নারায়ণ সান্যাল জীবনপুরের পথিক
- সুমনপাল ভিক্ষু
"রবে না কাহার ও মনে
-এই শিখা দিত কত আলো।
আনুগত্য তথ্য যদি ফঅইলে না মিলে
প্রমান হবে না - তুমি কোনদিন ছিলে
এই দুনিয়ায়!
হায়!
ভয় হয় তাই
আপন অস্তিত্বখানি কখন হারাই!
অনাগত যুগে কোন গবেষক এসে
ফুটনোট কণ্টকিত থিসিসের শেষে
কহিবে কর্কশ কণ্ঠে: শোন! সবে শোন!
নারান সান্যাল নামে
দুনিয়ার কেউ কভু ছিল না কখনও।" – নারায়ণ সান্যাল।
"বঙ্গভাষা আজ আর উপেক্ষিত নহে বাঙ্গালী বলিয়া যাঁহারা গর্ব করেন, তাঁহাদের নিকট বঙ্গভাষা বরং অপেক্ষিত যখন বাঙ্গালীর ছেলে, বঙ্গভূমির বক্ষের উপর দাঁড়াইয়া বাঙ্গলা ভাষায় কথা বলা, বা বাঙ্গলা ভাষায় গ্রন্থ অধ্যয়ন করাকে লজ্জাজনক, কতকটা বা প্রত্যবায়জনক মনে করিতেন, সে দুর্দিন কাটিয়া গিয়াছে, সে মোহ ভাঙ্গিয়াছে।
মহাকবি কৃতিবাস হইতে কবিবর রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বহু মনস্বী বঙ্গসন্তান বঙ্গবাণীর স্বর্ণমন্দির রচনায় সাহায্য করিয়াছেন, রাজা রাম মোহন, প্রাতঃ স্মরণীয় বিদ্যাসাগর, অমর বঙ্কিমচন্দ্র, চিন্তাশীল অক্ষয় কুমার প্রভৃতি বহু প্রতিভাশালী সারস্বতগণ সেই মন্দির গাত্র নানাবিধ শিল্পসৌন্দর্যে খচিত করিয়াছেন। বঙ্গভাষা এখন বাঙ্গালির একটা প্রকৃত স্পর্ধার সামগ্রী হইয়া দাঁড়াইয়াছে।" (আশুতোষ মুখোপাধ্যায়)।
যে জাতির নিজের পরিচয়যোগ্য ভাষা নেই, বা নিজের জাতীয় সাহিত্য নাই, সে জাতির বড়ই দুর্ভাগ্য। (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিবিধ প্রবন্ধ, ১ম খণ্ড)।
বর্তমান সময়ের কালখণ্ডে সাহিত্যিকের আনুগত্য সাহিত্যের চেয়েও অনেক অনেক বেশী নীরস বাস্তব পৃথিবীর প্রতি, যে পৃথিবী ধর্ষিত এবং লাঞ্ছিত হয়ে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এক্ষেত্রে সাহিত্য হবে তীব্র কুঠার।
কর্কশ এবং ধারালো, তাতে থাকবে না কোনরকম পোশাকি শব্দ কিম্বা আঁতলামি সম্বল কথামালা।
"....একথা মনে হতে পারে, যখন চারিদিকে ভাঙনের ছবি দেখি। পুরানো পোকায় খাওয়া সমাজ এখন থরথর করে কাঁপছে, এমন কি যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই দেশে শুধু শোষণ ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করে চলেছে, মনে হয় প্রচণ্ড ভূমিকম্প বুঝিবা তাকে ও সম্পূর্ণ গ্রাস করবে বলে মাটির নীচে চাপা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে চাইছে। কিন্তু মাটির ওপর থেকে বিস্ফোরণকে ত্বরান্বিত করার কোনো প্রস্তুতিই কোথাও নেই।" (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
যদি আমাদের মধ্যে একজন ও বিদ্যাসাগর, মাইকেল কিম্বা অনুসন্ধিৎ সু কথাকার উপস্থিত থাকতেন, তাহলে তিনি অভিশাপ দিতেন হয়তো।.... আজকে পুনঃরায় নতুন করে ভাবনা-চিন্তার সময় উপস্থিত হয়েছে। সৎ সাহিত্য বিচারের কী রীতি, মনুষ্যত্বকে ফুটিয়ে তোলা সাহিত্যের মূল অর্থাৎ প্রধান লক্ষণ কিনা, বিবেকের কাছে হৃদয়ের কাছে আবেদন না অবিবেকী সত্তার নিকট আত্মসমর্পন হবে লেখকের বিচার্য নারায়ণ সান্যালের রচনার প্রেক্ষিতে এ সকল মূল্যায়ন আজকে একান্তভাবে জরুরী। নতুবা অসীম মুর্খতা আমাদের গ্রাস করতে বাধ্য করবে।
এ প্রসঙ্গে উঠে এল এন জুলফিকার মহাশয়'এর নারায়ণ সান্যাল সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ এপিটাফ-
"...ওঁর সেই পল্লবগ্রাহিতার কল্যাণে উপকৃত হয়েছি আমরা, সাধারণ পাঠক সমাজ। ডুবুরির মতো সাগরতল থেকে নিপুণ সন্ধানে তুলে এনেছেন মণি মুক্তা, সংগ্রহ করেছেন হিরে জহরত সাহিত্য সেবার প্রয়োজনে, পাঠকদের কাছে পরিবেশনের উদ্দেশ্যে। সে খোঁজায় তাঁর ক্লান্তি ছিল না কোনও, নিষ্ঠায় ছিল না ছেদ জীবনের শেষ পর্যন্ত। ফাঁকিবাজি বা 'সৌখিন মজদুরি' ছিল না তাঁর লেখায়।
নারায়ণ সান্যাল বলেছেন, "আশ্চর্য এই উদ্দ্বাস্তুদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কেউ কিছু লিখল না। পঞ্চাশ লক্ষ লোক ঘর-বাড়ি, সমাজ-সংসার ছেলে চলে এল।.... দশ-পনেরো বছর ধরে স্রোতের জলে ভেসে ভেসে বেড়ালো শিকড় গাড়ল না কোথাও। নতুন জমিতে, নতুন করে ওরা বাঁচতে চায় কী তীব্র ওদের বাঁচার আকাঙ্খা।... অন্ধকারে ওরা জীবনকে খুঁজছে।"
নারায়ণ সান্যাল অনুভব করেছিলেন বাস্তচ্যুত মানব জমিনের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, আত্মীয়, পরিজনের সমবেত আর্তনাদ, ব্যাথাতুর জীবন, আরও কত কি.....। দেশ ভাগের বিপর্যয়'এর প্রভাবে নৈতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক ভাঙন প্রভাবে ব্যক্তি মানসে সৃষ্ট নৈরাজ্য, ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা। মনে হয় পৃথিবী গভীর হতে গভীরতম ব্যাধিতে আক্রান্ত। নারকীয় পারিপাশ্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে কথাকার 'এর মানব পঠে।
ধূসর আকাশ
ভাষাহীন, নিঃস্তব্ধ পাথরের মতো
দীর্ঘ রাত্রি
ক্লান্ত পথিকের মুখোশে নিঃসঙ্গ।
স্বপ্ন
প্রেমহীন এলোমেলো
আজও মেয়েটা কাঁদে
নবকুমারের অপেক্ষায়।
তখন
আমার অন্ধকারে আমি
নির্জন শহরের বুকে, নিঃসঙ্গ।
নিথর
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এখানে জীবন একটা ফুলের মতো, যার পাপড়ি গুলি এক এক করে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। মানুষের হৃদয়াবেগের কোমলতম এবং সব থেকে মূল্যবান অনুভূতি গুলি ধর্মমোহের অবক্ষয়ী গ্রাসে হারিয়ে গেছে। ফুটে উঠেছে মৃত্যুর কলবর আর অসহায়ত্বের ছায়া। মনে হয় মৃত শবের অসহনীয় গন্ধে, শেষহীন শব্দের পাশে আসন্ন রাত্রির পদক্ষেপে স্তব্ধ লালনের গান আর সমবেত কীর্তন। নারায়ণ সান্যালের উপন্যাসে পাই উদবাস্তুদের পটচিত্র:
আবার একপাক ঘুরল মহাকালের রথচক্র ….
