Sunday, June 28, 2026

ভাষাতত্ববিদ সুকুমার সেন বৌদ্ধ মননশীল ভাবধারা

 ভাষাতত্ববিদ সুকুমার সেন বৌদ্ধ মননশীল ভাবধারা

- সুমনপাল ভিক্ষু


"বাংলা সাহিত্যের সমগ্র পরিচয়ের এমন পরিপূর্ণ চিত্র ইতিপূর্বে আমি পড়িনি। গ্রন্থকার তাঁর বিবৃতির সঙ্গে সঙ্গে আলোচিত পুস্তকগুলি থেকে যে দীর্ঘ অংশ সকল উদ্ধৃত করে দিয়েছেন তাতে করে তাঁর গ্রন্থ এক সঙ্গে ইতিহাসে এবং সংকলনে সম্পূর্ণ রূপ ধরেছে।"
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর সেইসব পাহাড়ের মতো উঁচু মানুষ এখন আর আমাদের অভ্যন্তরে বিদ্যমান নেই। উপস্থিত নেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, এমন কি তাঁদের আদর্শে পথ চলা ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে মানব ধর্মে উদ্দীপিত মুখ।
ইতস্তত ছড়ানো ম্যানিফেষ্টো, মানবধর্মী রচনায় সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আজও দেখা যায়। এখন এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এটা হতে পারে ধর্মমোহ। অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য আজ ভাঙ্গনের মুখে। সমাজ-সভ্যতার ক্রম বিকাশের মুখে পদাঘাত করে উদ্ভূত হয়েছে সামন্ততন্ত্রের পুরাতন পোকা খাওয়া বিজাতীয় সংস্কৃতি। তবুও সেই অঙ্গিস্ফুলিঙ্গ প্রমাণ করে চলেছে মনুষ্যত্বের কোনদিন বিনাশ নেই, হতে ও পারে না।

নেরুদা এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য বিপ্লবী কবিরা ঠিক সেইধরণের কবিতা চাইছেন, আমাদের মনে হয় তা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাতেই ইতিপূর্বে লেখা হয়েছে। এদিক থেকে বায়রন'এর কাব্যগ্রন্থটি, তার উৎসর্গপত্র সহ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মায়াকোভস্কি, নজরুল এবং তৃতীয় দুনিয়ার সাহিত্য, একই প্রসঙ্গে আমরা সুকুমার সেনের নামও উচ্চারণ করতে পারি। এক্ষেত্রে নিন্দকেরা অবশ্য বলতে পারেন সেন মহাশয় কি তাহলে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর? আমি বলব তাঁর আনুগত্য সাহিত্যের চেয়ে ঢের বেশী নীরস বাস্তব পৃথিবীর প্রতি, যে পৃথিবী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখোশপরা অসভ্য, বর্বরদের দ্বারা ধষিত এবং লাঞ্ছিত হচ্ছে।

এক অদ্ভুত চিন্তা এখন আমাদের গ্রাস করছে। তাহলে কি বলতে হয় আমার চিন্তা সম্পূর্ণই চৈতন্যরহিত, জড় পদার্থে পরিণত করেছে আমায়। অতীতের প্রতি আমাদের সীমাহীন তাচ্ছিল। কিন্তু কেন? উত্তর যদি যুগসন্ধিক্ষণ হয় তাহলে বলা হবে আমাদের আদ্ভুত এক নৈঃশব্দ এই তাচ্ছিল্যের কারণ। ফলে সামন্ততান্ত্রিক ধর্মমোহতার প্রীতি রবীন্দ্রনাথ হতে শুরু করে সুকুমার সেনের নাম আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছে। অথবা আমরা আজ অধিকতর পতিত, অর্থাৎ চর্যাপদ কিম্বা বাউল ফকির কথা এখন আমাদের কণ্ঠে আর ততটা সহজে উচ্চারিত নয়, যতটা উচ্চারিত নতজানু হওয়ার প্রবণতা।
এই অদ্ভুত আঁধারে যে কোন কথা সাহিত্যিক কিম্বা রসহীন শুষ্ক কাষ্ঠের ন্যায় ভাষাবিদ'এর নাম উচ্চারণ করা অথবা তাঁর প্রতি অপার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করা এক অর্থে হয়ে উঠবে অ্যাসাইলাম'এর সমবেত আর্তনাদ। নতুবা হাস্যকৌতুক এবং ইষাৎ বিদ্রুপ এড়ানোর প্রক্রিয়াতেই রসদ যোগাবে বলে মনে হয়। আলোচনায় বিশ্বকবির এই কবিতাটিও বিশেষ উল্লেখের অপেক্ষা রাখে।

নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস

বাংলার শিল্প এবং সংস্কৃতি এখন আর সেই অর্থে জীবিত নেই, যার রসদ হতে একটি সম্পূর্ণ শতাব্দী আলোকিত হয় অথবা হতে পারে। কিন্তু হাজার বছরের বৌদ্ধ গান ও দোঁহা এই একবিংশ শতাব্দীর সংক্রান্তিতে নতুন প্রভাতের সঙ্গীত রচনা করবে একথা ব্যক্ত করা কি অত্যুক্তি হবে। বোধ করি না। তবু ও বলতে পারি কেন না আমাকে বলতে হয় যে মানুষ অমর।

সুকুমার সেন উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর নির্মাণ। তিনি স্বয়ম্ভূ নন। কারণ যে জীবন কতসত পুলকের ভান্ডার, কত আনন্দ মুহুর্তের আলো জ্যোৎস্নার অবদানে মণ্ডিত, ইহাদের সে মাধুরীময় জীবনযাত্রার সবে তো আরম্ভ। অনন্ত যে জীবনপথ দূর হতে বহুদূরে দৃষ্টির কোন ওপারে বিসর্পিত। সে পথের ইহারা নিতান্ত ক্ষুদ্র পথিক দল, পথের বাঁকে ফুলে ফলে দুঃখে সুখে, ইহাদের অভ্যর্থনা একে বারে নতুন।।
সে পথের বিচিত্র আনন্দ যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমায় ঘর ছাড়া করে এনেছি। চল এগিয়ে যাই।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন: "শুধু বেঁচেবর্তে থাকাই তো একজন মানুষের অন্বিষ্ট নয়। নিজের ছোট্ট চিলেঘরটিতে বসে একতারা বাজিয়ে সারাজীবন প্রেম আর অপ্রেমের গান গাওয়া তাও নয়। মানুষ কোন ইশ্বর প্রেমিক বৃক্ষ নয়, সারা জীবন ধরে তাকে রাস্তার পর রাস্তা হাঁটতে হয়। আর শুধুই কি রাস্তা হাঁটা। অর্ধেক জীবন তো তার পায়ের নীচে কোন মাটিই থাকে না, তাহলে কীরকম রাস্তা একজন মানুষের? একজন...।"
বড় গাছ হয়তো স্থির থাকাটাই বেশি পছন্দ করে, কিন্তু বাতাস কি প্রশামিত হয়? উত্তর একটাই না, হয় না। আমার কাছে লেখা না বিষয়টি হচ্ছে বিশরণ প্রক্রিয়ার সময়কে, পদ্ধতি, গঠন, রঙ, পরিবেশ ও ভাবনার এক সামগ্রিক ঐক্য। প্রত্যক্ষকারী চোখ তো কয়েক মিনিটের পর ধ্বংস হয়ে যায় কখনো দ্রুত, কখনো আস্তে আস্তে। প্রতিটি বিদ্যমান বস্তুর কোন মধ্যবর্তী স্থান আছে এবং তারা কোন না কোন ভাবে যোগ সাধন করে চলেছে। আমাদের সনাক্ত করণের মূল অস্ত্র তো অর্থ। যুগ্ম বৈপরীত্যের কাঠামোর মানানসই করানোর জন্য একটি অর্থকে আবার বিপরীত ইমেজ ও বহন করে নিয়ে যেতে হয়। শেষ অবধি যদি এই অর্থ ব্ধতাকে শুধু যোগ ও বিয়োগ চিহ্ন দ্বারা চিহ্নিত করা যায়, তখন তাদের সব অর্থই নাকচ হয়ে যায়। অবশিষ্ট পড়ে থাকে শুধু যোগ বিয়োগের চিহ্নগুলি। শব্দের যে অভিধানিক অর্থ আছে আসলে লেখার অর্থ নির্ধারণে তা খুব বেশি ভূমিকা বহন করে না। ভাষার স্তরে যখন তারা নিজস্ব একটা অর্থ বহন করে এবং পরাভাষায় স্তরে আবার তারা উপাদান গুলির সংযুক্তি হিসাবে অন্যতর কিছু বহন করার আগ্রহে থাকে। ফলত এই অর্থ ও অর্থ শূণ্যতা অংশত তার উপাদান সংযোজনের দ্বারা নির্ধারণ সমালোচকেরা নিরন্তর চালিয়ে যায়। ঘটনাগুলি ন্যায্য অপেক্ষা বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। আর এই ক্রিয়ার যে কোন বিশ্লেষণই বন্ধ্য হতে বাধ্য।

সকল শিল্পকর্মেরই বিভিন্ন স্তর থেকে মানুষ রস গ্রহণ করে থাকে। প্রাথমিক স্তরে একটা টানা গল্প হয়তো থাকে হাসিকান্না সুখ দুঃখ নিয়ে বিভিন্ন জীবনের নকসা। তবে বিষয়গুলির একটু গভীর স্তরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে রাজনৈতিক, সামাজিক দ্যোতনাগুলি খেলা করছে। আরো গভীর স্তরে প্রবেশ করে যার মন তিনি দেখেন দর্শনগত ও শিল্পীর আত্মচেতনা অনুসারে দিগ্দর্শনের সংকেতগুলি। তার ও গভীরে তলিয়ে যান যিনি তিনি যে মুহুর্তগত অনুভূতির আস্বাদন লাভ করেন তাকে কথা দিয়ে ধরা যায় না। সেই মুহুর্তগুলিতে তিনি অজ্ঞেয় একটার দোরগোড়ায় গিয়ে উপস্থিত হন।... অবশ্যই সবকটি স্তরের রস ছুঁয়ে যায়। এটা হচ্ছে মহৎ শিল্পের প্রাথমিক স্তর।

বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভ্রান্ত মধ্যবিত্ত মানুষের বর্ষামুখ হয়ে উঠেছিলেন সুকুমার সেন, অন্য আর কোন কথা বলার ব্যস্ততা ছিল না তাঁর। তিনি অনুভব করেছিলেন যে তাঁর চারিদিকে অযৌক্তিক অন্ধ সমাজ ও ব্যক্তির অসহায় অবস্থার টানাপোড়েন। সমাজ, যদি ধরি, একটি পূর্বাপর সম্পর্কযুক্ত নিয়মানুগ সংগঠন, আর তাই, ঠিক মতো দখলে, সামাজিক আবেগ ও ব্যক্তির অন্তর্গত আবেগ আসলে দ্বান্ধিক। এই জটিলতায় সে তার নিজস্ব সত্তাতেই সত্য এবং স্থিত, আর ভোগ করে এক অদৃশ্য শর্তহীন শাস্তি। আধুনিকতা কোন আপাত বস্তুকে গ্রাহ্য না করে ক্রমশ আবিস্কার করতে থাকে মানুষের মানবিক সত্তাকে। এটি কোন ভঙ্গি বা ভঙ্গি নির্মাণের কৌশল মাত্র নয়। সুকুমার সেন তাই মজ্জাগত ভাবে এই উপলব্ধির সন্তান এবং বিশেষভাবে সৎ বলেই তাঁর নির্মাণ ও বিশেষভাবে সত্য।

এক্ষেত্রে আমি কাফকাকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। তবে এই উদাহরণের বিষয়টি অনেকের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক অথবা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। তবে আমি কাফকা এবং সুকুমার সেনের এই দুই বৈপরীত্যের অভ্যন্তরে একটা মিলন কেন্দ্র রয়েছে, সেটা হল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিষয়বস্তু উপস্থাপন। প্রেশট'এর মতে কাফকা ক্রান্তদর্শী কিন্তু তিনি কোন সমাধান খুঁজে পাননি এবং দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠতে পারেন নি। ....তাতে করে কি কাফকা বিস্তৃত হয়েছেন?

এ্যাবসারভ বলেছেন, অবাস্তবতার খুঁটি বলে কাফকাকে বাতিল করে দেওয়া যেমন একধরণের যান্ত্রিক সমালোচনা ছাড়া কিছু নয়,...তাঁর লেখার কোন কোন স্তর পরস্পর অদ্ভুত রহস্যমণ্ডিত, জীবনের প্রতি বিমবিষা বোধে আচ্ছন্ন, যুক্তি বর্জিত একধরণের ফ্যান্টাসি। কিন্তু এ সবই তাঁর লেখার শেষ কথা নয়। জগৎ জোড়া সাহিত্যের মহাশ্মশানে নরচর্য্যপত্র তথা অস্থিলেখনী হস্তে সংস্কৃতির শবাসনে আসীন..... বানমারা শ্লোক লিখে চলেন অবিরাম.... আর উত্তরসূরী সমক্ষে আমাদের আত্মপ্রবঞ্চক আত্মার বন্ধল খসে পড়ায়.... অনাগত কালের নির্ঘণ্টে আবাহনেই বিসর্জনের ছায়াপাতে প্রত্যক্ষ করে মদীয় সন্ততিকূল।
ইতিহাস-বিজ্ঞানী সুকুমার সেন সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে মযহারুল ইসলাম বলেছেন, ভাষা বিজ্ঞানী হিসেবে প্রফেসর সেন যে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, সেখানেও অন্ধভাবে মতকে সমর্থন না করে একটি যুক্তিবাদী চেতনাকে তিনি তাঁর বক্তব্যে সর্বদাই জাগ্রত রেখেছেন। ভাষাবিদ হিসেবেও তিনি যে ঐতিহাসিক, একথা আমরা তাঁর গ্রন্থপাঠে কখনই বিস্মৃত হই না। ভাষা বিজ্ঞানের অনেক জটিল তত্ত্বই তিনি তাঁর আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন, কিন্তু ঐতিহাসিক পারস্পর্যের কথাটি তিনি গুরুত্বসহ সর্বত্রই বিবেচনা করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি একজন বৈয়াকরণ ও বটেন। তিনি একজন পুরোপুরি বিজ্ঞানী বলেই সহনশীলতা এবং উদারতা তাঁর একটি মহৎ স্বভাব ধর্মে পরিণত হয়েছে। তিনি আমাদের যুগের একজন অসাধারণ সাধক।

কূলে কূল মা হোইরে মুঢ়া উজুবাট সংসারা।
বাল ভিন একুবাকু ন ভুলহ রাজপথ কন্ধারা।।
মাআ মোহ সমুদারে অন্ত ন বুঝাসি থাহা।
আগ নাব ন ভেলা দীসই ভান্তি ন পুচ্ছসি নাহা।। - শান্তিপাদ, ১৫ সৎ।

