Tuesday, April 7, 2026

ভারতবর্ষে মধ্যযুগে বর্ণশ্রেণী প্রথা প্রসঙ্গ জাতক

 

ভারতবর্ষে মধ্যযুগে বর্ণশ্রেণী প্রথা প্রসঙ্গ জাতক

 

সুমনপাল ভিক্ষু

 

প্রাককথন:

 

জাতক কথা' সময়কাল নির্ণয় করা অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ এই রচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় জাতক। অনেক ব্রাহ্মণবাদী পণ্ডিত (যেমন, . জয়সওয়াল, হিন্দু পলিসি, পৃঃ ৩৪) তাদের ভ্রমবশত জাতকের রচনাকাল বুদ্ধপূর্ব যুগ, অর্থাৎ স্ত্রী: পূর্ব ৬০০ বর্ষেরও অধিক বলেছেন। পরিতাপের বিষয় এই যে তারা অত্যন্ত সচেতন বা অবচেতনভাবে জাতককে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।

 

জাতক-কথা' সংখ্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। 'জাতক মালা' তে (সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ) ৩৪টি জাতক বিদ্যমান। প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ বিদ্ধান লামা তারনাথ (তারনাথ)'এর মতে জাতক মালা' রচয়িতা বৌদ্ধ পণ্ডিত আর্যশূর।

 

ঈশানচন্দ্র ঘোষ মহাশয়'এর মতানুসারে 'মহাবস্তু' নামক গ্রন্থে ৮০টি জাতক কথা রয়েছে। থেরবাদী (চট্টগ্রাম, সিংহল, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, কম্বোডিয়া ইত্যাদি দেশের বৌদ্ধ) পরম্পরানুসারে জাতক'এর সংখ্যা ৫৫০। 'জাতকট্টকথা' অনুসারে এই সংখ্যা ৫৪৭। 'চুলনিদ্দেস' 'পঞ্চজাতকসতানি এই রূপ উল্লেখ পাওয়া যায়, অর্থাৎ ৫০০ জাতক।

 

জাতক মূল অর্থে ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্মের গাথা সম্পর্কিত সংকলন। অপরদিকে 'জাতককট্টকথা'তে সিদ্ধার্থ গৌতম'এর জীবন বৃত্তান্ত তো রয়েছেই, উপরন্তু তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধগণের জীবন গাথা বিদ্যমান। তবে 'জাতক' বা 'জনতকট্ঠকথা'তে শুধুমাত্র ভগবান বুদ্ধ বা পূর্ব বুদ্ধগণের কথা লিপিবদ্ধ হয়নি, উপরন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়গুলি গভীরভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যদি গভীরভাবে জাতক অধ্যয়ন করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে তৎকালীন ভারতীয় সমাজের প্রতিচ্ছবি কেমন ছিল। জাতক কথা' ভাষা অলংকার পূর্ণ নয়, সকল বিষয় সহজ সরল ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

জাতকে যে কথা বর্ণিত হয়েছে, তা হল মানব জীবনের কথা। তৎকালীন মানব সমাজ এবং মানব স্বভাবের যেরূপ চিত্র আমরা জাতকে পাই, এইরূপ সুসংগঠিত চিত্র আমরা অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গ্রন্থে পাই না।

 

মানবকে জাতক কথাতে 'দয়নীয়' প্রাণী রূপে স্বীকার করা হয়েছে। সে তার পূর্ব জন্মের অবিদ্যা জনিত কারণে দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করতে পারে না। এই অবিদ্যাজনিত সংস্কার জন্মজন্মান্তের মানবের পশ্চাৎ' ধাবিত হয় এবং পরবর্তী জন্ম-জন্মান্তর পর্যন্ত তার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। অবিদ্যাজনিত সংস্কার হতে ততক্ষণ মুক্তি লাভ সম্ভব নয়, যতক্ষণ তৃষ্ণার ক্ষয় না হয়। আমরা এই অবিদ্যাজনিত সংস্কার হতে কিভাবে মুক্তিলাভ করব তার মার্গ ভগবান বুদ্ধ প্রদান করেছেন। এই মার্গ হল 'মধ্যম প্রতিপদা' (মধ্যম মার্গ)

 

"অনেক জাতি সংসারং সংদ্ধাবিস্সং অনিব্বিসং,

গহকারকং গবেস্সন্তো দুক্খা জাতি পুনপ্পুনং।

গহকারক দিট্ঠোসি পুন গেহং কাহসি,

সব্বাতে ফাসুকা ভগ্গা গহকূটং বিসংখিতং,

বিসঙ্খারগতং চিত্তং তন্হানং খয়মজ্ঝগা।" খুদ্দক নিকায়, খণ্ড , পৃ. ৩২।

 

জাতক-কথার অভ্যন্তরে মানব'এর মূল কর্তব্যকে মৈত্রী সূত্রের মাধ্যমে গাঁথা হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় ব্যক্ত করা প্রয়োজন যে জাতকে ব্রাহ্মণ-বর্গ এবং তাদের বর্ণ বিভাজন'এর বিষয়টিকে মানব সমাজের উন্নতির প্রতিকূল ব্যবস্থা বলা হয়েছে।

 

"সব্ব পাপস্স অকরণং কুসল উপসম্পদা।

সচিত্তপরিয়োদপনং এতং বুদ্ধান সাসনং।।"ধম্মপদ, ১৪।৫।

 

ভগবান বুদ্ধ স্বয়ং বলেছেন, "...তথাগতের সংঘে প্রবেশ করলে, সর্ব প্রথম ব্যক্তির (পুদ্গল) নাম গোত্র ইত্যাদি পরিত্যাগ করতে হবে, শুধুমাত্র 'শাক্যপুত্রীয় শ্রমণ' রূপে পরিচিতি লাভ করবে।"

(উদানং, /; অঙ্গুত্তর নিকায়, দ্রষ্টব্য)

 

প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ (পালি) হতে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে ভগবান বুদ্ধ দ্বারা প্রবর্তিত ধর্ম কোন অর্থেই বর্ণ ব্যবস্থার রীতি নীতি পদ্ধতির প্রতি ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি ভিক্ষু সংঘের কার্যপ্রণালীর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার ভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে বজায় ছিল।

 

ভারতের প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ব্রাহ্মণ বর্গ তাদের সামাজিক স্বার্থকে চরিতার্থ করার প্রশ্নে এবং সমাজে শোষণ নিষ্পীড়ন ইত্যাদি অনৈতিক বিষয়গুলিকে পুষ্ট করার তাগিদে ঈশ্বরবাদের মোড়কে বর্ণ ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল। ভারতের সমাজ ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কস ভারতীয় সমাজের স্থানুতা কুসংস্কারাচ্ছন্নতা সম্পর্কে কয়েকটি গভীর অর্থবহ এবং তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন। এক স্থানে তিনি বলেছেন, "আমরা নিশ্চয়ই ভুলবনা যে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলি জাতিভেদ দাস ব্যবস্থার দ্বারা বিশেষভাবে সংক্রামিত ছিল, এরা মানুষকে বহির্জগতের প্রভুর আসনে উন্নীত করার পরিবর্তে বহির্জগতের দাসে পরিণত করেছিল, এরা একটা আত্মনির্ভরশীল সামাজিক অবস্থাকে একটি অপরিবর্তনীয় এবং স্বাভাবিক ভবিতব্যে পরিণত করেছিল, এবং এইভাবে প্রকৃতির বর্বরোচিত উপাসনার জন্ম হয়েছিল যার অত্যন্ত মর্যাদাহানিকর প্রকাশ ঘটেছে মানুষের, যে মানুষ প্রকৃতির সার্বভৌম অধীশ্বর, তার বানর গাভীর নিকট নতজানু হয়ে পূজা অর্চনা করার মধ্য দিয়েই।" (কার্ল মার্কস, নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড-, পৃ. ৩২৯) সন্দেহ নেই যে সামাজিক বোধশক্তিহীনতা মানুষকে বানরের নিকট নতজানু করেছে, তাই আবার মানুষকে পৌরাণিক কল্পকাহিনীতে বিশ্বাসী করিয়েছে। এঙ্গেলস একেই বলেছেন, "মানুষের চেতনার উদ্ভট প্রতিবিম্ব।" (এঙ্গেলস, নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড-, পৃ. ৮০)

 

পুরুষ সুক্তের (ঋগ্বেদ, ১০ম মন্ডল, সুক্ত ৯০) অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের বর্ণবিভাজন। খণ্ডিত পুরুষের বিভিন্ন অংশ হতে মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে রাজন্য (ক্ষত্রিয়), উরু থেকে বৈশ্য এবং চরণ থেকে শূদ্রের সৃষ্টির বিষয়টি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক, অভূত কল্পনাবিলাসী তত্ত্বা এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

 

পুরুষ সুক্তের বক্তব্য যে অস্তিত্বসম্পন্ন নয়, আবার অস্তিত্বহীন নয়, সৃষ্টিও নয় আবার সৃষ্টিপূর্ব নয় এমন একটি বিশেষ অবস্থা থেকেই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে বিষয়টি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হল:

 

১। সেকালে যা নেই তাও ছিল না, যা আছে তাও ছিল না। পৃথিবীও ছিল না, অতি দূর বিস্তার আকাশও ছিল না। ২। তখন মৃত্যু ছিল না, অমরত্বও ছিল না, রাত্রি দিনের প্রভেদ ছিল না। কেবল সে একমাত্র বস্তু বায়ুর সহকারিতা ব্যতিরেকে আত্ম মাত্র অবলম্বনে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস প্রযুক্ত হয়ে জীবিত ছিলেন। তিনি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। ৩। অবিদ্যমান বস্তু দ্বারা তিনি সর্বব্যাপী আচ্ছন্ন ছিলেন। তপস্যার প্রভাবে সে এক বস্তু জন্মিলেন। ৪। সর্বপ্রথম মনের উপর কামের আবির্ভাব হলো, তা হতে সর্বপ্রথম উৎপত্তির কারণ নির্গত হলো। বুদ্ধিমানগণ উৎপত্তির স্থান নিরুপন করলেন। ৫। রেতোধা পুরুষেরা উদ্ভব হলেন, মহিলা সকল উদ্ভব হলেন। ৬। কেই বা প্রকৃত জানে? কেই বা বর্ণনা করবে? কোথা হতে জন্মিল। কোথা হতে সকল নানা সৃষ্টি হলো, দেবতারা সমস্ত নানা সৃষ্টির পর হয়েছেন। ৭। নানা সৃষ্টি যে কোথা হতে হলো, কার থেকে হলো, কেউ সৃষ্টি করেছেন, কি করেন নি, তা তিনিই জানেন, যিনি এর প্রভুস্বরূপ পরমধামে আছেন। অথবা তিনিও না জানতে পারেন। (ঋগ্বেদ, ১০ম মণ্ডল, সুক্ত ১২৯, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২৪)

 

বশিষ্ট ধর্মশাস্ত্র এবং মনু সংহিতায় জাতপাতের প্রথা ভেদাভেদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়। বশিষ্ঠ ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী:

 

১। জাত-বর্ণ প্রকার, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র।

২। ৩টি জাত ব্রাহ্মাণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের বলা হয় দ্বিজ।

৩। শূদ্র সমাজের অপাংতেয় এবং হীন শ্রেণী ভুক্ত। (বশিষ্ঠ সূত্র, পৃ. )

 

মনু তাঁর বিধানে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যকে সমাজের মূল স্তম্ভ এবং শূদ্রকে 'পাপাত্মা' বলেছেন। (মনুস্মৃতি, পৃ. ৭৮)

