বক্তব্য
সুমনপাল ভিক্ষু
মনো পূব্বঙ্গমা ধম্মা মন সেট্ঠা মনোময়া।
মনসা চে পদুট্ঠেন, ভাসতি বা করোতি বা।
ততোনং দুক্খমন্বেতি, চক্কং ব বহতু পদং ।।১, ধম্মপদ, যমকবগ্গ।
মানুষ দুষিত মনে যা কিছু ব্যক্ত করে বা সম্পাদন করে, এই (কায় বাক্য মনে ১০ (দশ) অকুশল কর্ম দ্বারা উৎপন্ন দুঃখ সেই মনুষ্যকে সেইভাবে অনুগমন (পশ্চাৎধাবন) করে, যেমন কোন বলদ শকট'এর চক্র (অক্ষ) শকটে যুক্ত বলদের পদকে অনুগমন করে।
মনো পূব্বঙ্গমা ধম্মা মন সেট্ঠা মনোময়া।
মনসা চে পসন্নেন, ভাসতি বা করোতি বা।
ততোনং সুখমন্বেতি, ছ্য়া ব অনপায়িনী ।।২, ধম্মপদ, যমকবগ্গ।
মানুষ তার অলোভ ইত্যাদি গুণ দ্বারা সম্পৃক্ত, শ্রদ্ধাসম্পন্ন মন দ্বারা প্রেরিত হয়ে বাণী দ্বারা যা কিছু ব্যক্ত করে বা শরীর দ্বারা চেষ্টা করে, এই ১০ (মানসিক, বাচিক এবং কায়িক) কুশল কর্ম দ্বারা উৎপন্ন সুখ সেইভাবে পশ্চাৎধাবন করতে থাকে, যেমন নিরন্তন অবস্থানরত মানুষর ছায়া তার অনুগমন করে।
প্রসঙ্গত স্মরণ যোগ্য যে ভারতীয় উপমহাদেশের জটিল সামাজিক, ধর্মনীতিক এবং রাজনৈতিক দ্বন্ধের পরিমান স্বরূপ বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। যা উত্তরকালে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক ধর্ম রূপে পরিচিতি লাভ করেছে। যা আজও বহমান। লক্ষ্যণীয় যে বৌদ্ধধর্ম কখনই একটি পশ্চাৎপদ ধর্মরূপে আত্মপ্রকাশ করে নি এবং এর মূল কারণ ছিল ভগবান বুদ্ধের ভাষ্য ও মতামত। যেমন -
একাহং জীৰিতং সেয্যো, পস্সতো উদযব্বযং॥।।১১৩, ধম্মপদ, সহস্স বগ্গ, অট্ঠ।
পঞ্চস্কন্ধ (সাংসারিক পদার্থ)'র উৎপাদ এবং বিনাশকে উপলব্ধি না করা (অজ্ঞানী পুরুষ) এর শতবর্ষ পর্যন্ত জীবিত থাকা নিরর্থক হয়। এর অপেক্ষা তার জীবন শ্রেষ্ঠ মনে করা উচিত যিনি এক দিন ও উক্ত পঞ্চস্কন্ধ'র উৎপাদ এবং বিনাশের বাস্তবিকতাকে অবগত করার প্রয়াস করেন।
বুদ্ধোৎপাদঃ সুখঃ প্রোক্তঃ, সুখা সদ্ধর্ম দেশনা। ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাব সকলের ক্ষেত্রে সুখপ্রদ হয়। তাঁর ধর্মদেশনা অপেক্ষাকৃত অধিক সুখপ্রদ হয়।
বৌদ্ধধর্মের মূলে রয়েছে ত্রিরত্ন বা তিনটি আশ্রয় (প্রধান), যার প্রতি ভিত্তি করে একজন বৌদ্ধ মার্গ অনুসরণকারীর উৎকৃষ্ট জীবন গড়ে ওঠে। এগুলি হলো বুদ্ধ, ধম্ম (ধর্ম) এবং সংঘ।
বুদ্ধ : তিনি অর্থাৎ কোনো তথাকথিত ঈশ্বর নন, বরং তিনি একজন 'সম্যক সম্বুদ্ধ' বা বোধিপ্রাপ্ত মানব। তিনি দুঃখের কারণ এবং তা থেকে মুক্তির পথ আবিস্কার করেছেন।
ধম্ম : বুদ্ধ যে শিক্ষা বা প্রাকৃতিক নিয়ম প্রচার করেছেন, তাকেই ধম্ম বলা হয়। এটি অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং জীবনকে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার একটি বাস্তব সম্মত পথ (যেমন আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ)।