চর্যাপদের সহজিয়া সাধক যেভাবে পণ্ডিতী শব্দের পরিবর্তে ভিন্ন এক সংলাপ প্রস্তুত করেছেন, ঠিক সেইভাবে সুকুমার সেন ব্যবহার করেছেন সর্বসাধারণের বোধগম্য সরস ভাষা। তিনি ইতিহাসের রস সন্ধানে বোধগম্য বিষয় এবং ভাবকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর এই কারণেই তিনি হয়ে উঠেছেন বৌদ্ধ, সাহিত্য ইতিহাস অনুসন্ধানের মূর্ত প্রতীক। সাহিত্য ভাষা নির্ভর। আগে ভাষা পরে সাহিত্য। অথবা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য। যে ভাষা আদিম অথবা অনুন্নত তাহাতে সহসা সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। তবে যে ভাষা উন্নত কোন ভাষার রূপান্তর, তাহাতে সাহিত্যসৃষ্টি ভাষার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ঘটিবার পক্ষে বাধা নাই। বাঙ্গালা এই রকম একটি ভাষা। অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে বাঙ্গালা ভাষার বিশেষ কোন নাম ছিল না। সাধারণ শিক্ষিত লোকেরা দুইটি দেশীয় ভাষার নাম জানিতেন। এক, সংস্কৃত, শাস্ত্রের ও পাণ্ডিত্যের ভাষা, আর মাতৃভাষা অর্থাৎ বাঙ্গালা। যেমন
শ্রীকর নন্দী (১৬ শতক, প্রথমার্দ্ধ)
দেশি ভাষে এহি কথা করিয়া প্রচার
সঞ্চরউ কীর্ত্তি মোর জগৎ ভিতর।
দৌলত কাজী (মধ্য ১৭ শতক)
দেশি ভাষে কহ অক পাঞ্চালীর ছন্দ
সকলে শুনিয়া যেন বুঝয়ে সানন্দ।
ভারতচন্দ্র রায় (১৮ শতক, প্রথমার্দ্ধ)
না রবে প্রসাদ গুণ না হবে রসাল
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।

সুকুমার সেন'এর লেখন শৈলী দুরস্থ প্রিজন্মের ন্যায়, বহুমুখী আলোক বিচ্ছুরনে কখনো উদ্ভাসী, কখনো তির্যক। তাঁর স্টাইল আপাত-শান্ত ভাষা ও নির্মাণ যেন এক উজ্জ্বল উদ্ধার, ভেতরে ভেতরে। মায়াকোভস্কি'র ভাষাতে:
একটি মাত্র শব্দের জন্য
তুমি একটন ভাষার খনিজ
হেঁটে চলেছ।

আমরা তবুও কেন জানিনা সুকুমার সেনকে ভালোবাসতে পারিনি। আসলে আমরা কাপুরুষ তাই। অন্ধ এবং মানসিক ত্রাস আমাদের গ্রাস করেছে। আমাদের জীবন দর্শন আজ হয়ে উঠেছে এ্যাবসারভ, অবোধ্য ও পলায়নমুখী। আমরা আমাদের সামন্ততান্ত্রিক দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠতে পারিনি। কর্দমাক্ত জীবনের কালখণ্ডে মৃত্যু ঘটেছে হুতোমের, কারণ কৃষ্ণপক্ষের তামসিকতায় আচ্ছন্ন। উপশম এর উপায় ও নেই। এখন আমরা নিরুপায় হয়ে জগতের আশা হতে বহুদুরে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের পূর্ব সাধক দ্বারা লিখিত পুঁথিগুলি দগ্ধ হতে হতে ক্রমশঃ নিঃশেষ হয়ে এসেছে। এখন আর আমাদের অভ্যন্তরে কোনরূপ সম্ভাবনার বীজ উপ্ত হয় না। যে ফরাসী বিপ্লবের উত্তর ইউরোপীয় জীবন বোধ একসময় আছড়ে পড়েছিল বাংলা সাহিত্যের বেলাভূমিতে। রচিত হয়েছিল ইতিহাস, কাব্য-সাহিত্য। এখন শুধুই বিষাদসিন্ধু। হে জ্ঞান তাপস মহাসাধক সুকুমার সেন। আপনি এই অর্বাচীন বাঙালী সমাজকে ক্ষমা করুন।

ভাষার নিজস্ব পৃথিবী এবং সুকুমার সেন

ভাষার একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে, কিন্তু ওই পৃথিবী তথাকথিত কোন দেবভোগ্য স্বর্ভারাজ্যের মতো অপরিবর্তনীয় নয়। সময় তাকে প্রতিনিয়তই পরিবর্তন করে, এবং তা নানাদিক থেকে, নানা ভাবে। যা কিছু অর্থাৎ ভাষার জলবায়ু, আলোবাতাস, তার মাটি, আকাশ দেখা যায় আমাদের চোখের পলক পড়ার আগে তাদের রং ক্রমশই বদলে যাচ্ছে। কখনো বা দেশবিদেশের কবিতা অথবা সাহিত্য পাঠে আমাদের এমন সন্দেহের মুখোমুখি হতে হয় যে, ভাষার পৃথিবী ভাষার ঠিক নিজস্ব নয়। সেখানে প্রচন্ড ঝড় বইছে...।

অতুল সুর'এর মতে, বাংলার স্বকীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা। অন্যান্য রাজ্যের ভাষার তুলনায় বাংলা ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী। এভাষার ভিত্তি স্থাপন করেছিল বাংলার আদিম অধিবাসীরা। সুকুমার সেন'এর মতানুসারে, ভাষা নিয়ে জাতি, জাতি নিয়ে দেশ। বাংলা ভাষার উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি জাতির ইতিহাস শুরু। কিন্তু বাংলা ভাষার পূর্ণ ইতিহাস আছে। সংস্কৃত বাংলা দেশের আদিম ভাষা নয়। (আদিম ভাষা নিশ্চয়ই একটা অথবা অনেকগুলি ছিল কিন্তু সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই অবগত নই।)
তথাকথিত পণ্ডিতগণ মান বহন করেন কি নিয়ে? তাঁদের মান হল মিথ্যা ইতিহাস, পুরানত্ব ইত্যাদি কিন্তু এইটি সত্য নয়, কারণ অন্ধ অহংবোধের পাণ্ডিত্য নিয়ে অলির ন্যায় গুঞ্জন হয়তো সাময়িক সুখানুভূতির রস প্রদান করতে পারে তবে তা প্রকৃত সত্যের সহায়ক হয় না। কারণ নৈব নৈব চ। ভাষাবিদ সুকুমার সেন কিন্তু সেপথে হাঁটেন নি। বিষয়টিকে চর্যাপদের ভাষায় এইভাবে বলা যায়-
নিঅ-সহাব নউ কহিঅউ অন্নে।
দীসই গুরু উবএসেঁ ন অন্নে।।

যারা নিপুন সাধক তাঁদের মন নিঃশেষে যায় বিলীন হয়ে সহজের মধ্যে যেমন জল যায় নিঃশেষে বিলীন হয়ে জলের মধ্যে।

গ্রীক চিন্তানায়ক হেরাক্লিটাস বলেছেন, মানুষ একই নদীতে দু-বার স্নান করে না। হেরাক্লিটাস যে অর্থেই কথাটা বলে থাকুক একটা অর্থ নিশ্চয়ই এই যে, মানুষ একই অভিজ্ঞতার প্রবাহে একাধিকবার অবগাহন করতে চায় না, বোধ হয় সম্ভব ও নয়, নূতন থেকে নূতনতর অভিজ্ঞতা তাকে আকর্ষণ করে। জীবনের একটা পর্বে, প্রায় ৬-৭ বৎসর, প্রাচীন বাঙালীর ইতিহাস ছিল আমার ধ্যান জ্ঞান, পঞ্চেন্দ্রিয়, প্রাণ মন বুদ্ধি সমস্তই ছিল সেই জীবন প্রবাহে সদাসন্তর মান।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র দুঃখ করে বলেছিলেন, বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নইলে বাঙ্গালী কখনও মানুষ হবে না...। তিনি শুধু রাজা ও রাষ্ট্রের ইতিহাস কামনা করেন নি, চেয়েছিলেন বাঙালীর সেই ইতিহাস যে ইতিহাস বলবে: কোন ধর্ম কতদূর প্রচলিত ছিল?... তখনকার লোকের সামাজিক অবস্থা কিরূপ? সমাজ ভয় কিরূপ? ধর্ম ভয় কিরূপ বাণিজ্য কি রূপ, কি কি শিল্পকার্যে পরিপাট্য ছিল?.... ইত্যাদি।
রাষ্ট্র.... অর্থনৈতিক বিন্যাস ইত্যাদি সকল কিছুই গড়ে তোলে মানুষ, এই মানুষের ইতিহাসই মূলঅর্থে যথার্থতার ইতিহাস। এই মানুষই পরিপূর্ণ বা সম্পূর্ণ মানুষ, তার একটি কর্ম অপর কর্ম হতে বিচ্ছিন্ন নয় এবং বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে সমস্ততাই অন্তঃসার শূণ্যতায় পর্যবসিত হয়। সুতরাং কর্মের সঙ্গে অপরাপর কার্মকে সম্পৃক্ত করে দেখলে তবেই তার সম্পূর্ণ রূপ এবং প্রকৃতি উদ্ভাসিত হবে। দেশ কাল অনুসারে এই বিষয়টি সত্য ও সর্বত্র স্বীকৃত। এই সত্য স্বীকৃতি না পেলে ইতিহাস যথার্থ অর্থে ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে না। ভাষার ক্ষেত্রে ও এই যুক্তিটি সত্য।

'গৌড় রাজমালা' গ্রন্থের ভূমিকায় স্বর্গত অক্ষয় কুমার মৈত্র বলেছেন, রাজা, রাজ্য, রাজধানী, যুদ্ধবিগ্রহ এবং জয়পরাজয় এর সকল কথাই ইতিহাসের কথা। তথাপি কেবল এই সকল কথা নিয়ে ইতিহাস সংকলিত হতে পারে না। বাঙালীর ইতিহাসের প্রধান কথা বাঙালী জনসাধারণের কথা।

সংস্কৃতির প্রয়োজন কি?

এর উত্তরে বলতে হয় যে মানুষ তো শুধু ক্ষুন্নিবৃত্তি মূলক কর্ম কাণ্ডের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখে না। তার একটা মানসগত বা বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবন আছে। এই জীবন পদ্ধতি সকল মনুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। পুঁজিবাদী সমাজের মানসজীবন এবং সামন্ত নির্ভর সমাজের আর্য সামাজিক পরিকাঠামোর অভ্যন্তরে বিস্তর অসাম্য প্রতীয়মান হয়। বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক বিপ্লব এর মূল কারণ। সংস্কৃতির মূলে রয়েছে কায়িক শ্রম হতে অবসর, যে শ্রেণী ও বর্ণের সামাজিক ধনসঞ্চয় বা উদ্ধৃত্ত ধন বেশী তারা সেই ধনশক্তির সহায়তায় এই শ্রেণী এবং বর্ণের ও অন্য শ্রেণী এবং অন্য বর্ণের কতকগুলি ব্যক্তিবর্গকে ধনোৎপাদনগত কায়িক শ্রম হতে মুক্তি প্রদান পূর্বক অবসরের সুযোগ প্রদান করতে পারে। সেই সুযোগে ত্যার চিন্তা, অধ্যয়ন, ভাষা সংস্কৃতি ইত্যাদি বিকশিত হয়। ফলে সেই ব্যক্তি এবং তাঁর সমাজ শ্রেণীগত, নিজস্ব ও বৃহত্তর সমাজগত মানসের চিন্তা, কল্পনা, ভাব ও অনুভাবকে রূপদান করতে পারে। বৌদ্ধ যুগে প্রাচীন বাংলায় এইরূপ সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। যদিও তা ইউরোপের ন্যায় বুর্জোয়া শ্রেণীর দ্বারা গড়ে ওঠেনি। চর্যাপদের সহজিয়া সিদ্ধান্তের অভ্যন্তরে এই রূপ বিপ্লবের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন-
জাহের বানচিহ্ন রূব ন জানী 
সো কইসে আগম বেঁএ কমানী। ধ্রু। 
কাহেরে কিষ ভনি মই দিবি পিরিচ্ছা 
উদক চান্দ জিম সাচ ন মিচ্ছা। ধ্রু।।
লুই ভনই মই ভাইব কীষ
জা লই অচ্ছম তাহের উহ ন দিস।।২৯।। - লুইপাদ

বাঙালীর জনতত্ত্ব নিরূপনের কিছুটা সহায়ক উপায়, বাঙলা ভাষার বিশ্লেষণ। অবশ্য একথা সত্য যে ভাষা বিশ্লেষণের সাহায্যে নরতত্ত্ব ঠিক নির্ণয় করা চলে না, কারণ মানুষ নানা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অথবা ধর্মগত কারণে ভাষা বদলায়, একজন অন্য জনের ভাষা গ্রহণ করে এবং সেই ভাষাই দুই তিন পুরুষ পরে নিজেদের জাতীয় ভাষায় পরিণতি লাভ করে,.... ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
আচার্য গ্রিয়ার্সন হতে আরম্ভ করে উত্তরকালীন সুকুমার সেন মহাশয় পর্যন্ত বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা পণ্ডিত বাঙলা ভাষার জন্ম সম্পর্কিত ইতিহাস নিরুপন করার প্রশ্নে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। এর ফলে প্রাচীন বাঙলার ভাষা সংস্কৃতির অনেকগুলি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় আমাদের নিকট উদ্ভাষিত হয়েছে।

সুকুমার সেন সম্বন্ধে সর্বপ্রথম যে কথাটি আমাদের মনে আসে সেটি হচ্ছে যে তিনি একজন অতীব কুশলী ভাষাবিদ। তিনি আধুনিক পন্ডিত সমাজের সেইসব ভাষাবিদদের এমন একজন যিনি কেবল ফিললজি শাস্ত্রেই বিশারদ নন, লিঙ্গুইস্টিক্স নামক তরুণতর শাস্ত্রে ও বিশারদ। ফলে ভাষা সম্বন্ধে তিনি যেখানে যা উক্তি করেছেন, তাঁর প্রতিটি উক্তি গ্রাহ্য এবং মাননীয়। কিন্তু বিশেষ কোন উক্তি বা মত ছাড়িয়ে তাঁর সংগঠনী চিতা বহুদূরে এগিয়ে যায়। এই অগ্রগামিতার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত পাই তাঁর সাহিত্য বিষয়ক মতামতে, বিশেষত সাহিত্য ইতিহাসের চিন্তায়। (জ্ঞান পথিক ডক্টর সুকুমার সেন, অমলেন্দু বসু, পৃঃ ২২)।

তাঁর ইংরেজী গ্রন্থ “হিষ্টরি অব্ বেঙ্গলী লিটারেচার” পড়ে জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন-
সাহিত্যের ইতিহাস রচনা কর্মে সুকুমার সেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সব ইতিহাস রচককেই প্রশস্ত জ্ঞানপথ দেখিয়ে দিয়েছেন। ভাষা সম্পর্কে যে গভীর ও সংবেদনা থাকার ফলে সুকুমার সেন জ্ঞান মাহাত্ম্য অর্জন করেছেন, সেই ভাষা সম্পর্কে আরো একটি কথা অন্য এক পন্ডিতের রচনা থেকে উদ্ধার করছি কেননা আমার অসম্যক বিচারেও সুকুমার সেনের পান্ডিত্যের এসব কথা সত্য বিরাজ করে। যেমন
প্রশস্ত ভাষা রাজপথের আশেপাশে যেসব কথ্য ভাষার অলিগলি চলে তাকে ইংরেজিতে বলে ‘স্ল্যাং’। এই স্ল্যাং-এর সাহিত্যিক প্রয়োগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় কিছু তিন শতাব্দী পূর্বের কথ্য ভাষার সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন সুকুমার সেন।
মুড়া কাঁটা বান্ধ্যে দিল বলিঞা লেঙ্গুর। 
পুরান তালাই দিল পালান ভিড়িঞা 
শামুকের খুলি দিল ঘুঙ্গুর বলিঞা। 
ছেল্যার কান্দর শুনি রেস্যানি বেরায় 
আলকুসি উড়াইঞা দিল তাদের গায়।

