Tuesday, April 19, 2022

পালি ভাষা এবং সাহিত্য

 

সুমনপাল ভিক্ষু

পালি মধ্যকালীন ভাষার মধ্যে অন্যতম। শৌরসেনী, অর্ধমাগধী, মাগধী, পৈশাচী ইত্যাদি বুদ্ধযুগের ভাষাসমূহ প্রাদেশিক ভাষা ছিল। ভাষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ হতে এই সকল মূলতঃ প্রাদেশিক ভাষা ছিল যা উত্তরকালে ভাষারূপে গণ্য হয়েছিল। মহাবীর, ভগবান বুদ্ধ ইত্যাদি মহাত্মাগণ মগধ এবং তার পাশ্ববর্তী প্রদেশ সমূহে নিজ ধর্মের প্রচার এবং উপদেশ এই প্রাদেশিক ভাষার মাধ্যমে প্রচার করেছিলেন। পরবর্তী সময়কালে তাদের উপদেশাবলি সংকলিত হয়। সেই সময় এই কথ্য ভাষার বিকাশ হতে শুরু করেছিল। সংকলন কাল পর্যন্ত উন্নীত হতে হতে তাতে বিবিধ ভাষিক প্রবৃত্তি সমূহ উৎপন্ন হয়েছিল। এই কারণে তাতে ভাষাগত বৈবিধ্য দৃষ্ট হতে লাগল। বৈয়াকরণগণ এই বৈবিধ্যের উল্লেখ বিকল্পাত্মক স্থিতি রূপে অবলোকন পূর্বক তাকে কোনভাবে নিয়ম নীতির মধ্যে আবদ্ধ করলেন। তাদের সম্মুখে ততদিনে সংস্কৃতের প্রারূপ  উপস্থিত হয়েছিল। সংস্কৃতকে সম্মুখে রেখে তারা পালি, প্রাকৃত ব্যাকরণ সমূহের রচনা করেছিলেন। 

পালির বিকাশ সেই সোপানেরই প্রাচীনতম রূপে এবং যার মাধ্যমে ভগবান বুদ্ধ উপদেশ প্রদান করেছিলেন। সর্বোপরি বৌদ্ধধর্মের বিশেষ প্রচার হওয়ার কারণে তার ( পালি ভাষা) গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি লাভ করেছিল। বৌদ্ধধর্ম মগধ হতে মথুরা, অবন্তী, গুজরাত, অন্ধ্র, তামিল, কর্ণাটক, কাশ্মীর, শ্রীলংকায় উপস্থিত হয় এবং সেখানে প্রথম শতাব্দীতে পালি সাহিত্যের সঙ্গায়ন হয়েছিল। তার এই সুদীর্ঘ যাত্রা স্বাভাবিক রূপে অনেক পরিবর্তন স্বীকার করেছিল। বার্মা, থাইল্যাণ্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, চীন, তিব্বত ইত্যাদি দেশ একদিকে পালি সাহিত্যের সৃজন এবং অপরদিকে তার অনুবাদ এবং টীকা রচনা করে নিজ নিজ দেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করতে সক্ষম হয়েছে।

পালি: বুদ্ধবচন অর্থে :

পরিবর্তনের স্বরূপকে মীমাংসা করার ফলে স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্ন উদ্ভূত হয় যে পালি মূলতঃ কোন প্রদেশের ভাষা ছিলসাধারণভাবে মেনে নেওয়া হয় যে পালি শব্দের প্রয়োগ ভাষা অর্থে প্রায় চৌদ্দ ১৪ শতাব্দীর পূর্বে পাওয়া যায় না। তবে এই তথ্য সার্বিক যে পালি শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধবচন অর্থে ষষ্ঠ শতাব্দীতে হয়েছিল। আচার্য বুদ্ধঘোষ (- শতাব্দীতে) এই শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধবচন বা পালি ত্রিপিটক অর্থে স্বয়ং কদাচিৎ প্রথমবার করেছিলেন। ইমানি তাব পালিযং, নেব পালিয়ং অট্ঠকথায়ং আগত। পাঠান্তরের নির্দেশ করার ক্ষেত্রেও তিনি ' ইতি পি পালি ' ' তি পি পাঠো ' ব্যক্ত করে পালি অর্থে কোথাও কোথাও পাঠ শব্দের প্রয়োগ করেছিলেন। তবে পাঠ শব্দের যথার্থ প্রয়োগ পালি অর্থে না হয়ে পরম্পরাকে ইঙ্গিত করার অর্থে অধিক দেশেই পাওয়া যায়। দীপবংশে পিটকত্তয পালিং তস্সা অট্ঠকথং পি '(২০:২০) তথা চূলবংস -মহাবংসে পালিমত্তং ইধানীতং নত্থি অট্ঠকথা ইধ " ( ৩৭. ২২৭) পালি শব্দ প্রয়োগের সূচনা বুদ্ধবচন বা পালি ত্রিপিটক অর্থে দৃষ্ট হয়। এইরূপে আরো অনেক উত্তরকালীন গ্রন্থে পালি শব্দের প্রয়োগ এই অর্থেই হয়েছে। অর্থাৎ বুদ্ধঘোষ এর পূর্বে পালি শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধবচন অর্থে আমরা দেখতে পাই না। বুদ্ধঘোষ দ্বারা প্রযুক্ত অর্থ চৌদ্দ শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে এবং পরবর্তীকালে তার প্রয়োগ ভাষা অর্থে প্রযুক্ত হতে থাকে কারণে যে বুদ্ধঘোষ পালি রূপে খ্যাত ছিল।

পালি ভাষার বুৎপত্তি :

আচার্য বুদ্ধঘোষ এর পূর্বে  পালি শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ প্রসঙ্গে বিদ্বানগণ যে প্রচেষ্ঠা করেছিলেন তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আমরা এইভাবে করতে পারি :

) পালি শব্দের প্রাচীনতম রূপে পরিচয় হয়তো ছিল কো নামো অযং ভন্তে ধম্মপরিযাযো তি (ব্রহ্মজাল সুত্ত দীর্ঘ  .), ভগবাত অনেক পরিযাযেন ধম্মো একাসিকো (সামঞ্ঞফল সুত্ত দীর্ঘ .এখানে পরিযায় শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধোদেশ অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে।  পলিযায় শব্দের প্রয়োগ সম্রাট অশোকের শিলালেখতে পাওয়া যায়- ইমানি ভন্তে ধম্মপলিযানি.... ভাব্রু শিলালেখ। এই সময় হতে সংক্ষিপ্ত রূপ পালি শব্দ বুদ্ধবচন অর্থে প্রযুক্ত হতে থাকে ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপ তার পালি মহাব্যাকরণ গ্রন্থের ভূমিকায় এই অভিমত ঠিকে স্থাপন করেছেন। পেয্যাল শব্দেও এই শব্দের রূপান্তর অর্থ। 

ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপের এই সিদ্ধান্ত অধিক তর্ক সঙ্গত রূপে প্রতীয়মাণ হয়ে। যদিও পলিযায শব্দের প্রয়োগ অধিক হয়নি তবুও পালি ব্যাকরণের প্রতি ভিত্তি করে পরি -পলি শব্দের পালি রূপ তো হয়ে যায়। ভাষা বিজ্ঞানের দৃষ্টি কোন হতে এই বিষয়টিকে স্বীকার করতে কোনরূপ বাধা বিপত্তি দৃষ্ট হয় না। 

) দ্বিতীয়ত ভিক্ষু সিদ্ধার্থ সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রতি ভিত্তি করে পালি ভাষার উ্দগম এবং তার বিকাশের প্রতি দৃষ্টিপাত পূর্বক পালি বা পালি শব্দকে সংস্কৃত 'পাঠ' শব্দের বিকৃত রূপ প্রস্থাপিত করেছেন। আমরা জানি যে প্রাচীনকালে বৈদিক পরম্পরায় বেদ বাক্যের ক্ষেত্রে 'পাঠ' শব্দের প্রয়োগ করা হত। বৌদ্ধ পরম্পরাতে এসে ব্রাহ্মণ  সম্প্রদায় বুদ্ধ বচণের ক্ষেত্রেও সেই পাঠ শব্দের প্রয়োগ প্রারম্ভ করেছিল। তাদের এই পরম্পরা বৃত্তি সাহিত্য, তন্ত্র, প্রবচণ ইত্যাদি শব্দকেও  সহিত, তন্ত বা তন্তি এবং পাবচন করে দিয়েছিল। এই পাঠ শব্দ ভিক্ষুসংঘে 'পাল' হয়ে গেল। পালি প্রাকৃত ভাষাতে সংস্কৃত মূধর্ণ ধ্বণি '' তে পরিবর্তিত হয়ে যায়। যেমন আটবিক পটচ্চর, দৃঢ় শব্দ পালিতে ক্রমশঃ আলবিক, পলচ্চর, দলহ হয়ে যায়। পরবর্তীতে পাল শব্দটি পালি হয়ে গেল, যেমন অঙ্গুল হতে অঙ্গুলি, সর্বঙ্গ হতে সব্বঞ্ঞূ।  এই বিষয় টিকে আমরা মিথ্যাসাদৃশ্যের উদাহরণ বলতে পারি। অতএব পাঠ>পাল>পালি >পালি শব্দের প্রয়োগ শুরু হল।

ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই  অভিমতটি সত্য হলেও পালি সাহিত্য 'পালি' শব্দের প্রয়োগ দৃষ্ট না হওয়ার কারণে এই মতের আধার ভূমি সরল বলে মনে হয় না। অট্ঠ্কথাতে পালি' স্থানে 'ইতি পি পাঠো' শব্দের প্রয়োগ দৃষ্ট হয়। অতএব এই অভিমতটি সঠিক নয়।

 

 ) তৃতীয় মতের স্থাপনা . বিধুশেখর ভট্টাচার্য পালির ব্যাখ্যা 'পংতি'  সাথে মিলকরণ করে করেছেন। মহাবগ্গে 'পালি' শব্দের প্রয়োগ পংতি অর্থেই হয়েছে। অভিধানপ্পদীপিকা (১২ শতাব্দী)তে 'পালি' অংশ পংতির সঙ্গে বুদ্ধবচনও করা হয়েছে -"তন্তি বুদ্ধবচনং পন্তি পালি" অম্বপালি, দন্তপালি ইত্যাদি শব্দও এই মতকে সমর্থন করে। বুদ্ধঘোষ মও পালি'কে তন্তি অর্থে প্রযুক্ত করেছেন।

) পণ্ডিত তথা বিদ্বান বর্গের এই মতটিকে গ্রহণ করতে একইরূপে আপত্তি হয়েছে যে ত্রিপিটকের মূল রূপকে পংতি'  সাথে কীভাবে সহাবস্থান করা যায়? কারণ  উদান' প্রযুক্ত  পালি শব্দে পালির অর্থ পংতি সঠিক বলে মনে হয় না এবং তার প্রয়োগ বুদ্ধবচনেও পাওয়া যায় না। তবে এই আপত্তি অধিক তর্কনিষ্ঠ নয়। 'পংতি' শব্দ  পরম্পরা' সূচক এবং বুদ্ধবচনের প্রয়োগ তার অলিখিত বা লিখিত অবস্থাতে হয়েছিল। অতএব পংতি শব্দের অর্থে পালি শব্দের প্রয়োগ ভ্রমমূলক নয়। বুদ্ধঘোষ এর অর্থ তথা প্রয়োগ পরম্পরা অর্থে করেছিলেন।

তবে এর পরেও বিদ্বানগণ অনেক অবধারণার জন্ম দিয়েছেন। যেমন ম্যাক্সমূলার পাটলি বা পডলি (পাটলিপুত্র)  '  সংক্ষিপ্ত রূপ পালি মনে করেছেন, কেউ বা 'পল্লি' ভাষা(গ্রামীণ ভাষা) কে পালি বলেছেন আবার কেউ তার সম্পর্ক প্রালেয়  বা প্রালেয়ক (প্রতিবেশী)' এর সঙ্গে প্রস্তাপিত করেছেন। তবে এই সকল মত স্বীকৃত হয় নি। 

) ভরতসিংহ উপাধ্যায় অভিধানপ্পদীপিক'তে প্রদত্ত  পংতি শব্দের বুৎপত্তি'  প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন- পালি পা রক্খণেতি, পাতি রক্খতীতী পালি; পালী তি একচ্চে তন্তি বুদ্ধবচনং,পন্তি পালি, ভগবতা বুচ্চ মানস্স অত্থস্স্ বোহাদস্স দীপনাতো সদ্দো এব পালি নামা তি গণ্ঠিপদেসু  বুত্তং তি অভিধম্মট্ঠ্কথায লিখিতং। যে বুদ্ধ বচনকে রক্ষা করে সে পালি। এই  প্রসঙ্গে বট্টগামিনী সঙ্গীতির মাধ্যমে বুদ্ধ বচনের রক্ষা করেছিলেন। দীপবংস(২০.২০.২১) এবং মহাবংসে(৩৩.১০০-১০১) নিন্ম গাথাতে) এই  অর্থে ত্রিপিটক এবং অট্ঠ্কথাকে পালি বলা হয়েছে। পরিযায় ইত্যাদি অর্থেও এই শব্দতে  সন্ধান করা যেতে পারে -

পিটকত্তং পালিং তস্সা অট্ঠ্কথং পি চ। 

 মুখপাঠেন আণেসুং পুব্বে ভিক্খু  মহামতি।।   

হানিং দিস্বাণ সত্তাণং তদা ভিক্খু সমাগতা

 চিরট্ঠিতত্থং  ধম্মসস  পোত্থকেসু লিখাপযুং ।।

 

সমীক্ষা :         

পালি শব্দ পংতির সূচক হয়। বলা হয় যে এই শব্দ নেপালের মধেশ প্রদেশ হতে সম্পর্ক যুক্ত। এখানে 'নে' শব্দটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অন্য ভাষার সঙ্গে পার্থক্য স্থাপন করার প্রশ্নে এই পালি শব্দের প্রচলিত হয় যা পংতির অর্থ দ্যোতিত করে।অট্ঠ্কথাতে এই অর্থের প্রতি বিশেষ ভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। চাইল্ডার্স এই অর্থকেই প্রামাণ্য রূপে গ্রহণ করেছেন। তিনি একে মগধের ভাষা বলে গণ্য করেছেন এবং অর্থ করেছেন পালি ভাষার তাৎপর্য হল পালি গ্রন্থের পরম্পরা। আর এটাই হল  থেরবাদী গ্রন্থের মূল ভাষা ছিল। অশোকের পশ্চিমী শিলালেখ'তে এর প্রয়োগ হয়েছে। অতএব সম্ভবত পালি উত্তরকালে মগধ হতে গুজরাত পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। এও সম্ভব যে প্রারম্ভিক স্তরে পালি নেপাল এবং মগধবর্তী প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল।পালি প্রাকৃত পরিবারের ভাষা যাকে সর্ব প্রথম  শ্রীলংকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল খ্রীঃ পূর্ব প্রথম শতাব্দীতে। আর এই বিষয়টি অবলোকন করা প্রয়োজন যে কতিপয় সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও এর সম্পর্ক না তো ঋ্গবেদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর না তো সংস্কৃতের সঙ্গে। 

ষ্টেনকেনো, ফেলিক্স লকোট এবং আলফ্রেড মাস্টার পালির সম্পর্ক পৈশাচীর সঙ্গে স্হাপন করেছেন এবং বলেছেন প্রথমদিকে একে পৈশাচী বলা হত। তবে অট্ঠ্কথা তাকে মগধ প্রদেশের ভাষা বলেছেন। অশোকের গিরনার শিলালেখের ভাষা এবং হাতিগুম্ফা শিলালেখের ভাষাতে বিশেষ সামঞ্জস্য রয়েছে। বুদ্ধঘোষ অনুসারে এর অনুবাদ সিংহলীতে হয়েছিল। রিস ডেভিডস পালিকে জনগণের  ভাষা বলেছেন এবং এর ব্যাপ্তি এই সমগ্র প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গাইগারও এই সিদ্ধান্তকে  সমর্থন করেছিলেন। চাইল্ডার্স এই ভাষাকে প্রাচীন মাগধী বলেছেন এবং ম্যাক্সমূলার  এর সম্পর্ক পাটলি বা পাডলি' সাঙ্গে যুক্ত করেছেন।

আধুনিক ভারতীয় বিদ্বানগণও এই বিষয়ে  ভাবনা চিন্তা করেছেন। ভিক্ষু বোধি বলেছেন পালি তৎকালীন প্রাকৃত ভাষার মিশ্রিত রূপ ছিল। ওয়াডার্র পালিকে পশ্চিম ভারতের কথ্য ভাষা বলছেন। তিনি পালি'কে অবন্তী জনগণের ভাষা বলেছেন যেখানে থেরবাদ অধিক লোকপ্রিয়  ছিল এবং পুনঃ তাকে গিরনার লেখে' সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ বলেছেন। . বাপত পালিকে অর্ধ মাগধীর সাহিত্যিক রূপ বলেছেন।সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, নলিনাক্ষ দত্ত ইত্যাদি বিদ্বানের এই মত কোন না কোন দৃষ্টিকোণ হতে সত্য। পালি যেহেতু কথ্য ভাষা ছিল অতঃপর সম্পূর্ণ প্রাকৃত হতে হওয়াটাই স্বভাবিক ছিল কারণ তা ভাষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ হতে প্রাকৃতের- প্রাচীনতম অংশ ছিল।পালির প্রতিটি শব্দ প্রাকৃতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।  উত্তরকালে সংস্কৃতের সঙ্গে পালির অবশ্যই সম্পর্ক হয়েছিল তবে তা ছিল আংশিক। অট্ঠ্কথাতে পালিকে কথ্য ভাষা বলা হয়েছে। সংস্কৃতকে যদিও শ্রদ্ধাবশতঃ দেবভাষা বলা হয় কিন্তু ভাষা হওয়ার কারণে তাতে পরিবর্তন অত্যন্ত সামান্য হয়েছিল।পরিবর্তন হয় কথ্য ভাষাতে যা আমরা প্রাকৃততে অবলোকন করি।

