Saturday, June 20, 2026

ভূমিকা

 ভূমিকা



ধম্মপদ'এর শাব্দিক অর্থ :

'ধম্মপদ' একটি সংজ্ঞাবাচক পদসমূহ। এটি পালি সাহিত্যের তিন পিটক (ত্রিপিটক)'এর সুত্তপিটকের অন্তর্গত 'খুদ্দকনিকায়' এর পনের (১৫) গ্রন্থের মধ্যে দ্বিতীয় গ্রন্থের নাম (সংজ্ঞা)। এই 'ধম্মপদ'এ দুটি শব্দ অন্তর্ভূত আছে ১। ধম্ম এবং ২। 'পদ'। 'ধম্ম' (পালি) অপভ্রংশ ভাষাতে হয় 'ধর্ম'। যদিও বৌদ্ধ এবং তথাকথিত আর্য সাহিত্যে 'ধর্ম' শব্দটি অনেক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। তবে এখানে এর সরল এবং সর্বসম্মত অর্থ 'সদাচার' (সাধুজনের নিত্য পালনীয় এবং করণীয় কর্তব্য) মনে করা উচিত। অপরদিকে 'পদ' শব্দ শাস্ত্রে দুটি অর্থে প্রয়োগ হয়েছে ১। মার্গ, যেমন 'আকাসে ব পদং নত্থি' (ধম্মপদ, গাথা ২৫৫), বা 'পমাদে মচ্চুনো পদং' (ধম্মপদ, গাথা ২১)। অতএব এই প্রমাণের প্রতি ভিত্তি করে 'পদ' এর অর্থ হয় 'মার্গ', অর্থাৎ 'ধম্মপদ'এর অর্থ হবে 'ধর্মের মার্গ'। ২। তবে এই গ্রন্থে 'পদ' শব্দ এক অন্য অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। সেই অর্থ হল কোন বচন বা বাণী। যেমন এখানে (এই গ্রন্থে) একটি গাথায় দেখা যায় যে 'কো ধম্মপদং সুদেসিতং কুসলো পুম্ফমিবপ্পচেস্সতি' (ধম্মপদ, গাথা ৪৪), এখানে 'ধম্মপদ' এর স্পষ্ট এবং সুগম অর্থ হল ধর্মসম্পৃক্ত বচন, বা ধর্মসম্পৃক্ত বাণী। ধম্মপদ গ্রন্থে ভগবান বুদ্ধের সদাচার সম্পর্কিত উপদেশ বচন বা বাণী সর্বত্র উদ্ধৃত আছে অতএব একে 'ধর্মবচন' বা 'ধর্মবাণী' এই অর্থ ব্যক্ত করা উচিত হবে।

ধম্মপদ'এর প্রতিপাদ্য বিষয় :

 বুদ্ধের ধর্মসম্বাদ তথা সদাচার সম্বদ্ধ বচন'ই এই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য (বর্ণনীয়) বিষয়। এই গ্রন্থে কথিত প্রত্যেক গাথা ভগবান বুদ্ধ কোন জিজ্ঞাসু সাধক ভিক্ষু বা উপাসক বা শ্রোতাকে, তার ঐকান্তিক হিত অনুধাবন করে ব্যক্ত করেছেন। এই গ্রন্থের সকল গাথা বুদ্ধ ভাষিত, কোন অন্য ব্যক্তির দ্বারা প্রোক্ত হয়নি।

ধম্মাপদের রচনাকাল :

যেহেতু এই গ্রন্থ ভগবান বুদ্ধপ্রোক্ত, তাহলে বুদ্ধের জীবনকাল'ই এই গ্রন্থের মান্য রচনাকাল স্বীকার করা উচিত, তবে এইরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পশ্চাৎ'এ একটি অন্য সত্য ও রয়েছে, যার কারণে পণ্ডিত তথা ঐতিহাসিকগণের মধ্যে নানাবিধ মতপার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। বিষয়টি এই যে বুদ্ধের সময়কালে এই দেশে লেখক শিল্পের প্রতি উপেক্ষাভাব অধিক ছিল। এই কারণে সেই সময় বুদ্ধ যে সকল উপদেশ প্রদান করতেন, সেগুলি তাঁর সম্মুখে উপস্থিত ভিক্ষু সংঘ, আনন্দ মহাস্থবির ইত্যাদি শিষ্য কন্ঠস্থ করতেন এবং পুনঃ পুনঃ অভ্যাস করতেন। এইভাবে বুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বৌদ্ধ সাহিত্য (পালি) স্মৃতি পরম্পরা দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।

