Tuesday, October 21, 2025

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং তাঁর কবিতায় বিপ্লবী


সুমনপাল ভিক্ষু


"আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা.....
...... বন্যার কাছে ঘূর্ণির কাছে রাখলাম নিশানা।" সলিল চৌধুরী

সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো বহু কবি, শিল্পী কেন সর্বহারার মর্তাদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন, এ প্রশ্ন অবাস্তর। কেননা যুগের আকর্ষণই তাঁদের টেনে এনেছিল। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তখন কেমন ছিল? এর উত্তর সুকান্ত ভট্টচার্যের কবিতায় উদ্ভাষিত হয়।

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাতে 
তার মুখে খবর পেলুমঃ 
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, 
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার 
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে। 
খর্বদেহ, নিঃসহায়, তবু তার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উত্তোলিত, উদ্ভাষিত 
কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

ভারতবর্ষে তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামাখা বেজে উঠেছে, তার সুযোগ নিয়ে ভারতের জনগন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির বিরদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, দেশের মাটিতে তীব্র হতে তীব্রতর হয়েছে ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং তার কয়েক বছর পরে নৌবিদ্রোহ যার সামগ্রিক প্রভাবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত ক্রমশই আলগা হয়ে উঠেছে। ভারত হতে ছেড়ে চলে যাওয়া ব্যতীত যে গত্যন্তর নেই তা এতদিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উপলব্ধি করতে পেরেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্যবাদী আন্দোলনের দাবানল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাভূত করে ফেলেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে 'বলশোভিক পার্টি' (পরবর্তীকালে সোভিয়েত কমিউনিষ্ট পার্টি)র রাশিয়ার প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতন্ত্র। রবীন্দ্রনাথ, রোমা রোলাঁ প্রমুখ বিশ্বের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীগণ এই নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তি সোভিয়েত জণগনের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কাছে পরাভূত হয়েছে এবং পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পুঁজিবাদী শাসন শোষনের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মেহনতী জনগণের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। চীনের জনগণ এগিয়ে চলেছে স্বাধীনতা'র পথে। এশিয়া আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে। অপরদিকে সামাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে সমানতরাল সমাজতান্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা। ফলে সাম্রাজ্যবাদ এক অর্থে হয়ে উঠেছে কাগুজে বাঘ। এমন প্রেক্ষিতে বিশ্বের দেশে দেশে তখন মার্কসবাদ লেলিন বাদ ও বামপন্থী আন্দোলনের পক্ষে প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়েছে।

'জনগনই শেষ পর্যন্ত শেষ কথা বলে।
জনগণই ইতিহাস রচনা করে।'

প্রগতিশীল মানুষ, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক মাত্রই তখন কমিউনিষ্ট মতাদর্শের পথে এগিয়ে চলেছে। অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ছাত্র-যুব মেহমতী জনগণের সংগ্রাম-সংগঠন। এঁরা কিন্তু কেরিয়ার গড়তে অসে নি। যুগোপযোগী আন্দোলনের ইস্তেহার রূপেই তাঁরা সর্বহারা মতাদর্শের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন শাসকের রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করেই।

"বিচার পতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা.....
নিঃস্ব যারা সর্বহারা 
তোমার বিচারে সেই নিপীড়িত জনগণের পায়ের ধারে
নামিয়ে মাথা....।"

বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা প্রতিভাধর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আপামর বাঙালী পাঠকের কাছে 'কিশোর কবি' নামে সুপরিচিত।

ইংরেজী সাহিত্যের শেলি, কীটস্ প্রমুখের ন্যায় তাঁর জীবন ও ফুরিয়ে গিয়ে ছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ২১ বছরের জীবনকালে বাংলা সাহিত্যকে যে অসামান্য অবদানে পরিপূর্ণ করেছেন সুকান্ত তা তুলনারহিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রাদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন তিনি। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েইছলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। ছাত্রপত্র, ঘুম নেই, মিঠেকড়া ইত্যাদি তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। শুধু কবিতাই নয়, তার পাশাপাশি কয়েকটি প্রবন্ধ এবং 'অভিযান নামে একটি নাটিকাও লিখেছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির পূর্ণ সময়ের কর্মী হিসেবে প্রগতিশীল লেখক শিল্পী সংঘে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বয়সের সীমাকে অতিক্রম করে বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য।

 ১৯২৬ সালের ১৫ আগষ্ট কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম। তাঁর পিতার নাম নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মাতা সুনীতি দেবী। নিবারণ চন্দ্র বইয়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সারস্বত লাইব্রেরী। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার উনিশয়া গ্রামে। সুকান্তের দাদু সতীশচন্দ্রের ইংরেজী সাহিত্য ও জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চার প্রতি গভীর দখল ছিল। মামার বাড়ীর পরিবেশ থেকেই পরবর্তীকালে সুকান্তের লেখাপড়ার প্রতি অনুরাগ, কুসংস্কারকে অগ্রাহ্য করার সাহস, দরিদ্র মানুষের প্রতি অগাধভালোবাসা ও দরদ এসব প্রবৃত্তিগুলো চরিত্রে ফুটে উঠেছিল। ১৯৩৭ সালে সুকান্তের যখন মাত্র ১১ বছর বয়স, সেই সময়েই তাঁর মাতা প্রয়াত হন। কমলা বিদ্যামন্দিরে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তিনি। কমলা বিদ্যামন্দিরে বিদ্যা শিক্ষাকালে 'সঞ্চয়' নামক তাঁর নিজের হাতে লেখা একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন সুকান্ত। এরপর তিনি বেলেঘাটা দেশবন্ধু উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই বিদ্যালয়ে তাঁর পরিচয় হয় সুহৃদ অরুনাচল বসুর সঙ্গে। সুকান্ত ভট্টচার্য এবং অরণাচল বসু একত্রে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় 'সপ্তমিকা' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন।

"হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো, 
পদ-ললিতা-ঝংকার মুছে যাক 
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো! প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা 
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।" --ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য।

বিজন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়'এর সম্পাদনায় 'শিখা' পত্রিকায় তাঁর প্রথম লেখা বিবেকানন্দের জীবনী প্রকাশিত হয়। মাত্র ১১ বছর বয়সে 'রাখাল ছেলে' নামক একটি রূপক গীতিনাট্য রচনা করেন সুকান্ত। তাঁর সাহিত্য জীবনে শিক্ষক নবদ্বীপ চন্দ্র দেবনাথ এবং তাঁর বন্ধু অরুণাচল বসুর মাতা সরলা দেবীর গভীর প্রভাব ছিল। কৈশোরে ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় সুকান্তের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

১৯৩৯ সাল থেকেই কলকাতার পথে পথে মিছিল, ধর্মঘট ইত্যাদির প্রভাব সুকান্তের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ১৯৪২ সালের গোড়ার দিকে কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ হয়ে ওঠেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং রাজনীতিতে অন্নদাশংকর ভট্টাচার্য। এই বছরেই মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়ে কমিউনিষ্ট পার্টির একনিষ্ট সদশ্যরূপে কাজ করতে শুরু করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। ঠিক এই সময়েই ঘটে যায় বাংলার পঞ্চাশের মন্বন্তর।

তিনি দুর্ভিক্ষ-পীড়িত নর-নারীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই দুর্ভিক্ষের বিরোধিতা করে সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন 'অভিযান নামে একটি বিখ্যাত নাটক। মোটামুটি ভাবে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যেই তাঁর সাহিত্য জীবন সীমায়িত ছিল।

সুকান্তের কবিতায় সাধারণ মানুষের কথাই বেশী প্রাধান্য লাভ করেছে এবং এই কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণ মানুষের কবি। অসহায় নিপীড়িত-সর্বহারা মানুষের সুখ-দুঃখ ছিল তাঁর কবিতার মুখ্য বিষয়। তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে শ্রেণী বৈষম্যের কথা বলেছেন। 'দৈনিক স্বাধীনতা' (১৯৪৫) পত্রিকার কিশোর সভা বিভাগের সম্পাদনার দ্বায়িত্ব ছিল তাঁর উপরে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য হল-
ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, মিঠেকড়া, অভিযান, ঘুমনেই, হরতাল, গীতিগুচ্ছ প্রভৃতি।

সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও রচনা দক্ষতায় অনন্যা। কখন ও বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি, কখনও মোরগ, কখনও পথ ইত্যাদি বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। সিঁড়ি, একটি মোরগের কাহিনী, রবীন্দ্রনাথের প্রতি, দেশলাই কাঠি, ঘুমভাঙ্গার গান, রৌদ্রের গান, ফসলের ডাক, ১৩৫১, কৃষকের গান, আঠারো বছর, প্রিয়তমাসু ইত্যাদি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা।

"তবুও নিশ্চিত উপবাস
আমার মনের প্রান্তে নিয়ত ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস,
আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি!"

রাজনৈতিক মতাদর্শকেই সুকান্ত তাঁর কবিতার প্রধান বর্শাক্ষুম রূপে গ্রহণ করেছিলেন সুকান্ত। তাই তাঁর কবিতাগুলি হয়ে উঠেছিল স্লোগান সর্বস্ব। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার মধ্যে তাই উদ্ভাষিত হয়েছে প্রাচীন সিংহদ্বারের আগল ভেঙে ফেলার আহন। কেননা তিনি কখনই সামন্তবাদী চিন্তা ও জীবনবোধকে প্রশ্রয় দেননি। সেই অর্থে বিপ্লবের ধারাবাহিকতাতেই সুকান্ত হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রেহী কবি। তিনি বিপ্লবী আদর্শর কথা শ্রেণী সংগ্রামের কথা দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন বারংবার। সুকান্ত তাঁর কবিতার চিন্তাজগতে নতুন ফর্ম সৃষ্টি করেছিলেন। এই সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সুকান্ত দেখিয়েছিলেন নতুন দিনের নতুন সকাল কেমন হওয়া উচিত। তিনি তাঁর কবিতার ভাষাকে নির্ভীকভাবে এমন রূপে উপস্থাপন করেছিলেন যা তার পূর্বাবৃত্তি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

এক্ষেত্রে মানিক মুখোপাধ্যায় (পথিকৃৎ, বিশেষ সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৮৩) এর একটি বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তিনি বলেছেন- ".... চিন্তার একটা আপেক্ষিক স্বাধীনতা আছে, কিন্তু বস্তুজগতের স্থানকালের সীমার মধ্যেই সেই স্বাধীনতা, তার বাইরে নয়।"

কবি সুকান্ত উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিগত বিপ্লব শুরু না হলে ভারতীয় জনগণের মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। কেননা কবি সাহিত্যিক সমাজ পরিবেশ থেকে তাঁদের কাব্য-সাহিত্যের রসদ সংগ্রহ করেন। এমনকি যে রূপাশ্রয়ে তাঁদের শিল্পসৃষ্টি, সেটিও সমাজ জমিন হতে আহরিত। তাই তিনি দীপ্তকণ্ঠে তাঁর কবিতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে 'জনযুদ্ধ' ঘোষণা করেছেন।

"লাল আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে,
কী হবে আর কুকুরের মতো বেঁচে থাকায়? 
কতদিন তুষ্ট থাকবে আর 
অপরের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট হাড়ে? মনের কথা ব্যক্ত করবে ক্ষীণ অস্পষ্ট কেঁউ কেউ শব্দে?
ক্ষুধিত পেটে ধুকে ধুঁকে চলবে কত দিন?
ঝুলে পড়া তোমার জিভ...।" --১লা মে-র কবিতা।

সুকান্ত'র কবি প্রতিভা সম্পর্কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিবাদী বাংলা সাহিত্যিক তথা শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, "গভীরতা", ব্যপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশর্ষ ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতি কবিতা পর্যন্ত। সুকান্তের কবিতায় তাই বাংলা কাব্য সাহিত্যের নবজন্মের সূচনা ছিল।"

সারি সারি বাড়ি সব 
মনে হয় কবরের মতো। 
মৃত মানুষের স্তূপ বুকে নিয়ে পড়ে আছে চুপ করে সজয় নির্জনে। 
মাঝে মাঝে শব্দ হয়ঃ 
মিলিটারি লরির গর্জন
পথ বেয়ে ছুটে যায় বিদ্যুতের মতো
সদম্ভ আক্রোশে। --সুকান্ত ভট্টাচার্য, সেপ্টেম্বর' ৪৬।

১৯৩৬ সালে রাজনৈতিক বন্দীমুক্তির জন্য সমগ্র দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়। অবিভক্ত বঙ্গ এবং অন্যত্র 'সর্বভারতীয় ব্যক্তি স্বাধীনতা' কমিটি গড়ে ওঠে। ঐ বছরেই বাংলার দুইজন রাজবন্দী মৃত্যুবরণ করেন। এই বিষয়টি বাংলার জনগণের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ফলে বিনা বিচারে আটক আইনের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ সোচ্চার হয়ে ওঠে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও ধিককার জানান। ১৯৩৭ সালে রাজবন্দীদের সাহায্যের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীগণের স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রে তৎকালীন দেশের পরিস্থিতির কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিবৃত হয়েছে "বিনাবিচারে বন্দী করা, বিচারে মুক্তি লাভের পর পুনরায় গ্রেপ্তার ও অন্তরীন করা, সভা-সমিতি ও বক্তৃতা করিবার অধিকার ক্ষুন্ন করিয়া ১৪৪ ধারা জারি করা, স্বাধীন চিন্তা এবং মত প্রকাশ বন্ধ করিবার উদ্দেশ্যে সংবাদপত্রকে আইন দ্বারা আষ্ঠে পৃষ্ঠে আবদ্ধ করা এবং আরও বহু প্রকারে সাধারণের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করাই হইতেছে আজিকার বাংলার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।"

১৯৩৭ সালের আগষ্ট মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, "জগতের অধিকাংশ দেশের দন্ডবিধিতে যে শাস্তিদানের নিষ্ঠুর প্রথা প্রচলিত আছে, উহাই মানব সভ্যতার কলঙ্ক। তাহার উপর সম্প্রতি পাশ্চাত্যের কোনও কোনও প্রদেশে রাজনৈতিক বন্দীদের উপর প্রতিহিংসা গ্রহণের এক উদ্দাম প্রবৃত্তি সহসা জাগিয়া উঠিয়াছে। ভারতবর্ষের গভর্ণমেন্টের মধ্যেও এই ফ্যাসিষ্ট-নীতি কতকটা সংক্রামিত হইয়াছে বলিয়া দেখা যাইতেছে। এই নীতি আইন এবং মানব স্বাধীনতার ন্যায্য দাবির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না।"

