প্রসঙ্গ দলিত ইতিহাস, সাহিত্য একটি পর্যালোচনা
সুমনপাল ভিক্ষু
"চিরকালই মানুষের সভ্যতায় একদল অখ্যাত লোক থাকে, তাদেরই সংখ্যা বেশি, তারাই বাহন; তাদের মানুষ হবার সময় নেই; দেশের সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা পালিত। ...সকলের চেয়ে বেশি তাদের অসম্মান।... উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে।" -রাশিয়ার চিঠি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; পৃ.: ১।
ভারতীয় উৎপাদক শ্রেণী হল উচ্ছিষ্ট-জীব এবং সর্বাধিক অসম্মানিত, সামাজিক প্রতিষ্ঠার অধিকারে তারা চিরবঞ্চিত। তথাকথিত জাতির অহংকারে তারা ঘৃণিত। হিন্দু সমাজের (?) বর্ণবাদী ব্যবস্থা তাদের করেছে চরণে দলিত। মনুসংহিতার মতে - এই সকল শূদ্রদের পবিত্র এবং মূল কর্ম হল উচ্চবর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য) সেবা করা। অর্থাৎ দাসত্বই হল তাদের পুণ্য শাস্ত্রাধিকার; বিদ্যার্জন, অস্ত্রশিক্ষা ও অর্থসংগ্রহ তাদের জন্য পাপ। সুতরাং ধর্মীয় অনুশাসন অর্থে তারা অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য, মন্ত্রহীন, ব্রাত্যজন অর্থাৎ বর্ণে চতুর্থ (শূদ্র বা ভারতীয় দাস সমাজ)।
হিন্দুদের পূজিত মহাকাব্য রামায়ণের শূদ্র উপাসক বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ এবং অনুশীলনের অপরাধে রামচন্দ্রের হাতে নিহত হয়েছিলেন। মহাভারতের একলব্য নিষাদ জাতির কারণে হারিয়েছিলেন অঙ্গুলি। বিদ্যা, ভূমি এবং বাণিজ্যের অধিকার প্রসঙ্গে ড. বি. আর. আম্বেদকর বলেছেন, "পৃথিবীর সব দেশের জনসমাজে দাস বা নীচু শ্রেণী বলে এক শ্রেণী ছিল বা আছে। রোমানদের ছিল ক্রীতদাস, স্পার্টানদের সেবাদাস, ইংরেজদের ভূমিদাস, ... আর হিন্দুদের আছে অস্পৃশ্য। অস্পৃশ্যরা শুধু ঘৃণিত নয়, জীবনে উন্নতি করার সমস্ত সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।"
ভারতবর্ষে বর্ণ এবং শ্রেণী পরস্পর পরিপূরক। ফলে শ্রেণী শোষণ অগনিত মানুষকে করেছে চিত্তহীন। ধর্মমোহ, শ্রেণী ও বর্ণের সমন্বয়ে ভারতবর্ষে বিরাজিত রয়েছে অর্ধেক সামন্ততন্ত্র এবং অর্ধেক উপনিবেশ। ধর্মশাস্ত্র সনাতনী জাতিব্যবস্থা ইত্যাদি হল উচ্চবর্ণের পবিত্র রাজদণ্ড। সুতরাং আক্ষরিক অর্থে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুসমাজ আজও মনুবাদের শাসনের বন্ধনে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ। ফলে ভারতবর্ষে 'পশ্চাৎবর্তিতা' রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি পরিপূরক অঙ্গ রূপেই গৃহীত হয়েছে। সেখানে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার বিষয়টিই প্রশ্নচিহ্ন হয়েই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় হিন্দুসমাজ বহুধা বিভক্ত এবং সম্পূর্ণ অর্থে সামন্তবাদী অর্থব্যবস্থা নির্ভর। ফলে এদেশের অর্থব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হল কৃষিনির্ভর এবং সেখানে পুঁজির প্রবেশ সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত মুক্ত।
ভারতবর্ষে হিন্দুধর্ম বিকাশের প্রশ্নে অপর যে বৈশিষ্ট্য প্রাধান্য লাভ করেছে এবং যা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে দৃষ্ট হয় না তা হল হিন্দুসমাজের জাতিভেদ। একই ধর্ম-বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত হয়েও মানুষের মধ্যে সৃষ্ট হয়েছে উচ্চ-নীচ জাতিভেদ। শুধু জাতিভেদই নয়, এমনকি নিম্নতর জাতের মানুষের হিন্দুধর্মের আদি গ্রন্থ বেদ (?) পাঠ এবং শ্রবণ সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। একই ধর্মীয় সমাজের অভ্যন্তরে এমন ভেদাভেদ এবং তথাকথিত উচ্চ দ্বারা তথাকথিক নীচকে ঘৃণা - বিশ্বের অন্য কোনো ধর্মেই এর কোনো তুলনা নেই। এর ফলাফল কেবলমাত্র প্রাচীন বা মধ্যযুগে নয়, বর্তমান যুগেও অতি উৎকট এবং প্রকট রূপেই প্রকাশমান শুধু সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই জাতিভেদ প্রথা ও অস্পৃশ্যতা তীব্রভাবে ক্রিয়াশীল। এর পরিণতিতে শুধু সামাজিক সমস্যাই নয়, ভারতে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জটিলতাও সৃষ্টি হয়েছে।
প্রসঙ্গত মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষের উপর ধর্মের প্রভাব পৃথিবীর সর্বত্রই একটি বাস্তব সত্য। সভ্যতার উদ্ভব তথা বিকাশে মানুষের মনে ধর্মভাবনার উদয় এবং তার কঠোরতা প্রাপ্তি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। মানুষের বিচার, বুদ্ধি ও মুক্তির প্রাথমিকতম পর্যায়ে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে অথবা সমঝোতায় যে ঈশ্বরচিন্তা এবং ধর্মভাবনার উদয় হয়েছিল, তা মানুষের জ্ঞান ও বিজ্ঞান তথা যুক্তিবাদের উৎকর্ষের যুগে প্রবলভাবেই বিদ্যমান।
মানব সভ্যতার বিকাশে নানাবিধ ধর্মের যে উদ্ভব ঘটেছিল প্রাথমিক স্তরে সেই ধর্মমতগুলির অন্যতম ভূমিকা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল সমাজের দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে। কিন্তু সমাজে শ্রেণী বিভাজনের তীব্রতায় সেই ধর্মমতগুলি প্রধানত সমাজের সুবিধাভোগী ও শাসক সম্প্রদায়গুলির দ্বারা আপন স্বার্থরক্ষাতেই সম্পূর্ণ রূপেই ব্যবহৃত হয়েছে। সমাজের নিষ্পেষিত মানুষদের ধর্মভাবনা তথা ঈশ্বরচিন্তায় আচ্ছান্ন করে রেখে উচ্চবর্ণের সুবিধাভোগীরা ধর্মকে অত্যন্ত স্থূলভাবে শোষণ এবং বঞ্চনার অস্ত্ররূপে ব্যবহার করেছে। ফলে ধর্মভাবনা অধঃপতিত হয়েছে ধর্মান্ধতায়।
ভারতবর্ষেও এই প্রক্রিয়ার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। ঐতিহাসিক ভাবেই তা সম্ভব নয়। কারণ ইউরোপের ন্যায় ভারতে কোনো বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হয়নি। ফলে ভারতে ধর্মান্ধতা, বিদ্বেষ ও সংঘর্ষ এবং তৎ-সহ জাত-পাত ও অস্পৃশ্যতার বিভেদ বাস্তবে শ্রেণী সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষাকেই স্তিমিত করেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। এর ফলে লাভবান হয়েছে সুবিধাভোগী ও শোষকশ্রেণী। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিপীড়িত ও শোষিত শ্রেণী।
অন্ধবিশ্বাস ও যুক্তিবাদ দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থিত। প্রাচীন ভারতে যুক্তিবাদী তথা বিজ্ঞানমনস্ক দর্শনের উদ্ভব হলেও সে দর্শন কালক্রমে বহির্বিশ্বে সম্প্রসারিক হলেও এদেশ হতে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে ধর্মান্ধতা, জাত-পাত ও অস্পৃশ্যতাই হয়ে ওঠে ভারতবর্ষের বস্তুগত আধার। তথাকথিত স্বাধীনতা এবং তার পরবর্তীকালে এদেশে গণতান্ত্রিক-মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্নে কোনোরূপ সদর্থক ভূমিকা (পদক্ষেপ) গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মধ্যযুগীয় কুৎসস্কার ও ধর্মান্ধতা আজও বিরাজমান এবং বর্তমানে তা তীব্রতার অভিমুখী।
তবে এই বিষয় সম্পর্কিত আলোচনা-পর্যালোচনা ইত্যাদী বিষয়গুলির গভীরে প্রবেশ না করলে এই দুঃসহ ও জটিল অবস্থার কার্যকারণ বিশ্লেষণ তথা ইতিহাসকে অবগত করা সম্ভব নয়। সর্বোপরি এই বিষয় সমূহের সঙ্গে সম্পৃক্ত 'দলিত' শব্দের ব্যাখ্যা, অবস্থান আন্দোলন ও তার পটভূমি এবং দলিত সাহিত্য বিষয়ক আলোচনাগুলিও অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই এই সীমিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমগ্র বিষয়গুলিকে ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হল।
'কোন এক যুগে কোনো এক একদিন/আসবে উল্টোরথের পালা তখন আবার নতুন করে নতুন যুগের উঁচুতে নীচুতে হবে বোঝাপড়া।...যারা একদিন ম'রে ছিল তারা উঠুক বেঁচে, / যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে,/ তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।" -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবিতা: রথের রশি ১৯০৯।
প্রাচীন ভারতের সমাজব্যবস্থা ও জাত-প্রথা :
ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনতম কালপর্ব অর্থাৎ ইতিহাস পূর্ব যুগটি এখনও তমসাচ্ছন্ন। প্রকৃত অর্থে একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতিরেকে সেই যুগকে স্বচ্ছরূপে ব্যাখ্যা করা সম্ভবপর নয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে ভারতে ইতিহাস পূর্ব প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন হল মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা। এই সভ্যতার অবস্থানকাল ছিল খ্রীঃপূর্ব ২৭৫০ (অনেকের মতে খ্রী: পূর্ব ৩০০০) বৎসর। সিন্ধু নদের অববাহিকা অঞ্চলেই ভারতের এই প্রাচীনতম সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।
মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক এবং আধুনিক। বসতগৃহ, স্নানাগার, সড়ক পথ, পয়ঃপ্রণালী-এমনকি ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের কূপ, শয্যাগার, তুলা এবং পশমের পোশাক, নানাবিধ মৃৎপাত্র, অলংকার, পশুচালিত শকট, মহিলাদের বিলাসব্যসনের সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, ধাতু নির্মিত শিল্পকৃতি, অস্ত্র, ওজন পরিমাপক, সিলমোহর, মুদ্রা, মৃৎশিল্প ইত্যাদি এই সভ্যতার অঙ্গ ছিল। বহির্বাণিজ্য এবং শুল্ক আদায় পদ্ধতিও এই সভ্যতায় দৃষ্ট হয়। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে-এই সভ্যতায় ব্যবহৃত লিপিসমূহ আজও পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি।
উপজাতিগুলির রাজনৈতিক সংগঠনের নানাবিধ ধরন ও সামগ্রিকভাবে তাদের দ্বারা সাংগঠনিক ঐতিহাসিক বিকাশের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে পার্থক্য এতই সুবিশাল ছিল যে সেটিও এক্ষেত্রে বিশেষ জটিলতা সৃষ্টি করে।
যদিও তথাকথিত মহাকাব্যিক পৌরাণিক যুগে আর্যদের মধ্যে শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উৎপত্তি ঘটেছিল, তবে প্রথম পর্যায়ে বৈদিক আর্যরা কিন্তু ছিল উপজাতিগত সংগঠনের এশিয়াস্তরের।
ক্রমে সম্পত্তির বিবর্তন এবং সামাজিক পদমর্যাদার উপর ভিত্তি করে উদ্ভূত অসাম্য যত দৃঢ় হতে লাগল, উপজাতি গোষ্ঠীগুলিও সেইরূপ স্তরে স্তরে বিন্যস্ত হয়ে পড়ল। অতএব সেই শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রগুলি উন্নীত হল রাষ্ট্রীক ক্ষমতায়। যে কারণে উপজাতি গোষ্ঠীর নেতারা স্বয়ং নিজেদের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করল। সর্বোপরি এই পদের সঙ্গে যুক্ত হল বংশমর্যাদা বা রক্তের সম্পর্ক। এইভাবে উদ্ভব হল জনপদ গঠন ও রাজ্য বিস্তার।
বৈদিক যুগে আর্যদের দ্বারা বিজিতদের দাস রূপেই গণ্য করা হত। বেদোক্ত বিভিন্ন তথ্য হতে জানা যায় যে দাসরা দাসমালিকদের বংশানুক্রমিক সম্পত্তি ছিল এবং বিবাহাদি তৎকর্মে দাস-দাসীদের উপহাররূপে ব্যবহার করা হত। তবে প্রশ্ন আসতেই পারে যে এই 'দাস' বলতে প্রকৃতঅর্থে ঠিক কোন শ্রেণীর জনগণকে বোঝানো হত?