"-ছিন্ন মলিন বসন। ওদের কাঁধে রাইফেল নেই, কাঁখে কঙ্কালসার শিশু। ওদের মনে যুদ্ধ জয়ের প্রেরণা নেই আছে জীবন যুদ্ধে পরাজয়ের গ্রানি। ফেলে আসা, অতীতের বিভীষিকা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওরা এসে গেল দলে দলে। হাজার হাজার উদ্বাস্তু পরিবার।" (বকুলতলা পিত্রল, ক্যাম্প)
আমাদের দেশভাগের, দেশত্যাগের ইতিহাস নেই, আছে স্মারক, হাজার হাজার। উদ্বাস্তু কলোনি, ক্যাম্প, বস্তি, ফুটপাথ।
সুধীর চক্রবর্তী এক স্মৃতিচারণ মূলক লেখায় তাঁর 'নারাণদা' সম্পর্কে লিখেছেন, "নারাণদা ছিলেন জীবনরসিক এবং শিল্প সাহিত্য প্রেমী। বস্তুত লিখতে এত ভালোবাসতেন যে তার প্রমাণ শতোত্তীর্ণ নাকি একশো পঁচিশের ও বেশি বইয়ের সংখ্যা, আর সেইসব বই লেখার জনে বিপুল পাঠের পূর্ব প্রস্তুতি, নোটস তৈরি করা। ...তাঁর লেখার পরতে পরতে আছে... মেধা ও মননের দ্যুতি। পাণ্ডিত্য আছে, কিন্তু তার ভার নেই।"
বকুলতলা পিত্রল, ক্যাম্প'এর মধ্যে অদ্ভুত ভাবে উঠে এসেছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়'এর একটি কবিতা:
নেভানো উনুনের ওপর পড়ন্ত আলোয়
যেন
ফাঁসির দড়িতে ঝুলছে
কাল বিকেলের মাজা ভাতের হাঁড়ি।
- একটি লড়াকু সংসার, ফুল ফুটুক।
..... ভিটে মাটি খাঁ খাঁ করছে।
সাম্প্রদায়িক লখের আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে কামিনী আর কুসুমের জীবন।
ঘরের মানুষ হয় মৃত নয়তো বা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
স্বাধীন দেশ তাদের নাগরিক মনে করেনি। অনেকেই দেশত্যাগী। ভাঙ্গা উনুনের পাশে পড়ে আছে সেই কবেকার বেওয়ারিশ কাঠকুটো, ভাঙা টিনের থালা।
পচে যাওয়া খুঁটি পাশে আড়ি পেতেছে শ্মশানের বামাচার। জেলেপাড়া, মালোপাড়া, যুগীপাড়া এখন মহেঞ্জোদরো হরপ্পা। কেউ নেই কোথাও। মানুষের নিকোনো উঠোন, সন্ধ্যারতি, অদ্ভূত ভাতের গন্ধ কিম্বা হানিফ মিঞা ডিঙা....।
আঁকাবাঁকা পথে ছায়ার মিছিলে ওরা হাঁটে নিরুদ্দেশের কালখণ্ডে। কুপার্স ক্যাম্প হতে রাজমহল অথবা দণ্ডকারণ্যের পথ ধরে ওরা
হাঁটে। তবুও কোথাও যেন জীবন নেই।
তখন বিকর্ণের দিনলিপিতে উঠে আসে এইসব বোবা যুদ্ধের বিষন্ন ছবি।
অন্ধকার নামে শুকনো তুলসী মঞ্চ আর পাগলা সুফি'র মাজারে। পিছনে করুণ মূর্তি পথের অন্ধকারে বিসফারিত। আলো চাই আলো কিন্তু কে দেবে তাঁকে। বাতাসে ভেসে আসে চাপা দীর্ঘশ্বাস।
অবিরত শত শত কুপথ কুকর্মে রত
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম হয়ে বিবর্জিত
ধনাশা পূরিত চিত্ত বিষয় মদেতে মত্ত
ভুলিয়া পরমতত্ত্ব হিত।
বিষয় বাসনা বশে পরে আত্ম ভ্রান্তিদোষে
আছে ভ্রান্ত হইয়া নিতান্ত
বিষয় বাসনা দেখি বসুমতী হাস্যমুখী,
হাস্য মুখ হয়েছে কৃতান্ত। - নববাবু বিলাস, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
লেলিন' একসময় বলেছিলেন, যেসব বুদ্ধিজীবী হয়েছেন, তাঁদের যথাযোগ্য মর্যাদা অবশ্যকর্তব্য। পুঁজির দাসত্ব না করে জনসাধারণের স্বার্থে বিজ্ঞানকে উন্মোচন করার কাজে ব্রতী মানবিক মূল্যবোধের প্রতি আত্মসচেতন, কর্তব্য-কর্মে দায়বদ্ধ, গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিদের প্রতিনিধি নারায়ণ সান্যাল সম্পর্কে লেলিনের এই উক্তি কি প্রযোজ্য নয়?
চীন-ভারত লঙ্ মার্চ' নারায়ণ সান্যালের অন্যরকম একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে লেখক বলেছিলেন:
"ভবিষৎ কালের কাছে এ বইটি একটা দলিল হয়ে থাকবে ১৯৭২-৭৩ সালে, প্রাক-এমার্জেন্সি-যুগের কংগ্রেস সুশাসন আমলে ভারতে একজন বাঙালী কথাসাহিত্যিকের মানসিকতা কী অবস্থায় ছিল, তিনি কতটা মনের ভাব প্রকাশ করতে ভরসা পেতেন তা এক থেকে বোঝা যাবে।
'শেষ কথা' শীর্ষক ১৯ পরিচ্ছেদের সূচনা পর্বে নারায়ণ সান্যাল বলেছেন 'লঙ মার্চের তুলনা ভারতবর্ষে নেই, একথা আগেই স্বীকার করেছি। কিন্তু মে-ফোর্থ আন্দোলন? কিয়াংসি সোভিয়েত? চিঙখানশান পাহাড়ের গেরিলা বাহিনী? সাংহাইয়ের নির্মম হত্যাকাণ্ড? তাদের কোনো উপমান কি খুঁজে পাওয়া যায় এ উপাদীপে?... স্বীকার করতেই হবে- ব্যাপ্তিতে তাদের কোনো উপমার কি খুঁজে পাওয়া যায় এ উপদ্বীপে?.... স্বীকার করতেই হবে ব্যাপ্তিতে, বিশালতায়, সংখ্যাতত্বে কিংবা সাফল্যের নিরিখে সমান্তরাল চিত্র নেই কিন্তু সেটাই তো শেষ কথা নয়। শেষ কথা আন্তরিকতা আর আত্মদানের নিরিখে উপমান হয়তো আছে।'
লাল নিশানের নীচে উল্লাসী মুক্তির ডাক
রাইফেল আজ শত্রুপাতের সম্মান পাক। - পদাতিক।
নারায়ণ সান্যাল দেখেছিলেন ৪৭'এর ব্যর্থ স্বাধীনতা, দেশভাগ, নিরন্ন এবং অসহায় মানুষের হাহাকার। রাজা এসেছে। আবার চলে ও গেছে নিয়ম মেনে। তবুও শাসন শোষনের দিন বদলায় নি।
'অহিংসা পরম ধর্ম'- মহান বুদ্ধের এই মানবিক চিন্তাধারাকে নস্যাৎ করে চীনের জনগণের উপর চেপে বসেছে সামাজবাদী আগ্রাসন।
অহিংসা পরমো ধর্ম নীলবর্ণ শৃগালের দলে।
টাকার টংকারে শুনি: মায়া এ পৃথিবী।
জীবের সুলভ মুক্তি একমাত্র স্বস্তিকার নীচে।
সংগ্রাম নিশ্চিত, তবু মাসুতুতে ভা'য়েরা
বিষম সন্ধিতে আজ কী চক্রান্ত চৌদিকে ফেঁদেছে।
আজকে এপ্রিল মাস (চৈত্র না ফাল্গুনে?)
ভ্রষ্ট নোগুচির ন্দি চাড়াইয়েরা ভনে। - পদাতিক।
বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ' লাল চীন'এর চিত্কা পাহাড়ের অগ্নিশিখা তেলেঙ্গানা, তেভাগার পথ ধরে উপস্থিত হল নকশাল বাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থানে। নারায়ণ সান্যালের কলম এখানে বেয়নটের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, চেয়ারম্যান মাও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল কৃতি ছাত্র শ্রেণীহীন সমাজের চির বাসনায় ভারতবর্ষের বুকে ক্রান্তিকাল আনতে চেয়েছিল। শাসক দলের মতে ওরা ছিল লুভে রাইট বা ভ্রান্ত পথের পথিক। তাই নেমে এল নিষ্ঠুর নির্মম দমন নিপীড়ন। কিন্তু বিপ্লবের কি মৃত্যু আছে....।
তবু জানি, কালের গালির গর্ভ থেকে বিপ্লবের ধাত্রী
যুগে যুগে নতুন জন্ম আনে,
তবু জানি,
জটিল অন্ধকার একদিন জীর্ণ হবে চূর্ণ হবে ভস্ম হবে
আকাশ গঙ্গা আবার পৃথিবীতে নামবে - সমর সেন, ঘরে-বাইরে।
নারায়ণ সান্যাল বিশ্বাস করতেন, কবি সাহিত্যিক যদি অবক্ষয়ের চেতনা'কে আঁকড়ে ধরে থাকেন তাহলে মধ্যবিত্ত জীবনের গলিত স্থবির এবং নপুংসক দিকটাই কেবল তার চোখে পড়বে। ফলে সে হয়ে উঠবে স্বপ্নভীরু ক্লীব। কবির ভাষায় সর্বাঙ্গে ভুলের নামাবলী।'
ইতিহাস কি?
ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের মূলগত সম্পর্কই বা কি? এর একটি চমৎকার এবং যুক্তি গ্রাহ্য উত্তর পাওয়া যায়। ইতিহাসের মূলগত ভিত্তি হল মানুষ। একটা বিশেষ লক্ষ্যে এই মানুষের ক্রিয়াশীলতাই মূলঅর্থে ইতিহাস। তবে কার্য কারণ তত্ত্ব ব্যতীত ইতিহাসের কোন মূল্য সেই অর্থে নেই।
যদি দার্শনিকের ভাষায় বলতে হয় তাহলে বিষয়টিকে এইভাবে বলা যেতে পারে।
প্রকৃত অর্থে ইতিহাস কিছুই করে না, এ (ইতিহাস) 'কোন বিরাট সম্পদের অধিকারী ও নয়', এ (ইতিহাস) 'কোন সংগ্রাম ও পরিচালনা করে না'। এটা কেবল মানুষ, বাস্তব, জীবন্ত মানুষ যে সব কিছু করে, যে সব কিছুর অধিকারী এবং যে সংগ্রাম করে, 'ইতিহাস' কোন বিচ্ছিন্ন সত্তা নয় যে মানুষকে নিজের লক্ষ্য সাধনে ব্যবহার করে, ইতিহাস নিজস্ব লক্ষ্যসাধনে মানুষের ক্রিয়া কর্ম ছাড়া আর কিছুই নয়।
"ক্ষেত্র কর্ষন পরিশ্রম সাধ্য কার্য হইলেও, সেই কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ-বপন ও উপযুক্ত সেচনাদির দ্বারা অঙ্কুরিত বীজের রক্ষণ এবং পরিবর্ধন অধিকতর পরিশ্রম সাধ্য ও বিবেচনা সাপেক্ষ। অঙ্কুরিত শয্যের আপদ অনেক। সেই সমস্ত আপদ হইতে রক্ষা করিয়া শষ্যকে ফলোম্মুখ করিয়া তোলা বড়োই দক্ষতা সাপেক্ষ। যে সময়ে জল সেচনের প্রয়োজন তখন জল, যখন আতপ নিবারণের প্রয়োজন। তখন ছায়ার ব্যবস্থা আবশ্যক। এই সমুদয়ের কোনো একটির অভাবেই কষিত ভূমি শস্যশালিনী হইতে পারে না।" (আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বঙ্গ দর্পন, পৃঃ ৫২২) ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে ও এই বিষয়টি আবশ্যক হয়। নতুবা উপাদানগুলি আবর্জনাজনিত ক্ষারদাহে দন্ধীভূত হতে বাধ্য।
প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল (১৯২৪-২০০৫ খ্রীঃ) একজন গদ্যকার হলেও এক অর্থে ইতিহাসকার। তাঁর ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপট জীবনবোধের মূল্যায়ন এবং সমাজভুক্ত মানুষের ক্রিয়াশীলতা। এখানে বস্তুবাদী উপাদানের উপায় ও উপাদানের সম্পক মুখ্যত ক্রিয়াশীল। এই সত্যকে কোন ভাবে অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু এই প্রয়োজন কেবলমাত্র ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে নয়, সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রযোজ্য। তবে একথা বলতে কুণ্ঠা বোধ করা উচিত নয় যে কেবলমাত্র ভাববস্তু এবং মনোভঙ্গির ক্ষেত্রেই নয়, প্রকরনগত দিক থেকেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ও লক্ষ্যণীয় ভাবে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। গদ্যরীতির প্রবর্তন, শব্দের ব্যবহার, রূপক প্রতীক প্রয়োগ এবং প্রকরণ গত বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের এই উত্তরণ ঘটেছিল। নারায়ণ সান্যালের গদ্যরীতিতে এই প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। মনে হয় তিনি জীবনানন্দের ভাষাতে'ই বলতে চেয়েছেন -
স্বপ্ন নয় - শান্তি নয় - ভালবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়।
আমি তারে পারি না এড়াতে। - ধূসর পাণ্ডুলিপি।
সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী 'সাহিত্য বাস্তব ও কল্পনা' প্রবন্ধে প্রগতি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছেন বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির সঙ্গে ঐতিহাসিক ভবিষ্যতের গতিপথে স্থিরলক্ষ্য কল্পনার শুভদৃষ্টিক।
তাঁর ভাষায়, 'সাহিত্যিক সামাজিক অগ্রগতির কাজে সহায়তা করতে পারেন যদি তিনি সার্ব্বজনীন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কাল্পনিক দৃষ্টিকোনকে সংযুক্ত করে ইতিহাসের সমগ্র রূপের সঙ্গে তার সামজ্ঞস্য স্থাপন করেন।' (সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯৯১ : ৪৭)
সুতরাং এই অর্থে যদি নারায়ণ সান্যালের সাহিত্যের লক্ষ্য এবং প্রধান লক্ষণ গুলিকে বিশ্লেষণ করা হল তাহলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি উঠে আসে। যেমন
১। নারায়ণ সান্যালের সাহিত্য হল দেশকাল এবং সমাজ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন অর্থাৎ সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
২। তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে রয়েছে গনমানুষের জীবন।
৩। তাঁর সাহিত্যের মর্মবস্তুতে নিহিত রয়েছে শুভত্বময় রূপান্তরের আদর্শ।
৪। তাঁর সাহিত্যে জীবন ও জগৎকে দেখানো হয়েছে প্রগতিশীল বিশ্ববিক্ষার আলোকে।
ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়'এর মতে, তথ্য পরিবেশনায় থাকবে বিজ্ঞানমনস্কতা, ঘটনা উপস্থাপিত হবে সেই কালধর্ম নির্ভর বাস্তবতার নিরিখে..... আর দৃষ্টিভঙ্গিতে থাকবে সেই মূল্যজ্ঞান যাতে নিহিত 'ভাল ভাবে এবং আরো ভাল ভাবে জীবন চালাবার ইচ্ছা।' (প্রাগুক্ত, ১৯৯১: ১-৬)।
এই অন্ধকার আমাকে কী করে ছোঁবে?
পাহাড়ের ধূসর স্তব্দতায় শান্ত আমি,
আমার অন্ধকারে আমি
নির্জন দ্বীপের মতো সুদূর.....। - সমর সেন, মুক্তি।
অনুসন্ধিৎসু কথাকার নারায়ণ সান্যাল তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার প্রশ্নে ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্রের অনুসারী। প্রসঙ্গত স্মরণ যোগ্য যে বৌদ্ধ যুগ ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ এবং এই যুগ ব্যতীত ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা তথা মূল্যায়ন করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। সর্বোপরি এই যুগ ভারতীয় উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর ইতিহাসকে ও নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।
নারায়ণ সান্যাল 'আনন্দস্বরূপিনী' উপন্যাস (রচনাকাল ১৯৭৭ এবং গ্রন্থপ্রকাশ ১৯৭৮ খ্রীঃ) বৌদ্ধ যুগের পটভূমিতে রচিত। মূল অর্থে ভারতের ইতিহাসে সুবর্ণযুগ অর্থাৎ গুপ্ত যুগ এবং চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন'এর ভারত আগমনকাল (৩৭০-৪১৩ খ্রীঃ)।
এই উপন্যাসের মূল কান্ডারী ভারতের ইতিহাসে ব্রাত্যজন, বিস্মৃত এবং অপাংতেয়। এর মূল কারণ আমাদের অজ্ঞতা ও অযোগ্যতা। এই অযোগ্যতার বিষয় সর্ম্পকে নারায়ণ সান্যাল খেদেক্তি করেছেন আমি তো মনে করি.... বিগত দ্বিসহস্রাব্দীতে যে পরিব্রাজকটির নাম স্মরণে আসা সঙ্গত, তিনিই আমার কাহিনীর ইতিহাস উপেক্ষিত নায়ক যাঁর নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে দ্বিধায় সঙ্কোচে মধ্যপথে নেমে পড়েছি।
ঔপন্যাসিক নারায়ণ সান্যাল আরও বলেছেন,... ভারতের ইতিহাস চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন যতটা সমুজ্জল মহাভিক্ষু কুমার জীব ততটা স্বীকৃতি পাননি। কাব্যে-উপেক্ষিত-র মতো সেই ইতিহাস উপেক্ষিত কুমারজীবকে এ কাহিনীর প্রধান চরিত্র বা নায়ক করতে চেয়েছিলেন। কী জানি হয়তো তাঁর অপেক্ষা অক্ষুমতীই বেশি প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