রিস ডেভিডস্ , তাকাকুসু, অনেসকী, সুজুকী, চন্দ্রদাস, নাগই, বুদ্ধদত্ত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, কোশাম্বী, বি.এম.বড়ুয়া, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, শরৎচন্দ্র দাস, ভন্তে সুমঙ্গল, বাপটহরমথডে, অনাগারিক ধর্মপাল, লেভি সয়াবে, গুণরত্ন জয়তিলক, নারদ, ডি-সিলভা, তেলঙ্গ, জোয়স, মৌঙ্গতিন, মলালসেকের, ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপ, রাহুল সংকৃত্যায়ন, ভরত সিংহ উপাধ্যায় পালি এবং পালি সাহিত্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

পালি ভাষার প্রারম্ভিক রূপ বৈদিক এবং ছান্দস সাহিত্যে পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ- দেবেভিঃ, দেবেহি, যমামসেপচ্চরে, কাতবে ইত্যাদি ভাষার যর্থাবত্ রূপ পালিতে পাওয়া যায় তবে সংস্কৃততে বিলুপ্ত হয়েছে।

 

ভাষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ হতে পালির  অন্তভার্ব প্রাকৃততে হয়ে যায়। তবে তথাগত বুদ্ধ মাগধী বা পালির যে রূপে উপদেশ প্রদান করেছিলেন তার পৃথক সত্তা হয়ে যাওয়ার কারণে পালিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হতে থাকে। অন্যথা তাকে আমরা প্রাকৃতের প্রাচীনতম রূপ করতে পারি। পালি-প্রাকৃত কথ্য ভাষা ছিল তার বিকশিত রূপ আধুনিক ভারতীয় ভাষাতে দৃষ্টব্য হয়। অপরদিকে সংস্কৃতের কোন বিশেষ বিস্তার হয়নি এইকারণে তা বস্তুতঃ লোকভাষা ছিল না।

সর্বপ্রথম পালি শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধনাম অর্থে প্রযুক্ত হয়েছিল এবং পুনঃ তন্তি, পলিযায় ইত্যাদি অনেক সোপান অতিক্রম করে এই পালি শব্দ কালান্তরে স্থবিরবাদী ত্রিপিটকের মূল ভাষার অর্থে প্রযুক্ত হতে থাকে। বস্তুতঃ তার মূল শব্দ ছিল মাগধী। তথাগত বুদ্ধ মাগধীতেই নিজ ধর্মোপদেশ প্রদান করেছিলেন। কচ্চান ব্যাকরণে তাকে মূল ভাষা রূপে সম্মানিত করা হয়েছে- ''সা  মাগধী মূল ভাসা ....  সম্বুদ্ধ চাপি ভাসরে''

সমন্তপাসাদিকাতে বুদ্ধঘোষও এর সমর্থন করেছেন-"সম্মসম্বুদ্ধেন বুত্তপ্পকারো মাগধকো বোহারো।" শুধু তাই নয়, তিনি তো আস্থাবশতঃ তাকে "মাগধিকায়  সব্বসত্তানং মূলভাসায" বলে গৌরবান্বিত  করেছেন। তার অনুকরণ করে চূলবংস(পরি.৩৭)'তে "সব্বেসং মূলভাসায মাগধায নিরূত্তিযা" বলা হয়েছে। অট্ঠকথার ভাষাকে মাগধী বলা হত। রেবত স্থবির বুদ্ধঘোষকে আদেশ দিয়েছিলেন যে তিনি যেন অট্ঠকথাকে  পালিতে অনুবাদ করেন- "মাগধানং নিরূত্তিযা পরিবত্তেহি" যাকে বুদ্ধঘোষ এই বলে অনুকরণ করেছিলেন- "পরিবত্তেসি সব্বা পি সীহলট্ঠকথা  তদা।"

তাকেই উত্তরাঞ্চলে পালি বলা হয়ে থাকে এইভাবে মোগ্গ্ল্লাণ(১২ শতাব্দী) 'ভাসিস্সং  মাগধী সদ্দলক্খ্ণ' বলেছেন, এই মাগধী ভাষা প্রায় ১৪ শতাব্দীতে পালি নামে প্রচলিত হয় গেল।

পালির অর্থ অভিধানপ্পদ্দীকা'তে  'সেতুস্মিং তন্তি মন্তাসু নারিযং পালি কথ্যতে' বলা হয়েছে(৯৯৬) এখানে তার প্রয়োগ  অর্থে সূচিত হয়- সেতু, তন্তি এবং মন্ত। সেতুর অর্থ পরম্পরা হতে পারে। সম্ভবতঃ সেতু অর্থ করার ক্ষেত্রে মোগ্গল্লান থের এর সমক্ষে অশোকের ভাব্রু শিলালেখতে প্রযুক্ত 'পলিযায় ' শব্দের অর্থ ছিল। ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপের মত এই অর্থে প্রযুক্ত হওয়া উচিত(পালি মহা-, ব্যাকরণ, ভূমিকা) পালির অপর অর্থ তন্তি বা পংতি দেওয়া হয়েছে। এই পংতি বুদ্ধ-বচন পরম্পরার প্রতীক। বিধুশেখর ভট্টাচার্যের মতে এই পংতি হতে সমবদ্দ হয়েছে। পালির তৃতীয় অর্থ মন্ত (মন্ত্র) দেওয়া হয়েছে, যাকে আমরা মন্ত্রনা, বিচারণা অর্থাৎ পাঠ করতে পারি। ভিক্ষু সিদ্ধার্থের অভিমত এই অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। 

পিটক শব্দের (অর্থ) অভিধানপ্পদ্দীপিকা'তে 'পিটকং ভাজনে বুত্তং তথেব পরিপত্তিযং (৯৯০) করা হয়েছে। বুদ্ধঘোষও  অট্ঠ্সালিনী নিদানকথাতে ''পিটকং পিটকতথা বিদূ পরিযত্তি ভাজনতথতো আহু" বলেছেন। পিটকের অর্থ এখানে ভাজন এবং পরিপত্তি (পরম্পরা)করা হয়েছে। এই পরম্পরা বুদ্ধ বচন রূপে স্বীকৃত। অর্থাৎ বুদ্ধবচনকে এক পরম্পরা হতে(প্রজন্ম)হতে অপর পরম্পরা (প্রজন্ম)পর্যন্ত উপনীত করার সাধন অথবা ভাজনকে পিটক বলা হয়। মোগ্গল্লান থের দীঘানিকায় অর্থে আগম শব্দেরও প্রয়োগ করেছেন(৯৫১)

পালি শব্দ ভাষা অর্থে বস্তুতঃ ১৩-১৪ শতাব্দীতে প্রযুক্ত হয়েছে একথা সত্য। তবে এই সময় পর্যন্ত এই শব্দের প্রয়োগ সংস্কৃত- প্রাকৃততে বিবিধ অর্থে প্রযুক্ত হতে থাকে। উদাহরণতঃ সংস্কৃততে এর প্রয়োগ অনেক অর্থে হয়েছে- . মর্যাদা সীমা, . পংতি, . স্থান, . সেতু, . অন্তঃকরণ, . দীর্ঘকার জলাশয়, . গ্রন্থ, . গুরু দ্বারা শিষ্যের সংরক্ষণ। এই অর্থ কোন না কোন ভাবে পালি শব্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পালি শব্দের প্রয়োগ পালি বা্ঙময়তেও এই অর্থে হয়েছে- যেমন পংতি (দাঠাবংস,.৬১; সুত্ত নিপাত অট্ঠকথা. ৮৭)।পালি শব্দের প্রয়োগ পিটকে হয় নি। তার বিকসিত এবং ধ্বন্যাত্মক অর্থের প্রয়োগ অট্ঠ্কথা সাহিত্যে অবশ্যই হয়েছে(পালিতো অট্ঠ্প্পত্তিতো, ধম্মপদ অট্ঠ্কথা. .৯৩) পালি বণ্ণনা শব্দও সেখানে পাওয়া যায় (জাতক -৫৫, . ১২৭; মিলিন্দপঞ্হো . পঠবো লোকং পালেতি)ইত্যাদি। শব্দও সেখানে পাওয়া যায় (বিসুদ্ধি.মগ্গ ২৪০)।পালেতি(পালমতি) রক্খতি শব্দও অনেকবার প্রযুক্ত হয়েছে(-৫৫, .১২৭; মিলিন্দপঞ্হো . পঠনী লোকং পালেতি) ইত্যাদি। 