ঐতিহাসিকগণের অভিমত হল, আর্যগন ছিল বহিরাগত। পণ্ডিত ধর্মানন্দ কোশাম্বির মতে, 'যে জনগোষ্ঠী সর্বপ্রথম বেদকে তাদের পবিত্র পুঁথি বলে মনে করে, যারা প্রথম ছান্দস ভাষায় কথা বলে এবং ইন্দ্রকে প্রধান হিসাবে রেখে একটি বিশেষ দেবতা গোষ্ঠীর উপাসনা করে, তারাই নিজেদের আর্য রূপে পরিচয় দিত। আবার কিছু পণ্ডিত ব্যাখ্যা করে বলেছেন, একমাত্র যে সকল জনগোষ্ঠীকে আর্য অভিহিত করা চলে তারা হল প্রাচীন ইরানীয় ও প্রাচীন ইন্দো-আর্যজনগোষ্ঠী। বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ইউলিয়াম জোনসের মতে এই জনগোষ্ঠীর পূর্বভূমি ছিল দানিউব ও অক্সাস নদীর মধ্যবর্তী কোনো একটি অঞ্চল। তবে যে মতটি বহুলভাবে স্বীকৃত তা হল দক্ষিণ রাশিয়ার স্তেপ অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। সম্ভবত খ্রী:পূর্ব ১৭৫০ বা তার কিছু পরে আর্যরা ভারতে (উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল হতে প্রবেশ করতে থাকে)।
জীবনপ্রণালীর গুণগত মান অনুসারে আর্যরা সিন্ধুসভ্যতার জনগণের তুলনায় অনেক পশ্চাৎপদ হলেও তারা অশ্ব এবং লৌহের ব্যবহার সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত ছিল। ফলে সমরবিদ্যায় অত্যন্ত কুশলী হওয়ার কারণে তারা নগর সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। অবশ্য এ অভিমতও সর্বগ্রাহ্য নয়। কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ফলে যে কাল পরম্পরা সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গেছে, তার থেকেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে সিন্ধু সভ্যতা ইন্দো-আর্যদের ভারতে আগমনের বহু পূর্বেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।
আর্যদের ধর্মীয় ভাবনা এবং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহ :
আর্যদের ধর্মীয় ভাবনা মূল উৎস হল বেদ। বেদ হতে আর্যদের সম্পর্কে বহু তথ্য অবগত করা যায়। বর্তমানে হিন্দুদের নিকট অত্যন্ত পবিত্রতম গ্রন্থ-বেদ।
অতি সংক্ষেপে বেদ এবং অন্যান্য বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলির পরিচয় নিম্নরূপ:
ক) চর্তুবেদ'র মধ্যে ১০১৯ মন্ত্র বা স্তোত্র সমন্বিত ঋগ্বেদ সংহিতাই হল সর্বাপেক্ষা প্রাচীনতম। তবে ঋগ্বেদ কেউই এককভাবে রচনা করেনি। অনুমান করা যায় যে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি পুরোহিত পরিবার পর্যায়ক্রমে এই ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলি রচনা করেছিলেন। অগ্নি, পবন, বরুণ এবং অন্যান্য দেবতাদের উদ্দেশ্যেই এই স্তোত্র রচিত হয়েছিল।
খ) সামবেদ স্পল্পসংখ্যক স্তোত্র সংবলিত এবং কিছু ঋগ্বেদের স্তোত্র পুনরাবৃত্তি।
গ) যজুর্বেদও প্রধানত ঋদ্বেদের বেশ কিছু মন্ত্রের সমন্বয়। শাস্ত্রীয় আচার পদ্ধতি তথা ঋগ্বেদে উল্লিখিত যজ্ঞ, উৎসর্গ ইত্যাদি অনুষ্ঠান পদ্ধতির নির্দেশাবলী এতে প্রদান করা হয়েছে।
ঘ) অথর্ব বেদের স্তোত্রগুলি গদ্য এবং পদ্যে রচিত। এই বেদে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মন্ত্র ইত্যাদি বিষয় সংকলিত রয়েছে।
ব্রাহ্মণসমূহ বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং যাগ-যজ্ঞ ইত্যাদির অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কিত বিভিন্ন টীকা সংবলিত। আরণ্যকসমূহ বাণপ্রস্থ অবলম্বনকারী মানুষদের নিয়ম-নীতিমালা ইত্যাদি বিষয় উদ্দেশ্যে রচিত। সূত্রগুলি হল ব্রাহ্মণসমূহের মূল বক্তব্যের সূত্রায়িত সারাংশ। শ্রৌত সূত্রগুলি বিস্তৃত যাগযজ্ঞ সম্পর্কেই রচিত। গৃহ্য-সূত্রগুলি সংস্কার, পর্যায়কালীন ধর্মানুষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল।
উপনিষদের বিষয়বস্তু হল জীবন, মৃত্যু এবং বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কিত ভাববাদী চিন্তা। তবে বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী পুঁথিগুলি (সংহিতা, আরণ্যক ও ব্রাহ্মণসমূহ) সম্ভবত খ্রীঃ পূর্ব ৮-৬ শতককালে রচিত হয়েছিল।
আর্যদের ধর্মচিন্তা ও ঈশ্বর কল্পনার মূল ভিত্তি হল ঋগ্বেদ। ঋগ্বেদের একাধিক স্থানে দেবতাদের সংখ্যা সম্পর্কিত উল্লেখ রয়েছে। যেমন-দুটি ঋকে (৩/৯/৯৩১০/৫২/৬) এই দেবতাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়েছে ৩৩/৩৯। আবার ঋগ্বেদেই (৮/২৮/১) ৩৩টি দেবতারও উল্লেখ পাওয়া যায়। এই দেবতাগুলির মধ্যে অন্যতম হল দ্যৌ, ইন্দ্র (পুরন্দর), বরুণ, সূর্য, পৃথিবী, অগ্নি ইত্যাদি। এই সকল দেবতা ব্যতীত আরও অনেক উপদেবতার অস্তিত্ব বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখিত আছে। কালক্রমে এই সকল দেবতার পরিবর্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর এবং দেবীরূপে মহালক্ষ্মী, উমা বা পার্ব্বতী স্বরসতী-সহ নানাবিধ দেব-দেবী মূর্তি পূজিত হতে থাকে।
মূলকথা হল বৈদিক আর্যদের যুগে ধর্মমোহ মূলত পৃথিবী ও পার্থিব জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও পুরোহিত তন্ত্রের উদ্ভব-বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি এবং বিভিন্ন রহস্যবাদী তত্ত্বের বিকাশ লাভ সম্ভব হয়েছিল এবং এর পরিণাম রূপে পুরুষ সুত্তটির (ঋগ্বেদের দশম মণ্ডল) উদ্ভব হল। এই সুত্তের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হিন্দু সমাজের বর্ণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) বিভাজন। সর্বোপরি এর সঙ্গে যুক্ত হল কর্মফল, আত্ম-পরমাত্মা, অভিশাপ, শাস্ত্রাচার, যাগযজ্ঞ, পশু ইত্যাদি আহুতি দান, আশির্বাদ ইত্যাদি নিতান্ত অদ্ভুত কল্পনাবিলাসী তত্ত্ব। ফলে ব্রাহ্মণ তথা পুরোহিত তন্ত্র সমাজে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হল।
হিন্দুধর্মের উত্থান এবং বর্ণাশ্রম প্রথা :
পুরুষ সুক্তের (ঋগ্বেদ) বিষয়গুলির অভ্যন্তরেই হিন্দুধর্ম ও তার সমাজের বিকাশ তথা বৈশিষ্ট্য নিহিত ছিল। পরবর্তীকালে বৃহদারণ্যক উপনিষদ এই বৃত্তটি সম্পূর্ণ করল। বেদ বা ব্রাহ্মণে আর্যদের নিত্যনৈমিত্তিক গার্হস্থ্য উপাসনা বা যজ্ঞাদি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তৃত কোনো তথ্য প্রদান করা হয়নি। কিন্তু পরবর্তী শাস্ত্র গৃহ্য-সূত্র ধর্মীয় আচরণ বিধি এবং দেব-দেবীর পূজা অর্চনার পদ্ধতি পাশাপাশি অন্ধবিশ্বাস ও ভক্তির বিষয়টিও সংযুক্ত হল। নির্মিত হল বিধি-নিয়ম, আচার-অনুষ্ঠান পর্ব।
'ব্রহ্মণ' শব্দটি প্রথমে একটি জাদুশক্তি রূপেই পরিচিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে 'ব্রহ্মণ' শব্দটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্তর্নিহিত একটি নৈর্ব্যক্তিক এবং অন্তিম শক্তি হিসাবেই গৃহীত হল। পরে আবার এই শব্দটি পরিবর্ধন হয়ে পুংলিঙ্গ 'ব্রহ্মা' শব্দে পরিণত হয়। এই ব্রহ্মাই হল পরবর্তীকালে দেবতাশ্রেষ্ঠ। অপরদিকে ঋগ্বেদের 'ব্রহ্মণ' থেকে 'ব্রাহ্মণ' শব্দটির উদ্ভব হয়ে ব্রাহ্মণ নামক একটি উচ্চসম্প্রদায়ের সৃষ্টি হল। পরবর্তী সময়ে সেই ব্রাহ্মণই হলেন হিন্দু সমাজের স্তরবিন্যাসের সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী পুরোহিত তন্ত্র।
পুরুষ সুত্তের বিষয় অনুযায়ী হিন্দু সমাজের শ্রেণী বিভাজন হল এইরূপে-খণ্ডিত পুরুষের মুখ হতে ব্রাহ্মণ, বাহু হতে রাজন্য (ক্ষত্রিয়), উরু হতে বৈশ্য এবং চরণ থেকে শূদ্রের সৃষ্টি। হিন্দু সমাজের জাতি-বিভাজন এবং স্তরভেদ পৃথিবীর সমাজ বিকাশের প্রশ্নে এক অদ্ভুত অন্তরায়। এই বিষয়টি হিন্দু সমাজে আজও তীব্রভাবে বিরাজমান।
ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয় ব্রাহ্মণ্যবাদ অর্থাৎ হিন্দুধর্ম বিশ্বাসের পুনরুত্থানের প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করেছিল। এই সময়কালেই হিন্দুত্ব বা হিন্দুধর্ম বিশ্বাস একটি কঠোর ও জটিল রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
হিন্দুত্ব শব্দটির দ্বারা এখানে বেদ-পুরাণ ও ব্রাহ্মণে বিশ্বাসী ভারতীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় এবং সামাজিক আচরণ, নিয়ম, জন্ম-মৃত্যু বিবাহ-সহ সমগ্র আচরণ বিধি বা এক কথায় তার সমগ্র জীবনের বিশ্বাস ও জীবনধারণের নীতি-নিয়মকেই বোঝানো হয়েছে। এমনকি ব্রাহ্মণ বিরোধী বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অনেক চিন্তা ভাবনা অত্যন্ত সুচতুরভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদ (হিন্দুধর্ম) নিজেদের স্বার্থেই ব্যবহার করে চলেছে। তবে এই বিষয়টি লক্ষণীয় যে হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী সমগ্র জনসমষ্টির মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণে নানা প্রভেদ এবং অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও, জাতিভেদ অনুযায়ী বিভিন্ন গোষ্ঠীর হিন্দুদের মধ্যে বিশ্বাস ও আচার-আচরণ যথেষ্ট কঠোরভাবেই নিষিদ্ধ। হিন্দু চতুবর্ণের মধ্যে একদিকে যেমন গোষ্ঠীগতভাবে এই কঠোরতা, আবার জাতিভেদ অনুযায়ী ঐগুলির প্রভেদও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
ধর্মশাস্ত্র, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, গৃহ্যসূত্র এবং দেব-দেবী পুরাণ-সহ রামায়ণ ও মহাভারতে যে কঠোরতা নির্দেশিত হয়েছে, মনুসংহিতায় সেই সামাজিক ও ধর্মীয় কঠোরতাকে একটি উদ্ভট এবং অযৌক্তিক রূপ প্রদান করা হয়েছে।
মনুসংহিতায় শূদ্র এবং নারীদের অত্যন্ত হীনরূপে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এই সম্পর্কে তাঁর নির্দেশিকার মমার্থ হল:
"বিপদ আপদের অবস্থায় ছাড়া প্রত্যক্ষ শ্রমের দায়িত্ব দ্বিজদের নয়... সে দায় শূদ্রদের।"
"স্বর্গলাভ করার জন্য বা স্বর্গ ও নিজ জীবিকা এই উভয়ের জন্য ব্রাহ্মণের সেবা করবে।... ব্রাহ্মণদের সেবাই শূদ্রের প্রকৃত কাজ এ ছাড়া শূদ্রের সব কাজই নিষ্ফল।"
"... শূদ্ররা কদাচ বেদ অধ্যয়ন ও শ্রবণ পর্যন্ত করবে না।”
"... নারীদের স্বাধীনতা লাভের যোগ্যতা নেই।"