১। অধ্যাপক ম্যাক্সমুলার'এর অভিমত :

প্রারম্ভিক সময়ে শুধু ত্রিপিটক'ই নয়, সকল বৌদ্ধ গ্রন্থ মৌখিক পরম্পরাতেই বিদ্যমান ছিল। উত্তরকালে সিংহল রাজা বট্টগামনি অভয়'এর শাসনকালে (৮৮-৭৬ খ্রী. পূর্ব) ত্রিপিটক'এর সকল গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করা হয়। 'মহাবংস' গ্রন্থে এর বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়।

২। দ্বিতীয় অভিমত :

 বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর রাজগৃহে অনুষ্ঠিত ভিক্ষুসংঘের প্রথম মহাসঙ্গীতিতে ত্রিপিটকের সকল গ্রন্থ সংকলিত করা হয়। এর বর্ণনা চুল্লবগ্গ' (বিনয়পিটক'এর খন্ধক ভাগ'এর দ্বিতীয় গ্রন্থ) তে বিস্তারিত ভাবে প্রদত্ত হয়েছে। পণ্ডিত গোবিন্দ চন্দ্র পাণ্ডের মতে, দ্বিতীয় (কালাসোক'এর সময় সম্পন্ন) এবং তৃতীয় (অশোকের সময় সম্পন্ন) মহাসঙ্গীতিতে উক্ত সংকলন শুধুমাত্র পূর্ণতা লাভ করেছিল। (বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের ইতিহাস, পৃ. ১০৫)।

উভয় মত হতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, সমগ্র ত্রিপিটক'এর সংকলন খ্রীষ্ট পূর্ব ৪৭৭ বর্ষেই সম্পন্ন হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে (৪র্থ শতাব্দী পরে) বট্টগামনি অভয়'এর আদেশে (চতুর্থ সঙ্গীতির মাধ্যমে) ত্রিপিটক লিপিবদ্ধ হয়। সংক্ষেপে, এইটি স্বীকার করা যায় যে ধম্মপদ'এর (৪২৩ গাথা যুক্ত) এইরূপ খ্রীষ্টপূর্ব ১ম শতাব্দী হতে বর্তমান ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত একইভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

অন্যান্য সাক্ষ্য :

১। বৌদ্ধ সাহিত্যে 'মিলিন্দ পঞ্হপালি' একটি প্রাচীনতম এবং সুবিখ্যাত গ্রন্থ। এর রচনা খ্রীষ্টিয় ১ম শতাব্দী মনে করা হয়। এর অনেক স্থানে ধম্মপদ গ্রন্থের উল্লেখ দৃষ্টিগোচর হয়।

২। সুত্তনিস্পাত'এর অট্ঠকবগ্গ অংশ, মহানিদ্দেস তথা পারায়ণবঙ্গ অংশে চুল্লনিদ্দেস'এর ২টি ব্যাখ্যা গ্রন্থ ত্রিপিটক খুদ্দক নিকায়'তে সংগৃহীত আছে। উভয় ব্যাখ্যা গ্রন্থে এমন বাক্যাংশ পাওয়া যায় যা শুধুমাত্র ধম্মপদ'এ বিদ্যমান। এর দ্বারা ধম্মপদ'এর দীর্ঘকালীন একরূপতা প্রমাণিত হয়।

৩। বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে সম্রাট অশোক ধম্মপদ'এর অপ্রমাদবর্গ (২য় বর্গ) বিদ্ধান ভিক্ষুগণের শ্রীমুখ হতে শ্রবণ করেছিলেন। এই সম্রাটের শাসনকাল খ্রীষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী মনে করা হয়। ফলে ধম্মপদ এই শতাব্দীর পূর্বেও বিদ্যমান ছিল তা প্রমাণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ধম্মপদ'এর রচনাকার :