 

মার্কস ভারতীয় সমাজের 'স্হুল শ্রম-বিভাজন' হিসাবে যা উল্লেখ করেছেন তা হল বংশানুক্রমিক ভিত্তিতে সমাজের শ্রম বিভাজন। বুদ্ধি ব্রাহ্মণদের পেশা হিসাবে চিহ্নিত এবং তাই বংশানুক্রমিক ভাবে ব্রাহ্মণরা পুরোহিত বা বুদ্ধিজীবী হবে, অনুপাত ভাবে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রদের পেশাও হবে বংশপরম্পরাগত এবং অপরিবর্তনীয়। তাই নীচ কাজ শূদ্রদের জন্য বংশানুক্রমিক ভাবেই সুনির্দিষ্ট। মার্কস সমাজের কর্ম বা শ্রম-বিভাজনের এই কঠোর অপরিবর্তনীয় রূপকেই শ্রম-বিভাজনের স্থূল রূপ বলে আখ্যায়িত করেছেন। (মার্কস, নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড-, পৃ.২৩০)

 

হিন্দু বা ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রে বর্ণিত চতুবর্ণ ভারতের আর্যসামাজিক ভিতের উপরই শুধু প্রতিষ্ঠিত ছিল তাই নয়, তাদের শাস্ত্রে উল্লিখিত সমস্ত বিধান হতে এইটাই প্রতিপন্ন হয় যে চতুবর্ণ আসলে তিনি আর্য সামাজিক ভিত্তিতে বিভক্ত জনগোষ্ঠী। সমাজের উৎপাদন, বিতরণ এবং ভোগ ব্যবস্থার বিন্যাস অনুযায়ী চতুবর্ণ ছিল শ্রেণী বিভাজন ব্যবস্থার বিন্যাস অনুযায়ী শ্রমবিভাজনের নির্দেশক।

 

মনু সংহিতা এবং অন্যান্য ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রে চতুবর্ণকে কঠোরতমভাবে নিশ্ছিদ্র প্রকোষ্ঠে বিভক্ত করে বংশপরম্পরাগতভাবে সুনির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় করে রাখা হয়েছে। শুধু শ্রম বিভাজন নয়, এমনকি ধর্মাচরণের অধিকার বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশ অনুসারে ব্রাহ্মণদের এই নির্দেশ অনুসারে ব্রাহ্মণদের পক্ষে কায়িক শ্রম নিষিদ্ধ, অপরপক্ষে শূদ্রদের জন্য একমাত্র কায়িক শ্রমই নির্দেশিত, শিক্ষা অর্জন বা প্রদান, এমনকি ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ।

 

বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বর, জীবের নিয়ন্ত্রক, আত্মা এবং বর্ণবাদকে স্বীকার করা হয়নি। এই ধর্ম বেদ ঔপনিষদিক ধর্মমত হতে সম্পূর্ণ একটি পৃথক ধর্ম। কেননা ভগবান বুদ্ধ সমস্ত বৈদিক যাগ-যজ্ঞ, বলি বা দেব-দেবীর আরাধনা ইত্যাদির বিরোধী ছিলেন। এই সকল কর্মকাণ্ডকে তিনি অনৈতিক এবং মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন বলেছেন। বৌদ্ধধর্মের মতে জন্ম, জীবন, মৃত্যু, পুনর্জন্ম এই চক্রের মূলে রয়েছে মানুষের তৃষ্ণা চক্র হতে মুক্তিলাভের প্রশ্নে মানুষের সমস্ত আশা-আকাঙ্খা ত্যাগ করা উচিত, কোনো জিনিষের প্রতি মোহ কাটিয়ে ওঠা কর্তব্য এবং সমস্ত কিছু অনিত্য এই সত্যকে স্বীকার করা উচিত। এই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে মানুষ যে স্তরে উন্নীত হবে তাতে সে লাভ করবে এক অনাবিল শান্তি আনন্দের অনুভূতি এবং তার নিজস্ব বোধ হবে লুপ্ত। এই স্তরের অনুভূতি সাধারণ মানুষের পক্ষে লাভ করা সম্ভব নয়। একমাত্র নির্বাণ লাভের মধ্যে দিয়েই পুনর্জন্মকে নিবারণ করে এই স্তরে উন্নীত হওয়া সম্ভব। মূল অর্থে বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ দার্শনিক বিষয়টি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত।

 

প্রসঙ্গত মনে রাখা প্রয়োজন, বস্তুগত পরিস্থিতি যেমন মানুষের চিন্তাভাবনার উপর প্রভাব বিস্তার করে, তেমনই চিন্তা ভাবনাও মানুষের বস্তুগত জীবনকে প্রভাবান্বিত করে। দ্বান্ধিক বস্তুবাদের এই সূত্র বৌদ্ধধর্মে প্রত্যক্ষ করা যায়। আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব বা উত্থানের ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদ যথেষ্ট ক্ষুন্ন হয়েছিল, কেননা বর্ণ-ব্যবস্থা যেভাবে সাধারণ মানুষের জীবন প্রণালীকে যে ভাবে খর্ব করেছিল, তাদের হাত থেকে মুক্তিলাভের প্রশ্নে সমাজের একাংশ বৌদ্ধধর্মের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। শ্রীমতী উমা চক্রবর্তীর মতে (দ্য সোসাল ভিমেনসনস্ অফ আর্লি বুড্ডিম্, পৃ. ৮৭) শুধুমাত্র ব্যবসায়ী শ্রেণীই বৌদ্ধধর্মের একমাত্র পরিপোষক ছিল তা নয়, মধ্যবিত্ত এবং বুদ্ধিজীবী শাসককূলের মানুষরা, এমনকি সাধারণ জনগন ব্যাপকভাবে বৌদ্ধধর্মকে সমর্থন করেছিল।

 

ব্রাহ্মণ্যবাদ যেখানে শূদ্রদের জন্য এবং এমনকি সর্বজাতের স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রেও বেদ পাঠ বা বেদশ্রবণ নিষিদ্ধ করেছিল, সেখানে বৌদ্ধধর্মমত অনুযায়ী বৌদ্ধ সংঘে যে কোনো জাতের মানুষ, যদি নৈতিক বুদ্ধিগত দিক হতে যোগ্য হতো, তবে সে সংঘে প্রাবশে করতে পারত। এক্ষেত্রে জাত পাতের কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা ছিল না। বিখ্যাত পণ্ডিত রীস ডেভিভস্ বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে ভগবান বুদ্ধ সংঘের অভ্যন্তরে জাত পাত, জন্ম, পেশা ইত্যাদির বিচার তো করতেনই না, উপরন্তু সংঘের বাইরেও তিনি জাতি ভেদাভেদ'এর বিরুদ্ধে একটি যুক্তি সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের জন্য প্রচার করেছেন। রীস্ ডেভিভস্ 'আমগন্ধ সুত্ত' এবং 'সুত্ত নিপাত' হতে উদাহরণ প্রদান করে দেখিয়েছেন যে ভগবান বুদ্ধের যুক্তি ছিল যে কোনো বিশেষ খাদ্য গ্রহণ বা খাদ্যকার দ্বারা প্রস্তুত হলো, তার উপর অপবিত্রতা নির্ভর করে না, অপবিত্রতা নির্ভর করে দুস্কর্ম, দুর্বাক্য এবং অন্যায় চিন্তার উপর। তাঁর মতে জাত-পাত সম্পর্কে বুদ্ধের মতামত যদি গ্রহণ করা হতো তবে ভারতের সামাজিক ইতিহাসের বিবর্তন অন্যপথ গ্রহণ করত এবং জাতিভেদ প্রথা ভারতীয় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতো না। (ডালগ অফ্ বুদ্ধ, পৃ.

১০২, ১০৪).

 

ভগবান বুদ্ধ সেই সময়কালে জনগণের নিকট স্বাধীনতা, সাম্য মৈত্রীর যে সিদ্ধান্ত প্রচার করেছিলেন তার মাধ্যমে বর্হিবিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। ভারতের সমাজ ধর্মের ক্ষেত্রে ভগবান বুদ্ধের অবদান সম্পর্কে ধর্মানন্দ কোশাম্বীর বিশ্লেষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, 'সমস্ত ধর্মমতের মধ্যে এটাই ছিল সর্বাপেক্ষা সক্রিয় এবং সামাজিক মতামত এবং তা কোনো সর্বশক্তিমান ব্যক্তিগত ঈশ্বর বা কোনোপ্রকার যাগযজ্ঞের প্রতি বিশ্বাস ব্যতিরেকেই।' (অ্যান ইনট্রোডিউশন ট্যু দ্য স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, পৃ. ১৬৫)

 

আদি মধ্যযুগ সম্পর্কিত ইতিহাস চিন্তা :

 

৬৫০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পর্বকে ঐতিহাসিকরা বলেছেন পরবর্তী গুপ্তযুগ, পরবর্তী প্রাচীন যুগ, প্রাক্ মধ্যযুগ, পরবর্তী ধ্রুপদী যুগ বিকাশোমুখ মধ্যযুগ। বর্তমানে একে আদি মধ্যযুগ হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আদি ঐতিহাসিক পর্বের শুরু খ্রীষ্টপূর্ব ৫ম শতকে। এভাবে যদি পর্ব চিহ্নিত করা হয় প্রশ্ন হঠে এই পর্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি কি এবং এই পর্ব কবে শেষ হয়েছিল? অন্তিম পর্বকে চিহ্নিত করা আরও দূরহ, কারণ দ্বাদশ শতকের অন্তিম লগ্নে চালুক্য চোলরা ছিল দক্ষিণ ভারতে, পূর্ব ভারতে ছিল সেনরাজারা। ঐতিহাসিকরা আদি ঐতিহাসিক পর্বের শেষ এবং আদি মধ্যযুগের কতকগুলি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলি আদি ঐতিহাসিক পর্বে দেখা যায় না।

 

এই সন্ধিক্ষণে বৌদ্ধধর্ম ভারতের বাইরে মধ্য এশিয়া চীনে বিস্তার লাভ করেছিল। বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে তৎকালীন ভারতীয় সমাজ দুইটি মুখ্য ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সাধারণ জনগনের একটি তাদের দৈনন্দিন জীবনে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি-নীতি পদ্ধতি অনুসরণ করতেন এবং অপর একটি অংশ হিন্দুধর্মের চিন্তা চেতনাকেই পালন করত। পরিনামে উভয় ধর্মের মধ্যে সংঘাত তীব্রতর হয়ে উঠেছিল।

 

৫ম শতাব্দীর পরবর্তী সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজ জীবনে দেব দেবীর আরাধনা এবং নানাবিধ মন্ত্রতন্ত্রের প্রাবল্য পরিলক্ষিত হতে থাকে। এটা সম্পূর্ণভাবে কোনো নতুন বিশ্বাস মনে করার কারণ নেই, কারণ বৈদিক যুগের শেষ পর্বে এই ধরণের ধর্মীয় চিন্তা ক্রিয়াকলাপ ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল।

 

বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্যবাদের আক্রমণ ছিল নিজেদের জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় এবং জাতিভেদ প্রথাকে টিকিয়ে রাখা। কেননা বৌদ্ধধর্ম ভারতীয় সমাজের ভ্রষ্টতা এবং অবক্ষয়কে ধ্বংস করেছিল। এই সময় সরাসরি বৌদ্ধ বিরোধী অভিযানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য পাওয়া যায়। বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন পুঁথিপত্রে বৌদ্ধদের উপর নির্যাতনের যে কাহিনী বর্ণিত আছে বিশেষ করে শৈব সম্প্রদায়ের রাজারা (বাংলার রাজ্য শশাঙ্ক) বৌদ্ধদের প্রতি নিষ্ঠুর নির্যাতন করতেন। এছাড়া কুমারিল ভট্ট এবং শঙ্কর প্রমুখ ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তক রাজানুগ্রহ লাভ করে বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে তাঁদের আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করেছিলেন।