পণ করো, দৈত্যের অঙ্গে
হানবো বজ্রাঘাতে, মিলবো সবাই এক সঙ্গে; 
সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির 
দিন নেই তর্ক ও যুক্তির। 
আজকে শপথ করো সকলে 
বাঁচাব আমরা দেশ, যাবে না তা শত্রুর দখলে; 
তাই আজ ফেলে দিয়ে তুলি আর লেখনী, 
একতাবদ্ধ হও এখনি -জাগবার দিন আজ, পূর্বাভাস।

কোনো ভাব, কল্পনা বা আদর্শ মূলঅর্থে আকাশ থেকে পড়ে না, জীবনের অভ্যন্তরেই তার সৃষ্টি এবং সেই জীবন সমাজবদ্ধ। সুতরাং যে কোনো ভাব বা আদর্শের মধ্যেই নিহিত আছে সৃষ্টি কালের সমাজ চেতনা। সেই অর্থে সামাজিক ইতিহাসের অভ্যন্তরেই সে যুগের চেতনার সধান করতে হয়।

তবে প্রকৃত অর্থে মনে রাখা প্রয়োজন, যে দিন থেকে ইতিহাসের উদ্ভব ঘটেছে সে দিন থেকে দেখা যায় সমাজ দ্বিধাবিভক্ত (শাসক এবং শোষিত)। কমিউনিষ্ট পার্টির ম্যানিফেস্টোর জার্মান সংস্ককণের ভূমিকায় (১৮৮৩ সাল) এঙ্গেলস বলেছেন, "প্রত্যেক ঐতিহাসিক যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং তার থেকে উদ্ভূত সমাজ কাঠামো সেই যুগের রাজনৈতিক এবং মানসিক ইতিহাসের ভিত্তিভূমি। সুতরাং অদিম যুগের ভূমির উপর যৌথ মালিকানা অবলুপ্তির পর থেকে সমস্ত ইতিহাসই হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, শোষক ও শোষিতের সংগ্রামের ইতিহাস, সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তরে অবদষিত ও প্রভূত্বকারী শ্রেণীর সংগ্রামের ইতিহাস।"

দূর পূর্বাকাশে 
বিহ্বল বিষান উঠে বেজে 
মরণের শিরায় শিরায়। 
মুমূর্ষু বিবর্ণ মত রক্তহীন প্রাণ-
বিস্ফারিত হিংস্র বেদনায়। -- পূর্বাভাস।

১৯৪২'এর আগষ্ট, তীব্র হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন, চলতে থাকে ইংরেজদের দমন-পীড়ন এবং গ্রেপ্তার। এই উত্তাল সময়ে সুকান্ত কমিউনিষ্ট পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সেই অনুভব সুকান্তের কবিতায় দৃষ্টিগোচর হয়-

জনগণ হও আজ উদ্বুদ্ধ 
সুরু করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ, 
জাপানী ফ্যাসিস্টদের ঘোর দুর্দিন মিলেছে ভারত আর বীর মহাচীন। সাম্যবাদীরা আজ মহা ক্রুদ্ধ 
শুরু করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ। 
--জনযুদ্ধের গান।

ওই সময়ে মধ্যবিত্ত মানসিকতার সংশয়, দোদুল্যমানতা, জাগ্রত চেতনা প্রভৃতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় সুকান্তর 'মধ্যবিত্ত, ১৯৪২ কবিতায়। অন্যদিকে ৪২-এর উত্তাল পরিস্থিতিতে মানুষের মনের কথা ম্যানিফেস্টো হয়ে উঠেছে তাঁর 'উদ্যোগ' কবিতায়। তিনি লিখেছেন-

বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষন করো চিত্ত, 
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। 
মূঢ় শত্রুকে হানো স্রোত রুখে, তন্দ্রাকে করো ছিন্ন, 
একাগ্র দেশে শত্রুরা এসে হয়ে যাক নিশ্চিহ্ন।

এরপরই তাঁর লেখনীতে বিধৃত হয় বিপ্লবী চেতনায় সময়ের উজ্জ্বল স্বাক্ষর 'চট্টগ্রাম ১৯৪৩' কবিতা 

ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম-
চট্টগ্রাম: বীর চট্টগ্রাম।
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা 
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎ প্রবাহ আনে, আনে চেতনার দিন।

ফ্যাসীবাদী আগ্রাসনের মধ্যেই বাংলায় দেখা দিয়েছিল ৫০'এর মন্বন্তর। তার উপর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের নির্মমতা। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ সময়। এই তমসাচ্ছন্ন সময়ে সুকান্তের কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে নব অরুণোদয়'এর গভীর প্রত্যয়-

রক্তে আনো লাল
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল - বিবৃতি।

'চট্টগ্রাম: ১৯৪৩' কবিতায় রয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লালফৌজের অজেয় সংগ্রামের কাহিনী। আর 'লেলিন' কবিতায় উদ্ভাসিত মহামতি লেনিরে নেতৃত্বে ঐতিহাসিক নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দূরন্ত ঘোষণা-

হাজার লেনিন যুদ্ধ করে,
মুত্তর সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে।
বিদ্যুৎ ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন
ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,
বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ;
আসে শত্রুজয়ের সংবাদ। --লেনিন।

অন্যায় এবং সংগ্রামের বিরুদ্ধে সংগ্রামই একমাত্র পথ। সংগ্রামী পথে কবি কন্ঠ হয়ে উঠেছে সুদৃঢ় :

আমি এক ক্ষুধিত মজুর
আমার সম্মুখে আজ এক শত্রু: এক লাল পথ,
শত্রুর আঘাত আর বুভুক্ষার উদ্দীপ্ত শপথ। --শত্রু এক।

৩০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে যে বিরাট অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল তা ১৯৪১ সালে একেবারে কলকাতার দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হোল। ১৯৪১ থেকে জাপানী বোমার ভয়ে কলকাতার মানুষ লাখে লাখে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেল। তখন দিনের কলকাতা ও জনশূণ্য। রাতে নিষ্প্রদীপ। ভয়ে সব শব্দহীন। মাঝে মাঝে মিলিটারি গাড়ি বা বুটের শব্দ। সুকান্ত লিখেছিলেন "....ম্লানায় মান কলকাতার ক্রমন্তস্বমান স্পন্দনধ্বনি শুধু বাংরবার আগমী ঘোষণা করছে আর মাঝে মাঝে আসন্ন শোকের ভয়ে ব্যথিত জননীর মত সাইরেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। নগরীর বুঝি অকল্যান হবে। আর ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে অবাতীর্ণ হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কলকাতা, তবে নাটকটি হবে বিয়োগান্তক। ১৯৪২ সাল কলকাতার নতুন সজ্জাগ্রহণের এক অভূত পূর্ব মুহূর্ত। বাস্তবিক ভাবতে অবকে লাগে, আমার জন্ম পরিচিত কলকাতা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাবে অপরিচয়ের গর্ভে, ধ্বংসের সমুদ্রে, তুমি ও কি তা বিশ্বাস কর, অরুণ?"

সুকান্তের এই বক্তব্যের মাধ্যমে একদিকে যেমন তখনকার কলকাতার অবস্থা জানা যায়, তেমনি অন্যদিকে সুকান্তের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়। মৃত্যু তো জীবনের অপরিহার্য পরিণতি কিন্তু সেই মৃত্যু যদি একটা বিরাট পরিবর্তনের মূল্য রূপে দিতে হয়, আগামী বসন্তের জন্য আত্মত্যাগ করতে হয় তবে সে মৃত্যু সার্থক।

আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতিক্ষায়,.....। -- রবীন্দ্রনাথের প্রতি।

৫০'এর ভয়াবহ ক্ষবন্তরের অভিঘাত সুকান্তের মনে গভীর বিষন্নতা সৃষ্টি করেছিল। সর্বোপরি যুদ্ধের অজুহাতে খাদ্যসামগ্রীর কৃত্তিম সংকট ইত্যাদি তাঁকে বিস্মিত এবং ক্ষুব্দ করে তুলেছিল। ফলে প্রতিবাদী কবির কলম হয়ে উঠেছিল বর্শামুখ-

আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,
জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,
দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,
প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।
.....পথে পথে দলে দলে কঙ্কালের শোভাযাত্রা চলে,
দুর্ভিক্ষ গুঞ্জন তোলে আতঙ্কিত অন্দর মহলে! -- বিবৃতি।

এই যুদ্ধ, মন্বন্তর, বুভুক্ষা মানুষের হাহাকার, সমবেত আর্তনাদ তরুণ কবি সুকান্তের অন্তরকে দীর্ণ করেছিল। তাই তিনি লিখেছেন-

.....একদা দুর্ভিক্ষ এল
ক্ষুধার ক্ষমাহীন তাড়ানায়
পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁসি সবাই দাঁড়ালে একই লাইনে
ইতর-ভদ্র হিন্দু আর মুসলমান
একই বাতাসে নিলে নিঃশ্বাস। 
-- ঐতিহাসিক।

কমিউনিষ্ট কবি স্বপ্ন দেখেছিলেন সমাজতান্ত্রিক ভারত একদিন হয়তো এশিয়ার মুক্তি সূর্যের প্রতীক হবে।

তাঁর আহ্বানষআর এক যুদ্ধ শেষ,
পৃথিবীতে তবু কিছু জিজ্ঞাসা উন্মুক্ত।
....জানো না এখানে যুদ্ধ শুরু দিন বদলের পালা।

অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র বলেছেন, "সাহিত্য গড়িয়া ওঠে যুগধর্মে।" সুতরাং শরৎচন্দ্রের কথাকে উপলব্ধি করে বলা যায় যে যুগের বিষয়টিকে অনুধাবন না করলে সাহিত্যের যথার্থতা অনুভব করা সম্ভব নয়। কেননা সুকান্ত যে সময়কালে জন্মেছিলেন সেই সময় কালের আর্থ সামাজিক পরিকাঠামো তাঁকে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্নে আত্মনিবেদন করেছিল। লেনিন বলেছেন, "মানুষ তাদের নিজেদের রক্তমাংসেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যে বিপ্লবী কর্মী নিজের অভিজ্ঞতা গুলোকে সুস্পষ্ট করে তুলতে সক্ষম হবার জন্যে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে এই জীবনের মধ্যে সক্রিয়, তাঁর রাজনীতির মূল সমষ্যাগুলো কোনোক্রমেই নীরস আর শিল্প রচনার বিরোধী হিসেবে উপস্থিত হতে পারে না।"

মাও সে তুং বলেছিলেন, "বিপ্লবী লেখক ও শিল্পীদের লক্ষ্য হবে শুধু পরদেশ আক্রমণ কারীদের, শোষক ও উৎপীড়নকারীদের স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করা, জনসাধারণের নয়। জনসাধারণের নিজস্ব ত্রুটি বিচ্যুতি আছে খুব স্বাভাবিক ভাবেই, কিন্তু এ ত্রুটি প্রধানত তাদের অত্যাচারীদের শাসনেরই ফল স্বরূপ।" সুকান্ত যথার্থ অর্থেই ছিলেন সর্বহারা মতাদর্শের কবি। তিনি তাঁর জীবনের গভীরতম আবেগের মধ্য দিয়েই সর্বহারা রাজনৈতিক ধারণার পথে ধাবিত হয়েছিলেন।

হে সূর্য।
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও-
শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড, তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকই 
এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ডে 
পরিণত হব। -- প্রার্থী। 

বুদ্ধদেব বসুর সমকালীন কবি বিষ্ণু দে লিখেছিলেন, "সুকান্তের কবিতা চার-পাঁচ বছর আগে হাতে আসে, হাতে-লেখা তিনটি কবিতা, পরিস্কার পরিণত হাতের লেখা। আশ্চর্য হয়েছিলুম সুকান্তর কবি প্রতিভা প্রকাশিত হলো প্রতিশ্রুতিতে নয়, একেবারে পরিণতিতে। তারপর থেকে মাঝে মাঝে তার কবিতা পড়েছি। অক্লান্ত কর্মীর আত্মত্যাগের অবসরহীন মাসন কিন্তু সুলিখিত কবিতা। একাধারে তার এই পরিণত কবিত্ব এবং মার্কসিস্ট তত্ত্বের জনগাম্ভীর্য বারবার বিস্মিত করেছে ভেবেছিল গৌঢ়ত্বে আর কি লিখবে, এর বিস্ময়কর প্রতিভার কি বিকাশ সম্ভব?" (স্বাধীনতা ১৮ মে, ১৯৪৭)। বাস্তবিক অর্থে সুকান্ত ছিলেন অসামান্য কবি। বিষ্ণু দে'র এই বক্তব্যের মাধমে সুকান্তের কবি প্রতিভার একটি সঠিক প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।

আজ দেহে আমার সৈনিকের কড়া পোশাক, 
হাতে এখনো দুর্জয় রাইফেল, 
রক্তে রক্তে তরঙ্গিত জয়ের আর শক্তির দুর্বহ দম্ভ, 
আজ এখন সীমান্তের প্রহরী আমি। আজ নীল আকাশ আমাাকে পাঠিয়েছে আমন্ত্রন,
স্বদেশের হাওয়া বয়ে এনেছে অনুরোধ,
চোখের সামনে খুলে ধরেছে সবুজ চিঠি,
কিছুতেই বুঝি না কী করে এড়াব তাকে? -- প্রিয়তমায়ু।

কমিউনিষ্ট পার্টির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জনগণের সংগ্রামের সঙ্গে ঘণিষ্ঠ সম্পর্কে এসেছিলেন কিশোর কবি সুকান্ত। নিপীড়িত জনগণের দুঃখ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, প্রতায় ও সংগ্রামের সঙ্গে গভীর একাত্মতার মধ্যে লালিত এবং বিকশিত হচ্ছিল তাঁর বলিষ্ঠ কাব্যচেতনা। ফলে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল গণসংগ্রাম কার্যক্রমেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুকান্তের আহ্বান --

আমি যেন সেই বাতিওয়ালা, 
যে সন্ধ্যায় রাজ-পথে পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে 
অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য, 
নিজের ঘরে জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার।

নিজের কবি ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সুকান্ত বলেছিলেন, "কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরণের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তা ছাড়া কবির চেয়ে বড়ো কথা আমি কমিউনিষ্ট, কমিউনিষ্টদের কাজ করবার সব জনতা নিয়েই।"

দুর্বল পৃথিবী কাঁদে জটিল বিকারে, মৃত্যুহীন ধরণীর জ্বলন্ত প্রলাপ 
অবরুদ্ধ বক্ষে তার উন্মাদ তড়িৎ 
নিত্য দেখে বিভীষিকা পূর্ব অভিশাপ।

অধ্যাপক জগদীশ ভট্টচার্যের মতে, "সুকান্তের কাব্যে এ যুগের তিনটি চিত্তবৃত্তি প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে।
১। জনজীবন চেতনা, ২। সমপ্রাণতা ও ৩। শুভকর্ম প্রেরণা। প্র্যতকে যুগের কতগুলো সঞ্চারী ভাব মুখ্য হয়ে ওঠে। এ যুগের তিনটিই মুখ্য সঞ্চারী।"