"পুরুষদের প্রতি তাদের আকর্ষণ, তাদের পরিবর্তনশীল মনোভাব... বিশ্বাসহীনতারই পরিচয় দেয়।"
"নারীদের ক্ষেত্রে শাস্ত্রানুযায়ী কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা নিষিদ্ধ; এই বিষয়ে বিধি-বিধান সুনির্দিষ্ট; নারীরা শক্তিহীনা এবং বৈদিক শাস্ত্রজ্ঞানহীনা, তাই তারা মিথ্যার ন্যায় অপবিত্র, এইটাই সুনির্দিষ্ট বিধি।”
"সৃষ্টির সময়ে স্বয়ন্তু পুরুষ নারীদের জন্য শয্যা, আসন, অলংকার, অপবিত্র আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, অসততা, ঈর্ষা এবং অসদাচরণই নির্দিষ্ট করে গেছেন।"
পণ্ডিতদের অভিমত যে শুঙ্গ রাজত্বকাল (খ্রীঃ পূর্ব দ্বিতীয় হতে প্রথম শতক) থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের হিন্দু রাষ্ট্রনীতি সমাজনীতি মনুসংহিতার মধ্যে বিধৃত হয়েছে সূত্রাকারে এবং মহাভারতে তা হয়েছে কাব্যিক রূপে।
মহাভারতের শান্তিপর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজধর্ম সুষ্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। রাজার উৎপত্তি হতে রাজার কর্তব্য সবই বিশ্লেষিত হয়েছে এই পর্বে।
অপরদিকে গীতার বক্তব্যগুলির অর্থ এই যে মানুষকে কর্ম করতে হয় ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুযায়ী। মানুষের ভূমিকা এখানে মন্ত্র মাত্র। অর্থাৎ মানুষ শোষণ নির্যাতন করলেও তা ঈশ্বরের ইচ্ছাকেই বাস্তবায়িত করা হয়। অর্থাৎ শোষণ ও শ্রেণীভেদমূলক সমাজের সমর্থন গীতার প্রতিটি ছত্রেই প্রস্ফুটিত হয়েছে।
"স্বধর্ম উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মে নিধনও কল্যাণকর; কিন্তু পরধর্ম গ্রহণ করা বিপজ্জনক।" সুতরাং কৃষ্ণের এই উক্তি ব্রাহ্মণ্যবাদী তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া অবতারবাদের তত্ত্বও ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ বৃত্তকেই স্থির করেছিল।
বৌদ্ধ যুগের সমাজজীবন ও শ্রেণীবিন্যাস :
মহামানব গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব এবং তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম-দর্শন নিছক কোনো ভাববাদী তথা আধ্যাত্মিক বিষয় ছিল না, তৎকালীন সময়কালে ভারতীয় উপমহাদেশের (খ্রীঃপূঃ) ৬ষ্ঠ শতাব্দীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন অর্থাৎ দ্বন্দুতত্ত্বই এইরূপ উন্নত ধর্মবোধ উৎপন্ন করেছিল।
বুদ্ধের জীবনের তিনটি মুল্যবোধের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে -বৈরাগ্য-সংসার ত্যাগ, মৈত্রী ও করুণা এবং প্রজ্ঞা। বস্তুতপক্ষে ঐ তিনটি গুণই নির্বাণ প্রাপ্তির হেতু স্বরূপ। কারণ তিন প্রকার ক্লেশ (চিত্ত কলুষতা) বারংবার মনুষ্যকে দুঃখের পথে আকর্ষণ করে তৃষ্ণা, দ্বেষ এবং অবিদ্যা। বৈরাগ্য হল তৃষ্ণার প্রতিষেধক, মৈত্রী ও করুণা দ্বেষের প্রতিষেধক, এবং প্রজ্ঞা অবিদ্যার প্রতিষেধক। এই তিনটি গুণের সার্বিক অনুশীলন দ্বারা ক্লেশসমূহ বিনাশ হয় এবং নির্বাণ লাভ হয়। সুতরাং এই তিনটি গুণ বুদ্ধ অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন।
অনেক তথাকথিত পণ্ডিতের অভিমত হল, বৌদ্ধধর্মের অনেক কিছুই সিন্ধু সভ্যতা হতে গৃহীত এবং সামান্য কিছু আর্য সভ্যতা হতে গৃহীত। এই অভিমতটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং অযৌক্তিক। কারণ গৌতম বুদ্ধের সময়কালে এবং পূর্বে অনেকগুলি ধর্ম অবশিষ্ট ছিল, তাহলে সেগুলি গড্ডালিকা প্রবাহে নিমজ্জিত হল কেন? আসলে এইরূপ ভ্রান্ত অভিমত গুলি হল মূলত কতিপয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হীনমন্যতা মাত্র। কেহ যদি অত্যন্ত গভীরভাবে বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শনকে উপলদ্ধি করতে সক্ষম হন তাহলে তিনি বৌদ্ধ এবং হিন্দুধর্মের পার্থক্যগুলি সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন।
"যে ধর্মা হেতুপ্রভবা: তেষাং হেতুং তথাগতোহবদৎ।
তেষাং চ নিরোধ: এবংবাদী মহাশ্রমণ:।।"
অর্থাৎ সমস্ত ধর্মই হেতুপ্রভব হেতুসঞ্জাত। তথাগত (বুদ্ধ) এদের হেতু বা কারণ সম্পর্কে বলেছেন এবং এদের নিরোধ বা নিবৃত্তি সম্পর্কেও বলেছেন। বুদ্ধের ধর্ম এবং চারি আর্য সত্য (দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিবৃত্তি এবং দুঃখ নিবৃত্তির উপায়) উভয়ের মূলকথা হল কার্যকারণ নীতি বা শৃঙ্খলা। দুঃখ নিবৃত্তির উপায় (অষ্টাঙ্গিক মার্গ) বুদ্ধ আবিষ্কার করেছেন।
"দুগ্ধমেব হি সম্ভোতি, দুগ্ধং বেতি তিতি।
নাঞজ্ঞ এ দুগ্ধা সম্ভোতি, নাঞঞ দুষ্কা নিরুজবাতি।।”
অনিত্য দর্শন বুদ্ধের দর্শনের গোড়ার কথা। বুদ্ধ বলেছেন :
"সব্বে সংখারা অনিচ্চা'তি যাদ পঞ্ঞায় পস্সতি অথ নিব্বিন্দতি দুক্খে এস মগ্ন বিসুদ্ধিয়া।" - সকল সংস্কার (যা কিছু কার্য-কারণ সম্ভূত) অনিত্য-এই অনিত্য দর্শনই হল বিশুদ্ধির মার্গ।
সুতরাং বৌদ্ধ দর্শন কখনই বিশ্বের আদি-অন্ত ইত্যাদি নিরূপণ করার চেষ্টা করেনি এবং তা বৌদ্ধ দর্শনের উদ্দেশ্যও নয়। বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হল-জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর কঠোর নিয়ম হতে মুক্তিলাভ করা।
গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত ধর্ম-দর্শন ঈশ্বরতত্ত্ব এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের সমূলে কুঠারাঘাত করেছিল। ফলে সমাজের সকল স্তরের মানুষ এমনকি নারীরাও দলে দলে এই ধর্মের বৃত্তে প্রবেশ করে প্রকৃত অর্থেই মুক্তিলাভ করেছিল।
যাইহোক, বুদ্ধ এবং বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে পৃথিবীর সমাজবিজ্ঞানীদের প্রধান আগ্রহ গৌতমবুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের সামাজিক আবেদনকে কেন্দ্র করেই। কঠোর এবং ক্রমোচ্চ শ্রেণী-বিভাজত এবং অসাম্যমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদের বিকল্পরূপে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যবাদী ধর্মমত হিসেবেই ব্যাপকভাবে পরিচিত। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়িত শ্রেণীগুলির প্রতি সহানুভূতিমূলক এবং জাতপাতের বিভেদ এবং উৎপীড়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী আন্দোলনরূপেও বৌদ্ধধর্ম বিবেচিত হয়।
পুরোহিত-তন্ত্রমূলক ব্রাহ্মণবাদ থেকে বৌদ্ধধর্মের বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান ছিল এবং এখনও রয়েছে। তবে জাতিভেদপ্রথা এবং সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে বুদ্ধের মত এবং শিক্ষা গভীর অভিনিবেশের পাশাপাশি সেই সময়কালের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয়গুলি সম্পর্কিত আলোচনা এবং তার ফলাফল এখানে বিবেচ্য। যেমন :
ভারতবর্ষে জাতিভেদ প্রথা উৎপাদন এবং বিতরণের ভিত্তিতে সামাজিক স্তর বিন্যাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে বিজড়িত।
কৃষি উৎপাদন ও নগর সভ্যতার বিকাশের পরিপূরক রূপে নানাবিধ শিল্পকর্ম ও তৎসংশ্লিষ্ট কারিগর প্রথার উদ্ভব।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্রাজ্য স্থাপন এবং সাম্রাজ্য বিস্তার।
রাজতন্ত্র এবং গণ সংঘের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও সহবস্থান।
কূলগত শাসনতন্ত্রের উদ্ভব এবং ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের প্রাধান্য লাভ।
বনভূমির পরিবর্তে কৃষি-ভূমি উদ্ধার এবং ভূমিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি তথা কৃষি-মজুর প্রথার প্রচলন।
ঋতু অনুযায়ী ফসল উৎপাদন এবং কর্তনের প্রশ্নে মজুরিভিত্তিক অর্থপ্রদান বা অনুরূপ বস্তু প্রদান প্রথার উদ্ভব।
দাস-দাসী দ্বারা ভাড়াটে সেনা গঠন তথা বারবণিতা প্রথার উদ্ভব।
কায়িক শ্রম বিমুখ মধ্যত্বভোগী দ্বারা কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে অর্থলগ্নী প্রথার প্রচলন।
জ্যোতিষ বিদ্যা, মায়া বিদ্যা, কুহক বিদ্যা ইত্যাদি বিদ্যার উদ্ভব এবং উক্ত বিদ্যার সঙ্গে দেবত্ববাদের সম্পৃক্তকরণ তথা মনুষ্যজীবনে অদৃষ্টবাদের উদ্ভব।
বুদ্ধ তৎকালীন সমাজের এই স্তরবিন্যাস এবং শ্রম বিভাজন ও তৎ উদ্ভুত উপরোক্ত প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটেই আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রচলিত ধর্ম এই সামাজিক বিন্যাস ও আঙ্গিককে সমূলে উচ্ছেদ করে প্রকৃত শোষণহীন সমাজগঠনের যে অহিংস বিপ্লব শুরু করেছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যই এক বিরল দৃষ্টান্ত।
ব্রাহ্মণ্যবাদ যেখানে শূদ্রদের জন্য এবং এমনকি স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রেও বেদ পাঠ বা বেদ শ্রবণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল, সেখানে বৌদ্ধ ধর্মমত অনুযায়ী বৌদ্ধ সংঘগুলিতে যে কোনো বর্ণ-গোত্রের মানুষ, যদি নৈতিক ও বুদ্ধিগত দিক হতে যোগ্য হত, তবে সে ঐ সংঘের সদস্য হতে পারত। এক্ষেত্রে জাত-পাত বা বর্ণগোত্রের কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা ছিল না। বুদ্ধ সমাজের বর্ণভেদ ভিত্তিক সামাজিক অসাম্যকে স্বীকার করেননি। তাঁর মত অনুযায়ী মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা মূল্য নির্ধারিত হয় কোন জাতে সে জন্মগ্রহণ করেছে তার দ্বারা নয়, নির্ধারিত হয় তার আত্মিক ও নৈতিক গুণাবলী দ্বারা।
গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত ভিক্ষুণী সংঘ গঠন নারীমুক্তির প্রশ্নে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বা যুগান্তকারী বিপ্লব রূপে গৃহীত হয়। বৌদ্ধ সাহিত্যগুলিতে তৎকালীন সমাজে নারী জীবনের দুরাবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। বুদ্ধ নারী সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিতে পিতৃশাসিত সমাজের রীতিনীতিকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন লিঙ্গভেদ মুক্তিপথের অন্তরায় হতে পারে না এবং নারীরা পুরুষের ন্যায় মোক্ষ লাভের যোগ্যতার অধিকারিণী।