কবির ভাষায় এইভাবে বলা যেতে পারে হয়তো -
এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,
প্রত্যেক নিভূত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি।
কাহিনীর স্থান - মূল রেশম সড়ক (কেন্দ্রীয় সিল্ক রুট), কুটী নগর এবং কাশগড় অঞ্চলের মধ্যবর্তী অংশ।
তাকলামাকান মরুভূমির উত্তর সীমান্তলীন পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত তারিম নদীর উত্তর উপকূল। তবে ভারত এবং চীনের মিলনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা সব থেকে বেশী। তবু ও অসংখ্য প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে ভগবান বুদ্ধ প্রবর্তিত সন্ধর্মের বর্তিকা উপস্থিত হয়েছিল চীনে।
ন হি বেরেন বেরানি, সম্মন্তীধ কুদাচনং।
অবেরেন চ সম্মন্তি, এস ধম্মো সনন্তনো ।।৫।। - ধম্মপদ, যমকবর্গো পঠমো।
ভগবান বুদ্ধের ধর্ম কখনই শোনিতের প্রবাহ ধারায় আশ্রিয় হয়ে বিশ্বের আঙিনায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। এর মূল কারণ সদ্ধর্মের প্রতি অনুশাসন। 'দীর্ঘনিকায়' এর সঙ্গিতী সুত্তম্ভ'তে ভগবান বুদ্ধ চিত্তশুদ্ধির চতুমার্গের কথা বলেছেন মৈত্রী, করণা, মুদিতা এবং উপেক্ষা।
মহাকবি অশ্বঘোষ বিরচিত 'বুদ্ধরচিত' কাব্যের ১৩তম সর্গ, ললিত বিস্তর কাব্যের ২১তম অধ্যায় এবং জাতক নিদান কথা'র অবিদুর নিদান'এ ভগবান বুদ্ধের মারবিজয় কাহিনী অসামান্য কাব্য সুষমায় পরিপূর্ণ।
এরপর মোক্ষ শত্রু পুষ্পধনু কামদেব তাঁর তিন পুত্র এবং তিন কন্যা সহ বোধিবৃক্ষতলে উপবিষ্ট বোধিসত্ত্বের ধ্যান বিনষ্ট করতে সসৈন্যে উপস্থিত হলেন। মার সৈন্যের ভয়ঙ্কর রূপ বোধিসত্ত্বের চিত্তকে বিচলিত করতে পারল না। অতঃ পরাজিত পুষ্পধনু (মার) সসৈন্যে পলায়ন করলেন। মার বিজয়ী বোধিসত্ত্ব প্রভাতের সূর্যের ন্যায় আলোকিত হলেন। (বুদ্ধচরিত, ১৩তম সর্গ)
চীনে সদ্ধর্ম প্রবেশের পর ফা-হিয়েন, সুয়াঙ জ্যাঙ (হিউয়েন সাঙ), ই-সিং সদ্ধর্মের শিক্ষালাভের অভিপ্রায়ে অতি দুর্গম পথ অতিক্রম করে ভারতে উপস্থিত হয়েছিলেন। অপরদিকে ভারত হতে চীনে গিয়ে ছিলেন ধর্মরত্ন, কুমারজীব, বুদ্ধভদ্র, ধর্মগুপ্ত, বজ্রবোধি প্রমুখবিদ এবং পরিব্রাজক বিস্মৃত প্রায়।
কাহিনীর সূত্রপাত রেশম পথের মাধ্যমে কুচি এবং কাশাগড় অঞ্চল। গুপ্তযুগে কাশ্মীর রাজার ব্রাহ্মণ অমাত্যের পুত্র কুমার নারায়ণ সংসার জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভগবান বুদ্ধের সদ্ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই সময় মহাযান মতাদর্শ ভারতীয় বৌদ্ধভিক্ষুদের একাংশের হাত ধরে তিব্বত এবং চীনে উপস্থিত হয়েছিল। এক সময় কুমার নারায়ণ কুশীজনপদের রাজা পো-সান্তের ভগিনী জীবার পানি গ্রহণ করেন। এই বিষয়ে নারায়ণ সান্যাল লিখেছেন -
.....এর পরের প্রকৃত ইতিহাস হারিয়ে গেছে, কিন্তু পরিনাম দেখে অনুমান করা যায়, মার বিজয়ীর রাজ্যে পঞ্চশর পুনরায় সফলকাম হয়েছিলেন।
কুমার নারায়ণ এবং জীবা'র দাম্পত্য জীবন ছিল ক্ষণস্থায়ী। এক সময় জীবা'র কোল আলো করে উপস্থিত হয় একটি পুত্র সন্তান। পিতা-মাতার নাম অনুসারে সেই পুত্রের নামকরণ করা হয় কুমার জীব। কিন্তু সাংসারিক বন্ধন হতে মুক্তি লাভের বাসনায় কুমার নারায়ণ ভিক্ষু বুদ্ধ স্বামীর (কুচী'র সংঘারাম প্রধান) নিকট উপসম্পদা গ্রহণের যাচনা করলেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভগবান বুদ্ধের সেই অমোদ বাণী যা ধম্মপদ'এ সংরক্ষিত আছে -
পুম্ফানি হেব পচিনন্তৎ, ব্যাসত্তমনসৎ নরৎ।
সুত্তং গামং মহোঘো ব, মচ্চু আদায় গচ্ছতি।।৪৭।।
যেভাবে নদীর সুবিশাল জলপ্রবাহ নিদ্রারত গ্রামকে বয়ে নিয়ে চলে যায়, ঠিক সেইভাবে কামভোগরূপ পুষ্পকে চয়নকারী তথা তাতে আসক্ত পুরুষকে মৃত্যু ধরে নিয়ে যায়।
ফলে মারের বন্ধনকে ছিন্ন করে কুমার নারায়ণ স্বপরিবারে উপাসম্পদা গ্রহণ করলেন। জীবা তাঁর শিশু পুত্র কুমার জীব সহ আশ্রয় গ্রহণ করলেন ৎ-সিয়াও লী সংঘারামে। অতি শৈশবকাল হতে কুমার জীব অসাধারণ মেধা সম্পন্ন ছিলেন। তিনি মাত্র ৬ বৎসর কালে পালি এবং সংস্কৃত ভাষায় বৌদ্ধ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। কুমার জীব ২০ বৎসর কালে উপসম্পদা গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ৩০ বৎসর কুচী'তেই ধর্মজীবন অতিবাহিত করেন। একসময় তিনি ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন, ব্রাহ্মণ্যবাদী দর্শন, জৈন দর্শন এবং অন্যান্য ব্যবহারিক বিদ্যাশিক্ষা আয়ত্ব করেন।
অত্তা হি অত্তনো নাথো, কো হিনামো পরো সিয়া।
অত্তনা হি সুদন্তেন, নাথং লভবিদুল্লভং ।।১৬০।। - ধম্মপদ, অত্তবঙ্গো।
মনুষ্য স্বয়ংই নিজের স্বামী (উদ্ধারক)। অপর কেউই তার স্বামী হতে পারে না। সর্বপ্রথম নিজেকে উত্তম রূপে দমন করার পরেই সেই মনুষ্য দুর্লভ নাথকে (নির্বাণ) লাভ করতে পারেন।
কালের রথচক্র এগিয়ে চলে।
এক সময় কুমার জীব হয়ে ওঠেন মহাজ্ঞানী, মহাতাপস বৌদ্ধ অর্হৎ। তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন কুচী নগরে। কাশগড়ে ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ কালে ভিক্ষু আনন্দকে প্রদত্ত পিন্ডাচরণের (ভিক্ষাপাত্র) পাত্রটি আবিস্কৃত হয়। কাশগড় রাজা এই সংবাদে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। তিনি উক্ত ভিক্ষাপাত্রটি সংরক্ষণের নিমিত্তে স্তুপ নির্মাণ করলেন। রাজ আদেশে কুমার জীব ভিক্ষুকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি রাজী হন। যাত্রাকালে ভিক্ষু'র সঙ্গী হন ভিক্ষুণী জীবা, রাজকন্যা অক্ষুমতী এবং শ্রবণা। প্রত্যাবর্তন কালে তাঁরা তারিম নদীর উপনদী অক্ষু'র স্রোত ধারা অতিক্রম করেন। স্রোতধারার নাম জিজ্ঞাসা কালে কুমারজীব বলেন 'আত্মানং বিদ্ধি'। অর্থাৎ 'আত্মদর্পণ স্বরূপিনী'। এক্ষেত্রে আমরা কুমারজীব'এর বক্তব্যটি আমরা উদাহরণ রূপে গ্রহণ করতে পারি-
নদী ও নারী অভিন্ন আত্মা। অক্ষুনদীর আর অক্ষুমতীর তুলনা এক্ষেত্রে ত্রুটিহীন। এই নদীর স্রোতরেখা ধরে যদি চলতে থাক উপনীত হবে ব্রাঘাশকোল হ্রদের উপকূলে সেখানে পৌঁছে স্থির হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়বে অক্ষু।...তার অচঞ্চল জলে নির্মেঘ আকাশের সবটুকু নীলিমাই প্রতি বিম্বিত। নদী-নারীর সার্থকতাও মহাসঙ্গমেই। সুপ্রবুদ্ধতনয়ার সার্থকতা যেমন রাহুল মাতায়।
ভিক্ষু কুমার জীব'এর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না শ্রবণা। তখন কুমার জীব ভিক্ষুণী জীবার জীবনের তিনটি পর্যায়কে উল্লেখ করলেন যা অত্যন্ত গভীর এবং ইঙ্গিত পূর্ণ ও বটে।
যো চ বুদ্ধং চ ধম্মং চ, সঙ্ঘং চ সরণং গতো।
চত্তারি অরিয়সচ্চানি, সম্মপ্পঞঞায় পখতি।।
যিনি বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের শরণাগত হন, তিনি সম্যকপ্রজ্ঞা দ্বারা চার আর্যসত্যের সাক্ষাৎকার করেন।
কুচীর প্রধান সংঘারাম ওয়েন-সু এবং ভিক্ষুনী বিহারের দ্বায়িত্বে ছিলেন বুদ্ধ স্বামী মহাস্থবির। তাঁর পরিনির্বাণের পর কুমার জীব সেই পদে আসীন হন।
