চক মহাসুহ ভাউ, দ্বাদশজোই পুন না যাউ।

সম্ভ বিঅক্ক সরদ ইন মনহিতু, মণ্ডলু তহি সুহ দিন জাউ।।

ইন্দিয় ভন্তি মহাসুহ মন্নসি ভাখনি পরম আপান সজাউ।

বিবিহরুঅ জিকরছ পহস্ত তিহুজন, মণ্ডল চল্ ফুরন্ত।।০।। - ডাকার্ণব, পঞ্চদশ পটল (খ)।

সহরপাদ দেহতত্ত্বের মূলকে এইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন -

কাঅ নাবড়ি খান্টি মন কেদুয়াল।

সদ্‌গুরু বঅনে ধর পতবাল।।

চিঅ থির করি ধরছরে নাহী।

অন উপায়ে পারন জাই।। - চর্যাপদ, ৩৮।

দেহ নৌকা, খাঁটি মনকে দাঁড় করে সদ্গুরুবচনরূপ হাল ধর। চিত্ত স্থির করে নৌকা চালাও, অন্য উপায়ে

পারে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়।

শাক্ত সাধক কমলাকান্ত সেখানে বলেছেন -

মনপবনের নৌকা বটে, বেয়ে দে.....।

মন মহামন্ত্র যার, সুবাতাসে বাদাম তুলে।।

মহামন্ত্র কর হাল, কুণ্ডলিনী কর পাল।


সুজন কুজন আছে যারা তাদের দে রে দাঁড়ে ফেলে।।

সুতরাং এই অর্থে বলা যায় যে শাক্ত পদাবলীর সঙ্গে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধন-চেতনার বহু সাদৃশ্য রয়েছে।

বৌদ্ধ গান ও দোহার ‘ভোম্বী’, ‘চণ্ডালী’র সঙ্গে মধ্যযুগের শাক্ত পদাবলী’র কুণ্ডলিনী, বৌদ্ধগণের

‘শূণ্যতা’, শাক্ত পদাবলীর পরমা চিৎশক্তি। যেমন -

কাতি কর্পর হতে মুণ্ডমালা গলে।

শোভা করে সরোবর শ্রবণ মণ্ডলে।। - বলরাম কবিশেখর, কালিকামঙ্গল।

তন্ত্রের শক্তি তত্ত্বের মূলাধার মাতৃকাশক্তি। তিনি এক অর্থে শক্তি। তিনিই আদ্যা শক্তি মহামায়া, তিনিই

পরমেশ্বরী, ‘বিশ্বচর্ষনা’ - বিশ্বের সৃষ্টি ও প্রলয়কারিণী। কালিকাপুরাণ (৭৪ অধ্যায়) মতে, ‘মাহায়া

মূলভূতা’।

শ্রী জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তীর মতে, (শাক্ত পদাবলী ও শক্তি সাধনা, উপাস্যতত্ত্ব, পৃ: ৮৯) “বাংলাদেশে যে

তন্ত্রগ্রন্থ ও তান্ত্রিক নিবন্মগুলি প্রচলিত আছে (যেমন কুলার্ণবস্ত্র, মহানির্বাণতন্ত্র, তন্ত্রসার, শাক্তানন্দ

তরঙ্গিনী ইত্যাদি), তাতে শক্তিতত্বের এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। এদেশে দর্শনের আলোচনা

অপেক্ষা ক্রিয়া (সাধনা) এবং চর্যার (আচার-আচরণ) উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।“

শাক্তপদাবলীর উপাস্যসঙ্গীত গুলি প্রকৃত অর্থে শাক্তাগম শক্তিতত্ত্বের নানাবিধ সিদ্ধান্ত নিয়ে রচিত

হয়েছে। শাক্ত মতে শক্তি ব্রহ্মময়ী এবং সেই কারণে কবিগণ শক্তি অর্থাৎ ব্রহ্মময়ীর অভ্যন্তরে সন্ধান

করেছেন নৈরাত্মা’কে।

রূপাদি না হতে সৃষ্টি, তুমি হতে কেমন দৃষ্টি

তখন কটা হাতে, কি বেশেতে, কার ধ্যানেতে থাকতে কোথায়?