'কোনো মানবগোষ্ঠীর বাস্তব ব্যবহারিক জীবন সম্পর্কে তাঁর "ধারণ" "উপলব্ধি" একটা একক চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয় যা তার ব্যবহারিক কার্যকলাপকে নির্দিষ্ট করে এবং নিয়ন্ত্রিত করে। বুদ্ধের মতে এই বিষয়টি হল কার্য কারণ তত্ত্ব।' কেননা বুদ্ধ তৎকালীন সমাজের স্তর বিন্যাস এবং শ্রম বিভাজন এবং তৎ-উদ্ভূত ধ্যানধারণা ও আদর্শবাদের প্রেক্ষাপটেই আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রচলিত দার্শনিক সিদ্ধান্ত (ধর্ম ও শিক্ষা) এই জটিল সামাজিক বিন্যাস ও ভাবনা চিন্তার দ্বারাই সজ্ঞাত হয়েছিল এবং তাকে প্রতিফলিত করেছিল।
ভারতীয় সমাজে 'ঈশ্বরবাদ' এবং তার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা অস্পৃশ্যতা বা শ্রেণী বিভাজনের সূচনা হয়েছিল শ্রেণী উৎপীড়নের অঙ্গ হিসেবে। কিন্তু এর প্রকাশটা ছিল ভয়াবহ এবং সাধারণ শ্রেণী শোষণের অপেক্ষা অধিকতর অমানবিক। এই একবিংশ শতকে উন্নীত হয়েও ভারতীয় সমাজ এই আদিমতা, নানা উদ্ভট বিশ্বাস, ধারণা এবং অনৈতিক আচার-আচারণ হতে মুক্ত হতে পারে নি। ফলে অতীব বিস্ময় ও বেদনার বিষয় এই যে অস্পৃশ্যতা শ্রেণী বিভাজনের চরম অমানবিধ বিধানকে আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্র ও তার তল্পিবাহকেরা পুনঃরায় সমাজের অভ্যন্তরে স্বীকৃতি প্রদানে সচেষ্ট বা তৎপর হয়ে উঠেছে এবং তথাকথিত 'অস্পৃশ্যদের' সঙ্গে পশুর ন্যায় আচরণ করে চলেছে।
বুদ্ধ সমাজের বর্ণভেদ, ভিত্তিক সামাজিক অসাম্যকে স্বীকার করেন নি। তাঁর মতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা মূল্য নির্ধারিত হয় কোন জাতে সে জন্মগ্রহণ করেছে তার দ্বারা নয়, নির্ধারিত হয় তার আত্মিক ও নৈতিক গুণাবলী দ্বারা।
বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্মের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক। বৌদ্ধ মতানুসারে একটা বিবর্তন ও অবক্ষয়ের পর্যায়ক্রমিক চক্রের মধ্যে দিয়েই জগৎ সংসার অগ্রসর হয়। অত্যন্ত লক্ষ্যণীয় বিষয় এই প্রক্রিয়ায় ইশ্বরের অস্তিত্বের কোনো প্রভাব ক্রিয়াশীল বলেও তিনি স্বীকার করতেন না। সৃষ্টিকর্তা বা ইশ্বরের বিষয়টিকে তিনি কাল্পনিক বলেছেন।
জগৎ সংসারের সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে 'দ্বান্দিক বস্তুবাদী' তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধ সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিকাশ সম্পর্কেও যুক্তি পূর্ণ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। বুদ্ধের শিক্ষা অনুযায়ী মানব সমাজ তার লালসাকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে সমাজের বিবর্তন ঘটায় এবং ক্রমে ইশ্বর, জাতপাত, শ্রেণী বৈষম্য যুক্ত সমাজ এবং রাজার আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁর (বুদ্ধ) বক্তব্য অনুসারে মানুষের সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে জাতি বিভাজন এবং রাষ্ট্রের কোনো যথার্থতা নেই। রাজার রাজশক্তি প্রজাদের সঙ্গে এক চুক্তির উপরই নির্ভরশীল। সেই চুক্তি হল প্রজাদের শ্রম শোষণ এবং শাসন। তিনি মৌলিক সাম্যে বিশ্বাস করতেন।