বৌদ্ধসংঘে দাস, শ্রম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সংঘের সকল কর্মপদ্ধতি যৌথভাবে পরিচালিত হত। কোনো একক ব্যক্তি সংঘ পরিচালনের অধিকারী হতে পারত না। সর্বোপরি বৌদ্ধ সংঘগুলি কোনোরূপ অর্থভাণ্ডার গঠন বা জমি অধিগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়গুলিতেও নিয়োজিত ছিল না। জনগণের স্বেচ্ছাদান দ্বারাই সংঘ তার কর্ম পরিচালিত করত। গৌতম বুদ্ধ শিক্ষার বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। ফলে বৌদ্ধ সংঘগুলি কালক্রমে উন্নত শিক্ষার পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিল। নালন্দা, বিক্রমশিলা এবং তক্ষশিলা তথা গান্ধার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বুদ্ধের অভিমত ছিল কোনো সর্বশক্তিমান ব্যক্তিগত ঈশ্বর বা কোনোপ্রকার যাগযজ্ঞের প্রতি বিশ্বাস ব্যতিরেকে শুদ্ধ এবং অনাড়ম্বর জীবনযাপনের মাধ্যমে সাম্য-মৈত্রী এবং স্বাধীনতা গ্রহণ অসম্ভব।
পালি সাহিত্যে তৎকালীন বুদ্ধ যুগ এবং বুদ্ধ পরবর্তী যুগের সমাজ জীবনের বহুল তথ্য পাওয়া যায়।
সমাজে সেই সময় মানুষ তার শ্রমের পরিমাপ অনুযায়ী বিভিন্নভাগে বিভক্ত ছিল।
যেমন :
ক্ষত্রিয়-
রাজন্যবর্গ, অভিজাত গোষ্ঠী এবং যুদ্ধ ব্যবসায়ী
ব্রাহ্মণ-
পূজা-পাঠ, সামাজিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ, অভিজাত গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা
বৈশ্য-
ব্যবসাবৃত্তি, অর্থলগ্নী, বৃহৎ জোত এবং সম্পদ-ধারণ
শূদ্র-
কৃষিকাজ, গোচারণ, মৎস-পশু শিকার, জাদুবিদ্যা প্রদর্শন, হত্যা ব্যবসায়ী (জল্লাদ) ইত্যাদি।
দাস-ক্রীতদাস এবং ভূমিদাস উচ্চবর্ণের প্রতি সেবাপ্রদান, কৃষি-পশুপালন এবং রাজ পরিবারে সুরক্ষা।
বারঙ্গনা।
অভিজাত শ্রেণীর মনোরঞ্জন এবং গুপ্তচর বৃত্তি।
এছাড়া চণ্ডাল নাম অত্যন্ত হীনবৃত্তি গ্রহণকারী জনগণের নামও পাওয়া যায়। এরা বনভূমির সন্নিকটে বসবাস করত। সর্বোপরি ভাড়াটে সৈন্য বৃত্তি গ্রহণকারী (মার্সেনারী) এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তারা কোন বর্গের ছিলেন তা স্পষ্ট নয়।
তবে বৌদ্ধধর্ম ভারতের ইতিহাসে তথা বহির্বিশ্বে বৃহৎ সামাজিক এবং ধর্মীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। রাজন্যবর্গ, বণিক শ্রেণী এবং সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে এই ধর্ম এক প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রূপে পরিগ্রহণ করেছিল, যা আজও প্রবাহমান।
ভারতে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয় এবং হিন্দুত্ববাদের পুনরুত্থান :
চতুর্থ পঞ্চম শতাব্দীতে ভারতে একদিকে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয় ও অপর দিকে ব্রাহ্মণ্যবাদ অর্থাৎ হিন্দু ধর্মবিশ্বাস শৈব রাজাদের আনুকূল্যে বৃদ্ধি পেতে থাকে। কুমারিল এবং শঙ্করাচার্যের ন্যায় বৌদ্ধ বিরোধীদের প্রভাবে বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে হিংসামূলক আক্রমণ কেন্দ্রীভূত হতে থাকলে বহু বৌদ্ধমঠ এবং সংঘারামগুলি ধ্বংস হয়ে যায়। বেশ কিছু বৌদ্ধমঠ হিন্দুমন্দিরে পরিবর্তিত হয় তথা বৌদ্ধ পুঁথি বিনষ্ট এবং বিকৃত করা হতে থাকে। বৌদ্ধধর্মের প্রতি এইরূপ অভিযান ও কার্যকলাপ ভারতে বৌদ্ধধর্মকে সমূলে উচ্ছেদ করেছিল।
কিন্তু তখনও বৃহৎবঙ্গে বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব বজায় ছিল। পালযুগের অবসান এবং হিন্দু-সেন বংশের উত্থানে বঙ্গে হিন্দুদের অভ্যন্তরে কৌলীন্য প্রথার উদ্ভব ঘটে। অবশেষে তুর্কী মুসলমানদের হাতে (১১৯২ খ্রীঃ) সেন রাজাদের পরাজয় ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংস সাধন, বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা ইত্যাদি বিষয়গুলি সংঘঠিত হলে বাংলা ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৌদ্ধরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অপরদিকে ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ প্রথম হতেই গৃহস্থ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল এবং তারা গৃহস্থপল্লী ও নগরে পূজা ইত্যাদি করত। ফলে তারা তুর্কী আক্রমণ হতে রক্ষা পেয়েছিল।
ভারতে হিন্দুধর্মের কঠোরতা বিভিন্ন রূপ নিয়ে মধ্যযুগ পর্যন্ত অগ্রসর হয়। প্রায় চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত দেব-পূজা এবং কঠোর আচার-আচরণ ভিত্তিক গোঁড়া হিন্দুবাদ চরমভাবে বিকাশলাভ করেছিল। তবে ইতিমধ্যে ভারতে ১১৯২ খ্রীঃ মধ্য এশিয়া হতে আগত তুর্কী মুসলমানদের হাতে হিন্দু রাজাদের সম্মিলিত শক্তি পরাভূত হলে উত্তর ভারতে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
হিন্দুধর্ম-বিশ্বাস ও হিন্দু সমাজনীতি হতে ভিন্নতর এক ধর্মবিশ্বাস ও সমাজনীতি ইসলামের মধ্য দিয়ে ভারতে আবির্ভূত হল। এটা ছিল একটা সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি। ফলে শুধু রাজনৈতিক নয়, ভারতের ধর্মীয় এবং সামাজিক জীবনে এর প্রভাব ছিল সুগভীর এবং সুদূরপ্রসারী।
ভারতে ইসলামী শাসন এবং হিন্দুধর্ম :
ভারতবর্ষে ১১৯২-১২১১ খ্রীঃ সময়কালে দিল্লিতে সুলতানী শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং ১৫২৬ খ্রীঃ মোগল আক্রমণের মধ্য দিয়ে সুলতানী সাম্রাজ্যের পতন ও মোগল সাম্রাজ্যের সূচনা হয় এবং এই সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ পতন হয় ১৮৫৮ খ্রীঃ। অর্থাৎ এই সুদীর্ঘ সময়কালে ভারতের হিন্দু নিম্নবর্গের মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়ে যায়। এর ফলে উত্তর-পশ্চিম ভারতে এবং বঙ্গদেশে জনগণের এক অংশ (মূলত বহু সংখ্যক শূদ্র এবং প্রাক্তন বৌদ্ধ) এই নব্য ধর্ম গ্রহণ করেছিল পরিস্থিতির প্রয়োজনে বা অন্যান্য কারণে। তবে হিন্দুদের রক্ষণশীলতার কারণে মুসলমানদের দ্বারা বিজিত অন্যান্য দেশের মতো ভারতে ঐ ধর্ম একমাত্র ধর্ম হয়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। যদিও মুসলমানরা সেই সময় দেশের বিভিন্ন অংশে শাসন কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল কিন্তু জনগণের ব্যাপক অংশই ছিল হিন্দু।
১৩০০ খ্রীঃ হতে ভারতে ইসলাম ধর্মের অভ্যন্তরে 'সুফী' মতবাদ এবং ১৪১০ খ্রীঃ হিন্দুধর্মে ভক্তিবাদ প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিতে থাকে। এই আন্দোলনগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল উভয় ধর্মের শোষণ নিপীড়ন হতে সাধারণ মানুষকে মুক্তি প্রদান। এই সময় বঙ্গদেশে নানাবিধ লোকায়ত দেব-দেবীর মাহাত্ম্যপ্রচার একটি গণতান্ত্রিক চরিত্র বহন করতে সচেষ্ট হয়েছিল। তবে একসময় ভক্তি ও সুফীবাদী চিন্তা পুনরায় হিন্দু-মুসলমান ধর্মের অভ্যন্তরেই লীন হয়ে গিয়েছিল।
সেই সময়কালের কয়েকজন ভক্তি ও সুফীবাদী আন্দোলনকারী তথা প্রচারকের নাম- ভক্তিবাদ আন্দোলনের প্রচারকগণ উত্তর ও পশ্চিমভারতে সুরদাস, রবিদাস, কবীর, নামদেব, ভক্তদাদু এবং গুরু নানকদেব।
বঙ্গদেশে চৈতন্য ও তাঁর অনুগামীগণ :
সুফীবাদ আন্দোলনের প্রচারকগণ :
নিজামুদ্দিন আউলিয়া, নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ চিরাগ, আলাউদ্দৌল্লা সিমনানি, ফকিরউদ্দিন ও মুল্লা শাহ বদখশানি প্রমুখ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও ভারতের সমাজ বিন্যাস চিত্র 'চেতনা তাই সচেতন সত্তা থেকে পৃথক কিছু নয়, আর মানুষের সত্তাই হল মানুষের বাস্তব জীবন-প্রক্রিয়া।' -কার্ল মার্কস
মোগল সাম্রাজ্যের মৃত ভিতের উপরেই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইমারত গড়ে উঠেছিল। ফলে ভারতে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির অবসান ঘটেনি বরং তা দেশের আর্থ-সামাজিক পশ্চাৎপদতাকেই রক্ষা করতে অগ্রসর হয়েছিল। তবে অর্থনীতির অভ্যন্তরে বিকৃত পুঁজির অনুপ্রবেশের ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতে ব্রিটিশ শাসন ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশে একটি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। যেহেতু ব্রিটিশ শাসন প্রথম বঙ্গদেশ হতে শুরু হয়েছিল এবং সেই কারণে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বঙ্গদেশে যে সংস্কারবাদী আন্দোলন শুরু হয় তা বঙ্গীয় রেনেসাঁস নামে খ্যাত। তবে এই আন্দোলন শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহলেই সীমাবদ্ধ ছিল। দেশের পশ্চাৎপদ অংশের জনগণ ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কার মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ করাকেই ঈশ্বরের নিকট আত্মসমর্পন বলেই মনে করত। আবার এই সময় জমিদারতন্ত্র এবং ব্রিটিশ বিরোধী কৃষক তান্দোলন সংগঠিত হলেও তা ছিল হিন্দু-মুসলমান ধর্মের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দু। এক্ষেত্রে সমাজের নীচু তলার জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল কিন্তু ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের দ্বি-মুখী সত্তার কারণে এই সকল আন্দোলনগুলি উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে পড়েছিল।
ব্রাহ্মণ-বিরোধী আন্দোলন :
গান্ধীজী বা তদানীন্তন জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ অনেকেই জাত-পাত বিশেষ করে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা সকলেই ছিলেন উচ্চবর্ণের এবং এঁরা কেউই অস্পৃশ্যতা বা জাত-বিভাজন টিকে থাকবার অন্যতম প্রধান শর্ত ভারতের সামন্তবাদী ভূমি-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনোরূপ লড়াই-আন্দোলন সংগঠিত করেননি। ফলে ভিতটাকে টিকিয়ে রেখে, তাকে (সামন্তবাদকে) বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করে, কেবলমাত্র উপরিসৌধের বিরুদ্ধে এঁদের আন্দোলন মূলত পর্বতের মূসিক প্রসবের ন্যায় থেকে গেছে।