পৃথিবী হয়নি যখন, চন্দ্র সূর্য ছিল না মন,

তখন ঘোর অন্ধকারভূতে, কিভাবে কে দেখতো তোমায়?- তারিণীপ্রসাদ জ্যোতিষী।

শাক্ত পদাবলীতে ও এই তত্ত্বের আভাস উদ্ভাষিত হয়েছে। যেমন-

তুমি চিৎ অভিমুখী কার্যহেতু চিৎ বিমুখী

চিদানন্দে পিছে রাখি চিত্তানন্দে উন্মাদিনী। - রসিক চন্দ্র রায়।

তন্ত্রমতে ‘কালী’ নামটির অর্থ ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। “প্রাণীমাত্রকে সংহার করেন বলে যিনি মহাকাল

তাঁকে তুমি কলন কর। (সংহার কর), এই জন্য তুমি আদ্যা, কালিকা, তুমি কালকে গ্রাস কর, এই জন্য

তুমি কালী।“ এখানে ‘কালী’ নাম এবং তাঁর ৩মঃ কৃষ্ণবর্ণের কারণ অনুমান করা যায়।


ড. বিনয়তোষ ভট্টচার্য ‘সাধনমালা’য় (ভূমিকা, খণ্ড-২) বলেছেন, “তারার ধ্যান ও সাধনা হিন্দুতন্ত্রে

প্রচলিত আছে এবং দুইটি ধ্যান মিলিয়ে দেখলে বোধ হয় হিন্দু তান্ত্রিকেরা মহাচীনা তারার উপাসনা ও

মূর্তি কল্পনা বৌদ্ধদের নিকট হতে গ্রহণ করেছিলেন। এর সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে।... বজ্রযোগিনী রত্নসম্ভব

কূলের এই দেবী অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শক্তিশালী..... ইনি দেখতে ঠিক হিন্দু দেবী ছিন্নমস্তার মত। বোধ হয়

বৌদ্ধ বজ্রযোগিনী হিন্দু ছিন্নমস্তাতে পরিণত হয়েছিলেন এবং তারও যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।“

(বৌদ্ধদের দেবদেবী) ‘তারা’ যে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী। ‘আর্য্যাসপ্তশতী’ (গোবার্জন আচার্য, খ্রিষ্টীয়-দ্বাদশ

শতাব্দী) গ্রন্থে ‘তারা’ যে শ্রুতি বিরোধী, জিন সিদ্ধান্ত স্থিত, সে সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়।

তান্ত্রিক দেবী-দেবতার প্রাপ্ত বিবরণ হতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ১। তান্ত্রিক দেবী-দেবতার

এমন অনেক রয়েছে যা কাপালিক লক্ষণ সম্পন্ন। ২। প্রায়: ভয়ংকর ক্রিয়া এবং প্রয়োজন সম্পন্ন দেবী-

দেবতা এইরূপ কাপালিক লক্ষণ ধারণ করেন। দ্বেষকূলের অনেক দেবী-দেবতা (তারা, মহাকালী এবং

মহাকাল) এই লক্ষণ সম্পন্ন এবং কাপালিক তত্ত্ব সবাধিক প্রতীত হয়। ৪। এক্ষেত্রে শক্তি, হস্তমুদ্রা এবং

বিশিষ্ট আসন (পঞ্চমুণ্ডি) এর বিপুল আয়োজন হয়।

কাপালিক তত্ত্বে মহাকাল শবারঢ় থাকেন, মুণ্ডমালা ধারণ করেন, শ্মশান নিবাস করেন। এইরূপ অনেক

কাপালিক লক্ষণ তাঁর মধ্যে বিদ্যমান থাকে। মহাযোগী মহেশ্বর ত্রিনেত্রধর, ব্যাঘ্রচর্মধারী, কপালধারী

তথা সর্পের আভূষণ ধারণ করেন। যুগনন্ধমুদ্রাতে এর শক্তি (মায়া) হস্তে খড়গ, কপাল এবং

যজ্ঞোপবীত’এর ন্যায় মুণ্ডমালা ধারণ করেন। তান্ত্রিক সাধক বলেন, নিখিল বিশ্বে এবং বিশ্বের অন্তরালে

এক মহাশক্তির লীলা চলছে। সেই অদ্বৈত শক্তি-উৎস হতে বিশ্বের যাবতীয় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ শক্তির

বিকাশ: জড়ে ও জীবনে এই শক্তির লীলা।

কালিকা মঙ্গল কাব্যে (বলরাম কবিশেখর) কাপালিক তত্ত্ব সম্বলিত দেবীর ভয়াল মূর্তি অঙ্কিত হয়েছে:

কাতি কর্পর হতে মুণ্ডমালা গলে।

শোভা করে সরোবর শ্রবণ মণ্ডলে।।

দ্বীপিচর্য পরিধান অতি শুষ্কদেহা।

নিরবধি লহ লহ করে তার জিহ্বা।।

চৌদিকে বেষ্টিত শিবা করয়ে গর্জন।

চাঁদ চকোর আঁখি শবে আরোহন।।

তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে (যোগরত্নমালা, পৃ: ১৩-১১৪) প্রজ্ঞা’র অনেক গুলি রূপ বিদ্যমান ১. জননী

(হিতৈষিনী), ২. ভগিনী (বৎসলা), ৩. নটী (পটুপচারা), ৪. রজকী (শুক্লকর্মরতা), ৫. বজ্রী (ধ্যানপ্রেয়া), ৬.

চণ্ডালী (নিহতমান কারণ ক্ষমাশীলা), এ ব্রাহ্মণী (অনবদ্যকর্মরতা)। এই প্রজ্ঞাই নৈরাখ্যা। এর

একত্বসাধন (যুগনন্ধ মুদ্রা) করা উচিত।

তন্ত্র বা শক্তি পূজার সাধক এই প্রজ্ঞাকে’ই আবার সিদ্ধবিদ্যারূপিণী বলেছেন -


কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী।

ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধূমাবতী তথা।।

অবধূতী, ললনা এবং রসনা বস্তুতঃ প্রজ্ঞোপায়াদ্বয়স্বভাব যুক্ত হয়। এই ৩ নাড়ির যোগ দ্বারা মহাসুখ

উৎপন্ন হয়। এই কারণে যোগবিদ্‌ সাধক সদৈব এর মহাসুখময়ী পূজা করেন। মোদ অথবা হর্ষ অথবা

মহাসুখ উৎপন্ন কারিনী হওয়ার কারণে ‘শক্তি’কে মুদ্রা বলা হয়। নিষ্পন্নক্রমসমাধির অন্তর্গত জপ-ধ্যান-

মুদ্রা-মণ্ডলাদির বিধান ও করা হয়েছে। তন্ত্রমতে এই সকল কর্ম আদিকর্মের অন্তর্ভূত হয়। পরমার্থের

মনন জগত্রানত্ব মন্ত্রের মূল তত্ত্ব। এই ভাবনা দ্বারা তন্ত্রে যে মন্ত্রযোগের বিধান প্রদত্ত হয়েছে তাতে

নানাবিধ সাধনোচিত্ত সামগ্রী এবং মন্ত্রোচ্চারণ সহ প্রতিষ্ঠানের ও নির্দেশ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে তান্ত্রিক

তত্ত্বে অত্যন্ত বিস্তারিত ভাবে দেবী এবং দেবতার কাপালিক সম্পন্ন রূপের ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তন্ত্রের মূল উপাস্য মাতৃকাশক্তি। স্ত্রী মাত্রই শক্তি। প্রকৃতি-মহী, রাত্রি, লৌকিক দেবী মনসা ইত্যাদি শক্তির

