পালি ভাষা ও বৌদ্ধ দর্শন সাহিত্য
ভূমিকা
যাকে আমরা বর্তমানে পালি ভাষা বলি, এইটি তার প্রারম্ভিক নাম ছিল না। ভাষা বিশেষ অর্থে পালি শব্দের প্রয়োগ অপেক্ষাকৃত নবীন উনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে (খ্রীঃ) এর এই অর্থে প্রয়োগ দৃষ্ট হয় না। 'পালি' শব্দের সর্বপ্রথম ব্যাপাক প্রয়োগ আমরা আচার্য বুদ্ধঘোষ (চতুর্থ পঞ্চম শতাব্দী, খ্রীষ্টাব্দ)'এর অট্ঠকথা এবং 'বিসুদ্ধিমগ্গ্ন'তে পাওয়া যায়। আচার্য বুদ্ধঘোষ ২টি অর্থে এই শব্দের প্রয়োগ করেছিলেন ১. বুদ্ধ-বচন বা মূল তিপিটক (ত্রিপিটক) এর অর্থে, ২. 'পাঠ' বা 'মূল তিপিটক'এর পাঠ'এর অর্থে। অতএব বলা যেতে পারে যে 'মূল তিপিটক' বা 'বুদ্ধ-বচন' এর অর্থে বুদ্ধঘোষ 'পালি' শব্দের প্রয়োগ করেছিলেন। যেমন 'বিসুদ্ধি মগ্গ'তে "ইমানি তাব পালিয়ং, অট্টকথায়ং পন...."
("এতো 'পালি'তে রয়েছে, কিন্তু 'অট্ঠকথাতে' তো....") তথা সেখানে "নেব পালিয়ং ন অট্ঠকথায়ং আগত"
("এটি না তো পালিতে এসেছে আর না তো 'অত্থকথা' তে")। এইভাবে 'সুমঙ্গলবিলাসিনী' (দীঘনিকায়'এর অট্ঠকথা) তে "নেব পালিয়ং, ন অট্ঠকথায়ং দিস্সতি"। ("এটি না তো 'পালি'তে দেখা যায় আর না তো 'অট্ঠকথা'তে") তথা পুগ্গলপঞ্ঞতি-অট্ঠকথা'তে "পালি মুক্তকেন পন অট্ঠকথানয়েন" ('পালি' ব্যতীত 'অট্ঠকথা'র প্রণালীতে) ইত্যাদি। এছাড়া যেখানে তাঁর (বুদ্ধঘোস) তিপিটকের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কোথাও কোথাও তার পাঠান্তর নির্দেশ করতে হয়েছে, সেখানে তিনি 'ইতি পি পালি' (এরূপ ও পাঠ হয়) ব্যক্ত করে 'পালি' শব্দ দ্বারা মূল তিপিটকের 'পাঠ'কে উল্লেখ করেছেন, যেমন 'সুমঙ্গলবিলাসিনী'র সামঞ্ঞ ফলসুত্ত বণ্ণনা'তে 'মহচ্চরাজানুভাবেন' পদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি (বুদ্ধঘোস) এর অর্থ করেছেন, 'মহতা রাজানুভাবেন' এবং পুনঃ পাঠান্তরের নির্দেশ করতে লিখেছেন 'মহচ্চা ইতি পি পালি' অর্থাৎ 'মহচর্চা' এরূপ ও পাঠ হয়। এখানে 'পালি'র অর্থ নিশ্চিত রূপে 'পাঠ' হয় এবং এই বিষয়টি হতে অবগত করা যায় যে সমান প্রসঙ্গে 'পালি'র সমানার্থ শব্দ রূপে 'পাঠ' শব্দের ও প্রচুর প্রয়োগ আচার্য বুদ্ধঘোস করেছিলেন। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ প্রযুক্ত হলো। "সেতকাণী অট্ঠীনী এতথাতি সেতষ্ঠিতা সেতটিকা' তি পি পাঠো” (সমন্তপাসাদিকা রেরঞ্জকণ্ডবণ্ণনা) তথা 'অপগতাকালকো ... অপহতকালকো' তি পি পাঠো" (সমন্তপাসাদিকা বেরঞ্জকন্ডবণ্ণনা)। বাস্তবে নানা স্থানে এবং ব্যক্তির নামের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে "তি পি পাঠো” নির্দেশ দ্বারা বুদ্ধঘোসের অট্ঠকথা পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