বাংলার নবজাগরণ পর্ব ব্যাতিরেকে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন সমাজ সংস্ককারক আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখনীয় ছিলেন বালশাস্ত্রী জাম্বেদকর (১৮১২-১৮৪৬), ভাউ-মহাজন (১৮১৫-১৮৯০), দাদোবা পান্ডুরঙ্গ (১৮১৪-১৮৮২), বিষ্ণুবুয়া ব্রহ্মচারী (১৮২৫-১৮৭১) প্রমুখ। তবে এই সকল সমাজ সংস্কারকগণ মূলত তাদের রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। তবে মহারাষ্ট্রের অন্যতম সমাজ সংস্কারক জ্যোতিবা ফুলে (১৮৭০-১৮৯০) ছিলেন সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি সাধারণ জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাঁর ব্রাহ্মণ বিরোধী আন্দোলনকে জনগণের নিকটে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফুলে প্রতিষ্ঠিত 'সত্যসাধক সমাজ' (১৮৭৩) সমাজের নীচতম জাতি শূদ্র ও অতি শূদ্রদের সংগঠিত করেছিল। জ্যোতিবা ফুলে প্রতিষ্ঠিত সত্যসাধক আন্দোলন যেমন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে পশ্চিমভারতে একটি শক্তিশালী অ-ব্রাহ্মণ আন্দোলনের ভিত্তিভূমি স্থাপন করেছিল, ঠিক তেমনভাবেই দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে পূর্বতন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে অ-ব্রাহ্মণ আন্দোলন গড়ে ওঠে।
১৯১৬ খ্রীঃ প্রতিষ্ঠিত 'সাউথ ইন্ডিয়ান লিবারেল ফেডারেশন' এবং জাস্টিস পার্টি, মূলত অ-ব্রাহ্মণ জমিদার শ্রেণী ও উগ্র উত্তর ভারতীয় বিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করলে শেষ পর্যন্ত দ্রাবিড় জাতিভুক্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির জন্ম হল। অর্থাৎ কিছু সুবিধাভোগী মানুষের স্বার্থই তারা রক্ষা করল, প্রকৃত গরীব এবং নিষ্পেষিত জনগণ মুক্তি পেল না। বিপরীতে বর্ণভিত্তিক এই ধারণা ও আন্দোলন মানুষের শ্রেণী-দ্বন্দুকেই সুপ্ত করে দিল।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে, বিশেষ করে ১৯২৫ খ্রীঃ লিখিত 'শূদ্র ধর্ম' শীর্ষক প্রবন্ধে শূদ্র সমস্যার গোড়া ধরে টান দিয়েছেন। এই সমস্যার মূলে যে হিন্দু সমাজের বর্ণভেদ এবং বৃত্তিভেদকেও যে ধর্ম শাসনের অনুবর্তী করে এই সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে সে বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়ায়নি। বর্ণভেদ এবং বর্ণ অনুযায়ী ধর্মপালনের যে কুফল এবং অশুচিতা চিন্তার উদ্ভব ঘটে তা তিনি স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন: 'এদিকে শাস্ত্র বলেছেন: স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়: পরধর্মো ভয়াবহ। তাই কথাটির প্রচলিত অর্থ এই দাঁড়িয়েছে যে যে-বর্ণের শাস্ত্রবিহিত যে ধর্ম তাকে তাই পালন করতে হবে। একথা বললেই তার তাৎপর্য এই দাঁড়ায় যে, ধর্ম-অনুশাসনের যে অংশটুকু অন্ধভাবে পালন করা চলে তাই প্রাণপণে পালন করতে হবে-তার কোনো প্রয়োজন থাক আর না থাক, তাতে অকারণে মানুষের স্বাধীনতার খর্বতা ঘটে ঘটুক, তার ক্ষতি হয় হোক। অন্ধ আচারের অত্যাচার অত্যন্ত বেশি, তার কাছে ভালো-মন্দর আন্তরিক মূল্যবোধ নেই। ... এই কারণে আধুনিককালে যারা বুদ্ধি-বিচার জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজকর্তাদের মতে স্বধর্ম পালন করে তাদের ঔদ্ধত্য এতই দুঃসহ অথচ এত নিরর্থক।' তাঁর এই বক্তব্যের সারমর্ম, হিন্দু সমাজের এই ভার লাঘব না হলে হিন্দু সমাজের অগ্রগতির সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখ্য নেতৃবৃন্দের অন্যতম ছিলেন গান্ধীজী। গান্ধীজী গোঁড়া হিন্দু এবং চতুর্বর্ণে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই শূদ্রত্ব অবসানে তাঁর কোনোরূপে আগ্রহ ছিল না, তাঁর আগ্রহ এবং প্রচেষ্টা ছিল অস্পৃশ্যতার অবসানে।
গান্ধীজীর মতে: 'বর্ণ, অবিচ্ছেদ্যভাবে না হলেও অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত জন্মের সঙ্গে এবং বর্ণধর্ম পালনের অর্থ হচ্ছে আমাদের সকলের পক্ষে আমাদের পূর্বপুরুষদের বংশগত ও ঐতিহ্যগত পেশায় কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে লিপ্ত থাকা। ... এই বংশগত বৃত্তি কর্তব্য হিসাবেই সাধন করতে হয় যদিও স্বাভাবিকভাবেই মানুষ এর দ্বারা তার জীবিকা অর্জনও করে।'
গান্ধীজীর এইরূপ অসঙ্গতিমূলক ভাবনার কারণে তাঁর সঙ্গে ড. বি. আর. আম্বেদকরের অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ নিয়ে ঘোরতর বিবাদ উপস্থিত হয়। কারণ তিনি বর্ণাশ্রমে এতই বিশ্বাস করতেন যে এই সামন্ততান্ত্রিক বিষয়টিকে তিনি 'ঈশ্বরের মহান দান' বলে কার্যত ব্রাহ্মণবাদীদেরই হাতকেই শক্ত করেছিলেন।
ড. বি. আর. আম্বেদকরকে (১৮৯১-১৯৫৬) ভারতে 'দলিত' মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক রূপে গণ্য করা হয়। আম্বেদকরের মতে: 'জাতিচ্যুতরা জাতিভেদ প্রথারই পরিণাম। যতদিন জাতিভেদ থাকবে ততদিন জাতিচ্যুতরা থাকবে। একমাত্র জাতিভেদপ্রথার বিলুপ্তি ব্যতিরেকে জাতিচ্যুতকে মুক্ত করবার আর কোনো উপায় নেই।'
ড. আম্বেদকর গান্ধীজী কর্তৃক 'হরিজন' শব্দটি ব্যবহারেও অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি এই প্রসঙ্গে সমালোচনা করে বলেছিলেন যে অস্পৃশ্যদের একটি সুমিষ্ট নামকরণের জন্য এই 'হরিজন' শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
জাতিভেদের ক্ষতিকারক ও বিচ্ছিন্নতামূলক চরিত্রকে উদ্ঘাটিত করে তিনি আরও বলেছিলেন, 'জাত-পাতই হিন্দু নাগরিক জীবন। তাই নিজের জাতের প্রতি একমাত্র সে দায়বদ্ধ। তার আনুগত্য একমাত্র নিজের জাতের প্রতি। পুণ্যও হয়ে দাঁড়িয়েছে জাত-পাত ভিত্তিক, নৈতিকতাও হয়েছে জাতির সীমানায় আবদ্ধ। যে সহানুভূতির পাত্র তার প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই, নেই গুণের মর্যাদা...।' তিনি বুদ্ধ ও কার্ল মার্কসের তুলনা করে বৌদ্ধ দর্শনকেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, 'এই বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, মার্কসের দাবি যে সমাজতন্ত্র অনিবার্য তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হয়েছে।' অপরপক্ষে বৌদ্ধ মতবাদের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়ে সিদ্ধান্তে আসেন যে ফরাসি বিপ্লবের রণধ্বনি সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীন যা ফরাসি বিপ্লবকেও ফলপ্রসু করতে পারেনি বা যা কমিউনিজম তো পারবেই না, তা কেবলমাত্র বৌদ্ধধর্মের মধ্য দিয়েই বাস্তবায়িত হতে পারে।'
১৯৩৫ সালে নাসিকে অনুন্নত জাতি সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করলেন যে তিনি হিন্দু হয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান না। তাই তিনি তাঁর অনুগামী-সহ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। আম্বেদকরের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ অস্পৃশ্য এবং শূদ্রদের আংশিক হলেও নাড়া দিয়েছিল।
ভারতের সামন্তবাদী ধ্যান-ধারণা, সামন্তবাদী ভূমিব্যবস্থার উৎপাদন এবং ব্যাপক জনগণের মধ্যে আম্বেদকরের নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই প্রমাণ করেছিল যে ভারতবর্ষ একটি ক্রীতদাস ও অর্ধবিক্রীত জাতিতে পরিণত হয়েছে। শ্রমিকশ্রেণীর এক বিশাল অংশ হয় অস্পৃশ্য পিছিয়ে পড়া জাত অথবা শূদ্রে পর্যবসিত হয়েছে। ফলে সমাজের সমগ্র কাঠামোটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যায়ভিত্তিক।
যাইহোক, ইউরোপীয় রেনেসাঁস সামন্ততন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুঁজিতন্ত্রের প্রবেশ ঘটিয়েছিল। ভারতবর্ষে সেইরূপ বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হয়নি। বঙ্গীয় রেনেসাঁসের ব্যাপ্তি ভারতের সর্বত্র উপস্থিত না হওয়ার কারণে সামন্তবাদী শাসন ও শোষণ আজও এদেশে বিদ্যমান। ফলে প্রকৃত অর্থে এদেশের পশ্চাৎপদ জনগণ তথাকথিত স্বাধীনতার দীর্ঘপথ অতিক্রম করলেও এই সমস্যাটি আরও জটিল হতে জটিলতর রূপ ধারণ করেছে। যার কারণে পুন: প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রক্ষণশীলতা ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদ। যা ভারতবর্ষের প্রগতি বা মুক্ত গণতন্ত্রের পক্ষে অনুকূল নয়।
'হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান অপমানে হ'তে হবে তাহাদের সবার সমান।'
'দলিত' কথাটির বুৎপত্তিগত সংজ্ঞা :
'দলিত' কথাটির অর্থ এমন বস্তু বা মানুষ যাদের কেটে ফেলা হয়েছে, ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে, টুকরো টুকরো করে পিষে ফেলা হয়েছে ও ধ্বংস করা হয়েছে। তৎকালীন মারাঠী সমাজ-সংস্কারক জ্যোতিবা ফুলে হিন্দু সমাজে নিপীড়িত অবর্ণ ও অস্পৃশ্য জাতিগুলির ক্ষেত্রে এই কথাটি ব্যবহার করেছিলেন।
'দলিত' পরিচয় :
'দলিত' বলতে কাদের বোঝায়? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাথমিকভাবে বলা যায় যে, শব্দটি এক অর্থে নবীন মারাঠী সাহিত্য হতে গৃহীত। রাজনৈতিক ভাবে বলতে গেলে ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে মহারাষ্টে 'দলিত পন্থা নামক সংগঠনের আত্মপ্রকাশের পর থেকেই একটি 'পরিভাষা' রূপেই শব্দটি বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। তবে অবশ্য 'দলিত' শব্দটির ব্যবহার বহু পূর্বেও, এমনকি ১৯৩১'এও লক্ষণীয় হয়েছে।