সমাজে পাপ, অপরাধ ও তজ্জনিত সভ্যতা এবং মানুষের সামাজিক অবস্থানের অধঃপতনের কারণ অনুসন্ধান করেছেন বুদ্ধ শাসকের ত্রুটি ও দুর্বলতার মধ্যেই, বিশেষ করে দরিদ্রদের প্রতি মনোযোগের অভাবের ফলেই। পাপ সৃষ্টির ফলে নৈতিকতার অধঃপতন ঘটে এবং তার পরিণতিতে জীবনমানের ও অবক্ষয় হয়। তারপর বিরাজ করে এক নৈরাজ্য। এই কারণেই বুদ্ধ বলেছেন।
হীনং ধম্মং ন সেৰেয্য, পমাদেন ন সংৰসে।
মিচ্ছাদিট্ঠিং ন সেৰেয্য, ন সিযা লোকৰড্ঢনো॥১৬৭, ধম্মপদ, লোকবগ্গ, ত্রয়োদশ।
কোনো হীনধর্ম (লৌকিক পঞ্চ কামগুণ)র আশ্রয়ণ করা উচিত নয়। কোনো কার্যে প্রমাদ যুক্ত হওয়া উচিত নয়। নিজ ধার্মিক চিন্তার মধ্যে মিথ্যাদৃষ্টিকে ভিত্তি রূপে গ্রহণ করা উচিত নয়। মিথ্যা প্রসংসা প্রাপ্তি হেতু লোক অর্থাৎ পৃথিবীতে সাংসরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা সমীচীন নয়।
বৌদ্ধধর্মে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার মূল কারণ ছিল ভগবান বুদ্ধের নারী পুরুষের সমতায় বিশ্বাস এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি সচেষ্ট হওয়া। এক্ষেত্রে ভগবান বুদ্ধের বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত আমরা উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। তৎকালীন সময়ে যে সকল নারী পুরসুন্দরী বা রাজসভায় সভাসুন্দরীর পেশায় লিপ্ত ছিলেন তাদের ভগবান বুদ্ধ সামাজিক দিক হতে হীন (নিম্নতর) বা সমাজচ্যুত রূপে স্বীকার করতেন না। এই রকম একজন নারী আম্রপালী যখন ভগবান বুদ্ধকে তাঁর গৃহে ভোজন গ্রহণের আমন্ত্রণ জানায় তখন তিনি সেই আমন্ত্রণ স্বীকার করেছিলেন। সর্বোপরি বৌদ্ধ সংঘের অভ্যন্তরে এবং বাইরে অনেক নারী তাঁদের নিজস্ব ক্ষেত্রে যথেষ্ট যশ অর্জন করেছিলেন।
বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রের বিশেষ পান্ডিত্যের অধিকারিণী ক্যারোলিন রস ডেভিডস বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে ভগবান বুদ্ধ সংঘের অভ্যন্তরে জাত-পাত, জন্ম, পেশা ইত্যাদির বিচার তো করতেনই না, উপরন্তু সংঘের বাইরেও তিনি এই জাতি ভেদাভেদের বিরুদ্ধে একটা যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের জন্য প্রচার করেছেন। শ্রীমতী রিস ডেভিডস্ সুত্ত নিপাত হতে উদারণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে ভগবান বুদ্ধের যুক্তি ছিল যে কোনো বিশেষ খাদ্য গ্রহণ বা ঐ খাদ্য কার দ্বারা প্রস্তুত হলো, তার উপর অপবিত্রতা নির্ভর করে না, অপবিত্রতা নির্ভর করে দুষ্কর্ম, দুর্বাক্য এবং অন্যায় চিন্তার উপর। ওঁর মতে (শ্রীমতী রিস ডেভিডস্) জাত-পাত সম্পর্কে ভগবান বুদ্ধের মতামত যদি গ্রাহ্য বা গ্রহণ করা হতো তাহলে ভারতের আর্য সামাজিক ইতিহাসের বিবর্তন অন্য পথ গ্রহণ করত এবং জাতিভেদ প্রথা ও নারী সমাজের প্রতি অবিচার ভারতীয় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতো না।