 

হিন্দুধর্মের চরম গোঁড়ামী, ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য, জাত-পাত, অস্পৃশ্য তার নিদারুণ অত্যাচার অবিচার গুপ্ত শাসকদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের উত্তর বলয় এবং দক্ষিণ অংশে প্রবল ভাবে বুদ্ধি লাভ করেছিল।

 

সম্রাট হর্ষবর্ধনের সময়কালে (৬০৬-৬৪৭ খ্রী.) বৌদ্ধধর্ম রাজশক্তির সমর্থন লাভ করেছিল। কেননা হর্ষবর্ধন শেষ জীবনে বৌদ্ধধর্মের অনুগামী হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কেননা ৫ম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত 'নালন্দা মহাবিহার' সমগ্র ভারত এবং বর্হিভারতেও একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাল বংশের শাসন কালেও আনুকুল্যে বঙ্গ বিহারে বৌদ্ধধর্ম ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। বঙ্গ-বিহার থেকেই বৌদ্ধধর্ম তিব্বতে বিস্তৃতি লাভ করেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যে এই সময়ে বৌদ্ধধর্ম মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়কালে বৌদ্ধধর্ম থেকে অনেকটাই পৃথক ছিল। বৌদ্ধধর্মের থেরবাদ সম্প্রদায় ভারত হতে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল এবং এই অবক্ষয়ের যুগে ভারত থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আনুগত্য মহাযান বজ্রযান সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিভক্ত ছিল।

 

আদি ঐতিহাসিক পর্বের কতকগুলি সাধারণ লক্ষণকে ঐতিহাসিকরা চিহ্নিত করেছিলেন। যেমন-

 

. আঞ্চলিক রাষ্ট্রের উদ্ভব বিকাশ।

. রাজন্য ক্ষত্রিয়রা হলো শাসক গোষ্ঠী, রাষ্ট্র হলো অতিকেন্দ্রীভূত এবং আমলাতান্ত্রিক, ভূস্বামীদের অস্তিত্ব ছিল না, অমলারা রাজকোশ হতে বেতন পেতেন।

. অর্থনৈতিক জীবন ছিল মুদ্রা নির্ভর, দূরপাল্লার বাণিজ্য ছিল, শিল্প-উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, নগর গড়ে উঠেছিল। গ্রামে গ্রামে সম্প্রদায় কৃষি উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত ছিল, ভূমিতে পরিবার নয়, সম্প্রদায়ের যৌথ অধিকার ছিল।

 

আদি ঐতিহাসিক পর্ব থেকে আদি মধ্যযুগে উত্তরণ ব্যাখ্যা প্রথম দিয়েছেন নীহার রঞ্জন রায়। তাঁর মতে, ৭ম শতকে মধ্যযুগ শুরু হয়েছিল, ৮ম শতকে পরিবর্তনের চিহ্নগুলি স্পষ্ট রূপ নিয়েছিল। -১২ শতক হলো মধ্যযুগের প্রথম পর্ব। অধ্যাপক রায় সামন্ত প্রক্রিয়ার কথা বললেও তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করেন নি। ভূপেন্দ্র নাথ দত্ত প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। অধ্যাপক রামশরণ শর্মা' মতে ৩০০-৬০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এই ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটেছিল, ৬০০-৯০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এর বিকাশ ঘটে এবং এর পরিণত রূপটি পাওয়া যায় ৯০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে।

 

অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় (দ্য মেকিং অফ্ আরলি মিডাইভ্যাল ইন্ডিয়া, পৃ. ৩১-৩২) বলেছেন, এই সামাজিক পরিবর্তনের চিত্রটি মূল অর্থে ৩টি ভাগে বিভক্ত।

 

. স্থানীয় আঞ্চলিক রাষ্ট্র সমাজের বিকাশ।

. উপজাতিদের কৃষিবৃত্তি গ্রহণ এবং নতুন জাতির উদ্ভব।

. বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের উদ্ভব প্রসার।

 

গুপ্তোত্তর যুগে বিভিন্ন অঞ্চলের ভূস্বামী হলো ব্রাহ্মণ, দেবালয়, কুটুম্বিন, মহত্তর, মহামহত্তর, প্রভূগোবুন্দা প্রভৃতি। কৃষকরা হলো কৈবর্ত, গুর্জর, প্রজা গোবুন্দা, কলিতা প্রভৃতি। সারাদেশে কৃষি অর্থনীতি ভিত্তিক রাষ্ট্র সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ব্রাহ্মণ ঐহিত্য হতে বৌদ্ধ ঐতিহ্য অবশ্যই স্বতন্ত্র ছিল। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে সময়ের ধারণা পরিস্কার, ভগবান বুদ্ধের জন্মবৃত্তান্ত, কর্ম এবং মহাপরিনির্বাণকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহে এই ধারাই পরিলক্ষিত হয়। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে কর্মকে স্বীকার করে ব্যক্তির ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। জাতক সহ অন্যান্য বৌদ্ধ গ্রন্থ তার উজ্জ্বল উদ্ধার।

 

জাতকের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এবং আর্যশূর:

 

'জন্' ধাতু হতে নিষ্ঠার্থক বা ভাবার্থক 'ক্ত' প্রত্যয়ের পরে স্বার্থতে প্রত্যয় যুক্ত করলে 'জাতক' শব্দ নিস্পন্ন হয়। এর শাব্দিক অর্থ হল 'পূর্বজন্মের কাহিনী' উন্নয়নশীল সিদ্ধান্ত অনুসারে একটি পুষ্প বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে সেই পুষ্পের জাতি বিশেষ প্রাপ্তির প্রশ্নে লক্ষ বৎসর অতিবাহিত হয়। ঠিক সেইভাবে কোন প্রাণীর জীবন মুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বহুজন্মের শুভকর্ম যুক্ত হয়। ভগবান বুদ্ধ কোন একটি জন্মের প্রয়াসের ফলে বুদ্ধত্ব লাভ করেন নি। বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির প্রশ্নে তিনি অনেক জন্ম পর্যন্ত প্রচেষ্টা করেছিলেন। বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির হেতু প্রচেষ্টারত ভগবান বুদ্ধ যখন তাঁর পূর্বজন্মের সদ্গুণের বিকাশ এবং নিজ আচরণ দ্বারা সৎকর্মের অভ্যাস করছিলেন, তখন তাঁর সংজ্ঞা 'বোধিসত্ত্ব' ছিল। সামান্যতঃ 'বোধি' অর্থ বুদ্ধত্ব এবং সত্ত্ব' অর্থ হল প্রাণী। সুতরাং বোধিসত্ত্বের অর্থ বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি হেতু প্রচেষ্টারত প্রাণী। এই দৃষ্টিকোণ অনুসারে বোধিসত্ত্ব'কে আমরা ভবিষৎ বুদ্ধও বলতে পারি।

 

বোধিসত্ত্ব' বিষয়টি মুখ্যতঃ মহাযান-সম্প্রদায়'এর দার্শনিক চিন্তায় সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বোধির অর্থ বুদ্ধত্ব এইরূপ প্রায়ঃ সকল বিদ্ধান স্বীকার করেছেন। কিন্তু 'সত্ত্ব' অর্থ প্রসঙ্গে বিদ্ধানগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অতএব এই কারণে বোধিসত্ত্বের ব্যাখ্যাও নানাবিধ হয়। পণ্ডিত হরদয়াল তাঁর গ্রন্থে (বোধিসত্ত্ব, পৃ. ) এই প্রসঙ্গ সম্পর্কিত বিভিন্ন অর্থ প্রদান করেছেন, সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের নানাবিধ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।

 

১। 'সত্ত্ব' (নপুং) অর্থ এম. উইলিয়াম (এম. উইলিয়ামস্ সংস্কৃত ডিক্সনারী, পৃ: ৬৮৮) অনুসারে বুদ্ধি, চরিত্র, জ্ঞান এবং প্রকৃতি। অতএব বোধি অর্থাৎ যার সম্পূর্ণ জ্ঞান বিদ্যমান, যার প্রকৃতি পূর্ণ জ্ঞানময়ী হয়, তিনিই বোধিসত্ত্ব।

 

২। 'সত্ত্ব' (পুং)' অর্থ হল প্রাণী। পালি ভাষায় সত্ত্ব' অর্থ সজীব পদার্থ।

 

এই অর্থ আধুনিক পণ্ডিতগণ স্বীকার করছেন। সমাধিরাজ সূত্রে বোধিসত্ত্বর অর্থ প্রসঙ্গে বলেছেন 'বোধতি সত্ত্বান ইতি বোধিসত্ত্বঃ। অধ্যাপক পি. ঘোষ সত্ত্বর অর্থ 'প্রাণী' করেছেন, কিন্তু সমস্তপদ বোধিসত্ত্বের ব্যাখ্যা তিনি এইভাবে দেখিয়েছেন 'বোধিঃ চাসৌ মহাকুপা শায়েন সত্ত্বালমবনাত সত্বশ্চেতি (সতসাহস্ত্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা পৃ. ) এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে মনুষ্য 'বোধি' এবং 'সত্ত্ব' উভয়ই হতে পারে।

 

৩। সত্ত্ব' অর্থ হল মনস, ইন্দ্রিয়, চেতনা। পালিতে সত্ত্বর অর্থ হল চেতনা। প্রভাকরমতি বোধিচয় বিচার টীকাতে লিখেছেন 'তত্র (বোধি) সত্ত্বং অভিপ্রায়োহস্যেতি বোধিসত্ত্বঃ। অধ্যাপক পি. ঘোষ বলেছেন- 'বোধৌ সত্ত্বম্ অভিপ্রায়ো যেষাংতে বোধিসত্ত্বাঃ। এই অনুসারে যার মন, প্রবৃত্তি, সিদ্ধান্ত তথা ইচ্ছা 'বোধি'তে কেন্দ্রীভূত, তিনিই বোধিসত্ত্ব।

 

৪। সত্তা' অর্থ গর্ভ, গুপ্ত, অজ্ঞাত, অব্যক্ত, তদনুসারে সেই হল বোধিসত্ত্ব, যার বোধিজ্ঞান অব্যক্ত রূপে নিহিত রয়েছে।

 

এইচ. কার্ণ 'বোধি' শব্দটিকে সাংখ্যযোগ 'বুদ্ধি' শব্দের সমানার্থক বলেছেন। বুদ্ধি সত্ত্ব শব্দ যোগ সাহিত্যে দৃষ্ট হয়। তাঁর মতে বোধিসত্ত্বের অর্থ হল- অন্তর্নিহিত বুদ্ধির মানবকার রূপ কিন্তু, এই ব্যাখ্যা যুক্তি গ্রাহ্য নয়। কারণ বোধি শব্দ উচ্চতম জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। এম. উইলিয়াম কৃত 'সংস্কৃত ইংরেজি ডিক্সনারী'তে 'সত্ত্ব' অর্থ হল শক্তি, বল, সাহস, উৎসাহ। এই তথ্য অনুসারে যে ব্যক্তির শক্তি বোধি (জাগৃতি বা জ্ঞান) অভিমুখ হয়, তিনিই বোধিসত্ত্ব।

 