জীবন চেতনার অনেকগুলো লক্ষণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সুকান্তের কর্ম এবং কাব্যচর্চায়। সুকান্তের অভিব্যক্তি বৃহত্তর মঙ্গলময়তার দিকে অগ্রসর হওয়া, সেখানে ব্যক্তি জীবন নয়, সুখ-সমৃদ্ধি নয়, ব্যক্তি জীবন সমগ্র সমাজ জীবনের কথা বলে। সমষ্টিগত প্রতিযোগ এক সম্ভবনাময় ভবিষ্যতের আধার।

আমার মৃত্যুর পর থেমে যাবে কথার গুঞ্জন 
বুকের স্পন্দনটুকু মূর্ত হবে ঝিল্লির ঝংকারে, 
জীবনের পথ প্রান্তে ভুলে যাবে মৃত্যুর শংকারে, 
উজ্জ্বল আলোর চোখে আঁকা হবে আঁধারের অঞ্জন।

জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে সুকান্তের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় কবিতা 'রানার'। এই কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় বাস্তব জীবন বোধের এক অদ্ভুত অনুভূমি। পরবর্তী সময়ে এই কবিতাটি সলিল চৌধুরীর সুরে এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যয়ের কন্ঠে বাংলার পথ প্রান্তর অতিক্রম করে সকল শ্রেণীর মানুষের ভাবাবেগকে নাড়া দিয়েছিল।

রানার! রানার! 
জানা-অজানার 
বোঝা আজ তার কাঁধে, 
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে; 
রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়, আরো জোরে, আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়। 
তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিয়ে সরে যায় বন,
আরো পথ, আরো পথ-বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ।

সুকান্ত প্রকৃত অর্থে ৩০ ও ৪০'এর দশকের অবক্ষয়ী সমজের জ্বলন্ত ইতিহাস। তাঁর জীবন বিদ্রোহী অথচ মানবিকতা পূর্ণ। তিনি মেহনতী জনগণের কবি। সুকান্তের কাব্য স্পষ্ট, আপসহীন, শানিত, হাতুড়ির মতো শক্ত, কঠিন এবংনতুন চিন্তার ফসল। গভীর নৈরাশ্য এবং যন্ত্রণার মধ্য হতে জেগে ওঠা আশাবাদই সুকান্তের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তোমাকে দিচ্ছি চরমপত্র রক্তে লেখা, অনেক দুঃখে মথিত এ শেষ বিদ্যে শেখা অগণ্য চাষী মজুর জেগেছে শহরে গ্রামে সবাই দিচ্ছে চরমপত্র একটি খামে; পবিত্র এই মাটিতে তোমার মুছে গেছে ঠাঁই 
ক্ষুব্ধ আকাশে ধ্বনিত 'স্বাধীনতা চাই'।
 --চরমপত্র।

সুকান্ত ছিলেন সমাজ জীবনে শোষণ বঞ্চনা বিরোধী শান্তি প্রতিষ্ঠাকামী বিপ্লবী এবং স্বাপ্নিক কবি। রাজনীতি ও কবিতা কোনোটিকেই তিনি ভিন্নরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন নি। উভয় বিষয়কেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন জীবনের সমগ্রতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলিয়ে। ফলে রাজনীতি এবং কবিতার এই মেলবন্ধনে রাজনীতি হয়েছে তাঁর কবিত্বের স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ প্রকাশ। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, দেশের জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তি আসবে শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। উপলব্ধি করেছিলেন, সুখী সুন্দর নতুন জীবনের জন্য, শোষণ ও শৃঙ্খলমুক্ত মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য চাই এক সফল বিপ্লব। এই বিপ্লব পরিচালিত হবে সর্বহারা অর্থাৎ মেহনতী জনগণের নেতৃত্বে। সুতরাং সেই অর্থে ৪০'এর দশকের উত্তাল গণসংগ্রামে যুক্ত হয়ে সুকান্ত সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ধ্বংসকামী এক রক্তাক্ত বিপ্লবকেই যেন আসন্ন ও অনিবার্য বলে অনুভব করেছিলেন।

আমরা বেড়িয়ে পড়ব, 
আমরা ছড়িয়ে পড়ব শহরে, গঞ্জে, গ্রামে-দিগন্ত থেকে দিগন্ত। 
আমরা বারবার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়-
তা তো তোমরা জানোই। 
কিন্তু তোমরা তো জানো নাঃ 
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই শেষবারের মতো। -- দেশলাই কাঠি।

৩০ এবং ৪০'এর দশকে বামপন্থী জীবনবোধকে আলোকবর্তিকা করে যে সকল কবি পৃথিবীতে পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যবাদী শোষনের পোষন যন্ত্রে মানুষের মর্মযাতনায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, এবং বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে কলমকে তীব্র কুঠার করেছিলেন, সাকন্তু ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

একদা যুদ্ধ হল সারা বিশ্ব জুড়ে জগতের যত লুণ্ঠনকারী আর মজুরে, চঞ্চল দিন ঘোড়ার খুরে। 
উঠি উদ্ধত প্রাণের শিখরে, চারিদিকে চাই 
এল আহ্বন জনপুঞ্জেও শুনি রোশনাই দেখি ক্রমাগত কাছে উৎরাই।
হাতছানি দিয়ে গেল শষ্যের উন্নত শীষ,
জনযাত্রার নতুন হদিশ-
সহসা প্রাণের সবুজে সোনার দৃঢ় উষ্ণীষ -- হদিশ।

মার্কসবাদ অনুসারে প্রতিটি সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর নিজ নিজ শ্রেণী স্বার্থের বৈরীতামূলক প্রকৃতিই শ্রেণী সংগ্রামের উৎস। পুঁজিবাদী সমাজে বুর্জোয়া শ্রেণী থাকে সমাজ ব্যবস্থার নিয়ত্তার অবস্থানে বিরাজমান শোষণ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক আধিপত্য ও স্বার্থ সংরক্ষণে তারা থাকে সদা তৎপর। পক্ষান্তরে শ্রমিক ও অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণী শোষণ ও সামাজিক নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি ও অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে।

মার্কস-এঙ্গেলস্'এর তত্ত্ব অনুসারে পুঁজিবাদী সমাজে এই দুই শক্তির মধ্যে শ্রেণীগত সংগ্রামই সমাজবিকাশের মূল চালিকাশক্তি। সমাজ বিবর্তনের একটা পর্যায়ে শ্রেণী সংগ্রাম চূড়ান্ত রূপ নেয় সমাজবিপ্লবে। পুঁজিবাদী সমাজে সংঘটিত সমাজ বিপ্লবের ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে বিপ্লবী শ্রেণী।

এখানে চল্লিশ কোটি এখনো জীবিত ভারতবর্ষের পরে গলিত সূর্য ঝরে আজ-
দিগ্বিদিকে উঠেছে আওয়াজ
রক্তে আনো লাল,
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল, --  বিবৃতি।

সুকান্তের কবিতায় সামাজিক মুক্তি এবং জনচেতনা নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর কবিতায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এসেছে বঞ্চিত, নিপীড়িত জনগণের প্রতি সহানুভূতি। তাই শোষন নির্ভর সমাজব্যবস্থার ধ্বংসের কথা সুকান্তের কবিতায় নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

দেখব, ওপরে আজো আছে কারা, খসাব আঘাতে আকাশের তারা, 
সারা দুনিয়াকে দেব শেষ নাড়া, 
ছড়াব ধান।
জাতি রক্তের পেছনে ডাকবে সুখের বান -- বিদ্রোহের গান।

মনে রাখতে হবে উপনিবেশ গুলি থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ ব্যতীত পুঁজিবাদী সভ্যতার তাক্-লাগানো সৌধ যে কখনই গড়ে উঠতে পারত না, তার অমোঘ যুক্তি আমরা পাই লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত আলোচনায় বা রোজা লুক্সেমবুর্গের 'আদি পুঞ্জীকরণ' এর বিশ্লেষণে। পুঁজিবাদের সংকটমোচনের উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল। ৩০'এর দশক থেকে পুঁজিবাদ এবং ফ্যাসিষ্ট বিরোধী সংস্কৃতির নতুন ধারাটি কেবল ধর্মীয় জাতিয়তাবাদের বিপক্ষেই দাঁড়ায়নি, স্বাধীনতার আকাঙ্খার মধ্যে যুক্ত করেছে তার আন্তর্জাতিকতার বার্তা। ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লাল ফৌজের (সোভিয়েত রাশিয়া) অসমসাহসিক প্রতিরোধ ঔপনিবেশিক শাসনে থাকা দেশগুলির কাছেও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছিল। আর সেই সঙ্গে এই ফ্যাসিষ্ট বিরোধী চেতনায় মেহনতী জনগণের জাগরণ স্বাধীনতার একটি গুরুত্ব পূর্ণ সূচক রূপে চিহ্নিত হয়েছিল। প্রগতি আন্দোলনে উদারপন্থী মানবতাবাদী লেখক চিন্তকদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংস্কৃতির যৌথ মঞ্চ গড়ে তোমার আহ্বান বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একথা স্পষ্ট করে যে, এই উদ্যোগগুলিতে প্রগতিশীল লেখক শিল্পী দার্শনিকদের প্রচেষ্টার অংশীদার ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের কমিউনিষ্টরা।

শঙ্কাকুল শিল্পীপ্রাণ, শঙ্কাকূল কৃষ্টি, দুর্দিনের অন্ধকারে ক্রমশ খোলে দৃষ্টি। হত্যা চলে শিল্পীদের, শিল্প আক্রান্ত, দেশকে যারা অস্ত্র হানে, তারা তো নয় ভ্রান্ত। 
বিদেশী চর ছুরিকা তোলে দেশের হৃদ্‌-বৃন্তে 
সংস্কৃতির শত্রুদের পেরেছিল তাই চিনতে। -- 'ছুরি', ঘুম নেই।

১৯৪২ সারে ৮ মার্চ ঢাকাতে 'সোভিয়েত সুহৃদ সংঘের আহ্বানে একটি ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে তরুণ ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও লেখক সোমেন চন্দ নৃশংসভাবে খুন হন। সোমেন চন্দের মৃত্যু সুকান্ত কে প্রবলভাবে ব্যাথিত করেছিল। সুকান্ত লিখেছেন-

শহীদ খুন, আগুন জ্বালে, শপথ, অক্ষুন্নঃ
এদেশে অতি শীঘ্রই হবে বিদেশী, চর, শূন্য। 
বাঁচার দেশ, আমার দেশ হানবো প্রতিপক্ষ, 
এ জনতার অন্ধ চোখে আনবো দৃঢ় লক্ষ্য। -- 'ছুরি, ঘুম নেই।

১৯৪৩ সালের মার্চে সমগ্র ইতালি জুড়ে প্রবল শ্রমিক আন্দোলন, গণবিক্ষোভ এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মুখে ফ্যাসিবাদের জনক মুসোলিনীর পরাজয় সুকান্তের কবিতায় উঠে এসেছে:

ভেঙেছে সাম্রাজ্যস্বপ্ন, ছত্রপতি হয়েছে উধাও;
শৃঙ্খল গড়ার দুর্গ ভূমিসাৎ বহু শতাব্দীর। 
'সাথী, আজ দৃঢ় হাতে হাতিয়ার নাও'-রোমের প্রত্যেক পথে ওঠে ডাক ক্রমশ অস্থির। 
উদ্ধত ক্ষমতালোভী দস্যুতার ব্যর্থ পরাক্রম, 
মুক্তির উত্তপ্ত স্পর্শে প্রকাশিত-
যুগ যুগ অন্ধকার রোম। -- রোম ১৯৪৩।

সুকান্তের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেকার দ্বন্ধ হলো শোষণ ও বঞ্চনার বিশ্ব বনাম সমৃদ্ধ, শোষণহীন, উন্নত বিশ্বের মধ্যেকার সংগ্রাম। মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় সুনিশ্চিত করে সমাজতন্ত্র স্থাপনের সংগ্রামকে জোরদার করতেই হবে। সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধ পরস্পরকে জড়িয়ে রয়েছে। চিরতরে শান্তি দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করার জন্যও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে শক্তিশালী করতেই হবে। দেশে দেশে প্রগতির শক্তির অগ্রগতি, গণতন্ত্র ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে সংগ্রাম, শ্রমিক কৃষক সহ মেহনতি জণগনের সংগ্রাম জোরদার করে, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ'এর বিরুদ্ধে লড়াই আরও তীব্রতর করতেই যুগের কেন্দ্রীয় দ্বন্ধ সমাজতন্ত্র বনাম সাম্রাজ্যবাদ তার তীব্রতা বৃদ্ধির ওতর মানব সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

সামনে ধূম-উজ্জীরণত কামান, 
পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে ধরা জনতা
-কামানের ধোঁয়ার আড়ালে দেখলাম, মানুষ। 
আর দেখলাম ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক মমতা।
অনেক যুগ, অনেক অরণ্য, পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে
তারা এগিয়ে আসছে ঝানো কঠোর মুখে --কনভয়।

সুকান্ত কমিউনিষ্ট আদর্শে অটল থাকলেও কখনই তিনি বাধাহীন ভাবাবেগে অবগাহন করেন নি। তিনি ছিলেন স্থির চিন্তক। তাঁরসংগ্রাম শীল জীবনধারা তাঁকে জনগণ মুখী এবং জনগণের নিকটবর্তী করেছিল। কেননা ১৯৪০-১৯৪২ সালের সন্ধিক্ষণে সুকান্ত সর্বহারা মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং জনগণকে মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এইকালপর্বে সুকান্ত ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। 'পরিখা' কবিতায় তিনি প্রতিরোধ লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন-

মরণের আজ সর্পিল গতি বক্রবধির-
পিছনে ঝটিকা, সামনে মৃত্যু রক্তলোলুপ। 
বারুদের ধূম কালো ছায়া আনে, তিকরত রুধির; 
পৃথিবী এখনো নির্জন নয় জ্বলন্ত ধূপ নৈঃশব্দ্যের তীরে তীরে আজ প্রতীক্ষাতে সহস্র প্রাণ বসে আছে ঘিরে অস্ত্র হাতে-

বস্তুত সুকান্তের দৃষ্টিতে সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম ছিল ভারতীয় জনগণের মুক্তিসংগ্রাম। তাঁর এই উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে 'মণিপুরে' কবিতায়।

এ ধূলোয় প্রতিরোধ, এ হাওয়ায় ঘূর্ণিত চাবুক,
এখানে নিশ্চিহ্ন হল কত শত গর্বোদ্ধত বুক। 
এ মাটির জন্যে প্রাণ দিয়েছি তো কত যুগ ধরে,
রেখেছি মাটির মান কতবার কত যুদ্ধ ক'রে।