আনন্দ 'স্বরূপিনী' উপন্যাসের গতিপথ এক সময় অক্ষু নদীর ন্যায় হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে।
উপন্যাসকার রাজকন্যা অক্ষুমতী ও কাশ্মীরী রূপবান যুবক বুদ্ধযশা'এর প্রেম বিরহের কাহিনী অতিসুন্দরভাবে অঙ্কন করেছেন। এক্ষেত্রে 'পূর্বরাগ' কবিতাটি অবশ্যই স্মরণযোগ্য -
সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।।
অতি পরিচিত বলিয়া মনে হয়,
পরান পিঞ্জরীর যেন সোনা পায়।
কেবা সে রূপের আখি দেখাইল,
কেবা সে অঙ্গের গন্ধ শুকাইল,
আকুল করিল মোর প্রাণ।
সই কেবা শুনাইল শ্যান নাম।।
চন্ডীদাস কহে, রাধার পিরিতে,
সতত সে রসে ভোরা।
নারায়ণ সান্যাল বুদ্ধযশা এবং রাজকন্যা অক্ষুমতীর নিবিড় নৈকট্য প্রদানের নিমিত্তে প্রকৃতির বিরূপতার সহায়তা গ্রহণ করেছেন। প্রবল ভূ-আন্দোলনের প্রভাবে সমগ্র ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে, সহযোগী অশ্বসমূহের কোন চিহ্ন মাত্র নেই। তমসাচ্ছন্ন রাতে সন্ন্যাসীর একটি পার্বত্য গুম্ফা জেগে আছে। সেখানেই রাত্রি যাপনের সংকল্প করলেন অঙ্কুমতী ও বুদ্ধযশা। রাত্রির অন্ধকারে উদাসী নক্ষত্রের চিত্র.....।
ঘণীভূত হল রাত্রি। বাহিরে নীরন্দ্র অন্ধক্র। শুধু নির্মেঘ এ কোন নির্জন বাসর সজ্জা। ... লক্ষ লক্ষ দিব্যঙ্গনা। সব্বাই। উপন্যাসিক বিষয়টি অতি মনোজ্ঞভাবে উপস্থাপনের পথে এগিয়েছেন আকাশে অতন্দ্র প্রহরায় লক্ষ লক্ষ তারকা। যেন এ কোন পার্বত্য গুম্ফা নয় কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে প্রতীক্ষারত। স্বাতী, শ্রবণা, চিত্রা, রেবতী, অরুন্ধতী
কিন্তু মার উভয়কেই পরাভূত করতে অক্ষম। বুদ্ধশাসন বিজয়ী হল। রাজকন্যা অক্ষুমতী এবং বুদ্ধযশা বুদ্ধশাসনে প্রব্রজিত হলেন।
সময়কাল ৩৮২ খ্রীষ্টাব্দ।
ভারতে তখন গুপ্ত যুগ, শাসন কর্তা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। এই সময় কুমার জীব বৌদ্ধ দর্শন জগতের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র তখন তিনি বুদ্ধপ্রায়।
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইতেছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিশ মোরে ফেলি তার জাল-
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহুদূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখর চূড়ায়।
রথের চঞ্চল বেগ হওয়ায় উড়ায়।
আমার পুরানো নাম। (শেষের কবিতা)
পরথ থেরবাদী বৌদ্ধ সম্রাট ফু-কিয়েন মহাযান মতের ব্যাখ্যা শ্রবণের অভিপ্রায়ে মহাভিক্ষু কুমার জীবকে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্দেশ্যে কুচী রাজ দরবারে দূত প্রেরণ করলে কুচী রাজা সেই প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। কারণ বৃদ্ধ কুমার জীবের পক্ষে ভয়াবহ গোবি মরুভূমি অতিক্রম করা সম্ভবন ছিল না। চীনা সম্রাট ফু-কিয়েন তখন তাঁর বিপুল সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে রওনা করলেন। কুচীরাজ পো-সাঙ ও পরাক্রান্ত চীনা সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। অনিবার্য ক্ষয়ক্ষতি এবং রক্তপাত এড়াতে কুমারজীব তাঁর বেশ কিছু পুঁথি সহ কুচী ত্যাগ করলেন।
যথা বুদুলকং পসসে, যথা পসসে থরীচিকং।
এবং লোকং অবেকখন্তং, মজুরাজা ন পসসতি ।।১৭০।।
যদি সাধক এই সংসারকে জল বুদবুদের ন্যায় বিনাশী এবং মৃগমরীচিকা তুল্য ভ্রমাত্মক মনে করেন তাহলে এই রূপ পরম সাধকের প্রতি মৃত্যু দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারেন না।
কুমার জীব এই ঘটনার ১০ বৎসর পূর্বে অক্ষুমতী'তে ধম্মপদের এই গাথা শুনিয়েছিলেন।
কুমার জীব একসময় চীনের অবৌদ্ধ হন সেনাপতি হো-লুসুন নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে চীনে নিয়ে যেতে অনুরোধ করলেন এবং বন্দি ভিক্ষুদের মুক্ত করতে বললেন। তখন সেনাপতির নির্দেশে কুমার জীব'এর প্রতি অমানবিক লাঞ্ছনা। তিনি পার্বত্য উপত্যকা দেখলেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমি এক ভয়াবহ বুচ্যুৎসবে নিশ্চিহ্ন।
এই স্থানে ঔপন্যাসিক বলেছেন, কুয়াশাচ্ছন্ন কুমার জীবের সংগৃহীত ইতিহাসে বর্বর হুন সেনাপতির হাতে তাঁর দৈহিক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ নেই। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে......
এক্ষেত্রে তিনি বলেছেন -
....আপনারা অনুমতি করলে 'নানা কারণে' কীভাবে তিনি 'চীনা সেনাপতির বিশ্বাসভাজন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন' তার কল্পিত চিত্র আঁকতে পারি।
উপন্যাসে একসময় উপস্থিত হন ভারতে প্রথম পরিব্রাজক ফা-হিয়েন। ঔপান্যাসিক নারায়ণ সান্যালের মতে, ফা-হিয়েন সদ্ধার্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে ভারতকে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের দৃষ্টিকোণ অনুসারে দেখেছিলেন।
প্রখ্যাত মার্কসবাদী কথাসাহিত্যিক সত্যেন সেন 'কুমারজীব' নামক একটি উপন্যাস (১৯৬৯ খ্রীঃ) লিখেছিলেন। চীন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ এইরূপ ভারতবর্ষ বৌদ্ধধর্মের জন্মভূমি। বিরাট দেশ, বিপুল তার জনসম্পদ। এই বিরাট শক্তির আধার বলেই ভারতবর্ষ তাঁর ধর্মকে তাঁর চতুর্দিকের দেশগুলিতে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।... এই ধর্ম তাঁর বিশুদ্ধ রূপ নিয়ে যদি চীনের মধ্যে সু-প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তবে এখান থেকে ও হাজার হাজার প্রচারক নিকট ও দূরের দেশগুলির মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারবে। সেই সুদিনের কথা মনে করে দেখ এবার, সেদিন ভারতবর্ষ আর চীন এই দুই সূর্যের আলোয় সমস্ত পৃথিবী উদ্ভাষিত হয়ে উঠবে।
মহা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন (৪১৩ খ্রীঃ) তখন কুমারজীব'এর বয়সকাল ৯১। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে কুমারজীব পরিব্রাজকের প্রত্যাবর্তনের বছরের পরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। কবির ভাষায় শতাব্দীর সূর্য হল অস্তমিত, কালের অমোঘ নিয়মে....।
আনন্দ স্বরূপিনী কি ভগবান বুদ্ধের প্রিয় শিষ্য ভিক্ষু আনন্দের প্রতিরূপ?
না কি কুমার জীব'এর প্রিয় শিষ্যা ভিক্ষুনী অক্ষুমতী'র জীবনালেখ্য? এর উত্তর অনুসন্ধানের দ্বায়িত্ব ঔপন্যাসিক পাঠকের হাতেই তুলে দিয়েছেন।
অজন্তা-অপরূপা
বৌদ্ধ-স্থাপত্য ইতিহাস অনুসন্ধানের এক কালজয়ী সাহিত্য চিন্তা। অজন্তার উপাখ্যান সম্পর্কে নারায়ণ সান্যাল বলেছেন-
অজন্তা দেখে এসে 'অপরূপা অজন্তা' রচনা করতে আমার তিন বছর সময় লেগেছিল। যে গ্রন্থের ভূমিকায় আমি কৈফিয়তে বলেছিলাম, দেবদূতরা ও সেখানে সন্তপর্ণ পদ সঞ্চারে সঙ্কুচিত, সেখানে কেন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছি, তার কৈফিয়াৎ দিতে বসে প্রথমে সেই দেবদূতদেরই কৈফিয়াৎ দাবি করার ইছে জাগছে। পৃথিবী যদি আজ ভারতকে জিজ্ঞাসা করে, তোমার ওখানে কোন স্থাপত্য কীর্তি দেখতে যান?
