Sunday, June 28, 2026

বৈদিক যুগের বর্ণ ব্যবস্থা ও জাতিভেদ প্রথা

 বৈদিক যুগের বর্ণ ব্যবস্থা ও জাতিভেদ প্রথা

- সুমনপাল ভিক্ষু

প্রাককথন-

ঋগ্বেদের পুরুষ সুক্ত - বৈদিক সৃষ্টিযজ্ঞের ও সংসার মণ্ডল বিস্তারের কাণ্ড কারখানা সর্বপ্রথম ঋগ্বেদের পুরুষসূক্তে পাওয়া যায়। পুরুষ- সুক্তর মূলতত্ত্বগুলির চার বেদেই দৃষ্ট হয়। যেমন ঋগ্বেদে ১০/৯০ সূক্ত, যজুবেদে ৩১ অধ্যায়ের ১-৬ ও ১১ মন্ত্র, সামবেদে ৬১৭-৬২২ মন্ত্র, অথর্ববেদে ১৯ কান্ডের যষ্ঠ সূক্তের ৪র্থ মন্ত্র।

পুরুষ সূক্তের দ্বাদশ মন্ত্র ও যজুর্বেদের ৩১ অধ্যায়ের একাদশ মন্ত্রটি এইরূপ-
ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীদ্বাহ্ রাজন্যঃ কৃতঃ।
উরু তদস্য যদ্বৈশ: পড়াৎ শূদ্রো অজায়ত।।।

অর্থাৎ এঁর মুখ ব্রাহ্মাণ হইল, দুই বাহু রাজন্য হইল, যাহা উরু ছিল তাহা বৈশ্য হইল, দুই চরণ হইতে শূদ্র হইল। চাতুর্বণ্য সম্বন্ধে গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে একবার (ত্রয়োদশ শ্লোকে) ও অষ্টাদশ অধ্যায়ে আটবার (৪১ থেকে ৪৮ শ্লোকে) উল্লেখ ও বর্ণনা করা হয়েছে।

চাতুর্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
অর্থাৎ বর্ণচতুষ্টয়' গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি সৃষ্টি করেছি। এই চারটি বর্ণ হলো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র। চারবর্ণের কাজ সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা অষ্টাদশ অধ্যায়ে আছে। সত্ত্বগুণ প্রধান ব্রাহ্মণদের স্বাভাবিক কর্ম হলো যজন, যাজন, অধ্যায়ন, অধ্যাপনা। অল্পসত্ত্বগুণ বিশিষ্ট রজঃপ্রধান ক্ষত্রিয়দের স্বাভাবিক কর্ম রাজ্যশাসন ও যুদ্ধ করা। অল্পতমোগুন বিশিষ্ট রজঃপ্রধান বৈশ্যদের স্বাভাবিক কর্ম হলো কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্য। তমঃপ্রধান শূদ্রদের স্বাভাবিক কর্ম অন্য তিন বর্ণের সেবা করা।

অষ্টাদশ অধ্যায়ে চারবর্ণের এই কর্মসমূহের বর্ণনা বিশেষ দৃঢ়তার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।
স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ।
স্বকর্ম নিয়তঃ সিদ্ধি যথা বিন্দাতি তচ্ছনু
যতঃ প্রবৃত্তিভূতানাং যেন সর্বথিদং ততম্।
স্বকর্থনা তথর্ভচ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবঃ।।

অর্থাৎ নিজ নিজ কর্মে নিষ্ঠাবান ব্যক্তি সিদ্ধিলাভ করে, স্বকর্মে তৎপর থাকিলে কিরূপে মনুষ্য সিদ্ধিলাভকরে তাহা শূন। যাঁহার হইতে ভূত সমুহের উৎপত্তি বা জীবের কর্মচেষ্টা, যিনি এই চরাচর ব্রহ্মান্ড ব্যাপিয়া আছেন, মানব নিজ কর্মদ্বারা তাঁহার অর্চনা করিয়া সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১/৪/১১' থেকে ১/৪/১২ পর্যন্ত শ্লোকে বর্ণ বিভাজনের উৎপত্তি এবং বিকাশ এইভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে-
"ব্যক্ত জগৎ যখন অব্যক্তাবস্থায় ছিল, তখন একমাত্র ব্রহ্মাই ছিল। তখন এই বর্ণভেদ ছিল না। অগ্নিসৃষ্টি করে তদ্রম্পতা প্রাপ্ত ব্রহ্মা বাক্ষণ জাতির অভিমান করায় ব্রহ্মা নামে অভিহিত হলেন। ক্ষত্রিয়াদি জাতি ব্রহ্মে অভিন্ন ছিল। সেই ব্রহ্মা ক্ষত্রিয়াদিরূপ পাক না থাকায় কর্মানুষ্ঠানে অসমর্থ অতিশয় সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মা ক্ষত্রিয় জাতির ভাবাপন্ন হলেন। তিনি ইন্দ্র, বরুণ, সোম, রুদ্র, পর্জনা, যম, মৃত্যু ও ইশান রূপে বহু হলেন। তাঁরা ক্ষত্রিয় জাতির দেবতা, তাঁরা রাজা। ইন্দ্র দেবতাদের রাজা, বরুণ জলচরগণের রাজা, সোম ব্রাহ্মণগণের রাজা, রুদ্র পশুগণের রাজা, মেঘ বিদুৎসমূহের রাজা, যম পিতৃলোকের, মৃত্যু রোগসমূহের এবং ইশান প্রভা সমুহের রাজা। এই প্রকারে দেবতা ও অন্যান্যদের মধ্যে ক্ষত্রিয় সৃষ্টি হলো। কিন্তু কেবল ব্রাহ্মাণ, ক্ষত্রিয় দেবতা থেকেও কাজ চলে না। তাই বিত্তার্জনক্ষম বৈশ্য দেবতার ও প্রয়োজন হলো। বিত্তার্জন একা হয় না বলেই তারা বহু। যেমন অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, কিন্তু পরিচারক ও তো চাই। তাই করলের শূদ্রবর্ণের সৃষ্টি।

পূবাই শূদ্রবর্ণ। যিনি পোষণ করেন তিনিই পূষা। পৃথিবীই পৃষা। (আবার ইশোপনিষদে পুষা বলা হয়েছে সূর্য কে)।
গীতা ভাষ্যের ভূমিকাতে (উপোদঘাত) বলা হয়েছে, "ব্রাহ্মণত্বস্য হি রক্ষনেন রক্ষিতঃ স্যাৎ বৈদিকো ধর্মঃ তদধীনত্বাদ বর্ণাশ্রমভেদানাম।” অর্থাৎ ব্রাহ্মণত্বের রক্ষা হলেই বৈদিক ধর্ম সুরক্ষিত থাকতে পারে কেননা বর্ণাশ্রম ভেদ তারই অধীন।

গীতার নবম অধ্যায়ে ২৬ শ্লোক থেকে ৩৪ শ্লোক'এ খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েএছ, 'মাৎ হি পার্থ ব্যাপাশ্রিত যেহপিস্যুঃ পাপযোনয়ঃ স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রান্তেহপি যাতি পরাংপতিম।।' (৯-৩২) অর্থাৎ, হে পার্থ, স্ত্রীলোক, বৈশ্য ও শূদ্র অথবা যাঁহারা পাপযোনিসম্ভূত অন্ত্যজ জাতি, তাঁহারাও আমার আশ্রয় লইলে নিশ্চয়ই পরমগতি প্রাপ্ত হন।

জাতিভেদ প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের স্পষ্ট মত নিম্নে উদ্ধৃত হল:

"জাতিভেদ সমস্যার একমাত্র যুক্তি সঙ্গত মীমাংসা মহাভারতেই পাওয়া যায়। মহাভারতে লিখিত আছে সত্যযুগের প্রারম্ভে একমাত্র ব্রাহ্মণজাতি ছিলেন। তাঁহারা বিভিন্ন বৃত্তি অবলম্বন করিয়া ক্রমশঃ বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত হইলেন। জাতিভেদ-সমস্যার যতপ্রকার ব্যাখ্যা শোনা যায়, তন্মধ্যে ইহাই একমাত্র সত্য ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা। আগামী সত্যযুগে আবার ব্রাহ্মণেতর সকল জাতিই ব্রাহ্মণরূপে পরিণত হইবেন। সুতরাং ভারতের জাতিভেদ সমস্যার মীমাংসা এরূপ দাঁড়াইতেছে উচ্চবর্ণগুলিকে হীনতর করিতে হইবে না ব্রাহ্মণজাতির লোপসাধন করিতে হইবে না। ভারতে ব্রাহ্মণই মনুষত্বের চরম আদর্শ শঙ্করাচার্য তাঁহার গীতাভাষ্যের ভূমিকায় এই ভাবটি অতি সুন্দর রূপে প্রকাশ করিয়াছেন (ভারতে বিবেকানন্দ, পৃঃ ৩০৪-৩০৬)।"
বর্ণ-ব্যবস্থার প্রারম্ভ বৈদিক যুগে হলেও এর বিবরণ স্মৃতি গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়। বৈদিক যুগে যে বর্ণ ব্যবস্থার উল্লেখ আছে তারই পরিবর্তিত রূপ পরবর্তী যুগের জাতি ব্যবস্থা। সমাজের বৃষ্টি ও জটিলতার দরুণ ধীরে ধীরে গুণ কর্মানুসারে বর্ণ ব্যবস্থার মধ্য থেকে জন্মগত জাতি ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। মনুস্মৃতিতে চার বণে৩র বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। মনু ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য বর্ণকে দ্বিজ শ্রেণীতে স্থান দিয়েছেন এবং শূদ্রবর্ণকে তার বাইরে রখেছেন। এই চারবর্ণের অতিরিক্ত কোন পঞ্চম বর্ণের তিনি নিষেধ করেছেন।

ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয়ো বৈশ্যয়ো বর্ণা দ্বিজাতয়ঃ।
চতুর্থ একজাতিস্ত শূদ্রো নাস্তি তু পঞ্চম।। - মনুস্মৃতি, (১০-৪)
তাঁর মতে এই চতুর্বিধ বর্ণব্যবস্থা বেদের দ্বারা প্রমাণিত। মনুষ্যদের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেণী শ্রেষ্ঠ। ধর্ম রক্ষার জন্য ব্রাহ্মণ বর্ণের উৎপত্তি, এবং ব্রাহ্মণ, আত্মজ্ঞান লাভ করে মোক্ষলাভের অধিকারী, ব্রাহ্মণই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব, কেননা ব্রাহ্মণ সব প্রাণীর ধর্মের রক্ষক। অন্যত্র মণু বলেছেন, ব্রাহ্মণ জল ও অগ্নির মত সর্বদাই পবিত্র এবং তাঁরা উৎপত্তির আদিকাল হতে দেবতাদের দেবতা।

ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় পরস্পরের পরিপূরক এবং পরস্পরের প্রতি আশ্রিত। বৈশ্যরা ক্ষত্রিয়ের পরেই দ্বিজস্থানীয় এবং আর্যাবর্তের আর্য্য সমাজে বসবাস করার পক্ষে উপযুক্ত, কিন্তু শূদ্রেরা দ্বিজসংস্কার হীন হওয়ার কারণে আর্যাবর্তের বাইরে অন্যত্র নিবাস করতে পারেন। পরাশর স্মৃতি অনুসারে ব্রাহ্মণেরা নিন্দার যোগ্য নন, এমন কি দুঃশীল ব্রাহ্মণ ও পূজার যোগ্য, জিতেন্দ্রিয় শূদ্রও দ্বিজ জাতির লোকদের দ্বারা পূজা বা সম্মান লাভের যোগ্য নয়।

মনুস্মৃতি (মনুসংহিতা) অনুসারে পুরুষসূক্তে ব্রহ্মার শারীরের যে যে অংশকে ব্রাহ্মম, ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র বলা হয়েএছ সেই মতানুসারে চার বর্ণের সামাজিক কার্য নিম্নলিখিত প্রকারে নির্দ্ধারিত।
১। ব্রাহ্মণের কার্য: পঠন, পাঠন, যজ্ঞ করা, দান গ্রহণ করা ইত্যাদি।
২। ক্ষত্রিয়ের কার্য: রাজ্য শাসন, প্রজা পালন, যুদ্ধ করা, দন্ড প্রদান, ব্রাহ্মণের পরামর্শ গ্রহণ।
৩। বৈশ্যের কার্য: পশু পালন, ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যজ্ঞ করান, কৃষিকার্য করা, তেজারতি ব্যবসা করা।
৪। শূদ্রের কার্য: তিনটি উচ্চবর্ণের লোকদের নিষ্কপট ভাবে শারীরিক সেবা করা।
যেহেতু ব্রাহ্মণেরা সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মুখ-স্বরূপ তাই ব্রাহ্মণেরাই জগতের স্বামী এবং তাঁদের থেকে শ্রেষ্ঠ কোন প্রাণী হতে পারে না (মনুস্মৃতি, ১.৮৭-৯১)।
যাজ্ঞবল্ক্য ও মণুর ন্যায় সমাজে ক্রমশঃ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের স্থান নির্ধারণ করেছেন। তিনি ও ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদন করেছেন এবং বলেছেন, যে ব্রাহ্মণ অধ্যাত্ম-তত্ত্ব জানেন এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। অগ্নিতে হোম করার চেয়ে ব্রাহ্মণ-রূপী অগ্নিতে হোম বা যজ্ঞ (দান) করলে বেশী ফল লাভ হয়।
তিনি কায়স্থ জাতির নিন্দা করে বলেছেন যে কায়স্থদের দ্বারা পীড়িত ব্যক্তিদের রাজার রক্ষা করা উচিত।
কায়স্থা লেখকা গণকাশ্চ তৈঃ পীভ্যমানা বিশেষতো রক্ষেৎ। যজ্ঞবন্ধ্য স্মৃতি (১.১৯৯)।
মনু বলেছেন, জন্মগত বর্ণনানুযায়ী কর্ম নিকৃষ্ট মনে হলেও সেটা স্বধর্ম হওয়ার কারণে উত্তম এবং অপর ধর্ম আপাততঃ উত্তম মনে হলেও জীবাত্মার পক্ষে অধম।

বরং স্বধর্মো বিগুনো ন পারক্যঃ স্বণুষ্ঠিতঃ।
পরধর্মেন জীবন্তি সদ্যঃ পততি জাতিতঃ।। - মনুস্মৃতি (১০.৯২-৯৩)

গীতার 'স্বধর্মে নিধনম্ শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ' উক্তির সাথে মণুর এই উক্তি তুলনীয় (গীতা ৩/৩৫)।
পরাশরের মতে শূদ্র যদি ব্রাহ্মণী গমন করে বা বেদপাঠ করে শক্তি অর্জনের চেষ্টা করে, তবে সে নরকগামী হবে (পরাশর স্মৃকি, ১.১৪-১৫)। শূদ্রের কাজ অর্থাৎ অন্য বর্ণের দ্বাসত্ব, সেবা কখনও গ্রহণ করবে না।

মহান বিপত্তি এলেও রাজার ব্রাহ্মণের প্রতি ক্রোধ করা উচিত নয়। মধু ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক আখ্যানের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদিত করেছেন। তাঁর মতে শূদ্র এবং স্ত্রীলোক কখনই ধর্ম বক্তা হতে পারে না। উভয়ের স্বাভাবিক কর্ম হল দ্বিজ জাতির দাসত্ব অর্থাৎ সেবা কর্ম করা (মনুস্মৃতি, ৯.৩১৩-৩১৯)।
ধর্ম শাস্ত্রে এবং মণু-স্মৃতিতে শূদ্রকে সমাজের সব থেকে নীচে স্থান দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে পূর্বজন্মের কর্মফল ও সংস্কার অনুসারে শূদ্রের জন্ম হয় অন্য তিনটি জাতির লোকের সেবা করা (মনুস্মৃতি, ৮.৪১৩-৪১৪)।

ঋগ্বেদের যুগে যে চতুবর্ণ ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল, পরে অর্থাৎ অর্থব বেদের যুগে তা বিধিবৎ ব্যবস্থা রূপে প্রচলিত হয়। অর্থববেদের ১৯ মণ্ডলে চার বর্ণের কার্যের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। যজুর্বেদে বর্ণিত চতুবর্ণ স্পষ্টতঃ কর্মমূলক ব্যবস্থা ছিল।