প্রাকৃত সাহিত্যতেও এই শব্দ জনপ্রিয় হয়েছিল এই সকল অর্থে। ভগবতী সূত্র (.৮০)এবং প্রশ্ন ব্যাকরণাংগ'তে পালি, অন্তকৃতদশাঙ্গ(.৮১,১০১)তে পালী এবং পালিত ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ পরম্পরা এবং সংরক্ষণ অর্থে রূঢ় হয়ে গিয়েছিল। বৃহৎকল্পভাষ্য (৩৭০৬)তে পালী শব্দের প্রয়োগ উপাশ্রয় বা প্রবাস স্থল'এর পালন/সংরক্ষণ অর্থে হতে লাগল। অঙ্গবিজ্জা (পৃঃ২৪১)তে তার প্রয়োগ  মর্যাদা অর্থে হয়েছে।

পালি/পালী  শব্দের এই সকল অর্থ সমীক্ষা করার ফলে এইরূপ মনে হয় যে প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মতে বুদ্ধ বচনের সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অধিক ছিল। সুভদ্র ইত্যাদি বুদ্ধ ভিক্ষু হতে ভগবান বুদ্ধের বচনের প্রতি আঘাত তথা আক্রমণ শুরু হয়েছিল। মহাসাংঘিক, মহাযান সম্প্রদায় তাঁর দেশনা সমূহকে এদিক-ওদিক করে নবীন অর্থকে বিস্তার করতে শুরু করেছিল। এইরূপ বিষম পরিস্থিতিতে বুদ্ধ বচনকে যথাসম্ভব মূল রূপে সুরক্ষিত রাখার আন্দোলন শুরু হল। এই ক্ষেত্রে পালি শব্দ হতে অধিক সার্থক ভিন্ন কোন শব্দ বৌদ্ধ আচার্যগণ অবলোকন করেন নি।

বুদ্ধঘোষ হতে ১৩-১৪ শতাব্দী পর্যন্ত এই শব্দ থেরবাদে ভাবাত্মক সম্পর্ক  স্থাপন করেছিল এবং পালি শব্দের প্রয়োগ মূল বুদ্ধ বচন রূপে স্থির হয়ে গেল। তবে এই বিষয়চিত্ত উল্লেখ্যনীয় যে এই দীর্ঘ সময়ের অন্তরালে বুদ্ধবচন প্রচার প্রসারের চিন্তাকে অবদমিত করা যায় নি। এমন কি অট্ঠ্কথারগণ বুদ্ধবচনের অনেক অর্থ পরিবেশন করেছিলেন এবং সেই সকল বুদ্ধ পরম্পরার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এই কারণে পালি শব্দের প্রয়োগ বুদ্ধবচন, পরম্পরা এবং পাঠান্তরণ হতে যুক্ত হয়েছে, কোন এক অর্থে নয়।

 

পালি এবং মাগধী :

বস্তুতঃ এই পালি এবং মাগধীর  বিষয়ে অত্যন্ত বিবাদগ্রস্থ এবং সমস্যাপূর্ণ। এর সম্পর্ক মধ্যকালীন ভারতীয় ভাষার যুগ(৫০০ খ্রীঃ পূর্ব  হতে ১০০০ খ্রীঃ পর্যন্ত) হতে সম্পৃক্ত। একে আমরা জন ভাষা বলতে পারি। ঋ্গবেদ কাল হতে শুরু করে এই ভাষা জনগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং যথাসময় সংস্কৃতের সঙ্গে প্রবাহিত হয়ে বিকশিত হয়েছিল।একে আমরা সাধারণ শব্দে প্রাকৃত বলা যেতে পারে। এর মধ্যে ঋ্দবেদ এবং অন্য বৈদিক গ্রন্থে প্রাকৃত ভাষার বীজ নিহিত ছিল। বৈদিক সংস্কৃত হতে পাণিনি লোকিক সংস্কৃতের রূপ প্রদান পূর্বক সংস্কৃতকে স্থির করে দিয়েছিলেন কিন্তু প্রাকৃত জনভাষা হওয়ার কারণে স্থির করা সম্ভব হয় নি। প্রাদেশিক স্থরে এই ভাষা বিবিধ রূপ ধারণ করেছিল। তার মাগধী রূপকে এই প্রাদেশিক রূপের একটি অংশ বলা যায়।

ভগবান বুদ্ধ মাগধীতে নিজ ধর্মোপদেশ প্রদান করেছিলেন।পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্ম প্রচার-প্রসার বৃদ্ধি লাভ করে এবং বুদ্ধ তা (ধর্ম দেশনা)নিজ নিজ ভাষায় অনুদিত করার অনুমোদন প্রদান করেছিলেন। এই কারণে মাগধী' যথার্থ বৈয়াকরণিক রূপ পরবর্তিত হয়েছিল। ত্রিপিটক মূল বুদ্ধবচন রইল না। তাতেও ভাষাগত বৈবিদ্য দৃষ্ট হতে লাগল। মাগধী' '' এবং '' ত্রিপিটক এবং অট্ঠ্কথাতে দৃষ্ট না হলেও উড়িষা, বিহার এবং উত্তর প্রদেশ হতে প্রাপ্ত অশোকের শিলালেখতে দেখতে পাওয়া যায়। প্রাচীন সুত্ততেও তার এইরূপ  উত্তম রূপ দৃষ্ট হয়। পশ্চিমোত্তর ভারত হতে দক্ষিণ ভারত এবং শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত যাত্রা করার ফলে  ত্রিপিটক তার মূল রূপকে কতটা রক্ষা করতে পেরেছিল এই প্রশ্ন থেকেই যায়। শৌরসেনী, মহারাষ্ট্রী প্রভাব হতে তাকে মুক্ত কীভাবে সম্ভব হত? ফলে পূর্বীয় মাগধী ভাষাতে পরিবর্তন হওয়াটাই স্বভাবিক ছিল।

পালি কোন প্রদেশের ভাষা ছিল? :       

 পালি বস্তুতঃ কোন প্রদেশের ভাষা ছিল, এই বিষয়ে পণ্ডিত বর্গের মধ্যে নানাবিধ বিতর্ক রয়েছে। রিস ডেভিডস্ তাকে কোসল প্রদেশের ভাষা  বলেছেন এবং ওয়েষ্টেরগার্ড  এবং কু্হন তাকে গিরনার অশোকের শিলালেখ হতে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করে উজ্জয়িনী প্রদেশের ভাষা বলেছেন। ফ্রেঙ্ক এবং বিন্ধ্য প্রদেশকে পালি ভাষার উ্দগম বলেছেন এবং ওল্ডেনবার্গ মূলার তাকে কলিঙ্গের মূল ভাষা বলেছেন। বিদ্ধানগণের এই অভিমত হতে এই তথ্য উঠে আসে যে পালি কোন একটি বিশেষ প্রদেশের ভাষা ছিল না। এই বিষয়টি সত্য যে ভগবান বুদ্ধ কোশল প্রদেশের অন্তর্গত কপিলবাস্তুতে উৎপন্ন হয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক -ভৌগোলিক সীমা পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে ভাষার প্রাদেশিক স্তর পরিবর্তিত হতে শুরু করেছিল। মাগধী ভাষা বস্তুতঃ অর্ধমাগধীর ন্যায় এক মিশ্রিত ভাষা হয়ে পড়েছিল এবং তার এবং যুক্ত রূপ উত্তরকালে সমাপ্ত হয়ে পড়লে ত্রিপিটক সঙ্গায়নকাল পর্যন্ত তা প্রায়  অদৃশ্য হয়ে গেল।

এই তথ্য প্রচ্ছন্ন নয় যে পালি /মাগধীতে পশ্চিমী ভাষার প্রভাব সর্বাধিক পড়েছিল। তবুও মাগধীর রূপ সমাপ্ত করা সম্ভবপর হয় নি।প্রাচীন মাগধীকে অবলোকন করা যেতে পারে। উত্তরকালে পালি থেরবাদী গ্রন্থের ভাষা রূপে প্রযুক্ত হলে এবং প্রাকৃতের বিকাশ যথাসময়ে হতে থাকল। আধুনিক ভারতীয় ভাষা সমূহ  প্রাকৃতের ভূমিতে দণ্ডায়মান আছে, দ্রাবিড় ভাষা সমূহেও প্রাকৃত তথা শৌরসেনী' প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

পালি এবং প্রাকৃতের অসামনতা :           

প্রাকৃতের বিস্তৃত ঘেরাটোপে যদিও পালি সমাবিষ্ট হয়ে যায় তবুও প্রাদেশিক ভাষার সমান তাতে কতিপয় বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ আলোচনা করা যেতে পারে।

যেমন) প্রাকৃততে ' এর পরিবর্তন 'তে হয়। যেমন বেদনা -বিঅনা। তবে পালিতে কোথাও কোথাও হয়। দ্বেষ- দোস। 

) প্রাকৃততে ' এর পরিবর্তন ' হয়। বিতস্তি-বিহত্থি পালিতে বিদত্থি হয়। ) প্রাকৃততে ' এর পরিবর্তন ' হয়। বিতস্তি-বিহতিথ। তবে পালিতে বিদতি্থ হয়। 

) পালিতে প্রথমা তথা দ্বিতীয়ার বহুবচনে প্রাকৃতের নো প্রত্যয়ের ন্যায় নো প্রত্যয় হয়। যেমন-সারভতিনো, গহপতিনো ইত্যাদি।          