উপরোক্ত তথ্য অনুসারে এই সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায় যে বোধিসত্ত্ব অবস্থা প্রাপ্তকারী সাধক আধ্যাত্মবীর হন। এইরূপ সাধকের জীবনের লক্ষ্য নিতান্ত উদাত্ত, মহনীয় তথা ব্যাপক হয়। তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য হল জগতের পরম কল্যাণ সাধন করা।

 

'জাতক মালার' অপর নাম 'বোধিসত্ত্বাবদানমালা' অবদান কথার অর্থ 'সুকর্ম' এইভাবে বোধিসত্ত্বাবদানমালা' অর্থ বোধিসত্ত্বের অবদান অর্থাৎ সুকর্মের মালা।

 

বোধিসত্ত্বের উত্তম আচরণ'এর উদ্দেশ্য এইভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে-

নায়ং প্রযত্নঃ সুগতি মমাণপ্তুং নৈকাতপত্রাং মনুজেন্দ্রলক্ষ্মীম্।

সুখপ্রকর্ষেকরসাং নচ দ্যাং ব্রাহ্মীং শ্রিয়ং নৈব মোক্ষসৌখ্যম্।।

যত্ত্বস্তি পুণ্যং মম কিঞ্চিদেবং কান্তারমগ্নং জনমুজ্জিহীর্ষোঃ।

সংসারকান্তাগতস্য তেন লোকস্য নিস্তারয়িতা ভবেয়স্।। জাতকমালা ৩০।২৭।

 

আর্যশূর জাতকমালা' রচয়িতা। কিন্তু আর্যশূর'এর সময়কাল সম্পর্কিত সঠিক কোন তথ্য লাভ করা সম্ভব হয় নি। জাতকমালার চীনা ভাষার অনুবাদ ৯৬০-১১২৭ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে ছিল। ইৎ-সিং'এর মতানুসারে ৭ম শতাব্দীর অন্তিমকালে ভারতে জাতকমালা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। অজন্তার বৌদ্ধ স্থাপত্যে জাতকের বহু দৃশ্য এবং শ্লোক অঙ্কিত রয়েছে। শ্লোকের অভিলেখ গুলি শতাব্দীর। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে জাতকমালা ৫ম শতাব্দীকালে পূর্ণ খ্যাতি লাভ করেছিল। নলিনাক্ষ দত্তের মতে আর্যশূর'এর সময়কাল সম্ভবত - শতাব্দী। অতএব সমগ্র তথ্যের প্রতি ভিত্তি করে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে জাতকমালা' সময়কাল ৩৫০-৪০০ খ্রীষ্টাব্দ হতে পারে।

 

কলকাতা রিভিউ, জুলাই ১৯৩০ খ্রী. পৃ. ৬৮'তে শ্রীযুক্ত গোকুলদাসকে প্রমাণ করার প্রচেষ্টা করেছেন যে জাতক কথার সব থেকে প্রাচীন অংশ গাথা রূপেই ছিল, যা মূল অর্থে অত্যন্ত প্রাচীন ভারতীয় জনপদের সমাজ জীবনের কাহিনী। এইভাবে জাতক কথা ভগবান বুদ্ধের জীবনকাল রাজগৃহে ভিক্ষুদের প্রথম সঙ্গীতি পর্যন্ত- জাতক কথা সংগ্রহ বৌদ্ধ কর্ম সিদ্ধান্তের উদাহরণ মাত্র ছিল। দ্বিতীয় সঙ্গীতির সময়কালে জাতক বাঙময় নীতি এবং ধর্মপ্রদ কথা কাহিনীতে পরিণত হয়। তৃতীয় সঙ্গীতির কালে জাতককথার সংগ্রহ 'খুদ্দক নিকায়'এর অর্ন্তভুক্ত হয়ে যায়। ৫ম শতাব্দীতে(খ্রীষ্টাব্দ) বোধিসত্ত্বের পূর্বজন্ম বিষয়ক জাতক কথা একটি স্বতন্ত্র সংগ্রহে পরিণত হয়। আর্যশূর পুনঃ ৩৪টি গাথা সংগ্রহ পূর্বক জাতকের সংস্কৃত অনুবাদ (গদ্য-পদ্য শৈলী) সম্পূর্ণ করেন।

 

জাতকে' ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

 

ভারহুত এবং সাঁচী স্তূপের শিলাতে ৩০'এর অধিক জাতক কথা উৎকীর্ণ রয়েছে। (বড়ুয়া অ্যান্ড সিনহা, ভারহুত ইনস্ক্রিপসনস্, পৃ. ৩৮-৯৯) ভারহুত সাঁচী স্তূপ খ্রীষ্টপূর্ব - শতাব্দীর। অমরাবতী বৌদ্ধ শিল্প কলাতেও বেশ কিছু জাতক কথা দেখা যায়। অজন্তা, ইলোরা, বাঘ' তো জাতক কথার অনেক চিত্র বিদ্যমান। একথা সত্য যে জাতক কথাতে যে পরিস্থিতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তা ভারতীয় সংস্কৃতির পূর্ব দশা দ্বারা পরিণত হয়েছিল। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১০০০ বর্ষ পর্যন্ত বৈদিককালীন কিছু রাজার বিষয়ে উল্লেখ শুধুমাত্র ঐতিহাসিক কালখণ্ডে পাওয়া যায় এবং কতিপয় প্রাচীন রাজার বিষয়ে আলোকপাত খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০-১০০০ বর্ষ পর্যন্ত কুরু এবং পাঞ্চাল রাজার উল্লেখ দৃষ্ট হয়। খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০-৮০০ বর্ষ পর্যন্ত বিদেহ এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের বিষয়ে, এবং খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০-৬০০ বর্ষ পর্যন্ত মহাজনপদের ইতিহাস কাশী এবং কোশল'এর বিষয়েও উল্লেখ পাওয়া যায়। এই কালখণ্ডে সব থেকে অধিক অলোকপাত কাশী কোশল রাজ্য এবং মহাজানপদের বিষয়ে করা হয়েছে। ঐতিহাসিক কালে, এই সকল রাজ্য গুলিকে পরাস্ত করে মগধ-সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, এই ঘটনা ভগবান বুদ্ধের সমকালীন ছিল। এই যুগে তক্ষশিলা একটি বিখ্যাত বাণিজ্যনগরী রূপে পরিগণিত হয়েছিল।

 

এক্ষেত্রে 'সুপ্পারক-জাতক' বিশেষভাবে উল্লেখ্যনীয়। এই জাতকে ভরুকচ্ছ' হতে সমুদ্রযাত্রার বিবরণ রয়েছে। এছাড়া নৌকাশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ, সার্থবাহ ইত্যাদির বিস্তারিত তথ্য সুপ্পারক জাতকে দেখতে পাওয়া যায়। ভরুকচ্ছ' হতে ইরানের মোহনা পর্যন্ত ৭টি বন্দরের নাম এই জাতকে প্রদত্ত হয়েছে।

 

জাতককথাতে ভৌগোলিক বিবরণগুলি অতি সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয়। গান্ধার এবং কম্বোজ হতে কলিঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কাশ্মীর তথা হিমালয় প্রদেশ হতে অবন্তী তথা অশ্মক ইত্যাদি দেশের বিষয়ে জাতককথাতে উল্লেখ পাওয়া যায়। লংকা (বর্তমান শ্রীলংকা), জাভা, সুমাত্রা, বোর্ণিও ইত্যাদি দেশ সম্পর্কে তৎকালীন ভারতবর্ষের জনগণ বেশ পরিচিত ছিলেন। জাতক কথাতে অনেক প্রাচীন নগরের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করা হয়েছে। হিমালয় তথা গঙ্গা নদীর চর্চা করা হয়েছে। মগধদেশের বেশকিছু নদী এবং গ্রামের নাম জাতক' পাওয়া যায়।

 

জাতক কথা এবং তৎকালীন ধর্মচিন্তা:

 

জাতক' কথা বা জাতকের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বোধিসত্ত্বের পূর্বজন্ম সম্পর্কিত হলেও তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্যান্য ধর্মচিন্তা এবং উপদেবতার (যক্ষ, প্রেত, পিশাচ ইত্যাদি) পূজা-পদ্ধতির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এই বিষয়গুলি জাতকে কিভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিল সেই সম্পর্কিত কোনরূপ সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবতঃ জাতকের লেখকগণ তৎকালনী সমাজে প্রচলিত এইরূপ আধিভৌতিক চিন্তা গুলি প্রত্যক্ষ করেছিলেন অথবা প্রক্ষিপ্ত ভাবে এই সকল উদ্ভট বা কাল্পনিক কথাগুলি পরবর্তীকালে জাতকে যুক্ত হয়েছিল, কিছুই বলা যায় না।

 

জাতক-যুগে বৌদ্ধধর্ম ব্যতীত যে সকল ধর্ম সম্প্রদায় বিদ্যমান ছিল তা এইরূপ:

 

১। অজীবক সম্প্রদায়

২। নিগ্গণ্ঠ - জৈন

৩। জটিলক - জটাধারী

৪। মগন্ডিক - অজ্ঞাত

৫। তেভন্ডিক - ত্রিদণ্ডী

৬। অবিরুদ্ধক (?)

৭। দেবধস্মিক - দেবধর্ম পালনকারী।

৮। শিখী সাধক - টিকি ধারী সাধু।

৯। বৈদিক ব্রাহ্মণ এবং

১০। গৌতমক অজ্ঞাত।

 

এখন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে জাতক' বর্ণিত যক্ষ (?) কে বা কারা? যক্ষ কি কোন ব্যক্তি না কি সম্প্রদায়?

 

প্রাচীনকালে 'রাজা' আরও একটি অর্থ 'যক্ষ' (মহাভারত, শান্তিপর্বস মোক্ষধর্ম, ১৭১।৫২) রামায়ণে 'ব্রহ্মা' শব্দের অর্থ 'যক্ষ' (রামায়ণ, লঙ্কা কান্ড ৩১।৯৭) গৃহ্যসূত্রে মহারাজা বৈশ্রবণ (জাতক, ৬।২৬৫)'এর পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় এখানে মহারাজা হলেন যক্ষ অর্থাৎ যক্ষাধিপতি কুবের। যক্ষকে রাজা এবং যক্ষেশ্বর (কুবের) কে 'রাজাধিরাজ' বলা হয়। বৌদ্ধসাহিত্যে সেকল নামক একজন মহাদান শীল যক্ষের (সুচিলোম জাতক) নাম রয়েছে, যার উল্লেখ পানিনি (৫।৩।৮৪) করেছেন।

 

ভারহুতে 'সুচিলোম যক্ষের' মূর্তি দৃষ্ট হয়। এই যক্ষের নামে জাতক কথা রয়েছে। এই যক্ষ প্রার্থনা রত অবস্থায় বৌদ্ধ প্রতীক চিহ্নের সম্মুখে দন্ডায়মান। এছাড়া সুদর্শনা নামক এক যক্ষিনী মূর্তি ভারহুতে বিদ্যমান। এই যক্ষিনী নৃত্য মুদ্রায় 'মকর' নামক একটি বিমূর্ত জলচর জীবের পৃষ্ঠে বিদ্যমান। জাতকে নাগ সম্প্রদায় বা নাগ জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল হতে প্রাপ্ত বৌদ্ধ ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যে নাগরাজ, নাগকন্যা ইত্যাদির মূর্তি (অজন্তা-ইলোরা) অঙ্কিত রয়েছে। অপর কোশ' (কান্ড, -, শ্লোক , ২১, ৩৪ এবং ১০৫) 'নাগ' শব্দটি চন্ডাল, সর্প এবং সিঁদুর অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে।

 

'নাগঃ কাদ্রবেয়া......