ড. ওল্ডেনবার্গ'এর মতে, 'বুদ্ধের সঙ্গে জাতের ভেদাভেদ ছিল না। যে'ই বুদ্ধের শিষ্য হবে তাকেই জাত ত্যাগ করতে হবে। ওল্ডেনবার্গ বুদ্ধের শিক্ষা থেকে একটি সুন্দর উহাহরণ প্রদান করেছেন। বৃদ্ধ বলেছেন, 'হে ভিক্ষুগণ, যেমন মহা নদ-নদীগুলি, সেগুলি যত বেশী সংখ্যাকই হোক না কেন, যেমন যমুনা, অচিরবর্তী, সরয়ু, মহী, যখন তারা সাগরে পৌঁছায়, তখন তারা তাদের পূর্বনাম এবং উৎস হারিয়ে ফেলে এবং শুধু একটা নাম বহন করে "মহাসমুদ্র"। হে ভিক্ষুগণ, ঠিক অনুরূপ ভাবেই এই চতুবর্ণ যখন তারা পরম ন্যায় পরায়ণ কর্তৃক প্রচারিত মতবাদ ও নিয়মানুসারে তাদের গৃহত্যাগ করে গৃহহীন হয়, তখন তারা পূর্বতন পৈতৃক নাম হারিয়ে ফেলে এবং মাত্র একটি অভিজ্ঞতাই বহন করে "শাকাবংশের পুত্রকে অনুসরণকারী সন্ন্যাসী"। বুদ্ধের মুখ নিঃসৃত এইরূপ আবো নানা বাক্যের উদাহরণ প্রদান পূর্বক ওল্ডেনবার্গ দেখিয়েছেন যে বুদ্ধ জাতের অন্তরায়কে স্বীকার করতেন না।
ভগবান বুদ্ধ ব্রাহ্মণ আধিপত্য এবং অভিজাত তন্ত্রকে সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করেছিলেন। তাঁর মূল কথা ছিল সাম্য, মৈত্রী এবং স্বাধীনতা তিনি শুদ্ধ জীবনযাপনের নিমিত্তে মানুষের নিকট ৮টি পথের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। সেগুলি হলো এইরূপ জীবহিংসা, চুরি এবং ব্যাভিচার হতে নিবৃত্ত থাকা, সত্য কথা বলা এবং ক্রোধ প্রকাশ বা অপ্রয়োজনীয় বাকা প্রয়োগ না করা, ধন সম্পদের প্রতি লোভ এবং ঘৃণা এবং সুকর্ম বা কুকর্মের বিষয়টিকে চিন্তা করা ইত্যাদি। সর্বোপরি ভগবান বুদ্ধ আরও কিছু বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। সেগুলি হলো জীবনধারণের জন্য ন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করা, উপযুক্ত পরিশ্রম করা, আত্মসংযম করা এবং উপযুক্ত চিন্তা ভাবনায় নিজেকে নিয়োজিত করা। কোশাম্বীর মতে, 'সমস্ত ধর্মমতের মধ্যে এটাই ছিল সর্বাপেক্ষা সক্রিয় এবং সামাজিক মতামত এবং তা কোনো সর্বশক্তিমান ব্যক্তিগত ইশ্বর বা কোনো প্রকার যাগ যজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত, তখন তিনি ঈশ্বর আছেন কি নেই এটা নিয়ে গবেষণায় না গিয়ে মানুষকে ন্যায় পরায়ন ও সৎ জীবনযাপনের উপদেশই দিয়েছিলেন।
ন ভজে পাপকে মিত্তে, ন ভজে পুরিসাধমে।
ভজেথ মিত্তে কল্যাণে, ভজেথ পুরিসুত্তমে॥৭৮, ধম্মপদ, পণ্ডিতবগ্গ, যষ্ঠ।
স্বহিতাকাঙ্ক্ষী পুরুষ (ব্যক্তি) পাপী মিত্রের সাথে সম্পর্ক করা উচিত নয়, অধম পুরুষের সঙ্গেও সম্পর্ক করা সমীচীন নয়; অপিতু কল্যাণকারী মিত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক করা উচিত, উত্তম পুরুষের সাথে সম্পর্ক করা উচিত।
মনুষ্যের জীবনে উত্তম কল্যাণ মিত্রের সাহচর্য লাভ অত্যন্ত দুর্লভ। ফলে অতিদ্রুত সে পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত হয় এবং বিবেক শূন্য হয়ে পড়ে। ভগবান বুদ্ধ সেই কারণেই মুর্খ, অকৃতজ্ঞ এবং দুর্জন ব্যক্তির সঙ্গ পরিত্যাগ করতে বলেছেন।