আচার্য বুদ্ধঘোস'এর কিছু সময় পূর্বে লংকা (বর্তমান শ্রীলংকা) তে রচিত 'দীপবংস' (পিটকত্তয়পালিং চ তস্সা অকথং পিচ।২০।২০) গ্রন্থে, চতুর্থ শতাব্দীর (খ্রীষ্টাব্দ) রচনা, 'পালি' শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধ বচনের অর্থে করা হয়েছে। এইভাবে বুদ্ধঘোস'এর প্রায়ঃসমকাল বা তৎকাল পরে (পঞ্চম শতাব্দী, খ্রীষ্টাব্দ), রচিত 'মহাবংস'তে ও (পিটকত্তয়পালিত্তুট তং অট্ঠকথং পি চ ।। ৩৩।১০০) পালি শব্দর প্রয়োগ বুদ্ধবচন বা পালি তিপিটক অর্থে হয়েছে। আচার্য বুদ্ধঘোসের পরও সিংহল (লংকা, বর্তমান শ্রীলংকা) দেশে 'পালি' শব্দের প্রয়োগ উপর্যুক্ত উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আচার্য ধম্মপাল (পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দী, খ্রীষ্টাব্দ) তাঁর 'পরমত্থদীপনী' (খুদ্দক নিকায় এর কতিপয় 'পাঠ' অর্থে করেছেন, যথা "অযাচিতো তথাগচ্ছী 'তি.... আগতো' তি পি পালি"। এইভাবে ত্রয়োদশ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) তেও, 'চুমূলবংস', অর্থাৎ মহাবংস'র (পঞ্চম শতাব্দী, খ্রীষ্টাব্দ) উত্তরকালীন পরিবর্দ্ধিত অংশতে 'পালি' শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধ বচন, অট্ঠকথা'র ব্যতিরিক্ত মূল পালি তিপিটক'এর অর্থে করা হয়েছে। এর একটি অতি প্রসিদ্ধ বাক্য "পালিমত্তং ইধানীতং নত্থি অট্ঠকথা ইধ।"
("এখানে শুধুমাত্র 'পালি' আনীত হয়েছে, 'অট্ঠকথা' এখানে নেই")। এইভাবে দেখানো হয়েছে যে আচার্য রেবত স্থবির বুদ্ধঘোস'এর প্রতি "অভিধম্ম'র পালি (মূল বুদ্ধ বচন)কে বলেছেন পালিমহাভিধম্মস্ম।"
"সদ্ধম্মসংগহ” (চতুদ্দশ শতাব্দী) তেও 'পালি' শব্দের প্রয়োগ এই মূল তিপিটক'এর অর্থে করা হয়েছে। এখানে স্থবির রেবত আচার্য বুদ্ধঘোসের প্রতি বলেছেন, "আয়ুস্মান বুদ্ধঘোস!" জম্বুদ্বীপে (ভারতবর্ষ) পিটক-ত্রয় পালি (পালি তিপিটক) মাত্র রয়েছে, তার অট্ঠকথা এবং আচার্যবাদ বিদ্যমান নেই। ("ইধাবুসো বুদ্ধঘোস, জম্বুদ্বীপে পিটকত্তয় পালিমত্তমেব অত্থি, তস্স অট্ঠকথা চ ন বিঞ্ঞন্তি।" সদ্ধম্মসংগহ, পৃ. ৩১)। এমন কি উনবিংশ শতাব্দীতে লিখিত 'সাসনবংসতেও "নেব পালিয়ং ন অট্ঠকথায়ং"এর পরম্পরাগত উদাহরণ সেই রূপে পালি'র অর্থকে স্পষ্ট করতে ব্যবহৃত হয়েছে। উপরন্তু এই গ্রন্থের একটি প্রসঙ্গতে "পালিমত্তং এব অত্থি, অট্ঠকথা ইব"এর কিছু অক্ষর পরিবর্তন দ্বারা পুনরুদ্ধারণ মাত্র করা হয়েছে, যার সমান বাক্য, যেরূপ আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, 'সদ্ধম্মসংগহ'তে ও এসেছে।
উপযুক্ত উদাহরণ 'পালি' শব্দের অর্থ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উনবিংশ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) পর্যন্ত যে অর্থে 'পালি' শব্দের প্রয়োগ হয়েছে, এটি তার দিগদর্শন করায়। তবে একথা সত্য যে তিপিটক'এ তো 'পালি' শব্দ বুদ্ধ বচন অর্থে পাওয়া যায় না।