মূর্তি। এক অর্থে বলা যায় যে স্ত্রীলিঙ্গ বোধক সকল পদার্থ এই শক্তির মূল প্রতীক। উত্তরকালীন তন্ত্রগ্রন্থে

বহু মহাশক্তির উল্লেখ রয়েছে “শতলক্ষ মহাবিদ্যা....” (সিদ্ধ যামল, পৃঃ ৩)

মধ্যযুগে বৌদ্ধতন্ত্র এবং হিন্দুতন্ত্রের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। তবে তন্ত্রে বেদাচার, দক্ষিণাচারের উলেখ

থাকলেও তান্ত্রিক দেবদেবী এবং উপাসনা পদ্ধতি মূলঅর্থে বৌদ্ধ তন্ত্র ধারারই ধারক। তন্ত্রোক্ত আচার

পদ্ধতি বৈদিক নয়। যেমন-

মদ্য মাংস তথা মংস মৈথুন।

ম-করা পঞ্চ দেবেশি শীঘ্র সিদ্ধিপ্রদায়ক।। - মহানির্বাণতন্ত্র।

কাপালিক সাধনার (শক্তিপূজা) ভূমিকা রূপে তান্ত্রিক সাধনাত্মক তত্ত্বকে যদি পরীক্ষা করা যায় তাহলে

গুরুশিষ্যবাদ এবং অধিকারভেদ, অভিষেক এবং দীক্ষা, বিভিন্ন সাধনাত্মক অবস্থা, দেবী-দেবতা মণ্ডল,

শক্তিতত্ত্ব, যুগনদ্ধ, মন্ত্র, মণ্ডল, পঞ্চমকার, মুদ্রা, ষটকর্ম, যোগদি’র বিবিধ তত্ত্ব স্পষ্ট রূপে পরিলক্ষিত

হয়। যেমন-

১। গুরুশিষ্য এবং অধিকার ভেদ:

গুরু ধর্মোপদেষ্টা’র সাথে সাথে আধ্যাত্মিক মার্গ নির্দেশক ও হন। গুরু বস্তুতঃ এক’ই হয়। সামান্য মানব

শুরু মহাকাল’এর অভিব্যক্ত রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইনি (মহাকাল) পার্থিব গুরুর অভ্যন্তরে

মন্ত্রদীক্ষার সময় অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর বানীতে প্রকট হন। ফলে শুরুর দীক্ষা মূল, দীক্ষা মন্ত্রের মূল, মন্ত্র

দেবতার মূল এবং দেবাত সিদ্ধির মূল। গুরু, মন্ত্র এবং দেবতার মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য নেই। (অ্যান

ইনট্রোভাকশন টু তন্ত্রশাস্ত্র, স্যার জন উডরফ, পৃ: ৬৫) পণ্ডিত গোপীনাথ কবিরাজ’এর মতে গুরু

সাধনাত্মক জীবনে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে পরম আবশ্যক কারণ তিনি জ্ঞানদাতা, কর্মদাতা এবং

ভক্তিরসদাতা ও হন। (ভারতীয় সংস্কৃতি একবা সাধনা, পৃঃ ২৪১)।

২. অধিকার ভেদবাদ:

অধিকার’এর সম্পর্ক সাধকের শ্রেণীবিভাগ দ্বারা সম্পন্ন হয়। স্যার জন উভরফ (অ্যান ইনট্রোডাকশন টু

তন্ত্রশাস্ত্র, পৃঃ ৭২) সাধকের শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত গুণ অথবা যোগত্যা অনুসারে তাকে ৪


ভাগে বিভিক্ত করেছেন মৃদ্যু, মধ্য, অধিমাত্রক এবং অধিমাধ্যম। স্যার উভরফ’এর এই বিভাজন দ্বারা

স্পষ্টতর হয় যে সাধকের ক্রমোয়ত সাধন জমে অধিকারের নির্ণয় তার শারীরিক, মানসিক এবং