এই সকল উদ্ধৃতি আঞ্চলিক ভাষায় অথবা এসব উদ্ধৃতি উপভাষায় ও কবিত্ব থাকতে পারে, অন্ততপক্ষে তৎকালীন কাব্য আদর্শের কবিত্ব, এই সকল উদ্ধৃতি যে শুধুমাত্র তৎকালীন সামাজচিত্র নয়, তৎকালীন ভাষা পরিস্থিতি হতে উদ্ধৃত কাব্য, সেকথা সুকুমার সেনের রচনা হতে সংবেদনশীল পাঠক অবগত করতে পারেন।

‘বটতলা’ সাহিত্যের ইতিহাস প্রসঙ্গে সুকুমার সেন’এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি রয়েছে। তিনি বলেছেন:
পুরাতন বাংলা সাহিত্য মোটামুটি বটতলাতে সঞ্জীবিত হয়েই আধুনিক বাঙালীর গোচরে এসেছিল। আগেকার দিনে সাধারণ বাঙালী সমাজে ব্রাহ্মণ শূদ্র নির্বিশেষে বৈষ্ণবেরাই মেয়ে পুরুষে লেখাপড়া জানতেন। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় এঁরাই ছাপা বৈষ্ণব গ্রন্থের ধারক, বাহক ও খাতক ছিলেন। কিন্তু বটতলার কৃতিত্ব শুধু পুরোনো বই ছাপিয়েই শেষ নয়, নতুন রচনা প্রকাশ করে বাংলা বানীর নৈবেদ্য সাজিয়ে গেছে এঁরা।

"বটতলার ছাপা ও ছবি" বইতে সুকুমার সেন নিছক যে বটতলার চিত্রশোভিত বই'এরই অনুপূর্ব ইতিহাস শুনিয়েছেন তা নয়, সেই সূত্রে বাংলা সচিত্র গ্রন্থের সূত্রপাতের ইতিহাস এবং মুদ্রনযন্ত্রের আদি ইতিহাস ও অতি আকষণীয় ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন।
প্যারীচাঁদ মিত্রের "আলালের ঘরের দুলাল" নামক বাংলা গদ্যটিকে সুকুমার সেন (১৯০০-১৯৯২) স্পষ্টতর অর্থে উপন্যাসের শ্রেণীতে বিশ্লেষণ করেন নি। তাঁর মতে, যদিও কাহিনীর ধারাবাহিকতা উপন্যাসের মতোই তবুও কয়েকটি কারণে বইটিকে উপন্যাস বলা চলে না। প্রথমত, প্লট খাপছাড়া রকমের, দ্বিতীয়ত, মূল কাহিনী প্রায়ই অবান্তর ঘটনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ... উপন্যাসে অপেক্ষিত প্রণয়রসের স্পর্শমাত্র নেই। (সুকুমার সেন, বাঙ্গলা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৬৪)।

সুকুমার সেন শুধুমাত্র ভাষাবিদ ছিলেন না, তিনি বাংলা সাহিত্যের অভ্যন্তরে বৌদ্ধ চিন্তা অনুসন্ধানেও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর এই মহতী উদ্যোগ হয়তো তাঁকে আরও বেশি জীবনমুখী হয়ে উঠতে সহায়তা করেছিল। এই কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গ সাহিত্য অনুসন্ধানের উত্তরকালীন জ্ঞানতাপস। তিনি বিশ্বাস করতেন, দৃষ্টিকোনের প্রসার এবং পরিবর্তন আবশ্যক নতুবা সমাজ এবং সংস্কৃতির মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

চর্যাপদের ঐতিহাসিক ভাবধারা এবং সুকুমার সেন

১। চর্যাপদ বা চর্যাগীতির স্বরূপ এবং প্রকৃতি:
আজি ভুসু বঙ্গালী ভইলী,
নিঅ ঘরিনী চন্ডালী লেলী।। ধ্রু।।
ডহি জো পঞ্চঘাট নই দিবি সংজ্ঞা নঠা,
ন জানমি চিঅ মোর কর্হি গই পইঠা ।।
সোন তরুঅ মোর কিম্পি ন থাকিউ,
নিঅ পরিবারে মহাসুহে থাকিউ ।। ধ্রু।। - ভুসুকপাদ, রাগ মল্লারী, ৪৯।
গুপ্তযুগে মহাযান সহ অন্যান্য ধর্মের সাহিত্যের ভাষা ছিল সংস্কৃত। এই ভাষাকেই অবলম্বন করে তৎকালীন বাংলার শিষ্ট কবি এবং পন্ডিত বর্গের সাহিত্য কর্ম চলত। যদি এই ভাষা সাধারণ জনগনের বোধগম্য ছিল না। পাল শাসনামলে (রাজা ধর্মপাল ৭৬৮-৮০৯) মন্ত্রযান এবং বজ্রযান'এর সংমিশ্রণে এক নতুন বৌদ্ধ মতাবাদের উৎপত্তি হয় এবং এই মতবাদ সহজযান নামে আত্মপ্রকাশ করে। সহজযানী'রা জনসাধারণের বোধগম্য অর্থাৎ কথ্য ভাষায় ধর্মতত্ত্ব, গান, ছড়া ইত্যাদি রচনা করতেন। এই সূত্র ধরে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য অর্থাৎ সহজযান মতালম্বীদের দ্বারা বাংলা ভাষা সাহিত্যে প্রথম অনুশীলনের সূচনা হয়েছিল। আর এই অনুশীলন দ্বারা মহীরুহে পরিনত হয়েছিল সিদ্ধাচার্যদের গূঢ় সাধন তত্ত্ব এবং অধ্যাত্ম অনুভূতি। যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদ নামে পরিচিত।
দেহ (হল) তরুবর পাঁচটি (সে) ভাল।
চঞ্চল চিত্তে উপবিষ্ট কাল।
সবিশ্বাসে মহাসুখ দোহাই মানিবে।
লুই বলে, গুরুকে জিজ্ঞাসি জানিবে।। - লুইপাদ, চর্যাপদ, ২৯।

অনেক ঐতিহাসিক মঙ্গলকাব্য গুলিকে বাংলা সাহিত্যের মূল শেকড় মনে করতেন। পরবর্তী সময়ে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় সিদ্ধাচার্য দ্বারা রচিত 'চর্যাপদ' গুলি আবিস্কারের মাধ্যমে এই প্রচলিত ধারণাকে নস্যাৎ করেছিলেন। চর্যাপদ'এর রচনাকাল তথা সিদ্ধাচার্যগণের সময়কাল সম্পর্কে পন্ডিতবর্গের অভ্যন্তরে বিস্তর মতপার্থক্য বিদ্যমান।

মহাপণ্ডিত রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন (পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, পৃঃ ১৪৭) এর মতে, সরহ আদিম (মূল) সিদ্ধ ছিলেন, তিনি পাল বংশীয় রাজা ধর্মপালের সমকালীন ছিলেন, তিনি পাল বংশীয় রাজা ধর্মপালের সমকালীন ছিলেন, এই কারণে তাঁর (সরহ) সময়, ৮ম শতাব্দীর উত্তরার্দ্ধ, স্বীকার করা উচিত।
ভাষাবিদ সুকুমার সেন এক্ষেত্রে অন্যান্য ভাষাবিদ এবং ঐতিহাসিকদের মতামত প্রদান করেছেন।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও তাঁহার অনুবর্তীরা বলেন লুইপাদ প্রভৃতি সিদ্ধাচার্য খ্রীষ্টিয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয়দের মতে সিদ্ধাচার্যদের কাল মোটামুটি দশম হইতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে পড়ে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দুই তিন অথবা ততোধিক শতাব্দী পিছাইয়া লইতে চান। নানা কারণে সুনীতিবাবুর মতই সমীচীন মনে হয়।

ঐতিহাসিক প্রমানে সিদ্ধাচার্যদের আবির্ভাবকালের নিম্নতম সীমা খ্রীষ্টিয় চতুর্দশ শতাব্দী, উর্ধ্বতম সীমা একাদশ শতাব্দী। (চর্যাগীতি, সুকুমার সেন, পৃ: ৫৪-৫৫)
চর্যাগান গুলির মূল উদ্দিষ্ট গভীর ব্যঞ্জনাময়। তবে এর পারিভাষিক শব্দ রহস্যমন্ডিত এবং লৌকিক তৎকাল অপরিচিত উৎপ্রেক্ষায় আকীর্ণ। যেমন -
এক সে শুন্ডিনিনী দুই ঘরে সান্ধঅ
সহজে থির করী বারুণী সান্ধে
চীঅন বাকলতা বারুণি বান্ধঅ ।। ধ্রু।। জে অজরামর হোই দিট কান্ধঃ ।। ধ্রু।
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখইআ
আইল গরাহক অপনে বহিআ ।। ধ্রু।।
সুকুমার সেন'এর অভিমত, এগুলির সাহিত্য মূল্য ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে অকিঞ্চিতকর নয়। সে সময় সাধারণ লোকের মধ্যে গানের যে রীতি চলিত ছিল সেই রীতি যথাযথ অনুসরণ করিয়াছে। এমনি গান গাহিয়া তান্ত্রিক ও যোগী সাধকেরা অযাচিত ভিক্ষাটন করিতেন।
দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ ।। ধ্রু।।
আঙ্গন ঘরপন সুন ভো বিআতী
কানেট চৈারি নিল অধরাতী ।। ধ্রু।। - কুবকরীপাদ।

চর্যাপদের ভাষা সম্পর্কিত মূল্যায়ন:

প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তথা বৌদ্ধ সহজিয়া'দের সাধন পদ্ধতি বাংলার জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রশ্নে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়। তিনি তৎকালীন নেপালের রাজদরবারের সংগ্রহশালা হতে চর্যাপদের পুঁথি আবিস্কার করেন এবং ১৩১৬ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক শাস্ত্রী মহাশয়'এর সম্পাদনায় 'হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগণ ও দোহা নামে গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়।
ভাবাবিদ সুকুমার সেনের মূল্যায়ন অনুসারে এই তথ্য পাওয়া যায় যে, চর্যাচর্যবিনিশ্চয় নামক প্রথম পুঁথির ভাষা বাংলা এবং অপরপদগুলি অপভ্রংশে অবহটঠে রচিত। মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন (পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, পৃ: ১৫৯-১৬০) বলেছেন, এই ভাষাকে পুরাতন ব্যক্তিজন "সন্ধ্যাভাষা" বলেছেন, এবং বর্তমানে তাকে "নির্গুন", "রহস্যবাদ", বা "ছায়াবাদ" বলতে পারি। গুপ্ত রাখার কারণে আমরা "প্রকৃত পৈঙ্গল” ইত্যাদি গ্রন্থে এই কাব্যের কোনরূপ উদাহরণ পাওয়া যায় না। সিদ্ধাচার্যদের কবিতার ভাষা ৮-১২ শতাব্দীর ভাষা বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর মতে সর্বপ্রথম সিদ্ধাচার্য সরহপাদ নালন্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, এই কারণে সরহের ভাষা মগহী (?) হওয়া স্বাভাবিক।

তাহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, চর্যাপদের ভাষা অর্থাৎ সিদ্ধদের ভাষা প্রকৃত অর্থে কি প্রাচীনতম বাংলা ভাষা? না কি অন্য কোন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা। বিতর্ক রয়েই যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় বলেছেন, আমরা দীপংকর শ্রীজ্ঞানকে বাঙালী বলিয়া ধরিয়া লইয়াছি। তাঁহার অনেকগুলি সংকীর্তনের পদ ছিল। একখানির নাম 'বজ্রাসন বজ্রগীতি', একখানির নাম 'চর্যাগীতি', একখানির নাম 'দীপংকর শ্রীজ্ঞান ধর্মগীতিকা'। আমার এইকথা যদি সত্যি হয় তাহা হইলে বঙ্গ সাহিত্যের সৌভাগ্য বড় কম ছিল না।
সুকুমার সেন বলেছেন, চর্যাগীতি গুলি প্রাচীন বাঙ্গালায় লেখা হইলেও ইহাতে অবহটঠের ছাপ ও ছাঁদ বেশ কিছু থাকায় কেহ কেহ এই ভাষাকে বাঙ্গালা বলিয়া নির্দেশ করিতে কুণ্ঠিত হন। কেহ কেহ আবার ইহাকে প্রাচীন হিন্দি, অর্থাৎ বাঙলা ছাড়া অপর একটি আধুনিক ভারতীয় আর্যভাষা বলিয়া মনে করেন। কিন্তু চর্যাগীতির ভাষা যে প্রধানত এবং মূলত বাংলা তাহা সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় সুনিশ্চিতভাবে প্রতিপন্ন করিয়াছেন।.... (চর্যাগীতি, সুকুমার সেন, পৃ: ৫৫)

অনেকের মতে চর্যাপদের ভাষা মগধ অঞ্চলের। রাহুল সাংকৃত্যায়ন প্রমুখ এই দাবীকে সমর্থন ও করেছেন। (পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, পৃ: ১৬৭) কিন্তু সুকুমার সেন তাঁদের এই দাবীকে নস্যাৎ করেছেন। তাঁর মতে বাংলা, ওড়িয়া এবং আসমিয়া এক মূল পূর্বপ্রান্তীয় কথ্য ভাষা হতে উদ্ভূত। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় এই ৩টি ভাষায় মধ্যে মিল থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে কোন কোন বিষয়কে স্বতন্ত্রভাবে অবলোকন করলে চর্যাপদের ভাষাকে প্রাচীন অসমিয়া কিম্বা ওড়িয়া ধরলে ভুল কিছু হয় না।

বৌদ্ধ সহজিয়া চর্যাপদ এবং সুকুমার সেন

বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকগণের সাধনপদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য দ্বারা রচিত চর্যাপদ এবং দোঁহা সমূহে অবলোকন করতে হয়, কারণ চর্যাপদ ইত্যাদিতে সহজিয়া সাধনতন্ত্রের মতবাদ সমূহ যেভাবে পাওয়া যায় তা অন্যত্র যেভাবে দৃষ্ট হয় না। ভাষাতত্ত্ববিদ এখানে অনুসন্ধান করেছেন বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন বাদের ইতিহাস এবং তার গতি প্রকৃতি।
বজ্রযান, মন্ত্রযান এবং তন্দ্রযান মর্তাদশে বৌদ্ধ সহজ সাধনার তত্ত্ব ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে পরিস্ফুট হলেও সেখানে তান্ত্রিক দেব দেবীর পূজা অর্চনা, তান্ত্রিক আচার-আচরণ মুখ্য রূপে বিদ্যমান। সহজযানের সাধনতত্ত্ব ইত্যাদিকে উপলব্ধি করতে হলে এর ইতিহাস অনুসন্ধান করা আবশ্যক নতুবা বিষয়টি অন্তঃসার শূণ্য হতে বাধ্য। বস্তুতঃ মহাযানবাদের বিবর্তিত এবং অন্তিমরূপ 'সহজযান'। অনেকের মতে উত্তরকালীন বৌদ্ধ তন্ত্রে 'সহজযান' নামক একটি বিশেষ সম্প্রদায়'এর উল্লেখ পাওয়া বজ্রযান পন্থী' সাধকদের সাধনতত্ত্বে।