ভগবান বুদ্ধ বলেছেন যে, সতা উপলব্ধি ব্যতীত প্রকৃত শান্তি সম্ভব নয়। মনুষ্য যখন নিজের ভুল, ভয় এবং মোহকে স্বীকার করে, তখনই জ্ঞানের মার্গ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
সত্যকে ধারণ করার অর্থ হল নিজের মনকে নির্মল করা। এতে লোভ, ক্রোধ এবং অজ্ঞতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, মুক্তি বাহিরের কোথাও নয় এটি নিজের চেতনার অভ্যন্তরেই নিহিত আছে। সৎ চিন্তা এবং সৎকর্ম সেই মুক্তির
যে ব্যক্তি সত্যের পথে স্থির থাকে, তার মন শান্ত ও স্থিতিশীল হয়। এই স্থিরতাই দুঃখ হতে মুক্তির শক্তি প্রদান করে।
তাই সত্যকে গ্রহণ করার অর্থ হল নিজের জীবনকে আলোকিত করা। এই অলোই মনুষ্যকে আত্মজয় এবং প্রকৃত স্বাধীনতার পথে নিয়ে যায়।মাৰমঞ্ঞেথ পাপস্স, ন মন্তং ন মত্তং আগমিস্সতি।উদবিন্দুনিপাতেন, উদকুম্ভোপি পূরতি।
বালো পূরতি, পাপস্স, থোকং থোকম্পি আচিনং॥১২১, ধম্মপদ, পাপবগ্গ, নবম।
কোন মানুষের সাধারণ পাপকে এই কারণে অবহেলা করা উচিত নয় যে এইটি সাধারণ, এর দুষ্পরিনাম কি হবে। কারণ, আমরা দেখতে পাই যে বিন্দু বিন্দু জল দ্বারা একটি জলপাত্র (ঘড়া) পূর্ণ হয়ে যায়, ঠিক সেইভাবে মূর্খজন দ্বারা সংঘঠিত সামান্য পাপকর্ম ও সময় উপস্থিত হলে, বৃহৎ আকার ধারণ করে।
বৌদ্ধ ধর্ম, ধর্ম হলেও এটি একটি দর্শন। এ দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিশ্বশান্তি এবং মানবিকতা। এক্ষেত্রে বৌদ্ধ দর্শন চর্চার ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই চর্চা মনুষ্যকে আলোকিত জীবন গঠন ও মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ্যে সাহায্য করে। মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষার অনুশীলন দ্বারা মানবতা, মানবিক বিশ্ব ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাই হলো বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য।
আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানের বস্তুকেন্দ্রিক উৎকর্ষ মনুষ্যের সুখ-স্বাচ্ছন্দ, আরাম বিলাসিতাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। দেশ হতে দেশান্তরের সীমা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে মহাশূণ্যের অন্বেষণে। কিন্তু বিজ্ঞানের সীমাহীন উন্মেষ সাধনের মাঝেও মানুষের মনের ভারসাম্য এবং মাসিক শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে। এ সমস্যা হতে উত্তরণের জন্য, অশান্ত বিশ্বে শাস্তি, মনুষ্য জীবনে অনাবিল সুখ প্রতিষ্ঠায় বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের মৈত্রী, করুণা, মুর্দিতা, উপেক্ষা অনুশীলন একান্ত প্রয়োজন। মনুষ্য সমাজে বিরাজমান উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, যুদ্ধ হানাহানি, শত্রুতা, অনৈক্য দূর করতে হলে এই ভাবনা অনুশীলনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অভূতপূর্ব উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক বিশ্ব নানা সমস্যায় জর্জরিত। পুঁজিবাদী চিন্তা চেতনা, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি, দেশ, বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, স্বার্থান্ধতার কারণে মনুষ্য জীবনে অশান্তি বিরাজমান।
