প্রগতির প্রহরী হও কর্মে ও চিন্তায়,
হও সদা আগুয়ান মুক্তবুদ্ধির চেতনায় ।
জড়তা ঝেড়ে ফেলে সত্যেরে ধারণে হও সচেষ্ট।
ঘরেতে ভ্রমণ এল।
লেখক : স্বপন রায়।
প্রকাশক : রোহিনী নন্দন।
প্রকাশকাল : মহাঅষ্টমী, ১৪২৮।
ভাষা : বাংলা।
পৃষ্ঠা : ২৩৯+৯ পৃষ্ঠা ফটো।
মূল্য : ৩০০।
“হয়তো বা আাকাশ জুড়ে সীমাহীন গাঙচিল, সূর্যলোকে চরম উপস্হিত হতে কংক্রিটের জঙ্গল পার হয়ে যেখানে বাতাসের এক্কাদোক্কা লেখা আছে। নদীর চরে সারি সারি কাশফুল বন, সাদা বকের ছায়া ঘেরা আদিম ফুলের গন্ধে অচেনা শহর, নদী বন্দর.......।“
এই বিশাল পৃথিবীর আমরা কতটুকুই বা জানি, আমরা কি কখনও জেনেছি পুতুল নাচের ইতিকথা অথবা রাজকন্যা অনুমতী কে? যার পূর্বপুরুষরা একদা বন- প্রান্তর শাসন করতেন। কিম্বা দেবতা টাঁড় বারো'র ইতিহাস ! যিনি বনের প্রাণীসকলকে রক্ষা করেন। অজানা এই ইতিহাসের আকর উদ্ধার করতে গেলে বদ্ধ দুয়ারের অর্গল উন্মুক্ত করে বেড়িয়ে পড়তে হবে পথে। নতুবা পরশ পাথরের সন্ধান পাব কি? স্বপন রায় হলেন সেই ক্ষ্যাপা, যিনি বারংবার সন্ধান করে বেড়ান সেই আশ্চর্য পরশ পাথরকে।
ভ্রমণ ক্ষ্যাপা স্বপন রায় তার জীবনের একটা অংশ ব্যয় করে চলেছেন দেশ বিদেশ তথা বিভূঁই' এর বিবিধ ইতিহাস, পালা-পার্বন ইত্যাদি বিষয়গুলিতে। তিনি শুধু ভ্রমণই করেন নি নানাবিধ খুঁটিনাটি বিষয়গুলিকে অনুসন্ধান, পর্যালোচনা করে লিপিবদ্ধ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। ফলে তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে পর্যায়বৃত্ত স্হান-কাল, পাত্র ইত্যাদি বিষয়গুলি তাই স্বপন রায় কখনও হয়ে উঠেছেন গদ্যকার, কখনও ইতিহাস শিক্ষক এবং কখনও বা উপাখ্যানকার। তার এই ভ্রমণ চর্চার পদাবলী সমূহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সু-প্রতিষ্ঠিত পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু গ্রন্হাকারে সেই আকর গুলি প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি বাস্তবিক অর্থে আত্মশ্লাঘার বিষয় হতে পারে কিম্বা হওয়াটাই বোধকরি নষ্টালজিক! কেননা মাতলামির প্রশ্নে এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত একসময় আবারও কোন এক ভ্রমণ ক্ষ্যাপাকে ইতিকথা পরের কথার সন্ধান এতে দিতে পারবে।
স্বপ্নন রায় কে ভ্রমণ পিপাসু বলা চলে নাকি ভ্রমণ সাহিত্যিক! এই দূরহ বিষয়ের মাইলস্টোন অতিক্রম করে তিনি কখনই নিজেকে এই দোলাচালের তুলাদণ্ডে পরিমাপ করেন নি এবং তাই তিনি বাস্তবিক অর্থে হয়েছেন অ-নাগরিক।
গ্রন্হের সূচীপত্রে ১৮টি ভ্রমণ বৃত্তান্ত ( পৃ. ১৩-২৩১) দেখা যায়। যদিও এই সকল ভ্রমণ বৃত্তান্ত গুলিকে ‘ভ্রমণ ইতিহাস’ অভিধায় অভিহিত করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ স্বপন রায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেকথাই ইঙ্গিত করে বারংবার।
‘ভৃগু-দর্দরী বা ভৃগু ছত্রের মেলা উত্তর প্রদেশবাসীর কাছে এক বিশাল আকর্ষণের বস্তু। .....সকলেই চলেছে ভৃগু- দর্দরী মেলায়। পূর্ণিমার পূন্যস্মানে। .....এরা সকলেই দোহাতি মানুষ....... মহিলাদের অধিকাংশই বৃদ্ধা।‘
'........দুপাশে অসংখ্য ভিখারি। ......জটাবাবা, তন্ত্র সাধক - সকলেই এসেছেন.......। গঙ্গার তীরে লোকে লোকারণ্য। ভারতবর্ষে অনুষ্ঠিত সমস্ত মেলার পিছনেই থাকে কোনো না কোনো পৌরাণিক কাহিনির ভিত্তি অথবা কিংবদন্তী জনশ্রুতি। (দেশ ২২ ডিসেম্বর, ১৯৯০)।