প্রত্যক্ষভাবে সর্বহারা মতবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার পূর্বেই সুকান্ত পীড়িত করেছিল স্বদেশের পরাধীনতা, দারিদ্রতা এবং মৃত্যু মিছিল। তারই বেদনামথিত রূপায়ন ঘটেছে 'অনুভব' কবিতায় ১৯৪০'এর অংশে :

অবাক পৃথিবী। আমরা যে পরাধীন অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন;
-------------------------------
হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে
দেখেছি লিখিত 'রক্ত খরচ' তাতে;
এ দেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,
 ---- অনুভাব: ১৯৪০।

১৯৪১ সালে (জুন মাস) নাৎসী জার্মান বাহিনী হিটলারের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করলে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি সোভিয়েত রাশিয়া সহ মিত্রশক্তির পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদী অক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মিত্রশক্তিকে সমর্থন করতে গিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টি কংগ্রেস এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারে নি। সেই সময় কমিউনিষ্ট পার্টির এই অবস্থান প্রসঙ্গে অমলেন্দু সেনগুপ্ত (উত্তাল চল্লিশ অসমাপ্ত বিপ্লব) লিখেছেন- ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে, আন্তর্জাতিকতাবোধ ও জাতীয়তাবাদের দ্বন্ধ কমিউনিষ্ট ও অন্যদের মধ্যে সৃষ্টি করল এক দুস্তর ব্যবধান। আন্তর্জাতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কমিউনিষ্টদের দৃষ্টিতে মূল শত্রু ফ্যাসিজম। এবং যুদ্ধে ফ্যাসিজমের জয় ও লালফৌজের পরাজয়ের অর্থ ানব সভ্যতার বিনাশ ও সমাজবিকাশের ধারায় ছেদ। অপরদিকে জ্বলন্ত বাস্তব হল দেশের মাটিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন অস্তিত্ব। স্বদেশ ও বিশ্বকে মেলাতে গিয়ে এক সংকটের আর্বতে গিয়ে পড়ে ভারতের কমিউনিষ্টরা।

কমিউনিস্টরা ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী এই কুৎসার জবাবে কবি সুকান্ত তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন 'বিক্ষোভ' কবিতায়-

দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম, 
হে স্বদেশ, ফের এই কথা জানালাম। যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী, আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।

সুকান্তের কবি প্রতিভা সম্পর্কে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, 'সাধারণ মানুষের জীবনকে সমবেদনায় অর্ন্তদৃষ্টিতে দেখবার যে শক্তি সুকান্তের কাব্যের প্রতি ছত্রে অনুরণিত হয়ে উঠেছে সে শক্তি সুকান্ত লাইব্রেরী বিহারিণী সরস্বতীর কাছে পায় নি, সে শক্তি সুকান্ত লাভ করেছিলেন জীবনের পাঠশালায় যার অধিষ্ঠান মাঠে গ্রামে, বস্তিতে মিলে রাজপথে। প্রসঙ্গত সুকান্ত বড়ো কবি হতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন জনগণের অসহায়ত্বকে প্রতিবাদের ভাষা দিতে এবং দিতে পেরেও ছিলেন।

আনন্দ বাগচী বলেছেন, 'সুকান্তর কবিতা আকাশ কুসুম নয়, অগ্নি কুসুম।' আর তারাশঙ্কর আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, 'আমি বিশ্বাস করি ইতিহাসের অমোঘ অস্ত্রসালায় এই কবিদধীচির অস্থিমালা দিয়ে যে বজ্র তৈরী হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে বঞ্চিত মানুষের বুকে তার ক্ষমাহীন নির্ঘোষ শোনা যাবে।'

১৯৪৬ সালের ১লা মে'র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সুকান্ত আহ্বান জানাচ্ছেন শাসক শ্রেণীর বশ্যতাকে অস্বীকার কারে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে:

তার চেয়ে পোষমানাকে অস্বীকার করো, 
অস্বীকার করো বশ্যতাকে 
চলো, শুকনো হাড়ের বদলে 
সন্ধান করি তাজা রক্তের, 
তৈরী হোক লাল আগুনে ঝলসানো আমাদের খাদ্য। 
শিকলের দাগ ঢেকে দিয়ে গজিয়ে উঠুক
সিংহের কেশর প্রত্যেকের ঘাড়ে -- ১লা মে- এর কবিতা ৪৬।

জালিয়ানওয়ালাবাগ (১৯১৯), চট্টগ্রাম (১৯৩০), ধর্মতলা (১৯৪৫) তে ব্রিটিশবিরোধী যে সংগ্রাম হয়েছে, সেই সকল সংগ্রামের সঙ্গে ঘোষিত হয়েছে তাঁর বিপ্লবী চেতনা:

জালিয়ানওয়ালায় যে পথের শুরু 
সে পথে আমাকে পাবে, 
জালালাবাদের পথ ধরে ভাই 
ধর্মতলার পরে,
দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেকের ঘরে 
---ঠিকানা।

চারিদিকে বিদ্রোহের আগুন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে, উন্মেষ ঘটেছে নতুন চেতনার, বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সচেতন কবি তখন শেকল ভাঙা সংস্কৃতির স্বপ্নে বিভোর হয়ে বলেছেন-

হে কলম! হে লেখনী! আর কত দিন ঘর্ষণে হবে ক্ষীণ? 
আর কত মৌন-মুক, শব্দহীন দ্বিধান্বিত বুকে 
কালির কলঙ্ক চিহ্ন রেখে দেবে মুখে? আর, 
কত আর আর কাটবে দুঃসহ দিন দুর্বার লজ্জার?

রবীন্দ্রনাথের 'রক্তকরবী' নাটকে দেখা যায় যক্ষপুরীর অবিরাম শোষণের চিহ্ন। বহুশ্রমিকের রক্ত-শ্রম শোষণ করে পুঁজিপতি লাভ করে আরাম নিবিড়তা আর মুনাফা। কিন্তু এই শোষণ ও একদিন পুঁজিপতির নিকট বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। শ্রমিক শ্রেণী ও তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠে সচেতন। সে তখন হাতুড়ির আঘাতে ধ্বংস করে দিতে চায় দাসত্বের নির্মম বন্ধন।

শোন রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার।
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়
হিসাব কিদিবি তার?
প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা,
ভেঙেছিস ঘরবাড়ি, 
সে কথা কি আমি জীবনে 
মরণে কখনো ভুলতে পারি?

শ্রেণী সংগ্রামের প্রশ্নে মার্কস বলেছেন, 'সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী.... সমাজ ব্যবস্থার যে অন্তাবন্ধ চলেছে মানুষ ও তার অংশীভূত; উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার সংঘাত মানুষকে চেপে ধরেছে, মানুষকে ভঅবিয়ে তুলছে। এই সংঘাতের তীব্রতা মাষকে নতুন সমাধানের সন্ধানে চালিত করছে। উৎপাদন ব্যবস্থা তো মানুষ বর্জিত প্রকৃতি জগতের বিষয় নয়। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে নিয়েই উৎপাদন ব্যবস্থা সংগঠিত। সেজন্য মানুষকেই সমাজের অর্ন্তাবন্ধ সম্বন্ধে সচেতন হতে হয়। কারণ উৎপাদনের উপকরণের মধ্যে বৈপ্লবিক শ্রমিক শ্রেণীই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী উৎপাদিকা শক্তির (প্রভার্টি অফ ফিলোসফি, মার্কস)।

শোন রে বিদেশী, শোন্
আবার এসেছে লড়াই জেতার চরম শুভক্ষণ!
আমরা সবাই অসভ্য, বুনো-
বৃথা রক্তের শোধ নেব দুনো 
একপা পিছিয়ে দু'পা এগোনোর আমরা করেছি পন, 
ঠ'কে শিখলাম
তাই তুলে ধরি দুর্জয় গর্জন। --একুশে নভেম্বর, ১৯৪৬।

রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন, দুঃখের মন্থনে জীর্ণ প্রাচীনতা থেকে নবীণের সাধনা উঠে আসবে। ঝড় সমস্ত কিছু আর্বজনা পঙ্কিলতা ধ্বংস করে নবসৃষ্টির সূচনা করে দেয়। এই অর্থবোধকে পাথেয় করে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন--- 

আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি
আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিয়ে তখনি,
এই স্বর সাধনায় পৌঁছিল না বহুতর ডাক-
রয়ে গেছে ফাঁক।

৪০'এর দশকে সাম্যবাদের আদর্শ আমাদের দেশে প্রবলভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেই সময় আধুনিক কবিদের অনেকেই 'মধ্যবিত্ত রোমান্টিজম্' কে পরিত্যাগ করে সর্বহারার মতাদর্শকে গ্রহণ করেছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্য দূর থেকে দাঁড়িয়ে কবিতা লেখেন নি। রাজনৈতিক জীবনে সাম্যবাদের পতাকাতলে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, "ফলে, কবিতাকে সে সহজেই রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে পেরেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে কোনো দ্বিধা ছিল না।" সুকান্ত ও বলতেন, "আমার কবিতা পড়ে পার্টির কর্মীরা যদি খুশি হয় তাহলেই আমি খুশি কেন না এই দলবলই তো বাড়তে বাড়তে একদিন এ দেশের অধিকাংশ হবে।"

হে জীবন, হে যুগ সন্ধিকালের চেতনা
আজকে শক্তি দাও, যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার গলানো উত্তাপ। -- বোধন।

আদ্যোপান্ত বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও সুকান্ত'র মনে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিপুল শ্রদ্ধাভাব ছিল।

এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,
প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,
এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি,
নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রুকুটি; 
এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে 
তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে। 
এখনো স্বগত ভাবাবেগে,
মনের গভীর অন্ধকারে তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।

রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের পর উভয় বাংলায় সুকান্ত ছিলেন প্রগতি পন্থী বিপ্লবী মানবতাবাদী ধারার অন্যতম বলিষ্ঠ প্রতীক। সুকান্তের রচনায় কবি বিষ্ণু দে প্রত্যক্ষ করেছেন পরিণত কবিত্ব: 'সুকান্তর কবিপ্রতিভা প্রকাশিত হলো প্রতিশ্রুতিতে নয়, একেবারে পরিণতিতে, অক্লান্ত কর্মীর আত্মত্যাগের অবসরহীন মানস কিন্তু সুলিখিত কবিতা। একধারে তাঁর এই পরিণত কবিত্ব এবং মার্কসীয় তত্ত্বের জনগাম্ভীর্য। ক্রিস্টোফার কডওয়েল বলেছেন, 'কবি কাব্যের চিরন্তন অনুভূতিগুলিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই অনুভবের প্রতি আকৃষ্ট হন। নারায়ণ চৌধুরীর ভাষায় (লেখক পাঠক ও সমাজ), 'কবিতায় শাশ্বত মূল অব্যাহত রেখে কবিতায় নতুন মূলবোধের পোষকতা করেছিলেন। কাব্যের চিরন্তন সৌন্দর্যের উপাসক হয়েও (সুকান্ত) কাব্যবস্তুতে যুগোচিত ভাবগত পরিবর্তন সাধন করেছিলেন-

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; 
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ পিঠে। 
চলে যেতে হবে আমাদের। 
চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ 
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, 
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। 
অবশেষে সব কাজ সরে, 
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে 
করে যাব আশীর্বাদ তারপর হব ইতিহাস। -- ছাড়পত্র।

কবি সুকান্ত ভট্টচার্য (১৫ আগষ্ট, ১৯২৬, ১৩ মে ১৯৪৭)'র সৃষ্টিশীল সত্তার তত্ত্বগত অনুপ্রেরণা ছিল বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের রূপকার লেনিন। কিন্তু একথা বললে ও তাঁর আদর্শবোধ কোনও ভাবেই খর্ব হবে না যে যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাতে...." এই কবিতাটির মধ্যে মহামানব গৌতম বুদ্ধের প্রভাব অবেচতন ভাবে উঠে এসেছে। কেননা বুদ্ধের মূল সিদ্ধান্ত ছিল মানব জীবনের দুঃখ মুক্তি। সুকান্ত ও এই বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন উত্তরকালে মার্কসবাদের আঙ্গীকে। যদিও বুদ্ধের সময়কাল এবং সুকান্তের সময়কাল এক নয় এবং তা হওয়ার বিষয়টি সম্ভব নয়। কারণ যুগের পরিবর্তন। কিন্তু একথাও ভুলে গেলে চলবে না বুদ্ধের সিদ্ধান্ত উত্তরকালের প্রগতিবাদী কোনো দার্শনিক নস্যাৎ করেন নি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁর কবিতায় শ্রদ্ধাভাবের বিষয়টি বারংবার উদ্ভাষিত হয়েছে।

মহামানব বুদ্ধ এই পৃথিবীকে যে সত্যের আলোক বর্তিকা প্রদান করেছিলেন, ঠিক সেই ভাবে সুকান্ত ও আশাবাদী ছিলেন যে একদিন মেহনতী জনগণ বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীকে জঞ্জাল মুক্ত করবে এবং সেই জঞ্জালমুক্ত পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবে নতুন শিশু।

মাত্র আট বছরের সংক্ষিপ্ত কাব্য জীবনে সুকান্ত তাঁর সৃষ্টিরাজিতে তৎকালীন বিশ্ব এবং স্বদেশ, এই দুই'এর পরিসরে বিপ্লব-বিদ্রোহ, রাজনীতি, নিজের চিন্তা-চেতনা, মূলবোধ'এর রূপকে বিপ্লবী আঙ্গিকে চিত্রয়িত করেছেন। কবির স্বপ্ন ছিল তিনি এই বিশ্বকে আগাম শিশুর বাসযোগ্য করবেন, করবেন, সৃষ্টির কাজে, প্রিয় আদর্শের স্বপ্নে বিভোর হয়ে কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করবেন। কিন্তু এক বৈশাখী সকালে তিনি বিদায় নিলেন......।

ছাড়পত্রের অধিকারে হয়তো কেউ আসবে না 
আঠারোর জয়গানে পংতি ভাসবে না অল্প আয়ব অগ্নি বায়ু কেউ দেখবে না তোমার মতো করে কেউ দেখবে না আর কেউ লিখবে না। 
কবি, তোমার মতো করে কেউ লিখবে না 
আর কেউ লিখবে না।

আকর কুঞ্চিকা :

১। সুকান্ত ভট্টাচার্য, ঈশান সামী, কথা প্রকাশ, বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০১৭।
২। সুকান্তের জীবন ও কাব্য, ড. সরোজ মোহন মিত্র, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা,  ২০১৮।
৩। রাজনীতির কবি বিপ্লবের কবি সুকান্ত, সন্দীপ দে, দেশহিতৈষী, শারদ সংখ্যা ১৪৩২, ২০২৫।
৪। সুকান্ত ভট্টাচার্য, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বাড়িঘর, ২য় মুদ্রণ, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ,  ২০১৮।
৫। তিনজন আধুনিক কবি, সমর সেন সুভাষ মুখোপাধ্যা সুকান্ত ভট্টাচার্য, ড. মাহবুবুল হক, কথা প্রকাশ, বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৫।
৬। কবি সুকান্ত নিঃসঙ্গ বাতিওয়ালা, তরুণ মুখোপাধ্যায়, রাধা প্রকাশনী, কোলকাতা, ২০২৫।
৭। কোরক' সাহিত্য পত্রিকা, প্রাক্ শারদ সংখ্যা, ২০২৫, জন্ম শতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য।

তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যচর্চার সামাজিক মাধ্যম

সুমনপাল ভিক্ষু, 
২৪মার্চ ২০২৩।
 
“...যদি ফিরে যেতে হয়
দুব দিয়ে দিয়ে পৌঁছতে হবে নিত্যদিনের পৃথিবীতে,
কি জানি কে জানে নতুনতর এক জীবনের তাগিদে
হয়তো আবার উঠে আসতেও হবে, হতে পারে”
 
আগুণের সবথেকে নিকট ও গূঢ় পটভূমিতে উপভূমিতে উপস্থাপিত, সূর্যের আলো এসে গেছে যার ওপর, শুকনো রুক্ষ কাঠ থেকে বেরিয়ে আসা সেই ধোঁয়াই নীলাজ্ঞম অন্তত তাই দেখায়”
-সুবিমল মিশ্র, ডায়েরি থেকে।
 
ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈব প্রক্রিয়া...। এজন্যই বহুমাত্রিক সমাজের কোন দিকটির রদবদল বা বাঁকবদল ঘটবে সে সম্পর্কে আগাম সংকেত দেওয়া অসম্ভব। যতক্ষণ নিজস্ব ক্ষমতা থাকে ততক্ষণ সাহিত্য সংস্কৃতি সমৃদ্ধ থাকে। কিন্তু সময়ের চাপে প্রায়ই সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুর্বর হয়ে পড়ে। আর তখনই তরুণ প্রজন্ম দ্বারা আন্দোলনের সূত্রপাত করা জরুরি হয়ে ওঠে। সাহিত্য শিল্প-র সঙ্গে সমকালের যোগ অচ্ছেদ্য, সমসাময়িক কালের আশা, হতাশা সমস্ত সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলির জন্ম দিয়েছে। জীবনবোধের স্বপ্ন যেখানে ধূলিসাৎ হয় তখন ক্ষুধার্ত প্রজন্ম হয়ে ওঠে অতৃপ্তিহীন।
 
“সন্তপ্ত কুসুম ফুটে পুনরায় ক্ষোভে ঝরে যায়
দেখে কবিকূল এত ক্লেশ পায়, অথচ হে তরু
তুমি নিজে নির্বিকার, এই প্রিয় বেদনা বোঝনা।
কে কোথায় নিভে গেছে তার গুপ্ত কাহিনী জানিনা।
নিজের অন্তর দেখি, কবিতার কোনো পংক্তি আর
মনে নেই গোধূলিতে, ভালবাসা অবশিষ্ট নেই।
অথবা গৃহের থেকে ভুলে বহির্গত কোনো শিশু-
হারিয়ে গিয়েছে পথে, জানে না নিজের ঠিকানা।”
-বিনয় মজুদার, হাংরি বুলেটিন – ১৯৬৩।
 
প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার আঙ্গিক হতে জন্ম নেয় সাহিত্যচর্চা। এখানে পারমুটেশন বা কম্বিনেশনের কোন স্থান নেই। আবার নেই কোন ইত্যকার প্লেটোনিকতা। কিন্তু মাধ্যম তো একটা চাই...। সেটা কি সমাজিক হবে না কি অসামাজিক? এই আপ্ত বাক্যটির সরল অর্থ হবে ‘একটি স্ফুলিঙ্গই দাবানল সৃষ্টি করতে পারে’। অপর অর্থে বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং ভালোবাসা। যেখানে শব্দগুলো হয়ে উঠবে এক-একটি বর্ষামুখ। সুবিমল মিশ্রের কথায় “...প্ল্যান্ড ভায়োলেন্স’। তাহলে মাধ্যম? অবশ্যই উজান পত্র (লিটল ম্যাগাজিন)। হাংরির ভাষায় বুলেটিন বা সমবেত আর্তনাদ।
 
“জীবনেই একবার শিল্পঅনুরাগিণির কাছে ন্যাংটার উদ্বৃত অংশ হাতড়ে বলেছিলুম, কী ভাবো শিল্পই যথেষ্ট! কেন কার্তুজ লটকানো হল দেহে?”
-শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
 
আবার এও হতে পারে কারণ হওয়াটাই স্বাভাবিক আবার অস্বাভাবিকও হতে পারে। আর এটাই হল তরুণ প্রজন্ম! থুড়ি ক্ষুধার্ত প্রজন্মের সামাজিক মাধ্যম।
 
“আমার লাশ আগাগোড়া তল্লাস কোরে হৃৎপিন্ড না পেয়ে মানুষেরা যে যার করে ফিরে যাচ্ছে। মানুষই মানুষকে শেখাচ্ছে খুন আর সেবা করার কায়দাকানুন। শরীর থেকে পড়ে যাওয়া হাতত পা তুলে লাগিয়ে নিয়ে ফিরে যেতে হয়
 
দুপুরের লালচে হওয়ায় আমি ২চোখ বুজে শুয়ে আছি”।
                                      -মলয় রায়চৌধুরী, মিলন সাগর।
 
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “...যেখানে প্রেম নেই বোবাদের সভা সেখানে গান নাহি জাগে।” আবার এরকম ও তো হতে পারে “...কবিতা শ্লোগান হয়ে উঠেছে বলে দুঃখ করছো?” তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে তরুণ প্রজন্ম কি চায়? ৯’এর দশকের কবির ভাষায় বলা যেতে পারে...।
 
“হে বন্ধু! চলে যাওয়ার মুহুর্তে আমি কার্তুজ হতে চাই অথবা বেয়নেট কিমবা সুবিমলের হারান মাঝি নয়তো ফাঁকা তাঁত চালিয়ে বলব কিছু একতা করতে হবে কিছু একটা।” – রিংকু শর্মা, গাধার জবানবন্দী।
 
নবারুণের ফ্যাতাড়ু কিংবা নীরা হারিয়ে যেও না। অথচ তরুণ প্রজন্ম তাদের সাহিত্য চর্চার আঙ্গিক কে ক্রমশই লাল ইস্তেহার বা ম্যানিফেষ্টোতে পরিনত করতে চায়। কলম রাইফেল হতে পারে...। তাতে কলমের আর দোষ কি? হাংরি নাকি কৃত্তিবাস অথবা দক্ষিণদেশে বা দেশব্রতী! সুতরাং সবটাই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার গল্প-কবিতা এবং শিল্প। শিল্পের জন্য শিল্প না কি জনগনের জন্য? প্রশ্নটা অবান্তর হতে পারে আবার নাও। তাহলে সামাজিক মাধ্যম টা কি হতে পারে। আন্তর্জাল না কি কারুবাসনা?
“কারা গড়েছিল থিবিস নগরীর সাত সাতটি প্রবেশদ্বার?
ইতিহাসের কেতাবে লেখা হরেক রাজার নাম।
কিন্তু বড় বড় চাঙরগুলো ঠেলে ঠেলে তুলেছিল যারা
তারা কি রাজা ছিল?”
-বেরটন্ট্ ব্রেশ্ট’এর কবিতার অনুবাদ, সরোজ দত্ত।
 
লিবিভোর হাড়মালা থেকে রৌরব...। শুভ দাশগুপ্ত কেন আত্মহত্যা করল? উত্তর মেলেনি আজও। অনন্ত আকাশ জুড়ে বোবা নক্ষত্রের মিছিল, বুভুক্ষা চাঁদ। তবে এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। তবে কি কৌরবের গাধাগুলো আজও কি ঘাস খায়? এগুলো অবান্তর হতে হতে তুলনামূলক সাহিত্যের শবদেহ পেরিয়ে ভিডিও ভগবান কংবা নকুলদানা। রাজনৈতিক অবক্ষয়ের চিহ্ন সর্বত্র কিন্তু তবুও নিরো বেহালা বাজায়...।
 
তিথির বরণ অথবা দ্রোণাচার্য ঘোষ’এর মুক্তির দশক জার্নাল ৭০ এখন মেহের আলীর কথায় বেবাক ঝুটো। প্রেসিডেন্সী এখন নিম সাহিত্যকে...। শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলন? জিয়নকাঠি না কি সেই বনলতা সেন নাটোরের। তাহলে বিদিশার দিশা কিংবা শ্রাবস্তীর কারুকার্য! তলস্তয় থেকে একেবারে দক্ষিণায়ন আকিরা কুরুসোয়া আথবা সেই চিলেকোঠার সেপাই। হাঁসজারু হতে হতে ক্রমশই...।
 
“বিভ্রান্ত সব শব্দের ভিতরে প্রতিদিন একা একা হরপ্পা-মহেঞ্জেদরো
খেলা করি, প্রতিদিন নিজের যুদ্ধ হয় নিজের ভেতরে-
শবমিছিলে হাঁটি, শ্লোগান তুলি কবন্ধ হয়ে,
বেলা শেষে নিজেকে নিজেই ফাঁসি দিই, ক্রসফায়ার করি
শুয়ে থাকি পোষ্টমর্টেমের ঘরে...।
আমার মতো তারা ও কি শুয়ে আছে?”
                                  -রিংকু শর্মা, মৃৎশকটে একা।
 
 বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মৃত্যু ঠিক কখন হয়েছে অথবা আদৌ মৃত্যু হয়েছে কিনা, তা জানতে হয়তো আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এ’কথা আমরা এখন ক্রমে উপলব্দি করতে পারছি যে তরুণ প্রজন্মের সাহিত্য চর্চার জৈবিক মৃত্যু অনেক আগেই ঘটে গেছে। তাদের হৃদয় স্তব্দ হয়ে গেলেও, চিকিৎসাবিদ্যার পরিভাষায়, যেহেতু তাদের মগজের মৃত্যু ঘটেনি, তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই তাদের ঠিক তখনই মৃত বলে ঘোষনা করা যাচ্ছে না। অথবা ঘোষনা করা যাচ্ছে না এ’কারণেও যে আমরা (?) তখনও সেই সত্য জানি না অথবা প্রকৃতির বিচিত্র কূটাভাসের জন্য, হাইসেনবার্গের বিড়াল নিয়ে সেই বিখ্যাত কাল্পনিক পরীক্ষাটির মতো, কখনও জানতে পারবো না যে ঠিক এই মূহূর্তে তারা মৃত না জীবিত, যদিও আত্মপ্রতারনার ছলে অন্তত বলতেই পারবো যে তারা মৃত নয়, কিন্তু হ্যাঁ জীবিতও নয়। আমাদের কালের একটি নির্মম অভিশাপ এই যে সে সব কিছুকেই নঞর্থে দেখে। তার শুরু নেতি দিয়ে, তার শেষ ও আরেক চূড়ান্ত নেতিতে। অর্থ থেকে নিরর্থকতার দিকে তাদের ঝোঁক বেশি, আকার থেকে নিরাকারেই তাদের আনন্দ, পূর্ণ নয় শূণ্যই তাদের প্রেয়। এর পিছনে রয়েছে কালের কুটিল সময় তাড়না বা দ্রুতির মিথ্যাভয় ও অর্থহীন প্রহেলিকা ছাড়াও সবথেকে বড় কারণ হচ্ছে সামগ্রিকভাবে অনিশ্চয়তার প্রবল আধিপত্য।
 
তবে বলতে হয় সাহিত্য চর্চা একটা জীবন্ত কিছু, মাতৃগর্ভ সঞ্চারের মতো, সে বড় হবে, হাত-পা ছুঁড়বে অবশেষে ভূমিষ্ট হবে। কিন্তু সবার আগে তো তাকে জন্মাতে হবে, মাতৃশরীরের মধ্যেই তার প্রাণসঞ্চার হতে হবে। সুতরাং এই অর্থে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম লেখে না, তারা অন্য কিছু করে এবং যেহেতু তারা লেখে না তাই তারা পড়ে না।
“...দূরে নক্ষত্রেরা জ্বলে
যে নক্ষত্র নীল হয়ে আছে, দেখি তাকে।
কখনো সে পৃথিবীতে আসবে না, জানি, তবু
আসতে কি পারে না সে মাঠের নিকটে?
মাঝে মাঝে নক্ষত্র তো চাঁদ হয়ে পৃথিবীর কাছে এসে থাকে।”
                  -বিনয় মজুমদার, নক্ষত্রের আলোয়।

 

Translation

Mallika was a poor girl. She was a daughter of garland-maker. One day she got a piece of bread and  while she was going to put it in mouth, she saw the Buddha's going on alms-round. She offered bread to the Bhagava who accepted it.

মল্লিকা ছিল একজন দরিদ্র মেয়ে। সে ছিল একজন মালা তৈরিকারীর মেয়ে। একদিন সে এক টুকরো রুটি পেল এবং মুখে দিতে যাবার সময় সে দেখতে পেল যে বুদ্ধ ভিক্ষা করছেন। সে ভগবানকে রুটি উপহার দিল এবং ভগবা তা গ্রহণ করলেন।

Mallikā nāma dalidda-kaññā Mālākārassa duhitā hoti. Sa eka divasaṃ eka khaṇḍaṃ godhumapūpaṃ labhitvā bhūñjituṃ kāle Buddhaṃ  piṇḍacaranāya gacchantaṃ disvā taṃ godhuma-Pūnaṃ tassa adāsi. Bhagavā pi tassa dānaṃ paṭigaṇhi.

मल्लिका एक गरीब लड़की थी। वह एक माला बनाने वाले की बेटी थी। एक दिन उसे रोटी का एक टुकड़ा मिला और जब वह उसे मुँह में डालने ही वाली थी कि उसने बुद्ध को भिक्षाटन करते देखा। उसने भगवान को रोटी दी, जिन्होंने उसे स्वीकार कर लिया।

玛莉迦是一位贫穷的少女,是花环制作者的女儿。有一天,她得到一块面包,正要放进嘴里,却看到佛陀正在托钵。她将面包供养给世尊,世尊接受了。

མལ་ལི་ཀ་ནི་བུ་མོ་དབུལ་པོ་ཞིག་རེད།  མོ་ནི་མེ་ཏོག་ཕྲེང་བ་བཟོ་མཁན་གྱི་བུ་མོ་ཞིག་རེད།  ཉིན་གཅིག་མོ་ལ་བག་ལེབ་གཅིག་ཐོབ་སྟེ་ཁ་ནང་དུ་བླུགས་པའི་སྐབས་སུ་སངས་རྒྱས་བཅོམ་ལྡན་འདས་མཆོད་འབུལ་བྱེད་བཞིན་པ་མཐོང་།  མོས་བཅོམ་ལྡན་འདས་ལ་བག་ལེབ་ཕུལ་བ་དེས་ཁས་ལེན་བྱས།
मल्लिका दरिद्रा बालिका आसीत् ।  सा मालाकारस्य कन्या आसीत् ।  एकदा सा रोटिकायाः ​​एकं खण्डं प्राप्य मुखं स्थापयितुं गच्छन्ती बुद्धस्य भिक्षा-गोलं गच्छन्तं दृष्टवती।  सा तद्भगवे रोटिकां अर्पितवती यः तत् स्वीकृतवान् |
_______
The Bodhisattva was born as the son of the chief elephant. It was pure white and red with might and face. The two kings of that kingdom were Cullasubhadda and Mahasubhadda.