প্রত্যেক জীব'এর এবং প্রত্যেকটি বস্তুর একটি সহজ স্বরূপ বিদ্যমান। এই সহজ স্বরূপকে উপলব্ধি করে মহাসুখে লীন হতে হবে। এই সিদ্ধান্ত হল এই মতাদর্শে বিশ্বাসী সাধকগণের মূল আদর্শ এবং এই কারণেই এরা সহজিয়া।
নিতা মান মুনস্থরে নিউনে জোই।
জিম জল জলহি মিলন্তে সোই।।
যারা নিপুন (অভিজ্ঞ) সাধক (যোগী) তাঁদের মন সহজের অভ্যন্তরে নিঃশেষে বিলীন হয়ে যায় যেমন ভাবে জল বিলীন হয়ে যায় জলের অভ্যন্তরে।

সুকুমার সেনের মতে, চর্যাপদের বাহ্য অর্থের বিষয় সমূহ সমসাময়িক জীবন চর্যা হতে নেওয়া হয়েছে। সেই জীবন অত্যন্ত সাধারণ ব্যক্তিবর্গের জীবন, যারা নৌকা চালায়, পশুপাখি শিকার করে, মাধ ধরে, সাঁকো তৈরী করে, এদের মধ্যে রয়েছে ডোম ডোমিনী, শবর-শবরী, চন্ডালী, মাঝি ইত্যাদি।
চর্যাপদের অর্থ- সাধারণ এবং গূঢ় (সাংকেতিক), রাগাত্মিক পদাবলী সম্পূর্ণ অর্থে গূঢ় বা সাংকেতিক। এক্ষেত্রে সুকুমার সেন'এর অভিমত হল এইরূপ -
চর্যাগীতিতে নারী-সঙ্গিনী গ্রহণের কথা আছে, কিন্তু তাহার যে বর্ণনা আছে তাহাতে সাধারণ নরনারীর দাম্পত্য বা গার্হস্থ্য সম্পর্ক স্পষ্টভাবে প্রকটিত। এবং তাহা সময়ে সময়ে এতটা যথাযথ যে গ্রাম্য বলিয়া কুন্ঠা জাগায়। কাহ্নের চর্যাগীতিতে এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। যেমন -
মেহলি চন্ডালী ঘরবি ব্রাহ্মণ
জগ বিটালত্তিতে দুই লাম্বন।
হল সহি কা-মঞি অচাভুঅ দিটা।
ব্রাহ্মণ মনস চণ্ডালিএ তুটঠা।
কুকুরীপাদের চর্যায় রয়েছে প্রহেলিকা এবং অভ্যন্তরের অর্থ যোগতত্ত্ব বিষয়ক। এখানে কুকুরীপাদ'এর ২টি চর্যায় উল্লেখ করা হল -
দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাতা ।। ধ্রু।।
আঙ্গন ঘরপন সুন ভো বিআতী
কানেট চৌরি নিল অধরাতী ।। ধ্রু।।
সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগতা
কানেট চোরে নিল কা গই মাগতাই ।। ধ্রু।।
দিবসই বহুড়ী কাউই ভরে ভাতা
রাতি ভইলে কামরু জাতা ।। ধ্রু।।
ভুসুকু'র সম্পর্কে সুকুমার সেন যে তথ্য পেশ করেছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন,
ভুসুকুর দুটি গানে তাঁর পদবীর ও উল্লেখ আছে।

....তিব্বতী ঐতিত্যে ইহাকে রাজার ছেলে বলা হইয়াছে। ইনি যোগী সাধক ছিলেন বটে তবে বৈরাগী ছিলেন না। তাহা বোঝা যায় একাধিক গানে গুরু পাকড়ানোর উপদেশ হইতে (২১, ২৩, ৪১)। ভুসুকুর গানে সেকালের অতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ছবি পাওয়া যায়।
কলা মুষা উহ ন বান
গতানে উঠি চরতা অমন ধান।  ধ্রু।। 
তব যে মুষা উঞ্চল - পাঞ্চল 
সদগুরু - বোহে করিহ সো নিচ্চল। ধ্রু।।
জবে মুষা এর চার তুটতা
ভুসুকু ভনতা তবে বান্ধন ফিটতা। ধ্রু।।২১
সংসারের সুখ পরিকল্পনা যে মরিচীকা মাত্র এই বিষয়টিও সুকুমার সেন ভুসুকুর গানের অভ্যন্তরে অনুভব করেছেন।

কাহ্ন বা কানহু (কাহু) নামে ১৩টি চর্যাগান আবিস্কৃত হয়েছে। (এই নামে অবহটঠে রচিত 'দোহাকোষ' ও পাওয়া যায়। সুকুমার সেন এর অভিমতে, কাহ্ন বা কাকু নামে যুক্ত রচনাগুলি সম্ভবত একটি মাত্র ব্যক্তির রচনা নয়। ভাষা এবং রচনানীতি অনুধাবন করলে এই সত্যে উপনীত হওয়া যায় যে কাহ্ন পরবর্তী কালের লেখক। চুরাশি সিদ্ধ অনুসারে কহ্নপা (চর্যপা) পাল রাজা দেবপাল (৮০৯-৮৪৯ খ্রীঃ) সমকালীন ছিলেন এবং তিনি সিদ্ধাচার্যের পরম্পরার ১৭তম সিদ্ধ। তবে এই কহুপা কি কাহ্ন (?) সুকুমার সেন তা ব্যক্ত করেন নি। (চর্যাগীতি, সুকুমার সেন, পৃঃ ৬২) কাহ্নের গানে নির্বাণ অবস্থার বর্ণনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর গানে জালন্মরীপাদের উল্লেখ থাকায় সুকুমার সেন (পৃ: ৬৫) মনে করেছেন যে তিনি অর্থাৎ কাহ্ন ঐ সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন।

শাখি করিব জালন্ধরী পাত্র
পাখি ন চাহই মোরি পান্ডিআচাদে।।
জালন্মরীপাদ আমি ডাকিতেছি সাক্ষে
পন্ডিত আচার্যগণ আমার বিপক্ষে।
সরহপাদ প্রাচীন সিদ্ধাচার্যগণের মধ্যে অন্যতম। সুকুমার সেন (পৃ: ৬৮) সরহ সম্পর্কে বলেছেন যে তিনি অর্থাৎ কাহ্ন ঐ সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন।
শাখি করিব জালন্ধরী পাত্র
পাখি ন চাহই মোরি পান্ডিআচাদে।।
জালন্ধরীপাদ আমি ডাকিতেছি সাক্ষে
পন্ডিত আচার্যগণ আমার বিপক্ষে।
সরহপাদ প্রাচীন সিদ্ধাচার্যগণের মধ্যে অন্যতম। সুকুমার সেন (পৃ: ৬৮) সরহ সম্পর্কে বলেছেন যে, সরহ নামটি একটু অদ্ভূত রকমের। তিব্বতী পণ্ডিতেরা নামটিকে 'সরোজ' শব্দজাত মনে করিয়াছেন তা ঠিক নয়, আমার মনে হয় নামটি সংস্কৃত সরধ (মানে মৌমাছি) শব্দ জাত। তাঁর গানগুলি সরল এবং তত্ত্বকথাপূর্ণ।

অপনে রচি রচি ভবনির্বাণ।
মিছে লোতা বন্ধাব এ অপনা। ধ্রু।।
তামেভ ন জাহই অচিন্ত জোই
জাম মরণ ভব কইসন হোই। ধ্রু।।
জইসা জাম মরন বি তইসো
জীবন্তে মতালে নাহি বিশেসো। ধ্রু।।
সরহপাদ তাঁর দোহাতে বলেছেন -
সন্ধপাস তোড়হু গুরুবঅনে।
ন্ন সুনই সোনউ দীসই নঅনে।।
পবন বহস্তে ন্নউ সো হল্লই।
জলন জলন্তে মউ সো উজঝই।।

গুরুর বচনে সকল শঙ্কাপাশ ছিন্ন কর, এই শঙ্কা দূরীভূত হয়েগেলে সহজের আভাস পাওয়া যাবে....।
বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন পদ্ধতির আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে চরম 'সাধ্য' রূপে তাঁরা যে সহজের কথা ব্যক্ত করেছেন, সেই সহজ কে তাঁরা আবার 'সহজ' রূপে এবং 'সহজানন্দ' রূপেও উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এই অর্থে বলা যায় যে সহজ'ই হল সহজানন্দ। কথাটির তাৎপর্যই বা কি?
তাৎপর্য হল এই যে সহজ স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারলে নিবিকল্প পরমানন্দ লাভ হয় এবং সেই নির্বিকল্প পরমানন্দ'ই হল প্রকৃত 'সহজানন্দ'। সহজিয়া সাধকগণ সহজানন্দকেই মহাসুখ বলেছেন। সিদ্ধাচার্য অনুসারে -
কইসনি হালো ভোম্বী তোহরী ভাভরিআলী।
অন্তে কুলিনজন মাঝে কাবালী।।
তইলো ভোম্বী সতাল বিটালিউ।
কাজন কারণ সসহর টালিউ।।
কেহো কেহো তোহেরে বিরুআ বোলই।
বিদুজন লোঅ তোরে কণ্ঠ ন মেলঈ।।

রবীন্দ্রনাথের বৌদ্ধ ভাবনা এবং সুকুমার সেন

বৌদ্ধ মানবতাবাদ ও বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জানার আগ্রহ ছিল অল্প বয়স থেকেই। তার জন্য তিনি প্রাচীন ভারতীয় দর্শন বিষয়ে বিভিন্ন পন্ডিত বর্গের নিকট হতে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, 'রবীন্দ্রনাথ একদিন আমাদের বললেন, তিনি জীবনে দুটি পন্ডিত দেখেছেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র এবং তাঁর বড়দাদা (দ্বিজেন্দ্রনাথ)......।
(সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী, ৪র্থ খন্ড, পৃ: ৬)।

তাঁরা উভয়েই ছিলেন প্রাচীন ভারততত্ত্বে পন্ডিত। রাজেন্দ্রলাল ছিলেন বৌদ্ধদশনে, দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন হিন্দু দর্শনে পন্ডিত। অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসবিদ এবং বৌদ্ধ বিশেষজ্ঞ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সংস্পর্শে আসেন। জীবনস্মৃতি'তে তিনি রাজেন্দ্রলাল সম্পর্কে লিখেছেন - এ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনেক বড়ো বড়ো সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার আলাপ হইয়াছে, কিন্তু রাজেন্দ্রলালের স্মৃতি আমার মনে যেমন উজ্জ্বল হইয়া বিরাজ করিতেছে এমন আর কাহার ও নহে।

রাজেন্দ্রলালের প্রতি তাঁর এতটা শ্রদ্ধার কারণ কী?
সুকুমার সেন বলেছেন বৌদ্ধ সাহিত্যে রাজেন্দ্রলালের প্রকৃত শিষ্য বলতে যদি কেউ থাকেন তো রবীন্দ্রনাথ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো রাজেন্দ্রলাল দীক্ষিত শিষ্য বৌদ্ধশাস্ত্র নিয়ে ভালো গবেষণা করেছেন জানি। কিন্তু বৌদ্ধ গ্রন্থে যে সাহিত্যরস আছে তার নিষ্কর্ষ রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ করতে পারেন নি, না এদেশে, না বিদেশে। সুতরাং 'রাজা', 'অচলায়তন', ও 'ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা'র জন্যে আমাদের কৃতজ্ঞতা কিঞ্চিৎ অংশ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের প্রাপ্য। (সুকুমার সেন, পরিজন-পরিবেশ রবীন্দ্র বিকাশ, পৃঃ ৩৪-৩৫)।
সাধারণ অসাধারণ, মহৎ-অমহৎ যে কোন কবির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য স্পষ্ট। আধুনিক বিদেশী কবিতায় পরিচিত ইন্দ্রিয়ভোগের তীব্রতা এবং সে ভোগাবসাদের ক্লিষ্টতা রবীন্দ্রকাব্যে অপরিচিত। কিন্তু তিনি কখনো কোন কিছুতে লোভ করিয়া হাত বাড়ান নাই। ণেন ধৈর্যের ও সংযমের অতএব ত্যাগের শিক্ষারম্ভ তাঁহার শিশুকাল হইতেই। রবীন্দ্রনাথের চরিত্র দম-ত্যাগ-অপ্রমাদ এই তিন অমৃত পদে প্রতিষ্ঠিত। এ সত্যটুকু স্বীকার না করিলে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে আলোচনা সর্বাঙ্গ সার্থক হইবে না। (সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড, ভূমিকা, পৃঃ ১৬)।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রস-বোধিসত্ত্ব। এ রস আলঙ্কারিকের রস নয়, নিরাসক্ত জীবনের আনন্দের রস।
রাখিতে চাহ, বাঁধিতে চাহ যারে,
আঁধারে তাহা মিলায় বারে বারে-
বাজিল যাহা প্রাণের বীনাতারে
সে তো কেবলি গান, কেবলি বানী।.....
সুকুমার সেন'এর মতে,
মানসী রবীন্দ্র কাব্যের সর্বাপেক্ষা বিশিষ্ট কবিতাগ্রন্থ। তাহার মানে এই নয় যে মানসীর কবিতার চেয়ে ভালো কবিতা তিনি আর লেখেন নাই। মানসীর কবিতাগুচ্ছের মধ্যে কবি নিজের হৃদয়কন্দর হইতে অনেকটা দূরে দূরে বিচরন করিয়াছেন এবং দেশকালের গম্ভীর মধ্যে বেশি করিয়া ধরা দিয়াছেন। বহিঃ সংসারের সঙ্গে কবি হৃদয়ের সাধারণ সংস্রবের পরিচয় মানসীতে যেমন ঘনিষ্ট তাঁহার আর কেন কবিতা গ্রন্থে তেমন দেখা যায় না। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৪ঃ)।
যে জন আপনি ভীত, কাতর, দুর্বল,
আপর হৃদয়ভারে পীড়িত জর্জর,
স্নান, ক্ষুধাতৃষ্ণাতুর, অন্ধ, দিশাহারা, সে কাহারে পেতে চায় চিরদিন তরে?
ক্ষুধা মিটাবার খাদ্য নয় যে মানব,
কেহ নহে তোমার আমার। - নিষ্ফল কামনা