তিপিটক'এর উপর ভিত্তি করে রচিত বৌদ্ধ সাহিত্যেও বুদ্ধঘোসের রচনা বা 'দীপবংস'র সময়কাল হতে পূর্বে 'পালি' শব্দের নির্দেশ বুদ্ধ বচন অর্থে দেখা যায় না। তাহলে আচার্য বুদ্ধঘোস কোন পরস্পরার আশ্রয় গ্রহণ করে 'পালি' শব্দকে 'বুদ্ধ-বচন' বা তার 'পাঠ' অর্থে প্রযুক্ত করেছিলেন। দ্বিতীয় অর্থে, বুদ্ধঘোসের সময়কাল হতে পূর্বে 'পালি' শব্দের ইতিহাস আমাদের অবগত করা অত্যন্ত জরুরী। কারণ ভাষার বিকাশের (ক্রমবিবর্তন) ক্ষেত্রে, স্থান এবং যুগ'এর বিশেষ পরিস্থিতির কারণ, শব্দের রূপ, অর্থ এবং ধ্বনিতে নানা বিকার হতে থাকে। ধ্বনি, রূপ এবং অর্থের সেই বিকারকে আমাদের অনুসন্ধান করা উচিত, যা অতিক্রমণ পূর্বক, 'পালি' শব্দ আচার্য বুদ্ধঘোষ'এর সময়কাল পর্যন্ত 'বুদ্ধ-বচন' বা 'মূল-তিপিটক'এর পাঠ' অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে এবং পুনঃ উনবিংশ শতাব্দী (খ্রীষ্টাব্দ) পর্যন্ত সেই অর্থকে ধারণ করেছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্যনীয় যে বুদ্ধঘোসের অট্ঠকথাতে 'পালি' শব্দ 'বুদ্ধ-বচন' বা 'মূল' তিপিটক' অর্থেকে ব্যক্ত করে, এই কারণে এর মূল রূপে এমন কোন শব্দ ছিল যা বুদ্ধ যুগে এই অর্থকে সূচিত করেছিল। এই অর্থে 'পালি' শব্দ পাঠ হয়। 'পালি' শব্দের প্রাচীনতম রূপ আমরা 'পরিযায়' শব্দতে পাই। 'পরিযায়' শব্দ তিপিটক'এ অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে। কোথাও কোথাও 'ধম্ম' শব্দের সঙ্গ এবং কোথাও কোথাও একা এই শব্দের ব্যবহার হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, 'কো নামো অয়ং ভন্তে ধম্মপরিযায়ো তি। ("ভন্তে। এইটি কোন নামের ধম্ম পরিযায় হবে"), 'ভগবতা অনেক পরিযায়েন ধম্মী পকাসিতো' ("ভগবান অনেক পর্যায়ের ধর্মকে প্রকাশিত করেছেন) ইত্যাদি। স্পষ্টতঃ এইরূপ স্থলে 'পরিযায়' শব্দের মূল অর্থ বুদ্ধোপদেশ হয়। পরবর্তী সময়ে (মাগধী'র অনুরূপর'কার কে ল'কার করে) 'পরিযায়' শব্দের বিকৃত রূপ 'পলিযায়' হয়েছে। সম্রাট অশোকের প্রসিদ্ধ ভাবরু শিলালেখতে 'পলিযায়' শব্দের প্রয়োগ এই অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে।
'পলিযায়' শব্দ 'পালি' উপসর্গের প্রথম অক্ষর দীর্ঘ হয়ে পরবর্তীতে 'পালিযায়' শব্দ হয়েছে। এই শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ উত্তরকালে 'পালি' হয়ে 'বুদ্ধ-বচন' বা 'মূল-তিপিটক' অর্থে দৃষ্ট হয়। ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপ তাঁর 'পালি মহাব্যাকরণ' বস্তু কথাতে এই অভিমতকে সমর্থন করেছেন। 'পালি' শব্দের ব্যুৎপত্তির বিষয়ে ড. বিধুশেখর ভট্টাচার্যের মতে 'পালি' শব্দের অর্থ 'পংতি' এবং এই অর্থে তা সংস্কৃত 'পালি' শব্দের সমার্থক শব্দ। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