মতঙ্গজো গজো নাগঃ।

সিন্দুরং নাগসম্ভবম্।

গজেঽপি নাগমাতঙ্গা।

 

হিন্দু পুরাণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে ব্রহ্মা যখন তাঁর তপোময় শরীর পরিত্যাগ করেছিলেন, তখন তাঁর দেহ হতে যক্ষ এবং রাক্ষসের উৎপত্তি হয়েছিল। (মহাময়ূরী সূচী, পৃ. ৩৫২)

 

সঙ্কপাল জাতক (৫১৮), উরগ জাতক (৩৫৪)' নাগরাজ্য, নাগরাজ শঙ্খপাল, নাগকন্যার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তাঁরা যে 'শ্রম-ধম' পালন করতেন, সেই বিবরণ উক্ত জাতকে বর্ণিত হয়েছে। মহাশ্রেষ্ঠী অনাথপিন্ডিক (কেসব জাতক ৩৪৬) প্রত্যেক দিবসে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণকে ভোজনদান করতেন। তিনি ভগবান বুদ্ধকে জেতবন দান করেছিলেন।

 

অনাথপিণ্ডিকো গহপতি সকটেহি হিরঞং নিব্বাহপেতুং

জেতবনং কোটিসংথারং সংথরাপেসি। 

-চুল্লবগ্, ১৫৯ এবং জাতক ১।৯২-৩।

 

বিশাখা নামক উপাসিকা তাঁর স্বর্ণালংকার বিক্রয় করে 'পূর্বারাম' বিহার নির্মাণ করেছিলেন। জাতক কথা হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে বৌদ্ধ ধর্মে মানবপ্রেম এবং সমাজ সেবা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ছিল। এই কারণে বৌদ্ধ যুগে জনগণের নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক চেতনা অত্যন্ত উন্নত হয়েছিল।

 

'বোধিচর্যাবতার পঞ্জিকা' (' পরিচ্ছেদ) তে বোধিসত্ত্বের আদর্শ এইভাবে বর্ণিত হয়েছে -

 

এবং সর্বমিদং কৃত্বা যন্ময়াঽঽসাদিতং শুভম্।

তেন স্যা সর্বসত্ত্বানাং সর্বদুঃখপ্রশান্তিকৃত।।

 

মখাদেব জাতকে () বলা হয়েছে-

 

জিন্নং দিস্বা দুক্খিতং ব্যাধিতং

এমঞ্চ দিস্বা গতমায়ুসঙ্খয়ং।

কাসাব বত্থং পব্বজিতঞ্চ দিস্বা

তস্মা অহং পব্বজিতোমিহ রাজা।।

 

নিজের দুঃখ-নিবৃত্তি নয়, জীবমাত্র দুঃখের নিবৃত্তি ভগবান বুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল, কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে স্বয়ং সুখ লাভ করা শ্রেষ্ঠ নয়, সকলকে সুখের প্রতি উৎসাহিত করে সকলের সুখে সুখী হওয়ার মধ্যেই নিহিত আছে শ্রেষ্ঠতা। আর এই কারণেই ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন 'বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়.... এই বিষয়টি জাতকে বারংবার পরিস্ফুট হয়েছে।

 

জাতক'এর মননচিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধ :

 

জাতক মূল অর্থে ভারতীয় নীতি সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল রূপে চিহ্নিত হয়েছে। মন, শরীর, সংসার, দুঃখ, পুরুষার্থ, লোভ, ঈষা, দ্বেষ, শীল ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কিত তৎকালীন বাতাবরণ কী রূপ ছিল, সমাজ কিভাবে সুরীতি এবং কুরীতি দ্বারা নিমজ্জিত ছিল এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীগণ ধর্মের মোড়কে কিভাবে সমাজকে শোষণ করেতেন, এই সকল বিষয় সম্পর্কিত সম্পূর্ণ তথ্য আমরা জাতক সংগ্রহতে পাই। এছাড়া জনপদের বিবরণ, রাজ্য রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রা, তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদি বিষয়ক বিবরণ জাতকে পাওয়া যায়।

 

অপন্নকং ঠানমেকে দুতিয়ং আহু তক্কিকা।

এতদঞ্ঞায় মেধাবী তং গন্থে যদপন্নকং।। -অপন্নক জাতক।

 

অর্থাৎ কিছু ব্যক্তি -যথার্থ বার্তালাপ করে এবং কিছু তার্কিক ব্যক্তি -যথার্থ বাদ-বিবাদ করে। বুদ্ধিমান পুরুষ কিন্তু যথার্থ অর্থকে গ্রহণ করে।

 

যে বদ্ধমপচায়ন্তি নরা ধম্মস্স কোবিদা।

দিট্ঠেব ধম্মে পাসংসা সম্পরায়ে সুগগতি।। -তিত্তির জাতক।

 

(এইভাবে) যিনি ধর্মের জ্ঞাতা, জ্যেষ্ঠ (শ্রেষ্ঠজন)' পূজা করেন আদর সম্মান করেন, তিনি এই জন্মে প্রশংসা লাভ করেন এবং মৃত্যুর পর তার সুন্দর গতি (সুগতি) লাভ হয়।

 

এতমেব মনুস্সেসু যো হোতি সেট্ঠসম্মতো।

সো চে অধম্মং চরতি পগেব ইতরা পজা।। -খদিরংগার জাতক।

 

অর্থাৎ মনুষ্যের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ রূপে স্বীকৃতি লাভ করেন, তিনি অধর্ম করলে অবশিষ্ট প্রজা (জনসাধারণ) অধর্ম করে (করতে থাকেন)

 

পাপোপি পস্সতি ভদ্রং যাব পাপং পঞ্চতি।

যদা পস্সতি পাপং পাপো পাপানি পস্সতি। -খদিরংগার জাতক।

 

যতক্ষণ পাপীর পাপ পরিপক্ক না হয় পূর্ণতা লাভ করে না, সে সুখভোগ করে, কিন্তু যখন পাপ পরিপক্ক হয়ে ফল প্রকট করে, দুঃখের সীমা থাকে না।

 

নকখত্তং পতিমানেস্তং অত্থো বালং উপগা।

অত্থো অত্থস্স নক্খত্তং কিং করিস্সন্তি তারকা।। -নকখত্ত জাতক।

 

(শুধুমাত্র) নক্ষত্র-গ্রহদোযাদি বিচার ইত্যাদির চক্রে আবদ্ধ হয়ে থাকলে ব্যক্তির কর্ম বিনষ্ট হয়। কার্য সিদ্ধির (অর্থ) শুভ নক্ষত্র। নক্ষত্র বা গ্রহরাজি কিভাবে শুভ-অশুভ নির্ণয় করবে।

 

অকতঞ্ঞুস্স পোস্সস নিচ্চং বিবরদস্সিনো।

সব্বং চে পঠবিং দজ্জা নেব নং অভিরাধয়ে।। -সীলবনাগরাজ জাতক।

 

যে ব্যক্তি অকৃতত্ব, যিনি শুধুমাত্র অপরের দোষ খুঁজে বেড়ান, তাকে যদি সমগ্র পৃথিবী প্রদান করা হয়, তবুও সে সন্তুষ্ট হয় না।

 

পরিবেকরসং পীত্বা রসং উপসম চ।

নিদ্দরো হোতি নিপ্পাপো ধম্মপীতি রসং পিবং।। - রুক্খধম্ম জাতক।

 

একান্ত নিবাস কর এবং শান্তির রস পান করে মনুষ্য নির্ভয় হয়ে যায়। যিনি ধর্মের (সদ্ধর্ম) প্রেমরস গ্রহণ করেন, তিনি পাপ মুক্ত হন।

 

যস মঙ্গলা সমুহতা উপ্পাতা সুপিনা লক্খনা চ। মঙ্গলদোসবীতবভো।

যুগযোগাধিগতো জাতুমেতি।। -মঙ্গল জাতক।

 

যে ব্যক্তির মাঙ্গলিক, অমাঙ্গলিক সম্পর্কিত শঙ্কা, গ্রহণাদি সম্পর্কিত উৎপাতের ভয়, শুভা-শুভ স্বপ্নের চিন্তা, শুভা-শুভ লক্ষণের বিচার (জ্ঞান দ্বারা) সমূলে বিনষ্ট বিনষ্ট হয়েছে, তিনি জ্ঞানী পুরুষ হন তথা দ্বদ্ধধর্মকে পরাভূত করার কারণে সে এই সংসারে পুনঃ জন্মগ্রহণ করেন না (তিনি দ্বদ্ধাতীত হয়েছেন, অতএব জীবন-মরণ'এর বন্ধন হতে মুক্ত হয়েছেন)

 

ভারতের আদি মধ্যযুগীয় সমাজদর্পন এবং জাতক অট্টকথা:

 

"সব্বং ভন্ডং সমাদায় পারং তিন্নোসি ব্রাহ্মণ।" -চুল্লধনুগ্গহ জাতক, ৩৭৪।

 

ভারতের আদি মধ্যযুগে (৬৫০-১২০০ খ্রীঃ) হিন্দু তথা ব্রাহ্মাণ্যবাদী শাস্ত্রের আঙ্গিকে সামাজিক শ্রম বিভাজন বিস্তৃত আকার ধারণ করেছিল। অপরদিকে বুদ্ধ বৈদিক সমাজের স্তরবিন্যাস এবং শ্রম বিভাজন এবং তৎ উদ্ভূত ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণা ইত্যাদি বিষয়গুলিকে নস্যাৎ করে শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের কথা বারংবার আলোচনা করেছেন। উত্তকালীন পালি এবং সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্যে এই দৃষ্টান্ত বারংবার উঠে এসেছে।

 

বলা যেতে পারে যে অদি মধ্যযুগে লৌহের ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদনের অগ্রগতির প্রভাবে উদ্ধৃত উৎপাদনের সূচনা হয় এবং বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে আন্তজার্তিক বাণিজ্য, শিক্ষার অগ্রগতি, নারী স্বাধীনতা, সংঘারাম-বিহার নির্মাণ এবং বর্ণ-সংকর জাতির উৎপত্তি বিষয়গুলি ব্রাহ্মণ্যবাদী পরিকাঠামোকে প্রায় বিনষ্ট করে তুলেছিল, এমতাবস্থায় বৌদ্ধ মতাবলম্বী জনগণ এবং তাদের পৃষ্টপোষকগণকে সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন তাগিদে 'অপবিত্রতা বা অস্পৃশ্যতার' ধারণা সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম সূত্র গুলিতে এই অপবিত্রতার ধারণাকে আরও দৃঢ়ভিত্তিক করে গড়ে তোলা হয়।

 

প্রাচীন নাটিকা 'মৃচ্ছকটিক' (পর্ব-), এর নায়ক চারুদত্ত একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে অবলোকন করে তাঁর বন্ধু মৈত্রীয়কে ক্রোধক্তিতে বলেন 'আহ' কী অশুভ দৃশ্য এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দেখছি আমাদের দিকে আসছে।' 'কল্কিপুরাণে' বৌদ্ধদের মহা পাতক রূপে উপাধিত করা হয়। এতে বৌদ্ধদের সঙ্গে কথা বলার পাপ'কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, "যারা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে বাক্যালাপ করবে তারা নরকে পতিত হবে।" ইতিহাসবীদ এস.আর. গোয়েল'এর মতে ( হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান বুড্ডিজম্, পৃ. ৬৩) পুরোহিত বর্ণের ব্রাহ্মণদের শত্রুতার জন্যেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধ বাদের অবলুপ্তি ঘটেছে।

 

ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভগবান বুদ্ধের জীবন কর্মের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আদি মধ্যযুগে এই অঞ্চল বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রূপে পরিগনিত হয়। প্রসঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন যে, বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তিস্থল ছিল পূর্ব ভারতে, বৌদ্ধধর্মের বিকাশের স্থান ছিল পূর্ব ভারত। বৌদ্ধধর্ম এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী স্থায়ীত্ব লাভ করেছে। (ডিস্কবারী অফ লিভিং বুড্ডিজম্ ইন বেঙ্গল, পৃ.)