আচারগত সামর্থের প্রতি নির্ভর করে।

হিন্দুতন্ত্রে ৮ প্রকার অভিষেক’এর বর্ণনা পাওয়া যায়। এই সকল অভিষেকগুলি হলো এইরূপ -

শাক্তাভিষেক, পূর্ণাভিষেক, ক্রমদীক্ষা অভিষেক, সাম্রাজ্যাভিষেক, মহাসাম্রাজ্যাভিষেক,

যোগদীক্ষাভিষেক, পূর্ণদীক্ষাভিষেক এবং মহাপূর্ণাদীক্ষাভিষেক ইত্যাদি। মুণ্ডমালাতন্ত্রের ব্যাখ্যা অনুসারে

মন্ত্র আলি এবং কালি হয়। প্রবেশ’এর স্থিতি এবং ব্যুত্থান’এর স্থিতি দ্বারা যে জ্ঞান প্রাপ্তি হয় তা মন্ত্র

নিষ্পত্তি হয়। কায়’এর অর্থ-সাধনাভূত নির্মাণ শরীর দ্বারা। বাচা-বজ্রজ্ঞাপন দ্বারা। মনে-হৃদয়ে অবস্থিত

স্বার্থশূণ্যতা। মনসন্তোব মহামুদ্রাবিশুদ্ধিকারক প্রিয় মহাকালের মুর্তির নিষ্পাদন।

চিত্তের নৈরাত্ম্য সাধনা এবং বচন তথা শরীরের ও নৈরাত্মী করণের ভাবনা করা উচিত। বাক্, কায় এবং

চিত্তের লক্ষণ-প্রজ্ঞা, উপায় এবং উপলব্ধির রূপ ত্রিবেণী হয়। আকাশ সমতা পরামার্থের লক্ষণ।

কায় বাক চিত্তের নিরুপন দ্বারা যে স্বভাব প্রাপ্তি হয় তা সংবৃতিসত্য, সেখানে স্বভাব থাকে না। মন্ত্র-প্রণব

ইত্যাদি। সংবৃতিসত্য এবং পরমার্থ সত্যের একত্রীকরণের ফলে সমাধি উৎপন্ন হয় যা মন্ত্রাত্মক। মন্ত্র

পঞ্চরশ্মিযুক্ত - ভৈরবী।

পবিত্র, একান্ত পৃথিবী প্রবেশ, শান্ত, শিবালয়’তে ও মন্ত্রধারক সাধক তাঁকে শুদ্ধ জল গন্ধ ইত্যাদি

বিলেপন করুণ কারণ নিত্য ছিন্নমস্তার পূজা হেতু।

রুধির বদনাবামা ত্রিণয়না ঘোর

শ্যামা বহ্নি-বরুণ-বায়ু সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিছে।

জড় প্রকৃতির ছলে শবদেহ পদতলে

নৃমুণ্ড-মালিনী কালি হুহুঙ্কারি নাচিছে।।

কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দশমহাবিদ্যার’ অভ্যন্তরে সভ্যতার ক্রমোন্নতির ধারাটি সুস্পষ্ট করেছেন

কালীরূপ সৃষ্টির প্রথম স্তর’এর রূপমূর্তি। এরপর তারা মুতি, প্রথম মানব সভ্যতার প্রকাশ। তৃতীয় স্তরে

দেবী ষোড়শী, জীব তখন প্রণয় বন্ধনে আবদ্ধ। তার পরে ভূবনেশ্বরী মূতি, তিনি সর্বমঙ্গলা। দেবী ভৈরবী

মূর্তি সভ্যতার পথম স্তরের প্রতীক। দেবী মাতঙ্গী, প্রীতি এবং বন্ধনের প্রতি মূর্তি। দেবী ধূমাবতী দুর্ভিক্ষের

ভয়ালমূর্তি। অষ্টমে দেবী বগন্ধা, দেবী এখানে দারিদ্র দলনী। দেবী ছিন্নমস্তা জগৎ কল্যাণে আত্মদানের

নিদর্শন। সভ্যতার অন্তিম স্তরে দেবী-কমলা। এইস্তরে উপ সখে-শোক তাপ মুক্ত এবং একে অপরের

প্রতি মমতাযুক্ত। দেবীও তাই লীলারসে বিভোর –

কিবা বেশ সুমোহন লীলারসে নিমগণ

পরমা প্রকৃতি সতী সর্বশেষ ভূবনে।....