'অভিধানপ্পদীপিকা'তে 'পালি' শব্দের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। 'পালি' শব্দকে তন্তি (সংস্কৃত 'তন্ত্র') 'বুদ্ধবচন' এবং 'পংতি'র সমানার্থক অর্থে সেখানে বলা হয়েছে "তন্তি বুদ্ধ বচনং পংতি পালি।" এর বিষয় ব্যাখ্যা 'অভিধানপ্পদীপিকা'তে দেখা যায়। এখানে 'পালি' শব্দের ব্যুৎপত্তি করা হয়েছে "পাতি রক্খতী'তি পালি" অর্থাৎ যে পালন করে, রক্ষা করে, সে 'পালি'। 'পালি' শব্দের 'পংতি' অর্থকে এখানে স্বীকার করা হয়েছে এবং এর উদাহরণ স্বরূপ 'তলাক-পালি' (তড়াগ-পংক্তি) এবং পালিয়া নিসীদিংসু (পংক্তিতে উপবেশন) ইত্যাদি উদাহরণ প্রদান করা হয়েছে। পালি'র অন্য ২টি অর্থ 'তন্তি' এবং 'বুদ্ধবচন' কে এখানে 'পালিধৰ্ম্ম' ('পালিসদ্দো পলিধম্মে') বা 'পরিয়ত্তিধৰ্ম্ম' রূপে ব্যাখ্যায়িত করা হয়েছে। "অয়ং হিপালি সদ্দো.... পরিযাত্তিধম্ম সঙ্গাতে পালিধম্মে দিস্পতি।" অর্থাৎ এই 'পালি' শব্দ সেই অর্থকে এবং ভাষাকে দ্যোতিত করে যা বুদ্ধ ভাষণ করেছেন। "ভগবতা বুচ্চমানস অথস বোহারস ব দীপনতো সদ্দো যেব পালি নামাতি।" এখানে পালি বা বুদ্ধবচনকে সমানর্থকবাচক রূপে 'পালিধম্ম' এবং 'পরিয়ত্তিধম্ম' শব্দের প্রয়োগ হয়েছে যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে 'ধম্ম'ই পালি এবং 'পরিয়ত্তি'কে বুদ্ধবচন বলা হয়। "তত্ত্ব ধম্মে' তি পালি"-'সমন্তপাসাদিকা' (বিনয়ট্ঠকথা)র বাহির নিদান কথা এবং "পরিয়ত্তি নাম বুদ্ধবচন" "সম্মোহবিনোদনী (বিভঙ্গকথা) এইভাবে এই অর্থ পূর্ণতঃ স্পষ্ট হয়ে যায় যে পালি বুদ্ধবচন ধম্ম পরিয়ত্তি পরিয়ত্তিধম্ম পালিধম্ম সেই 'অর্থ' যা ভগবান বুদ্ধ উপদেশ প্রদান করেছিলেন এবং সেই 'ভাষা' ও যেখানে সেই অর্থ সুরক্ষিত রয়েছে অর্থাৎ পালি তিপিটক'এ সংরক্ষিত অর্থ এবং তার ভাষাও। এটাই 'পালি' ভাষার সম্পূর্ণ অর্থ।
পিটকত্তয়পালি চ তস্সা অকথং থি চ।
মুখপাঠেন আনেসুং পুব্বে ভিক্খু মহামতি।।
হানিং দিস্বান সন্তানং তদা ভিক্খু সখাগতা।
চিরট্ঠিত্থং ধম্মস্স পোথকেসু লিখাপয়ুং।। দীপবংস, ২০/২০/২১।
ইংরেজীতে পালি সাহিত্যের ইতিহাস তথা পালি ভাষা ও বৌদ্ধ দর্শন সাহিত্য সম্পর্কিত অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বিদ্যমান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মহাস্থবির জ্ঞানাতিলোক'এর 'গাইড থু দি অভিধম্ম পিটক' (লগুন, ১৯৩৮) এবং ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপ প্রণীত' 'অভিধম্ম ফিলোসফি' (১৯৪২-১৯৪৩) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এইভাবে সুত্ত পিটক, বিনয় পিটক, পালি কাব্য, ব্যকরণ, অট্ঠকথা সাহিত্য ইত্যাদি পালি সাহিত্যের নানাবিধ উল্লেখ্যনীয় বিষয়গুলি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ভাষায় 'পালি' সাহিত্যের চর্চা আশানুরূপ নয়। উনবিংশ শতক হতে একবিংশ শতক পর্যন্ত বাংলা ভাষায় পালি ভাষা ও বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা হলেও সেই উত্তাপ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