বুৎপত্তিগত অর্থে, 'দলিত' শব্দটি আবির্ভূত হয়েছে 'দলন' থেকে, যার অর্থ 'বলপূর্বক কাউকে দমন করে রাখা'। এই প্রক্রিয়ায় যদিও পেশীশক্তির যাবতীয় প্রকরণই যুক্ত, তা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে সামাজিক ক্রমোচ্চ বিন্যাস এবং তার সঙ্গে ঘনীভূত হয়েছে ক্ষমতা'র প্রশ্ন। সে কারণে, বিদ্যমান আইনব্যবস্থা ও নীতি-নৈতিকতার যাবতীয় 'বিধি' লঙ্ঘন করেও 'দলন' প্রক্রিয়ার বিষয়টি প্রায় অব্যবহতভাবেই চলতে পারে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেছেন: "... 'দলন' বস্তুটি আমাদের দেশে এবং সমাজে আবহমান কাল থেকে প্রায় একটি 'ফাইন আর্টস'-এ পরিণত হয়েছে, যার তুলনা জগতে শুধু দুর্লভ নয়, একেবারে অপ্রাপ্য। মুনি-ঋষিদের দোহাই দিয়ে আর নিত্যকর্ম পদ্ধতিকে ধর্মের শিকলে বেঁধে রেখে, সঙ্গে সঙ্গে শুধু বর্ণাশ্রম, জাতিভেদে ('অস্পৃশ্যতা' যার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কে লিপ্ত) আর জন্মান্তরবাদের মতো ধারণার জোরে ইতিহাসে সর্বকালের সর্বদেশের সবচেয়ে মজবুত 'শ্রেণীকর্তৃত্বে'-এর ইমারত এদেশের মনুবাদীরা পরম ঐতিহাসিক দক্ষতায় প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন।'’
অতীত ভারতে মনুষ্য কর্তৃক মানুষের এই 'দলন' প্রক্রিয়া যেহেতু প্রধানত গোষ্ঠীগত ভাবেই সংগঠিত হয়েছে-সে কারণে 'দলনকারী' ও 'দলিত' সম্পর্কের বিভাজনটিও অনেকখানি গোষ্ঠীগত। ভারতে বর্ণভেদের ক্ষেত্রে 'শ্রম বিভাজন'-এর তত্ত্বকথা (গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারী বর্ণভেদ) চালু থাকলেও শেষপর্যন্ত তা 'জন্মসূত্রে জাতিভেদে'র প্রথায় পর্যবসিত।... হিন্দু বর্ণব্যবস্থার নিরিখে 'দলিত' বলতে সাধারণভাবে সেইসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের বোঝায় যাদের অবস্থান 'চতুবর্ণ'-এর বাইরে। সে অর্থে তারা 'অপবিত্র' বা 'অস্পৃশ্য'।
জাতিগত নিপীড়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ফলে, সমাজে সকল ধরনের উৎপীড়ন ও নির্যাতিত অংশগুলিকেই 'দলিত' অভিধানভুক্ত করার প্রবণতা লক্ষণীয় হয়েছে। আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন নির্ধারকের পাশাপাশি আবার সাংস্কৃতিক অবদমনের প্রশ্নটিও সাম্প্রতিককালে উঠে এসেছে। সর্বোপরি, গণতন্ত্রের সঙ্গে 'মর্যাদাবোধ'-এর বিষয়টিও 'দলিত' শব্দটিকে রাজনৈতিকভাবে অধিকতর ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে। সব মিলিয়ে তাই একটি ব্যাপকতর দৃষ্টিতে বিষয়টিকে অনেকেই দেখতে চাইছেন। অপরদিকে অনেকে 'দলিত' শব্দটিকে আবার এমন একটি 'মতাদর্শ' হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন, যা ব্যাপক অর্থে সমাজ কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
'দলিত' শব্দের ব্যাপকতা নিয়ে এই আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আমরা যদি সংকীর্ণ অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করি, তখনও 'দলিত' বলতে আমরা বুঝি জাতপাতভিত্তিক সমাজকাঠামোতে কথাকথিত নিম্নবর্গে অবস্থিত জনগোষ্ঠীসমূহকে। উল্লেখ্য যে, আর্থিক বিচারেও তারা কিন্তু যথেষ্ট পশ্চাৎপদ। পেশাগতভাবে দেখলে বলতে হয় যে, গ্রামীণ ক্ষেত্রে তারা প্রধানত দরিদ্র কৃষক, বর্গাদার এবং ক্ষেতমজুর; নগরজীবনে তাদের বেশিরভাগটাই শ্রমজীবী মানুষ। এখানে অবশ্য এই কথাটিও মনে রাখা আবশ্যক যে 'দলিত' সমাজের একটি অংশ সরকারি 'সংরক্ষণমূলক' ব্যবস্থাদির সুবাদে নিজেদের আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোকে যথেষ্ট মজবুত করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এইভাবেই 'দলিত' সমাজে একটি মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে; ক্ষেত্রবিশেষে তারাই আবার 'দলিত' শ্রেণীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে উচ্চবর্ণের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদতে। ভারতীয় রাজনীতিতে এই বিষয়টি অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
হিন্দু সামাজিক বিভাজনের সূত্র ধরেই বর্তমানে প্রশাসনিক পরিভাষায় 'দলিত' বলতে আমরা বুঝি যাদের 'তপশিলভুক্ত জাতি' হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকে অবশ্য 'তপশিলভুক্ত উপজাতিসমূহ' এবং 'অন্যান্য' অনগ্রসর শ্রেণীসমূহ'কেও 'দলিত' অভিধায় ভূষিত করতে চান। প্রসঙ্গত একথা মনে রাখা আবশ্যক যে, হিন্দু বর্ণব্যবস্থা বা জাতিভেদপ্রথার নিরিখে যদি 'দলিত' বলতে তথাকথিত 'অস্পৃশ্য' জনগোষ্ঠীগুলিকে বোঝানো হয়ে থাকে; তবে একথাও সত্য যে, সকল 'পূর্বতন অস্পৃশ্য' জাতিগুলি বর্তমান 'তপশিল'গুলির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই, সুনির্দিষ্টভাবে 'দলিত' বলতে কাদের বোঝানো যাবে, সে-বিষয়েও মতভেদ রয়েছে।
দলিত আন্দোলনের উত্তরণ (আম্বেদকর হতে নকশালবাড়ী) :
ভারতে দলিত আন্দোলনের স্ফুরণ ঘটেছিল আম্বেদকরের হাত ধরে। এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের পতন এবং কমিউনিস্ট বলশেভিক বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছে। পৃথিবীর পাঠশালায় রাজনৈতিক দিক হতে সময়টা ছিল অত্যন্ত সংগ্রামমুখর; এর সামাজিক মুক্তি আন্দোলনে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিষ্ঠার সময়কাল। তবে আম্বেদকর যদিও 'দলিত' আন্দোলনকে একটি স্বতন্ত্র রূপ প্রদানে আগ্রহী ছিলেন; এর ফলে তিনি সেখানে 'অ-দলিত সমাজতন্ত্রী' নেতৃত্বের উৎকৃষ্ট সম্ভাবনাকেও সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছিলেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও আম্বেদকরের চিন্তায় মার্কসীয় প্রভাবকে কোনোভাবেই নসাৎ করা চলে না। কারণ আম্বেদকর সম্পাদিত পত্রিকা 'জনতা'-র বিভিন্ন সংখ্যায় পুঁজিপতি ও জোতদার বিরোধী শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের অসংখ্য বিষয় মুদ্রিত হয়েছে। 'জাতিগত শোষণ' ও 'শ্রেণীগত শোষণ' ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে আম্বেদকর প্রচুর আলোচনাও করেছেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে ভারতের কমিউনিস্ট সংগঠন এবং স্যোসালিস্ট দলগুলির মতাদর্শগত সংগ্রামে দোদ্যুল্যমান অবস্থানের কারণে তথা সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিমুখতা আম্বেদকরকে অত্যন্ত বিচলিত করেছিল, ফলে তিনি এইসকল বিষয়গুলিকে 'বৌদ্ধ অর্থনীতি' অর্থাৎ মার্কসীয় অর্থনীতির একটি সচেতন বিকল্প রূপে গ্রহণ করতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। 'রিভ্যুলিউশন অ্যান্ড কাউন্টার-রিভ্যুলিউশন' শীর্ষক রচনাতেও তিনি বৌদ্ধ দর্শন, হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে সাংস্কৃতিক শোষণের বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানটিও সুনির্দিষ্ট করেছিলেন।
আম্বেদকরের জীবনকালেই দলিত আন্দোলনে একদিকে যেমন বৌদ্ধ-প্রভাব বিকশিত হতে থাকে; অন্যদিকে তেমনই একটি রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনেও প্রস্তুতি শুরু হয়। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর 'দলিত' আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক মঞ্চরূপে আত্মপ্রকাশ করে 'ভারতের প্রজাতন্ত্রী দল, (আর পি আই)। প্রাথমিকভাবে এই দলটি কিছুটা সাফল্য অর্জন করলেও অচিরেই মতাদর্শগত বিরোধের কারণে আর পি আই বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে অচিরেই অনিবার্যভাবে 'দলিত' আন্দোলনে ভাটা পড়ে যায়।
১৯৭০ সালে 'পোস্ট-আম্বেদকর' মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে মহারাষ্ট্রে শুরু হল 'দলিত প্যান্থার' আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হল 'দলিত রাজ' প্রতিষ্ঠা। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাদের অগ্রগমন সে সময়ে সংশ্লিষ্ট সকলের নজর কেড়েছিল। প্যান্থারদের অনুসরণে দেশের বিভিন্ন অংশে নতুন ভাবে 'দলিত' আন্দোলন আত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকে। অবশ্য রাজ্যে রাজ্যে আন্দোলনের রূপ বৈচিত্র্য এবং অন্তর্নিহিত আন্দোলনের ভিন্নতা লক্ষণীয় হয়ে পড়ে। কর্ণাটকে 'দলিত সংঘর্ষ সমিতি', অন্ধ্রপ্রদেশে 'দ্রাবিড় মুক্তি সংঘ' প্রভৃতি উল্লেখনীয় ছিল।
৭০ দশকে বিপ্লবী বামপন্থী ধারায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশের গ্রামাঞ্চলে সংগঠিত হতে থাকে 'দলিত' উত্থান। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লব, দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ, নির্বাচন বয়কট, গণফৌজ এবং গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলা। তবে এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট দেশগুলি হতে স্বীকৃতি অর্জন করলেও অল্পকালের মধ্যেই নানাকারণে স্থিমিত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের মধ্যেও বিভাজন ঘটে যায়। 'দলিত' জনগণের সামাজিক রূপান্তরের স্বপ্নও কিছু 'বিপ্লবী' কথাবার্তার মধ্যে হারিয়ে যায়। 'আম্বেদকর পন্থী' এবং 'মার্কসবাদী' বা 'মার্কসবাদী-লেনিনবাদী' অথবা 'মাওবাদী'-এই সকল গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে চিন্তার দৈন্যতা পরিলক্ষিত হয়। উভয়েই ভারতবর্ষের দেশীয় প্রেক্ষাপটে জাতি সংগ্রাম এবং শ্রেণী সংগ্রামের সমন্বয় সূত্র উদ্ভাবনে কোনো নতুন দিশা দিতে অপারগ প্রতিপন্ন হয়েছে। তবে বিতর্ক যাই থাক, উভয় আন্দোলন একে অপরের পরিপূরক ছিল। ফলে দলিত রাজনীতি ও আন্দোলনের এই অধ্যায়কে 'বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ' বললে অত্যুক্তি হবে না।
দলিত সাহিত্যের উদ্ভব: একটি সন্ধানপর্ব :
কথাপর্ব :
ভারতে দলিত সাহিত্যের প্রসঙ্গ উঠলেই মারাঠি সাহিত্যের অবদানের বিষয়টি সামনে এসে পড়ে। বাংলা সাহিত্যে এই ক্ষেত্রটির বিস্তার কতখানি; তার গভীরতাই বা কতদূর, নির্ধারক বৈশিষ্ট্যগুলিই বা কী কী -এমন বহুপ্রশ্ন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। স্বাভাবিক ভাবেই, বাংলা সাহিত্য সম্ভারের কোন উপাচারগুলিকে এর অন্তর্ভুক্ত করা যাবে তা নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। অত: এই প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে-"বাংলায় দলিত সাহিত্য বলে বাস্তবিক অর্থে কিছু আছে?"