কথা ও কাহিনীর কবিতায় পাওয়া যায় মহৎ ত্যাগের মহিমা-ভাবনা। এই ত্যাগ সমাজধর্মের উপর সর্বভূমিক ও সর্বকালিক মনুষ্যত্বের জয় ঘোষণা করেছে। সুকুমার সেন বলেছেন, ইহার বস্তু বৌদ্ধ পুরান, লোকাচার ইত্যাদি বিবিধ আকর হতে আহত। বৌদ্ধ শাস্ত্র পুটে আবাদ্ধ মহৎ কাহিনীর মধ্যে এমন কিছু কাহিনী বীজ আছে যাহার মহত্ব রবীন্দ্রনাথই প্রথম অনুভব করিয়া প্রকাশ করিলেন। এদেশের পন্ডিতদের মধ্যে রাজেন্দ্রলাল মিত্র বৌদ্ধ সাহিত্যকে শিক্ষিতের গোচরে আনিয়াছিলেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কোন বাঙ্গালী (এবং ভারতীয়) মনীষীর দৃষ্টি সে সাহিত্য সম্পদের দিকে আকৃষ্ট হয় নাই। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিপরায়ন প্রতিভার এখানে এক বিশেষ প্রকাশ। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৭৮)।
বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি ভারতবর্ষে হলেও কালপ্রবাহে তা বিকশিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধ ধর্ম অধ্যুষিত প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে (জাপান সহ) ভ্রমন ও করেছিলেন। ফলে তিনি বৌদ্ধধর্মতত্ত্ব ও মানবতাবাদী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি লিখেছেন- ভারতবর্ষে বুদ্ধদেব মানবকে বড়ো করিয়াছিলেন। তিনি জাতি মানেন নাই, যাগযজ্ঞের অবলম্বন হইতে মানুষকে মুক্তি দিয়াছিলেন, দেবতাকে মানুষের লক্ষ্য হইতে অপসৃত করিয়াছিলেন। তিনি মানুষের আত্মশক্তি প্রচার করিয়া ছিলেন। দয়া এবং কল্যান তিনি স্বর্গ হইতে প্রার্থনা করেন নাই, মানুষের অন্তর হইতে তাহা তিনি আহ্বান করিয়াছিলেন। এমনি করিয়া শ্রদ্ধার দ্বারা, ভক্তির দ্বারা, মানুষের অন্তরের জ্ঞান শক্তি ও উদ্যমকে তিনি মহীয়ান করিয়া তুলিলেন। মানুষ যে দীন দৈবাধীন হীন পদার্থ নহে, তাহা তিনি ঘোষণা করিলেন। (মন্দির, বিচিত্র প্রবন্ধ, 'বুদ্ধদেব', পৃঃ ১৮)।

 বুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন রচনা লিখেছেন। দার্জিলিং সফর কালে ভগবান বুদ্ধ বিষয়ক কবিতাটি এইরূপ:
কাল প্রাতে মোর জন্মদিনে
এ শৈল আথিত্যবাসে
বুদ্ধের নেপালি ভক্ত এসেছিল মোর বার্তা শুনে
ভূতলে আসনপাতি
বুদ্ধের বন্দনামন্ত্র শুনাইল আমার কল্যাণে,
গ্রহণ করিণু সেই বাণী
এ ধারায় জন্ম নিয়ে যে মহামানব
সব মানুষের জন্ম সার্থক করেছে একদিন
মানুষের জন্মক্ষণ হতে নারায়ণী ও ধরণী।
যার আবির্ভাব লাগি অপেক্ষা করেছে বহুযুগ
(জন্মদিনে, ৬ সংখ্যক কবিতা, মংপু, বৈশাখ ১৩৪৭)

রবীন্দ্রনাথের কবিতা অবলম্বনে নাট্ররচনা এক অনবদ্য শিল্পসৃষ্টি। সুকুমার সেন বলেছেন, এসব রচনা গাননিষ্ঠ এবং গানের মধ্যে সুরের তরঙ্গ ও নাচের হিন্দোল সমান ভাবে জড়াইয়া আছে। বলিতে পারি এই ধরনের নাটপালা হইতেই রবীন্দ্রনাথের বাণীশিল্পে নৃত্যভঙ্গির সংযোগ ঘটিল, 'নৃত্যনাট্য-এর সৃষ্টি হইল।' 'নটীর পূজা' (১৯২৬) বহু কাল আগে লেখা 'পূজারিনী' কবিতা অবলম্বনে রচিত। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২৪৬)।
আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো, নমো হে নমঃ 
তোমায় স্মরি, হে নিরুপম 
নৃত্যরসে চিত্ত মস 
উছল হয়ে বাজে।। 
আমার সকল দেহের আকুল রবে 
মন্ত্রহারা তোমার স্তরে 
ভাহিনে বামে ছন্দ নামে 
নব জনমের মাঝে।
তোমার বন্দনা মোর ভঙ্গীতে আজ
সঙ্গীতে বিরাজে।...
'চণ্ডালিকা' (১৯৩৩) একটি বৌদ্ধ অবদানের কাহিনী অবলম্বনে রচিত। (দিব্যাবদানের অন্তর্গত শার্দুলকর্নাবদান। কাহিনীটি রবীন্দ্রনাথ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের 'দি সাংসক্রিট বুড্ডিস্ট লিটারেচার অফ নেপাল, পৃ: ২২৩-২২৭ গ্রন্থ হতে সংগ্রহ করেছিলেন)।

সুকুমার সেন'এর মতে, আনন্দকে রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধশিষ্য ভিক্ষুপ্রধান করিয়াছেন। আনন্দের মনের দ্বন্ধ রবীন্দ্রনাথ অভিচারক্রিয়ার উপলক্ষে স্পষ্টভাবে রূপায়িত করিয়াছেন।
'শ্যামা'র কাহিনী বৌদ্ধ গ্রন্থ 'মহাবস্তু' হইতে নেওয়া। এই বিষয় লইয়া রবীন্দ্রনাথ প্রথমে শিখিয়াছিলেন (২৩ আশ্বিন ১৩০৬) একটি কবিতা 'পরিশোধ' (প্রথমে 'কাহিনী'তে সংকলিত ছিল)। তাহার পর এই কবিতাটিকেই সংক্ষেপ করিয়া নাট্যেচিত গানে এই নামেই (আশ্বিন ১৩৪৩)।... এমন রবীন্দ্রনাথের আর কোন গম্ভীর নাট্ট রচনায় দেখি নাই। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২৪৭)
কঠিন বেদনার তাপস দোঁহে
যাও চিরবিরহের সাধনায়,
ফিরো না, ফিরো না, ভুলো না মোহে।

সুকুমার সেন আরও বলেছেন, ভারতীয় অধ্যাত্মসাধনার চিরন্তন পথ হইল ধ্যানী যোগীর। রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মভাবনা অচল প্রতিষ্ঠ ধ্যানী যোগীর নহে, তাহা পর্যটন আনন্দ ভিক্ষুর। তিনটি উৎপ্রেক্ষার মালা গাঁথিয়া তিনি নিজের অধ্যাত্মভাবনার কথা বলিয়াছেন। তিনি হৃৎকমলে আনন্দ মধুর সন্ধানে থাকেন না সে কমল ফোটে নিস্তরঙ্গ অগভীর হ্রদে। রবীন্দ্রনাথের অন্বেষণ গানের স্রোতে নৌকা বাহিয়া আনন্দের ধাওয়া করা। তিনি মৌন ধ্যানস্থ থাকেন না, বীণা বাজাইয়া গানে গানে সঙ্গতি খুঁজিয়া বেড়ান। নীরব স্তব্ধতার সাধনা নহে রবীন্দ্রনাথের, তাঁহার সাধনা মুখর পরিব্রাজকের। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৪২৬)।
খাঁচার মাঝে অচিন পাখি কমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতেম পাখির পায়।

এক সময় বাউল গানের এই পদটি কবিচিত্তে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। এর মূল কারণ কবির পূর্ববঙ্গে (শিলাইদহ) বাস এবং পরিভ্রমণ। এই সময় তিনি বহু বাউল সুফি সাধকের সংস্পর্শে আসেন তথা বাউল, সারি ইত্যাদি লোকসঙ্গীতের মর্মপরিচয় লাভ করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তনের পর রবীন্দ্রনাথের গানে বাউল তত্ত্বের প্রভাব অঙ্কুরিত হল এবং ক্রমশ তা পল্লব পুষ্পে সজ্জিত হয়ে উন্মুক্ত বাতাসের আস্বাদন গ্রহণের অভিপ্রায়ে সুবিশাল মহীরুহে পরিণত হল।
সুকুমার সেন'এর মতে, কালবশে নিতান্ত স্বাভাবিক কারণে কীর্তনগানের প্রাণপ্রবাহ ক্ষীণ হইয়া আসিলে বাঙ্গালা গীতি কবিতার জীবনধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল ভদ্রলোক লোচনের অগোচরে বাউল দরবেশ কর্তাভজা ইত্যাদি অসম্প্রদায়িক "সহজ" জীবন-উপাসক মরমিয়াদের সাধন ও ভজন গানে। রবীন্দ্রনাথের কবিসত্ত্ব যে এই "সহজ" সাধকদের'ই স্বজাতি তাহা উভয়ের গানের ভাব ও ভাষা হইতে বোঝা দুরূহ নয়।

....বৌদ্ধ তান্ত্রিক সহজ সাধকদের একটি গানের অজ্ঞাত কবি যেন বিরহিনী প্রিয়ার ভূমিকা লইয়া নির্ভরসুপ্ত উদাসীন প্রিয়কে জাগাইতেছে, "উঠ ভড়ারো করুণমনু"। গীতালি'র একটি গানে ইহার অসংশয়িত প্রতিধ্বনি।
মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে
একেলা রয়েছ নীরব শয়ন পরে
প্রিয়তম হে জাগো জাগো জাগো।
কবি যেমন বৌদ্ধ অধ্যাত্মবাদের গভীরতায় ডুব দিয়ে নির্বাণ সুখে আত্মমগ্ন হতে চেয়েছেন, ঠিক সেই ভাবে সুকুমার সেন বৌদ্ধ সাহিত্যে অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন জীবন কথার মর্মকথা।
আমার সকল দেহের আকুল রবে
মন্ত্রহারা তোমার স্তবে
ডাহিনে বাথে ছন্দ নামে
নব জনমের মাঝে।
তোমার বন্দনা মোর ভঙ্গীতে আজ
সঙ্গীতে বিরাজে।

প্রভু তুমি এসেছ আমাকে উদ্ধার করতে তাই এত দুঃখই পেলে ক্ষমা করো, ক্ষমা করো। অসীম গ্রানি পদাঘাতে দূর করে দাও।

সুকুমার সেন'এর দৃষ্টিতে মহাকবি অশ্বঘোষ এবং বৌদ্ধ সংস্কৃত সাহিত্য:

মহাকবি অশ্বঘোষ ছিলেন মহাযান সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্যের একজন মহান যশাস্বী কবি। সুকুমার সেন'এর মতে অশ্বঘোষ ছিলেন কুশান যুগের শ্রেষ্ঠ সম্রাট এবং মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্টপোষক কণিদ্ধের সমসাময়িক।
লোকশ্রুতি অনুসারে অশ্বঘোষ সম্রাট কনিষ্কের নিকট উপঠোকন রূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে কবির জনপ্রিয়তাকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রশ্নে অনুরূপ লোকশ্রুতির সৃষ্টি। তবে প্রচলিত ঐতিহ্যের ভিত্তিতে এই তথা পাওয়া যায় যে কবি অশ্বঘোষ রাজা কণিদ্ধের সমকালীন ছিলেন। ড. ই.এইচ. জনস্টন'এর মতে অশ্বঘোষ'এর আবির্ভাব ৫০ খ্রীঃ পূর্বঃ হতে ১০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে।

কণিদ্ধের সময়কাল নির্ধারণের প্রশ্নে পন্ডিতগণ ঐক্যমতে উপনীত হতে পারেন নি। সাহিত্যিক উপাদান, শিলালেখ এবং প্রাপ্ত মুদ্রা সমূহ বিশেষণ করে ঐতিহাসিক গণ তাঁর আনুমানিক কাল নির্ধারণ করেছেন। ড. ফ্লিট'এর অনুমান ৫৮ খ্রীষ্টাব্দ। ফার্গুসন, ওল্ডেনবার্গ, থমাস, রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ পন্ডিত বর্গের ধারণা ৭৮ খ্রীষ্টাব্দ।
ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার'এর মতে কনিষ্কের সিংহাসন আরোহনের সময়কাল তৃতীয় শতক। ড. দীনেশচন্দ্র সরকার একটি অদ্ভূত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, 'কণিষ্ক' নামে একাধিক রাজা ছিলেন। ভান্ডারকার ২৭৮ খ্রীষ্টাব্দকে কণিন্ধের সিংহাসন আরোহণ কাল বলেছেন।
যাইহোক, অধিকাংশ সমালোচকদের মতে, বৌদ্ধ পণ্ডিত অশ্ব ঘোষ ছিলেন সম্রাট কণিদ্ধের সমকালীন একজন কবি। খ্রীষ্টিয় প্রথম শতক হল কণিষ্কের সময়কাল। সুতরাং মহাকবি অশ্বঘোষের আবির্ভাব কাল ও ঐ যুগে।

মহাকবি অশ্বঘোষ'এর জন্মভূমি সাকেত বা বর্তমান অযোধ্যা নগর। 'শারিপুত্র প্রকরণে'র পুষ্পিকাতে অশ্বঘোষ সম্পর্কিত এই তথা পাওয়া যায় "আর্য সুবর্ণাক্ষীপুত্রস্য, আর্য অশ্বঘোষ স্য"....।
সুকুমার সেন এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, অশ্বঘোষ জাতিতে ছিলেন ব্রাহ্মণ। প্রথম বয়সে ব্রাহ্মণোচিত শিক্ষা লাভ করার পর তিনি জন্মগত ধর্ম পরিত্যাগ পূর্বক বৌদ্ধ মতালম্বী হন। অশ্বঘোষ ছিলেন মহাযান মতাদর্শের পৃষ্টপোষক এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক।
অসাধারণ প্রতিভাবান এবং কবিত্বশক্তি সম্পন্ন ছিলেন বলে তাঁর পক্ষে প্রথম শ্রেণীর মহাকাব্য, নাটক এবং সঙ্গীত রচনা করা সম্ভব হয়েছিল। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন সুগায়ক।
মহাকবি অশ্বঘোষ বিরচিত 'বুদ্ধচরিত'এর চীনা এবং ভোট ভাষায় যে অনুবাদ পাওয়া যায় তাতে সর্বমোট ২৮টি সর্গ বিদ্যমান। ভগবান বুদ্ধের মহাপনির্বাণ লাভের বিবরণ পর্যন্ত তাতে বর্ণিত হয়েছে। তবে সংস্কৃত বুদ্ধচরিত কাব্য মাত্র ১৭টি সর্গ পাওয়া যায়। এখানে ভগবান বুদ্ধের ধর্মচক্রপ্রবর্তন বৃত্তান্ত পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।