যজুর্বেদ ও অর্থববেদের যুগে চার বর্ণের মধ্যে ব্রাহ্মণের স্থান ছিল সর্বোচ্চ। অর্থববেদে ব্রাহ্মণদের মহর্ষি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বৈদিক সমাজে মহর্ষি ব্রাহ্মণদের 'বিশ্বামিত্র' (বিশ্বের মিত্র), 'বশিষ্ঠ' (পৃথিবীতে বসবাসকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ), 'ভরদ্বাজ' (অন্ন উৎপন্ন করবার ক্ষমতা সম্পন্ন), 'অত্রি' (ত্রিবিধ পাপ হতে মুক্ত) এবং 'শর্দি' (শরণদানকারী) ইত্যাদি বিশেষণের দ্বারা সম্বোধন করা হত। তৈত্তিরীয় সংহিতা'তে ব্রাহ্মণকে প্রত্যক্ষ ইশ্বরের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, কেননা তিনি ইশ্বর বিষয়ক জ্ঞান প্রদান করেন।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মার মতে শূদ্র কোনও ভিন্ন বর্ণ ছিল না; বরং আদিবাসী (মূল নিবাসী) জনগোষ্ঠীকে শূদ্র আখ্যা হয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে অর্থববেদে বর্ণিত 'আর্য্য' এবং 'শূদ্র' শব্দ ক্রমশঃ 'আর্য্য' এবা 'দস্যু' দের জন্য প্রযুক্ত হত। উত্তর বৈদিক যুগে শূদ্র চতুর্থ বর্ণের মধ্যে গণ্য হতে লাগল। শূদ্রের কর্তব্য ছিল অন্য তিন উচ্চ বর্ণের মানুষের সেবা করে জীবিকা নির্বাহ করা। বৃহদারণ্যক উপনিষদ অনুসারে, 'নৈবব্যভবংস শৌদ্রং বর্ণমসৃজত পুষণমিয়ং বৈ পুষেয়ং হীদং সর্বং পুষ্যতি যদি দং কিঞ্চ।' অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা মনুষ্য সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য বর্ণ সৃষ্টি করার পর শদ্র বর্ণের সৃষ্টি করে ক্ষান্ত হলেন।

বৈদিক যুগের অন্তিম লগ্নে শূদ্রেরা শিক্ষালাভ'এর অধিকার হতে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছিল, কেননা প্রধানতঃ তিনবর্ণের শক্তিলাভের কারণে শূদ্ররা সামাজিক অধিকার হারিয়েছিল। সূত্র যুগের প্রারম্ভে শূদ্রদের সামাজিক স্থিতি সম্পূর্ণরূপে হেয় ও নিকৃষ্ট হয়ে গেল। বৈদিক যুগে দাসেরা শূদ্র বর্ণের'ই একটি উপবর্গ ছিল। দাসেরা অনার্য এবং বিজিত জাতির মানুষ ছিল। ঋগ্বেদ সংহিতায় পুরুষ দাস অপেক্ষা স্ত্রী দাসীর উল্লেখ বেশী পাওয়া যায়।

ঋগ্বেদে ১০০ গর্দভ'এর সালে দাস-দাসী দানের উল্লেখ আছে, অর্থাৎ দাসেরা ক্রীতদাস তুল্য চল-সম্পত্তি ও পণ্ড সম্পত্তির সমান ছিল। দাস-দাসীদের প্রধান কাজ ছিল উচ্চবর্ণের গৃহস্থের গৃহে এবং কৃষি ক্ষেত্রে শারীরিক শ্রম প্রদান করা।

বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র অনুসারে শূদ্রদের ধার্মিক স্থিতি দন্ডনীয় ছিল। তাদের বেদপাঠ ও যজ্ঞ বিধান ছিল না। গৌতম বিধান মতে বেদ-মন্ত্র উচ্চারণকারী শূদ্রের জিহ্বা ছেদনের অধিকার রাজার ছিল। কেননা বেদ মন্ত্রের দ্বারা শক্তিলাভ করে তামসিক গুণ সম্পন্ন, দেহাত্মবোধ পরায়ণ, স্বার্থান্ধ শূদ্রেরা সমাজের কল্যাণ না করে রাক্ষসের ন্যায় অকল্যাণ করতে পারে। শূদ্রদের যেহেতু উপনয়ন সংস্কার হোত না তাই গুরুগৃহে বেদপাঠ ও মন্ত্রযুক্ত যজ্ঞ সম্পন্ন হতে তাঁরা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত ছিল। এই অধিকার শুধু দ্বিজদের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য) ছিল।

ব্রাহ্মণেরা শূদ্রের দ্বারা রদ্ধিত বা স্পর্শকৃত ভোজন গ্রহণ করতে পারতেন না, কেননা ঐ অপবিত্র ভোজনের দ্বারা ব্রাহ্মণের তাত্ত্বিক গুণ ক্ষুণ্ণ হতে পারে (আপস্তম্ব ধর্ম সূত্র, ১.৫.১৬.২১)।
আপস্তম্ভ বর্ণাশ্রমধর্ম রক্ষার স্বার্থে সর্বদা সবর্ণ বিবাহের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তাঁর মতে অন্য বর্ণের স্ত্রী'র গর্ভে জাত পুত্র দোষ যুক্ত হবে ও স্বধর্ম পালনে অনুত্তরাধিকারী হবে। বর্ণান্তর বিবাহের পরিনাম স্বরূপ সন্তান বর্ণ-সংকর জাতি বলে পরিগণিত হবে। বৌধায়নের মতে বর্ণসংকর জাতির লোকেরা ব্রাত্য (বেদ বিরোধী ও ব্রতহীন) হয়।

বর্ণসংকরাদুৎপন্নান, ব্রাত্যানা হুর্মনীযিনঃ।
ব্রাহ্মণেরা মৃত্যু দন্ড হতে মুক্ত ছিলেন। রাজ্যের শাসন ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ হতে ব্রাহ্মণেরা অবধ্য, অবন্ধ্য, অদন্ড্য, অবিচার্য, অবহিকাৰ্য্য এবং অপরিহার্য্য ছিলেন। রাজাজ্ঞা অনুসারে তাঁরা রাজকর হতে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত ছিলেন, কেননা তাঁরা ছিলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সর্বোচ্চ সন্তান এবং বেদ ধর্মশাস্ত্র পারঙ্গম (বৌধায়ন ধর্মসূত্র, ২.২, ৮২-৮৩)।

"ঋগ্বেদ'এর প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় মণ্ডল (সুক্ত ১১/৪, পৃঃ ২৬৫) এ ইন্দ্র (পুরন্দর) কর্তৃক দাসদের (ভারতের মূল নিবাসী) পরাজিত করা সম্পর্কে প্রার্থনায় বলা হয়েছে-
হে ইন্দ্র। আমরা স্তোত্র দ্বারা তোমার সুখকর কল বর্ধিত করছি এবং তোমার হস্তদ্বয়ে দীপ্ত বজ্র অর্পণ করছি। তুমি বর্ধিত ও তেজ যুক্ত হয়ে 'দাস' লোকদের পরাভূত কর।

দৈহিক গঠন এবং দেহের বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ পৃথক এই ভারতের আদি-অধিবাসীদের (মূল নিবাসী) বহিরাগত আর্যরা শত্রু রূপে চিহ্নিত করেছিল এবং অশ্ব, অশ্বচালিত রথ ও লৌহ নির্মিত উন্নততর অস্ত্রের সাহায্যে যুদ্ধ দ্বারা ব্রোঞ্জ যুগের নগর ভিত্তিক উন্নত সভ্যতার মানুষদের পরাভূত করেছিল। এই পরাভূত মূল নিবাসীদের আর্যরা অপকৃষ্ট অর্থাৎ 'দাস' হিসেবে অভিহিত করত।

এই দাস বা দাসীরা যে হত্যার যোগ্য ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে (সূক্ত ৮৫/২১-২২, পৃ: ৫৫৮) তার ও উল্লেখ রয়েছে। যেমন-দ্যুতিমান কীর্তিমান অতিশয় দর্শনীয় ইন্দ্র মনুষ্যের জন্য উন্মুথ হয়ে আছেন, শত্রু নাশক বলবান ইন্দ্র যেন লোক অনিষ্টকারী দাসের প্রিয় মস্তক নিম্নে নিক্ষেপ করে।
বৃত্রহা পূরণাশক ইন্দ্র কৃষ্ণযোনি দাস সেনাকে বিনাশ করেছেন, মণুর জন্য পৃথিবী ও জল সৃষ্টি করেছেন। তিনি যেন যজমানের উচ্চ অভিলাষ পূরণ করেন।

অপর আরও একটি ঋগ্বেদে (অষ্টম মণ্ডল, সুক্ত ৩১/৫-৯)তে ইন্দ্রের নিকট প্রার্থনা করা হয়েছে।
আমাদের চতুর্দিকে দস্যুজাতি আছে, তারা যাগ-যজ্ঞ করে না, তারা কিছু মানে না, তাদের ক্রিয়া স্বতন্ত্র, তারা মনুষ্যের যোগ্য নয়।

হে শত্রু সংহারকারী, তাদের নিধন কর। সেই দাসজাতিকে ঘৃণা কর।
হে ইন্দ্র। দাসের বল বিনাশ কর, আমরা দাস কর্তৃক সংগৃহীত অর্থ ভাগ করে নেব।

বৈদিক যুগের পূর্ববর্তী সমাজ ব্যবস্থা এবং ভারতবর্ষ

কার্ল মার্কস তাঁর সুবিখ্যাত রচনা 'কমিউনিষ্ট ম্যানিফেষ্টো'র সূচনাতেই লিখেছেন, এযাবৎ কাল আদিম সাম্যবাদী সমাজের পরবর্তী মানবসভ্যতার সমগ্র ইতিহাসই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।
কিন্তু ইতিহাস কি? ইতিহাস এবং মানুষের মধ্যেকার সম্পর্কই বা কি? এর অতি চমৎকার এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা মার্কস নিজেই দিয়েছেন। মার্কসের ভাষায়, "ইতিহাস কিছুই করে না, এ (ইতিহাস) 'কোন বিরাট সম্পদের অধিকারীও নয়', এ (ইতিহাস) 'কোন সংগ্রাম ও পরিচালনা করে না।' এটা কেবল মানুষ, বাস্তব, জীবন্ত মানুষ যে সবকিছু করে, যে সব কিছুর অধিকারী এবং যে সংগ্রাম করে, 'ইতিহাস' কোন বিচ্ছিন্ন সত্তা নয় যে মানুষকে নিজের লক্ষ্যসাধনে ব্যবহার করে, ইতিহাস নিজস্ব লক্ষ্যসাধনে মানুষের ক্রিয়া-কর্ম ছাড়া আর কিছুই নয়।"

ইতিহাসের অগ্রগতি সম্পর্কে কার্ল মার্কসের বিশ্লেষণ রীতিকে অনুধাবন করে ইতিহাসকার ধর্মানন্দ কোসাম্বী বলেছেন যে, "ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় উৎপাদনের উপায় ও উৎপাদন সম্পর্কের পর্যায়ক্রমিক বিকাশের একটা ধারাবাহিক বিবরণ হিসাবে।'

তবে ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতার বিকাশের ধারার অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কার্ল মার্কসের বিশ্লেষণ আরও একবার স্মরণ করা যেতে পারে। ইতিহাস বিষয়ে মার্কসীয় বস্তুবাদ যাকে এঙ্গেলস ঐতিহাসিক বস্তুবাদ রূপে আখ্যায়িত করেছেন সেই অনুযায়ী উৎপাদনের উপায় এবং উৎপাদন সম্পর্কের উপরই সমাজ প্রক্রিয়া মুখ্যত নির্ভরশীল। কিন্তু মার্কসীয় বস্তবাদ সমাজ প্রক্রিয়ার আদর্শ বা ভাবের ভূমিকাকে কখনও অত্যন্ত গৌণ বিবেচনা করে না। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষ যে উৎপাদন সম্পর্কেকর অঙ্গীভূত হয়, তার উপর ভিত্তি করেই মানুষের আদর্শগত বা ভাবগত জগতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আবার সেই আদর্শ ও ভাবই বস্তুজগতে সৃষ্টি হয়েছে, সেই বস্তুজগতের উপর এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে যে, বস্তু জগতে এক বিরাট পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এই পরিবর্তন সমাজকে প্রগতির পথে নিয়ে যায়, সমাজ নিজেই পরিবর্তিত হয়। সমাজ প্রগতির এই প্রক্রিয়াই মার্কসীয় দর্শনের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। মার্কস এ বিষয়টাকে অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে সূত্রায়িত করে বলেছেন যে 'তত্ত্ব ও যে মুহূর্তে মানুষকে অভিভূত করে ফেলে তখনই তা একটা বস্তুগত শক্তি হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায় (মার্কস-এঙ্গেলস্, নির্বাচিত সংকলন, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ ১৮২)।

আর্য সভ্যতায় উৎপাদনের উপায় এবং উৎপাদনের সম্পর্কের অভ্যন্তরেই বেদ ও পুরাণ রচিত হয়েছিল। পক্ষান্তরে বেদ ও পুরাণ ঐ সভ্যতা এবং তার পরবর্তী ইতিহাসে ও সুদীর্ঘকালব্যাপী কিভাবে এবং কেন এত প্রবল প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় মার্কসের ঐ সূত্রের মধ্যেই।
বেদ উপনিষদ কি ভাবে রচিত হলো? যে বা যাঁরা ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন তত্ত্বকে অস্বীকার করেন বা এই সম্পর্কে তেমন কোন তত্ত্বগত ধারণা নেই, তাঁরা তথাকথিত বিশ্বাসের উপরই মূল অর্থে নির্ভরশীল। তাদের এই বিশ্বাস তথা ধারণার মধ্য হতে বেদ ইত্যাদির ঐশ্বরিকত্বলীন সমাজের মানুষের জীবিকা, শ্রেণী বিন্যাস, উৎপাদন পদ্ধতি, উৎপাদন সম্পর্কে মানুষের স্থান ইত্যাদি এক কথায় তৎকালীন জীবনধারণ এর যে বাস্তব অবস্থা, তারই একটা ভাবগত প্রতিফলন। ভারতবর্ষের ইতিহাস গ্রন্থে কো আস্তানভা প্রমুখ (পৃ: ২৯) বলেছেন, 'ইতিহাসকার যে অতীত নিয়ে গবেষণা করেন সেই অতীত মৃত নয়, বরং সেই অতীত একটা বিশেষ অর্থে বর্তমান ও জীবন্ত।

উপরোক্ত আলোচনা হতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে বেদে বহিরাগত আর্যদের জীবনচর্যা, উৎপাদন পদ্ধতি, ভারতের মূল নিবাসীদের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ বিগ্রহ, সামাজিক শ্রেণী বিভাজন এবং তৎসহ আর্যদের ভাবগত ধারণা এবং বিশ্বাস সম্পর্কিত নানাবিধ তথ্য পাওয়া যায়। সুতরাং বস্তুবাদী ইতিহাসকারের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত পৌঁছনোই স্বাভাবিক যে, বেদ ভারতের আর্য সভ্যতার ঐতিহাসিক আকর গ্রন্থ রূপেই বিবেচ্য, ধর্মশাস্ত্র অর্থে নয়।
কিং পুণ ব্রাহ্মণাঃ পুণ্য ভক্তা রাজর্যয়স্তথা।
অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম।। - রাজগুহ্যযোগ

খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০ শতাব্দীতে মিশর, সুমের এবং সিন্ধু উপত্যকায় (ভারতীয় উপমহাদেশ) প্রায় একই সময়ে নগরভিত্তিক সভ্যতার সংকৃতি গড়ে উঠেছিল। এই সভ্যতার নগর কেন্দ্রগুলি যে পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল তাতে বড় বড় শহরের ছিল দুটি করে প্রধান অংশ। এদের একটি ছিল নগর-দুর্গ, যেখানে শহরের কর্তাব্যক্তিরা বসবাস করতেন, এবং অপরটি ছিল তথাকথিত 'নিচের শহর' যেখানে অন্যান্য সাধারণ জনগণের বসবাস ছিল।

মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা সভ্যতায় কৃষি-শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। নগর নির্মাণের ক্ষেত্রে এই সভ্যতা মিশর এবং সুমের হতে অত্যন্ত উন্নত স্থরে বিরাজমান ছিল। তবে জনসংখ্যার অধিকতর অংশই গ্রামে বাস করত এবং কৃষিকার্যে ব্যাপৃত থাকত। সিন্ধু উপত্যকা ছিল পৃথিবীতে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির প্রাচীনতম কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম। এই উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষেরা গ্রামেই বসবাস করত এবং উদ্ধৃত্ত ফসলের ভোগকারী অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা থকত নগর কেন্দ্রে এবং শাসনক্ষমতা এই শ্রেণীর মানুষের'ই নিয়ন্ত্রনাধীন ছিল। আবার শহরগুলিতে কারখানার অবস্থানের চিহ্ন ও পাওয়া যায় ঐ গুলি ছিল 'নিচের শহর' এর অন্তর্ভুক্ত স্থানে।

সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক সংগঠনের প্রকৃতি সম্পর্কিত বিষয়টি এখন ও বিতর্কের রূপেই প্রতিভাসিত হয়। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে শ্রেণী বিন্যাসের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে সিন্ধু সভ্যতা শ্রেণী সমাজের উদ্ভবের যুগের পূর্বে বিরাজ মান ছিল। তবে খনন কার্যের ফলে আবিষ্কৃত তথ্যের মাধ্যমে ঐ ধারণা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং সিন্ধু উপত্যকায় শ্রেণী সমাজের উদ্ভব হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতা গ্রীক বা রোমান ধরণের পুরোমাত্রায় ক্রীতাদাস মালিকানা প্রথার উপরই গড়ে উঠেছিল কিনা এ সম্পর্কে পন্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ থাকলে ও, এই অনুমান অনেকেই করেন যে ঐ সভ্যতায় মুচলেকাবদ্ধ মজুর এবং ক্রীতদাসদের অস্তিত্ব অবশই ছিল। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহে বসবাস করত। ফসল মাড়াই, ভারী বোঝা বহন এবং সম্ভবত ভূগর্ভস্থ পয়ঃ প্রণালীর আর্বজনা ইত্যাদি পরিস্কার করার মতো শ্রমে তাদের নিয়োগ করা হতো।
ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববিদ ডি.এইচ. গর্ডন এবং ফরাসী প্রত্নতত্ত্ববিদ জে.এম. কাসাল এর মতে হরপ্পা সভ্যতার আমলেই ভ্রূণাকারে পরবর্তী বর্ণাশ্রয়ী সমাজ কাঠামোর অস্তিত্ব ছিল।
যাইহোক, খননকার্যের ফলে সিন্ধু সভ্যতার যে রাজনৈতিক সামাজিক কাঠামোর পরিচয় পাওয়া তার থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে এই অঞ্চলে সম্ভবত এক ধরণের প্রভুত্বমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, আর এই শাসক বা উচ্চশ্রেণীর মানুষরাই ছিল জমির মালিক এবং অর্থবান।

হরপ্পা যুগের শহরগুলিতে রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থার প্রকৃতি এবং এই সভ্যতার সময়কালে সমগ্র সমাজের শ্রেণীগত চরিত্র সম্পর্কিত বিষয়টি এখনও বিতর্কিত বিষয়। বেশ কিছু পণ্ডিত (যেমন, ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ.ভ. জ্বভে এবং তদানীন্তন জার্মান গণতান্তিক প্রজাতন্ত্রের ডব্লিউ রুবেন) এই মত প্রচার করেছেন যে হরপ্পা-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল একধরণের ক্রীতদাস মালিকানা প্রথার ওপর ভিত্তি করে। তবে এই তত্ত্বের স্বপক্ষে তথ্য প্রমাণ এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত নয়। অন্যান্য কিছু পণ্ডিত আবার এই সভ্যতার রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে প্রাচীন মেসোপটেথিয়ার রাজনৈতিক সংগঠনের তুলনা করেছেন এই অনুমানের ভিত্তিতে যে সিন্ধু উপত্যকাতে ও শাসন ক্ষমতার মূল পরিচালক ছিলেন তথাকথিত পুরোহিত সম্প্রদায়, এই সম্প্রদায়ই ছিলেন সকল জমির মালিক। তবে এটাও সম্ভব যে হরপ্পা যুগের শহরগুলিতে রাষ্ট্র শাসনের প্রকৃতি ছিল ক্ষমতাপন্ন অল্প সংখ্যক ব্যক্তি পরিচালিত প্রজাতন্ত্রীয় রাজ্য। সিন্ধু সভ্যতায় ক্রীতদাসদের অস্তিত্বের বিষয়ে ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববীদ পণ্ডিত ডি.এইচ. গর্ডন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক মন্তব্য উপস্থাপিত করেছেন। তাঁর মতে এখানে পাওয়া পোড়মাটির কিছু মূর্তি মূলঅর্থে ক্রীতদাসদের মুর্তি ছাড়া আর কিছু নয় (এগুলি হল উপবেশন রত নারী পুরুষের মূর্তি। এদের প্রত্যেকে দুই হাতে নিজের দুই হাঁটু জড়িয়ে রয়েছে এবং মাথায় ধারণ করে আছে গোলাকৃতি বাটি টুপি)। এছাড়াও কাসাল খুব সরল এবং সংক্ষিপ্ত 'লিখন' সহ একপ্রস্ত অতি ক্ষুদ্র আকৃতির 'পজ্ঞা'কে শ্রমিক ও ক্রীতদাসদের 'পরিচয় পত্র' রূপে সনাক্ত করেছেন। কালিবাঙ্গান (কালিবঙ্গান) ও লোথাল অঞ্চলে এমন কিছু সারিবদ্ধ কুটির পাওয়া গেছে যেগুলি দেখে স্পষ্টতই মনে হয় যে সেখানে ক্রীতদাস বা মজুর শ্রেণী অবশ্যই বসবাস করত।

নগর-সভ্যতার অবক্ষয় ও পতন
হরপ্পা-সভ্যতার নগরগুলির অধঃপতন ঘটল কেন?

এটি বিশেষজ্ঞাদের একটি বিতর্কের বিষয়। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা আমলের শহর বা নগরগুলির এবং সম্পূর্ণ হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের মূল কারণ হল আর্য বা বহিরাগত জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ অভিযান। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানের ফলে জানা গেছে যে শহরের ধারে কাছে কোনো বিদেশী শত্রু'র আবির্ভাবের পূর্বেই অভ্যন্তরীন নানাবিধ বিপর্যয়ের কারণে এই সভ্যতা হীনবল হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।
পণ্ডিতবর্গ মনে করেন যে কৃষিজমিতে লবনতাবৃদ্ধি, বন্যা, রাজস্থান ও তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলে মরুভূমির সম্প্রসারণ এবং সিন্ধুনদের গতি পরিবর্তন ওই অভ্যন্তরীন বিপর্যয়ের মূল কারণ সমূহের মধ্যে অন্যতম। আবার অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মহেঞ্জোদারো সভ্যতার ধ্বংসের মূল কারণ হল বন্যা। মহেঞ্জাদারো ধ্বংসের কারণ প্রসঙ্গে সম্প্রতি আরও একটি তত্ত্ব প্রচারিত হয়েছে। সেটি হল সিন্ধুনদের গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার কারণে একদা যে প্রচন্ড খরা উৎপন্ন হয়েছিল তাতে শহরটি দীন ও হীনবল হয়ে পড়ে এবং এর ফলে বিদেশী আক্রমণকারীদের পক্ষে শহরটি দখল করে নেওয়া সহজতর হয়েছিল।
তবে উপরোক্ত এই সমস্ত তত্ত্বকথা কিন্তু ১৮ বা ১৭ শতকে (খ্রীষ্টপূর্ব) সম্পূর্ণ হরপ্পা সভ্যতা কেনই বা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়। এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে হরপ্পা যুগের সমাজে মূল পরিবর্তন সংঘটনের মূলে ছিল সুবিশাল ভূখণ্ড জুড়ে এই সভ্যতার দ্রুত সম্প্রসারণ এবং সভ্যতা বিকাশের দিক থেকে পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলিকে অন্তর্ভুক্তিকরণের ফলে এই সংস্কৃতির লক্ষণীয় বর্বরতা প্রাপ্তি ও দূষণ।

কালিয়াওয়াড় (গুজরাত) উপদ্বীপের ন্যায় সিন্ধু সভ্যতার প্রত্যন্ত অঞ্চল গুলিতেও প্রায় একই ধরণের অবক্ষয় এবং পতনের ধারা লক্ষ্য করা যায়। লোমালে এই অবক্ষয়ের প্রথম ধারাগুলি (লক্ষণ) ধরা পড়ে খ্রীষ্টপূর্ব ১৯ শতকে, তার পরবর্তী ২ শতাব্দীর মধ্যে এই বৃহৎ বন্দর-নগরী এবং ততদিনে অভ্যন্তরীণ নানাবিধ সংকটে জর্জরিত সিন্ধু-উপত্যকার প্রধান। প্রধান নগরের যোগসূত্র ক্রমে ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হতে হতে অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সিন্ধু অঞ্চলের কয়েকটি শহরের ক্ষেত্রে বিকাশের অপেক্ষাকৃত পরবর্তী পর্যায় অবশ্য ওই অঞ্চলে বিদেশী উপজাতিদের অনুপ্রবেশের বিষয়টি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ প্রসঙ্গে লক্ষ্যণীয় যে ওই পর্যায়ে হরপ্পা শহরটি বৈদেশিক আক্রমণ হতে সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে শহরের দূর্গ ব্যবস্থাকে অধিকতর মজবুত করে গড়ে তোলা হয়েছিল। হরপ্পা এবং অন্যান্য শহরগুলিতে আবিস্কৃত ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন এবং নগরের অলিগলিতে পড়ে থাকা মানুষের অস্থি-কঙ্কাল (স্প ততই আক্রমণকারী শত্রু এবং শহরবাসীর দেহাবশেষ) ইঙ্গিত প্রদান করে যে একদা শহরবাসী ও বহিরাগত শত্রু উপজাতির মধ্যে ঘোরতর সংগ্রাম হয়েছিল।

বিদেশী অর্থাৎ বহিরাগত যে সকল জনগোষ্ঠী সিন্ধু উপত্যকার শহর বা নগর গুলি আক্রমণ করেছিল, জনসংখ্যার বিচারে তারা অত্যন্ত সীমিত ছিল। তবু ও একথা স্বীকার করে উপায় নেই যে এই সকল জনগোষ্ঠী বা উপজাতি হরপ্পা সভতার প্রধঅন নগর কেন্দ্র গুলির পড়তি অবস্থাকে তার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই সকল আক্রমণকারী (হানাদার) জনগোষ্ঠীর কোনও একটি অংশকে 'ইন্দো-আর্য' গোষ্ঠীভুক্ত রূপে ও আখ্যায়িত করা হয়। তবে সামগ্রিক ভাবে বিচার করলে বলতে হয় যে, হরপ্পা সভ্যতার অবক্ষয়ের সঙ্গে ভারতে আর্যদের অনুপ্রবেশ সম্পর্কিত যে প্রথাসিদ্ধ তত্ত্বটি প্রচলিত আছে তার মৌল পুনবিচার প্রয়োজন। অবশ্য ভারতবর্ষে যে একদা ইন্দো-আর্য জাতিগোষ্ঠী গুলির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল এই বাস্তব সত্যটি কিন্তু এর ফলে খণ্ডিত হচ্ছে না।

আর্য-আগমন ও গাঙ্গেয় উপত্যকা সভ্যতা

বেশ কয়েক দশক ধরে প্রত্নতত্ত্ববীদ গণ আর্যদের ভারতে আগমনের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করে আসছেন। কেননা মূল প্রশ্ন হল কোন অঞ্চল হতে এবং কীভাবে ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠীগুলি ভারতে এসেছিল। সর্বোপরি আর্যদের আদি বাসভূমি কোথায় ছিল, এ প্রশ্নটিও বিতর্কিত।
রমেশচন্দ্র দত্তের মতে প্রথম যুগে আর্যগণ সিন্ধুনদীর তীরে বাস করতেন; ঋগ্বেদ সংহিতায় আমরা এই যুগের বিবরণ প্রাপ্ত হই। এই গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই যে, আর্যরা সিন্ধু এবং তার পঞ্চ শাখার নিকটবর্তী প্রদেশ অধিকার করে তথায় বসতি স্থাপন করেছিল, কিন্তু শতদ্রুর প্রাচ্যদেশ এই সময়ে তাদের নিকট অজ্ঞা ছিল। তিনি পুনঃ বলেছেন, আর্যরা কোন সময়ে পঞ্চনদ অধিকার করেছিলেন? এ প্রসঙ্গে তিনি যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন তা এইরূপ:
'শ্রীযুক্ত কোলব্রুক ইউরোপীয় সমাজে প্রথমে বেদের একটি বিবরণ প্রচার করেন। তাঁর (কোলব্রুক) মতে খ্রীষ্টাব্দের ১৪০০ বৎসর পূর্বে বেদ মণ্ডলাদি আকারে সংগৃহীত হয়েছিল। বেদ বিদ পণ্ডিতেরা সকলেই এক ব্যাকে স্বীকার করেন যে, নুন্যাধিক ৫০০ কি ৬০০ বৎসরে হিদু আর্যগণ সিন্ধু ও পঞ্চনদ সন্নিহিত প্রদেশ সমূহ অধিকার করে আধিপত্য স্থাপন করেছিল। সুতরাং খ্রীষ্টের পূর্বে ২০০০ হতে ১৪০০ বৎসর পর্যন্ত বৈদিক গ্রন্থে লিখেছেন, খ্রীষ্টের পূর্বে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বেদ প্রণীত হয়েছিল। অধ্যাপক ওয়েবর বলেছেন, সিন্ধু হতে গন্ডকী পর্যন্ত ভূভাগ পরাজয়, অধিকারে ও কর্যনায়ও করে হিন্দুত্ব সংস্থাপন করতে সহস্র বৎসর (খ্রীঃ পূঃ ১৫০০-৫০০) প্রয়েজন হয়ে থাকবে। অধ্যাপক হুটটনী খ্রীষ্টের ২০০০-১৫০০ বৎসর পূর্বে ঋকবেদ মন্ত্র প্রণয়নের সময় বলে মত প্রকাশ করেছেন। পণ্ডিতবর মার্টিন হুগ্ খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১৪০০ বৎসর পর্যন্ত ঋকবেদ প্রণয়ন সময় অবধারণ করেছিলেন। এইটি বহু পণ্ডিত সম্মত। এই কালকে আমরা বৈদিক যুগ বলে ব্যাখ্যাত করব।' (প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতার ইতিহাস, পূঃ ৩৪-৩৫)। প্রকৃত অর্থে 'আর্য' শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে 'অরি' শব্দ থেকে, বৈদিক যুগে 'অরি' অর্থে বোঝাত পরদেশী কিম্বা 'বিদেশী', আর 'আর্য' অর্থে 'নবাগত' কিম্বা 'নবাগতের প্রতি পক্ষপাতী'।

তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট গবেষণার ফলে জানা গেছে যে একদা এমন একটা সময় ছিল যখন প্রাচীন ইরানীয় এবং প্রাচীন ভারতীয়রা একত্রে বসবাস করতেন, তাঁরা ছিলেন তথাকথিত ইন্দো-ইরানীয় সম্প্রদায় ভুক্ত। এর প্রমান মেলে এই দুই জাতির ভাষার মধ্যে ঘনিষ্ট সাদৃশ্য এবং তাদের শাস্ত্র-সাহিত্যের ঐতিহ্য থেকে (প্রাচীন আবেস্তা ও ঋগ্বেদ)। সর্বোপরি উভয় জাতির ধর্মচিন্তা এবং তাদের বহু প্রাচীন সামাজিক রীতিনীতি, পদ্ধতির মিল থেকেও এর প্রমান পাওয়া যায়।
আর্যদের আদি বাসভূমি ঠিক কোথায় ছিল এই সম্পর্কিত সঠিক তথ্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। অনেকের মতে আর্যদের মূল বাসভূমি ছিল মধ্য এশিয়ায়, আবার অপর কিছু পণ্ডিতের মতে দক্ষিণ রাশিয়ার স্তেপভূমিতে। তবে ঠিক কোন পথ ধরে আর্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল সে ব্যাপারেও পণ্ডিতদের মধ্যে কোনরূপ ঐক্যমত নেই।

পরিতাপের বিষয়, ইন্দো-আর্যরা প্রকৃত অর্থে সর্বপ্রথম ভারতের কোন অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল তার এখনও পর্যন্ত কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না। তবে এ কথা বলা যায় যে এই দীর্ঘস্থায়ী জন স্থানান্তরনের বিষয়টা চলেছিল দুই বা ততোধিক যাত্রাপথ ধরে। প্রাচীন আর্যদের লিখিত পুঁথি অনুসারে জানা যায় যে তাঁরা পূর্ব পাঞ্জাব এবং যমুনা ও গঙ্গা নদীর উপরাংশ বরাবর বসতি স্থাপন করেছিল। এই তথ্য অনুসারে বোঝা যায় যে ইন্দো আর্য উপজাতি গুলি হরপ্পা সভ্যতার প্রধান নগরকেন্দ্র গুলি যে সকল অঞ্চলে অবস্থিত ছিল সেই সকল অঞ্চলে হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে ইন্দো-আর্যদের ভারতে অনুপ্রবেশের কয়েক শতাব্দী পূর্বে।