 ) পালিতে   হয়। পবচন  এবং -বেলু।  

) প্রাকৃত তে পুঢবী থেকে পুহবী হয় কিন্তু পালিতে পঢবী হয়। 

 ) প্রাকৃততে কতিপয়  কহবাহ হয় এবং পালিতে কতিপাযাহ  রূপ হয়। 

) প্রাকৃততে   হয়- ললাট-ণলাভ।  পালি তে হয়  নঙ্গল, পজান।

৮। প্রাকৃততে ক্ষ  বা চ্ছ হয়- ক্ষণ -ছন, অক্ষ- অচ্ছি, পালিতে ক্ষ  ক্খ  হয়। পক্ষ -পক্খ।    

) প্রাকৃত তে  ভম্ হয়।  কুভ্মল-কুম্পল। পালিতে ভুম হয় কুভুমল।    

১০) প্রাকৃত তে হ্ল  ল্হ হয়। প্রহ্লাদ - পহ্লাঅ।  পালিতে হ্লাড  হিলাড হয়।  

 ১১) প্রাকৃত তে সব্ব রূপ পালিতে স্ব্রব হয়।     

১২) প্রাকৃত তে সাধারণতঃয  হয় কিন্তু পালিতে হয় না।৷ 

 ১৩)পালিতে ভূতকাল (অতীত)সূচক 'এর আগম হয় তবে প্রাকৃত তে হয় না।

১৪)পালিতে প্রাকৃতের সমান প্রেরক প্রত্যয় যুক্ত হয় তবে পাথর্ক্য এই যে আব' এর স্থানে আপ  তথা আবে' এর  স্থানে আপে প্রত্যয় হয়। করাব, করানে' এর স্থানে পালিতে  কারাপেমি, কারাপেথ।  

১৫কর্মি নি প্রয়োগে প্রাকৃত তে ঈয, ইজ্জ প্রত্যয় হয় তবে পালিতে , ইয, ঈয প্রত্যয় হয়।   

 

১৬) প্রাকৃত তে রায(রাজা)শব্দ পালিতে রাজ হয়।প্রাকৃত তে রাইনা,পালিতে রঞ্ঞা হয়। 

১৭) প্রাকৃত তে  হেত্বর্থ  কৃদন্ত তে তুল এবং তয় প্রত্যয় হয় কিন্তু পালিতে তুং তথা তবে'এর প্রয়োগ হয়। ভূতকৃদন্ত তে প্রাকৃত তে তুন, তুআন,ইত্তান ইত্যাদি প্রত্যয় হয়। অপরদিকে পালিতে ত্বা, ত্বান,তূণ  বা প্রত্যয় হয়।যেমন- করিত্বা-করিত্তা,কত্তুন- কাতুন ইত্যাদি।   

এই কতিপয়  বৈশিষ্ট্য প্রাদেশিক ভাষাকে স্বরাত্নক এবং ব্যঞ্জনাত্নক পরিবর্তনের প্রতি সংকেত করে। পালি যেহেতু প্রাকৃতের প্রারম্ভিক অবস্থা ছিল ফলে এতে এক শব্দের রূপ অধিক দৃষ্ট হয় না, তবে প্রাকৃত তে এই রূপ অনেক পাওয়া যায়।

 পালি ব্যাকরণ এবং তার সম্প্রদায়:

 পালি ব্যাকরণে সাধারণতঃ ৩টি সম্প্রদায় দৃষ্ট হয়। যেমন কচ্চায়ন, মোগ্গল্লায়ন এবং সদ্দনীতি। তবে এর মধ্যে কচ্চায়ন সম্প্রদায় সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। এর সময় সাধারণতঃ -  শতাব্দী মনে করা হয়। এই সময় তা সিংহল দ্বীপে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। কচ্চায়ন ব্যাকরণে ৬৭৫টি সূত্র বিদ্যমান। এই ব্যাকরণে সংস্কৃত ঐন্দ্র ব্যাকরণের প্রভাব অধিক।

. মোগ্গল্লান তাঁর ব্যাকরণ পরাক্রম ভূজের শাসনকালে রচনা করেছিলেন (১১৫৩-১১৮৩ খ্রীঃ) . সদ্দনীতি সম্প্রদায়ের সংস্থাপক ব্রহ্মদেশের অগ্গবংস ছিলেন। তিনি তাঁর গ্রন্থ (সদ্দনীতি ব্যাকরণ)১১৫৪ খ্রীঃ রচনা করেছিলেন এই গ্রন্থে ১৩৯১ টি সূত্র আছে। প্রথম ২টি সম্প্রদায় অপেক্ষা এই সদ্দনীতিতে  প্রগল্ভতা অধিক। এই সকল সম্প্রদায়ের ব্যাকরণ গ্রন্থের বিষয়ে বিদ্বানগণ  টীকা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। 

পালি-প্রাকৃতের এই অন্তঃ সম্পর্ক উভয় ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিল। এই উভয় ভাষা মধ্যকালীন আর্য ভাষার আর্য প্রাকৃত। পালি-প্রাকৃত ভাষার বিদ্ধান এবং বৈয়াকরণগণ পালি প্রাকৃতকে ২রূপে অবলোকন করেছিলেন। যেমন- . তার ছন্দস্  ভিত্তি এবং . জনভাষা। বৈদিক প্রাকৃততত্ব উত্তরকালে দেশী শব্দ হয়ে যায়। প্রাকৃত যেহেতু সমগ্র ভারতের ভাষা ছিল ফলে তাতে একই শব্দের অনেক রূপ পাওয়া যায়। বস্তুতঃ পালি প্রাকৃতের প্রথম অবস্থা ছিল যা এক সীমিত প্রদেশ হতে বৌদ্ধ গ্রন্থে স্থিরতা লাভ করেছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু বিদ্বান তার প্রকৃতিকে সংস্কৃততে সন্ধান করে ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তবে সংস্কৃতে পরিবর্তনের স্থিতি ছিল না। অপর দিকে পালিতেও শব্দ রূপের বৈবিধ্য অধিক প্রাপ্ত হয় না। সর্বোপরি এই কথা বলা যায় যে পালি-প্রাকৃতের অন্তঃ সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল।

পালির মূল আধার:    

এখানে উল্লেখ্যনীয় যে লূডর্স অশোকের শিলালেখ এবং অশ্বঘোষের নাটকের প্রতি ভিত্তি করে এই বিষয়টি প্রমাণ করার প্রচেষ্ঠা করেছিলেন যে পালির মূল আধার প্রাচীন অর্ধমাগধী হওয়া উচিত। সম্ভবতঃ মহাবীরও মাগধীতেও উপদেশ প্রদান করেছিলেন। শেতাম্বর সম্প্রদায় দ্বারা স্বীকৃত আগম গ্রন্থ পঞ্চম শতাব্দীরই পরিনাম যখন দেবধিগণি ক্ষমাশ্রমণ তার সম্পাদন করে বর্তমানে প্রাপ্ত আগম কে স্থির করেছিলেন।এই আগমে প্রাপ্ত অর্ধমাগধীর বিকাশ পালির উত্তরকালে হয়েছিল। শৌরসেনী এবং অর্ধমাগধীর রূপ তাতে অবশ্যই দৃষ্ট হয় তবে তার সংমিশ্রণের ফল। পালি ত্রিপিটকের সঙ্গায়ন প্রথম শতাব্দীতে হয়েছিল।প্রায় ৫০০ বর্ষের মধ্যে ভাষার বিকাশ হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিছু ভিক্ষু এই মিশ্রণকে দূষণ মনে করে পালি মাগধীর রূপকে ছান্দসে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন (সকায়-নিরুত্তিযা  বুদ্ধবচনং দূসেন্তি, ইন্দ মযং ভন্তে বুদ্ধবচনং ছন্দসো আরোপেমাতি)তখন বুদ্ধ তাকে দুষ্কৃত অপরাধ সংজ্ঞা প্রদান পূর্বক সকলকে নিজ নিজ ভাষাতে শিক্ষার অনুজ্ঞা প্রদান করেছিলেন ( অনুজাণামি ভিক্খবে  সকায নিরুত্তিযা বুদ্ধবচনং পরিযাপুনিংতু - চুল্লবগ্গ)

গাইগার মতে এখানে বুদ্ধঘোষ সকায-নিরুত্তিয়া' অর্থ মাগধী করেছেন।অতএব পালি ত্রিপিটকের মূলাধার মাগধী মনে করা উচিত। উত্তরকালে তাকে সংস্কৃততে রূপান্তরিত করা হয়। এই আলোচনা হতে এইটি স্পষ্টতর হয় যে পালি প্রাকৃতেরই প্রাচীনতম অংশ এবং প্রাকৃততে শৌরসেনী প্রাকৃত প্রাচীনতম এবং মূখ্য। বররূচি তাঁর প্রাকৃত প্রকাশে মাগধী এবং পৈশাচীর প্রসঙ্গে শৌরসেনী(১০.-,১১,-)বলে এইটি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে মাগধী এবং পৈশাচীর প্রকৃত শৌরসেনী এবং শৌরসেনীর প্রকৃত সংস্কৃত(প্রকৃতিঃ সংস্কৃতম্ ১২--) পালি সংস্কৃতের অধিক নিকটবর্তী  ভাষা। আর এই কারণেই পালিতে শৌরসেনী তত্ত্ব অধিক প্রাপ্ত হয়। সুতরাং এই পালি প্রাচীন মাগধী এবং শৌরসেনী'রই  রূপান্তর ভাষা। ভরত মুনিও এই তত্ত্বের প্রতি সংকেত প্রদান করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রাকৃতকে সুসংস্কৃত করা হয়।হেমচন্দ্র প্রাকৃতের প্রকৃতিকে সংস্কৃত মনে করেছেন, তার পশ্চাৎ' এই মূলভাব ছিল, না কি এই বি.সংস্কৃত তার জন্মদাত্রী ছিল।