পণ্ডিত বর্গের মতে এই ১৭টি সর্গের মধ্যে মাত্র ১৩টি সর্গ মহাকবি অশ্বঘোষ রচিত। অবশিষ্ট সর্গ গুলি উত্তরকালীন রচনা উনবিংশ শতাব্দীর নেপালী কবি অমৃতানন্দ অবশিষ্ট সর্গগুলি সম্পূর্ণ করেছিলেন।
সংস্কৃত সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা (প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১৮) কলকাতা, ৯'তম বর্ষ, ৭ম সংখ্যায় 'বৌদ্ধ সংস্কৃতম' নামক একটি সংস্কৃত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধকার শ্রীযুক্ত সুকুমার সেন। তার কিছু দিন পূর্বে শ্রীযুক্ত সেন মহাশয় সংস্কৃত সাহিত্য মহাসম্মেলনের ১০তম অধিবেশনে উক্ত প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন। পাঠকদের সুবিধার্থে এই প্রবন্ধটির কিয়দংশ এখানে উপস্থিত করা হল।

"-ভগবান বুদ্ধ হিমালয় প্রান্তে আধুনিক নেপাল দেশের সীমান্তবর্তী কবিলবাস্তুতে জন্মলাভ করেছিলেন। তদানীন্তন মাগধী প্রাকৃত ভাষাই স্বাভাবিক কারণে শাক্যমুণির মাতৃভাষা ছিল। তবে তিনি কখনও মাগধীতে কখনও বা শৌরসেনী প্রাকৃতে জনসাধারণকে সান্ধর্থ উপদেশ প্রদান করতেন। তাঁর নিকট হতে ভিক্ষুরা সদ্ধর্থের শিক্ষা গ্রহণ পূর্বক নিজ নিজ মাতৃভাষায় তা জনগণের নিকট সবিতারে প্রচার করতেন। ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর বহু বৎসর পর্যন্ত এই সদ্ধর্থ শাস্ত্রাকারে লিপিবদ্ধ হয়নি। পরবর্তী সময়ে এই সদ্ধর্থবাদীরা হীনযান এবং মহাযান' এই দুই মর্গে বিভক্ত হয়ে পড়েন। হীনযানী শাস্ত্র লেখা হয়েছিল পালি ভাষায়। এ ভাষার ভিত্তি শুরসেন জনপদের লোকভাষা, যার সঙ্গে মাগধী ও অর্ধমাগধী প্রাকৃতের উপাদান মিলে পালি ভাষার উদ্ভব ঘটেছে। মহাযানপন্থীরা ভেবেছিলেন, সদ্ধর্থ বিকৃত এবং বিসাদৃশ্য হলে গতানুগতিক লোকসমাজ তা গ্রহণ করবে না। শিষ্ট সভায় যেহেতু সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল, তাই মহাযানী বৌদ্ধ শাস্ত্র সংস্কৃত ভাষায় রচিত হতে থাকে। তবে পানিনি'র অনুশাসন মেনে সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ অত্যন্ত দূরহ কাজ ছিল। অপরদিকে সাধারণ জনগণ প্রাকৃত ভাষা এবং পুরাণ সুলভ লৌকিক সংস্কৃত ভাষাকে পছন্দ করতেন। এই কারণেই মহাযানীরা আর্য সংস্কৃত ভাষায় গ্রন্থ রচনা করতে থাকেন।

.....বুদ্ধরচিত এবং সৌন্দরনন্দ নামক মহাকাব্য দ্বয় কবিবর সুবর্ণফীপুত্র সাকেত নিবাসী ভদন্ত অশ্বঘোষ রচিত। সৌন্দরমন্দ গ্রন্থটির পুনরদ্বারে এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের কৃতিত্ব প্রশংসার দাবী রাখে। কবির অপর সৃষ্টি শারি পুত্র প্রকরণ নামক নাট্য গ্রন্থটি তুফরান অঞ্চলের বালুকাস্তূপ হতে জার্মান পন্ডিত ল্যুডার উদ্ধার করেছিলেন। কবীন্দ্রবচন সমুচ্চয় গ্রন্থে ভদন্ত অশ্বঘোষের বেশ কিছু শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে। ভর্তৃহরির বৈরাগ্য শতক'এ 'মধুতিষ্ঠতি বাচি যোযিতাম (নারী বচনে মধু থাকে) এই শ্লোকটি অশ্বঘোষ'এর সৌন্দরনন্দ মহাকাব্য হতে গৃহীত। বস্তুত সংস্কৃত সাহিত্যের আদি কবি রূপে অশ্বঘোষ স্বীকৃতি লাভের যোগ্য। পন্ডিতবর্গের মতে, কালিদাসকে বাদ দিলে অশ্বঘোষ সংস্কৃত সাহিত্যের 'মূর্ধণ্য' কবি। বলতে গেলে, কালিদাস অনেক স্থানে কবি অশ্বঘোষের নিকটঋণী।
....ভদন্ত অশ্বঘোষ অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার সবগুলি চীনা এবং ভোট ভাষায় অনুবাদ হয়ে প্রচারিত হয়েছে। এর মধ্যে বুদ্ধরচিত, সৌন্দরনন্দ, বজ্রসূচী এবং গন্ডীস্তোত্র এই গ্রন্থ কয়টি সংস্কৃতে উপলব্ধ আছে। তবে নিম্নলিখিত গ্রন্থ সমূহের সংস্কৃত পাঠ ইদানিং বিলুপ্ত :
১. অষ্টবিঘ্নকথা, ২. গন্ডীস্তোত্রগাথা, ৩. দশকুশলকর্মপথ নির্দেশ, ৪. পরার্থবোধিচিত্তভাবনা-ক্রমবর্ণসংগ্রহ, ৫. মণিদীপমহাকারুণিক দেবপঞ্চস্তোত্র, ৬. বজ্রযান মূলোৎপত্তিসংগ্রহ, ৭. শতপঞ্চাশতকনামস্তোত্র, ৮. শোকবিনোদন, ৯. সংবৃতিবোধিচিত্ত ভাবনোপদেশ বর্ণ সংগ্রহ, ১০. স্কুলপত্তি, ১১. দশদুষ্টকর্মমার্গসূত্র, ১২. মহাযোন ভূমি গুহ্যবাচ্যমূলশাস্ত্র এবং ১৩. সূত্রলঙ্কার শাস্ত্র ইত্যাদি।
বৌদ্ধ সংস্কৃত সাহিত্যের আরও একটি প্রধান অঙ্গ 'অবদান' সাহিত্য। ভগবান বুদ্ধের দ্বাদশ ধর্মপ্রবচনের মধ্যে সপ্তম হল অবদান।

মহাযান পন্থী বৌদ্ধাচার্যরা তাই বলেছেন।.... সব অবদান গ্রন্থই গদ্য পদ্যমিশ্রিত। পদ্যাংশ গাথায় রচিত। গাথা বলতে বোঝায় সংস্কৃত, প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ মিশ্রিতভাষা।
বৌদ্ধ সংস্কৃতে এমন বহু শব্দ পারিভাষিক হিসেবে এমন বহু শব্দ পারিভাষিক হিসেবে পাওয়া যায়, যাদের অন্যত্র ব্যবহার নেই। অল্প কিছু মহাভারতে মেলে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হল। (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, ৩৩.৩, ১৮৪-১৯২, ১৯২৬ খ্রীঃ)।
১। বিশেষ শব্দ:
আনন্দী, নন্দী (-আনন্দ), উপোষধ, পোষধ (-উপবসথ), একত্য (প্রত্যেক), অনাত্মন (-অবাস্তব), আত্তমনস্ (-হৃষ্ট), একধ্য (-একত্র), উপরিম (-উপর), অভিধ্যা (-লোভ), কুন্ত (ক্ষুদ্রজন্তু), কার, কারা (-পূজা)।
২। ক্রিয়াপদ:
অবলোকয়তি (-আপৃচ্ছতে, বিদায় দেয়), বিপুষ্পয়তি (-স্ময়তে, মুচকি হাসে), বিচ্ছন্দয়তি (-নিবারয়তি, নিবৃত্ত করে), সম্প্রবারয়তি (-উপতিষ্ঠতে, অনুরঞ্জয়তি)।
পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ও ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষা এবং তাতে বিধৃত সাহিত্য প্রসঙ্গে ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলা ও ইংরেজীতে অনেকগুলি নিবন্ধ রচনা করেছিলেন। যেমন -
ক. অন দ্য বুদ্ধরচিত অফ অশ্বঘোষ, ইন্ডিয়ান হিস্ট্রোরিক্যাল কোয়াটারলি, ২ (১৯২৬ এ ডি)।
খ. অ্যান আউটলাইন সিনটেক্স অফ বুড্ডিষ্টিক সংস্কৃত, জার্নাল অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট অফ লেটার্স, ইউনিভারসিটি অফ ক্যালকাটা, ১৭ (১৯২৮ এ.ডি)।
গ. দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ অশ্বঘোষ সৌন্দরনন্দ কাব্য, জার্নাল অফ এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল, এন এস ২৬ (১৯৩০ এডি)।
বস্তুত বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্থে আচার্য সুকুমার সেন যেভাবে বৌদ্ধ চিন্তাকে গ্রথণ করেছিলেন তা একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের পথ চলার পাথেয় হতে পারে।

মঙ্গলকাব্যে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধস্ত্রের অনুসন্ধান এবং বিশ্লেষণ:

ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর পূর্বে অর্থাৎ বাংলাদেশে তুর্কী মুসলমান আগ্রাসনের ঠিক আগে এই দেশের ধর্ম সংস্কৃতি এবং আর্য সামাজিক পরিকাঠামো কেমন ছিল তা অনুধাবন করতে পারলে মধ্যযুগীয় বাংলার সাহিত্যের গতি প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব হবে। আচার্য সুকুমার সেন'এর মতে, এদেশে বৈদিক যজ্ঞকান্ড কখনোই আমল পায় নাই। বৈদিক কর্মকান্ড উপনিষদে প্রত্যাখ্যাত। উপনিষদ পূর্ব ভারতের বস্তু, যদি বিদেহবাসী জনকের ঐতিহ্য মানিতে হয়। দুইটি প্রধান বেদবাহ্য ধর্ম বৌদ্ধ ও জৈন মত পূর্ব ভারতেই উৎপন্ন ও প্রবৃদ্ধ। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খন্ড, পৃঃ ৭৮)।

সেন বংশীয়রা কর্ণটি (বর্তমান দক্ষিণ ভারত) অঞ্চল হতে আগত গোঁড়া হিন্দু। ফলে তাঁদের সঙ্গে বাংলার বৌদ্ধ মতালম্বীদের সংঘাত কোন অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। এই সেন আমলেই বাংলাদেশ হতে বৌদ্ধ প্রভাব বিলুপ্ত হয় এবং "মধ্যদেশ বিনির্গত" ব্রাহ্মণদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। নবাগত ব্রাহ্মণরা পরাজিত বৌদ্ধদের উপাস্য ক্ষেত্র এবং সাহিত্য সমূহকে নানাবিধ পৌরাণিক আখ্যানের মোড়কে আচ্ছাদিত করার কারণে বৌদ্ধতান্ত্রিক দেব দেবীগুলি বিবর্তনের ধারায় নতুন আঙ্গিকে উদ্ভাষিত হতে থাকে। ফলে অচিরেই শুরু হয় অলৌকিকতায় মোড়া দেব-দেবীর মাহাত্ম্যবিজরিত আখ্যায়িকা গীতি।
এ প্রসঙ্গে আচার্য সুকুমার সেন বলেছেন, অতএব সাহিত্যের দিক দিয়া আমরা তিনটি ধারা লক্ষ্য করি। প্রথম, অধ্যাত্মসাধকদের গোষ্ঠীর মধ্যে অনুশীলিত গান (চর্যাগীতি) ও উপদেশ কবিতা (দোহা, ছড়া)। দ্বিতীয়, রাজসভাশ্রিত শিক্ষিত কবিদের রচিত পুরাণ কাহিনী (কাব্য, নাটক, প্রকীর্ণ কবিতা), দরবারি ও বৈঠকি গান। তৃতীয়, জনসমাজে দেবদেবীর মাহাত্ম্যমূল গেয় আখ্যায়িকা কাব্য (পাঞ্চালিকা)। (প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃঃ ৭৮)।

সুমলমান শাসনের প্রথমদিকে সমাজে ঝাঁকুনির প্রভাবে তথাকথিত হিন্দু সমাজের ধর্মীয় চিন্তায় অনেক পরিবর্তন সাধিত হল। মহাযান মতালম্বী উপাস্য অনেক দেবদেবী ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক উপাসনার মধ্যে যুক্ত হল এবং লোপাম্মুখ (তান্ত্রিক) বৌদ্ধ মত ব্রাহ্মণ্য মতের মধ্যে উপস্থিত হল। পাষান ধাতব অথবা পট-প্রতিমায় দেব দেবীর পূজা প্রথমে বৌদ্ধ তান্ত্রিক মতে শুরু হয়েছিল এবং গুপ্ত শাসনামলে তা ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও চলিত হয়েছিল। সেন যুগে বিষ্ণু-শিব, রাজেশ্বরী চণ্ডী ও শিবের অস্ত্রীক-সস্ত্রীক মূর্তি পূজার প্রচলন রীতিমত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

গ্রামাঞ্চলে ধর্ম ঠাকুর এবং মনসা-বাশুলী দেবীর উত্থানের মধ্য দিয়ে (পঞ্চদশ শতাব্দী) লৌকিক সাহিত্যের বীজ অঙ্কুরিত হল এবং এই সকল নবদেবতার উপাখ্যান বাংলার জনজীবনে ধীরে ধীরে নব পল্লবে শোভিত হতে লাগল।
মনসা বাশুলী সম্পর্কে আচার্য সুকুমার সেন'এর অভিমত হল এইরূপ- বৌদ্ধ মহাযান মতে মহামায়ূরী দেবী বিশনাশকের আরোগ্যের এবং বিদ্যার দেবতা। মহাযান মতে আরও একটি বিষহরী দেবী আছেন। তিনি জাঙ্গুলী তারা। এই নাম পরে মনসাতে বর্তিয়াছে জাগুলী। মহাযান তন্ত্রের উপাসনা পদ্ধতিতে (সাধন-এ) আর্যজাঙ্গুলী মহাবিদ্যাকে বর্ণনা করা হয়েছে, হিমালয়ের উত্তর পার্শ্বে যে গন্ধমাদন পর্বত আছে তাহার শিখরে শত পূণ্যলক্ষণা কুমারীরূপে।
এনেয়চর্মবসনা সর্পমণ্ডিত মেখলা 
আশীবিষসুগুলিকা দৃষ্টিবিষাবতংসিকা।।
খাদন্তী বিষপুষ্পানি পিবন্তী মালুতালতাম।
'পরিধানে মৃগচর্ম, সাপজড়ানো মেখলা। আশী বিষ হার, দৃষ্টিবিষ কর্ণভূষণ। খাইতেছেন বিষপুষ্প, পান করিতেছেন মালুতালতার রস।'
মহাযান-তন্ত্রসাধনায় জাঙ্গুলী দেবীর অপরিসীম প্রতিপত্তি হইয়াছিল। এমন কি বজ্রেশ্বরী "তারামহত্তরায়ী” অর্থাৎ তারা ঠাকুরাণী ও আর্য জাঙ্গুলীর রূপ ধারণ করিয়াছিলেন, "শুক্লবর্ণা চতুর্ভুজা জটা মুকুটিনী শুক্লোত্তরীয় সিতরত্নালঙ্কারবর্তী শুক্লসর্পভূষিতা।"