ঋগ্বেদ এবং ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠীর সম্প্রসারণ
ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠীর আকর সাহিত্য রূপে ঋগ্বেদ কেই চিহ্নিত করা হয়। আধুনিক বিশেষজ্ঞদের মতে এই বেদ সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব ১১ বা ১০ শতকে রচিত হয়েছিল। বৈদিক সাহিত্যের উত্তরকালীন পুঁথি সমূহ অর্থাৎ সংহিতা, আরণ্যক এবং ব্রাহ্মণ সমূহ লিখিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব ৮ থেকে ৬ দশকের মধ্যে।
ঋগ্বেদের সুক্ত সমূহ হতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে ইন্দো আর্য জনগোষ্ঠী বা উপজাতি গুলির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র নদী ছিল সরস্বতী। সর্বোপরি সিন্ধু এবং পাঞ্জাবের কয়েকটি নদীর নাম ওই সকল সুক্তো পাওয়া যায়। তবে গঙ্গানদীর নাম ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে মাত্র একবার উল্লিখিত হয়েছে। ঋগ্বেদ অনুসারে তৎকালীন আর্যরা হিমালয় পর্বত মালার সঙ্গে সুপরিচিত থাকলে ও বিন্ধ্য ইত্যাদি পর্বতের সঙ্গে তাঁরা সুপরিচিত ছিলেন না, কেননা ওই পর্বতের কথা সুক্ত গুলির কোথাও দৃষ্ট হয় না। বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী সংগ্রহসমূহে পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে।
রমেশচন্দ্র দত্তের মতে 'গাঙ্গ্য' প্রদেশে যে সকল জাতি প্রাদুর্ভূত হয়েছিল, তন্মধ্যে বিখ্যাত তথা জাতি সমূহের কীর্তিকলাপ হিন্দুদের মহাকাব্যাদিতে বিবৃত রয়েছে। আধুনিক দিল্লীর চতুঃপার্শ্বে কুরুজাতির রাজ্য সংস্থাপিত হয়। তার পূর্ব-দক্ষিণ দিকে আধুনিক কানোজের চতুঃপার্শ্বে পঞ্চাল জাতির রাজ্য ছিল। গঙ্গা ও গণ্ডকীর অন্তর্গত স্থানে আধুনিক মিথিলাবা ত্রিভৃত প্রদেশে বিদেহ রাজ্য এবং আধুনিক বারাণসীর নিকট কাশী রাজ্য সংস্থাপিত হয়।

কোশল রাজ্যের লোকের সুমার্জিত জাতি রূপে পরিচয় পাওয়া যায়, রামায়ণে সামাজিক ও পারিবারিক কর্তব্যাকর্ত্তব্য বিচার যথেষ্ট দেখা যায়, পৌরহিত্যের প্রাধান্য হয়েছিল, তার ও প্রমাণ লক্ষিত হয়, কিন্তু মহাভারতে যে সাহস, বীর্য্য, তেজস্বিতা, এবং স্বাধিকার রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা লক্ষিত হয়, রামায়ণে তা ততদূর দৃষ্ট হয় না। (প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতার ইতিহাস, পৃঃ ৩৫-৩৬)।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্দো-আর্যদের বসতি স্থাপন সর্বত্র একই ধরণের সাধিত হয়নি এবং এ উপলক্ষে স্থানীয় মূল নিবাসীদের সঙ্গে তাদের সংযোগ সাধনের ক্রিয়াপ্রক্রিয়া এক এক স্থানে এক এক ভাবে সমাহিত হয়েছে। পূর্ব পাঞ্জাবের কিছু অংশে আর্যরা স্থানীয় উপজাতি হতে তেমন কোন গুরুতর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি, ফলে তাঁরা নতুন নতুন ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের প্রয়োজনে দক্ষিণও পূর্বাঞ্চলের দিকে এগিয়ে যায়। গঙ্গা উপত্যকায় এই পরস্পর অঙ্গীকরণের বিষয়টি পাঞ্জাবের ন্যায় অতদ্রুত ঘটেনি। বৈদিক আর্য উপজাতি গুলি এই সময় স্থানীয় ভারতীয় জনগণের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময়কাল ধরে ইন্দো-আর্যরা ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে (গঙ্গা উপত্যকা অঞ্চল) ঘণিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করে নি। এই কারণে বৈদিক সংস্কৃতের ওপর এই অঞ্চলের ভাষাগুলির প্রভাব লক্ষণীয় ভাবে কথা দেখা যায়। পরবর্তীকালে তারা একই রকম ভাবে দক্ষিণ ভারতে ও অনুপ্রবেশ করেছিল। খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই ইন্দো আর্য উপজাতি গুলি গঙ্গা উপত্যকার প্রধান প্রধান অঞ্চল গুলিতে অনুপ্রবেশ করেছিল, বলতে গেলে তারা প্রয়া উত্তর ভারত নিজেদের অধিকারে নিয়ে এসেছিল। এই সময়কাল হতে বৈদিক আর্যদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠন গুলি ক্রমশ উন্নত হয়েছিল। বেদের পুঁথিগুলিতে দেখা গেল এর প্রতিফলনঃ এক্ষেত্রে বিশেষ কৌতূহলোদ্দীপক হল প্রথম দিককার বৈদিক সংহিতা গুলির সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ে রচিত পুঁথিগুলির তুলনামূলক আলোচনা।

বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং আচরণবিধি

বৈদিক আর্য জনগোষ্ঠীর ধর্মচিন্তা ইত্যাদি সুপ্রতিষ্ঠিত হতে এবং বিশিষ্ট রূপ নিতে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় গ্রহণ করেছিল। আর এ িপরিণতির দীর্ঘ পর্বের এক একটি বিশিষ্ট স্তর ভিনন ভিন্ন বৈদিক সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে। মূল অর্থে বৈদিক ধর্ম তথা বেদ'কে একটি সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর (ইন্দো আর্য) ধর্ম ব্যবস্থা, আচরণ বিধি এবং পূজা পদ্ধতির আঙ্গিক রূপে গণ্য করা চলে। এই ধর্ম বিশ্বাস হল আদিম সমাজ সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে অবশিষ্ট থাকা অত্যন্ত পুরাতন কিছু ধ্যান ধারণা, কিম্বা ইন্দো-ইরানীয় যুগের সংস্কৃতি গত কিছু নির্দশন এবং পরিশেষে যে যুগে প্রথম ভারতীয় জনপদগুলি ক্রমশ গড়ে উঠেছে বৈদিক আর্য সমাজের বিকাশের সেই বিশেষ স্তরে।

বেদ হল ভারতে জাত-ধর্মবিশ্বাসের সবচেয়ে প্রাচীন একটি সমন্বিত রূপ। এই ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরকালীন ধর্মীয় মত প্রবণতা এবং দার্শনিক মতাদর্শের প্রতি বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল। তবে বৌদ্ধধর্মের ন্যায় এই ধর্ম বহিঃবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েনি। বৈদিক ধর্মের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হল বহু ইশ্বরবাদ, অর্থাৎ অনেক সংখ্যক দেবদেবী এবং অবতারের পূজা অর্চনা। বৈদিক যুগে মানুষ দেবতাদের নিকট প্রার্থনা করেছেন আর ও বহুসংখ্যক গৃহপালিত পশু, যুদ্ধে বিজয়, উত্তম ফসল কিম্বা বিপর্যয় এবং বিনষ্টের হাত থেকে নিস্কৃতি। ঋগ্বেদে দেবতাদের শ্রেণী বিন্যাস করার একটা প্রয়াস ও লক্ষ্য করা যায়। বৈদিক ধর্মে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে স্বর্গ, মর্ত্য এবং অন্তরীক্ষ এই তিন অংশে বিভক্ত করে দেখার জন্য যে তত্ব প্রদান করা হয়েছিল তা হল এইরূপ- ব্রহ্মাণ্ডের এই তিনটি অংশের প্রত্যেকটির নিজস্ব দেবদেবী ছিল। স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে ছিল সূর্য দেবতা, উষার দেবী উষস্ এবং ন্যায়নীতির নির্ধারক দেবতা বরুণ। মর্ত্যের দেবতাদের মধ্যে শ্রদ্ধার আসনে ছিল অগ্নি এবং সোমরসের দেবতা সোম। এছাড়া অন্তরীক্ষের দেবতাদের মধ্যে ঝড়ঝঞ্জার দেবতা রুদ্র, বাতাসের দেবতা বায়ু এবং মহাপরাক্রান্ত যুদ্ধের দেবতা ইন্দ্র।
ঋগ্বেদের ২৫০ সুক্ত ইন্দ্র দেবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বেশ কয়েকটি বৈদিক উপাখ্যানে ইন্দ্রকে নানাবিধ ক্রিয়া কলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যায়।

বৈদিক দেবতা বরুণ সম্পূর্ণ আকাশের ওপর আধিপত্য করে থাকেন এবং রথারুঢ় হয়ে আকাশ পরিক্রমা করে বেড়ান। তিনি জগৎ সংসারের শৃঙ্খলা (ঋত) রক্ষক, আর তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন গ্রহনক্ষত্রের চলাচল এবং মনুষ্যের ক্রিয়াকলাপ। তিনি পৃথিবী, মহাশূণ্য এবং বায়ুমণ্ডলের রক্ষক, ঋতুর পারম্পর্যের নিয়ন্ত্রক। ঋগ্বেদে অগ্নিকে গৃহের রক্ষাকর্তা রূপে ও উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরকালে সর্বেশ্বরবাদী ধ্যানধারণার ক্রমবিকাশের ফলে বৈদিক ধর্ম বিশ্বাস বৈদিক সাহিত্যে এবং পৌরাণিক মহাকাব্যগুলিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। চারটি বেদেরমধ্যে ঋগ্বেদ (১০১৯ মন্ত্র বা স্তোত্র সমন্বিত) হল প্রাচীনতম। তবে কেউ একক ভাবে এগুলি রচনা করেন নি। অনুমান করা হয় যে পর্যায়ক্রমে এগুলি রচিত হয়েছিল। অগ্নি, বায়ু এবং বরুণ সহ অন্যান্য দেবতাদের উদ্দেশ্যে এই স্তোত্র গুলি রচিত হয়েছে।
সামবেদ স্বল্প সংখ্যক স্তোত্র সমন্বিত। এর অনেকগুলি স্তোত্র এবং কিছু ঋগ্বেদ স্তোত্রের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাওয়া যায়। যজুর্বেদ ও প্রধানত ঋগ্বেদের বেশকিছু মন্ত্রের সমন্বয়। এই বেদে ঋগ্বেদে উল্লেখিত যজ্ঞ, উৎসর্গ ইত্যাদি অনুষ্ঠান পদ্ধতির নির্দেশাবলী প্রদান করা হয়েছে। অথর্ববেদের স্তবগুলি গদ্য এবং পদ্যে রচিত। এর অনেকগুলি স্তবই ঐ সময়কালের সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, কুসংস্কার, মন্ত্র-তন্ত্র সম্পর্কিত।

বৈদিক সিদ্ধান্ত ক্রমশ বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেদোক্ত দেবদেবী এবং বৈদিক উপাখ্যানাদি ও আচার অনুষ্ঠানের সাধারণ ছকের মধ্যে তাঁদের স্থান মাহাত্ম্যের তাৎপর্যের ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বরুণের ন্যায় কিছু কিছু জ্যেষ্ঠ দেবতা তাঁদের গুরুত্ব বা প্রাধান্য হারালেন এবং তাঁদের পরিবর্তে প্রজাপতি (ব্রহ্মা) হয়ে উঠলেন প্রধান। উদাহরণ স্বরূপ, এর প্রমাণ মেলে অথর্ব বেদের ঐন্দ্রজালিক আচার অনুষ্ঠান এবং মন্ত্র ইত্যাদি উচ্চারণের মধ্যে। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে এর এক সুস্পষ্ট ধারা লক্ষ্য করা যায়। দেখা যায় যে 'ত্রিনাথ' (ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর) ক্রমশ প্রধান তিন দেবতা রূপে প্রাধান্য লাভ করছেন। দেবপূজার একটি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল যজ্ঞের অনুষ্ঠান। এক সময় যজ্ঞের অনুষ্ঠান সম্পাদন এবং পরিচালন'এর প্রশ্নে গড়ে উঠল পুরোহিত গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীগুলি ক্রমশ বৈদিক সমাজের সামাজিক তথা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মূল পরিচালক হয়ে উঠল।

ব্রাহ্মণ সুক্ত গুলিতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে যজ্ঞের আচার অনুষ্ঠানের ওপর। বৈদিক দেবতা প্রজাপতিকে এক্ষেত্রে নিবার্চন কার হয়েছে যজ্ঞের অধিষ্ঠাতা দেবতা হিসেবে। যজ্ঞের অনুষ্ঠান এক সময়ে মনুষ্যের প্রধান গুণ এবং তার ধার্মিক চিন্তার নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। বলা হয় যে যজ্ঞ অনুষ্ঠান ও মন্ত্রপাঠ শুধুমাত্র দেবতাদের' নয়, মানবের অমরত্ব লাভের মূল পথঃ এর ফলে দেবতাগণ সন্তুষ্ট হয়ে মনুষ্যকে সুখসমৃদ্ধি প্রদান করেন।

ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা তাঁদের কর্তৃত্বকে বজায় রাখার প্রশ্নে এই ধারণাকে আরও বদ্ধমূল করে তুলেছিল। বৈদিক যুগে দেবপূজার জন্য দেবতাদের প্রতিকৃতি ইত্যাদি ব্যবহৃত হোত কিনা, এ প্রসঙ্গে কোনরূপ সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। এমন কি পণ্ডিতেরা ও একমত হতে পারেন নি। তবে বৈদিক গ্রন্থ সমূহের কিছু শ্লোক হতে এইরূপ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে সেই সময় দেবতাদের মানবিক রূপ কল্পনার ছবি সম্ভবত প্রচলিত ছিল।

ভারতীয় মহাকাব্য সমূহের যে পৌরাণিক উপাখ্যান সমূহ দৃষ্ট হয় তা সাধারণভাবে বেদের পৌরাণিক ভিত্তি হতে সম্পূর্ণ অর্থে পৃথক। যদিও মহাকাব্যগুলির কিছু কিছু উপাখ্যান এবং ধ্যানধারণার অভ্যন্তরে পূর্ববর্তী যুগের ভাবধারা ও প্রতিফলিত হয়। যেমন মহাকাব্যীয় পুরাণে ও বেদগ্রন্থগুলির ন্যায় বহু ইশ্বরবাদ এবং দেবতায় নরত্ব আরোপের বিবিধ লক্ষণ স্পষ্ট, এক বিশেষ ধরণের সর্বেশ্বরবাদের লক্ষণ ও সেখানে বর্তমান। অন্যদিকে মহাকাব্যগুলিতে সামগ্রিক ভাবে যে পৌরাণিক উপাখ্যান সমূহ পাওয়া যায় তা অনেকাংশেই প্রক্ষিপ্ত।

মহাকাব্যগুলিতেই আমরা প্রথম 'সকন্ধ' নামক রণদেবতার সাক্ষাৎ মেলে। বেদগ্রন্থগুলির প্রথমাবস্থায় ইন্দ্র (পুরন্দর) দেবসমাজে প্রধান স্থান অধিকার করে ছিলেন। কিন্তু মহাকাব্যের যুগে ইন্দ্র বা বরুণ (ঋত) গৌণ গুরুত্বের দেবতা রূপে পরিণত হয়েছিল। অপরদিকে মহাকাব্যগুলিতে পৌরাণিক উপাখ্যানাদির যে সকল জটিলতা লক্ষ্য করা যায় তার মূল কারণ হল মহাকাব্যগুলির বিষয়বস্তু ভিন্ন ভিন্ন যুগ পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। রামায়ণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষ করে প্রতীয়মান হয়।

রমেশচন্দ্র দত্তের মতে, 'যে যুগে আর্যরা গাঙ্গ্য প্রদেশ অধিকার করেন, তখনই বেদ চতুষ্টয় সংগৃহীত ও মণ্ডলাদিতে বিভক্ত হয়। যে প্রণালীতে যজ্ঞাদি সম্পন্ন করতে হবে, তার সবিস্তার বিবরণ "ব্রাহ্মণ" নামক গ্রন্থাবলীতে প্রণীত হয়েছিল। এই সকল সারশূণ্য ও সুবিস্তৃত গ্রন্থ হতে উক্ত যুগের পুরোহিতের প্রাধান্য লাভের চেষ্টা ও জনসাধারণের পৌরুষ হীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ সমূহের শেষাংশের নাম "আরণ্যক"। এই সকল বেদ ব্রাহ্মণ-আরণ্যক মিলিত হয়ে বৈদিক শ্রুতিশাস্ত্র গঠিত হয়েছে।' (প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতার ইতিহাস, পৃঃ ৩৭)।

ইংরেজ প্রাচ্যবীদ হোরেস হেম্যান উইলসন বলেছেন, '৫০০ বৎসরের অধিককালে বৈদিক যুগের দ্বিতীয় পর্যায়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তন পরিপক্ক হয়েছিল। এই যুগে শতদ্রু হতে ত্রিহত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ গাঙ্গেয় প্রদেশে আর্যরাজ্য বিস্তৃত হয়, আর্য সভ্যতা ও আচার-ব্যবহার প্রচারিত হয়। অনেক পরাক্রমশালী রাজবংশের উদয়, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তর আড়ম্বর বৃদ্ধি, বংশানুক্রমিক জাতীয় নিয়ম হতে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, পুরোহিত সম্প্রদায়ের আধিপত্য স্থাপন এবং ব্রাহ্মণ আরণ্যক উপনিষদ ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর মতে এই যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল খ্রীষ্টপূর্ব ১৩০০-১০০০ অব্দ পর্যন্ত। সুতরাং এই অর্থে প্রথম যুগকে বৈদিক যুগ এবং দ্বিতীয় যুগকে আমরা মহাকাব্যের যুগ বলতে পারি।