 

পূর্ব ভারতের বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ উল্লেখানীয়ভাবে বৌদ্ধধর্মকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, চীন, তিব্বত প্রভৃতি অঞ্চলে বিস্তৃতির প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান গ্রহণ করেছিলেন। এই অঞ্চলেই বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিতদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাঁরা আজও এই পৃথিবীতে শ্রদ্ধেয় (শ্রীজ্ঞান অতিশ দীপঙ্কর) হয়ে আছেন। আদি মধ্যযুগে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বিখ্যাত বৌদ্ধবিহার সমূহ পূর্বভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। এই বৌদ্ধ বিহার সমুহে ভারতবর্ষ সহ বহির্বিশ্বের বহু বিদ্যার্থী এবং শিক্ষকগণ জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনে আগমন করতেন। সর্বোপরি পূর্বভারতের বৌদ্ধ রাজাসমূহের উদারনৈতিক চিন্তা এবং প্রজাকল্যাণকারী কার্যসমূহের কারণে এই অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম নানা আঙ্গিকে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।

 

বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক ইৎ-সিং ৬৭১ খ্রীষ্টাব্দে ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর বিবরণ থেকে এই তথ্য পাওয়া যায় যে, এর ৫০০ বৎসর পূর্বে 'হই লুন' নামক একজন চৈনিক পর্যটক ভারতে (নালন্দা) এসেছিলেন। হই লুন উল্লেখ করেছেন, মহারাজা শ্রীগুপ্ত চৈনিক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য একটি বিহার নির্মাণের ব্যয়ভার গ্রহণ করেছিলেন। কেম্ব্রিজ সংগ্রহশালার ১৬৪৩ নং সংখ্যায় উক্ত উপাসনা স্থাপন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা দিয়ে এর পরিচিতি দেওয়া হয়েছে 'বরেন্দ্রর মৃগ স্থাপন স্তূপ' ফাউচার মৃগস্থাপন স্তূপ সম্পর্কে ইঙ্গিত করে এটিকে ইৎসিৎ উল্লিখিত 'মি-লি-কি-য়া-সি-কি-য়া-পো-নো' উপাসনালয়ের সঙ্গে অভিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন।

 

রমেশচন্দ্র মজুমদার'এর মতে (হিস্ট্রি অফ অ্যানসিয়েন্ট বেঙ্গল, পৃ. ৩৭) চৈনিক মন্দিরের সন্নিকটস্থ মৃগস্থাপন স্তূপ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভাগীরথী অথবা পদ্মা তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। মহারাজা শ্রীগুপ্ত ব্যতীত বৌদ্ধ বিহার'এর অবস্থানের শনাক্তকরণ প্রশ্নে পরিব্রাজক ইৎ-সিৎ'এর বিবরণীর নিরিখে এইটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খ্রীষ্টিয় - শতাব্দীকালে বাংলার বেশ কিছু অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্যধর্ম অপেক্ষা বৌদ্ধধর্ম অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল। লামা তারনাথের বর্ণনা মতে নালন্দা মহাবিহার ' শতকের মধ্যেই বৌদ্ধধর্মের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। সুয়াও জাঙ (শুয়াং জাঙ)'এর বর্ণনানুসারে নালনা মহাবিহারের ক্রমোন্নতি গুপ্ত শাসনধীনেই বিকশিত হয়েছিল। এই সম্প্রসারণ পালযুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

 

শুয়াং জাঙ্ (হিউয়েন সাঙ)'এর সময় থেকে ইৎ-সিং পর্যন্ত মাত্র ৫০ বৎসরের ব্যবধানে সমতটে বৌদ্ধধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পাল রাজাদের উত্থানের পূর্বে সমতটের শাসকদের বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা বিশিষ্টতার দাবী রাখে। যদিও এসময় ব্রাহ্মণ্যবাদই স্বাভাবিকভাবে সুবিধা প্রাপ্ত হয়েছিল। আবার পরবর্তীকালের পাল সহ সম সাময়িক অন্যান্য শাসকদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে যে, তাঁদের বৌদ্ধধর্মের প্রতি ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকা সত্বেও ভূমিদান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় গুরুত্বলাভকরেছে। (দ্য ওড়িশা হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ জার্নাল, খন্ড-১১, পৃ. ২০৬)

 

ইৎ-সিৎ আরও উল্লেখ করেছেন যে সমতট অঞ্চলে সেং-চি রাজভট্ট নামক একজন বৌদ্ধ উপাসক রাজা ভগবান বুদ্ধের সম্মানে অবলোকিতেশ্বর'এর প্রতিকৃতি সহ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠান এবং দানকার্য সমাধা করতেন। তিনি সমতটে ৬৭১ খ্রীষ্টাব্দের কিছুকাল পূর্বে রাজত্ব করতেন। (বিনয় চন্দ্র সেন, বঙ্গদেশের প্রাচীন ইতিহাস, ভারতবর্ষ, মাঘ ১৩৫৫ বঙ্গাব্দ, পৃ. ২৮০)

 

গুপ্ত রাজাদের শাসনকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এক অর্থে রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়েছিল। কেননা গুপ্ত শাসকদের ৫০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাপ্ত বেশিরভাগ লেখতেই ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দানের উল্লেখ পাওয়া যায়। (পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া, পৃ. ১৯১)

 

শুয়াং জাঙ (হিউয়েন সাঙ) তাম্রলিপ্তি (বর্তমান তমলুক) এবং সমতট পরিভ্রমণ করেছিলেন। তাম্রলিপ্তিতে শুয়াং জাঙ ১০টি বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এছাড়া এইস্থানে তিনি ১০০০ ভিক্ষুর এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন। অবশ্য এর শতাব্দী পূর্বে ফা-শিয়েন তাম্রলিপ্তি ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তাম্রলিপ্তিতে ২২টি বিহার প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ৭ম শতাব্দীকালে ইৎ-সিৎ যখন এই অঞ্চলে উপস্থিত হন, তখন তিনি -৭টি বিহার অবলোকন করেছিলেন। মনে করা হয় যে - শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে তাম্রলিপ্তির বিহার সমুহের অবস্থার ক্রমাবনতি হয়েছিল। (প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাস, পৃ. ৭৮)

 

সমস্ত বিষয় বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে গুপ্ত শাসনকালে প্রাচীন বাংলার বেশ কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য দৃষ্টিগোচর হয়। কেননা গুপ্ত রাজারা নিজেদের 'পরম ভাগবত' অর্থাৎ বৈষ্ণব ধর্মের একান্ত অনুসারী রূপে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবুও এই যুগেই বৌদ্ধ বিহার সমূহ নানাভাবে সমৃদ্ধশালী হয়েছিল। এছাড়া এযুগে বৌদ্ধ বিহার বৃহত্তর পরিসরে পঠন-পাঠনে আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সময়কালে দক্ষিণ দক্ষিণ পূর্ব বাংলার বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস পূর্নগঠনের জন্য পর্যাপ্ত সাহিত্যিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে চৈনিক শ্রমণদের বর্ণনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গক্রমে এটা উল্লেখ্য যে, ৮ম শতাব্দীর নালন্দাতে প্রাপ্ত একটি লিপিতে বলাদিত্যকে একজন শক্তিশালী গুপ্তরাজা এবং তাঁকে নালন্দার অত্যাশ্চর্য বিহারের নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, খন্ড-২০, পৃ. ৩৭)

 

আচার্য বুদ্ধঘোস এবং জাতকট্ঠকথা:

 

বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে এইতথ্য পাওয়া যায় যে পালি ত্রিপিটক এবং পালিভাষা নিবন্ধ প্রাচীনতম অট্ঠকথা সমূহ প্রথম বৌদ্ধধর্ম সঙ্গীতির সময়কালে সঙ্গায়ন করা হয়েছিল এবং দ্বিতীয় তৃতীয় সঙ্গীতিকালে 'অনুগীত' করা হয়। অতএব মহান বৌদ্ধ সম্রাট অশোকের পুত্র মহামহেন্দ্র স্থবির দ্বারা তা শ্রীলংকাতে আনয়ন করা হয়, সেখানে তা প্রাচীন সিংহলী ভাষাতে অনুবাদ করা হয়। উত্তরকালে এই প্রাচীন সিংহলী ভাষার অনুবাদকে' বুদ্ধঘোসাচার্য এবং তাঁর সমকালীন তথা পরবর্তী অন্যান্য অট্টকথাচার্যগণ 'তস্তিনযানুচ্ছবিকা ভাসা' (পালি' অনুরূপ ভাষা) পুনঃ অনুবাদ করেছিলেন। 'সদ্ধম্মসংগ্রহ' (পৃ. ৩৪) তে এই তথ্যকে পরিস্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, "বুদ্ধঘোসা সববং সীহলটাঠকথং মূলভাষায় মাগধিকায় পরিবত্তেসি।"

 

আচার্য বুদ্ধঘোস'এর জীবন সম্পর্কিত তথ্য-, 'চুল বংস' ৩৭তম পরিচ্ছেদ'এর ২১৫-২৪৬ গাথা, . বুদ্ধাঘোসুপ্পত্তি বা মহাবুদ্ধঘোসস্স নিদানবত্থু, . গন্ধবংস, . সাসনবংস এবং . সদ্ধম্ম সংগহ। উপযুক্ত গ্রন্থের তথ্য অনুসারে বুদ্ধঘোস'এর সময়কাল - শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) তিনি তাঁর আচার্য মহাস্থবির রেবত'এর আজ্ঞানুসারে লংকাধিপতি মহানাম'এর শাসনকালে শ্রীলংকা গিয়েছিলেন। তবে তার জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কিত সঠিক কোন পাওয়া যায় না। বর্মী (মায়ানমান) পরম্পরা অনুসারে আচার্য বুদ্ধঘোস শ্রীলংকা হতে বার্মাতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারার্থে গিয়েছিলেন। অপরদিকে কম্বোডিয়া (কাম্পুচিয়া) নিবাসীদের মতে বুদ্ধঘোস মহাস্থবিরের পরিনির্বাণ তাদের দেশে হয়েছিল। (দ্য লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক অফ বুদ্ধঘোষ, পৃ. ৩৮-৩৯)

 

জাতকট্ঠকথা বা জাতকট্টবনমণ্ণনা বা জাতকত্ববণ্ণনা জাতকগাথার অটাঠকথা। 'গন্ধবংস' অনুসারে 'জাতকট্ঠকথা' আচার্য বুদ্ধঘোস কৃত গ্রন্থ। . গাইগার'এর মতে এই গ্রন্থ কোন এক সিংহলী ভিক্ষুর রচনা। বস্তুতঃ জাতকট্ঠবণ্ণনা' লেখক সিংহলী ভিক্ষু চুল্ল বুদ্ধঘোস ছিলেন, যিনি বুদ্ধঘোস'এর প্রায় সমকালীন ছিলেন, বা পরবর্তী সময়কালের ভিক্ষু হতে পারেন। 'গন্ধবংস' তেও একজন সিংহলী ভিক্ষু চুল্ল বুদ্ধঘোস' এর উল্লেখ পাওয়া যায়, তাঁর ২টি রচনা 'জাতত্তগীনিদান' এবং 'সোতত্তগীনিদান' সম্ভবত 'জাতত্তগীনিদান' জাতকট্ঠকথা বা জাতকট্ঠবণ্ণনা?