বোধিসত্ত্ব প্রধান হস্তির পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি পবিত্র ছিলেন, তবে পা ও মুখমণ্ডল লাল ছিল। তাঁর দুই রাণী ছিলেন চূল্লসুভদ্দা এবং মহাসুভদ্দা।

Bodhisattvo nāgarājassa puttarupena nibbati. So odatāya vaṇṇasampaṇṇo ca  mukhamaṇḍala ca padayugani rattabho vaṇṇasampaṇṇo hoti.Tassa Cullasubhaddā ca Mahāsubhaddā nāma dve Mahesiyo atthi.

बोधिसत्व का जन्म मुख्य हाथी के पुत्र के रूप में हुआ था। वह पूर्णतः श्वेत और लाल रंग का था, जिसमें पराक्रम और मुख था। उस राज्य के दो राजा थे, कुलसुभद्द और महासुभद्द।

बोधिसत्तः मुख्यगजस्य पुत्रः इति जातः।  शुद्धः शुक्लः रक्ता पराक्रमः मुखः च आसीत्।  तस्य राज्ञौ कुल्लासुभद्दा महासुभद्दा च ।

菩萨生于象王之子。象王通体洁白,面容红润,威武雄壮。该国的两位国王分别是丘罗须跋陀(Cullasubhadda)和摩诃须跋陀(Mahasubhadda)

བོ་དྷི་སཏྭོ་ནཱ་ག་རཱ་ཛ་སཱུཏྲ་རུ་པཎ་ནིབ་ཏི། སོ་ཨོ་དཱ་ཏཱ་ཡ་ཝཎྜ་སམ་པཎ་ཅ་མུ་ཁཱ་མཎྜལ་ཅཱ་པད་ཡུ་ག་ནི་རཏྟ་བྷོ་ཝཎྜ་སམ་པཎ་ཧོ་ཏི།ཏས་ས་ཅུལ་སུ་བྷ་དྷ་ཅ་མ་ཧཱ་སུ་བྷ་དྷ་ནཱ་མ་དྭེ་མ་ཧེ་སི་ཡོ་ཨ་ཐི།

ভূমিকা/রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী

ড. সুমনপাল ভিক্ষু

অতিথি অধ্যাপক, পালি বিভাগ

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, 

বঙ্গদেশে আজ সদ্ধর্মের বিকাশ এবং বিশেষ চর্চা অস্তমিত প্রায়। এর কারণ অনুসন্ধানের প্রসঙ্গটি এই মুহূর্তে আলোচনার বিষয় নয় তবুও অতি গ্লানির সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে এদেশে বৌদ্ধ সাধক রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী আজ বিস্মৃতির অন্ধকারে নির্বাসিত। তবে বলতে অত্যুক্তি নেই যে একালে বিদর্শনাচার্য রূপে তিনি ছিলেন যশ ও খ্যাতির উর্দ্ধে। "বঙ্গদেশে ধ্যানচর্চা" এবং বিদর্শনাচার্য" দীপা মা অর্থাৎ ননীবালা বড়ুয়ার জীবনবৃতান্ত রচনা প্রসঙ্গে সবচেয়ে রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দীসহ বৌদ্ধ সাধক-সাধিকাদের মহান আত্মত্যাগ, বংশগত জীবন ইত্যকার বিষয়গুলিসহ ভগবান বুদ্ধের শাসন- বিদর্শন ভাবনার বিষয় চিত্ত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে এই বিষয়ে ২টি মূল্যবান গ্রন্থের উল্লেখ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা হল-

১। বঙ্গে ধ্যানচর্চা-১৯৯৫,
২। বিদশনাচর্য দীপা মা ননীবালা বড়ুয়া।

প্রসঙ্গত স্মরণীয় যে, এই দুইটি গ্রন্থে বিদর্শন তথা ধ্যানা অনুশীলনকারীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সহ ৩৭প্রকার বোধিপক্ষী ধর্ম বিষয়ের উন্মেষ রয়েছে। সর্বোপরি ভগবান বুদ্ধের বোধি-বিধি ও বঙ্গদেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের বরণীয় মনীষীগণের মধ্যে মহাপণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির, শীলানন্দ মহাস্থবির এবং মহাজ্ঞান তাপস পুন্নানন্দ মহাস্থবির এর নাম এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁরা সকলেই সদ্ধর্মের গম্ভীর অনুশীলন তথা বিদর্শন চর্চার অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যাই হোক এই প্রসঙ্গে মানবিক সত্তা' গ্রন্থের লেখক জর্জ টনের এবটি বিখ্যাত উক্তির প্রতি আলোকপাত করা যাক-

"মনুষ্যত্বের বিকাশের প্রশ্নে মনের সংযত করণের প্রাসঙ্গিক অনুশীলনের বিষয়টি হল বাস্তবতা কিন্তু মন মনুষ্যকে বাস্তব অনুশীলন ব্যতিরেকে বিভ্রম" এর পথে পরিচালিত করে এবং তা ফলশ্রুতিরূপে প্রসব করে কতকগুলি ফলিত কাল্পনিক বিষয়। এই কল্পনা প্রসূত বিষয়গুলির একটি চূড়ান্ত রূপ হলো ধর্মমোহ"। যা একটি সমাজ, দেশ এবং রাষ্ট্রকে প্রকৃত আর্শে গতে এমন এক স্থান নিয়ে যায় যেখানে শুধুই (অলীক কিছু প্রচলিত ধারণা) মিথ্যার দিবাস্বপ্ন বিরাজ করে। আবার বিশ্বকবির ভাষায়-

মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম,
আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, 
এই ব্রত বহিব সদাই।

বিদর্শনাচার্য বাঙালি বৌদ্ধ উপাসক হলেন সেই ব্যক্তিত্ব যিনি তৎকালীন (ব্রহ্মদেশে) মায়ানমার গিয়ে প্রখ্যাত বিদর্শনাচায সেয়ামং সান্নিধ্যে প্রথম বিদর্শন জ্ঞানে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই দেশেই বিদর্শন কেন্দ্র স্থাপন পূর্বক বিদর্শন ভাবনা প্রশিক্ষণের নৈতিক দায়িত্ব তথা মহান কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন। তাঁর এই মহান কর্তব্য সাধনার পুরস্কার স্বরূপ ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবিরের সুযোগ্য উপাসক রূপে 'আর্যশ্রাবক' উপাধিতে বিভূষিত হয়েছিলেন। যা বঙ্গদেশের বৌদ্ধ সমাজে অত্যন্ত বিরল।

'একে বাপি সুরবৃক্ষেন
পুস্পিতেন বৃক্ষেন সুগন্ধিনো
বাশৎ ভপুনং সব্বং সুনত্রেশ কূল যদা।

বৌদ্ধ জগতের অনন্য এই গুণবান তথা পুণ্যবান মহৎপ্রাণ রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দীর প্রয়াণের প্রায় বৎসর অতিক্রান্ত হলেও তাঁর মহতী কর্মকাণ্ড সর্ম্পকিত ইতিহাস উদ্ধার করার বিষয়টি পুনরুদ্ধার করার মহৎপ্রয়াস অত্যন্ত গৌরবজ্জ্বল বিষয়, কারণ গুণীজনই গুণীর কদর অবগত করেন, সন্ধান করেন তথা চর্চা এবং মূল্যায়ন করেন পুঙ্খানুপুঙ্কভাবে। "মনুষ্যত্বের বিকাশটায় চরম শিক্ষা, আর সমস্তই তার অধীন। এই আপ্তবাক্যটির সঙ্গে আরও কিছু শব্দাবলী সংযুক্ত করে নিলে উপরিউক্ত উক্তিটির অসম্পূর্ণ হবে। যেমন- 'জীবন ইচ্ছা শক্তি দাবী করে।" অর্থাৎ মনুষ্যত্বের বিকাশের পরম মর্মাথ হল ব্যাপকভাবে নৈতিক জীবনের উন্নতি। এদেশে রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী এই চরম সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই প্রকৃত আত্মসোপানের সন্ধান তথা অনুশীলন করেছিলেন এবং এখানেই তিনি থেমে থাকেন নি। তিনি তাঁর সাধনাকে প্রকৃত মনুষ্য নির্বাণ চর্চার ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

"স্বার্থপর যে জন মানুষ, বৃহৎ জগতে যে কখনো শেখেনি বাঁচিতে"।

অর্থাৎ স্বার্থপর ব্যক্তি কখনই এই বৃহৎ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন না। তারা নিরবে পৃথিবীতে আসে আবার নিরবেই পৃথিবী হতে বিদায় নেন। তাদের সম্পূর্ণ জীবনটাই আমি, আমার এবং আমিত্বে পূর্ণ। অর্থাৎ তারা ইতিহাস সৃষ্টিতে অক্ষম। কিন্তু কিছু ব্যক্তিজন, তাঁদের সংখ্যা অতীব নগন্য হলেও তাঁরা মুক্তচিন্তার নররূপে পৃথিবীতে উৎপন্ন হন। ধম্মপদে এই প্রসঙ্গ দৃষ্ট হয়-

"দুল্লভা পুরিসাজঞ্ঞো নমো সব্বত্থ জায়তি,
যত্থ সো জায়তি ধীরো তং কুলং সুখমেধতি"।
-ধম্মপদ, গাথা নং- ১৯৩।

এই রূপে পুণ্যশীল বিরল আধ্যাত্মিক ব্যক্তি চরিত্র আর্যশ্রাবক রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী ১৮৮৭ খ্রীঃ ৮ জ্যেষ্ঠ (আজ হতে ১৩৩ বৎসর পূর্বে) অবিভক্ত বঙ্গদেশের (বর্তমান বাংলাদেশ) হাটহাজারী উপজেলার বৌদ্ধ পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল ছিলেন শ্রী হরচন্দ্র মুৎসুদ্দী এবং শ্রীমতি সরলা দেবীর জ্যেষ্ঠ পুত্র সন্তান। তাঁর বাল্যশিক্ষার ক্ষেত্রে পারিবারিক সান্নিধ্যই ছিল প্রধান। প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করা প্রয়োজন যে মূলত 'মুৎসুদ্দী' পদটি কোন জন্মগত নাম নয়। বৃটিশ শাসনকালে বঙ্গদেশে কর আদায়কারীগণ 'মুৎসুদ্দী' নামে পরিচিত ছিলেন। যাই হোক, আর্যশ্রাবক রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী একটি নাম নয়। অগণিত নামের একটি আলোচিত ঠিকানা। প্রায় অর্ধশতাব্দী যাবত সমগ্র বৌদ্ধ চেতনায় বিমূর্ত ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাথেরো মহোদয়ের বিদর্শনাচার্য ছিলেন রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্যনীয় যে, শ্রদ্ধেয় রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দীর পরিবার স্মরণাতীতকাল হতে বঙ্গদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতির উন্নয়নের পাশাপাশি সদ্ধর্মের প্রচার-প্রসারে উল্লেখনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। জন্মসূত্রে রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী বৌদ্ধ ধার্মিক পরিবারের কৃতি সন্তান ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ব্রহ্মদেশে গমন এবং সেই দেশে এক প্রসিদ্ধ চিকিৎসকের ছত্রছায়ায় চিকিৎসাশাস্ত্রে তিনি বিশ্বের ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। এই সময়কালে তিনি তাঁর মেধা এবং প্রজ্ঞাময়তায় গুণে ব্রহ্মদেশে একজন গুরুত্বপূর্ণ সুচিকিৎসকরূপেও প্রতিষ্ঠা তথা খ্যাতি অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন।

"এ কথা যেমন সত্য, তবু কেউ পুড়ে যেতে চায়,
পৃথিবীকে ভালো দিয়ে, কী আশ্চর্য, সেই মুর্খ হয়!"

বিদর্শনাচার্য রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দীর জন্মগ্রহণের সময়কাল ছিল ১৮০০ শতক অর্থাৎ বৃটিশ শাসনাধীন ভারত। এই সময়কালে বঙ্গীয় নবজাগরণের স্ফুরণ বিকশিত হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে নবজাগরণের স্রোত কলিকাতার বুদ্ধিজীবি শ্রেণী তথা বৃটিশ শাসক শ্রেণীর হাত ধরে সমগ্র বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সকল বর্গের মানুষের মধ্যে এই নবজাগরণের আশোক প্রস্ফুটিত হয়নি। বঙ্গদেশের সিংহভাগ অঞ্চলই ছিল অশিক্ষা এবং ধর্মীয় কুসংস্কারে নিমজ্জিত। চট্টগ্রামের বৌদ্ধ প্রভাবিত অঞ্চল ব্যতিক্রম ছিল না। সেখানে অত্যন্ত বিকৃতভাবে পুরোহিত তন্দ্রের প্রভাব যুক্ত তন্ত্রবাহী বৌদ্ধ প্রভাব বজায় ছিল। উনিশ শতকের সময়কালে বৃটিশ শাসককূল ও ভারতহিতৈষী কিছু ইউরোপীয় গুণীজনের বদান্যতায় ভারতবর্ষের মানুষ বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন তথা বৌদ্ধ স্থাপত্য সম্পর্কে ওয়াকিহাবহাল হলে বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের পুনঃসংস্কার তথা পুনঃজাগরণ শুরু হয়। এই সময়কালে বঙ্গদেশে যে সকল বৌদ্ধ মনীষী আর্বিভাব হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বিদর্শনাচার্য রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী ছিলেন উল্লেখ্যনীয়। রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী একজন সুপ্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর নিকট অর্থ ইত্যাদির প্রাচুর্যতাও ছিল এবং তিনি চাইলে পারতেন গড্ডালিকা প্রবাহে জীবন নিমজ্জিত করতে কিন্তু তাঁর অভিপ্রায় এইরূপে ছিল যে তিনি সকল দিক হতে পঙ্গুপ্রায় বৌদ্ধ সমাজকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী করতে উদগ্রীব ছিলেন এবং এই কারণেই বিদর্শনকে বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের বিকাশ ইত্যাদির ক্ষেত্রে অমোঘ হাতিয়ার রূপে গণ্য করেছিলেন। সর্বোপরি চট্টগ্রামের বৌদ্ধ প্রভাবিত অঞ্চলে বৌদ্ধ বিহার স্থাপন তথা সদ্ধর্মের বিকাশের ক্ষেত্রে পালি শিক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি বিদর্শন সাধনার যে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তা কখনই তিনি নিজের মধ্যে সংকুচিত করে রাখেন নি বরং তিনি এই শিক্ষাকে বঙ্গদেশের সর্বত্র প্রসারিত করার প্রশ্নে সদা তৎপর ছিলেন। ক্রমে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় বঙ্গদেশের বিভিন্ন স্কুলে বৌদ্ধ বিহার গুলিকে কেন্দ্র করে বিদর্শনচর্চা বিকশিত হতে থাকে এবং আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। সুবিখ্যাত চীনা দার্শনিক লাওৎস বলেছেন-"মহত্তম বন্ধুত্ব বলতে বোঝায় সমাজ বিকাশের উন্নয়নে একজন প্রকৃত মনুষ্যের ভূমিকা কি? এই বিষয়টির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশীলন তথা এই ক্ষেত্রে অক্লান্ত শ্রম করা, নতুবা আগামী প্রজন্ম কী শিক্ষা লাভ করবে? দাসত্বের অভিশাপ না কি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, কোন বিষয়টি!” বিদর্শনাচার্য রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী উপলব্ধি করেছিলেন যে বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের বিকাশ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হল অশিক্ষা এবং অজ্ঞানতা সুতরাং এই ব্যাধি সমূহকে নির্মূলীকরণ করতে হলে মনুষ্যত্ব বোধের জাগরণ করতে হবে এবং এই কারণেই তিনি বিদর্শন চর্চার প্রতি গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন। তাঁর সেই হেতু তিনি হয়েছিলেন বুদ্ধপুত্র।