বৈদিক যুগে চতুবর্ণের উৎপত্তি ও বিকাশ

চতুবর্ণের উৎপত্তি সম্পর্কিত প্রাচীনতম অনুমানটি পাওয়া যায় ঋগ্বেদের 'পুরুষ সুক্তে' রক্ষিত সৃষ্টি সংক্রান্ত অতিকথায়। তবে মনে করা হয় যে ঐ সংহিতার দশম মণ্ডলে এটি একটি প্রক্ষেপ। কিন্তু উত্তরকালীন বৈদিক রচনা, মহাকাব্য, পুরাণ ইত্যাদিতে সামান্য কিছু পরিবর্তন সহ এই বিষয়টি পুনরুস্থাপিত হয়েছে।

পুরুষ সুক্তে বলা হয়েছে আদি পুরুষ (?) এর মুখ হতে ব্রাহ্মাণ শ্রেণীর উৎপত্তি, বাহু হতে রাজণ্যের, উরু হতে বৈশ্যের এবং পা অর্থাৎ পদ হতে শূদ্র অর্থাৎ অন্ত্যজ শ্রেণীর উৎপত্তি। রচনাকালের প্রশ্নে 'পুরুষ সূক্ত' অথর্ব বেদ পর্বের অন্তিম পর্যায়। অথর্ববেদে 'পুরুষ সুক্ত' রয়েছে সর্বশেষ অংশে, সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ শতকের পরবর্তী কোন এক সময়ের রচনা। ওল্ডেনবার্গ'এর মতে এই সুক্তে জনগোষ্ঠীমূলক সমাজ ভেঙে শ্রেণী সমাজে পরিণত হওয়ার স্বপক্ষে ধর্মীয় ভাবাবেগের আবরণে একটি যুক্তি খাড়া করা হয়েছে। ঋগ্বেদের পর্বেই শ্রম বিভাজনের বিষয়টি অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়েছিল। অথর্ববেদে'র পর্বের অন্তিম পর্যায়ে কর্ম বিভাজন ক্রমশই হয়ে উঠতে লাগল (সামাজিক) স্তর বিভাজন এবং জনগোষ্ঠী ও পরিবারগোষ্ঠী এক সময় সামাজিক শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে গেল। সামাজিক শ্রেণী রূপে শূদ্রদের আমি তথা একমাত্র উল্লেখ পাওয়া যায় 'পুরুষ সুক্তে', যার কথা ইতিপূবেই বলা হয়েছে। এটি আবার দেখা যায় অথর্ববেদ (১৯/৬/৬) এবং উনবিংশ কান্ডে। হুইটনি'র মতে এই বিভাগটি অবশ্যই 'পুরোহিত উৎস জাত।' এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে বর্ণব্যবস্থার মতাদর্শের বিকাশ ঘটেছিল পুরোহিত তন্ত্রের প্রভাবে। হুইটনি'র বক্তব্য অনুসারে এই বিষয়টিকে অথর্ববেদ'এর শেষ দিকে ফেলা যায়, যখন তাদের উৎপত্তি বিষয়ক 'পুরুষ সুক্ত' ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে অনুপ্রবিষ্ট করা হয়। অথর্ববেদের গোড়ার দিকে শুদ্রদের তিনটি উল্লেখ'এর সন্ধান পাওয়া যায়। হুইটনি যাকে অথর্ববেদের প্রথম বড় বিভাগ (প্রথম সপ্তমকান্ড) বলেছেন। তাঁর মতে এই ভাগটি অনেকাংশেই লোক উৎসজাত এবং এইটি সংহিতার সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক অংশ।
'শোচন্তশ্চ দ্রবন্তশ্চ পরিচর্যাসু যে রতাঃ।
নিস্তেজসো অল্পবীর্যশ্চ শুদ্রাস্তানব্রবীংতু সঃ।।" - বায়ু পুরাণ (১/৮/১৫৮)।

ভবিষৎ পুরাণ (১/৪/২৩) বলা হয়েছে, বেদজ্ঞানের ক্ষরণ প্রাপ্তির জন্য তাদের শুদ্র বলা হয়; 'যে তে শ্রুর্তেদ্রুতিং প্রাপ্তাঃ শুদ্রান্তেনেহ কীর্তিতাঃ।'
তাহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে 'শুদ্র' শব্দের বুৎপত্তি গত অর্থই বা কি? বাদরায়ণের 'বেদান্তসূত্রে' সর্বপ্রথম এই প্রচেষ্টা দেখা যায়। সেখানে শব্দটিকে দুইভাবে বিভক্ত করা হয়েছে। 'শুক' অর্থাৎ শোক এবং 'দ্রু' ধাতু হতে উৎপন্ন 'দ্র' অর্থাৎ 'ধারণ করা।' জানশ্রুতি (ছান্দোগ্য উপনিষদে রাজা হিসেবে উল্লেখ আছে, ৪/২/৩) কেন শূদ্র বলা হয়েছিল সে সম্পর্কে শঙ্করের ভাষ্য (বেদান্ত সূত্র ১/৩/৩৪) এর শঙ্কর ভাষ্য) তে তিনটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে:
১। তিনি দুঃখের প্রতি ধাবিত হলেন (শুচম্ অভিদুদ্রাব)।
২। শোক তাঁর দিকে ধেয়ে এল (শুচা বা অভিদুদ্রাবে) এবং
৩। শোক মগ্ন অবস্থায় তিনি রৈকের দিকে ধেয়ে গেলেন (শুচা বা রৈকেম্ অভিদুদ্রাব)। বাদরায়ন কৃত শূদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তি এবং শঙ্করের ভাগ) কোনটিই শুদ্র সম্পর্কিত যুক্তিগ্রাহ্য তথ্য প্রদান করেন নি। কথিত আছে শঙ্কর যে জানুশ্রুতি'র কথা বলেছেন, তিনি ছিলেন মহাবুষদের শাসক। অথর্ববেদ অনুসারে উত্তর পশ্চিম ভারতের অধিবাসী রূপে এদের উল্লেখ পাওয়া যায়। জানশ্রুতি শূদ্র বর্ণের ছিলেন কিনা তাই সন্দেহজনক। পানিনির ব্যাকরণের উনাদিসূত্রে (২/১৯) শূদ্র শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়।
শূদ্রবর্ণের উৎপত্তি সংক্রান্ত আলোচনার মূলগত তত্ত্ব হল এই যে, অংশত বাহ্য এবং অংশত অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যদিয়ে আর্য ও প্রাগ্‌আর্য সাধারণের একটি বৃহৎ অংশকে শূদ্র পর্যায়ে অবনমিত করা হয়। যেহেতু এই সংঘাত হয়েছিল মূলত গো-ধন এবং পরবর্তীকালে ভূমি ও তার উৎপন্নের অধিকার নিয়ে, তাই যারা এই সকল অধিকার হতে বঞ্চিত ও নিঃস্ব হয়ে গেলেন, তাঁরাই নতুন সমাজের চতুর্থ শ্রেণী রূপে গণ্য হয়েছিল। দাস শ্রেণী গঠনের মূল প্রক্রিয়া মূল অর্থে শুরু হয়েছিল পরবর্তী বৈদিক যুগে, যখন পশু পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল কৃষি এবং আধা যাযাবর বৃত্তির পরিবর্তে ব্যাপক জনপদ স্থাপন। উত্তরকালীন বৈদিক রচনাদি থেকে এই বিষয়টি অতি সহজেই অনুমান করা যায়।

শূদ্রদের প্রকৃত অর্থে কোন নাগরিক মর্যাদা ছিল না তার ইঙ্গিত পাওয়া তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ (৩/৩/১১/২, ভট্টভাস্করের ভাষ্য সহ) বর্ণিত একটি সূত্রে। এক্ষেত্রে ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, শূদ্ররা তাঁদের প্রভুদের সামনে থেকে তাঁর কৃপা ভিক্ষা করেন, আর যাঁরা কোনরকম বিরোধিতা করতে পারেন না, তাঁদের দুজনকেই একই ভাবে শূদ্র হিসেবে গণ্য করা হবে। শতপথ ব্রাহ্মণে পরিস্কার ভাবে বলা হয়েছে (৩/৫/২/১১) যাঁরা ক্ষত্রিয় বা পুরোহিত কোনটাই নন, তাঁরা অসম্পূর্ণ। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (৮/৪) বলা হয়েছে যে ব্রাহ্মণরা যান ক্ষত্রিয়ের আগে, কিন্তু বৈশ্য এবং শূদ্ররা তাঁর অনুবর্তন করেন।

মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০'এর মধ্যবর্তী সময়কালে উচ্চ গাঙ্গেয় অববাহিকার সমাজ শ্রেণীবিভক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং যদিও বৈশ্যও শূদ্ররা ছিলেন দুটি নিম্নতর বর্গ, তাহলে ও তাঁদের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট ভাবে নির্দিষ্ট। 'যজুর্বেদ সংহিতা'র একটি অংশে বলা আছে (১৪/৩০) যে বৈশ্য ও শূদ্রদের একই সঙ্গে সৃষ্টি করা হয়েছিল। একথা পুরুষ সূক্তে'র বিপরীত। কেননা পুরুষ সূক্তে বলা হয়েছে যে সৃষ্টির পরম্পরায় শূদ্রের পূর্বে এসেছেন বৈশ্য, তাই সমাজে শূদ্রদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে নিম্নতম স্থান।

শূদ্ররা যে সেবক শ্রেণী ছিলেন, সে কথা পরবর্তী বৈদিক রচনায় অতি সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিভাসিত হয়। এই যুগের ধর্মসূত্রে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে শূদ্রদের কর্তব্য হল তিন বর্গের সেবা করা। ধর্মসূত্রের (১ম, ১২৩১) ব্যবহার বিধি হতে অনুমান করা যায় যে ভাগীদাররা যৌথভাবে ভূ-সম্পত্তি ও গ্রামের সাধারণ সম্পদ নির্বিশেষে ভোগ দখল করতেন, তেমনি তাঁরাই হয়ে উঠেছিল এই সকল সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম-শক্তির নির্বিশেষ অধিকারী। প্রতি গ্রামের শ্রমজীবী বা দাসবর্গীয় লোকদের বলা হতো শূদ্র। তাঁদের উপর উচ্চতর তিনবর্ণের নিয়ন্ত্রণ থাকত। এইভাবে স্পষ্টই এমন এক সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে যার মূল হলো শূদ্র শ্রম। আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে (১/১/৩/৪০, উজ্জ্বলা-টীকা সহ) স্পষ্ট অর্থে নির্দেশিত হয়েছে যে শূদ্ররা উচ্চতর বর্ণের উচ্ছিষ্ট অন্ন, অব্যবহার্য পোশাক ইত্যাদি গ্রহণ করবে। উত্তরাধ্যয়ন সূত্রে (৩/১৭) দাস, ভৃত্য, পশু এবং নারীকে একই পর্যায় ভুক্ত করা হয়েছে।

আপস্তম্ভ মতে (২/১০/২৬/৪) রাজসভা অলঙ্কৃত করে থাকবেন শুধুমাত্র বিশুদ্ধ এবং সত্যবাদী আর্যরা, তাঁরাই হবেন রাজার মূল মন্ত্রনাদাতা ও বিচারক। এক্ষেত্রে 'আর্য' শব্দটিকে প্রথম তিন বর্ণের সদশ্য অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোন শূদ্রকে কখনই আর্য বলে গণ্য করা হয় নি, 'দ্বিজত্বের' কথা তো ওঠেই না। সবশেষে গৌতম এবং আপস্তম্ব বলেছেন যে, কোন শূদ্র যদি বচনে, আসনে, শয়নে বা পথে দ্বিজের সমান স্থান গ্রহণ করে, তাহলে তাকে দন্ডাঘাত করা হবে।

ধর্মসূত্রে চন্ডাল নামক একটি শ্রেণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত এরা ছিলেন আদিম জনগোষ্ঠী। গৌতমের (১/৪৭/৫) রচনায় চন্ডাল বলতে 'মৃতপ' (শদের প্রহরী) জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে। এরা গ্রাম ও নগরের বাইরে বাস করতেন। পতঞ্জলির মতে, যাঁদের স্পর্শে ব্রাহ্মণদের কাঁসার পাত্র কলুষিত হয়ে যায়। অনেক ঐতিহাসিক (হস্কিনস্ প্রমুখ) মনে করেন যে অস্পৃশ্যতার ধারণা প্রাগ্ মৌর্য যুগের শেষ দিকে প্রকট হয়েছিল। গৌতম'এর রচনায় পানিনির ন্যায় অনুরূপ একটি বিধান আছে। তাঁর মতে কোন চন্ডাল যদি দ্বিজের দেহ অপবিত্র করে তাহলে সবস্ত্র অবগাহন করে অমঙ্গলের পূর্বাভাস। সাধারণত উচ্চবর্ণের সব লোকই চন্ডালদের অস্পৃশ্য বলে ঘৃণা করতেন, কিন্তু বিশেষভাবে ঘৃণা করতেন ব্রাহ্মণ রাঃ ধর্ম সূত্র হতে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ব্রাহ্মণ রচনায় 'বেন' (বৈদেহক/বৈন), রথকার, চর্মকার এবং নিষাদ (ব্যাধ) ঘৃণিত জাতির তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এই কারণে গৌতম (২০/১) বর্ণ সংকর প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন। এমন কি শূদ্র নারীদের 'পাপিষ্ঠা' বলা হয়েছে। আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে (২৩/৩২) 'অন্তঃ' শব্দটি চন্ডাল এবং দাস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যাদের বেদমন্ত্র উচ্চারণ নিষিদ্ধ ছিল।

মনুস্মৃতি (মনুসংহিতা)'র আঙ্গিকে বর্ণব্যবস্থা

মনুস্মৃতি'র রচনাকাল সম্পর্কে পণ্ডিতবর্গের মধ্যে বিস্তর মত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন-অষ্টাদশ শতাব্দীর ভাষাতত্ত্ববিদ স্যার উইলিয়াম জোনস্ এবং কার্ল উইলহ্যাম ফ্রেডরিক শিগেলের মতে 'মনুসংহিতা'র সময়কাল খ্রীষ্টপূর্ব ১২৫০-১০০০ সন, অর্থাৎ বৈদিক সভ্যতার (খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ সন) গোড়ার দিকে অন্যদিকে, ভাষাশৈলী এবং গঠনগত ক্রমবিকাশ অনুসারে ভাষাতাত্ত্বিকদের একাংশের অভিমত মনুস্মৃতি'র রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সন'এর কোন এক সময়ে অর্থাৎ বৈদিক যুগের একেবারে অন্তিমলগ্নে। তবে মনুস্মৃতিতে অর্থের উল্লেখ থাকায় আধুনিক ভাষাতত্ত্ববিদ প্যাট্রিক অলিভেল'এর মতে এর সম্ভাব্য রচনাকাল খ্রীষ্টিয় ২-৩ শতাব্দীর মধ্যে। সুতরাং এটি বৈদিক যুগোত্তর একটি ধর্মশাস্ত্র।
মনুস্মৃতি'র অষ্টম অধ্যায়ে এর প্রমাণ আছে, যা এইরূপ -
অধর্মনোর্থসিদ্ধার্থম উত্তমর্ণেন চোদিতঃ।
দাপয়ে ধনিকস্য অর্থম অধমর্নাদ বিভাবিতম্।। - শ্লোক ৮.৪৭।

একজন ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার নিকট হতে পাওনা উদ্ধারের নির্মিত্তে ঋণের প্রমাণসহ (রাজার দ্বারস্থ হলে, তিনি (রাজা) ঋণ গ্রহীতাকে সেই অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করবেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, অধিকাংশ ভাষাতাত্ত্বিক গণের মতে মনুস্মৃতি কোনো একক ব্যক্তি বিশেষের রচনা নয়; মূল রচনায় বিভিন্ন প্রক্ষিপ্ত অংশ বিভিন্ন রচয়িতার মাধ্যমে নানাবিধ সময়ে সংযোজিত হয়েছিল। ভাষাতত্ত্ববিদগণের মতে গ্রন্থটি পরস্পরবিরোধিতা এবং অসঙ্গতি থাকার কারণে সামঞ্জস্যহীনতার দোষে দুষ্ট। এমন কি, কুল্লুকাভট্ট সম্পাদিত মনুস্মৃতি ব্যতীত আরও ৫০টি বেশী পাণ্ডলিপির হদিশ পাওয়া গেছে, সেগুলির অধিকাংশই অসঙ্গতি পূর্ণ। ফলে পুঁথিটির (মনুস্মৃতি) রচনাকাল এবং গ্রামানিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। মনুস্মৃতি'র একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে বৈশ্য, শূদ্র এবং নারী সমাজের প্রতি অনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়েছে। সম্ভবত অশোকের বৌদ্ধনীাতির প্রতিক্রিয়া, তীব্র সামাজিক সংঘর্ষ এবং নতুন জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব এর ফলে মনুস্মৃতি ব্রাহ্মণ্য সমাজকে সংরক্ষিত করার চেষ্টা করেছে।