পদ্মাসন করে পদ্ম সতী সর্ব সুখ সম্ম

দয়াতে ডুবায়ে ভব জীব-দুঃখ হরিছে।

বস্তুতঃ মধ্যযুগে বাংলার ধর্মচিন্তায় কালীমূর্তি যেন সকল বৈপরীত্যের আধার বিষয় গুণ ও ক্রিয়া, রূপ

এবং অপরূপের এক আশ্চার্য সমন্বয়।

জপমালা এক করে জ্ঞানমুদ্রা ধরে

দ্বিকরে অভয় বরে, করেন ধারণ। - মহাতাবচাঁদ।


ইতিকথার ভাষা:

বাংলায় সহজ সাধনা তান্ত্রিক মানসিকতাকে আশ্রয় করেই উদ্ধৃত হয়েছিল। বৌদ্ধ-সহজিয়াদের প্রজ্ঞা-

উপায় ও যুগনন্ধ মধ্যযুগে হিন্দুতন্ত্রের অভ্যন্তর দেখতে পাওয়া যায়। খ্রিষ্টীয় নবম-দশম শতাব্দী থেকে

চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত যে সহজিয়া ধর্ম বাংলায় প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা তন্ত্রের প্রকৃতিতত্ত্ব, সাধনায়

সাধন-সঙ্গিনীর প্রয়োজনীয়তা, কুলকুণ্ডালিনী যোগ প্রভৃতির উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। বাংলায়

নাথধর্মের অভ্যন্তরে ও তন্ত্রের প্রভাব যথেষ্ট। নাথধর্মে তন্ত্রের কুণ্ডালিনী জাগরণ, ষটচক্র সাধন, অজপা

জপ প্রভৃতি মুখ্য স্থান অধিকার করে আছে। ড. কল্যাণী মল্লিকের মতে, "নাথেরা মূলতঃ শৈব এবং

নাথেরা শিব ও আদিনাথের উপাসক হলেও নামধর্মকে তন্ত্র ও যোগতত্ত্বের সংমিশ্রণ বলা যেতে পারে।

তন্ত্রের পিশু ব্রহ্মাণ্ডের একত্ব অনুভূতি সাধন এবং শক্তি পূজা নাথদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।" (নাথ

সম্প্রদায়ের ইতিহাস, দর্শন ও সাধন প্রণালী, পৃ: ১৫২)।

তন্ত্র প্রভাবিত বজ্রযান, সহজযান, কুলাচার, নাথধর্ম প্রভৃতি মধ্যযুগে নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য

দিয়ে বাংলার গণ জীবন এবং জাতীয় মানসে গভীরভাবে আধিপত্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল।

এই ঈশ্বরিক রহস্যবাদী সিদ্ধান্ত মূলঅর্থে অনুত্তর যোগতন্ত্রের রহস্যবাদের প্রতি ইঙ্গিত করে। এ সম্পর্কে

নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। যেমন -

১। তন্ত্রাগম একটি সহজ অনির্বচনীয় সত্যে বিশ্বাস করে এবং তাকে সাধনাত্মক জীবনের লক্ষ্য মনে

করে। ২। তাঁরা ও অদ্বয়াত্মক দীবন দর্শনকে স্বীকার করে। ৩। বিশ্বের অন্যান্য রহসাবাদীর ন্যায় এদের

রহস্যবাদ ও অদ্বৈতবাদী। ৪. পরমতত্ত্ব এবং পরমাণুভূতি উভয়কে তাঁরা অনির্বচনীয় মনে করে।