আবার ‘শ্রী কৈলাশ দর্শন’।'.......বহু মানুষের বিশ্বাস দেবলোকের এই পুণ্য সরোবর দেবতাদের অবগাহন ক্ষেত্র। এই বৃত্তান্তে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবৃত হয়েছে কীভাবে কৈলাস ভ্রমণের মূল বিষয়গুলি। এই ভ্রমণের পূর্বে লেখক বলেছেন- শ্রী কৈলাসের প্রতি আগ্রহ আমার অনেক দিনের। 'হিমালয়' নামে একটি সংকলন গ্রন্হ সম্পাদনার সময় মানস কৈলাসের ওপর প্রায় সব গ্রন্হ পড়েছি। (শারদীয় বসুমতী, ১৪২০)।
কিম্বা ‘ফিরে দেখা চারধাম’। 'ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের কাছে উত্তরাখণ্ডের চারধাম ভ্রমণ অমোঘ আকর্ষণের বিষয় এই স্হান ভ্রমণ কালের বিষয়টিকে লেখক বিভিন্ন পর্যায়গত ভাবে বিভক্ত করেছেন যেমন ভ্রমণ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানগত বিষয়, ত্রিযুগীনারায়ণ গুপ্তকাশী উখিমঠ তথা দেওরিয়াতাল, চোসতা এবং কল্পেশ্বর ইত্যাদি। সর্বোপরি তিনি চারধাম ভ্রমণের প্রয়োজনীয় বিবরণও প্রদান করেছেন। ( সুখী গৃহকোণ, ২০১৭)।
নতুবা ‘মন্দাকিণীর ধারা’। বৃত্তান্তের সূচনাপর্বে দৃষ্ট হয় লেখকের সঙ্গে অশীতিপর বৃদ্ধের কথোপকথন। অতপর যাত্রা শুরুর বিবরণ। এখানেও লেখক তার কলমের মুন্সিয়ানার উজ্জ্বল ধারা বজায় রেখেছেন। '.........জানালা দিয়ে তাকালে কখনো কখনো বহুনীচে জলের ক্ষীণ ধারা চোখে পড়ে। আর তখনই বিশ্বচরাচর কেমন আবছা হয়ে আসে।‘ আবার প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যকেও লেখক বিশ্লেষণ করেছেন একজন গল্পকারের আঙ্গিকে। '......কোন পাহাড় একেবারেই বৃক্ষহীন কেবল শ্যাওলা, ঘাস আর লতা-পাতা সম্পূর্ণভাবে পাহাড়ের নিজস্ব রুক্ষতাকে ঢেকে দিয়েছে। '.......হলুদ রঙের অজস্র ছোট ছোট ফুল। এই সমস্ত বন্য কুসুমের গন্ধ নেই সত্য, তবু তাদের বর্ণ এবং লাবন্য পাহাড়ের রুক্ষতা এবং দুর্গমতার কথা সম্পূর্ণ ভুলিয়ে দেয়।'
'......পাহাড়ের গায়ে জমাটবাঁধা বরফের গা বেয়ে নেমে আসছে যমুনোত্রীর করুনাধারা। সেই একই ছন্দে বিরতিহীন.....অবিরত। সচিত্র পূর্বায়ণ, পূজাসংখ্যা (১৩৯৪)।
লেখকের কুম্ভে ভারত দর্শন।
কুম্ভে ভারত দর্শন বৃত্তান্ত পর্বে তিনি বলেছিলেন - 'বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকের অন্যতম কালকূট (সমরেশ বসু) এই কুম্ভ মেলার তীর্থ ও পুণ্যতিথির স্নান মাহাত্ম্য দর্শন করে এসে তিন দর্শক আগে লিখেছিলেন 'অমৃত কুম্ভের সন্ধানে'। তাই তিনি বড় অদ্ভূত ভাবে বলেছেন- 'এই অমৃত কুম্ভের সন্ধানে গিয়ে কি পান জানি না, কিন্তু হারাবারও কিছু থাকবে না। .....চলমান জীবনে কত কিছুই হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে আছি।'
লেখক এই বৃত্তান্তে পুনঃপুনঃ ইতিহাস, ভূগোল এবং পৌরাণিক গল্পকথা তুলে ধরেছেন। ফলে বৃত্তান্তটি নিছক ভ্রমণ চর্চাতে পর্ষবসিত হয় নি বরং তিনি কুম্ভে সন্ধান করেছেন অমৃত পূর্ণ কলসটিকে। (শনিবারের চিঠি, ৫ এপ্রিল ১৯৮৬)।