মহাযান তন্ত্রে দেবী একজটা তারার যে চিত্র পাই তাহা বহুকাল পরে প্রতিফলিত হইয়াছে মনসামঙ্গল কাব্যে মনসার মূর্তিতে।
অন্বয়বজ্রের শিষ্য লালিত গুপ্ত তারা সাধনে লিখিয়াছেন (শ্রীযুক্ত বিনয়তোষ ভট্টাচার্য সম্পাদিত সাধনমালা, ১২৮)।
'নিজেকে ভগবতীরূপে ভাবিবে শুক্লা, দ্বিভুজা, একাননা, দক্ষিণ হস্তে নিরংশুক অক্ষমালা বাম হস্তে নীলোৎপল মুকু ধরিয়া, অতি পিঙ্গল একমাত্র জটা, ব্রহ্মাণ্ডখন্ডব্যাপিনী, হিংস্র, সর্পভূষণ ভূষিতা মাথায় বেড়িয়া নীলবর্ণ কর্কেটিকা, কণ্ঠে আভরণ রক্তবর্ণ তক্ষক, কর্ণে দুই কুন্ডল পীতবর্ণ নন্দ উপনন্দ, উপবীত শুরু বর্ণ বাসুকি, দক্ষিণ বাহুতে বলয় পারাবত বর্ণ কুলিক, অপর বাহুতে বলয় ধবলবর্ণ শঙ্খপাল, দুই নূপুর রক্তবর্ণ পদ্ম মহাপদ্ম।'

জাঙ্গুলী বিষবিদ্যা বলিয়া বিষবৈদ্যের নাম হইয়াছিল "জাঙ্গুলিক" বা "জাঙ্গলিক"। জাঙ্গুলী পরে মনসার সঙ্গে মিলিয়া যায়, তাই মনসার নামান্তর হয় জাগুলি। মনসা মঙ্গলের প্রাচীনতম কবি বিপ্রদাস "জাগুলি" নামের লোক ব্যুৎপত্তি দিয়াছেন "জাগিয়া জাগুলি নাম সিজবৃক্ষে স্থিতি।"
(বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৫৬-১৫৭)
মনসামঙ্গলে শক্তি তন্ত্রের প্রভাব অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন ভাবে বিদ্যমান। 'সোনার ঘট, ছাগ, মহিষ ইত্যাদি দিয়ে মনসার পূজা। তবু পদ্মার মন ভোলে না। বেহুলা হংস, কবুতর বলি দিল। তবু পদ্ম মুখ ঘুরিয়ে এবার উত্তর মুখো। হরিণ, বলি দিলেও পদ্মা আবার মুখ ঘুরিয়ে পূর্বমুখো হয়ে যায়। বেহুলা এবার এক একটি অঙ্গ কেটে দান করতে শুরু করে। খড়গ পূজা করে তবুও পদ্ম প্রসন্ন হন না।' (শক্তি সাধনা, অবতরনিকা, পৃঃ ২৪)।

বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে মনসার বিষ ঝাড়ন মন্ত্রে তান্ত্রিক যোগের কথা বলা হয়েছে:
কেন ত্রিভূবননাথ আপনা বিস্ময়।
মন পবনেতে জীব পরিচয় কর।।
প্রসঙ্গত স্মরণযোগ্য, মুসলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নিম্নবর্ণের মধ্যস্থতায় লৌকিক বৌদ্ধ সংস্কারের সঙ্গে নতুন করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মিলন সাধিত হয়। সেই সময় অনেক বৌদ্ধ দেব দেবী লোকায়ত সংস্কারের স্বীকৃতি লাভ করে। এই দেব দেবী তথাকথিত মঙ্গল দেব দেবী। তাঁদের মহিমা এবং পুজা ইত্যাদির কাহিনী নিয়ে যে কাব্য রচিত হয়েছে, তা মঙ্গল কাব্য রূপে গৃহীত হয়েছে।
পত্রের ছাউনি গৃহ আঙ্গিনা জঙ্গাল
তথি বাসে রহে পদ্ম পরি বাঘছাল।
সুকুমার সেন'এর মতে মনসার এই ভেক বৌদ্ধতন্ত্রে শবর কুমারী জাঙ্গুলী মহাবিদ্যার বর্ণনাকে স্মরণ করায়। (প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৯৯)।

মধ্যযুগের দেব ভাবনায় মঙ্গলকাব্যের কবিগণ তথাকথিত পৌরাণিক পরিচয়ের সঙ্গে সমকালীন পরিচয়কে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছেন। আখ্যান মূলক কথার মূল বৈশিষ্ট্য হল এটাই। প্রাচীন বাংলা হতে বৌদ্ধ ধর্ম বিলুপ্ত হওয়ার পর ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মে নানা আঙ্গিকে অবতারবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং পৌরাণিক কাব্যগুলিকে লোকায়ত ঘরানায় পরিবেশিত করা হতে থাকে। সর্বোপরি এর সঙ্গে যুক্ত হয় আদি দেবভাবনা এবং সমকালীন বৌদ্ধ ধর্মের কর্মবাদ।
ধর্ম-ঠাকুর প্রসঙ্গে আচার্য সুকুমার সেন বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। যেমন -
'বিহারে ধর্মপূজার চিহ্নাবশেষ "ছট"। এককালে যে ধর্ম পূজা কাশী কোশলে ও অজ্ঞাত ছিল না তাহার ও প্রমাণ পাইয়াছি।

উত্তর ভারতে অনেক জৈনতীর্থের বর্ণনায় যে কমঠাসুরের উল্লেখ আছে তাহাতে কুর্মাসনস্থ ধর্মদেবাতর রূপান্তর দেখি। কোথাও কোথাও ধর্মরাজ জৈন সিদ্ধ ধর্মনাথে পরিণত হয়েছিলেন, কিন্তু নিজের পরিচয় একেবারে গোপন করিতে পরেন না। চর্তুদশ শতাব্দীতে জিন প্রভসূরি তাঁহার রত্নবাহপুরকল্পে লিখিয়াছেন, "তত্র চ তথৈব নাগমূর্তি পরিবারিত শ্রীধর্মনাথপ্রতিমাহন্যাপি পূজাতে।"
শিক্ষিত সমাজে ধর্ম ঠাকুরের প্রথম প্রকাশ করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
ইনি ধর্ম ঠাকুরের পূজায় বাঙ্গালা দেশে বৌদ্ধধর্মের শেষ পরিণতি অনুমান করিয়াছিলেন। ধর্ম ঠাকুরের পূজায় হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান সর্ব ধর্মেরই অনুষ্ঠান অল্পবিস্তর নেওয়া হইয়াছে। (প্রাগুক্ত, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১১০)।

পশ্চিমবঙ্গে নাথ ধর্ম বহু প্রাচীন, নাথ এই বিষয়ে একটা কথা মনে হয় নাথ ধর্ম ধর্মে বহু আদিম দেবতার পূজা মিশ্রিত হয়ে প্রচলিত হয়েছিল এবং সেই কারণে নাথদের ওই জাতীয় ধারণা হতে পারে। যোগীরা ধমঠাকুর পূজার পৌরহিত্য করেন, তাঁদের ধারণা ধর্মঠাকুর বুদ্ধের অবতার। তান্ত্রিক শৈব ধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের সংমিশ্রণে সৃষ্ট ধর্মপূজা তান্ত্রিক এবং তন্ত্রযানী বৌদ্ধদের এক সময় তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাজে মহাকালের পূজা বিশেষ প্রচলিত ছিল। প্রথম ধর্মপালের সময়কালে তান্ত্রিক বৌদ্ধগণের পুণরভ্যুদয়ের সূত্রপাত হলেও দ্বিতীয় ধর্মপালের সময়েই প্রকৃত প্রস্তাবে তান্ত্রিক বৌদ্ধগণ প্রাধান্যলাভ করেছিলেন। তাঁরা মহাযান সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। শূন্যবাদই মহাযান সম্প্রদায়ের মূলমন্ত্র এবং নানা দেব দৌর উপাসনা এই সম্প্রদায় ভুক্ত তান্ত্রিকধর্মের মূল অঙ্গ রূপে প্রসিদ্ধ ছিল। শূণ্যপুরাণের মূল লক্ষ্য মহাযানদিগের শূণ্যবাদ। রামাই পন্ডিত বলেছেন -
নহি ছিষ্টি ছিল আর নহি সুর নর।
বস্তা বিষ্টু ন ছিল ন ছিল আঁরর।।
সরগ মরত নহি ছিল সভি ধুদ্ধকার।
দসদিকপাল নহি মেঘ তারাগণ।
শূণ্য পুরাণ।

রামাই পণ্ডিতের এই উক্তি হিন্দুশাস্ত্রমূলক নয়, তা মহাযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শূন্যবাদ মূলক, তা সকলেরই স্বীকার করা উচিত।
সুন্নে পূজ এ হরিচন্দ্র বিসাদ ভাবিয়া মতি।
পাল যুগে লোকেশ্বর ও মহাকালের উপাসনা তান্ত্রিক বৌদ্ধ সমাজে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল, এই দুই দেবতাই শূণ্য পুরাণে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। যেমন -
পরভুর মালঞ্চ এ জাগন্তি নন্দি মহাকাল।
আচার্য সুকুমার সেন'এর মতে, ধর্ম ঠাকুরের পুরাণ অনুযায়ী সৃষ্টিপত্তন কাহিনী বিভিন্ন নিবন্ধেও পুঁথিতে বিভিন্ন নামে প্রসিদ্ধ। যেমন 'শূণ্য-শাস্ত্র', 'শূণ্য-পুরাণ', 'অনিল-পুরাণ', 'সৃষ্টি-পুরাণ', 'স্থাপনপালা' ইত্যাদি। সহজিয়া মতের কোন কোন নিবন্ধে ও এই সৃষ্টি প্রক্রিয়া বর্ণনা অথবা ইঙ্গিত আছে।
ভাল গো ভোমের ঝি সরোবর রাখ
সুহংস চড়িয়া যায় তাবা নাই দেখ।
পখুর পাড়েতে সদা ভোমের কুড়িয়া
ঘন ঘন আইসে যায় ব্রাহ্মণ বড়ুয়া।
ব্রাহ্মণ বন্ধুয়া নয় নিরঞ্জন রায়
দেখিতে দেখিতে হংস শূণ্যেতে লুকায়। - ধর্ম ঠাকুরের গাজনের গান।
একটি চর্যাগীতির প্রথম দুই ছত্রের সঙ্গে এই গানের প্রথম দুই ছত্রের সাদৃশ্য আছে। যেমন -
নগর বাহিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ
ছই ছোই যাইসি ব্রাহ্মণ নাড়িআ।।

ধর্মপূজার প্রথম প্রবর্তক বা ধর্ম ঠাকুরের আদি পুরোহিত ছিলেন রামাই পন্ডিত। আচার্য সুকুমার সেন এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষন করেছেন। তিনি বলেছেন, তথাকথিত 'শূণ্য পুরাণ' এই 'ব্যক্তি'রই রচিত বলিয়া এখনও কেহ কেহ বিশ্বাস করেন। ধর্মপূজার ছড়া ও নিবন্ধগুলি ধর্মপূজার প্রবর্তক কোন একটিমাত্র "শ্রীরামাই" পন্ডিতের লেখা হইতে পারে না। সব চেয়ে পুরানো পুথিগুলি ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের আগে লেখা নয়। (প্রাগুক্ত, ২য় খন্ড, পৃঃ ১১৪)।

উপরোক্ত আলোচনা হতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে আচার্য সুকুমার সেন এবং মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় ধর্মপূজা'র ইতিহাস সম্পর্কিত যে তথ্য পেশ করেছেন তা সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়। কারণ উভয়ের তথ্য অন্ধসন্ধানের বিষয়টি ভিন্ন। সুকুমার সেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতামতকে সমর্থন করেন নি। (প্রাগুক্ত, ২য় খন্ড, পৃঃ ১১০)।

আচার্য সুকুমার সেন এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বৈদিক তত্ত্ব এবং পৌরাণিকতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। হতে পারে তাঁর মতমতটি সঠিক, আবার নাও হতে পারে। তবে মঙ্গল কাব্যের (মনসা মঙ্গল, ধর্মমঙ্গল এবং অন্যান্য মঙ্গল কাব্য) ইতিহাস অনুসধঅনের ক্ষেত্রে সুকুমার সেন'এর অবদানকে কোন ভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা বিষয়টি ভবিষ্যৎ গবেষকদের প্রতি অর্পন করলাম। আশা করব তারা বিষয়টি কে নতুন করে গবেষণা করবে। কারণ আমরা মনে করি কোন ব্যক্তি সমালোচনার উর্দ্ধে নয়।

যোগী সিদ্ধদের ইতিহাস অনুসন্ধানে সুকুমার সেন -
'নামপন্থা' চুরাশি সিদ্ধ হতে উদ্ভূত হয়েছে। কারণ ১২-১৪ শতাব্দী পর্যন্ত যে সকল দোঁহা গুলি রচিত হয়েছিল তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বিষয় ছিল বৌদ্ধ তান্ত্রিক মত এবং নিরীশ্বর বাদ। "গোরক্ষ সিদ্ধান্ত সংগ্রহ"তে "চতুরশীতিসিদ্ধ" শব্দের সাথে নিন্ম সিদ্ধের নাম মার্গ প্রবর্তক রূপে লেখা হয়েছে -
নাগার্জুন (১৬), গোরক্ষ (৯), চর্পট (৫৯), কন্থাধারী (৬৯), জালন্ধর (৪৬), আদিনাথ (জালন্ধরূপা, সিদ্ধ ৪৬), চর্যা (কছুপা) (১৭)। এর ফলে নামপন্থা সম্পর্কে কোনরুপ সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
"নাগার্জুনো জউভরতোহরিশ্চন্দ্রস্ততীয়কঃ।
সত্যনাথো ভীমনাথো গোরক্ষশ্চর্পটস্তয়া।।
অবয়শ্চৈব বৈরাগ্য: কন্থাধারী জলন্ধরঃ।
মার্গপ্রবর্ত্তকা হোতে তান্ধচ্চ মলয়াজুনঃ।।" গোরাক্ষসিদ্ধান্ত সংগ্রহ, পৃঃ ১৯।
এবং শ্রীগুরুরাদিনাথঃ। মৎসেন্দ্রনাথঃ। তৎপুত্র উদয়নাথঃ। দন্ডনাথঃ, সত্যনাথঃ, সন্তোষনাথঃ, কুর্মনাথঃ, ভবনার্জিঃ। তস্য শ্রী গোরক্ষনাথঃ...।। পৃ: ৪০।
যদিও বর্তমানে নাথ পন্থা অনীশ্বরবাদী সিদ্ধান্তকে পরিবত্যাগপূর্বক ইশ্বরবাদী হয়েছে, তবুও এখনও তাঁদের বাণী সমূহ অনুসন্ধান করলে নির্বাণ, শূন্যবাদ এবং বজ্রযানের বীজ পাওয়া যায়। মহারাষ্ট্রীয় নাথপন্থী (জ্ঞানেশ্বর) তাদের পরম্পরা এইভাবে প্রস্তুত করেছেন-
১। আদিনাথ
২। মৎস্যেন্দ্রনাথ
৩। গোরখনাথ
৪। গহনীনাথ
৫। নিবৃত্তিনাথ
৬। জ্ঞানেশ্বর