পালি সাহিত্যের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গরিমামণ্ডিত। এর গুরুত্ব ও বিস্তীর্ণ পরিধির ব্যাপকতা বিশ্বের ঐতিহ্যবাদী যে কোন সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। পালি ত্রিপিটক'এর নানাবিধ অংশ দর্পনের ন্যায় স্বচ্ছ। অতি সাম্প্রতিক কালের সাহিত্য সম্পর্কে ও একথা প্রযোজ্য। এই কারণেই হাজার বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও এর আলোচনা আকর্ষণীয় এবং অর্থবহ। আলোচ্য গ্রন্থে পালি ভাষা ও বৌদ্ধ দর্শন সাহিত্য সম্পর্কে একটি সামগ্রিক রূপ প্রদানের প্রয়াস করা হয়েছে এবং পালি ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। সর্বোপরি আলোচনা সমূহের গুণাগুণ সুধীজনের প্রতি বিবেচ্য হল।
খ্রীষ্টির প্রথম শতকে সম্রাট মিঙ্-তি'এর রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্ম চীনে প্রবেশ করে। ভিক্ষু কাশ্যপ মাতঙ্গ এবং ধর্মরক্ষক (ধর্মারণ্য) চীনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাং বংশের প্রথমদিকের শাসনকালে (৬১৮-৯০৭ খ্রীষ্টাব্দ) বৌদ্ধদের প্রতি ধর্মীয় নিপীড়ন (কনফুসীয় দর্শনের প্রভাবে) চরম মাত্রায় উন্নীত হলেও বৌদ্ধ ধর্ম তার প্রভাব অক্ষুন্ন রেখেছিল। চীনদেশ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে স্বয়ং বৌদ্ধধর্ম প্রচারকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তিব্বত সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের সংস্পর্শে এসেছিল তিব্বত রাজা 'স্রোং-সাঙ-গাম্পো'র বৈবাহিক (চীন সম্রাটের বৌদ্ধ কন্যা) সম্পর্কের মাধ্যমে কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে যখন তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত হল তখন তিব্বতের পথপ্রদর্শক রূপে গৃহীত হয়েছিল ভারতবর্ষের তন্ত্রযান এবং মন্ত্রযান বৌদ্ধধর্ম। অপরদিকে চীন মাধ্যমিক ও যোগাচার দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।
জাপানে বৌদ্ধধর্ম বিকশিত হয় কোরিয়ার মাধ্যমে। ৫৫২ খ্রীষ্টাব্দে শিন্টো ধর্মের সঙ্গে এক দীর্ঘ দ্বন্ধের পরিনাম স্বরূপ বৌদ্ধধর্ম বিকাশ লাভ করে। সুং যুগের পুনরুজীবিত কনফুসিয়বাদ ১৬০৮-১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে পৃষ্টপোষকতা লাভ করলেও বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়নি। বর্তমান কালে জেন ও শিন্টো সম্প্রদায় জাপানে সমৃদ্ধি লাভ করেছে।
বৌদ্ধধর্ম ২টি প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত, থেরবাদ এবং মহাযান। তবে উবয় সম্প্রদায় ভারতবর্ষ হতে উদ্ভুত, কিন্তু মহাযান চীন, জাপান এবং কিছুটা পরিবর্তিত রূপে তিব্বতে বিস্তার লাভ করেছে ও থেরবাদ মূলত সিংহল (বর্তমান শ্রীলংকা) প্রভৃতি দেশে বিদ্যমান। ফলে অনিবার্যভাবে 'নর্দান' এবং 'সাউথর্দান' বৌদ্ধধর্ম রূপে খ্যাত।
সম্রাট অশোকের সময়কালে বৌদ্ধধর্ম সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিকতাবাদী ধর্মে পরিণত হয়। সিংহলী পালি সাহিত্য 'মহাবংস' অনুসারে অশোক পুত্র মহেন্দ্র স্থবির এবং কন্যা সংঘমিত্রা ভিক্ষুণী সিংহল রাজা দেবানামপ্রিয় তিস্সের শাসনকালে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। পরবর্তী সময়ে সিংহল বা শ্রীলংকাতে লিপিবদ্ধ করা হয়। সিংহলী বংস সাহিত্যের (পালি) ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক, তর্থনির্ভর।