প্রসঙ্গত এ কথাটাও মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, 'দলিত' একটি রাজনৈতিক পরিচিতি। তবে জাতিগত পরিচিতি-এর ভিত্তিভূমি হলেও তা এর সবটুকু পরিচয় নয়। জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে এর সাযুজ্য এইরূপ যে, 'দলিত' আত্মপরিচয়ে নিহিত জাতিভেদ-জনিত মানবিক অবমাননার মূলোৎপাটনের ঐতিহাসিক সংগ্রামের উত্তরাধিকার সেখানে বিদ্যমান। ইন্দ্রনীল আচার্য তাই যথার্থই লিখেছেন: "দলিত একটি রাজনৈতিক আইডেনটিটি। জাতিগত পরিচিতির সঙ্গে এর বিরোধ আছে। এটি দলিতদের আত্মচেতনার দ্যোতক। এক চেতনা যা তাদের শোষিত সত্তার যন্ত্রণাবিদ্ধ। এর মধ্যে এক বৈপ্লবিক সমাজ পরিবর্তনের শপথও রয়েছে।"
মহারাষ্ট্রে প্রথম দলিত সাহিত্য সম্মেলন আয়োজিত হয় ১৯৫৮ সালে; এবং সেখানেই প্রথম 'দলিত সাহিত্য' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ফলে গঠিত হয় 'দলিত সাহিত্য সংঘ'। বাবুরাও বাগলু, বন্ধুমাধপ, অর্জুন ডাঙলে প্রমুখ লেখকদের ভাবনায় এই ধারাটি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালে একদল নব্য মারাঠি লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে 'দলিত প্যান্থারর্স' আন্দোলন দলিত সাহিত্য বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। কালক্রমে এই আন্দোলন ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও বিকশিত হতে থাকে।
প্রসঙ্গত এসেই পড়ে বাংলায় গড়ে ওঠা 'হাংরি আন্দোলন', 'নিম সাহিত্য আন্দোলন' এবং 'পণ্য সাহিত্য বিরোধী আন্দোলন' বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী সাহিত্য আন্দোলনের কথা। এই সকল আন্দোলনগুলির সময়কাল ক্ষণস্থায়ী হলেও এর ব্যপ্তি ছিল সুদূরপ্রসারী। কালক্রমে এই সাহিত্য আন্দোলনের ফলশ্রুতি রূপে গড়ে ওঠে পোস্টমর্ডানিজম সাহিত্য এবং ডায়াসপোরা সাহিত্য। ফলে বাঙালির সাহিত্যচর্চায় 'দলিত সাহিত্য' এই আন্দোলনগুলির উৎকৃষ্ট ফসল রূপে অনেকেই মনে করে থাকেন।
সাম্প্রতিক সময়কালে এই বিষয়টি নিয়ে নানারূপ বাগ্-বিস্তার অনেকটা বেশি হলেও বাংলার সাহিত্য আন্দোলনের পুরাতন ইতিহাসটিকে অবশ্যই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সুতরাং সুনির্দিষ্ট নামকরণের কথা বাদ দিলে বাংলায় চর্যাপদের সময়কাল থেকেই তার ব্যাপ্তি বলে মনে করা হয়। মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যেও 'দলিত' জীবনের অনুষঙ্গ সবিশেষ প্রতীয়মান। নাথ সাহিত্যেও দলিত সংস্কৃতির বিষদ পরিচয় বিদ্যমান।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়- সহ পরবর্তী সময়ের লেখককুল, বিশেষত মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, সুবিমল মিশ্র, কমল মজুমদার, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র, নবারুণ ভট্টাচার্য প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকদের লেখনীতে দলিত জীবনের আর্তনাদ-সংগ্রাম উঠে এসেছে। অদ্বৈত মল্লবর্মনের 'তিতাস একটি নদীর নাম', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি', বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন', নবারুণ ভট্টাচার্যের 'ফ্যাতাডু' বাংলা দলিত সাহিত্যের 'ম্যানিফেস্টো' হিসেবে স্বীকৃত। মহাশ্বেতা দেবী ও অনিল ঘড়াই'এর লেখাপত্র যেন দলিত জীবনের ঘরের কথা।
বাংলায় দলিত লেখকদের আত্মানুসন্ধান ও জনজাগৃতির চেতনার উন্মেষ বিংশ শতকের সূচনা পর্বেই প্রতীয়মান হয়েছিল। ১৯০৯-এ রাসবিহারী রায় সম্পাদিত 'নমশূদ্র দর্পণ' ১৯১৭-তে মুকুন্দ বিহারী মল্লিক সম্পাদিত 'পতাকা' শীর্ষক মাসিক পত্রিকা এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। অতঃক্রমশ আত্মপ্রকাশ করে 'যোগীসখা', 'নমশূদ্র বান্ধব', 'নমশূদ্র হিতৈষী' প্রভৃতি পত্রিকা। পশ্চিমবঙ্গে ৮০ দশকের মধ্যবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা 'বঙ্গীয় দলিত লেখক পরিষদ' এবং পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে গঠিত 'বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা'র মাধ্যমে বিকশিত হতে থাকে দলিত চেতনা।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্যনীয় যে এই বিকাশমান চেতনার পথ বেয়ে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ মৌলিক বিষয়টি হল 'বৃত্ত নির্মাণের সমস্যা'। 'দলিত' বলতে কাদের বোঝাবো সেখান থেকেই মূল সমস্যাটির উৎপত্তি। আবার, দলিত সাহিত্য কেবলই এক বিশেষ জনগোষ্ঠীর জীবনকথা নিয়ে রচিত সাহিত্য; নাকি এক গোষ্ঠীবদ্ধ লেখনশৈলী; না প্রতিষ্ঠান বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন সেইসব নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। অপর দিকে প্রগতিশীল সাহিত্যের সঙ্গে দলিত সাহিত্যের আন্ত:সম্পর্ক নিয়েও কথা কম নয়। আবার 'প্রতিবাদী সাহিত্য' রূপে দলিত সাহিত্য-একটি পরিসর নির্মাণ এবং তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলিও এই পথেই দৃষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন-'সাবঅলটান ভয়েস' বা অন্যস্বর গোছের তর্কবিতর্ক এই প্রসঙ্গে অবশ্যম্ভাবী হয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ জটিলতর হয়ে ওঠে বাংলা দলিত সাহিত্যের বৃত্তের সন্ধান।
দলিত সাহিত্য: বিভ্রান্তি এবং বিতর্ক :
দলিত সাহিত্যের ধরন ও ধারণা সম্পর্কিত আলোচনার প্রেক্ষিতে অনিবার্য ভাবেই সৃষ্টি হয় কিছু বিভ্রান্তি এবং বিতর্ক। 'দলিত সাহিত্য' লেখকের দলিত বংশোদ্ভূত মরমী সাহিত্যিকদের রচনাকে বৃত্তের বাইরে রাখতে হয়। সেদিক থেকে বাংলা কথা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, মানিক - তারাশঙ্কর হয়ে একালের মহাশ্বেতা দেবী কিংবা নবারুণ ভট্টাচার্য অথবা সুবিমল মিশ্র-সহ এক ঝাঁক কৃতী লেখকদের অবদান সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়। কারণ যখন মনে হয় যে, লেখালেখির ক্ষেত্রে 'কমিটমেন্ট'-এর কথাটি যেন বাংলা সাহিত্যে সবার অলক্ষ্যে বহুদিন ধরেই জারি হয়েছে। ফলে মুদ্রার অপর পিঠের যুক্তিটিও বেশ সবল বলেই দৃষ্ট হয়। তাদের মতে 'দলিত সাহিত্য' অনুমান নির্ভর নয়-অভিজ্ঞতাপ্রসূত। এই প্রসঙ্গের সূত্র ধরেই এসে পড়ে আত্মজীবনীমূলক দলিত সাহিত্য। কারণ অধিকাংশ দলিত সাহিত্যই আত্মজীবনী'র আকর-ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে স্বয়ং নিজেদের নির্যাতিত সত্তার উন্মোচন। আবার, এই বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি যে, দলিত-অদলিত বিভাজনের প্রক্রিয়া যেমন বিশেষ কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, দলিতও তেমনই কোনো সমসত্ত্ব একক নয়। দলিতদের বিভিন্ন অংশের মধ্যেকার পার্থক্য কালক্রমে সামনে এলে তার ফল সর্বনাশা হতে বাধ্য। ফলে দলিতদের অভ্যন্তরে 'অগ্রগামী' ও 'পশ্চাৎপদ' অংশের মধ্যেও এই মুহূর্তে একটা দূরত্বের আবর্তও ইদানীংকালে প্রতীয়মান হয়েছে।
দলিত সাহিত্য কি কেবল দলিতরাই গ্রহণ করবেন-নাকি হৃদয়বান অদলিত মানুষেরাও তার সম্ভাব্য পাঠক তালিকায় স্থান পাবেন-এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই পুরাতন প্রশ্নগুলিতে অবগাহন করা যেতেই পারে, কারণ লেখক পাঠক আলাপচারিতার এলোমেলো পথ বেয়ে যে ভাব অ-ভাবের আদান প্রদান ঘটে এবং বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের সেটাই প্রাকৃশর্ত। সুতরাং এই অর্থে যদি কোনও 'অদলিত' দলিত সাহিত্যের পাঠক না হন; বা দলিত মানুষদের কাছে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র, মানিক হতে সুবিমল মিশ্র অথবা মহাশ্বেতা যদি অস্পৃশ্য হয়ে পড়েন, তাহলে বিপর্যয় তো অবশ্যম্ভাবী হতে পারে। প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারতে প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের সূচনাপর্বের অন্যতম অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন: "প্রগতি সাহিত্য আর 'দলিত সাহিত্য' ও তৎসংলগ্ন আন্দোলনকে আলাদা করে দেখা বা রাখা কেন? দুয়েরই তো অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। নিছক সাংগঠনিক তাগিদে স্বতন্ত্র সংগঠন যে হতে পারে না, তা নয়, কিন্তু তাদের মৌলিক সাযুজ্য, ঐক্য, সংগৃতি, একত্র অগ্রগতি বাধ্যবাধকতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।"
আক্ষেপের সুরে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, মহাশ্বেতা দেবী, দেবেশ রায় প্রমুখ সাহিত্যিকেরা যে পথে চলেছেন, সে পথের পথিক বাড়ে না কেন?