এর মধ্যে আদিনাথ প্রকৃত অর্থে জালন্ধর পা। বিষয়টি জালস্করপাদ বিরচিত "বিমুক্তমঞ্জরী"র ভোট অনুবাদ হতে অবগত করা যায়। এই পরম্পরার মধ্যেকার প্রজন্মের উল্লেখ করা হয়নি। কারণ গোরখনাথ (গোরক্ষনাথ) ৯ শতাব্দী এবং জ্ঞানেশ্বর (১৪ শতাব্দী)'এর মধ্যে ২টি প্রজন্ম থাকতে পারে না।
১৬ শতাব্দীর ভোট প্রান্থ "রত্নাকার জোপমকথা"তে বিষয়টি অত্যন্ত বিচিত্র রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে-
"মীননাথ এবং মৎস্যেন্দ্রনাথ, উভয়ই ভারতের পূর্বপ্রাপ্ত কামরূপ (দেশ) এর জেলে ছিলেন (সেখানে) লৌহিত্য নদী রয়েছে, বর্তমানে এই নদীকে ভোট ভাষায় 'চঙ-পো' বলে। (মৎস্যেন্দ্র) মাছের উদরে ১২ বর্ষ ছিলেন। অতঃ আচার্য চপটী'র নিকট উপস্থিত হন। ... উভয়েই সিদ্ধ হয়েছিলেন। পিতা (হন) সিদ্ধ মীনপা এবং পুত্র সিদ্ধ মহিন্দ্র পা।
এক সে শুস্তিনি বুহ ঘরে সান্ধঅ,
চীতান বাকলতা বারুণী বান্ধআ।।
সহজে থির করী বারুণী সান্ধে,
জে অজরামর হোই দিট কান্ধ।।
দশমি দুআরত চিহন দেখইআ,
আইল গরাহক অপনে বহিয়া।।
বিরূপ বজ্রগীতিকা, ৪৮।১৬

আচার্য সুকুমার সেন সিদ্ধযোগী'দের সম্পর্কে বলেছেন যে, শৈবযোগীদের গান ও ছড়ার অস্তিত্ব বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্মেষ কালেও ছিল। তাঁর মতে সিদ্ধচার্য কাহ্নপাদের একটি চর্যাপদে বা চর্যাগীতিতে তাঁর গুরু জালন্ধরি পাদের উল্লেখ রয়েছে। জালন্ধরি পাদ (মতান্তরে হাড়িপা) আদি সিদ্ধ যোগীদের মধ্যে অন্যতম।
চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী (পৃ: ২৫০) অনুসারে এই তথা পাওয়া যায় যে জালন্ধরা পা বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যেমন-
চক্রসম্বর গর্ভতত্ত্বসিদ্ধি
বজ্রযোগিনী সাধন
বিমুক্ত মঞ্জরী নাম গীতা (পুষ্পিকায় রচয়িতা আদিনাথ জালন্ধর পাদ বলা হয়েছে)।
মহাকারুনিক অভিষেক প্রকরণ উপদেশ
ভগবৎ শম্বর স্তোত্র (মতান্তরে ঘন্টাপা এই গ্রন্থটির রচয়িতা)।

হে বজ্র সাধনস্য চিপ্পনী শুদ্ধি বজ্রপ্রদীপ
চর্যাগীতি কোশ, চতুরশীতি সিদ্ধ প্রবৃত্তি এবং অন্যান্য তিব্বতী সূত্রে লুইপা'কে প্রথম সিদ্ধ বলা হয়েছে, রাহুল সাংকৃত্যায়ন কিন্তু সরহকে আদি সিদ্ধ বলেছেন। (পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, পৃঃ ১৪৭)।
ধর্মবীর ভারতী (সিদ্ধ সাহিত্য, পৃঃ ৪৫) বিভিন্ন পন্ডিত বর্গের মতামতকে অনুসরণ করে সিদ্ধকের আনুমানিক কাল নির্ণয় করেছেন- সরহপা, লুইপা প্রভৃতি সমকালীন সিদ্ধগণ ৮০০-৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দ মৎস্যেন্দ্র প্রভৃতি সিদ্ধগণ ৮৭৫-৯২৫ খ্রীষ্টাব্দ গোরক্ষ, জালন্ধর, কাহুপা প্রভৃতি ৯২৫-১০০০ খ্রীষ্টাব্দ তিল্লোপা, নারোপা, মৈত্রীপা প্রভৃতি ১০০০-১১০০ খ্রীষ্টাব্দ।

সিদ্ধদের সময়কাল নির্ণয়ের প্রয়াস করেছেন তিব্বতের অনেক ঐতিহাসিক। এঁদের মধ্যে বু-তোন রিসনুছেন ডুপ, জোনাং তারনাথ কুণগাঞিনাপো প্রমুখ উল্লেখ্যনীয়।
সুকুমার সেন'এর মতে কাহ্ন ছিলেন "কাপালী-যোগী"। সমসাময়িক অবহট্ট সাহিত্যে শৈব যোগীদের লেখা বেশ কিছু দোঁহার নিদর্শন পাওয়া যায়। যেমন -
মুলু ছড্ডি জে ভাল চড়ি কহ তহ জোড়ভাসি।
চীরু ন বুননহ জাই বড় বিণু উট ঠিয়ই কপাসি।। - পাহুড দোহা, শ্লোক ১০৯।
সুকুমার সেন আরও বলেছেন, জালন্ধরি পাদ এবং কাহ্ন পাদ সম্ভবত ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম। কিন্তু মীননাথের (মুনিদত্তের উদ্ধৃতি ব্যতীত) এবং গোরক্ষনাথের ঐতিহাসিকত্বের কোন বলবৎ প্রমান নেই। (প্রাগুক্ত, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৮৮)।

যোগী সিদ্ধ কথা (সুকুমার সেন, পৃ: ১৮৯) অনুসারে এই তথা পাওয়া যায় যে, সর্বোমোট ৫-৬ জন প্রাচীন সিদ্ধ যোগীর নাম বাংলা এবং অন্য ভাষা সাহিত্যে আছে মৎস্যেন্দ্রনাথ (মচ্ছিন্দর বা মোচন্দর), গোরক্ষনাথ, জালন্ধরি (এঁদের নামে "নাথ" নেই), কাহ্ন (এর নামে ও "নাথ' নেই), চৌরঙ্গীনাথ (?) এবং শিশু বা গাঙুর (?)। তবে চুরাশি সিদ্ধে শিশু বা গাভুরের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। সুকুমার সেন'এর মতে ইতি জালন্ধরির পুত্র শিষ্য।
অতএব, সুকুমার সেন'এর তথ্য অনুসারে মোটামুটি এইরূপ চিত্র উঠে আছে। যেমন -
মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, জালন্ধরি ও কাহ্ন (গাঙুর, শিশু)। ৪ জন সিদ্ধ ২টি দলে বা সম্প্রদায়ে পড়েন, -
ক. মৎস্যেন্দ্র এবং গোরক্ষ (নাথ' যুক্ত), এবং খ. জালন্ধরি এবং কাহ্ন (নাথ' হীন)।
কিন্তু একটু তলাইয়া দেখিলে আসলে দল ২টি নয় একটিই, মৎস্যেন্দ্র এবং জালন্ধরি অভিন্ন এবং যিনি গোরক্ষ তিনিই কাহ্ন। (প্রাগুক্ত, পৃ: ১৮৯)।

মহাপন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন এক্ষেত্রে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী' অনুসারে –
কহ্নপা (সিদ্ধ ১৭) কর্ণাটক দেশে'র ব্রাহ্মণ কূলে তাঁর জন্ম হয়েছিল, এই কারণে তাঁকে কৃষ্ণপা বা কহ্নপা ও বলা হয়। তিনি মহারাজা দেবপালের (৮০৯-৮৪৯ খ্রীঃ) সমকালীন ছিলেন এবং সোমপুর বিহারের (পাহাড়পুর, রাজশাহী) পন্ডিত ভিক্ষু ছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধ জালন্ধর পাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তৎকালীন মগহী ভাষায় কবিতা রচনা করেছিলেন। তাঁর দো। এখানে উদাহরণ রূপে প্রদান করা হল -
আগম বেঅ পুরাণে, পন্ডিত মান বহস্তি।
পঞ্চ সিরিফল অলিঅ জিম, বাহেরিত ভ্রময়ন্তি।।২।। তন্ জুর (৩.২০।১০)

গোরক্ষা পা (সিদ্ধ ৯) মহারাজা দেবপালের সমকালীন ছিলেন।ীরপা ছিলেন কামরূপ নিবাসী, জালন্ধর পাদ (৪৬) এর শিষ্য গোরক্ষপা'র শুরু মৎস্যেন্দ্র নাথ পিতা। মগধ নিবাসী চোরঙ্গি পা গোরক্ষপা (৯)র গুরুভাই ছিলেন। (চতুরাশীতি সিদ্ধ প্রবৃত্তি, তন-জুর ৮৬।১)।
যোগী সিদ্ধ সম্পর্কিত কাহিনী ২ ভাগে বিভক্ত। প্রথম, সিদ্ধদের ইতিহাস এবং গোরক্ষনাথ কর্তৃক গুরু মীননাথকে মোহের কবল হতে উদ্ধার এই কাহিনী গুলি 'অনিলপুরাণ'এ পাওয়া যায়। অপর যে সকল পুঁথি গুলি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলি হল গোরক্ষবিজয় এবং গোপীচন্দ্রের গান। সুকুমার সেন'এর মতে, যোগী সিদ্ধদের পুরান কথা গুলিতে গৃহস্থকল্যানের ইঙ্গিত না থাকার কারণে তা মঙ্গল কাব্য রূপে সমাদৃত হয়নি।

কথিত আছে রাজা শিবসিংহের পুণ্যর্থে এবং ভৈরব-ভক্তি জাগরণের উদ্দেশ্যে সৎকবীশ্বর বিদ্যাপতি 'গোরক্ষবিজয়' নামক নাটক রচনা করেছিলেন। রচনাটি সংস্কৃত, প্রাকৃত, ব্রজবুলি (মৈথিল) এবং বাংলা, এই ৪ ভাষায় রচিত। রচনা শৈলীর মূল কাঠামো সংস্কৃত নাটকের ন্যায় (সংস্কৃত এবং প্রাকৃতের ব্যবহার তদনুযায়ী)। শুধু গান গুলি মৈথিল বজ্রগুলি ও বাংলায়। যেমন -
দু গোটা যোগি হমে সহজক সঙ্গ
পথ জনু হোত্র মনোরথ ভঙ্গ।
আমি তথা বোলি জা জাক্রো।
যথা সুনিলো গুরুচরণেরি নাঞো।
ভিখিআ ভোজন গুরুতর (-তরুতল) বাস
ভনই বিদ্যাপতি দুরে দুরে আস ।। ৪।। - গোরক্ষবিজয়।
সুকুমার সেন বলেছেন, বাঙ্গালায় অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে লেখা মীননাথ গোরক্ষনাথের কাহিনীর কোন পুথি পাওয়া যায় নাই। গোরক্ষ বিজয়ের অধিকাংশ পুথি উত্তরবঙ্গের "নাথ" যোগীদের প্রভাব বাঙ্গালা দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় দীর্ঘ স্থায়ী হয়েছিলে। (যোগী সিদ্ধ কথা, পৃঃ ১৯১-১৯২)।
ময়নামতী গোবিন্দচন্দ্রের কাহিনীর অস্তিত্বের প্রমান ১৬ শতাব্দীর পূর্বে পাওয়া যায় নি। বাংলায় পাওয়া সব থেকে পুরাতন ময়নামতী গোবিন্দচন্দ্রের আখ্যান হল দুর্লভ মল্লিকের গান। এতে কাহিনীর প্রাচীনত্ব, ধর্মপূজার সঙ্গে যোগী সিদ্ধদের সাধনার সম্পর্ক রক্ষিত আছে। দুর্লভ মল্লিকের গানের সুচনা পর্বটি এইরূপ:
প্রথমে বন্দিলাম ধর্ম আদ্যের গোসাঞী
যার অগোচরে কিছু ত্রিভূবনে নাঞী।
আবার -
কাহের তরে রাউল মুড়ায়িল মাথা
কাহের তবে রাউল গলে দিল কাঁথা।

সুকুমার সেন'এর মতে, গোবিন্দ্রচন্দ্রের "পাটিকা" ভুবন প্রাচীন বাঙ্গালার "পট্রিকের" জনপদ, আধুনিক ময়নামতী অঞ্চল। একদা ও অঞ্চল বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার একটি পীঠস্থান ছিল। (প্রাগুক্ত, পৃ: ২১৪)
উপরিউক্ত আলোচনা হতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে কাল প্রবাহে নাথ সম্প্রদায়'এর অভ্যন্তরে শৈব ভাবধারা পরিস্ফুট হলেও তাঁরা বৌদ্ধ তন্ত্র হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারে নি। আচার্য সুকুমার সেন তা নানা আঙ্গিকে প্রমান করার চেষ্টা করেছেন। বিষয় টি আচার্য সেন'এর বৌদ্ধ অনুরাগকে বহন করেছে।

যদিও গোরঙ্গ বিজয় কাহিনীতে যে সকল সিদ্ধের কাহিনী (গোরক্ষনাথ, মীননাথ এবং হাড়িপা) সহ শৈব মত প্রচার করা হয়েছে তা মূল অর্থে উত্তরকালীন কিন্তু কানপা (কাহ্নপাদ) এবং হাড়িপা (পূর্ববঙ্গের পুথি তে হাড়িফা, নামান্তর জালন্ধরি পাদ) মূল অর্থে বৌদ্ধ সহজিয়া পন্থী ছিলেন। ফলে প্রশ্ন চিহ্ন থেকেই যায়।

সহায়ক গ্রন্থসূচী:
১। বাঙ্গালা সাহিত্যে ইতিহাস, ১ খন্ড, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ফাল্গুন ১৪০১, কলকাতা।
২। প্রাগুক্ত, ২য় খন্ড, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ফাল্গুন ১৪০১, কলকাতা।
৩। প্রাগুক্ত, ৪র্থ খন্ড, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ফাল্গুন ১৪০১, কলকাতা।
৪। পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, গৌতম বুক সেন্টার, দিল্লী, প্রকাশ কাল ২০০৭।
৫। সুকুমার সেন স্মারক গ্রন্থ, সম্পাদনা, বরুণ কুমার চক্রবর্তী, অর্পনা বুক ডিস্ট্রিবিউটার্স, কলকাতা, প্রকাশ কাল ২০০৯।
৬। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খন্ড, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ফাল্গুন ১৪০১, কলকাতা।
৭। মঙ্গলকাব্য বাঙালির পুরাণ ইতিহাস, উত্তম পুরকাইত, ছোঁয়া, কলকাতা, বইমেলা ২০২৫।
৮। ধর্মমঙ্গল, সম্পাদনা, শ্রীবিজিত কুমার দত্ত ও শ্রী সুনন্দা দত্ত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, প্রকাশ কাল-২০০৯।

No comments:

Post a Comment