তাহলে জবাব আসবে অজন্তা-ইলোরা....। পৃথিবী তাই দেখতে আজও ভারতে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, সেই অজন্তাকে দেখবার, বোঝাবার কোনো আয়োজন আমরা করিনি। অজন্তায় প্রতি বছর লক্ষাধিক দর্শক আসেন, অজন্তার নামে সরকার লক্ষাধিক মুদ্রা প্রতি বছর ব্যয় করেন, তবু অজন্তা বিষয়ে প্রকৃত গাইড বই আজও ছাপা হয় নি।
- ভুল তথ্যে ভরা কিছু নিম্নমানের পুস্তিকামাত্র অজন্তার কাছে পিঠে পাওয়া যায়। ইউনেস্কোর এ্যালবাথে কিছু ভালো ছবি আছে, কিন্তু তাদের কোনো পরিচয় নেই।
জাতক কাহিনীগুলির সাথে ঐ চিত্রগুলির কি সম্বন্ম, কোথায় তাদের অবস্থিতি, তা উপলব্ধি করা যায় না।
প্রথমদিকে বইটির নাম 'অপরূপা-অজন্তা' হলেও পরবর্তীতে নাম পরিবর্তিত হয়ে 'অজন্তা-অপরূপা' হয়। বইটির ইংরাজী অনুবাদটির নাম 'ইমমর্টাল অজন্তা'। 'অজন্তা-অপরূপা'র সর্বমোট পরিচ্ছেদ সংখ্যা-১১, অজন্তা সম্পর্কিত নারায়ণ সান্যালের নিজের অংকন ১২৪টি। প্রথম পরিচ্ছেদ'এ রয়েছে অজন্তার পরিচয়।
দ্বিতীয় হতে সপ্তম পরিচ্ছেদ'এ অজন্তার বিভিন্ন গুহা বৌদ্ধ বিহার সম্পর্কিত বর্ণনা প্রদত্ত হয়েছে। অষ্টম পরিচ্ছেদ'এ রয়েছে অজন্তার স্থাপত্যের ক্রমবিবর্তন, চিত্র বিশ্লেষণের বিবরণ রয়েছে নবম পরিচ্ছেদ'এ।
দশম পরিচ্ছেদ'এর বিষয়বস্তু প্রাচ্য স্থাপত্য শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে অজন্তা অন্তিম অর্থাৎ একাদশ পরিচ্ছেদ 'অন্তিম প্রনাম'।
আমার এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় অজন্তা আলেখ্য বিনির্মান।
বুদ্ধকালীন ভারতীয় ভূগোল হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাব এবং তাঁর প্রবর্তিত ‘ধম্ম’ তৎকালীন ষোড়শ মহাজন পদ এর শ্রেণী চরিত্র তথা আর্য সামাজিক পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণ অর্থে পরিবর্তন করেছিল। ফলে এক সময় বৌদ্ধ ধর্ম রাজানুগ্রহ লাভ হতে বিঞ্চিত হয় নি। বৌদ্ধ ধর্মের জনপ্রিয়তা ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পকে চরম সীমায় উন্নীত করেছিল। অপর অর্থে এই স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষতাকে বৌদ্ধ স্থাপত্যকলার যুগ ও বলতে পারি।
মহামতী অশোকের সময়কালে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণের সেইরূপ কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। এর মূল কারণ ছিল থেরবাদী পরম্পরা অর্থাৎ মূলবুদ্ধ বচনের সিদ্ধান্ত। এই সময় ভারতীয় স্থাপত্যে বিমূর্ত ভাবধারা ফুটে ওঠে। যেমন বোধিবৃক্ষ, স্তুপ, চৈত্য ইত্যাদি। মহাযান মতবাদ প্রচারিত হওয়ার ফলে ভারতীয় স্থাপত্যের চরিত্র ও ক্রমশ পরিবর্তিত হতে থাকে গান্ধার শিল্পকলা হতে বাংলার পাশ যুগ এর উজ্জ্বল উদ্ধার। তক্ষশিলা, নালন্দা, বিক্রমশিলা, জগদ্দল, সোমপুর এবং পাহাড়পুরে গড়ে ওঠে বিহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়। মগধ শিল্পকলার যুগে সাঁচী, লেনী এবং মহারাষ্ট্র অঞ্চলে নির্মিত হতে থাকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপাসনা কক্ষ, বুদ্ধ মূর্তির জীবন্ত স্থাপত্য। অজন্তা’এর মধ্যে এক বিস্ময়কর স্থাপত্যকলা। যা এক কথায় কল্পলোকের স্বর্গরাজ্য। গুহার মধ্যে নির্মিত হয়েছে স্তুপ, চৈত্য, বিহার। সঙ্গে রয়েছে মনোমুগ্ধকর বৌদ্ধ চিত্রকলা। এই চিত্রকলা এবং স্থাপত্য সমূহ ভগবান বুদ্ধের জীবন সম্পর্কিত ঘটনাবলীকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
হঠাৎ বৃষ্টির দিনে ঘুরে দেখি অজন্তা আকাশ
এমন সৌন্দর্য আমি কখন ও দেখিনি
এমন সহজভাবে বৃষ্টির ঝাপটাখোলা হাসি
আর কারও ঘর ভ’রে ছড়ায়?
ঘর নয় আকাশ?
এ সেই আকাশ, যাকে কখনও দেখিনি আগে - অপরূপা অজন্তা, জয় গোস্বামী।
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের পশ্চিম দিকে অবস্থান করছে ইন্দ্রাদি পর্বত শৃঙ্খলা। পর্বতের অনেক নীচে সর্পিল গতিতে এগিয়ে চলেছে বাঘোরা নদী। তাকে বেষ্টন করে পাহাড়ের নির্জন কোলে বিদ্যমান ৩০টি কৃত্তিমভাবে নির্মিত বৌদ্ধ গুহা। যা এক সময় ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ এই অমোঘ বাণীর আলোক ছড়িয়ে দিত নিখিল বিশ্বে। এই বৌদ্ধ গুহার মধ্যে রয়েছে ৪টি গুহা চৈত্য (নং-৯, ১০, ১৯ এবং ২৬) অর্থাৎ উপাসনাকক্ষ
সুবিশাল গৃহ (আকৃতি লম্বা ক্যাপসুলের ন্যায়), গৃহের অন্তিম প্রান্তে একটি নিমগ্ন স্তুপ এবং অবলোকিতেশ্বর স্বয়ং বিরাজমান। অবশিষ্ট গুলি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শ্রমণদের কক্ষ সর্বমোট ২৬টি।
অপরূপা অজন্তার সূত্রধর নারায়ণ সান্যাল স্বয়ং।
কারণ তিনি যেভাবে বৌদ্ধ শিল্পকলার ইতিহাসকে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন তা এককতায় অনবদ্য।
৪টি চৈত্য এবং ২৬টি বিহার এতেই পরিপূর্ণই অজন্তার ইতিহাস। যা নারায়ণ সান্যালের কলমের ছোঁয়ার হয়ে উঠেছে জীবন্ত। বর্ণনা প্রদান প্রসঙ্গে উঠে এসেছে থেরবাদ এবং মহাযান যুগের বৌদ্ধ বিহারের মধ্যেকার পার্থক্য। নারায়ণ সান্যাল উপস্থাপন করেছেন তপন অর্থাৎ সূর্য গবাক্ষের কথা, বিম-বরগা, স্তম্ভ এবং অলংকরণের বিবর্তন, স্থাপত্য অনুযায়ী যুগ বিভাগ।
দীপবংস’র পরম্পরা অনুসারে বৈশালীর বজ্জিপুত্তক ভিক্ষুগণ দ্বিতীয় সঙ্গীতির সংঘ নির্ণয়কে অস্বীকার করেন এবং স্থবির অর্হত ব্যতীত অন্য একটি সভা দ্বারা নিজেদের অনুকূল স্বতন্ত্র মত প্রতিষ্ঠা করেন। উত্তরকালে এই ভিক্ষুগণ ‘মহাসাংখিক’ নামে পরিচিত হন। বৌদ্ধকলার প্রাচীন বিষয় হল বিহার এবং স্তুপ। বিনয়’তে পঞ্চবিধ ‘লয়ন’ অথবা শয়নাসনের উল্লেখ পাওয়া যায়। যাকে বিহার, অর্ধযোগ, প্রাসাদ, হ্য এবং গুহা বলা হয়েছে। (চুল্লবগ্ন, পৃঃ ২৩৬)। বস্তুতঃ বিহার হল ভিক্ষুদের সংবাস, প্রাকৃতিক গুহাবাসের প্রয়োজন একান্তচর্যা ছিল। কৃত্তিম গুহাত্মক বিহার কালান্তরে আবাসিকতা তথাএকান্তচর্যার সমাধানকে সম্পূর্ণ করে ছিল। এই প্রক্রিয়াতে ক্রমশঃ প্রস্তর-কলার বিকাশের বিষয়টি ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। স্তূপ মহাপরিনিবৃত তথাগতের প্রতীক, অতএব স্তূপ অথবা চৈত্যের উপাসনা প্রচলিত হওয়ার পর কালান্তরে চৈত্যগৃহ নির্মাণ শুরু হয়। বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে থেরবাদী মতাদর্শের অনুসারী সম্রাট অশোক ৮৪ হাজার স্তূপ এবং বহুসংখ্যক বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেছিলেন। চীনা পরিব্রাজকগণ ভারতের নানা স্থানে স্তূপ এবং বিহার পর্যবেক্ষণ পূর্বক সেগুলি অশোক দ্বারা নির্মিত বলেছেন।
সুয়াঙ জ্যঙ (হিউয়েন সাঙ) এর বর্ণনায় অজন্তার ভিত্তি চিত্র এবং গুহাবাসের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর মতে অপরান্তক অঞ্চলের অর্হত ভিক্ষু 'অচল'এর তত্ত্বাবধানে এই গুহা নির্মিত হয়েছিল। গুহার দেওয়ালে চিত্রিত বোধিসত্ত্বের লীলা চৈত্যে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধের প্রতি প্রত্যক্ষ সংকেত করে।
মহাসাৎথিকরা কালক্রমে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। মহাযান পরম্পরা মূলঅর্থে ভক্তিমার্গী মহাসাংথিক সম্প্রদায়'এর বিবর্তিত রূপ। এই সম্প্রদায় বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বকে দেবোপম লোকোত্তর রূপে চিত্রিত করেছিল এবং গান্ধার তথা মথুরাতে গ্রীক ও ভারতীয় কলার সম্পর্ক তথা ভক্তির আগ্রহ দ্বারা বুদ্ধ প্রতিমার আবির্ভাব ঘটেছিল। অজন্তার স্থাপত্য এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে।