"অদ্যমে সফলং জন্ম মূলব্বো
মনুসো ভব,
অদ্য বুদ্ধকুলে জাতো বুদ্ধ সুতোস্মি সাংপ্রতং"।

ডা. রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দি ছিলেন মুক্ত চিন্তার অধিকারী এবং বাঙালী বৌদ্ধ সমাজের দিকদর্শন, পথিকৃৎ ও জ্ঞানদীপ্তের মুর্ত পথিকৃৎ। মনুষ্যত্ববোধের উন্মেষ তথা বুদ্ধগণসহ স্বীয় মুক্তির সম উন্মুক্ত করার বিষয়ে তিনি ছিলেন সদা জাগ্রত স্বরূপ।

"আমাকেও মনে রেখো পৃথিবীর লোক
আমি খুব বেশি দেশে থাকি নি কখনো।
আমি থাকি বঙ্গদেশে, আমাকেও মনে রেখো বঙ্গদেশে তুমি।"

সর্বজনবিদিত প্রাণপুরুষ আর্যশ্রাবত ডা. রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী ছিলেন কর্মবীর, বিদর্শনাচার্য এবং সুচিকিৎসক। সাধারণ দরিদ্র মানুষের সেবার্থে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিকিৎসাকেন্দ্র। এইভাবে তিনি ক্রমান্বয়ে জনসেবাতে নিজেকে সমর্থন করেছিলেন তাঁর জীবনের শেষদিক পর্যন্ত। আর এই কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন মহাসাধক।

"সময়ের অজুহাতে ছুইনি সময়
বহে গেছে নদী-জল শৈশব টলোমল
মেঘ রাস্তা আকাশের সঞ্চারি বুকে
দূর থেকে দেশে সুপ্ত-
অনুভবে বৈভব, উজ্জ্বল স্মৃতিময়।

রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দি সম্পর্কে আজ এই স্মৃতিচারণ, হয়তো প্রাসঙ্গিক কিম্বা সময়োপযোগী হবে নিঃসন্দেহে তাঁর জীবন-কর্ম পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তাঁর ব্রহ্মদেশ যাত্রা, অত্যন্ত ঘটনাবহুল। এবং তাঁর পারিবারিক জীবন ও সমাজ চেতনা ও ধর্মীয় চেতনা অনুপ্রেরণা ও অনুশীলনের বিষয় হওয়া উচিত প্রত্যেকের জীবনে। তিনি একজন সমাজ-সংগঠক এবং অনাগত সংঘ সৃষ্টিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন তা তুলনারবীত। আধ্যাত্মিক সাধনা ও অলৌকিক প্রভাব এগুলো মহাপুরুষ ও অশৈখ্য পুরুষের ধর্মের অঙ্গস্বরুপ। সমাজ সেবা ও গ্রামোন্নয়ন তাঁর হাত ধরে হয়েছে ধর্মের আলো ও শিক্ষার আলো প্রজ্জ্বলিত করেছেন। গ্রন্থকার মহোদয় পরিশিষ্ট- ১ ও ২ সংযোজন করেছেন তা সত্যিকার অর্থে প্রশংসনীয় ও ধন্যবাদান্ত। ভন্তেকে বন্দনা নিবেদন করছি।

আমার আচার্যদেব ড. জিনবোধি ভিক্ষু মহোদয় প্রণীত 'আর্যশ্রাবক রাজেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দী জীবন-কর্ম ও মূল্যায়ন গ্রন্থটি ইতিহাস অনুসন্ধানের খনিসদৃশ। তিনি ইতিহাসকে টেলিস্কোপের মতো সূক্ষ্মভাবে তুলে এনেছেন তাঁর জীবন-কর্মের অণু-পরমাণু। এত সল্প পরিসরে একজন মহানব্যক্তির জীবনচর্যা আঁকা সম্ভব নয়। দরকার পড়ে অনেক সময়কাল, সময়ের স্তূপ খনন করে অমূল্য রত্নরাজি আহরণ করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। গ্রন্থকার তাঁর সাধ্যমত অসাধ্য সাধন করে একটা ঠিকানার খোঁজ আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। সেজন্য গ্রন্থাকার ও মদীয় আচার্যদেবকে নতশিরে সশ্রদ্ধ বন্দনা নিবেদন করছি। ভন্তের সুস্থ ও নীরোগ দীর্ঘায়ু জীবন কামনা করছি। তাঁর পরিশ্রম সার্থক হোক। উত্তর প্রজন্ম শেখরের সন্ধানে ব্যাপৃত হোক। গ্রন্থটির বহু প্রচার কামনা করি। অলং ইতি বিত্থারেন।

ড. সুমনপাল ভিক্ষু
অতিথি অধ্যাপক, পালি বিভাগ
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, 
অতিথি অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ ,
নবগ্রাম হীরালাল পালি কলেজ, কোন্নগর, হুগলি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু : প্রসঙ্গ ধর্ম


সুমনপাল ভিক্ষু

ধর্মভিত্তিক গত ভাবে 'সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু' বিষয়টি অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। কারণ এই বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে সর্বপ্রথম 'ধর্ম' ইত্যাদি ইত্যকার বিষয়গুলিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করা প্রছোজন নতুবা সমগ্র বিষয়টি অন্তঃসার শূণ্য হতে বাধ্য।

'ধর্ম' বলতে অধ্যাপক লিউ চুন তাঁর বিক্যাত গ্রন্থ 'ধর্ম ও দ্বন্ধ প্রসঙ্গে' বলেছেন, "...ধর্ম হল কতকগুলি অদ্ভুত আচরণ বিধি, নিয়ম, রীতি-নীতি, পদ্ধতি এবং এই সকলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে কিছু পৌরাণিক কথামালা, তথাকথিত ঈশ্বর তত্ত্ব ও জটিলতা।" বিখ্যাত রুশ দার্শনিক 'পৃথিবীর ইতিহাস' নামক গ্রন্থে বলেছেন- "শাসক শ্রেণী দ্বারা শাসন শোষণের উৎকৃষ্ট তথ হাতিয়ার হল ধর্ম। যা জনগণকে বিভাজিত করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত্য পোষণ করতে বাধ্য করে।"

"ধর্ম হল আফিম....।" এই বিখ্যাত উক্তির প্রবক্তা হলেন দার্শনিক কার্ল মার্কস।

"যারা ঈশ্বরের মহিমার কথা বলছে
তারা বোবা যাঁরা শ্রোতা সকলেই জন্ম থেকে বধির। অথচ ধর্ম সভায় কবন্ধের মিছিল চলছে। কবন্ধ হয়েছে কিম্বা মৃত কিন্তু সকলেই ঈশ্বরকে রক্ষার প্রশ্নে দায়বদ্ধ। তবে তা কী জন্য এবং কেন
তবে উপস্থিত যারা তারা বহুপূর্বেই
ঈশ্বর ও জানেন না। কারণ তিনি অসহায়।"

তবু মানুস্য নানাবিধ ধর্ম দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। এক্ষেত্রে যুক্তি বোধ বা মুক্ত চিন্তার বিষয়টি এক অর্থে অনুপলব্ধ। কারণ ধর্মমোহ তা বিবর্তন বা দ্বন্ধ তত্ত্বকে স্বীকার করে না। যজি তাদের প্রশ্ন করা হয় পরজাগতিক বিষয়টি তো 'শূণ্য'। তাহলে ঈশ্বর (?) নামক একটি পৃথক স্বত্তার প্রয়োজন কেন? সে অর্থে তো সাকার অথবা নিরাকার উভয়তই অপাংতেয় হয়ে যাবে। ঈশ্বরবাদীগণ তখন 'সনাতন', নারীর বাণী কিম্বা ঈশ্বরের প্রেরিত দূত ইত্যাদি অর্বাচীন শব্দ ছকের গোলক ধাধায় নিজেদের সিঞ্জার করে অথবা তাদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত (!) বিষয়টিকে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হয় এমনভাবে যেন তারাই সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশের একমাত্র পৃষ্টপোষক। এক্ষেত্রে তাদের মূল হাতিয়ার সেই ভাববাদী তাড়না। যার সম্পূর্ণটাই দ্বন্ধতত্ত্বের বিপরীত। এই বিষয়টিকে দ্যতর্থক অর্থে মিথ্যাদৃষ্টি ও বলা যেতে পারে।

ধর্ম তো এইরূপ হওয়া উচিত, যা সহজ হবে, সুগম হবে এবং সুগ্রাহ্য হবে। ধর্মের অর্থই হল অত্যন্তধার্য স্বভাব। জল যেমন শীতলতাকে ধারণ করে, অগ্নি যেমন উষ্ণতা কে ধারণ করে, ঠিক সেই ভাবে ধর্মও মনুষ্যের ক্ষেত্রে অযত্নধার্য অথবা সহজধার্য হওয়া উচিত

অত্তনো স্বভাবং ধারেতীতি ধম্মো।
বস্তুতঃ ধম্মপদে বলা হয়েছে- 

ন তেন হোতি ধম্মাটঠো যেনতথং সহসা নযে।
যো চ অতথং অনতথং চ উভৌ নিচ্ছেয্য পণ্ডিতো।।

আচার্য শান্তিদের বোধিসত্ত্বের লোক কল্যাণ সংকল্পকে প্রকট করতে গিয়ে বলেছেন-

অনাথানামহং দাসঃ সার্থবাশ্চ যায়িনাম্।
পারেস্তনাং চ নৌভূতঃ সেতুসক্রম এব চ।।

দীপাথিনামহং দীপঃ শষ্যা শয্যাথিনামহম্।
দীসার্থিনামহং দাসো ভয়েয়ং সর্বদেহিনাম্।।

ধর্মের এই স্বরূপ প্রকৃত অর্থে অভিপ্রেত হওয়া উচিত। এত না তো তথাকথিত ঈশ্বর প্রান্তে শাস্ত্রে আগ্রহ আছে, আর না তো লোক অথবা পরলোকাভ্যুদয় সিদ্ধির লোভ। বস্তুরঃ ধর্মের এই স্বরূপ মানুবমাত্র প্রকৃতিরূপে বর্ণিত হয়। প্রকৃত অর্থে ধর্ম আমাদের 'উপাধি' নয় 'নিসর্গ' হওয়া উচিত। শাস্ত্রানুরোধ দ্বারা গ্রাহ্য হওয়ার পরিবর্তে ধর্মকে আত্মানুরোধ অথবা লোকানুরোধ দ্বারা গ্রাহ্য হওয়া উচিত। যদি ধর্ম আমাদের 'স্বভাব' রূপে নির্মিত হয়, তাহলে তার সিদ্ধির প্রশ্নে তন্ত্র-মন্ত্র, পূজা-পাঠ, তীর্থ ব্রত এবং মন্দির-প্রতিমা ইত্যাদির প্রয়োনীয়তা কোথায়? তাহলে তো তা আমাদের আচরণ মাত্র হবে। এইরূপ সহজস সঙ্গত, সর্বগ্রাহ্য ধর্মই সমাজের ক্ষেত্রে ঔষধ কল্প হবে

যে কেচি ওসধা লোক বিজ্ঞন্তি বিবিধা বহু।
ধম্মোসধসমং নতিম এবং সিবথ ভিকখবো।।
ধম্মোসধং পিবিত্বান অজরামরনা সিয়ং।
ভাবযিত্বা চ পসিত্বা নিৰ্ব্বতা উপধিকথযে।।

তবে উপরোক্ত বিষয় তথা মূল্যানয় টি স্বার্থানুমাগী ধর্ম তথা সম্প্রদায়ের নিকট কোনভাবেই বোধগম্য হবে না। কারণের প্রশ্নটি একটি উদাহরণের মাধ্যমে আলোচনা করা হল :

যেমন মধ্যপ্রাচ্য হতে উদ্ভূত হওয়া একটি বিশেষ ধর্ম (৬১০-৬৩২ খ্রীঃ) সামন্ততান্ত্রিক পরিকাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে এখনও পর্যন্ত সে (বিংশ শতাব্দী) ব্যক্তি স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেয় নি। এই বিষয়টি সেই সকল ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য, যারা নিজ ধর্মগ্রন্থকে 'ঈশ্বরোদভূত' মান্য করে অনেক অমানধীয় দুষ্কৃত্যকে সমর্থন করেন। অতঃ এতপ্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে তাহলে কি ধর্মগ্রন্থের উপদেশ বলপূর্বক জনগণের প্রতি সমর্পিত করার বস্তু অথবা বিবেক এবং যুগা রোধ পূর্বক গ্রহণ করার যোগ? সেই ধর্মদেশনার বাস্তবিক গুরুত্ব কি, যার দ্বারা অন্তশ্চেতনার ক্ষতি হয়। সুতরাং এইরূপ অভদ্র, অগ্রাহ্য, অযৌক্তিক ধর্ম কেন স্বীকার করতে হবে?