প্রাচীন ভারতের পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধ বিহার সমূহের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গুপ্তবংশের শাসনকালে (রাজা কুমার গুপ্ত, পঞ্চম শতাব্দী) বর্তমান বিহারের রাজগীর (রাজগৃহ) হতে মাইল দূরে নির্মিত হয়েছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক পাণ্ডুলিপি সুরক্ষিত ছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষু শীলভদ্র, ধর্মপাল, শান্তরক্ষিত প্রমুখ নালন্দার প্রসিদ্ধ বিদ্বান ছিলেন। পাল যুগে এই বিশ্ববিদ্যালয় এর খ্যাতি আন্তর্জাতিক ভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। পালযুগের পতনের পর এই বিশ্ববিদ্যালয় বিধর্মীদের দ্বারা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। (দ্য ইউনির্ভাসিটি অফ্ নালন্দা, পৃ. ২০৯) নালন্দার সমকক্ষ বিহার ছিল বিক্রমশিলা। অষ্টম শতাব্দী, রাজা ধর্মপালের সময়কালে এই মহাবিহার স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমান বাংলাদেশে স্থিত এই বিহার ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে বিনষ্ট হয়ে যায়। পালকালীন অন্যান্য বৌদ্ধ বিহার সমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল ওদন্তপুরী, পাহাড়পুর এবং জগদ্দল। সম্ভবতঃ এই সকল বিহারগুলি ১২০৩-১২০৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বিধর্মীদের আক্রমণে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল।
বর্তমান বিহার রাজ্যের বুদ্ধগয়া নামক স্থানে মহাবোধি মহাবিহার অবস্থিত। এই স্থানে মহাবোধি বৃক্ষতলে রাজকুমার সিদ্ধার্থ বুদ্ধত্ব লাভ করে সম্যক সমবুদ্ধ হয়েছিলেন। ফলে এই মহাস্থান বৌদ্ধদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র।
উনিশ সতক হতে বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের পুনঃর্জাগরণের ক্ষেত্রে যে সকল সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া এশিয়াটিক সোসাইটি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়'এর পালি বিভাগ, অনাগারিক ধর্মপাল প্রতিষ্ঠিত মহাবোধি সোসাইটি এবং বঙ্গীয় বৌদ্ধদের তথা কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবির প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা বা বেঙ্গল বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। তাঁর সহযোগী ছিলেন পরিব্রাজক কালীকুমার মহাস্থবির ও কবিধ্বজ গুণালঙ্কার মহাস্থবির। এই সকল প্রতিষ্ঠান সমূহ বৌদ্ধগ্রন্থ প্রকাশ তথা নবীন প্রজন্মের নিকট বৌদ্ধধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে তাদের কর্ম যজ্ঞ আজও বজায় রেখেছে।