নারায়ণ সান্যাল বিরচিত 'অপরূপা-অজন্তা'র প্রাণ ভোমরা লুকায়িত আছে দ্বিতীয় হতে নবম পরিচ্ছেদে, স্তাপত্য ভাস্কর্য এবং চিক্রকলার মৌলিক পরিচয়ে। অজন্তার স্থাপত্য মূল অর্থে যে বৌদ্ধ বিদ্যার পরিনাম এবং একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা, তা হয়তো অনেক মানুষই অবগত নন। তাই এই বৌদ্ধ গুহাগুলি নিছক ক্ষেত্র হিসেবেই রয়ে গেছে, ফলে বৌদ্ধ স্থাপত্যের বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়নি।
অজন্তা অপরূপা'র অন্তিম পর্যায়টি সম্পূর্ণ অর্থে ভিন্ন চিত্র বহন করে। নারায়ণ সান্যালের মতে বিষয়টি 'পূর্বদিকে মুখ করে স্থাপনা।' অজন্তা'র অনুভূমিক চিত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে উপলব্ধি করা যাবে যে তা মূল অর্থে অল্প ক্ষুরাকৃতি আকৃতির। অর্থাৎ প্রতিটি গুহা, চৈত্য বা বিহার, তার প্রতি সম অক্ষ বরাবর রেখাগুলি আসলে অভিসারী। ফলে বিহার বা চৈত্য গুলি একেবারে নিখুঁত অঙ্ক কষে নির্মিত হয়েছে। কোন ভুল সেই অর্থে খুঁজে পাওয়া দুস্কর।
নারায়ণ সান্যাল একজন দক্ষ বাস্তকার ছিলেন। তিনি নানাভাবে অজন্তার স্থাপনাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং খুঁজে পেয়েছিলেন সেই গাণিতিক তত্ত্ব, যার মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল 'অজন্তা-অপরূপা'। যা আজও বিস্ময় কর।
অজন্তা যেন সেই রূপকথার রাজকুমারী।
সহস্র বছরের নিদ্রা ভেঙে সভ্য জগতের দিকে
চোখ মেলে তাকালো....।
নারায়ণ সান্যাল কখনই একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যের ঘরনায় আবদ্ধ থাকেন বা আবদ্ধ থাকার চেষ্টা ও করেন নি। 'এক' দুই তিন' মূল অর্থে রাজনৈতিক ইতিহাস। স্পষ্ট অর্থে বলা যায় যে এই বইটি মূল অর্থে একটি রাজনৈতিক ম্যানিফেষ্টো। যার উৎস্থল ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত একটি উপন্যাস 'র্যানিম্যাল ফার্ম' বা পশু খামার। লেখক 'জর্জ অরওয়েল'।
'এখন বলা হচ্ছে, কমরেড গণ।'
আমাদের জীবনের ধরণটা কি রকম? সোজাসুজি বলতে গেলে আমাদের আয়ু অল্প, প্রচন্ড খাটুনী, দুর্দশার অন্ত নেই। আমরা জন্মালাম? তারপর আমাদের জন্য যে খাদ্য বরাদ্দ হয় তাতে কোনরকমে ধড়ের সঙ্গে প্রাণটুকু ধুক ধুক করে টিকে থাকতে পারে। সেই আহার্যের জোরে যারা বেঁচে থাকে তাদের জোর খাটিয়ে নেওয়া হয়। আর যে মুহুর্তে আমরা অকেজো হয়ে পড়ি সেই মুহুর্তে নিষ্ঠুরভাবে আমাদের হত্যা করা হয়। কী ভয়ঙ্কর কথা?.... পশুর জীবন মানেই দাসত্ব আর দুর্দশা এই হচ্ছে খাঁটি কথা।'
'য়্যানিম্যাল ফার্ম' অবলম্বনে 'পশুখামার' নামক নাটক। রচনাকার 'অর্পিতা ঘোষ'। কিন্তু সে তো মূল কাহিনীর অনুবাদ। নারায়ণ সান্যাল কিন্তু এপথে হাঁটেন। এক্ষেত্রে তাঁর অভিমতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-
যে ইতিহাস আমাদের শেখানো হয়েছে তার বাহিরে স্বাধীনতা উত্তর ভারতের প্রকৃতি ইতিহাসটা কী?..... আমরা পরাধীন। স্বাধীন দেশের পতাকা আছে, জাতীয় সঙ্গীত আছে, সংবিধান আছে তবু দেশের নিরন্ন মানুষ কেন এমন চরম অবমাননাকর জীবনযাপনে বাধ্য?....
এরপর লেখক তার কিছুই বলেন নি। কারণ আমাদের ব্যর্থতার ইতিহাস।
সমাজের ছাপ পড়ে শিল্প-সাহিত্যে।
না।
জলে যেমন ছায়া পড়ে, ঠিক তেমনি?
শিল্প-সাহিত্য সমাজের অকর্মণ্য ছায়া নয়।
ভষ্মলোচনের গল্প জানো?
ভষ্মলোচন যা কিছু দেখতো, তাই পুড়ে যেতো। যেদিন সে
ছায়ার মধ্যে নিজেকে দেখলো, সেদিন নিজেই সে পুড়ে গেলো। - সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
'এক' 'দুই...তিন... যেন ছায়া মানুষ। নিজেকে নিজের মধ্যে খুঁজছে বারং বার। এই নাটক বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অনুসন্ধান।
অজন্তার গুহা চিত্র একটি আলোকিত অধ্যায়
এই গুহা চিত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় জাতক। ইশানচন্দ্র ঘোষ'এর মতানুসারে 'মহাবস্তু' নামক গ্রন্থে ৮০টি জাতক কথা পাওয়া যায়। থেরবাদী (সিংহল, শ্যাম, মায়ানমার, ইন্দোচীন ইত্যাদি দেশের বৌদ্ধ) পরম্পরা অনুসারে জাতক সংখ্যা ৫৫০।
মূল জাতকে ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্ম সম্পর্কিত গাথা বিদ্যমান আছে। 'জাতকটঠ কথা'তে সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবন গাথা তো আছে, এর সাথে তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধের (বুদ্ধ বংস) জীবন গাথা ও রয়েছে।
মানবকে জাতক কথা'তে দয়নীয় প্রাণী মনে করা হয়েছে। সে যদি পাপী হয়, তাহলে সে তার পূর্বজন্মের অবিদ্যাজনিত সংস্কারের কারণে। এই অবিদ্যাজনিত সংস্কার জন্ম-জন্মান্তর মানব-জীবনের পশ্চাৎ'এ ধাবিত হয় এবং অনন্ত জন্ম পর্যন্ত চলতে থাকে। এর থেকে মুক্তিলাভ করা অত্যন্ত কঠিন, যতক্ষণ আমরা সচেতন না হব। আমরা কিভাবে সচেতন হব তা ভগবান বুদ্ধ ব্যক্ত করেছেন। জাতক'এর মূল চরিত্র দেবতা (?), যক্ষ, নাগ, প্রেত (?) ইত্যাদি'র অতিরিক্ত প্রায় সকল প্রাণী এই পৃথিবীর সাধারণ জীব। সাধারণতঃ জাতকের সকল জীব এক সূত্রে আবদ্ধ। 'মৈত্রী ধর্ম'র তাৎপর্য শুধু মানবের সঙ্গে মানবের নয়, সকল পশু পক্ষীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযুক্ত হয়েছে। এটাই ভগবান বুদ্ধের মূল শিক্ষা বা সিদ্ধান্ত।
যদিও জাতক' কথা এখানে আলোচনার বিষয় নয়। যেহেতু জাতকের সঙ্গে অজন্তা এবং বাঘ গুহার সম্পর্ক রয়েছে তাই প্রসঙ্গ ক্রমে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।
সমস্ত গুহা বিহারের দেওয়াল ও ছাদে (গুহার সিলিং'এ) অনবদ্যভাবে চিত্রায়িত হয়েছে অনবদ্য সব চিত্র জাতক কথা। নবম অধ্যায়ে (অজন্তা অপরূপা) নারায়ণ সান্যাল বিশ্লেষণ করেছেন অজন্তা চিত্রকে। সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি একেবারে সূক্ষ্ম স্থাপত্য সমালোচক এবং অনুরাগী রূপে অজন্তার গুহাচিত্র গুলিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আলোচনা প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ে গেল
শিল্পের জন্য শিল্প, না কি মানুষের জন্য....। জাতক' কথার আঙ্গিকে যদি বলতে হয় তাহলে বলব মানুষের জন্য, পৃথিবীর সকল প্রাণীর জন্য। অজন্তা'র চিত্রকলা মধ্যভারতীয় উৎকীর্ণ চিত্র পরম্পরার একটি বিকশিত এবং পরিস্কৃত রূপ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। এখানে ভগবান বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বের চরিত্র অঙ্কিত আছে তথা নিরূপণ বিধি সদৃশ্য কারণ সমান আলেখ্য প্রবেশে অনেক ঘটনার চিত্র তথা সামনে পেছনে'র বস্তুকে অযথার্থ রূপে নীচে উপরে প্রদর্শিত করা হয়েছে। ভিত্তি'তে 'চিত্রের' বিভাজন প্রায় বিচিত্র ব্যক্তির কেন্দ্রের প্রতি অভিমুখ দ্বারা সুচিত হয়। পশু বৃক্ষের চিত্রে প্রকৃতির প্রেম তথা জনসংকুল এবং উল্লেসিত জীবনের অভিব্যক্তি সাঁচীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অজন্তা'র গুহাচিত্রে নগরের বিভিন্ন দৃশ্য এক আধ্যাত্মিক আশায় দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র এবং স্তরে বোধিসত্ত্বের আদর্শ অনুসরণ সম্ভব এবং এর দ্বারা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির অভিষ্ট হতে পারে। গুহার দেওয়ালে চিত্রিত বোধিসত্ত্বের লীলা চৈত্যান্তে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধের প্রতি প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত করে।