বর্তমান বিশ্বে বিদ্যমান অন্যায়, অমানবিকতা, অশান্তি, ভেদাভেদ, সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে ভগবান বুদ্ধের সিদ্ধান্তের অনুশীলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শত্রুর প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করতে হবে। অহিংসা, সাম্যভাব, দয়া, ত্যাগ, সাধনা অনুশীলন দ্বারাই প্রকৃত মানবতার উদ্ভব এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়। ভগবান বুদ্ধের জীবনে ও আমরা দয়া, মৈত্রী এবং ক্ষমার পরিচয় পেয়ে থাকি। তাঁর মৈত্রী গুণ ছিল অপরিসীম। পালি ত্রিপিটক সাহিত্যে এর স্বপক্ষে নানাবিধ উদাহরণ এবং কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে।
অৰেরেন চ সম্মন্তি, এস ধম্মো সনন্তনো॥ ৫, ধম্মপদ, যমকবগ্গ, প্রথম।
পৃথিবীতে শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না। মিত্রতা বা বন্ধুত্বের দ্বারা শত্রুতার উপশন হয়। এটাই 'সনাতন' ধর্ম।
আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন মনুষ্যের মঙ্গল এবং মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্যই উদ্ভূত হয়েছে। বিশ্ব সভ্যতায় মানবতার প্রবক্তা ভগবান বুদ্ধ এবং মানবতা সতত প্রকাশ মান বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শনে। বৌদ্ধ দর্শন যে সম্পূর্ণরূপে মানবিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে মুক্তির পথ দেখিয়েছে তা চিরন্তন ও শাশ্বত।
একবিংশ শতকে উপনীত হয়ে আমরা পুঁজিবাদ তথা সাম্প্রাজ্যবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধের পরিনাম স্বরূপ ক্রমশই অসহায় হয়ে পড়েছি। এক সর্বগ্রাসী যুদ্ধের উন্মাদনা আমাদের কর্ম জীবনকে নিয়ে চলেছে চরম অনিশ্চয়তার পথে। মনুষ্য সভ্যতার এই অনাকাঙ্খিত পরিণতি সমাজের সম্মুখে উপস্থিত করেছে ভয়াবহ অবক্ষয়। অপরদিকে মানবিক অধিকার এবং মূল্যবোধকে করেছে বিপর্যস্ত।
'কংকাল গাছ হাতছানি দেয়,
প্রখর রৌদ্রে
মরুভূমি আমাদের ঘেরে;
রসহীন ফণিমনসায়, রুক্ষ বালুতে
প্রাণের প্রতিরোধে চক্রান্ত চলে।' সমর সেন, শবযাত্রা।
এই বিপর্যস্ত জীবন হতে মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় মনুষ্য চিত্তের পরিশুদ্ধি। এছাড়া বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মৈত্রীর গুণ ও শক্তি অতুলনীয় এবং অচিন্তনীয়। এই মৈত্রী ভাবনা দ্বারা মনুষ্যের অন্তর কলুষ মুক্ত হয়, পাপযুক্ত হয়, হিংসামুক্ত হয়, দ্বেষচিত্ত মুক্ত হয়, তাদের চিত্ত ক্ষমা এবং প্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। বৌদ্ধ দর্শনে রয়েছে, 'সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্ত'। অর্থাৎ বিশ্বের সকল প্রাণী সুখী হোক। ভগবান বুদ্ধ সকল প্রাণীর প্রতি অপার মৈত্রী প্রদর্শনের শিক্ষা প্রদান করেছেন। মৈত্রীচিত্ত ধারণ পূর্বক অবস্থান করা মনুষ্যের জন্য অত্যন্ত লাভদায়ক হয়। এরূপ বসবাস করলে মনুষ্যের চিন্তায় কোনোভাবেই উত্তেজনা এবং হিংসা ভাবের উদ্রেক হয় না। এর ফলে সকলেই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। ভগবান বুদ্ধ অপ্রথেয় মৈত্রীভাবকে সর্বদিকে সর্বতোভাবে প্রসারিত করার জন্য উপদেশ প্রদান করেছেন।
আমাদের স্মরণে রাখতে হবে যে সর্ব জীবের প্রতি নিঃস্বার্থ প্রিয়তা, আদর, স্নেহ ইত্যাদি প্রদর্শনই হলো মৈত্রী। এর স্বরূপ কি? জীব-জগত প্রত্যেক জীবের নিজের প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়বস্তু আর কিছুই নেই। সুতরাং নিজেকে, নিজের প্রাণকে প্রত্যেকে যেমন ভালোবাসে, আদর-যত্ন করে, সর্বতোভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করে, জগতের জীবমাত্রেই তেমন নিজের প্রতি, নিজের প্রাণের প্রতি মমতা রাখে। এটা'ই পরম মৈত্রী এবং মৈত্রীতে লোভ থাকে না, হিংসা বা দ্বেষ থাকে না, নিঃস্বার্থতার পরিপ্রেক্ষিতে মোহ থাকে না, শুধু অনবিল প্রশান্তভাব তখন চিত্তের মধ্যে বিরাজ করতে থাকে। এই মৈত্রী শুণে ক্রোধ পরিত্যক্ত হয়, ক্ষমাশীল হয় এবং জীবের প্রাণে জাগিয়ে তোলে প্রশান্তির পবিত্র আনন্দ। অতএব মৈত্রীময় ধর্ম শুধু মৌখিক বচনসার মাত্র নয়, নীতি আচরণে, অনুশীলনে, পালনে, রক্ষণে মৈত্রী সুপরিস্ফুট হয়ে থাকে। ক্রোধ ও মোহের মূল লোভ, লোভহীন হৃদয় দয়ার উৎস এবং করুণার নির্বারিণী। এ দয়ায় জীব জগতে অনীত হয় সাম্য মৈত্রী।
সাম্য মৈত্রীই মুদিতার অর্থাৎ অপরের সুখে সুখী হওয়ার সুযোগ প্রদান করে থাকে। উপর্যুক্ত বক্তব্যকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, সর্ব প্রাণীর প্রতি সমতাময় চিত্ত জাগ্রত করার অর্থই হল মৈত্রী। দয়া, পরোপকারিতা, সেবার সদিচ্ছা ইত্যাদি মৈত্রীর পর্যায়ভুক্ত। সুতরাং মৈত্রীর অনুসারী হলে দ্বেষ, ক্রোধ ও অহংবোধকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে। সকল প্রকার প্রাণীকে আপনবোধে অপ্রমেয় প্রেমে সিক্ত হতে হবে। দান, ধর্ম, সহযোগিতা এবং পরোপকারিতা ইত্যাদিতে স্বতস্ফুর্তভাবে উদ্যার্থী হতে হবে। তাহলেই মৈত্রী চর্চা পূর্ণতা প্রাপ্ত হবে।
হিংসা, বিদ্বেষ হলো মৈত্রীর বিপরীত দিক। বিদ্বেষ পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও ঘৃণা জন্মায়। ফলে হিংসার দাবানল জ্বলে ওঠে। এর ফলে মনুষ্যের অর্থাৎ আমাদের মন হিংস্র পশুর চেয়েও খারাপ হয়। বৈশ্বমৈত্রী ভাবনা হিংস্রতা ও গ্লানি হতে মনুষ্যের মনকে মুক্ত করে। একে অপরের সম্পর্ককে মধুর করে এবং পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখে। মন আকাশের মতো উদার, অসীম, শান্ত ও স্নিগ্ধ হয়। মৈত্রী চিন্তা মানসিক ক্ষিপ্ততা, রুক্ষ্মতা ও কঠোরতা বর্জন যে দ্বেষ উৎপন্ন হয়, মৈত্রী চিন্তা তাকে সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে। পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় সৌম্য রূপ ধারণ করে। এ চেতনা সর্ব প্রকার কলুষ থেকে মনকে বিমুক্ত ও করে। জীবের হিতসুখ কামনা মৈত্রী। এর আলম্বন হলো প্রাণী। সর্বসত্ত্বের সঙ্গে একাত্মবোধই হলো মৈত্রীর বিকাশ।