উচ্চতর জাতির সেবা করার জন্য ব্রহ্মা (জগৎ পিতা) নির্দিষ্ট করেছেন শূদ্রকে এই প্রাচীন তত্ত্বটি মনুস্মৃতিতে বারংবার উঠে এসেছে। আপদ ধর্ম (মণু ৭/১৩-৩০) অধ্যায়ে বলা হয়েছে, শূদ্রের উচিত ব্রাহ্মণের সেবা করা, তাতেই তার সব প্রয়োজন সম্পূর্ণ হবে। অত্যত্র বলা হয়েছে, (মনু ৮/৪১৮) রাজা যেন বিশেষ ভাবে বৈশ্য এবং শূদ্রদের দ্বারা তাদের নির্ধারিত কর্ম পালন করিয়ে নেন, এই দুই বর্গ তাদের কর্ম পরিত্যাগ করলে সারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা উৎপন্ন হবে।

মনুস্মৃতি অনুসারে শূদ্রকে ধনসম্পদ সঞ্চয় করতে দেওয়া উচিত নয়, কারণ সে ব্রাহ্মণদের বাধাগ্রস্ত করবে। আপৎকাল অধ্যায় (মনু ৯/১৫৭) হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে সেই সময় ব্রাহ্মণ সমাজ বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধ অনুগামীদের 'শূদ্র' বলে মনে করতেন। মৌর্যোওর যুগের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শূদ্রদের অবস্থান সম্পর্কিত যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। মনুস্মৃতি মতে (ন শূদ্ররাজ্যে নিবসেৎ। মনু ৪/৬১) শূদ্র রাজ্যে কোন স্নাতকের (ব্রাহ্মণ) বাস করা উচিত নয়। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে ঐ যুগে শূদ্র বা রাজ্য বলতে কি বোঝায়? কেননা সমসাময়িক ইতিহাসে এই ধরণের কোনো রাজার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। মণিয়ের উইলিয়ামস্ (দ্য পলিটিক্যাল অ্যাণ্ড সোশাল সিস্টেম অফ মণু, পৃঃ ১৫০) এর মতে এইসব রাজা বলতে সম্ভবত গ্রীক, শক, পার্থিয় এবং কুষাণ শাসকদের কথা বলা হয়েছে যাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মণু এদের শূদ্রত্বে পতিত ক্ষত্রিয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন (বৃষলত্বং গতা লোকে মনু ১০/৪৩-৪৪)।
'মনুস্মৃতি মতে (মণু ৫/৮৪) ক্ষত্রিয় বংশজাত নয় এমন রাজার নিকট হতে ব্রাহ্মণদের কোনরূপ উপঠোকন গ্রহণ করা উচিত নয়। নারী, শূদ্র এবং বৈশ্যদের হত্যা করার বিষয়টিকে মনু তুচ্ছ অপরাধ বলে ঘোষণা করেছেন (মণু ১১/৬৭)। মণুর মতে শুদ্র এবং নারীকে দাসত্ব হতে মুক্তি প্রদান করা যায় না, কারণ দাস্য তাদের স্বভাবজাত (মণু ৮/৪১৪)। কুল্লুকা ভট্ট সম্পাদিত 'মনুসংহিতা' হতে জানা যায় যে বৃষল (দাস), বৃষলী (দাসী) এবং শূদ্র হীন পর্যায় ভুক্ত ছিল।

মণু বর্ণিত বিভিন্ন সঙ্কর জাতির অধিকাংশই ছিল অস্পৃশ্য। নিষাদ, আয়োগব, মেদ, অন্ধ্র, চুষ্ণু, মদণ্ড, ক্ষতা, পুরুস, ধিগবন এবং বেন এই সকল জনগোষ্ঠীর লোকেরা ছিল শূদ্র পর্যায় ভুক্ত। মনু নির্দেশ করেছেন যে এরা গ্রামের বাহিরে চৈত্যবৃক্ষ, শ্মশান, পর্বত এবং উপবনে নিবাস করবে। (মণু ১০/৪৯-৫০)।
মধু বিশেষ করে ব্রাহ্মাণ ও অস্পৃশ্যদের মধ্যে সকল প্রকার সংস্রব পরিহার করার কথা বলেছেন। মনুস্মৃতি অনুসারে চণ্ডাল, পুরুস, অন্ত্য এবং অন্ত্যাবসায়ীদের সঙ্গে 'স্নাতক'-এর (সাধারণত ব্রাহ্মণ) বসবাস করা উচিত নয়। (মণু ৪/৭৯), বশিষ্ঠের ন্যায় মণু ও বিধান দিয়েছেন, 'স্নাতক' কখনই শূদ্র এবং নারীকে ধর্ম ব্যাখ্যা করবেন না। (মণু ২/১০৯) কোন দ্বিজ তাঁর স্ত্রীকে ধর্ম কার্যে যুক্ত করবেন না। তিনি যদি মোহবশত তা করেন তাহলে তাঁকে চন্ডালতুল্য ঘৃণ্য রূপে গ্রহণ করা হবে। (মণু ৯/৮৭),

মনুসংহিতা (মনুস্মৃতি)'র বিচারে সমাজে নারীদের অবস্থান কীরূপ ছিল তার পরিস্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন 'ন-অস্তি স্ত্রীনাং ক্রিয়া মন্ত্রের ইতি ধর্মে ব্যবস্থিতিঃ নি-ইন্দ্রিয়া হামন্ত্রাশ্চ স্ত্রীভ্যো অণুতম ইতি স্থিতি।।" (মণু ৯/১৮) অর্থাৎ শক্তি হীনা, (বেদ) জ্ঞানরহিত হওয়ায় নারীরা যেহেতু মিথ্যাচারের মতোই (অপবিত্র) তাই তাদের জন্য পবিত্র মন্ত্রসহ কোনো ধর্মীয় আচার নেই, এই হল বিধি।
বৈদিক সমাজে নারী এবং অস্পৃশ্যকে একই আসনে বসানো হয়েছে এবং তা কতটা মারাত্বক ছিল মনুস্মৃতি'র ছত্রে ছত্রে তার নিদের্শন পাওয়া যায়।
'স্বভাবেষ নারীনাং নরানম্ ইহ দুষণম্। অতো অর্থান্ ন প্রমাদ্যন্তি প্রমদাসু বিপশ্চিতঃ।। (মণু ২/২১৩) অর্থাৎ নারীদের স্বভাব হল পুরুষদের প্রলুব্ধ করা, কাজেই বিচক্ষণ পুরুষের কখনোই অরক্ষিত অবস্থায় নারীদের সংস্পর্শে আসা উচিত নয়। উপরের বিবৃতি সম্ভবত পূর্ববর্তী খৃষ্টীয় শতকগুলির অবস্থা সম্পর্কিত। বৌদ্ধযুগের সময়ের ক্ষেত্রে কথাগুলো প্রযোজ্য নয়।

বৈদিকোত্তর যুগের আর্য সামাজিক পরিকাঠামো এবং নতুন ধর্মচিন্তা

প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে বৌদ্ধযুগ প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিপ্লবের যুগ ছিল। এই যুগে ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী ভাবনার অভ্যুদয় এবং প্রাধান্য, অর্থনৈতিক জগতে ধনিক শ্রেণীর আবির্ভাব, ধর্মজগতে বৌদ্ধ ধর্ম মতের উদয় এবং ব্যাপ্তি, সমাজে কর্মকাণ্ডী ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পতন ও ক্ষত্রিয় প্রধান সমাজের জন্ম দেখতে পাওয় যায়। এই যুগের সময়কাল খ্রীষ্টপূর্ব শতাব্দী হতে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত গণনা করা হয়।
ষোলটি মহাজানপদ এবং এগারোটি গণতান্ত্রিক রাজ্যের অস্তিত্বের উল্লেখ এই যুগে পাওয়া যায়। সাম্রাজ্য সমূহের মধ্যে মগধ এবং গণতান্ত্রিক রাজ্যের মধ্যে কপিলাবস্তুর (শাক্যজাতি গোষ্ঠী) নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্যনীয়।

ড. শশী অবস্তীর মতে (প্রাচীন ভারতীয় সমাজ, পৃঃ ২৫০-২৫২) এই সময় ভারতে ৬১টি বিভিন্ন ধার্মিক মতবাদ ছিল। তাদের মধ্যে মুখ্য ছিল বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মমত। খ্রীষ্টপূর্ব ৬৯৯ সনে জৈন ধর্মের প্রবর্তক বর্ধমান মহাবীর বৈশালীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং খ্রীষ্টপূর্ব ৫২৮ সনে (মতান্তরে ৪৬৮ সন) পাবাপুরীতে দেহত্যাগ করেন।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ খ্রীষ্টপূর্ব ৫৬৩ সনে কপিলাবস্তুতে শাক্য রাজকূলে জন্মগ্রহণ করেন এবং খ্রীষ্টপূর্ব ৪৮৩ সনে কুশানগরে মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন। মৌর্য যুগের সামাজিক ব্যবস্থা এবং বর্ণ বিন্যাস সম্পর্কিত তথ্য মেগাস্থিনীসের বিবরণ, সম্রাট অশোকের শিলালেখ ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থ হতে অবগত করা যায়। চাণক্য বা কৌটিল্য পূর্ব প্রচলিত বর্ণ ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিলেন। মেগাস্থিনীসের বর্ণনা অনুসারে মৌর্য যুগে ভারতীয় সমাজ ৭টি জাতিতে বিভক্ত ছিল। যেমন দার্শনিক বর্গ, কৃষক বর্গ, পশুপালক ও শিকারী বর্গ, কুটির শিল্পীবর্গ, যোদ্ধাবর্গ, মন্ত্রী বর্গ এবং গুপ্তচর বর্গ। সম্ভবত মেগাস্থিনীস কর্ম অনুসারে জাতির বিভাজন করেছিলেন। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য জৈন মতালম্বী হওয়ার কারণে সমাজে কর্মবাদকে গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পরবর্তী শাসকগণ (বিন্দুসার, অশোক প্রমুখ) বৌদ্ধধর্ম অবলম্বন করার কারণে জনগণের জীবন জীবিকা পদ্ধতির বিপুল পরিবর্তন হয়েছিল। ই সময় ব্রাহ্মণদের প্রভাব প্রতিপত্তি বহুলাংশে খর্ব হয়ে যায়।

ভগবান বুদ্ধ বিভেদমূলক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে কর্ম-মূলক ব্যবস্থার পক্ষপাতি ছিলেন। তাঁর মতে মানুষের সামাজিক প্রতিষ্ঠা কখনই জন্মগত নয়, বরং উত্তম কর্মকেই বরণ করে নেওয়া উচিত। বৌদ্ধধর্মে জাতি এবং বর্ণের পরিবর্তে মানুষের শীলাচারকেই প্রধান গুরুত্ব প্রদান করা হয়। ধম্মপদে 'ব্রাহ্মণ'এর যে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে তা 'বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ তত্ত্ব' হতে সম্পূর্ণ অর্থে ভিন্ন। যেমন-
যোধ তন্থং পহন্তবান, অনাগারো পরিব্বজে।
তস্থাহাভবগ্লরিকথী নং, তমহং ক্রমি ব্রাহ্মণং।। ৪১৬।।
অর্থাৎ যে সাধক তৃষ্ণাকে পরিত্যাগ পূর্বক গৃহত্যাগী হয়ে প্রবজিত হন, যার এখানে (এই লোকে) পুনঃ জন্ম গ্রহণের তৃষ্ণা সম্পূর্ণ অর্থে ক্ষীণ হয়ে গেছে, এই রূপ সাধককে আমি 'ব্রাহ্মণ' বলি।

মৌর্য যুগের শ্রেষ্ঠ সম্রাট মহামতি অশোক (খ্রীষ্টপূর্ব ২৯৭-২৩২ সন) কলিঙ্গ বিজয়ের পর হিংসার পথ ত্যাগ করে অহিংস বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলে সমগ্র ভারতবর্ষ এবং শ্রীলংকা সহ অন্যান্য দেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয়। তাঁর শাসনকালে বৈশ্য, শূদ্র এবং কৃষকেরা সামাজিক মর্যাদা লাভ করেছিল (এজ অফ দ্য নন্দ অ্যান্ড মৌর্য, নীলকান্ত শাস্ত্রী, পৃঃ ৩১৩)। সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য পতনের মুখে পতিত হয়। কারণ তাঁর উত্তরাধিকারীগণ সকলেই ছিলেন শাসক হিসেবে অযোগ্য।

খ্রীষ্টপূর্ব ১৮৫-৩২০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতে ব্রাহ্মাণ রাজবংশের উদয় হলে পুনঃ ব্রাহ্মণ্য বর্ণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। এই সময় শুদ্র, স্বতন্ত্র শিল্পী বা কারিগর, দাস, চন্ডাল ইত্যাদি শ্রেণীর ব্যক্তি জন 'ব্রাত্য' শ্রেণীভুক্ত ছিল (শূদ্র ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া, রামশরণ শর্মা, পৃঃ ২৪০)। ভারতে ব্রাহ্মণ রাজবংশের মধ্যে উল্লেখ্যনীয় ছিল শুঙ্গ রাজবংশ (খ্রীষ্টপূর্ব ১৮৫-৭২ সন), কম্ব বংশ (খ্রীষ্টপূর্ব ৭২-২৭ সন) এবং দক্ষিণ ভারতে সাতবাহন রাজবংশ ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগকে সুবর্ণযুগ বলা হয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের উদয় হয় তৃতীয় শতাব্দীতে (২৭৫ খ্রীষ্টাব্দ)। গুপ্ত বংশের শাসকগণের মধ্যে উল্লেখ্যনীয় ছিলেন-
শ্রীগুপ্ত (২৭৫-৩০০ খ্রীষ্টাব্দ), প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩২৮ খ্রীষ্টাব্দ), সমুদ্র গুপ্ত (৩২৮-৩৭৫ খ্রীষ্টাব্দ), চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য (৩৭৫-৪১৩ খ্রীষ্টাব্দ), কুমার গুপ্ত (৪১৩-৪৫৫ খ্রীষ্টাব্দ) এবং সকন্ধ গুপ্ত (৪৫৫-৪৬৭ খ্রীষ্টাব্দ) পুরুগুপ্ত (৪৬৭-৪৭৩ খ্রীষ্টাব্দ), দ্বিতীয় কুমার গুপ্ত (৪৭৩-৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ) এবং বুধগুপ্ত (৪৮০-৫০০ খ্রীষ্টাব্দ)।

গুপ্তরাজারা বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের পৃষ্টপোষক হওয়ার কারণে বৌদ্ধযুগের উদার সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রাচীন বর্ণব্যবস্থা পুনর্জীবন লাভ করেছিল। এই সময় বর্ণব্যবস্থা অত্যন্ত দৃঢ়, কঠোর এবং ভেদ-ভাবাত্মক হয়ে গিয়েছিল। নারদ স্মৃতি (৫.২৩) এবং বৃহস্পতি স্মৃতি (১৫.১২) অনুসারে শূদ্র সাধারণ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল:
১। সৈন্য কর্মে নিযুক্ত শূদ্র।
২। কৃষিকর্মে যুক্ত শূদ্র।
৩। নিম্নতম শ্রেণীর শূদ্র (দাস-দাসী প্রমুখ)।

বিষ্ণু স্মৃতিতে (৭.১৬) বিভিন্ন পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়। যারা মূল অর্থে শূদ্র শ্রেণী ভুক্ত ছিল, যেমন-মালী, রজক, কুম্ভকার, চিত্রকর, মালাকার, বস্ত্রকার, চর্মকার, কাষ্ঠহারক, স্বর্ণকার, গাইন-বাইন প্রমুখ। গুপ্ত যুগে কৃষক শূদ্র এবং শিল্পী-শূদ্রদের থেকে রাজকর নেওয়া শুরু হয়। ব্রাহ্মণেরা শূদ্রদের অন্নগ্রহণ করতেন না এবং শূদ্রদের গৃহে বা এক পংতিতে অন্নগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। বৃহস্পতি স্মৃতি (শ্রাদ্ধ খণ্ড, ৪৩) মতে ব্রাহ্মণ শূদ্রের অন্ন গ্রহণ করলে তাঁদের আধ্যাত্মিক শক্তি এবং ধর্ম বুদ্ধি হ্রাস পারে।
গুপ্ত যুগে শূদ্রের ও অস্পৃশ্য অন্ত্যজ বর্গ, ব্রাত্যবর্গ, উপজাতি বর্গ এবং দাস প্রথার প্রচুর উল্লেখ পাওয়া যায়। 'মৃচ্ছ কটিক' নাটকে অস্পৃশ্য চণ্ডালদের বিভিন্ন কাজের অনেক উদাহরণ দৃষ্ট হয়। নারদ স্মৃতিতে (৫.২৬-২৮) বিদেশী জাতিদের 'ব্রাত্য' (বৈদিক ব্রতহীন) রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই যুগে দাসদের একটি পৃথক নিকৃষ্ট শ্রেণী রূপে স্বীকার করা হয়েছিল।