ভারতবর্ষে তথা বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের (থেরবাদ) পুনরুদ্ধানের প্রশ্নে অনাগারিক ধর্মপাল এবং চট্টল নিবাসী (অধুনা হট্টগ্রাম) বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের মুখ্য ভূমিকা ব্যতীত এই অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের পুনরুত্থান সমগ্র ছিল না। তাঁদের এই মানসিক তাকে আমরা নব্য যুগের প্রতিনিধিত্ব মূলক রূপে গণ্য করতে পারি। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ উনিশ শতকের বঙ্গীয় মানবতাবাদীদের অভ্যন্তরে বৌদ্ধধর্ম দর্শন, পালি সাহিত্য এবং সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্য চর্চা শুরু হয়।
বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ধঙ্গদেশের মনীষীদের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। সমাজ ধর্মচিন্তা এবং সংস্কৃতি হঠাৎ করে উদ্ভূত হয় না। আবার এগুলির পরিবর্তন ও ঘটে ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় আবিস্কৃত চর্যাপদ (বৌদ্ধ সহজিয়া সাহিত্য) তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উনিশ শতকের বৌদ্ধ দার্শনিক গমের মধ্যে অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন মহাপণ্ডিত বেণীমাধব বড়ুয়া। তিনি বৌদ্ধ জাতির উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক। মহাপরিব্রাজক শরৎচন্দ্র দাস, আশুতোষ, মুখোপাধ্যায়, অবনীন্দ্র নাথ ঠাকুর প্রমুখ বৌদ্ধধর্ম-দর্শন- সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তা বাস্তবিকঅর্থে শ্লাঘার বিষয়।
উপরিউক্ত সকল বিষয়গুলি অত্যন্ত সুন্দর এবং সুসৎবদ্ধভাবে লেখক পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রে তার পরিশুদ্ধ বুদ্ধিকে আমি শ্রদ্ধা করি। কারণ তিনি যেভাবে এই সুবৃহৎ বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস তথা সাহিত্যের বিষয়গুলিকে বর্ণনা করেছেন তা সত্যই প্রশংসার যোগ। এই অর্থে আমি বলতে পারি গ্রন্থটি মূল অর্থে বৌদ্ধধর্ম সাহিত্য সম্পর্কিত তথ্যের গবেষণ মূলক সংকলন। ফলে গ্রন্থটি বৌদ্ধধর্মের অনেক মূল্যবান তথ্য নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে ধরবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই পরিশেষে বলতে পারি এইভাবে-
আপনারে দীপ করি জ্বালো,
আপনার যাত্রাপথে
আপনিই দিতে হবে আলো। - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
নবীন লেখক আমার পরমপ্রিয় ছাত্র জীবন রায় তাঁর রচিত গ্রন্থ পালি ভাষা ও বৌদ্ধ দর্শন-সাহিত্য নতুন ধারা তুলে ধরেছে সংক্ষেপে। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি, অলং ইতি বিত্থারেন।
সুমনপাল ভিক্ষু
পালি বিভাগ
ও
বৌদ্ধ বিদ্যা অধ্যয়ন বিভাগ,
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
No comments:
Post a Comment