'যতোহজুদয়নিঃ শ্রেয়সসিদ্ধিঃ স ধর্মঃ'

ভদন্ত সুমনপাল ভিক্ষু প্রণীত 'ধর্মকেতু' নামক গ্রন্থের অবতরনিকা'তে ধর্ম সম্পর্কে বলা হয়েছে যে।

'সংস্কৃত' ধৃ ধাতুর সঙ্গে 'মন' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ধর্ম শব্দটির উৎপত্তি। 'ধৃ' ধাতুর অর্থ হল ধারণ করা। এই ধর্ম বলতে বোঝায় যা কোনো কিছুর অস্তিত্বকে ধারণ করে। রিলিজিয়ান বা ধর্ম হচ্ছে, বিশ্বাস ও আচার-আচরণ যা কোনো অতি প্রাকৃতিক সত্তা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃত্ত থাকে।'

পাশ্চাত্য পণ্ডিত বর্গের মতে, ধর্ম হল আত্মিক জীবে বিশ্বাস, আবার কেউ বলেন, তথাকথিত পবিত্র বস্তু সম্পর্কিত কতকগুলি বিশ্বাস ও প্রথার সমষ্টি।

ধর্মের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে নানাবিধ তত্ত্ব উপস্থিত আছে। যেমন:

ক। প্রাকৃতিক এবং অতি প্রাকৃত মতবাদ।
খ। আধ্যাত্মিক মতবাদ।
গ। মনস্তাত্ত্বিক মতবাদ।
ঘ। চারিত্রিক মতবাদ।
ঙ। সামাজিক এবং ঐশী মতবাদ।

এই মতবাদ গুলি আবার ২ ভাবে বিভক্ত; যেমন ১। বিভিন্ন দর্শনগত মতবাদ এবং ২। প্রচলিত সংস্কার গত ধর্মীয় মতবাদ। এছাড়া ধর্মের উৎপত্তিগত আরও কতকগুলি মতবাদ (তত্ত্ব) আছে, যেগুলি হল

১। মাননীয় বিচার বিশ্লেষণ যুক্ত মতবাদ।
২। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মতবাদ।
৩। মনস্তাত্ত্বিক মতবাদ।
৪। নৃতাত্তিক মতবাদ।

দার্শনিক অ্যাডামসের মতে, বিশ্ব ধর্মগুলি বিভাজনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ভৌগলিক বিষয় তথা বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটি সাধারণ ভৌগলিক শ্রেণী বিন্যাস মূল বিশ্বধর্ম সমূহকে এই ভাবে বিবেচনা করে -

১। মধ্য প্রাচ্যের ধর্ম সমূহ:
জরখ্রষ্টীয় ধর্ম বা প্রাচীন পারসিক ধর্ম, ইহুদী ধর্ম, খ্রীষ্টান ধর্ম, ইসলাম ধর্ম এবং অন্যান্য আদিম ধর্ম।

২। দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয়ার ধর্ম সমূহ:
বৌদ্ধ ধর্ম (স্থবিরবাদ এবং মহাযান), অত্তবাদ এবং কণফুসিয় মতবাদ।

৩। ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্ম সমূহ:
প্রাচীন বৈদিক ধর্ম, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্ম, ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম (বর্ণ হিন্দুত্ববাদ), ভক্তি মূলক ধর্ম এবং টোটেম ধর্ম।

৪। আফ্রিকান মহাদেশের ধর্ম সমূহ:
প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম ব্যতীত টোটেম ধর্ম।

৫। দুটি আমেরিকা মহাদেশের ধর্ম সমূহ:
নানাবিধ আদিবাসী মানুষের বিশ্বাস তথা টোটেম ধর্ম।

৬। ইউরোপ মহাদেশের ধর্ম সমূহ:
প্রাচীন গ্রীস এবং রোমান ধর্ম সহ টোটেম ধর্ম।

তবে এই সকল ধর্ম সমূহের মধ্যে বর্তমানে অনেকগুলি ধর্মের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এর মূল গত কারণ হল খ্রীষ্টান এবং ইসলাম ধর্মের সম্প্রসারণ বাদী চিন্তা।

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ খ্রীষ্টান (রোমান ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, পিউরিটান, অর্থেডক্র এবং জিহোবিষ্ট ইত্যাদি), ২৪ শতাংশ ইসলাম (সিয়া, সুন্নি এবং ওয়াহবী), হিন্দু ১৫-১৬ শতাংশ, বৌদ্ধ (থেরবাদ এবং মহাযান) ৭ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৩ শতাংশ অন্যান্য ধর্মালম্বী।

অর্থাৎ গণিতের নিরিখে খ্রীষ্টান ধর্ম হল সংখ্যাগুরু একটি ধর্ম। অবষ্টি অন্যান্য ধর্ম গুলি হল সংখ্যা লঘু ধর্ম। কিন্তু এই গাণিতিক পর্যায় দ্বারা এই সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যা লঘু ধর্মের মাপকাঠি বিচার করা এক প্রকার অসম্ভব। কারণ একটি সংখ্যাগুরু ধর্ম স্থান-কাল বিশেষ সংখ্যালঘু ধর্ম হয়। যেমন : মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দঃ পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু দেশের ইসলাম একটি সংখ্যা গরিষ্ট ধর্ম। অপর দিকে খ্রীষ্টান, জিহোবিষ্ট ইত্যাদি সংখ্যালঘিষ্ট ধর্ম।

ইউরোপ, উঃ দক্ষিণ আমেরিকা, ওশিয়ানিয়া মহাদেশে আবার খ্রীষ্টান একটি সংখ্যা গরিষ্ট ধর্ম। তবে এই ধর্মের নানাবিধ গোষ্ঠী কোন দেশে সংখ্যা গরিষ্ট অথবা সংখ্যালঘু।

ইসলাম ধর্মের সুন্নি মতাবলম্বীরা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা মহাদেশে সংখ্যাগুরু এবং ইরাণে শিয়া মতাবলম্বীগণ সংখ্যা গুরু।

আবার ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু মতালম্বীরা সংখ্যাগুরু হলেও বাংলাদেশ, পাকিস্থান, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্থান সহ সম্পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যে সংখ্যালঘু।

চীন, জাপান, তিব্বত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, কোরিয়া ইত্যাদি দেশ সহ শ্রীলংকাতে বৌদ্ধ ধর্ম সংখ্যা গুরু হলেও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে সংখ্যালঘু একটি ধর্ম।

এইভাবে জৈন, শিখ, কণফুসীয়, তাওবাদী ধর্ম সম্পূর্ণ ভাবে সংখ্যালঘু একটি ধর্ম। জিহোবিষ্টরা ও এই পর্যায় ভুক্ত। তবে এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে যে পৃথিবীতে এতগুলি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিরাজমান থাকলেও সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যা লঘু (?) এইভাবে আখ্যায়িত করা কেন? উত্তর হল ধর্মমোহতা এবং দ্বন্ধ। কারণ ইসলাম এবং বেশ কিছু টোটেম ধর্ম অপৌত্তলিক হলেও তাদের ধর্ম সম্পূর্ণরূপে সামন্ততান্ত্রিক। অর্থাৎ সংস্কারবাদী নয়। ঠিক তেমন ভাবে খ্রিষ্টান ধর্মের একতাংশ সংস্কার পন্থী কিন্তু ক্যাথলিক গণ প্রাচীন পন্থী। তবে উভয়েই পৌওলিক হলেও ধর্মীয় আচার-আচরণে অপৌত্তলিক।

প্রসঙ্গত উল্লেখনীয় যে 'ইসলাম ধর্ম' পথিবীতে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের তুলনায় সম্পূর্ণভাবে নবীন (৬-৭ শতক খ্রীঃ) একটি ধর্ম হলেও ১২০০ খ্রীঃ'র মধ্যেই এই ধর্ম সম্প্রসারণবাদী হয়ে পড়লে অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে ক্রমাগত সামরিক সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার কারণে মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশে ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়লে তাদের মধ্যে প্যান-ইসলামীজমের ধারণ গড়ে উঠতে থাকে। অপর দিকে খ্রীষ্টান ধর্ম মধ্যপ্রাচ্য (বেথলেহেম শহর) হতে উৎপত্তি হলেও মধ্যপ্রাচ্যে এই ধর্ম রোমান শাসকদের নিকট অনুকূল ছিল না, কারণ সেই সময় রোমান বা পৌত্তলিকবাদী তথা বহু দেব দেবী প্রথায় বিশ্বাস ছিল। ফলে রোমান শাসকদের তথা পুরোহিত তন্ত্রের প্রভাবে খ্রীষ্টান ধর্ম মধ্যপ্রাচ্যে তেমন ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি। ৩১৩ খ্রীঃ রোমান সম্রাট কণসস্টানটাইন সর্বপ্রথম খ্রীষ্টান ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মরূপে ঘোষণা করলে একদা প্রতিষ্ঠিত পেগান ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে পড়ে এবং পূর্ব ইউরোপে খ্রীষ্টান ধর্ম একটি শক্তিশালী সংখ্যা গরিষ্ট ধর্মে পরিণত হয়। 

৬২২-৬৩২ খ্রীঃ সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ দ্বারা মদিনাতে (আবর অঞ্চল) ইসলামিক রাজতন্ত্র স্থাপিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১২০০-১৫২৬ খ্রীঃ'র সময়কালে অটোমান তুর্কী সাম্রাজ্য, ইরাণে সাফাজিদ সাম্রাজ্য এবং দক্ষিণ এশিয়াতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এই সময় মধ্য প্রাচ্যে ইসলাম ধর্ম একটি সংখ্যা গরিষ্ট ধর্মে পরিণত হয়েছিল।

১০৯৬-১২৭২ খ্রীঃ পর্যন্ত সর্বমোট ৯টি ধর্মযুদ্ধ (ক্রুসেড) সংঘঠিত হয়েছিল। খ্রীষ্টান শাসকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যীশু খ্রীষ্টের জন্মস্থান বেথলেহেম শহরকে ইসলামিক অর্থাৎ মুসলমান শাসকদের হাত থেকে রক্ষা করা এবং অটোমান তুর্কীদের প্রভাব প্রতিপত্তি স্পেন হতে খর্ব করা। এই যুদ্ধে প্রায় ৩ লক্ষ লোক নিহত হয় কিন্তু মধওপ্রাচ্যে মুসলমানদের প্রভাব অক্ষুণ থাকে।

১৪৫৩ খ্রীঃ খ্রীষ্টানদের হাতে তুর্কী সাম্রাজ্যের পতন হলে পূর্ব ইউরোপে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে খ্রীষ্টান ধর্মে সংস্কারবাদী মতদর্শের উৎপত্তি হলে প্রোটেস্ট্যান খ্রীষ্টান ধর্ম সংখ্যা গরিষ্ট ধর্মে পরিণত হয়। এই আন্দোলনের পেছনে ছিল বুর্জোয়া এবং পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণী। অর্থাৎ ধর্ম বিভাজন তথা পুঁজির অনুপ্রবেশ ইউরোপের সামন্ত শ্রেণীকে উৎখাত করতেসহায়তা করেছিল।

ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের পতন এবং ব্রাহ্মণ ধর্মের উত্থানের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন রাজা পুষ্যমিত্র শুঙ্গ (২০০ খ্রীঃ)। ৫১৫ খ্রীঃ ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল (বর্তমান আফগানিস্থান, পাকিস্থান ও উত্তর ভারত) হতে বৌদ্ধ ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছেন হুন নেতা মিহির কুল। আদি শঙ্করাচার্য (৯ শতক) সম্পূর্ণ ভাবে বৌদ্ধ বিরোধি ছিলেন। সর্বোপরি ১২ শতকে মুসলমান শাসকদের হাতে ভারতবর্ষ তথা বঙ্গদেশ হতে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়ে যায় ১২০০-১৮৬২ খ্রীঃ পর্যন্ত ভারতবর্ষে মুসলিম সংখ্যালঘু শাসকবর্গ একটি সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পরাভূত করে রেখেছিল। এই সুদীর্ঘ সময়ে ভারতীয় জনগণের এক অংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ফলে জনগণের মধ্যেকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ ক্রমশই প্রকট হয়েছিল।

১৭ শতকে ভারতবর্ষে 'ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী অফ গ্রেট বৃটেন' মুসলমান শাসন তন্ত্রকে ধ্বংস করে শাসন ক্ষমতা দখল করলে খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচারকদের দ্বারা ভারতীয় জনগণের একঅংশ খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়। এই সময় ভারতবর্ষে খ্রীষ্টান এবং মুসলমানরা ধর্মগত ভাবে সংখ্যালঘু হলেও কর্তৃত্ববাদী আগ্রাসী মনোভাব বজায় রেখেছিল। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হল অলিগড় আন্দোলন।

ভারতবর্ষে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন (১৯ শতক)র প্রধান পৃষ্টপোষক গণ ছিলেন মূলতঃ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী বা শিক্ষিত বুর্জোয়া শ্রেণী। অপরদিকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সিংহভাগই এই আন্দোলন বিরোধি এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের পক্ষপাতি ছিল। আর এই কারণের তৎকালীন ঢাকার নবাব এবং ইংরেজ শালক বর্গের বদান্যতায় তথাকথিত মুসলিম আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে মুসলিম লীগ (প্রতিষ্ঠাতা নবাব সলিমুল্লাহ, ১৯০৬ খ্রীঃ) প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯১৫ খ্রীঃ বিনায়ক দামোদর সাভারকার প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু মহাসভা নামক রাজনৈতিক দল। ১৯২৯ খ্রীঃ এই রাজনৈতিক দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষিণপন্থী হয়ে ওঠে। ১৯২৫ খ্রীঃ কে.বি. হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠিত করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আর এস এস)। ১৯৫১ খ্রীঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত করেন ভারতীয় জনসংঘ। এই সকল রাজনৈতিক দলের মূল আদর্শ ছিল ভারতবর্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের জাতীয় স্বার্থকে প্রতিষ্ঠিত করা।

১৯৪৬-৪৭ খ্রীঃ মহম্মদ আলী জিন্নার নেতৃত্বে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হলে কোলকাতা, ঢাকা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, অবিভক্ত পাঞ্জাবে ধর্মীয় দাঙ্গায় কয়েক লক্ষ ব্যক্তি নিহত হয়। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্থান (মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ প্রদেশ) গঠিত হলেও মূল ভারত ভূখণ্ডে সংখ্যাগুরু হিন্দু এবং সংখ্যালঘু মুসলমান সহ অন্যান্য ধর্মের সমন্বয় গত সমস্যা বজায় রইল। এর মূল কারণ হল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বা মৌলবাদ।

বর্তমান ভারতে হিন্দু মতাবলম্বী জনগোষ্ঠী সামগ্রিক অর্থে সংখ্যা গুরু হলেও কোনো কোনো রাজ্যে, গ্রামে বা বাণিজ্যিক শহরে মুসলমান বা খ্রীষ্টান সংখ্যাগুরু। ফলে ধর্মগত বিদ্বেষের পরিমান ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিষয়টি অত্যন্ত নিরাশাজনক তথা উদ্বেগ জনক ও বটে।

"এপারে হিজাব, আর ওপারে টিপ...।"