দলিত এবং প্রগতি সাহিত্য :
'দলিত সাহিত্য' এর প্রবক্তাগণ সাহিত্যের এই বিশেষ ধারাটির যে বৈশিষ্ট্যগুলির সচরাচর উল্লেখ করেন তার ফলেই এমনই এক বৃত্তের কথা মনে আসে যা এক বিশেষ ধরনের সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষিতেই রচিত। অথচ এটাও সত্যি যে 'দলিত' বলতে যদি ব্যাপকতর অর্থে 'সামাজিক দলন' এর কথা বলা হয় সে ক্ষেত্রে 'অর্থনৈতিক দলন'-ও তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সেদিক হতে দারিদ্র, অশিক্ষা, অনাহার ও মানসিক দাসত্ব, কুসংস্কার ইত্যাদি নানা কিছুই তো 'দলিত' জীবনের অনিবার্য পরিণতি। তাই দলিত সাহিত্য যখন সামাজিক বঞ্চনার কথা বলে, তখন অর্থনৈতিক নিপীড়নের বিষয়টিকে কোনো মতেই উপেক্ষা করা যায় না এবং তারা করেনও না। এখানে সমস্যাটি এই যে, 'দলিত' দের জন্য অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনা হতে মুক্তির যে-কোনো কর্মসূচীর বিষয়ে তথাকথিত 'অদলিত' শোষিত মানুষের কথাকে প্রকৃত অর্থে আলাদা করা যাবে কি?
সামাজিক রূপান্তরের কোনও ইতিবাচক কর্মসূচী কেবলমাত্র কোনো বিশেষ অংশের মানুষের জন্য-'সমপর্যায়ভুক্ত' অন্যান্য অংশের জন্য নয়-এমন কথা বলা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। বরং এমন উদ্যোগকে বেগবান করে তুলতে 'দলিত-অদলিত' শোষিতের ঐক্য সর্বাপেক্ষা জরুরি। নতুবা, পারস্পরিক অনৈক্যে এবং অবিশ্বাসে সামাজিক অগ্রগমনের প্রক্রিয়াটাই আক্ষরিক অর্থে ব্যাহত হবে। শুধু তাই নয়, সামাজিক ক্ষেত্রে যে বিপদ ঘটবে, তার সর্বাধিক প্রভাব লক্ষণীয় হবে দলিত জীবনেই।
অনেকেই 'দলিত সাহিত্য' ও প্রগতি সাহিত্যকে পরস্পরের পরিপূরক রূপে গড়ে তুলতে আগ্রহী। অনেকে আবার শ্রেণীগত অবস্থানের নৈকট্যের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন যে, সাধারণভাবে জাতি-বর্ণের বিচারে যারা দলিত হিসেবে পরিচিত তারা আবার অর্থনৈতিকভাবে শোষিতও বটে। বলাবাহুল্য যে, এমনতরো বিচার ধারায় দলিত ও প্রগতি সাহিত্যের মধ্যে কোনোরূপ 'বার্লিনের প্রাচীর' নেই। ফলে বাংলা দলিত সাহিত্য তখন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে 'দলিত-অদলিত' লেখকের রচনার উত্তরাধিকারে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেছেন: "প্রগতি সাহিত্য ও দলিত সাহিত্যকে যেন ভিন্ন কোটিতে ফেলে সাহিত্যক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নবজীবন সৃষ্টির প্রযত্ন বাধা না পেতে পারে।"
এই প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবে উপস্থিত হয় বামপন্থা ও দলিত ভাবনার মধ্যেকার সমস্বর এবং ভিন্নস্বর-এর কথা। বামপন্থা সাধারণত একটি তাত্ত্বিক ধারণা নিয়েই পথ চলে। বামপন্থীদের মতে, আর্থিক ধনবৈষম্য ও নিপীড়নই যাবতীয় সামাজিক সমস্যার মূলে। সেই কারণে, শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সাম্য উপস্থিত হলে, শ্রেণীগত আধিপত্যের অবসান ঘটাতে পারলেই সামাজিক বৈষম্যের সম্পূর্ণ অবসান হবে। তাদের মতে 'দলিত বিচ্ছিন্নতা' ও অপনোদন এই পথেই সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রশ্ন এসেই যায় যে, সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক অনিবার্যতাই আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে। তা সত্ত্বেও যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে "একদিন নতুন সকাল আসবেই", তা সত্ত্বেও সেই 'ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ' সমাগত না হওয়া পর্যন্ত 'দলিত মুক্তি'র ম্যানিফেস্টো কি স্থগিত থাকবে? আবার, যে সকল দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, সেই সকল দেশে জাতিগত-ধর্মগত বৈষম্য তো থেকেই গিয়েছিল। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ আরও কত উদাহরণ তো আমাদের সম্মুখেই রয়েছে। সব মিলিয়ে সমস্বর যেমন প্রকট; ভিন্নস্বর-এর কোনো ঘাটতি নেই।
ভারতীয় প্রেক্ষাপটে জাত-পাতগত নিপীড়নের ঐতিহাসিক বাস্তবতা যেমন অনস্বীকার্য; ঠিক তেমনই আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোভিত্তিক শোষণব্যবস্থাও কার্যত উপেক্ষণীয় নয়। দলিত আন্দোলনেও তাই মহান বুদ্ধ' এর পাশাপাশি অনিবার্যভাবেই উঠে আসে মার্কস বা আম্বেদকরের নাম। অতএব সেকথা মনে রেখেই বলতে হয় যে, ভারতের প্রগতি সাহিত্যের অগ্রণী লেখককুলকে তাই যান্ত্রিক ভাবনা হতে বেরিয়ে এসে দলিত জীবন ও দলিত সাহিত্য নিয়ে আরও বেশি সংবেদনশীল এবং অনুশীলনকামী হয়ে উঠতে হবে। দলিত সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িক - বিচ্ছিন্নতাবাদী সাহিত্য রূপে গণ্য না করে তার প্রগতিশীল উপাদানগুলিকে বিকশিত করে তোলার প্রয়াসেই সাহিত্যের দুই ধারার মেলবন্ধন সম্ভব বলেই অনেকে মনে করেন।
মহান গৌতম বুদ্ধ, মার্কস-এঙ্গেলস কিংবা আম্বেদকর- এদের দর্শনের মূল মর্ম সংঘই শক্তি। সংঘ শক্তিই পারে জীবনকে জয়ী করতে, বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়, তা সে সাস্কৃতিকই হোক আর রাজনৈতিকই হোক।
ইতিকথার পরের কথা :
বাংলা দলিত সাহিত্যের একটি উপপাদ্য নির্মাণের যে-কোনো প্রয়াসের উপসংহার নির্মাণের প্রয়োজন কিংবা সময় এখনও বোধকরি উপস্থিত হয়নি। একথা কেবল বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়-সামগ্রিক ভাবেই এইরূপ ধারণার যৌক্তিকতা এসে যায়। তবে ধারণাগতভাবে 'দলিত' শব্দের ব্যঞ্জনা সম্পর্কে সহমত হতে না পারলে এ-কাজ আদৌ সম্ভব হবে না এবং সার্বজনীন ভাবে তা আদৌ সম্ভব নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। ব্যাপকঅর্থে আর্থ-সামাজিক নিপীড়ন-এর কথা এবং তৎসহ নানা কুতর্ক-বিতর্ককে পাশে রেখেও যদি অত্যন্ত সরলীকৃত ভাবে একথা বলা হয় যে, ভারতে হিন্দু সমাজে বর্ণভেদী ব্যবস্থার সূত্র ধরেই 'দলিত' চেতনার উদ্ভব, তাতেও কিন্তু যে সমস্যার নিরসন হয় না, এই আলোচনাতেই তা পরিস্ফুট হয়েছে। আবার একথাও উঠে এসেছে যে, ইসলাম-খ্রিস্টান ধর্মে কোনো জাতিভেদ বা বর্ণভেদের স্থান নেই বলে দাবি করা হলেও উভয় সমাজে জাতিভেদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বেদনাদায়কও বটে। এই সকল বিষয়গুলি মনে রেখেই তাই দলিত সাহিত্যের পরিবর্তনশীল তত্ত্বভিত্তি এবং তার বিভিন্ন প্রকাশগুলিকে উপলদ্ধি করে নিতে হয়।
কারণ ভারতে উৎকট জাতিভেদ প্রথা এবং তৎসংশ্লিষ্ট অস্পৃশ্যতার হীনপ্রকৃতি ও নিপীড়নমূলক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে রচিত সাহিত্যকেই সাধারণভাবে দলিত সাহিত্য রূপে আখ্যায়িত করা হয়-একথা সত্য যে দলিত বলতে যতটা না কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে বোঝায়, তার চেয়ে বেশি বোঝায় এমন একটি উপলদ্ধিকে যা সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা তাদের আনন্দ-বেদনা ও সংগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অধ্যাপক সনৎকুমার নস্করের মতে, "দলিত সাহিত্যের আলোচনায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দেবেশ রায়, পশুপতি প্রসাদ মাহাতো, অচিন্ত্য বিশ্বাস, সমরেন্দ্র বৈদ্য, ব্রজেন মল্লিক, নীতিশ বিশ্বাস, বিমলেন্দু হালদারের মতো অসংখ্য দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত লেখকেরা আলোচিত হচ্ছেন, তেমনি বর্ণ পরিচয়ে অদলিত রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ, মহাশ্বেতা দেবী, অভিজিৎ সেন, নবারুণ, স্বপ্নময়, সুবিমল মিশ্রের মতো অগণিত দলিত দরদী লেখকদের নানা রচনা নিয়ে সদর্থক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন যে, প্রান্তিক চিন্তা হতে সরে এসে যদি ওদের সাহিত্যগুলিকে বিচার করা যায় তাহলে তাদের রচনাগুলি দলিত সাহিত্যের ম্যানিফেস্টো'তে গণ্য হবে।
"জনসাধারণকে সঠিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হতে হলে তাদের একই স্বার্থ থাকা দরকার; এবং তাদের স্বার্থ একই হতে হলে প্রয়োজন বর্তমান সম্পত্তি সম্পর্কের পরিবর্তনের; কেন-না এই সম্পত্তি সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত রয়েছে কয়েকটি জাতি কর্তৃক অপরাপর জাতিসমূহের উপর শোষণের বিষয়টি।" -কার্ল মার্কস রচনাবলী, খণ্ড ৬।
আকর গ্রন্থসূচী
১. ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতি, দেবনারায়ণ মোদক, একুশশতক, ২০১৬।
২. দলিত সাহিত্য, সম্পাদনা নীতিশ বিশ্বাস, ঐকতান গবেষণা সংসদ।
৩. মানবিক সত্তা, জর্জ টমসন, ক্রান্তিকাল, ১৯৯২।
৪. মানবাধিকার ও দলিত, দেবী চ্যাটার্জী, অনু: সন্তোষ রানা, ক্যাম্প, ২০১৪।
৫. প্রান্তজনের সাহিত্য চর্চা, সুরঞ্জন মিন্দে, নান্দনিক, ২০১৯।
৬. গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন, সম্পাদনা: ড. সুকোমল চৌধুরী, মহাবোধি।
৭. প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, দুর্গাদাস লাহিড়ী, বসুমতী।
৮. ভারতের সভ্যতা ও সমাজ বিকাশে ধর্ম শ্রেণী ও জাতিভেদ, সুকোমল সেন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।
৯. নকশালবাড়ীর সংগ্রাম ও বিহারের চলমান কৃষক আন্দোলন, বিপ্লবী কৃষক কমিটি'র একটি রিপোর্ট, ১৯৯১।
No comments:
Post a Comment