 

প্রসিদ্ধ বিদ্ধান মলালসেকর (দ্য পালি লিটারেচার অফ্ সিলোন, পৃ. ১২৪)'এর মতে সিংহলী ভাষাতে পূর্ব থেকেই জাতকট্ঠবণ্ণনা' নামক একটি জাতক-কথা (মূল পালি সিংহলী) প্রচলিত ছিল এবং পালি জাতকট্ঠকথা'এরই পালি অনুবাদ। তবে একথা সত্য যে জাতকট্ঠকথা'তে অতীত এবং বর্তমান (বুদ্ধ) জীবন কাহিনীর পৃষ্ঠভূমিতে অনেকগুলি পরিবর্তন দৃষ্ট হয়, অতএব উত্তরকালীন প্রক্ষিপ্ত অংশ বা আখ্যানগুলি এই গ্রন্থে নিহিত আছে। ২টি জাতককথাতে (হত্থিপাল জাতক এবং মুগ পক্খ জাতক) বেশকিছু সিংহলী ভিক্ষুর নাম পর্যন্ত রয়েছে। যাইহোক না কেন, ভারতীয় কথা সাহিত্যের প্রাচীন রূপকে অবগত করার প্রশ্নে জাতক (গাথা জাতক) এর সমান 'জাতকট্ঠকথা' অধ্যয়ন করা অত্যন্ত জরুরী।

 

আচার্য বুদ্ধঘোস'এর যুগ বলতে ৪০০-১১০০ খ্রীষ্টাব্দ' সময়কালকে বোঝানো হয়। সম্ভবত এই সময়কাল মূল অর্থে গুপ্তযুগ। কেননা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসনকাল মূল অর্থে গুপ্ত যুগ। কেননা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসনকাল ৩৭৫-৪১৩ খ্রীষ্টাব্দ অর্থাৎ আদি মধ্যযুগ। ইতিপূর্বে এই যুগের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং ধর্মীয় চত্রি সম্পর্কিত বিষয়গুলি আলোচনা করা হয়েছে। রমেন্দ্রনাথ নন্দী' মতে (সোস্যাল রুটস্ অফ রিলিজিয়ন ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া, পৃ. ১৬)' আদি মধ্যযুগে অস্পৃশ্যতা' ভিত শ্রেণী শোষণের অঙ্গ হিসেবেই নিহিত ছিল। পুরনোক্ত গ্রন্থগুলি এই সময়কালে অস্পৃশ্যতার বীজকে অঙ্কুরোদগম করেছিল। অপরদিকে বৌদ্ধধর্ম এই সামাজিক নিপীড়নের বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করে সংঘের মাধ্যমে উৎপাটন করতে সচেষ্ট হয়েছিল।' প্রথমত এখানে লক্ষণীয় যে বৌদ্ধধর্ম সমাজ বিকাশের একটা অপেক্ষাকৃত উন্নত স্তরে আবিভূর্ত হয়েছিল। তাই হিন্দুধর্মের মতো নানাবিধ অনৈতিক বিশ্বাস, ধারণা, আচার-আচরণ বর্ণ-বিভাজনের ক্রমবিকাশের ভিত্তিতে বৌদ্ধধর্ম সৃষ্টি হয়নি। বৌদ্ধধর্ম একটা বিশেষ সামাজিক পরিস্থিতিতে বিজ্ঞান ভিত্তিক একটা সংঘবদ্ধ ধর্ম হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল। বুদ্ধঘোস'এর চিন্তা তার উজ্জ্বল উদাহরণ রূপেই প্রতিফলিত হয়েছে।

 

পাল যুগ এবং প্রাচীন বাংলার ধর্ম প্রসঙ্গ:

 

প্রাচীন বাংলায় পালযুগের উত্থানকে বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়রূপে চিহ্নিত করা হয়। কেননা পালরাজারা বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। গোপালের শাসনামনে (আনুমানিক ৭৫৬-৭৮১ খ্রীষ্টাব্দ) বাংলার বাণিজ্যিক পরিকাঠামো, কৃষিভূমি উদ্ধার এবং জলাভূমি সংস্কার সহ বৌদ্ধ বিহার গুলি যথেষ্ট উন্নতিসাধন করেছিল। সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ এবং নারীদের ধর্মাচরণের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। দক্ষ কারিগরদের সিংহভাগই ছিল বৈশ্য এবং শূদ্র পর্যায় ভুক্ত। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় ছিল। পালযুগে দাস বা ক্রীতদাস প্রথার কোনরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় না। পাল রাজা নয়পাল (আনুমানিক ১০৪৩-১০৫৮ খ্রীষ্টাব্দ) তাঁর ১৫তম রাজত্ব বর্ষকালে ব্রাহ্মণ্য মতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং হিন্দু ব্রাহ্মণ্য দেব-দেবীর তাঁর অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়। এই সময়কালে বৌদ্ধ আচার্য অতিশ দীপঙ্কর তিব্বত গমন করেছিলেন। সম্ভবত ধর্মীয় মতপার্থক্য এর মূল কারণ ছিল। (এপিগ্রাফিকা ইন্ডিকা, খণ্ড-৩৬, পৃ. ৮৬-৮৮) সন্ধ্যাকর নন্দী' রামচরিতে সিন্ধু বা সমুদ্র হতে পালরাজা ধর্মপালের উৎপত্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। সূত্রটি কাল্পনিক হলে বিষয়টি অত্যন্ত কৌতূহলদ্দীপক। যেমন- প্রিয়মুম্মুদ্রিতলক্ষ্মীযুগলং কমলানামিনঃ বস্তুনুতাং।

 

কৃত্বালোকহরনং মহাক্ষয়ে যং বিধুর্বিশতি।। রামচরিত, ১ম পরিচ্ছেদ, ৩য় শ্লোক।

 

এর পরের শ্লোকে দেখতে পাওয়া যায় যে, সেই সমুদ্রের বংশে রাজা ধর্মপাল জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

 

তৎকুলদীপো নৃপতিরভূ () ধর্মো ধামবানিবেক্ষ্বাকুঃ।

যস্যান্ধিং তীর্ণাগ্রাবনৌ ররাজাপি কীর্ত্তিরবদাতা।। রামচরিত, ২য় পরিচ্ছেদ, ৪র্থ শ্লোক।

 

ধর্মপালের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র দেবপাল বাংলার সিংহাসনে আসীন হয়। গুবরমিশ্রের স্তম্ভলিপি হতে অবগত হওয়া যায় যে, দেবপাল তাঁর মন্ত্রী কেদারমিশ্রের সহায়তায় উৎকল কূল উৎকীলিত করে, হুনগর্ব চূর্ণ করে এবং দ্রবিরেশ্বর গুজ্জরনাথের দর্প চূর্ণীকৃত করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত সমুদ্রমেখলা ভরণা বসুন্ধরায় বৌদ্ধধ্বজা উজ্জীন করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

 

মুঙ্গেরে (বর্তমান বিহার) আবিষ্কৃত তাম্রশাসন হতে এই তথ্য পাওয়া যায় যে, দেবপাল শ্রীনগর ভুক্তির (অর্থাৎ পাটলীপুত্র ভুক্তির) রাজগৃহ বিষয়ের (বর্তমান রাজগীর) অন্তঃপাতী অজপুর নয়প্রতিবদ্ধ নন্দিবনাক মনিবায়ক গ্রাম, পিলিপিঙ্কা নয় প্রতিবন্ধ নয়িকাগ্রাম, হক্তিগ্রাম এবং গয়া বিয়ের পালানব গ্রাম, সুবর্ণদ্বীপ বা যবদ্বীপের রাজা শ্রীবালপুত্ত দেব কর্তৃক অনুরুদ্ধ হয়ে তন্নিম্মিত নালন্দাবস্থিত বিহারে প্রতিষ্ঠিত ভগবান বুদ্ধের সেবার জন্য এবং আর্য্য ভিক্ষুসংঘের চীবর, পিন্ড, শয়নাসন এবং ঔষাধার্থে, ধর্ম্মরত্বের (ধর্মগ্রন্থের) লেখনের জন্য বিহার ভগ্ন হলে তা সংস্কারের জন্য প্রদান করেছিলেন।

 

ধর্মপাল এবং দেবপালের শাসনামলে গৌড় মগধ বঙ্গ শিল্পের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল। এই সময় কালে বাংলার সামাজিক শ্রেণী বিভাগের যে প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় তা এইরূপ-

 

১। মাল রাজবংশী, গোবরা এবং তুঙ্গা শ্রেণী ভুক্ত, কোচদের মধ্যেও এই শ্রেণী বিদ্যমান। বিষহরি দেবীর উপাসক। এদের পূর্ব পুরুষ বেদে শ্রেণীভুক্ত।

 

২। বাগাদি বঙ্গদেশের নদিয়া, দুই ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, বীরভূম, মানভূম অঞ্চলে বহু সংখ্যক বাগাদি বসবাস করে। বাগাদি গণ অনার্য এবং মল্লজাতিভুক্ত। বিষহরি এদের প্রধান দেবী।

 

৩। দুলিয়া এই শ্রেণী বাগদি সম্প্রদায় ভূক্ত। পালকি বহন এবং মৎস শিকার এদের মূল জীবিকা।

 

৪। বাউরি পূর্ববঙ্গের বাউরি সম্প্রদায় মল্লজাতি হতে উৎপন্ন। কৃষিকার্য এদের মূল জীবিকা।

 

৫। ভূঁইমালী মল্লভূমিয়া জাতিই পূর্ববঙ্গের ভূইমালী জাতি। কৃষিকার্য, পালকি বহন এবং নৌকাচালন এদের মূল জীবিকা।

 

এছাড়া নিম্মলিখিত যে সকল সম্প্রদায়'এর উল্লেখ পাওয়া যায় তার বিবরণ প্রদত্ত হল।

 

১। হাঁড়ি, ২। কেওড়া বা কাওড়া, ৩। চন্ডাল নমশূদ্র, ৪। ধাঙর, ৫। যুগি, ৬। মালো, ৭। কেটে, ৮। জালিয়া বা জেলে, ৯। নলে, ১০। পাতর, ১১। পাড়ুই, ১২। পোদ, ১৩। পাটনি, ১৪। মন্ডল, ১৫। পুণ্ড্র বা পুনভীক, ১৬। মগ, ১৭। চাষাধোপা, ১৮। কাপালি, ১৯। স্বর্ণবণিক, কলু, ২০। গোপ, ২১। সদ্গোপ, ২২। কৈবর্ত, ২৩। আগুরি, ২৪। তাঁতি, ২৫। তিলি বা তেলি, ২৬। কামার (কর্কট), ২৭। কুমার, ২৮। তাম্বুলি, ২৯। নরসুন্দর, ৩০। মালাকার, ৩১। কাঁসারি, ৩২। গন্ধবণিক, ৩৩। শাঁখারি, ৩৪। বারুই, ৩৫। মোদক, ৩৬। কায়েত বা কায়স্থ, ৩৭। বৈদ্য, ৩৮। ব্রাহ্মণ, ৩৯। গুণমাঝি, ৪০। চোয়াড় এবং ৪১। ডোম। 

 