পালি- প্রাকৃতের অন্তঃ সম্পর্ক:             

বস্তুতঃ পালি প্রাকৃতেরই অন্যতম অংশ। উভয় ভাষার সমনতা বৈদিক সংস্কৃতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর ফলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে পালির গঠন বৈদিক সংস্কৃত এবং প্রাকৃতের সংমিশ্রণের প্রভাবে হয়েছিল।তবে পালিতে শৌরসেনী প্রাকৃত প্রভাব অধিক দৃষ্ট হয়। যেমন- . মধ্যবর্তী ব্যঞ্জনের আলোপ, . মধ্যবর্তী 'এর অপরিবর্তন, . শব্দের প্রারম্ভিক 'তে অপরিবর্তন, . দানি, ইদানি শব্দের ইত্যাদি প্রয়োগ। অন্য প্রাকৃতের বৈশিষ্ট্য পালিতে দৃষ্ট হয়। যেমন-পালির সমান অর্ধমাগধীতে এব' যেব  হয়। পৈশাচী প্রাকৃত হতেও সমানতা পালিতে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- . এবং 'এর অপরিবর্তন, . ঘোষ স্পর্শের স্থানে অঘোষ স্পর্শ হওয়া, . পুংলিঙ্গের অকারান্ত শব্দে প্রথমা একবচনে  ওকারান্ত হওয়া। এছাড়া পালি প্রাকৃততে আরও সমনতা দৃষ্ট হয়। যেমন- . ধ্বনি সমূহের সমানতা, . বিসর্গ প্রয়োগের অভাব, . এবং ' এর প্রয়োগ, . তালব্য এবং মূধর্ন্য , এর স্থানে দন্ত্য হওয়া, . , ঋৃ লূ, লূ্ূ, বিলুপ্ত হওয়া, . মূর্ধণ্য ধ্বনির সদ্ভাব, . দ্বিবচনের অভাব, . চতুর্থী এবং ষষ্ঠী বিভক্তির রূপ সমান হওয়া, . -' এর সমান প্রয়োগ।

 

পালি শিক্ষণ বিধি :      

বর্তমানে পালি শিক্ষাকে বি.এড. ইত্যাদি পাঠ্যক্রমে সম্মিলিত করা উচিত। অতএব পালি শিক্ষণ বিধিকে অবগত করা অত্যন্ত আবশ্যক। পালি শিক্ষা কালে সর্বপ্রথম পালি শিক্ষার গুরুত্ব  ব্যক্ত করা প্রয়োজন। পালি মূলতঃ কথ্য ভাষা ছিল। অপরদিকে ঋ্গবেদ ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীনতম গ্রন্থ হলেও তার ভাষা বিশুদ্ধ  সংস্কৃত ছিল না। তাতে কথ্যভাষার অনেক তত্ত্ব পাওয়া যায় যা পালি প্রাকৃততে আজও দৃষ্ট হয়।সুতরাং পালি-প্রাকৃত সংস্কৃত ভাষার পূর্ববর্তী ভাষার অস্তিত্ব ছিল, তা ব্যক্ত করার প্রশ্নে কোন সংকোচ থাকা উচিত নয়। ভগবান বুদ্ধ এবং তীর্থঙ্কর মহাবীর এই কথ্য ভাষাতেই তাদের উপদেশ প্রদান করেছিলেন। অতএব ভাষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ হতে সংস্কৃতকে জনভাষার রূপ প্রদান করা যায় না। সাহিত্যেও এইরূপ  কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে সংস্কৃত জনভাষা ছিল। ভারতের প্রাচীনতম শিলালেখ পালি-প্রাকৃততে পাওয়া যায়, সংস্কৃততে নয়। বস্তুতঃ সংস্কৃত ব্রাহ্মণ্য অভিব্যক্তির সাধন ছিল।সুতরাং এই কারণে পালি কিম্বা প্রাকৃতকে প্রাচীনতম ভাষা রূপে  গণ্য করা উচিত। মিশর এবং মেসোপোটেমিয়াতে প্রাপ্ত অভিলেখতে পালি- প্রাকৃতের তত্ত্ব সন্ধান  করা কঠিন নয়।

সাহিত্যকে সমাজের দর্পণ রূপে গণ্য করা হয়। তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক, আর্থিক এবং ভৌগোলিক পরিস্থিতির বিস্তৃত বিবরণ সাহিত্যের স্পষ্টতঃ দৃষ্ট হয়। পালি সাহিত্যে এইরূপ চিত্র পরিপূর্ণ ভাবে রয়েছে। এই সাহিত্য ভারত, সিংহল, বার্মা, থাইল্যাণ্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ইত্যাদি দেশের সাংস্কৃতিক চেতনাকে পরিপুষ্ট করেছে। ভগবান বুদ্ধ ঈশ্বর তত্ত্ব এবং বর্ণ ব্যবস্থাকে খণ্ডন করে যথার্থ মানবতাবাদকে স্থাপন করেছিলেন। সর্বোপরি তিনি অন্যান্য ধর্ম-দর্শনের সীমাবদ্ধতাকে জনগণের সম্মুখে তুলে ধরেছিলেন। গণিত, বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি প্রায় সকল বিদ্যার মূলভূত সিদ্ধান্ত পালি সাহিত্যে বিদ্যমান। এখানে এই বিষয় চিত্ত উল্লেখ্যনীয় যে পালি সাহিত্যে যে আধ্যাত্মিকতার দর্শন বিদ্যমান তা মনুষ্য জীবন নির্মাণ তথা রাষ্ট্রীয় একতাকে  সুদৃঢ় করতে সহায়তা প্রদান করেছে। 

পালি সাহিত্যের এই বৈশিষ্ট্যই সমগ্র ভারতবর্ষে  পালি অধ্যয়ন/অধ্যাপনাকে পুনর্জীবিত করেছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি এবং বৌদ্ধধর্মের পাঠ্যক্রম সংযোজিত হয়েছে। এক সময় পালিকে মৃতভাষা বলেন উপেক্ষা করা হত। তবে এখন এই পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে এবং প্রবুদ্ধ জনগণের নিকট এই বিষয় টি  অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিদেশে পালি সাহিত্য সমাদৃত হয়েছে।

. ব্যাকরণ পদ্ধতি: 

ব্যাকরণ ব্যাতীত ভাষা জ্ঞান  সম্ভব নয়। এই পদ্ধতি দ্বারা ছাত্র ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ হতে মূল গ্রন্থকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।ভাষাবিজ্ঞানের মূল হলো ব্যাকরণ। ব্যাকরণ ভাষাগত অশুদ্ধতাকে দূর করতে সক্ষম।

একটি ডাইরেক্ট মেথডও হয় যার উদ্দেশ্য হল ছাত্র পালিতেই তার ভাবনা চিন্তাকে ব্যক্ত করবে। এখানেও ব্যাকরণ জ্ঞান মূখ্যতর হয়, শব্দকোষ নির্মাণ করতে হয়। এতে সম্ভাষণ প্রণালী বিকশিত হয়ে যায়। এর অতিরিক্ত শ্রুতি লেখন এবং মৌখিক আত্ম-প্রকাশনের প্রতি ছাত্রের রুচি বৃদ্ধি করা হয়। এইভাবে অধ্যাপককে পালি ধ্বনি সমূহের শিক্ষণ প্রদানের সময় তার শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি বিশেষভাবে ধ্যান দেওয়া উচিত। অনুস্বার এবং ব্যাকরণের প্রতি বিশেষ ভাবে ধ্যান প্রদান করতে হবে।ব্যাকরণ বিষয়ে কথার পাঠ যোজনা নির্মাণের সময়ে উদ্দেশ্য, প্রস্তাবণা, প্রশ্ন, পাঠ্যোপস্থাপন, নিয়ম-নির্ধারণ, অভ্যাস ইত্যাদি তৈরি করা অধ্যাপকের বিশেষ কার্য হয়ে যায়। কাব্য- শিক্ষণ কালে কাব্যের ব্যাখ্যা, দণ্ডান্বয়, খণ্ডান্বয়, ভাষ্য, তুলনা অলংকার ইত্যাদি ব্যাখ্যা করা হয়। দ্রুত পাঠ -শিক্ষণ আবশ্যক হয়ে যায়। সম্ভব হলে অনুবাদ কার্যেরও শিক্ষা প্রদান করা উচিত।