সর্বজীবের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা এবং মঙ্গলাকাঙ্খাই মৈত্রী নামে অভিহিত। মৈত্রী দ্বেষকে ধ্বংস করে। নিঃস্বার্থ পরোপকার 'এর স্বভাবই হয় মৈত্রী। যদিও এর প্রকাশ সকল মনুষ্যের মধ্যে সমান নয়। মৈত্রী মনুষ্যের সঙ্গে মনুষ্যের সম্পর্ককে ঘণিষ্ঠ করে তোলে। প্রেমের অনাবিল পরিবেশের মধ্যে শাস্তির স্পর্শ হয় নিবিড়। মৈত্রী ভাবনার মূল লক্ষ্য হলো ক্রোধ এবং হিংসা পরিহার করা। ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করলে অবগত করা যায় যে, সম্রাট 'চন্ডাশোক' এক সময় নিষ্ঠুর এবং কঠোর স্বভাব যুক্ত ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু বৌদ্ধধর্ম তাঁকে 'ধম্মাশোক' এ পরিণত করেছিল।অপ্পমাদো অমতপদং, পমাদো মচ্চুনো পদং।
অপ্পমত্তা ন মীযন্তি, যে পমত্তা যথা মতা॥২১, ধম্মপদ, অপ্পমাদবগ্গ, দ্বিতীয়।
অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ, প্রমাদ মৃত্যুর পথ, অপ্রমাদ পরায়ন ব্যক্তিরা অমর এবং প্রমাদ পরায়ণ ব্যক্তিরা জীবিত থেকেও মৃত। ভগবান বুদ্ধ জগতের সকল প্রাণীর প্রতি অপার মঙ্গল, মহামৈত্রী বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজীবে দয়া, বিশ্বশান্তি এবং মানবতা। এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো বিশ্ব মৈত্রী ব্যতীত বিশ্বশান্তি, মানবিক বিশ্ব, ন্যায় ভিত্তিক, সামাভিত্তিক, প্রবঞ্চনামুক্ত সুষম মনুষ্য সমাজ বিনির্মান করা আদৌ সম্ভব নয়। সুতরাং মৈত্রীর চর্চা এবং বিকাশ একান্ত প্রয়োজন। এ মৈত্রীই হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, দুনীর্তিমুক্ত মানবিক সমাজ বিনির্মান ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রশ্নে ভগবান বুদ্ধ উপদিষ্ট বিশ্বমৈত্রী ভাবনার বিকল্প আর কিছুই নেই। বাক্তিতে ব্যক্তিতে সম্পর্কের অটুট বন্ধনের জন্য সুখী পরিবার গঠনে, বিভিড়ন দেশের মধ্যে, সর্বক্ষেত্রে সুসম্পর্ক ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ক্ষেত্রে ভগবান বুদ্ধ প্রদত্ত মৈত্রী শক্তির প্রভাব অতুলনীয়।
পরিশেষে আমি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত উক্তি প্রদানের ধ্যমে আমার বক্তব্যটির সমাপ্তি ঘোষণা করছি। 'সত্যের ধর্ম বলতে বোঝায় মনুষ্যের মধ্যে যে সত্য তাঁরই ধর্ম, মানুষ্যের মধ্যে যে মহৎ, গুণী তাঁরই ধর্ম।" অর্থাৎ মনুষ্যের ধর্ম, শ্রেষ্ঠ মানব-স্বরূপের ধর্ম।
Yours in Dhamma
sd/-
Sumanapal Bhikkhu
(Dr. Subhasis Barua)
50T/1C, Pandit Dharmadhar Sarani,
Kolkata-700015.
+91 8910675412
No comments:
Post a Comment