উপরোক্ত বিষয়গুলি মহারাজ নন্দকুমারের এই পদটিতে অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়:

কবে সমাধি হবে শ্যামা-চরণে

অহংতত্ত্ব দূরে যাবে সংসারে বাসনাসনে।।

উপেক্ষিয়ে মহত্তত্ব, ত্যাজি চতুর্বিংশতত্ত্ব,

সৰ্ব্বতত্ত্বাতীত তত্ত্ব দেখি আপনে আপনে।।

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য এবং শাক্ততন্ত্র বা পদাবলী সাহিত্যে যে সাধন পদ্ধতি তথা তান্ত্রিক সিদ্ধান্ত

উদ্ভাসিত হয়েছে, উত্তরকালে অর্থাৎ উনিশ শতকে বঙ্কিমচন্দ্রের; কপাল কুণ্ডলয় তা অত্যন্ত

পরিস্কারভাবে দেখা যায়।


....জটাধারী এক ছিন্ন-শীর্ষ গলিত গলিত শব্দের উপর বসে আছে। আরও সভয়ে দেখলেন যে সম্মুখে

নরকপাল রয়েছে, তন্মধে রক্তবর্ণ দ্রব্য পদার্থ রয়েছে। চতুর্দিকে স্থানে স্থানে অস্থি পড়ে রয়েছে এমন কি

যোগাসীনের কণ্ঠস্থ রুদ্রাক্ষমালা মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অস্থিখণ্ড গ্রথিত রয়েছে। নবকুমার মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে

রইলেন। ....বুঝলেন যে এ ব্যক্তি দুরন্ত কাপালিক।

সহায়ক গ্রন্থসূচী:

১। প্রাচীন ভারতীয় তান্ত্রিক সাধনা ও সাহিত্য, পণ্ডিত নাগেন্দ্র নাথ উপাধ্যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী,

বারাণসী, নভেম্বর, ১৯৭৯।

২। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে তন্ত্রের প্রভাব, ড. জ্ঞান্দ্রে নাথ ভট্টাচার্য, পুস্তক বিপনী, কলকাতা-

৯, নভেম্বর, ২০০০।

৩। শাক্ত পদাবলী ও শক্তিসাধড়া, শ্রী জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তী ডি.এম. লাইব্রেবী, কলকাতা-৬, এপ্রিল

১৯৯৩।

৪। প্রাচীন বাংলার ধর্ম প্রসঙ্গ, ড. মো. গোলাম সারওয়া অনুশিষ্য, উত্তরপাড়া, হুগলী, অক্টোবর, ২০২৫।

৫। পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, গৌতম বুক সেন্টার, দিল্লী, মার্চ ১৯৮০।

৬। মঙ্গল কাব্য, বাঙালীর পুরাণ ইতিহাস, উত্তম পুরকাইত ছোঁয়া, কলকাতা-১২, বইমেলা ২০১৮।

৭। বৌদ্ধ দর্শন মীমাংসা, পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায়, ভারতী পুস্তকালয়, দিল্লী, ডিসেম্বর, ১৯৭০।

৮। শক্তি সাধনা ও তন্ত্র, পণ্ডিত নাগেন্দ্রনাথ উপাধ্যায়, এলাহাবাদ বুক ডিপো, এলাহাবাদ মার্চ ১৯৮২।

১। বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), নীহার রঞ্জন রায়, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা-৭৩, ১৩৮৭ বঙ্গাব্দ।

১০। বৌদ্ধধর্ম ও চর্যাগীতি, মহাবোধি বুক এজেন্সি, কলকাতা-৭৩, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ।

১১। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য ভাবনা এবং কপাল কুণ্ডলা, অজয় ভট্টচার্য, অশ্বমেধ, ঝাড়খণ্ড, বইমেলা

বিশেষ সংখ্যা ২০১।

No comments:

Post a Comment