পালি ভাষার বিকাশাত্মক অবস্থা:  

  পালি প্রাচীনতম ভারতীয় ভাষা। এই কারণে অবশেষে তার বিকাশাত্মক অবস্থার প্রতি অবলোকন করা অত্যন্ত জরুরী। অতএব  আমরা পালিকে নিম্নলিখিত সোপানে বিভক্ত করতে পারি। যেমন:- ). বৈদিক সাহিত্য কথ্য রূপের ব্যবহার দৃষ্ট হয়। 

) ত্রিপিটকের পদ্যের ভাষাকে ভাষা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করলে তাতে নিহিত প্রাচীন তত্ত্ব দৃষ্ট হয় যা বৈদিক ভাষা হতে অনুসৃত। যেমন সুত্তনিপাতের ভাষা স্পষ্টভাবেই  প্রাচীন। ধ্বনি পরিবর্তন এবং রূপবিধানে সাম্য অধিক রয়েছে।

) ত্রিপিটকের পদ্যের ভাষাতে পদ্যের ভাষা অপেক্ষা একাত্মকতা অধিক। রূপের অল্পতা এবং নতুন রূপের অভিব্যক্তি এর প্রমাণ। জাতকের ভাষাতে এই তত্ত্ব দৃষ্ট হয়।

উত্তরকালীন পালি গদ্য সাহিত্য অপেক্ষাকৃত অধিক অলংকারিক এবং কৃত্তিম। মিলিপঞ্হ এবং অ্ট্ঠকথা  সাহিত্য এর উদাহরণ। এখানে দীর্ঘ সমাস বহুল বাক্য রয়েছে। 

) উত্তরকালীন পালি কাব্যের ভাষা অলংকার বহুল এবং তাতে সিংহলী তথা বর্মী ইত্যাদি ভাষার শব্দকে যুক্ত করা হয়েছে। সংস্কৃত কাব্যের প্রভাবও তাতে স্পষ্ট রূপে দেখতে পাওয়া যায়। দীপবংস, মহাবংস, তেলকটাহগাথা, জিনদত্তচরিত ইত্যাদি কাব্য এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 

) আধুনিক পালি সাহিত্যের পালি ভাষাতে আধুনিক ভাষার প্রভাব প্রতীয়মান হয়। পালি ভাষার প্রচার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এই তথ্যকেও বিশ্লেষণ করতে পারি যে পালি ভাষা এবং সাহিত্যের প্রভাব আধুনিক ভারতীয় ভাষা এবং তার সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে কিভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা, হিন্দি, মারাঠী, গুজরাঠী ইত্যাদি সকল ভাষার বিকাশ অপভ্রংশের  বিবিধ উপভাষা'  মাধ্যমে হয়েছে। শুধু তাই না, এই ভাষার সাহিত্য সমূহেও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

 

 . বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি : এখানে কথা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা যায় এবং রাজনৈতিকআধ্যাত্মিক এবং ঐতিহাসিক বিষয়কেও ব্যাখ্যা করা যায়। 

.ব্যাখ্যা পদ্ধতি: এতে সমাস-বিগ্রহ, সন্ধি বিচ্ছেদ, বুৎপত্তি  ইত্যাদি ব্যাখ্যা পূর্বক সম্পূর্ণ পাঠের অর্থ করা হয়। 

 . অনুবাদ পদ্ধতি:  সমীক্ষা অংশকে মাতৃভাষার মাধ্যমে অনুবাদ করে বিষয়টিকে স্পষ্ট করা উচিত। 

. প্রত্যক্ষ পদ্ধতি: এতে সেই ভাষা লেখা পঠন-পাঠন এবং ব্যক্ত করার অভ্যাস করানো হয়। সম্ভাষণের অভ্যাসও এতে বৃদ্ধি লাভ করে।

.হারবাটীর্য় পদ্ধতি :

মনোবিদ হারবার্ট' এর  সিদ্ধান্তের প্রতি ভিত্তি করে এই পদ্ধতির বিকাশ হয়েছে। এতে সংবাদ অংশকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করে উপলব্ধি করানো হয়। যেমন- . প্রস্তাবণা, . বিষয়োপস্তাপণা. তুলনা, . সামাণ্যীকরণ বা পুনরাবৃত্তি  এবং . প্রয়োগ  বা অভ্যাস কার্য। এর প্রতি ভিত্তি করে পুনঃ মূল্যাঙ্কর করা হয়। যেখানে উদ্দেশ্য, ব্যবহার রূপে পাঠ্যবিন্দু ইত্যাদি তত্ত্বের প্রতি বিচার করা হয়। এই পদ্ধতি হতে ব্যাকরণ-অনুবাদ পদ্ধতিতে ছাত্র- ছাত্রীকে  আবশ্যক এবং সরল নিয়মকে ব্যক্ত করে পালি পাঠের অনুবাদ করে দেওয়া হয়। এর ফলে তার বোধ শক্তি জাগ্রত হয় এবং অধ্যায়নের প্রেরণা লাভ করে।  তবে এক্ষেত্রে অনুবাদ পদ্ধতির প্রতি নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।  পাঠ্য-পুস্তক বিধিতে পাঠ সম্পূর্ণ অধ্যয়নের মূল কেন্দ্র বিন্দু হয়। সর্বপ্রথম পাঠের সস্বর পাঠ হয়, অতএব ব্যাকরণ পূর্বক তার অনুবাদ করে দেওয়া হয়। বিশুদ্ধ উচ্চারণ' এর শিক্ষাও এখানে প্রদান করা।

পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ প্রিয়রত্ন থের মহোদয় প্রণীত "প্রাথমিক পালি ভাষা শিক্ষা" পালি চর্চ্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ইতিপূর্বে বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে প্রায় একশত বৎসরের অধিক কাল হতে অনেক প্রাতঃস্মরণীয় ভিক্ষু বৌদ্ধ উপাসকগণ পালি ভাষা সাহিত্য চর্চ্চা ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছে, তারই উত্তরসূরী তথা উত্তরসাধক রূপে আবির্ভূত হলেন ভদন্ত প্রিয়রত্ন থের মহোদয়।

 

ইতিপূর্বে যাঁরা পালি ভাষা চর্চ্চা ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রনয়ণ করেছেন তার কিছুটা ধারাবাহিক আলোকপাত করে ভন্তের প্রণীত গ্রন্থের ধারণা পেতে চেষ্টা করবো। 

পালি ব্যাকরণ রচনায় যাঁর কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় তিনি হলেন - শ্রী বিধুশেখর ভট্টাচার্য্য প্রণীত "পালি প্রকাশ" শান্তিনিকেতন, ১৯১১ সালে, ১৩১৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়ে, দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়ে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দে, তৃতীয় মুদ্রণ হয়ে ২০১৪ সালে। দ্বিতীয় পালি ব্যাকরণ হল-