ধম্মপদ'এর রচনাকার বুদ্ধ এইটি বৌদ্ধ পরম্পরার মান্যতা। আচার্য বুদ্ধঘোষ ধম্মপদট্ঠকথা'র সূচনা পর্বে অনুবাদ চতুষ্টয়'এর সঙ্গে ধম্মপদ'এর রচয়িতার সম্পর্কে লিখেছেন-

"তং তং কারণমাগম্ম, ধম্মাধম্মেসু কোবিদো।
সম্পত্তসদ্ধম্মপদো, সতথা ধম্মপদং সুভং।।
দেসেসি, করুণাবেগ সমুসসাহিত মানসো।
যং বে দেবমনুসসাং পীতিপামোজ্জবড্ঢনং।।" ধম্মপদট্ঠকথা, মঙ্গলগাথা।

এর দ্বারা এই সত্যে উপনীত হওয়া যায় যে, বৌদ্ধ পরম্পরার বিদ্ধান মণ্ডলী ভগবান বুদ্ধ'কেই এই গ্রন্থের রচয়িতা মনে করেন।

ধম্মপদ কোন গ্রন্থসমূহের অঙ্গ ?

বৌদ্ধ পরম্পরার ৩টি গ্রন্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনয়পিটক, সুত্তপিটক এবং অভিধম্মপিটক। এর মধ্যে ৫টি সুত্ত পিটকের গ্রন্থ-১। দীঘনিকায়, ২। মজিঝনিকায়, ৩। সংযুক্তনিকায়, ৪। অঙ্গুত্তরনিকায় এবং ৫। খুদ্দকনিকায়। এই অন্তিম খুদ্দকনিকায়'এর অর্ন্তগত ক্ষুদ্র বৃহৎ ১৫টি গ্রন্থ পরিগণিত আছে। এর মধ্যে ২'য় গ্রন্থটি হল 'ধম্মপদ'।

ধম্মপদ'এর বর্ণন পদ্ধতি :

১। বর্গ, ধম্মপদ'এর বর্ণবিষয়কে সংগ্রাহকগণ যমকবগ্গ, অপ্রমাদবর্গ ইত্যাদি বর্গভেদ অনুসারে ২৬ বর্গে বিভক্ত করেছেন, যার সূচী ধম্মপদ গ্রন্থের যথাস্থানে বর্ণিত হয়েছে।

২। গাথা সমূহ: বর্গভেদ দ্বারা বিভাজিত করে ৪২৩ গাথা এই গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, যার উপদেশ ভগবান বুদ্ধ জিজ্ঞাসু পুদ্গল'কে সময় সময় প্রদান করেছিলেন।

ধম্মপদ'এর আচার্য বুদ্ধঘোষ রচিত অট্ঠকথা

এই সকল ৪২৩ গাথার ব্যাখ্যা আচার্য বুদ্ধঘোষ স্বরচিত অটঠকথাতে (ধম্মপদটঠকথা) তে সিংহল দেশে ভারত হতে গৃহীত প্রাচীন অট্ঠকথার প্রতি ভিত্তি করে পালি ভাষাতে রচনা করেছিলেন। বুদ্ধ যে স্থানে, যে উপদেশ্য পুদ্গলকে, যে স্থিতিতে, যে গাথার উপদেশ প্রদান করেছিলেন এই সকল বিষয়গুলি ধম্মপদট্ঠকথাতে আচার্য বুদ্ধঘোষ ক্রমশঃ বিস্তারিত ভাবে প্রদান করেছেন, যার ফলে পাঠকের এতদ্বিষয়ক সর্ববিধ সন্দেহ নিবৃত্ত হয়ে যাবে।

ধম্মপদ বর্ণিত বিষয়বস্তু :