পালযুগে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম ব্যতীত হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শাখা উপশাখা (শৈব ধর্ম, সূর্যের উপাসক, বৈষ্ণব ধর্ম), জৈনধর্ম এবং প্রকৃতির পূজা প্রচলিত ছিল।

 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসারে ব্যস্ত স্বয়ং অতিশ তাঁর তিব্বত বাসের দ্বিতীয় পর্যায়ে সে দেশে সরহ- দোহা প্রচার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাধা পেয়েছিলেন, এবং বাধাটা তুলেছিলেন স্বয়ং 'ডোম-জ্যো-বেই-জুং-নে (ডোম বংশের জয়কার) সরহের দোহা বা গানে সবরকম ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষই তার চরমপ্রমান। ......সরহ বলেছেন,

 

হতভাগারা যোগীদের নিয়ে পরিহাস করে,

বলে ওরা বিষাক্ত সাপের মতো,

দেখা মাত্র ভয়ে পালাও।

ব্রাহ্মণেরা আসলে কিন্তু ভেতুয়া (অজ্ঞ, বোকা)

ওর অর্থহীন চতুর্বেদ আওড়ায়।

 

(নিমোক্ত স্তবকটি প্রবোধচন্দ্র বাগচী সম্পাদিত সংস্কারণে নেই, মূল তিব্বতী থেকে সংগ্রহীত। সূত্র চুরাশি সিদ্ধার কাহিনী, অলকা চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ২৫-২৭)

 

কারা এই যোগী বা সিদ্ধচার্য? প্রসঙ্গে অলকা চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, "... সমাজের বাইরে, লোকালয় ছেকে দূরে বাস করতেন এই অজ্ঞাত পরিচয় যোগীরা, সংসারী মানুষের কাছে তাঁরা একান্তই উপেক্ষিত, অস্পৃশ্য। অথচ রাজা রাণী, রাজপুত্র রাজকন্যা, ব্রাহ্মণ মন্ত্রী তত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিত, ধনী গৃহস্থ থেকে শুরু করে বিশেষত চামার, গুঁড়ি, কামার, কুমোর, তেলি, তাঁতি, চাষাভুষো পর্যন্ত সমাজের সবধরণের মানুষ এঁদের গুরু বলে মেনেছেন.... (পৃ. ৪৭)

 

সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতে সিদ্ধদের আবির্ভাব কাল ৯৫০-১১০০ খ্রীষ্টাব্দ। প্রবোধ চন্দ্র বাগচীর মতে ১০-১২ খ্রীষ্টাব্দ। ধর্মবীর ভারতী সিদ্ধদের আনুমানিক কাল নির্ণয় করেছেন সরহপা, লুইপা প্রভৃতি সমকালীন সিদ্ধগণ ৮০০-৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দ। মৎসেন্দ্র প্রভৃতি সিদ্ধগণ ৮৭৫-১২৫ খ্রীষ্টাব্দ।

গোরাক্ষ, জালন্ধর, কাহ্নপা প্রভৃতি ১২৫-১০০০ খ্রীষ্টাব্দ।

তিল্লোপা, নারোপা, মৈত্রীপা ১০০০-১১০০ খ্রীষ্টাব্দ।

সিদ্ধগণের মধ্যে কোন কোন সিদ্ধ নিম্নবর্গের ছিলেন তার বিবরণ প্রদত্ত হল:

 

১। শবরিপা - ব্যধ।

২। কংকরিপা - শূদ্রকূল।

৩। শীনপা - জেলে।

৪। গোরক্ষ - গন্ধবণিক।

৫। তন্তিপা - তাঁতি।

৬। চমরিপা - যুচি।

৭। খড়গপা - শূদ্রকূল।

৮। কাম্বুপা - কায়স্থ।

৯। থকনপা - নীচকূল।

১০। নারোপা - শুঁড়ি।

১১। শলিপা - শূদ্র।

১২। দুখন্ডি - ঝাড়ুদার।

১৩। ধোম্বিপা - ধোপা।

১৪। ভন্ধেপা - পটুয়া।

১৫। তন্ধেপা - শূদ্র।

 

(সংক্ষেপিত)

 

সহজেই সবাই সমান,

সেখানে শূদ্রও নেই, নেই ব্রাহ্মহ্মণ।

এই (সহজেই) পুণ্যসলিলা যমুনা,

এখানেই গঙ্গা সাগর, বারাণসী, প্রয়াস।

চন্দ্র, সূর্য এখানেই। - সরহপাদ।

 

সেন শাসনামল এবং বাংলার বিপর্যয়:

 

অষ্টম এবং নবম শতাব্দীতে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল হতে যখন বৌদ্ধধর্ম প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে তখন পূর্ব ভারতে পাল, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধ রাজবংশ খড়গ চন্দ্র শাসকদের ধর্ম নীতিতে উদার ধর্মনীতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। তবে গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী সেন রাজবংশ ব্যাপারে যথেষ্ট গোঁড়ামির পরিচয় দিয়েছিল। নাস্কির বৌদ্ধদের পদোচ্ছেদের জন্য প্রত্যক্ষ 'নারায়ণরূপী' বল্লান সেনের আবির্ভাব হয়েছিল বলেই 'দানসাগর' দাবী করা হয়েছে। দাক্ষিণাত্য হতে আগত ব্রাহ্মণ্যবাদের পৃষ্টপোষক সেন রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা বাংলার ধর্ম সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্ণ বিভাজন ব্যবস্থাকে দৃঢ় করতে সচেষ্ট হয়েছিল। বৌদ্ধধর্মের পরিবর্তে সেনদের গোঁড়া মতবাদ সমগ্র বাংলার পৃষ্টভূমিকে ধ্বংস করেছিল।

 

"বল্লালের অত্যাচারে বণিক সমস্ত।

নানা স্থানে সকলে যাইতে হৈলা ব্যস্ত।।বৈশ্যকুলজী গ্রন্থ।

 

বল্লাল সেনের শাসনকালে 'কৌলিন্য মর্যাদা' স্থাপিত হয়। অপরদিকে যারা বৌদ্ধধর্ম পরিত্যাগ করে নি, তারা সমাজের নিম্নস্তরে পতিত হয়, এবং হিন্দুগণ তাদের সংশ্রব ত্যাগ করলে যুগি, মালো প্রভৃতি নিকৃষ্ট জাতিতে পরিগণিত হয়।

 

সামাজিক বর্ণবিন্যাসের কঠোরতা সেন যুগে প্রবলভাবে বৃদ্ধি লাভ করেছিল। সৃষ্টি হয়েছিল রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র, যাদের প্রাধান্য কৃষক সম্প্রদায় এবং বণিক শ্রেণীর স্বার্থকে খর্ব করেছিল। গোঁড়া হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিভেদ, বহুবিবাহ, নারীদের প্রতি বঞ্চনা অবহেলা, সহমরণ প্রভৃতি কু-প্রথা।

 

সেন যুগে পুনরায় ব্রাহ্মণ্য প্রভাব দৃঢ়মূল হলে বৌদ্ধ ভাবধারায় পুষ্ট বাঙ্গালীর শিক্ষা-দীক্ষা এবং উন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সময় শিক্ষা সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। নারী শিক্ষা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং দেবমন্দিরে নৃত্য করার জন্য দেবদাসী নিযুক্ত ছিল। নগরে নগরে বারবিলাসিনীর সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল না। নগরে নগরে বারবিলাসিনীর সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল না। নারীগণ কারও সঙ্গে সম্ভাষণ করতে না। কেননা কৌলিন্যপ্রথা প্রকোপ সমাজের বর্ণে বিদ্যমান ছিল।

 

সমাজের নিম্ন শ্রেণী অর্থাৎ ভূইমালি, চণ্ডাল, ডোম, বাগদি প্রভৃতি জাতির মানুষ শাসক এবং ব্রাহ্মহ্মণ্য ধর্মের নিপীণনে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করত। চর্যাপদে এই শ্রেণীর করুণ চিত্র পাওয়া যায়।

 

"টালত মোর ঘর নাহি পরিবেশী।

হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।

বেঙঅ সংসার বডহিল জাও।" -----চর্যাপদ

 

যাইহোক, বাংলার লোক সমাজ মূল অর্থে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে। অপরদিকে 'বল্লালী-কর্ণাট'এর মতো হিন্দু সমাজের গঠনে জাতপাতের কঠোর শ্রেণী বিন্যাস, রাজতন্ত্রের সংস্কৃতানুরাগী শাসকদের সঙ্গে সাধারণের দূরত্বকে আরও বড়ো করে তুলেছিল। একদিকে ধর্মানৈতিক বিরোধ, ব্রাহ্মণ্যধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্মের সংঘাত, অপরদিকে ভাষাগত বিরোধিরে প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত বাংলার লোকায়ত চরিত্রগুলি ক্রমশই বিবর্তনের হাত ধরে 'মঙ্গলকাব্যে' সম্পৃক্ত হয়ে পড়ল। সেনবংশের পতনের পর পঞ্চদশ শতাব্দী নাগাদ বৌদ্ধধর্ম সম্প্রদায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ব্রাহ্মণ্য তন্ত্র বাংলার প্রচলিত মহাযান বৌদ্ধধর্মের তন্ত্র সমূহকে আত্মাসাৎ করে নিল। বৈদিক ধর্মাশ্রিত আর্য ব্রাহ্মণেরা বুদ্ধ কূর্মাকৃতি শিলাখণ্ডকে বিষ্ণুর অবতার রূপে ঘোষণা করার মাধ্যমে বাংলার সুপ্রাচীন বৌদ্ধ ইতিহাসকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দিল। এরপর ধর্মের নিজস্ব সত্তা বাংলায় আর থাকল না।

 

সহায়ক গ্রন্থসূচী :

 

১। পালি সাহিত্যের ইতিহাস, ভরত সিংহ উপাধ্যায়, উত্তর প্রদেশ হিন্দি সংস্থান, প্রয়াগ, ২০২১।

২। জাতকমালা, অনু: . জগদীশ চন্দ্র মিশ্র, চৌখাম্বা সুরভারতী প্রকাশন, বারাণসী, ২০০৬।

৩। প্রাচীন বাংলার ধর্ম প্রসঙ্গ, . মো. গোলাম সারওয়ার, অনুশিষ্য, হুগলী, ২০২৫।

৪। ভারতের সভ্যতা সমাজ বিকাশে ধর্ম শ্রেণী জাতিভেদ, সুকোমল সেন, এন বি , কলকাতা, ২০১০।

৫। বাংলার পুরাবৃত্ত, শ্রী পরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, খড়ি, কলকাতা, ২০২৫।

৬। বঙ্গদর্পন- প্রধান সম্পাদক-পবিত্র সরকার, সমাজ রূপান্তর সন্ধানী তৃতীয় সহস্রাদ্ধ সমিতি, কলকাতা, ২০২৫।

৭। বৌদ্ধ ধর্ম চর্যাগীতি, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, মহাবোধি বুক এজেন্সি, কলকাতা, ২০২১।

৮। পুরাতত্ব নিবন্ধাবলী, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, গৌতম বুক সেন্টার, দিল্লী, ২০২৪।

৯। বৌদ্ধ ধর্মের রূপরেখা, পণ্ডিত দ্বারিকা দাস শাস্ত্রী, সুগত প্রকাশনী, বারাণসী, ১৯৯০।

১০। চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী, অলকা চট্টোপাধ্যায়, অনুষ্ঠুপ, কলকাতা, ২০২৩।

১১। বাঙ্গলার ইতিহাস-, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দে' পাবলিশিং, কলকাতা, ১৪০৫ বঙ্গাব্দ।

No comments:

Post a Comment