চিত্রাঙ্কনের পূর্বে গুহার শিলাময়ী স্থানে গোময়, শিলাচূর্ণ, তুষ ইত্যাদির মিশ্রণ অত্যন্ত মসৃণভাবে লেপন করা হোত। এর উপর চুণের লেপ তথা আলেখনের পূর্বে জল দ্বারা সিক্ত করা হোত। গৈরিক বর্ণ দ্বারা রূপরেখা টেনে কালোরঙ দ্বারা তাকে আবশ্যক অনুসারে সংশোধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। উন্মীলনে উপযুক্ত রঙ যা'ই হোক না কেন সেখানে লাল এবং নীল রঙ মুখ্য ছিল। বলা হয়েছে "রেখাং প্রমংসন্ত্যাচার্যা"। অর্থাৎ আচার্যগণ রেখার সহায়তার চিত্র অঙ্কন করতেন। ওহাভিত্তিক বিপূল ভূমিতে যে নির্বাধ, নিশশঙ্ক এং নির্দোষ রূপে রেখা অঙ্কন করা হয়েছে এবং তার সহায়তায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবের ব্যঞ্জনা প্রদর্শিত হেেছ, তার সমুচিত বর্ণনা এবং প্রশংসা করা এককথায় অসম্ভব। "পতিত হয়েছে অননয়ন, নয় বিনু বাণী"। যদিও িেশয়ার চিত্র কলাতে সর্বত্র রেখাঙ্কনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অজন্তা রেখাঙ্কনে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কবির ভাষায় অজন্তার চিত্র এক অর্থে স্বতন্ত্র একটি মহাকাব্য যা রামায়ণ মহাভারতের বিপুল জনপ্রিয়তাকেও হার মানায়।
বৌদ্ধ চিত্রকলার ক্ষেত্রে অজন্তা ছিল একটি শাশ্বত প্রেরণা। মধ্য এশিয়াতে দন্দান, উলিক, কিজিল, মিরান এবং তুন ত্বংগ পর্যন্ত রে প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই নয় জাপানের বৌদ্ধ বিহারে বিনষ্ট ভিত্তি চিত্রে অজন্তার পরম্পরা উদ্ভাসিত হয়েছে। নারায়ণ সান্যালের মতে, চিত্র কাহিনীগুলি অধিকাংশই জাতকের গল্প। গৌতম বুদ্ধ পূর্ব পূর্ব জন্মে যে সব লীলা করেছেন, সেই জাতিস্মর মহাপুরুষ-কথিত সেই সব কাহিনীই জাতকের গল্প নামে পরিচিত।
সর্ব সমেত পাঁচশ'র উপর জাতকের গল্প আছে। এক এক রূপ নিয়ে বুদ্ধদেব ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন-
তাঁরা পূর্ণ বুদ্ধ নন, তাঁরা বোধিসত্ত্ব। বুদ্ধত্ব লাভের পথে বিভিন্ন জন্মচক্রের মধ্য দিয়ে তাঁরা চলেছেন এ মর্ত্যভূমে নানান লীলা করে, মহাপরিনির্বাণের পথে।
নারায়ণ সান্যাল তাঁর আলোচনা প্রসঙ্গে গ্রিফিব সাহেবের কথা উল্লেখ করেছেন। গ্রিফিব সাহেব লিখেছিলেন-
নারীচিত্র অঙ্কনে অজন্তার শিল্পী বিভিন্ন ও বিচিত্র ভঙ্গির পরিকল্পনা করেছেন। অনেকগুলি নারীচিত্র বিবসনা অথবা সেগুলি এত স্বল্প বস্ত্রাবৃত যে তাদের দেহসৌষ্ঠব সম্যক উপলব্ধি করা যায়। এমন কি পশ্চাৎ থেকে ও সম্পূর্ণ নারী দেহকে আঁকা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। এ চিত্র গুলি অধিকাংশই নষ্ট হয়ে এসেছে।
অজন্তার শিল্পী মহাজনক জাতক'এর কাহিনীর সারবস্তুকে অবলম্বন করে অপরূপ একটি চিত্র কাহিনী (১/২ক-১/ঙ) দেওয়ালে অঙ্কন করেছেন, তা নারায়ণ সান্যালের মনে হয়েছে একটি পঞ্চাঙ্ক নাটক।
.....তুমি কলমের জাদুকর অতি অল্প কথায় লাবন্য যোজনার মর্মকথা ভারি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
রূপকে যেমন পরিমিতি দেয় প্রমাণ, যথোপযুক্ত এবং যথাযথ মনোহর একটি সীমার মধ্যে আসিয়া, তেমনি লাবন্য পরিমিতি দেয় ভাবের কায়কে বা ভঙ্গীকে অদ্ভূত ও উচ্ছৃঙ্খল ভঙ্গী হইতে নিকস্ত করিয়া। ভাবের তাড়নায় ভঙ্গী ছুটিয়া চলিয়াছে উন্মত্ত অশ্বের মতো অসংযত উদ্দাম অসহিষ্ণু এমনকি অশোভন রূপে প্রমাণের সীমা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া, লাবন্য আসিয়া তাহাকে শান্ত করিতেছে....। এ অজন্তা-শিল্পীর কোন প্রয়োগ, কৌশলের কৃতিত্ব নয় এ নারায়ণ সান্যাল বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন বারংবার। তাঁর মতে ওঁদের ধ্যানের ধন, সহজাত জ্ঞানচক্ষুর দৃষ্টি!
দ্যাখো -
পৃথিবীর সবকটি হাত
রস নিতে
আলোর পাখনা মেলেছে চতুর্দিক!
সাহিত্য প্রজ্ঞা এবং নারায়ণ সান্যাল
নারায়ণ সান্যাল এক অর্থে কাল-সমান্তর। তাই শুধুমাত্র নাগরিক ক্লান্তির জীবনমনস্কতাই নয়, তাঁর সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল ইতিহাস অনুসন্ধান এবং সমকাল-সচেতনতা। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্যে অভিযোজিত হয়ে উঠে এসেছে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ইতিহাস চেতনার সূত্র। বলতে গেলে, প্রগতিশীল সচেতনতা স্পষ্টভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে এবং এর মূলে রয়েছে তাঁর ব্যক্তি জীবনের সচেতন মূল্যবোধ।
নারায়ণ সান্যাল ছিলেন একজন প্রাণবন্ত মানুষ। এমন কোন বিষয় ছিল যাতে তাঁর আগ্রহের অভাব দেখেছি। অনেক সময় আমার সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আলোচনা করতেন। এক কথায়, আলোচনার বিষয়ের অন্ত ছিল না। জীবনের নানা বিচিত্র দিকে নারায়ণ বাবু আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁর সান্নিধ্য লাভ আমার জীবনে অমূল্য সম্পদ রূপে পরিগণিত হয়েছে। আমি নানা কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। 'নালন্দা' পত্রিকার লেখা সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। (২০০৩, ২০০৪ এবং ২০০৫) তিনি কোন 'ইজম্'কে আঁকড়ে ধরেন নি। এর মূল কারণ ছিল তাঁর সাহিত্য চেতনার প্রতি অতি সক্রিয়তা। আমার মনে হয় তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন-
মাথার উপরে আসন্ন পৃথিবীর
অন্ধকার বিরহিত সূর্য-সংস্কৃত আকাশ, - একটি বুদ্ধিজীবী, গ্রহণ।
আমার কেন জানি না বারংবার মনে হয়েছে তিনি একজন 'লোকায়ত-রাখাল'। অজন্তায় তিনি অনুসন্ধান করেছেন লোকায়ত জীবনের ছবি। বস্তুত, পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার অন্তর্নিহিত বিরোধগুলির দ্বান্দ্বিক প্রতিফলনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে সমাজ জীবন, সমকালীন রাজনীতি এবং মধ্যবিত্তের শ্রেণী চরিত্রের স্বরূপ তিনি অঙ্কন করেছিলেন তাঁর গদ্য সাহিত্যে। অপরদিকে তাঁর বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে 'আনন্দ স্বরূপিনী'র ইতিহাস রচনার অনুসন্ধানে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, সাহিত্য রচনার প্রথম পর্ব থেকেই নারায়ণ সান্যাল দ্বায়বদ্ধ সাহিত্যিকের অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং এখানেই ছিল তাঁর সফলতা।
সহায়ক গ্রন্থসূচী:
১। নারায়ণ সান্যাল, এক অনুসন্ধিৎসু কথাকার, সম্পাদনা, এন জুলফিকার সৃষ্টি সুখ, হাওড়া, ২০২৫।
২। বকুল তলা পি.এল. ক্যাম্প, বেঙ্গল পাবলিসার্স, কোলকাতা, ১৯৭৮।
৩। আনন্দ স্বরূপিনী, অমর সাহিত্য প্রকাশন, কোলকাতা, ১৯৭৮।
৪। অজন্তা অপরূপা, ভারতী বুক স্টল, কোলকাতা, ১৯৭৬।
৫। চীন ভারত লং মার্চ, এ মুখার্জী অ্যান্ড কোং, কোলকাতা, ১৯৮৭।
৬। অজন্তা সুন্দরী, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, স্পাউট, কোলকাতা, ২০২৪।
No comments:
Post a Comment