এই গ্রন্থে নৈতিক সদাচার'এর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তথা সেই সকল কথার বর্ণনা এখানে পাওয়া যায় যা সদাচার বৃদ্ধির সহায়ক হয়, বা এই অনুসারে চললে মানুষ তার জীবনের প্রধান লভ্য স্বদুঃখবিনাশ লাভ করতে সমর্থ হয়। এর সাথে সাথে এই গ্রন্থে বৌদ্ধ ধর্মের অন্য বৈশিষ্ট্যর বর্ণনা ও যথাস্থানে পাওয়া যায়। যেমন মনুষ্য জীবন নৈরাশ্যময়, সমস্ত সংসার দুঃখ দ্বারা পরিলুপ্ত, দুঃখ কেন হয়? এই দুঃখ হতে মুক্তির উপায় কি? দুঃখ হতে মুক্ত হওয়ার স্থিতি কি? সেই স্থিতির নাম কি? ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনাও এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। যেমন

কো ণু হাসো কিমানন্দ নিচ্চং পজ্জলিতে সতি।
অন্ধকারেন ওনাদ্ধ পদীপং ন গবেষয়!।। ধম্মপদ, গাথা সংখ্যা ১৪৬।

.....কিছুকাল পূর্বে মধ্য এশিয়ার মরুভূমি থেকে সংস্কৃত ও প্রাকৃত ধম্মপদ উদ্ধার করা হয়েছে। সংস্কৃত ধম্মপদের নাম 'উদানবর্গ'। এই উদানবর্গ একাধিক বার চীনা ও তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ধম্মপদ গ্রন্থের এইসব বিভিন্ন রূপের বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যাবে শ্রী প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ধম্মপদ ও উদানবর্গ' প্রবন্ধ (হরপ্রসাদ সংবর্ধন লেখমালা, ১৯৩১)। ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচী প্রণীত 'বৌদ্ধ ধর্ম ও সাহিত্য' পুস্তকে ও সংস্কৃত পালি ও প্রাকৃত ধম্মপদের সংক্ষিপ্ত অথচ সুষ্ঠু পরিচয় আছে। এ স্থানে তার পুনরাবৃত্তি অনাবশ্যক। (প্রবোধচন্দ্র সেন, বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন, ৭ চৈত্র ১৩৬০)।

অনেক পণ্ডিত ধম্মপদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদী গ্রন্থ গীতার সাদৃশ্য সন্ধান করেছেন। যদিও উভয় গ্রন্থের মধ্যে সাদৃশ্য অপেক্ষা বৈসাদৃশ্য'ই বেশী। যা ধম্মপদের ইতিহাস সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে ধম্মপদ সম্পর্কিত বিভিন্ন পণ্ডিতবর্গের অভিমত ব্যক্ত করা হল।

"আমরা শ্রীমদ্ভগবদগীতার যে রূপ সমাদর করি বৌদ্ধগণ ধম্মপদ গ্রন্থের তদ্রুপ সমাদর করিয়া থাকেন"।

ডক্টর সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ (ধম্মপদ ভূমিকা)।

"ধম্মপদ বৌদ্ধগ্রন্থ না হলে এদেশে তা গীতার চেয়ে কম আদর পেত বলে মনে হয় না।"
ডক্টর প্রবোধ চন্দ্র বাগচী (বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য, ৬৬)।

অনেক'এর ধারণা দম, ত্যাগ ও অপ্রমাদ 'ভাগবত সম্প্রদায়'এর মূলনীতি। এই অনুমান সত্য নয়। এগুলি বৌদ্ধ ধর্মের মূলনীতি। ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে এই সিদ্ধান্ত সত্য এবং সমর্থিত। ড. বেণীমাধব বড়ুয়া বলেছেন-

"অপ্রমাদই হল বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষার মূলনীতি বা ভিত্তি। তাঁর মতে এই অপ্রমাদ কথাটির মধ্যে তাঁর সমস্ত উপদেশের সারমর্ম নিহিত রয়েছে।” (অশোক এবং তাঁর শিলালিপি, ২৭, ২৫০)।

অপ্পমাদো অমতপদং, পমাদো মচ্চুনো পদং।
অপ্পমত্তা ন মীয়ন্তি, যে পমত্তা যথা যথা।। ২১।। ধম্মপদ, অপ্পমাদ বর্গ-২।

অপ্রমাদ (সাধনা বা চর্যাতে ভুল না হওয়া) অমৃতের পদ (মার্গ) হয়। তথা প্রমাদ মৃত্যু (র পথে গমনকারী স্থান) মার্গ হয়। অপ্রমাদী (প্রমাদ না করা পুদ্গল)র (বাস্তবিক) মরণ হয় না।