 সমণ পুন্নানন্দ স্বামী প্রণীত "প্রাথমিক পালি-শিক্ষা" (First Pali Primer), ১৯২১ সালে এস. কে. লাহিরী এণ্ড কলেজ স্ট্রিট, কোলকাতা, থেকে প্রকাশিত হয়। তৃতীয় পালি ব্যাকরণ হল- মহামহোপাধ্যায় . সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ সমণ পুন্নানন্দ স্বামী যৌথভাবে অনূদিত সম্পাদিত "বালাবতার", কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস হতে ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয়। চতুর্থ পালি ব্যাকরণ হল- শ্রীমৎ জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবির প্রণীত -" পালি প্রবেশ" (Pali Grammar), [ বুত্তোদয় ধাতুকোষ ], শ্রী জিনানন্দ ভিক্ষু কতৃ্র্ক ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয়ে। দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৯৪ ইং ১৪০১ বাংলা। পঞ্চম পালি ব্যাকরণ হল- শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত, পালি প্রবেশ (শব্দানুশাসন) প্রথম ভাগ, মহাবোধি সোসাইটি, কলিকাতা১৯৩০, মূল্য সাত আনা। সপ্তম পালি ব্যাকরণ হল- শ্রীবংশদীপ মহাস্থবির প্রণীত সম্পাদিত - "নামাখ্যাত পদমালা", শ্রীপ্রজ্ঞাবংশ ভিক্ষু শ্রী বিরুদ্ধাচার ভিক্ষু কতৃর্ক প্রকাশিত হয়, বৈশাখী পূর্ণিমা ২৪৮৩ বঙ্গাব্দ ১৯৪০ খৃষ্টাব্দমূল্য -আট আনা। এইচ এমন প্রেস, প্রিন্টার - শ্রীচন্দ্রমাধব বিশ্বাস, ১০, মদন গোপাল লেন, কলিকাতা। এবং অষ্টম পালি ব্যাকরণ হল- শ্রীবংশদীপ মহাস্থবির অনূদিত "কচ্চায়ন ব্যাকরণ" (কাত্যায়ন ব্যাকরণ), ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়। নবম পালি ব্যাকরণ হল-শ্রীবংশদীপ মহাস্থবির অনূদিত "বালাবতার" প্রকাশকাল ১৯৪০ সাল, ১৩৩২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়ে। দশম পালি ব্যাকরণ হল- আচার্য সংরক্ষিত রচিত "সুবোধালঙ্কার", অনুবাদক সদ্ধর্মাচার্য শ্রী আর্য বংশ ভিক্ষু, সূত্র-বিনয়-অভিধর্ম বিশারদ, আষাঢ়ী পূর্ণিমা২৪৯২ বুদ্ধাব্দ, ১৩৫৫ সাল, ১৯৪৮ খৃষ্টাব্দ। প্রকাশক সুরেন্দ্র লাল বড়ুয়া২সিমদন বড়াল লেন, মূল্য টাকা। একাদশ পালি ব্যাকরণ হল- Dwijendralal Barua, অধ্যাপক, পালি বিভাগ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রণীত "New Elements of Pali Grammar", ১৯৫৬ সালে, পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা দপ্তর কতৃর্ক প্রকাশিত হয়। দ্বাদশ পালি ব্যাকরণ হল- পণ্ডিত শান্তরক্ষিত মহাস্থবির প্রণীত, প্রাথমিক পালি ভাষা শিক্ষা, প্রথম খণ্ড দ্বিতীয় খণ্ড,  (A Pali Grammar and translation),  ৬ষ্ট শ্রেণী হতে ৮ম শ্রেণীর উপযুক্ত এবং পালি পটোলের আদ্য মধ্য উপযুক্তমূল্য ,২৫ পয়সা মাত্র। ত্রয়োদশ পালি ব্যাকরণ হল- Anomadarshi Barua (Bhikshu), অধ্যাপক, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি  প্রণীত Introduction to Pali, ১৯৬৫ সালে, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি প্রেস হতে প্রকাশিত হয়, পরবর্তীতে . চন্দ্রশীলা বড়ুয়া কতৃর্ক Introduction to Pali,Text(Pali, Sanskrit) Translation (Hindi) Grammar Etc. হিন্দি অনুবাদ সহ প্রকাশিত হয়, ২০০৭, ভারতীয় বিদ্যা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। চতুর্দশ পালি ব্যাকরণ হল- শ্রীনীরদ রঞ্জন মুৎসুদ্দি, অধ্যাপক, বিদ্যাসাগর কলেজ শ্রীভূপেন্দ্রনাথ মুৎসুদ্দি, এডভোকেট, প্রণীত "পালি ব্যাকরণ অনুবাদ শিক্ষা", (মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র -ছাত্রীদের জন্য), প্রকাশক চট্টোপাধ্যায় ব্রাদার্স, বঙ্কিম চ্যাটার্জি ষ্ট্রীট ১৯৭৮ সালে ষোড়শ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পঞ্চদশ পালি ব্যাকরণ হল- শ্রীবিনয়েন্দ্রনাথ চৌধুরী প্রণীত "পালি অলঙ্কার", ১৯৯০ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে প্রকাশিত হয়। ষোড়শ পালি ব্যাকরণ হল- অধ্যক্ষ প্রমোদ রঞ্জন বড়ুয়া কতৃর্ক রচিত সম্পাদনা, " পালি পকাশিকা", বাংলা একাডেমি, ঢাকা, বাংলাদেশ, জুলাই ১৯৮৫, আষাঢ় ১৩৯২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। সপ্তদশ পালি ব্যাকরণ হল- অধ্যাপক দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া প্রণীত পালি ভাষা শিক্ষা, তৃতীয় ভাগ(অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য), ১৯৯১ জানুয়ারী, প্রকাশক: নালন্দা,আন্দরকিল্লামুদ্রণে : প্রজ্ঞা প্রিন্টার্স। চট্টগ্রাম, থেকে প্রকাশিত হয়। অষ্টাদশ পালি ব্যাকরণ হল- তপন কুমার বড়ুয়া কতৃর্ক রচিত "পালি ব্যাকরণ অনুবাদ শিক্ষা", মাঘী পূর্ণিমা, ২৫৩৪ বুদ্ধাব্দ, ১৩৯৭ বঙ্গাব্দ১৯৯১ ইংরেজি প্রকাশিত হয়। উনবিংশতি পালি ব্যাকরণ হল- দিকপাল ভিক্ষু কতৃর্ক সঙ্কলিত " পালি ভাষা শিক্ষা", ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কাঞ্চনপুর, ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত হয়, মাঘীপূর্ণিমা ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ, ১৯৯১ সালে। বিংশতিতম পালি ব্যাকরণ হল- . সুকোমল বড়ুয়া প্রণীত "পালিভাষা সাহিত্য ছন্দ অলঙ্কার" বাংলা একাডেমি, ঢাকা, চৈত্র ১৪০৫, এপ্রিল ১৯৯৯, সালে প্রকাশিত হয়। একবিংশতি পালি ব্যাকরণ হল- অধ্যাপক দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া প্রণীত "পালি ব্যাকরণ অনুবাদ পরিচিতি" বাংলাদেশ পালি সাহিত্য সমিতি, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়, ২৫৫৩ বুদ্ধাব্দ, ১৪১৬ বঙ্গাব্দ, ২০০৯ সালে। দ্বাবিংশতি পালি ব্যাকরণ হল- . দীলিপ কুমার বড়ুয়া কতৃর্ক রচিত "পালি ভাষার ইতিবৃত্ত" বাংলা একাডেমি, ঢাকা থেকে ২০১০ ইংরেজি, ১৪১৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। ত্রয়োবিংশতি পালি ব্যাকরণ হল- বিমান চন্দ্র বড়ুয়া কতৃর্ক রচিত "পালি মঞ্জুষাপালি এণ্ড বুদ্ধিষ্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। চর্তুবিংশতি পালি ব্যাকরণ হল- অলকা বড়ুয়া প্রণীত "Simplified Grammar to Pali Language" নিউ ভারতীয় বুক করপোরেশন, দিল্লি হতে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও বেশ কিছু পালি ব্যাকরণ ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি ভাষায় রচিত হয়েছে এখানে ভূমিকা অংশে কলেবর বর্ধিত হবে বিধায় উল্লেখ না করে ইতি টানলাম। 

উপরিউক্ত যত পালি ব্যাকরণ রচিতসম্পাদিত অনুদিত হয়েছে তার মধ্যে  শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ প্রিয়রত্ন থের মহোদয় প্রণীত "প্রাথমিক পালি ভাষা শিক্ষা" অত্যন্ত  উপাদেয় সাবলীল বাংলায় রচিত অনুদিত হয়েছে এবং পর পর অধ্যায়ের বিন্যাস সাজানো হয়েছে তা অনন্য সাধারণের দাবি রাখে বিষেশত চিত্রাঙ্কণ দ্বারা সুন্দরভাবে অভিযোজিত হয়েছে।  যথা- প্রথম অধ্যায় -অক্ষর মালা, দ্বিতীয় অধ্যায়- যুক্তাক্ষর গঠন পদ্ধতি, তৃতীয় অধ্যায়- পদে ব্যবহার এবং চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন, চতুর্থ অধ্যায়- চিত্রের মাধ্যমে একবচন বহুবচনের ব্যবহার, পঞ্চম অধ্যায় - চিত্রের মাধ্যমে পুরুষ ভেদ, ষষ্ঠ অধ্যায়- আমন্ত্রণ এবং বিধান, সপ্তম অধ্যায় -বাক্য গঠন, অষ্টম অধ্যায় -করণার্থ, নবম অধ্যায় -সম্প্রদানার্থ, দশম অধ্যায় - অপাদান অর্থএকাদশ অধ্যায় -সম্বন্ধ(সাহায্য অর্থ), দ্বাদশ অধ্যায় -ইকারান্ত নাম, ত্রয়োদশ অধ্যায় -অনাগত আখ্যাত, চতুর্দশ অধ্যায়-পূর্ব ক্রিয়া, পঞ্চদশ অধ্যায়-নপুংসক লিংগনাম, ষষ্ঠদশ অধ্যায়-পঞ্চমী আখ্যাত, সপ্তদশ অধ্যায়-নিপাত পদে, অষ্টাদশ অধ্যায়-স্ত্রী লিংগনাম, ঊনিশতম অধ্যায়-বাক্য রচনা অনুবাদ, বিশতম অধ্যায়-পূজা পর্ব দিয়ে সমাপ্ত করেছেন। গ্রন্থ সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, প্রত্যেকটি অধ্যায়ে নতুনত্বের ছোঁয়া রেখেছে। এবং প্রত্যেকটি অধ্যায়ে, শব্দ, বাক্য, অর্থ, সন্ধি, কারক, ইত্যাদি পরিবেশন করেছেন, যা অভিনব বলা যায়।  আশা করি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে, পালি শিক্ষায় পারঙ্গমতা সাচ্ছন্দ্য বোধ করবে পাঠক। অলং ইতি বিত্থারেন।

সুমনপাল ভিক্ষু

অতিথি অধ্যাপক 

পালি বিভাগ 

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

No comments:

Post a Comment