সুতরাং এই অর্থে বলা যায় যে মৌর্য যুগের পরবর্তী পর্যায়ে ভারতবর্ষের যে সকল অঞ্চলে ব্রাহ্মণ রাজবংশের উদ্ভব হয়েছিল সেখানেই বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থান ঘটেছিল। শুঙ্গ, কম্ব, সাতবাহন এবং গুপ্ত রাজবংশের অধীনে ভারতীয় সমাজের যে চিত্র পাওয়া যায় তার সাহিত্যিক সাক্ষ্য মূলতঃ মনুস্মৃতি এবং মনঞ্জলির মহাভাষ্যে ও দৃষ্ট হয়।

শঙ্গ রাজবংশের সংস্থাপক পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ব্রাহ্মণ্য বর্ণ ব্যবস্থার পৃষ্টপোষক এবং তীব্র বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধি ছিলেন। তাঁর শাসনকালে বহু বৌদ্ধ বিহার, চৈত্য ও স্থাপত্য ধ্বংস কার হয়েছিল। বাল্মীকী রামায়ণের অযোধ্যাকান্ডে বুদ্ধকে বেদ বিরোধি এবং নাস্তিক মত প্রচারাকারী রূপে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুপ্ত যুগ ৫৫০ খ্রীষ্টাব্দে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এর মূল কারণ রূপে যে সকল বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল তা নিম্নরূপ:
১। হেফথালাইট (শ্বেত হুন) গোষ্ঠীর ক্রমাগত আক্রমণ।
২। অর্থনৈতিক সংকট।
৩। কৃষক এবং দাস বিদ্রোহ।
৪। বণিক শ্রেণীর অসেন্তাষ।
৫। শাসক শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ কলহ।
৬। বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের দার্শনিক সংঘাত।
৭। প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

মৌর্য যুগের ন্যায় কৃষাণ যুগ ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভি.সি. সরকার'এর মতে "কুষাণ যুগ ভারতের ইতিহাসে যুগ প্রবর্তক কাল। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর সর্বপ্রথম একটি মহান সাম্রাজ্য গঠিত হয়েছিল, যেখানে কেবলমাত্র সমগ্র উত্তর ভারত সম্মিলিত ছিল না উপরন্তু অন্যান্য প্রদেশ ও সম্মিলিত ছিল যা মধ্য এশিয়ার অনেক অঞ্চলকে যুক্ত করেছিল।" (ইন্ডিয়া আন্ডার দ্য কুষান'স, পৃঃ ৭১)।

অধ্যাপক ডে বর্গেস (দ্য গান্ধার সকাল্পচারর্স, পৃ: ৬৩) বলেছেন, "কুষাণ যুগে ধর্ম, সাহিত্য এবং মূর্তিকলার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ হয়েছিল, বিশেষ করে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের উদয়, গান্ধার কলা এবং বৌদ্ধ মূর্তির আগমন।" কুষান বৌদ্ধ রাজা কণিষ্ক (৭৮-১০১ বা ১০২ খ্রীষ্টাব্দ।) অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজা ছিলেন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার প্রশ্নে কৃষি, শিল্প এবং দেশীয় আন্তজার্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার বহুল উন্নতি সাধন করেছিলেন।

ড.বি.এন. পুরী'র মতে, "কুষাণ যুগে কৃষি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল। ফসল, ভূমির চরিত্র এবং তার বিকাশ, সেচ পদ্ধতি হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে কৃষক শ্রেণী ফসল বৃদ্ধি তথা ভূমি সংস্কার পদ্ধতির বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন। স্থানীয় সরকার পশুপালনের জন্য সাধারণ জনগণকে ঋণ এবং পশুপ্রদান করতেন। খাদ্য সুরক্ষার জন্য সুরক্ষিত ভান্ডার ছিল।

সাধারণ জনগণ আর্থিক রূপে বেশ সচ্ছল ছিল। বণিক শ্রেণী প্রাকৃতিক সংকট এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাজাকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করতেন। বৈশ্য এবং শূদ্রদের মধ্যে কোনরূপ ধর্মীয় বিভেদ ছিল না। 'সার্থবাহ' গ্রন্থ (পৃঃ ৩০৬-৩১৮) হতে কুষাণ যুগের ব্যবসায়িক শ্রম বিন্যাসের বিবরণ পাওয়া যায়। যেমন স্বর্ণকার, বস্ত্র নির্মাতা, তেলী, সুগন্ধী প্রস্তুতকারী (গন্ধী), খাদ্য-সামগ্রী বিক্রেতা, আনাজ বিক্রেতা, মসলা বিক্রেতা, কুমোর, কামার, ঘরামি, মূর্তিকার ইত্যাদি। শ্রেণী'র অধ্যক্ষকে শ্রেষ্ঠিন বলা হত। শ্রেষ্ঠিন বণিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষা করতেন। বৌদ্ধ গ্রন্থ 'মহাবস্তু'তে বণিক শ্রেণীর সমুদ্রযাত্রার বিবরণ রয়েছে।

সমাজ নিম্নবর্গের লোকেদের মধ্যে শিকারী, বৃক্ষের ছাল বিক্রেতা, কাষ্ঠহারক, মাংস বিক্রেতার সংখ্যা ও নেহাৎ কম ছিল না। (ইন্ডিয়া আন্ডার দ্য কুষাণস্, পৃঃ ৮৫)। সেবক বর্গের মধ্যে মালী, নাট্যকার, নর্তক-নর্তকী, বিদূষক এবং পুরসুন্দরী'র উল্লেখ ও পাওয়া যায়। তবে কুষাণ যুগে ব্রাহ্মণ বর্গের সেইরূপ প্রভাব দৃষ্ট হয় না। কুষাণ যুগের ইতিহাস সম্পর্কিত তথ্য ব্রাহ্মণ এবং পুরাণ গ্রন্থ সমূহে সেইভাবে উল্লেখিত হয়নি। সম্ভবত এর মূল কারণ ছিল কুষাণ রাজাদের বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরাগ। অপরদিকে কুযাণরা অ-ভারতীয় হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণবাদী সংস্কৃতি তাঁদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে নি। (পৌরাণিক ধর্ম এবং সমাজ, খণ্ড-২, পৃঃ ৩২১) অন্য তথ্য মতে (ইন্ডিয়া আন্ডার দ্য কুষাণস্, বি.এন.পুরী, পৃঃ ৬৩) কুষাণ যুগে ব্রাহ্মণধর্ম বেশ শক্তিশালী ছিল। মথুরা জৈন মতের প্রবল কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। জৈন গ্রন্থে নাগ উপাসক নামক একটি স্বতন্ত্র ধার্মিক সম্প্রদায়'এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

গুপ্ত এবং গুপ্তত্তোর যুগের পরবর্তী পর্যায়ে চতুবর্ণের উৎপত্তি সংক্রান্ত প্রাচীন কল্প কাহিনী পুনরাবৃত্ত হয়েছিল। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে ঘোষণা করা হয়েছে-
শুদ্রাঃ পৃথিব্যাং বহবো রাজ্ঞাং বহুবিনাশকাঃ।
তস্মাৎপ্রমাদং সুশ্রোণি ন কুর্যাৎ পণ্ডিতো নৃপঃ।। অনুশাসনপর্ব (দক্ষিণীপাঠ) ২১৪/৫৮
অর্থাৎ, শূদ্ররা রাজার বিনাশকারী এবং সেজন্যা কোন বিচক্ষণ রাজার পক্ষে এই বিশাদ সম্পর্কে অনবহিত থাকা উচিত নয়। আশ্ববমেধিক পর্বে (দক্ষিণাপাঠ, ১১৮/১৭-২০)র একটি অংশে শূদ্রদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে তাঁরা দীঘবৈর, হিংস্র, অহঙ্কারী, কোপন স্বভাব, অসত্যভাষী, প্রচন্ড লোভী, অকৃতজ্ঞ, ব্রহ্মাদূষক, অলস ও অশুচি।

শান্তি পর্বের এক স্থানে (শ্লোক ২০) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে দাস ও ম্লেচ্ছদের নিয়ন্ত্রণ করা উচিত এবং চন্ডাল এবং প্লেচ্ছদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করাই বিধেয়। পুয্যভূতি বংশের (উত্তর ভারত, ৬ শতাব্দী, খ্রীষ্টাব্দ) শাসনকালে বিভিন্ন রচনায় বারংবার বলা হয়েছে অভিনেতা, বৈন (বংশ খন্ড ছেদনকারী), স্বর্ণকার, শস্ত্রবিক্রয়ী, কর্মার (কারিগর), তুন্নরায় (দর্জি), শ্বজীবী (কুকুর দ্বারা যার জীবিকা নির্বাহ হয়), বধজীবী, রজক এবং চাক্রিকের (তৈলিক, কুম্ভকার বা সারথি) অন্ন ব্রাহ্মণ এবং স্নাতকের ক্ষেত্রে অভোজ্য। (মৃচ্ছটিক্, অঙ্ক-২, পৃঃ ৬৪) পঞ্চতন্ত্রে (পৃ: ১৫-২৬) শূদ্র ভুক্ত আহার হিসেবে নলিকা শাক, পেঁয়াজ রসুন, কুককুট, ছাত্রাক ও অলাবু (লাউ) ইত্যাদি বলা হয়েছে। পেঁয়াজ, রসুন এবং মাংস অ-ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের আহার ছিল। মধ্যদেশের কর্মকার ও কারুশিল্পীরা চন্ডাল বং অন্যান্য অস্পৃশ্য জাতির ছিল। ব্রাহ্মণরা তাঁদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতেন। (দ্য রেকর্ডস অফ্ বুড্ডিষ্ট কিংডমস্, জেমস্ লেগে, পৃঃ ৪৩)। নারদ সুক্তে (১/৩৩২) নাস্তিক (বৌদ্ধ এবং জৈন), ব্রাত্য এবং দাস'দের সংস্পর্শ ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। মৌর্যোত্তর যুগ (আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ২০০-৩০০ খ্রীষ্টাব্দ), বিশেষত খৃষ্টীয় শতক শূদ্রদের অবস্থানের ক্ষেত্রে এক গুরুতর পর্যায়ের সূচক মনুস্মৃতির শূদ্রবিরোধি ব্যবস্থাপত্র এবং পুরাণে ব্রাহ্মণ্য বিরোধি কার্যকলাপের জন্য শূদ্রদের নিন্দাবাদ এক তিক্ত সামাজিক সংঘর্ষ ও অস্তিরতার পর্বের ইঙ্গিত বহন করে। সম্ভবত শক্তিশালী রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং বণিক শ্রেণীর উত্থান ও হস্তশিল্পের উন্নতির কারণে শুদ্র বা দাসদের অবস্থানগত পরিবর্তন হয়েছিল। প্রথম দুটি খ্রীষ্টিয় শতক ছিল হস্তশিল্প, বাণিজ্য, মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন এবং নগরায়নের যুগ।

বৌদ্ধযুগে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার ফলে বৃত্তিগোষ্ঠীগুলি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্র সমূহের উন্নতি সাধন করতে সচেষ্ট হয়েছিল। অপরদিকে সমাজের একটি বৃহত্তর অংশ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের ফলে বৈশ্য এবং শূদ্রদের একত্রিভূত শ্রেণী (মধ্যশ্রেণী) রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়ে স্বাধীন বৃত্তিতে মনোনিবেশ করেছিল। ব্রাহ্মণ গ্রন্থে জৈন, বৌদ্ধ এবং আজীবকদের শূদ্রের পর্যায়ে নামিয়ে রাখা হয়েছিল।
কেননা এই সকল সম্প্রদায়ে শূদ্র এবং অন্ত্যজ শ্রেণী নির্বিভেদে যোগ দিতে পারতেন। এদের মধ্যে সব থেকে শক্তিশালী বৌদ্ধধর্মে নারী এবং পুরুষ নির্বিশেষে সংঘে যোগদান করতে সক্ষম ছিলেন।
মঝিম নিকায়ের অস্সল্যায়ন সুত্তে বর্ণিত আছে যে ভগবান বুদ্ধ ব্রাহ্মণদের মতবাদের বিরুদ্ধে বলেছিলেন। কারণ তাঁরা মনে করেন যে তাঁরা সকল অপর শ্রেণীগুলি হতে শ্রেষ্ঠ। এই সুত্ত যোন-কম্বোজ অঞ্চল সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন কারণ এখানে বর্ণ বা জাতি ব্যবস্থা ছিল না। ভগবান বুদ্ধ অস্সল্যায়নকে জাতি প্রথা সম্বন্ধীয় এবং বর্ণ বা জাতি সম্পর্কে ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ে অনেক প্রশ্ন করেছিলেন যে ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠতা সম্বন্ধে দাবীর কোন দৃঢ় ভিত্তি ছিল না। (বৌদ্ধকোষ, ২ খণ্ড, পৃঃ ১৫৩)।
বৌদ্ধত্তোর যুগে (১০০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দ) কারুশিল্প তথা বাণিজ্যের অবনতির কারণে বণিক (বৈশ্য) ও কারুশিল্পী (বৈশ্য-শূদ্র) দের প্রতি ভূস্বামী শ্রেণীর (ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়) কঠোর ধর্মীয় সংকীর্ণতার ফলে তাঁদের রাখা হলে অস্পৃশ্যের পর্যায়ে। এর জন্যই বজ্রসূচী তথা পরবর্তী পুরাণ সমূহের তালিকায় বহু সংখ্যক পেশার মানুষের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁরা সকলেই শূদ্র।

প্রাচীন বঙ্গদেশের বর্ণ ব্যবস্থা এবং ধর্মচিন্তা

প্রাচীন ভারতের বর্ণবিন্যাস, মধ্যযুগীন ভারত এবং বর্তমান বঙ্গীয় সমাজের (পশ্চিমবঙ্গ এবং অধুনা বাংলাদেশ) অভ্যন্তরে নিহিত ধর্মচিন্তার মধ্য দিয়ে বঙ্গের বর্ণ বিন্যাসের প্রথম পর্বের ইতিহাস অনুসন্ধান একটি গভীর তাৎপর্য পূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। কেননা বঙ্গদেশে'র খাদ্যাভাষ এবং বিবাহ গত ধর্মীয় বিঘিনিষেধ বহুযুগ ধরে পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী (বর্তমান হিন্দু ধর্ম) সমাজের একটি বিশেষ বর্ম বিন্যাস যার উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মূল উপাদান রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, মণু বোধায়ন (বৌধায়ন) প্রভৃতি স্মৃতি এবং সূত্রকারদের গ্রন্থে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। অপরদিকে বৌদ্ধ এবং জৈন গ্রন্থ সমূহে বঙ্গদেশের বর্ণ বিন্যাস সম্পর্কিত বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

নীহার রঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ: ২৯৪) এর মতে, "প্রাচীন স্মৃতিগ্রন্থগুলির একটি ও বাঙলাদেশে রচিত নয়, কাজেই বাঙলার বর্ণবিন্যাস গত সামাজিক অবস্থার পরিচয় ও তাহাতে পাওয়া যায় না, আশা করাও অযৌক্তিক এবং অনৈতিহাসিক।" বস্তুত, একাদশ শতক হতে "বাঙালী স্মৃতি ও পুরাণকারেকা সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে বাঙলার সমাজ ব্যবস্থাকে প্রাচীনতর ব্রাহ্মণ্য স্মৃতির আদর্শ ও যুক্তি পদ্ধতি অনুযায়ী ভারতীয় বর্ণ বিন্যাসের কাঠামোর মধ্যে বাঁধিবার চেষ্টা আরম্ভ করেন।"
বাঙলার অর্থাৎ প্রাচীন বঙ্গদেশের বর্ণবিন্যাস সম্পর্কিত আলোচনা করতে গেলে তৎকালানী বাঙলার আর্থীকরণ'এর সূত্রপাত সম্পর্কিত সামান্যতম জ্ঞান থাকা আবশ্যক নতুবা সমগ্র বিষয়টি অন্তঃসার বাধ্য। আর্যীকরণ এবং বর্ণবিন্যাসের ইতিহাস নিম্নলিখিত সাহিত্যগত উপাদানের অভ্যন্তরে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। যেমন-
ক. রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, মনুস্মৃতি, বৌধায়ন স্মৃতি।
খ. প্রাচীন বৌদ্ধ এবং জৈন গ্রন্থসমূহ।
গ. উত্তরবঙ্গে এবং বাঙলাদেশের অন্যত্র গুপ্ত সাম্রাজ্যের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে আর্থীকরণ তথা বাঙলার বর্ণ বিন্যাসের দ্বিতীয় পর্বের সূত্রপাত হয়। এই সময়কাল হতে আরম্ভ করে একে বারে ত্রয়োদশ শতকের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত বর্ণ বিন্যাস ইতিহাসের অসংখ্যা উপাদান বাঙলার বহু লিপিমালায় বিদ্যমান।
ঘ. সমকালীন দু একটি কাব্যগ্রন্থ, যেমন- 'রামচরিত' ইত্যাদি।
৫. ভগদেব ভট্ট এবং জীমূত বাহনের কয়েকটি গ্রন্থ (সেন এবং বর্মন যুগ'এর)।
চ. বৃহদ্ধর্ম পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ।
ছ. বল্লাল রচিত (গোপাল ভট্ট এবং আনন্দ ভট্ট কৃত)।
জ. বাঙলার কুলজী গ্রন্থমালা।
ঝ. সহজযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গ্রন্থ, চর্যাচর্য্য বিনিশ্চয় বা চর্যাগীতি বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদে (চর্যাগীতি) রচনাকাল ১০-১২ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) পর্যন্ত এবং এই রচনায় তৎকালন বাঙলার অন্ত্যজ শ্রেণীর (ডোম, চন্ডাল বর্ণ সংবাদ পাওয়া যায়।

বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের বর্ণ ব্যবস্থার চিত্র প্রায় এক ও অভিন্ন; এবং তা যে বাঙলাদেশ সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রযোজ্য একথা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। তবে এই দুই গ্রন্থদয়ের রচনাকাল নির্ণয় করা কঠিন এবং দুসাধ্য ও বটে, তবে এর কাল ১২ শতাব্দী আগে নয় এবং ১৪ শতাব্দীর পরে নয় বলে অনুমান করা হয়েছে। নীহার রঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃঃ ২৯৫) বলেছেন, "প্রথমোক্ত পুরাণটিতে পদ্ম ও বাঙলাদেশের যমুনা নদীর উল্লেখ, গঙ্গার তীর্থ মহিমার স-বিশেষ উল্লেখ, ব্রাহ্মণের মাছ-মাংস খাওয়ার বিধান (যাহা ভারতবর্ষে আর কোথাও বিশেষ নাই), ব্রাহ্মাণেতর সমস্ত শূদ্রবর্ণের ছত্রিশটি উপ ও সংকর বর্ণে বিভাগ (বাঙলার তথাকথিত 'ছত্রিশ জাত' যারা ভারতবর্ষে আর কোথা ও দেখা যায় না) ইত্যাদি দেখিয়ে মনে হয় এই পুরাণটির লেখক বাঙালী না হইলে ও বাঙলাদেশের সঙ্গে তাঁহার সবিশেষ পরিচয় ছিল।"

ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য বর্ণের পৃথক উল্লেখ এতে (বৃহদ্ধর্মপুরাণ) নেই। সৎ ও অসৎ' এই দুই পর্যায়ে শূদ্রদের বিভক্ত করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণদিগের পরেই অন্বষ্ঠ (বৈদ্য) এবং করণ (কারস্থ) দের স্থান নির্ণয় করা হয়েছে। এছাড়া শঙ্খকার (শাঁখারী), মোদক (ময়বা), তত্ত্ববায়, দাস (কৃষক), কর্মকার, সুবর্ণবণিক ইত্যাদি উপ ও সংকর বর্ণের জাতির উল্লেখ ও রয়েছে।
বাঙলাদেশ প্রকৃত অর্থে উত্তর ভারতের পূর্ব প্রত্যন্ত দেশ হওয়ার কারণে আর্য-ব্রাহ্মণ সংস্কার এবং সংস্কৃতির স্পর্শ ও প্রভাব এই দেশে সকলের পরে প্রবেশ করেছে।
আনন্দ ভট্ট বিরচিত 'বল্লাল চরিত' (রচনাকাল ১৫১০ খ্রীষ্টাব্দ) নামক গ্রন্থে বল্লাল কর্তৃক বণিকদিগের প্রতি অত্যাচার, সুবর্ণ বণিকদের সমাজে 'পতিত' করা এবং কৈবর্ত প্রভৃতি বর্ণের লোকেদের উন্নীত করা ইত্যাদি কাহিনী বর্ণিত আছে। ঐতরেও ব্রাহ্মণ গ্রন্থে পুণ্ড্র প্রভৃতি জনপদের জনসাধারণ কে 'দুস্য' বলা হয়েছে। বৌধায়নের ধর্মসূত্রে বঙ্গ (পূর্ব বাঙলা), পুণ্ড্র (উত্তরবঙ্গ) প্রভৃতি কৌমের জনগদণকে আর্য বহির্ভূত অঞ্চলের বাসিন্দা বলা হয়েছে।

বাঙালীর ইতিহাস গ্রন্থে (আদিপর্ব, পৃঃ ৩০২) স্পষ্টভাবে ব্যাখাত হয়েছে যে, "লিপিপ্রমাণ হইতে মনে হয় গুপ্ত আমলে আর্য ব্রাহ্মণ্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ব্রাহ্মণ্য বর্ণ বিন্যাস, ধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতি এদেশে সম্যক স্বীকৃতই হয় নাই। তাহার পরে ও ব্রাহ্মাণ্য বর্ণ বিন্যাসের নিম্নস্তরে ও তাহার বাহিরে সংস্কার ও সংস্কৃতির সংঘর্ষ বহু দিন চলিয়াছিল, সেন বর্মণ আমলে (একাদশ-দ্বাদশ শতকে) বর্ণ সমাজের উচ্চস্তরে আর্যপূর্ব লোক সংস্কৃতির পরাভব সম্পূর্ণ হয়।"

গুপ্ত যুগের লিপিমালা ও দানপট্ট সমূহে ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণ্য প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ দেখা যায়। প্রথম হতে পঞ্চম দামোদর পুর লিপিতে (খ্রীষ্টশতক ৪৪৩-৪৪ থেকে ৫৪৩-৪৪ পর্যন্ত) ব্রাহ্মণদের ভূমি প্রদানের প্রসঙ্গ রয়েছে। বিজয় সেনের মল্লসারুল লিপি (ষষ্ঠ শতক) এবং জয়নাগের বস্যঘোষবাট লিপিতে (সপ্তম শতক) ব্রাহ্মণদের ভূমি ও দেব মন্দির নির্মাণের অর্থদান বিষয়টি দৃষ্ট হয়। ষষ্ঠ শতদের ফরিদপুর এবং সপ্তম শতকের লোকনাথ লিপির সাক্ষা ও একই প্রকার, এখানে শর্মা, ভট্ট, আচার্য, চট্ট এবং স্বামী পদবী যুক্ত বৈদিক ব্রাহ্মণ শ্রেণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত এরা বাঙলাদেশের বাইরে অর্থাৎ পশ্চিম বা দক্ষিণ হতে এসেছিলেন। মনুস্মৃতিতে কৈবর্তদের বলা হয়েছে সংকর বর্ণ, কিন্তু বিষ্ণু পুরাণে তাদের বলা হয়েছে 'অব্রহ্মণ্য', অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্য সমাজ বহির্ভূত।

ষষ্ঠ শতকের (গুণাইঘর লিপি, ৫০৭-৮ খ্রীষ্টাব্দ) লিপিতে ত্রিপুরা রাজ্যের জনৈক নাথ শর্মা নামক একজন মহাযানিক এর উল্লেখ পাওয়া যায় যিনি আর্য অবলোকিতেশ্বর'এর আশ্রম-বিহারের জন্য অর্থ সংগ্রহের নিমিত্তে মগধে এসেছিলেন।
কায়স্থদের বর্ণগত উৎপত্তি সম্পর্কে লিপিমালা এবং অর্বাচীন স্মৃতি গ্রন্থাদি সমূহে নানা প্রকার কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। ১০৪৯ খ্রীষ্টাব্দের কলচুরীরাজ কর্ণের জনৈক কায়স্থ মন্ত্রীর একটি লিপিতে কায়স্থদের 'দ্বিজ' (৩৪ শ্লোক) বলা হয়েছে, অন্য স্থানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে তাঁরা শূদ্র ছিলেন। ন্যায় কন্দলী গ্রন্থের লেখক শ্রীধরের (৯৯১ খ্রীষ্টাব্দ) পৃষ্টপোষক ছিলেন পাণ্ডুদাস, তাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছে 'কায়স্থ কুল তিলক' রূপে।

নীহার রঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, পৃঃ ৩১২-৩১৩) এর মতে, "বাঙলার বর্ণ বিন্যাস ব্রাহ্মণ এবং শূদ্রবর্ণ ও অন্ত্যজ ম্লেচ্ছদের লইয়া গঠিত, করণ-কায়স্থ, অন্বষ্ঠ বৈদ্য এবং অন্যান্য সংকর বর্ণ সমস্তই শূদ্র পর্যায়ে: সর্বনিম্নে অন্ত্যজ বর্ণের লোকেরা। দ্বাদশ ত্রয়োদশ শতকের এই বর্ণ বিন্যাস পঞ্চম অষ্টম শতকে খুব সুস্পষ্টভাবে দেখা না দিলেও তাহার মোটামুটি কাঠামো এই যুগেই গড়িয়া উঠিয়াছিল, এই অনুমান করা চলে।' বাঙলার স্মৃতি পুরাণ ঐতিহ্যে ক্ষত্রিয় বর্ণের সবিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় না। 'রামচরিত' গ্রন্থের টীকাকার পাল বংশকে ক্ষত্রিয় বংশ বলে দাবী করেছেন। লামা তারনাথ (তারানাথ) বলেছেন, গোপাল ক্ষত্রিয়ানির গর্ভে জনৈক বৃক্ষ দেবতার পুত্র, এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে টোটেম চিন্তার ইঙ্গিত বহন করে। আবুল ফজলের মতে, পাল রাজারা কায়স্থা। তবে পালেরা যে বর্ণ হিসেবে 'দ্বিজ' শ্রেণীভূক্ত ছিলেন না, তারনাথ (তারানাথ) এবং আবুল ফজল উভয়েরই ইঙ্গিত যেন সেই দিকে। বস্তুত বাঙলার কোন কালেই ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য সুনির্দিষ্ট বর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে নি।

আর্য মঞ্জুশ্রী মূল কল্পে গ্রন্থকার স্পষ্ট অর্থেই বলেছেন, মাৎস্যন্যায়ের পর গোপালের অভ্যুদয় কালে সমুদ্রতীর পর্যন্ত স্থান তীর্থিক (ব্রাহ্মণ?) দের অধ্যুষিত ছিল, বৌদ্ধ মঠ গুলি জীর্ণ হয়ে পড়েছিল, লোকে সেই সকল জীর্ণ মঠ হতে ইট কাঠ সংগ্রহ পূর্বক গৃহাদি নির্মাণ করেছিল। ছোট বড় ভূস্বামীরা ও তখন অনেকে ব্রাহ্মণ। তীর্থিক রাজা শশাঙ্কের কারণে সমগ্র গৌড় বঙ্গ হতে বৌদ্ধরা বিলুপ্তপ্রায় হয়েছিল। পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল স্বয়ং ব্রাহ্মণাণুরক্ত হওয়ার কারণে মাৎস্যন্যায়ের পর নতুন করে ব্রাহ্মণ শাস্ত্র শাসনানুযায়ী বিভিন্ন বর্ণ গুলিকে সুবিন্যস্ত করা হয়।

বর্মন রাজবংশ (১১০০-১২০০ শতক) ছিল প্রবল বৌদ্ধ বিদ্বেষী এবং পরম বিষ্ণুভক্ত। এই বর্মন বংশের অন্যতম মন্ত্রী স্মার্ত ভট্ট বৌদ্ধদের প্রতি মোটেই শ্রদ্ধাবান ছিলেন না। তিনি বৌদ্ধদের 'পাযনজবৈতন্ডিক' রূপে চিহ্নিত করে 'শূদ্রভুক্ত' করেছিলেন। বর্মন রাজা জাত বর্মা উত্তরবঙ্গ অভিযান কালে 'সোমপুর বৌদ্ধ মহাবিহার' অগ্নি দ্বারা ধ্বংস করে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বর্মন রাজাদের কীরূপ মনোভাব ছিল তা নালন্দা হতে প্রাপ্ত একটি লিপি হতে অবগত করা যায়। বস্তুত, পাল বংশ ও পাল রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করে সেন বংশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, অপরদিকে চন্দ্রবংশকে ধ্বংস করে বর্মর বংশের প্রতিষ্ঠা। যে দুটি বংশ এবং রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়েছিল তারা উভয়েই বৌদ্ধ এবং যে দুটি বংশ ও রাষ্ট্র নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তারা উভয়েই ভিনপ্রদেশাগত, উভয়েই নৈষ্টিক ও গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতির ধারক পোষক। বাঙলার আর্থ সামাজিক ইতিহাসের দিক হতে এই দুটি তথ্যই গভীর ও ব্যাপক অর্থবহ বলেই প্রমাণিত হয়।

সেন-বর্মন-দেবরাষ্ট্র এবং রাজবংশ বাঙলার অতীত সামাজিক বিবর্তনের ধারা, বিশেষভাবে, গৌরবময় বৌদ্ধ পাল চন্দ্র যুগের ধারা, গতি প্রকৃতি তথা আদর্শকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বৈদিক, স্মার্ত এবং পৌরাণিক যুগ বাঙলাদেশে পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। ফলে পরিনাম স্বরূপ সমাজ ব্যবস্থায় কোন ও ঔদার্য, অন্যতর আদর্শ এবং উদার ব্যবস্থার কোনও স্বীকৃতি আরও অবশিষ্ট রইল না, ব্রাহ্মণ্যধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতি এবং তদনুযায়ী সমাজ ও বর্ণ ব্যবস্থা বাঙলার সমাজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করল। সেন বংশ প্রতিষ্ঠি 'কৈৗলিন্য প্রথা' বাঙলাদেশে বর্ণ বিন্যাসের ক্ষেত্রটিকে ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে (রাষ্ট্রের ইচ্ছায়) সর্ব উপায়ে সবলে স্থালন করল। অপরদিকে বৌদ্ধরা সমাজে 'পতিত' রূপে গণ্য হলেন এবং সেই পাতিত্যের কারণ বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দ্বারা সীমাহীন অত্যাচার। বল্লালসেনের 'দানসাগর' গ্রন্থে দেখা যায় যে, বৌদ্ধরা রাষ্ট্রের অকৃপাদৃষ্টির প্রভাবে 'শূদ্র' ভুক্ত হয়েছিল। এই দৃষ্টান্ত ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত অনবরতই পাওয়া গেছে।

সন্দর্ভ গ্রন্থসূচী:
১। ভারতের সভ্যতা ও সমাজ বিকাশে ধর্ম শ্রেণী ও জাতিভেদ, সুকোমাল সেন, এন বিএ, কলকাতা, জুলাই ২০১০।
২। ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৬।
৩। বর্ণ ব্যবস্থা ও জাতিভেদ প্রথা, আচার্য বীরেশ্বর গঙ্গোপাধ্যায়, রক্তকরবী, যাদবপুর, জানুয়ারী, ২০২৫।
৪। প্রাচীন ভারতে শূদ্র, রামশরণ শর্মা, কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, কলকাতা, ১৯৯৯।
৫। মনুস্মৃতি, উৎপল মিত্র, এনবিএ কলকাতা, জানুয়ারী ২০২৫।
৬। প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতার ইতিহাস, রমেশ চন্দ্র দত্ত, দীপায়ন, কলকাতা, অক্টোবর, ২০১৮।
৭। সংস্কৃত বাঙ্ময় এর বৃহৎ ইতিহাস (বেদ), সম্পাদক অধ্যাপক ফুলচন্দ্র জৈন প্রেমী এবং রামশংকর ত্রিপাঠী, উত্তর প্রদেশ সংস্কৃত সংস্থান, লক্ষ্ণৌ, ২০০৭।
৮। প্রাগুক্ত, উপনিষদ।
১। প্রাগুক্ত, পুরাণ।
১০। বৌদ্ধধর্ম এবং কুষাণ যুগ, ড. অরুণ কুমার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশন বারাণসী, উত্তর প্রদেশ, ২০১০।
১১। বৌদ্ধ জৈন চার্বাক দর্শন, পদ্মভূষণ আচার্য এবং বলদেব উপাধ্যায়, উত্তরপ্রদেশ সংস্কৃত সংস্থান, লক্ষ্মৌ, ২০০৭।
১২। বৌদ্ধ ধর্ম বিকাশের ইতিহাস, ড. গোবিন্দ চন্দ্র পান্ডে, উত্তর প্রদেশ হিন্দি সংস্থান, লক্ষ্ণৌ ২০১০।
১৩। বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), নীহার রঞ্জন রায়, দেজ পাবলিশিং কলকাতা, সাক্ষরতা সংস্করণ ১৩৮৭।
১৪। বঙ্গদর্পণ, ১ম খণ্ড, সমাজ রূপান্তর সন্ধচনী তৃতীয় সহস্রাব্দ কমিটি, কলকাতা, ২০০৫।
১৫। বৌদ্ধ কোষ, দ্বিতীয় খণ্ড (প্রথম খণ্ডের পরিশিষ্ট সহ), পালি বিভাগ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়স ১৯৯৭-৯৮।

No comments:

Post a Comment