(এর বিপরীত) যে সাধক প্রমত্ত জীবন ব্যতীত করেন, তিনি (জীবিত হয়েও) মৃতের সমান হন।

ডক্টর হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর অভিমত এইরূপ -

"প্রত্যেকের নির্বাণ লাভের জন্য উদ্যম ও অপ্রমাদ অত্যাবশ্যক। ইহাই ভগবান বুদ্ধের অন্তিম বাণী।" (ভারতবর্ষের ইতিহাস, ১৯৩৪, পৃ. ৪৯)।

অগ্গ মহাপন্ডিত শ্রদ্ধেয় ধর্মাধার মহাস্থবির বঙ্গদেশে বৌদ্ধগণের মধ্যে ধম্মপদ এর প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব অনুভব করে অধ্যাপক ভাগবত মহাশয় এর ইংরেজী অনুবাদ (ধম্মপদ) কে বঙ্গাক্ষরে অনুবাদ করেন এবং ১৯৩৮ সালে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয়।

ধম্মপদের অনুবাদ ও গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন -

"ধম্মপদ মানবমাত্রেই নিত্যপাঠ্য। বৌদ্ধ উপাসকগণ প্রাতে সন্ধ্যায় ইহার কয়েকবর্গ অধ্যয়ন না করিয়া অন্নজল গ্রহণ করেন না। সাধারণের ব্যবহার সৌন্দর্যে ইহা অনূদিত হইল। ইহা কোন মৌলিকত্বের দাবী রাখে না। কেবল ক্ষুদ্র কলেবরে ধর্মপ্রাণ নরনারীর নিকট স্থান পাইবার প্রত্যাশা করে।” (১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দ)।

শ্রদ্ধের ধর্মাধার মহাস্থবির ধম্মপদ'এর অনুবাদ সম্পর্কিত কোনরূপ কৃতিতের দাবি করেন নি। তিনি মনীষী সতেন্দ্র নাথ ঠাকুর মহোদয়কে এর পথিকৃৎ (১৯০১ খ্রীষ্টাব্দ) রূপে আখ্যায়িত করেছেন। ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে অধ্যাপক শ্রী চারুচন্দ্র মহাশয় ধম্মপদের পালি অন্বয়, সংস্কৃত এবং বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে চারুচন্দ্র বসু মহাশয়'এর অনুবাদ কার্যটি ভারতীয় ভাষায় ধম্মপদের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ কর্ম।

তবে একথা অনস্বীকার্য যে উত্তরকালীন ধম্মপদ গ্রন্থের অনুবাদকগণের মধ্যে অগ্গ মহাপণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির'এর নাম অগ্রগণ্য। কারণ তিনি তো অপ্রমাদী সাধক।

পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। তিনি ছিলেন একঅর্থে সাহিত্যিক, দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক, আচার্য, শিক্ষক, মানবদরদী এবং কৃতবিদ্য পুরুষ। এ প্রসঙ্গে মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্তের একটি বিখ্যাত কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

"হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি....।"

তাঁর ন্যায় মহাপ্রতিভাধর ব্যক্তি এভূখণ্ডে বিরল। 
যার নিটক হতে সম্যক সম্বুদ্ধের উপদিষ্ট সদ্ধর্ম অবগত করতে পারবে ব্রাহ্মণের যজ্ঞাগ্নি পূজার ন্যায় সেই শিক্ষাগুরুকে সগৌরবে বন্দনা জ্ঞাপন করতে হবে। সুতরাং এই অর্থে পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির আমাদের শিক্ষাগুরু। অপর অর্থে পূজনীয় ব্যক্তির পূজা মঙ্গলজনক কাজ। আমরা তাঁর অসমাপ্ত কর্মকে সম্পাদনের মাধমে তাঁকে বন্দনা জ্ঞাপন করব। এই কর্মসম্পাদনের মাধ্যমেই সদ্ধর্মের জয় ঘোষ ধ্বনিত হবে কামনা করি।

১৯৯৭ সালে বি. এ. পড়তে  আসি, তখনও ভন্তে ছিলেন স্মৃতিতে বেশ সতেজ, ৯৮ বছর বয়সে যেন চির নবীন। তিনি আমাদের গ্রামের কথা নখদর্পণে আমার মনোজগতে যেন এঁকে দিচ্ছেন। সেগুলো এখন রেখাপাত করে। তারপর কেটেছে ২ বছর তাঁকে এশিয়াটিক সোসাইটি ড. বি. সি. লাহা স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়, তাঁর সঙ্গে এশিয়াটিক সোসাইটি উপস্থিত হওয়া এক আনন্দ অনুভূতি। তাঁকে সকলে যে সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন আপ্লুত হয়েছি। সেই অনুষ্ঠানে ড. ইউ. এন. বিশ্বাসও উপস্থিত ছিলেন। তারপর কলেজ পড়াশোনো তাঁর কাছে যেতাম তিনি জরাজীর্ণ বয়সেও ক্লান্তির অনুভব দেখাতেন না। 

২০০০ সালে তাঁর শতবর্ষ উদযাপন ২৭ জুলাই, সেটা মহাসমারোহে আয়োজন হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে সার্বক্ষণিক তাঁর সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল এটা আমার পুণ্যপারমী মনে করি। কিন্তু সেই অনিত্য তিথি কালের করাল গ্রাস একই বছর ৪ নভেম্বর তাঁর পবিত্র সূর্যাস্ত হল। ২০০১, ২৭ জুলাই একশত বছর পালন করা হয়। কেটে যায় ৪টা বছর ২০০৪ সালে পণ্ডিত ধর্মাধার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট কতৃর্ক ধর্মাধার শতবার্ষিকী ভবনের প্লেন পাশ করতে সমর্থ হই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। নানা বাঁধাবিপত্তি পেড়োতে হয়। ড. সুকোমল চৌধুরী, ড. অমল বড়ুয়া, আমি মিলে অসাধ্য কাজ করেছিলাম, দীপিকা মাসির অবদান অনস্বীকার্য। অধ্যাপক প্রজ্ঞাবংশ মহাস্থবিরের অর্থ দ্বারা এই কাজ হয়েছিল। পরবর্তীতে পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবিরের শিষ্য ধর্মবংশ মহাস্থবিরের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয় যে, তাঁর গুরুদেবের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে তাঁর সঞ্চিত অর্থ দান করবেন, আমি, ড. সুকোমল চৌধুরী, নীহার কান্তি বড়ুয়া, ড. অমল বড়ুয়া প্রমুখগণ। ২০০৯ সালে পটারী রোড নামকরণ করা হয় পণ্ডিত ধর্মাধার সরণী নামে, তাতে সর্বার্থক অবদান ও সাহায্য করেছিলেন ড. প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্র। আমাকে এই নথি নিয়ে একাধিকবার কোলকাতা কর্পোরেশন ও ড. প্রতাপ চন্দ্রের বাড়িতে যেতে হয়েছিল। সরণী নামকরণ হওয়ার হস্তাক্ষর করেছিলাম,  আমি, প্রজ্ঞাজ্যোতি ভন্তে, ড. সুকোমল চৌধুরী, ড. অমল বড়ুয়া, নীহার কান্তি বড়ুয়া, ডা. এস. কে. রায়চৌধুরী, ডা. সেন, কাউন্সিলর জয়শ্রী দেবনন্দী, এবং সাহায্য করেছিলেন ভূপতি মোহন বড়ুয়ার বড় সন্তান, প্রকাশ বড়ুয়া।  

এই বছর পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবিরের  ১২৫তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হবে এবং তাঁর অনূদিত গ্রন্থ তৃতীয় সংস্করণ পণ্ডিত ধর্মাধার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশ করছেন, ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক ও প্রকাশক ড. সুজিত কুমার বড়ুয়া মহোদয় ধন্যবাদার্হ। অলং ইতি বিত্থারেন।

সুমনপাল ভিক্ষু
অতিথি অধ্যাপক 
পালি বিভাগ ও বৌদ্ধ বিদ্যা অধ্যয়ন বিভাগ
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পালি বিভাগ
সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়।









No comments:

Post a Comment