লেখকের পর্যায় বৃত্তের অপর আলেখ্য হল ‘অবলাসুন্দরীর উপাখ্যান’ এবং কিন্নর ভ্রমণ। ‘কিন্নর ভ্রমণ’ সম্পর্কে লেখক আলোচনাকালে ভীমাকালী মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস পর্বটি অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে বর্ণনা করেছেন। মন্দিটির স্হাপত্য শৈলির বিবরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন- ‘মন্দিরে গঠনরীতিতে একইসঙ্গে তিব্বতী, বৌদ্ধ এবং হিন্দু স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।
কিন্নরের জনজীবনের প্রসঙ্গ পর্বটিও লেখক স্বল্প পরিসরে আলোচনা করেছেন। আবার কিন্নর যাত্রার প্রয়োজনীয় তথস্যমূহও প্রদান করেছেন। লেখকের এই তথ্য প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হল ভবিষ্যত ভ্রমণ যাত্রীদের সঠিকভাবে নির্দেশ করা যাতে তারা বিভ্রান্তি বা প্রতারণার কবলে না পড়েন।
অন্য এক বারাণসী।
লেখক স্বপন রায় বারাণসী ভ্রমণ (৩য় বার) কালে যোগীরাজ্ শ্যামাচরণ লাহিড়ী’র বসতবাড়ির সন্ধানে বড়ই অদ্ভূত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন ‘......জিজ্ঞাসা করি শ্যামাচরণ লাহিড়ীর বাড়িটি কোথায়? অধিকাংশ লোকই.....সেই মহাপুরুষ সম্বন্ধে এত অনীহা! বড়ো আশ্চর্যবোধ হল’। অবশেষে তিনি এক বৃদ্ধের সহায়তায় লাহিড়ী বাবার বসতবাড়ি ‘পুরাতন দূর্গাবাড়ি’র সন্ধান পেয়েছিলেন। এরপর তিনি তৈলঙ্গস্বামীর জীবন ও সাধনার ইতিহাস অতি সংক্ষিপ্ত কারে অথচ সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। (অথকাশী কথা, বইমেলা ১৯৯৯)।
আতরের আতুঁড় ঘরে।
আতরের উৎপাদন এবং ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লেখক সিকন্দর পুরের আতর শিল্প খুঁটিনাটি বিষয়গুলি এত সুন্দর এবং সাবলীল ভাবে আলোচনা করেছেন যে যেন মনে হচ্ছে আতর উৎপাদনের পদ্ধতি ইত্যাদি পড়ছি। আবার আতর শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং আতর নির্মাণকারীদের হতাশগ্রস্ত অবস্হাগুলিও ব্যাখ্যা করেছেন। 'নকল জিনিসে তামাম সিকন্দর পুরই বিপর্যস্ত। আসলের চেয়ে নকলের চাহিদা বেশি'। তিনি খেদোক্তি করে বলেছেন, '....... অচিরেই সিকন্দর পুরের শিল্পীরা আতরের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে চিরতরে মুছে যাবে খাঁটি আতর তৈরির ক্ষেত্র সিকন্দরপুরের নাম।‘ (আ.বা. পত্রিকা, ৩ মার্চ ১৯৯০)।
গ্রন্হের (পৃষ্ঠা নং ১৪৪-১৫৪) এই অংশে আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘দ্বীপময় ইন্দোনেশিয়া’। ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন, ‘সাড়ে সতেরো হাজার দ্বীপের ইন্দোনেশিয়ার আজও বহু দ্বীপে মানুষ বাস করে না। অর্থাৎ অনেক দ্বীপ আজও অর্থে অগম্য’।
এখানে বোরোবুদুর বৌদ্ধ মন্দির প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত গবেষকের ন্যায় আলোচনা করেছেন। তিনি বৌদ্ধ মন্দিটির স্হাপন কাল, মন্দির নির্মাণ পদ্ধতি বৌদ্ধ স্তুপ (৭২টি), ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তির ইত্যাদি বিষয়গুলি অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিস্তাপিত করেছেন।
অতপর তিনি ইন্দোনেশিয়ার সুলতানের প্রাসাদ, স্হানীয় বাজার, রামায়ণ নৃত্য তথা বালি দ্বীপ এর সমুদ্র সৈকত এবং বিখ্যাত তামান আয়ুন মন্দির, বারং নৃত্য (দেবতা ও অশুভ দানবের যুদ্ধের কাহিনি), তীর্থ এম্পূল মন্দির'এর ইতিহাস অতি সুন্দরভবে পর্যায়ভাবে উপস্হাপন করেছেন। অসাধারণ পটভূমির রচিয়তা ভ্রমণ পিপাসু সাহিত্যকার স্বপন রায়। এককথায় অনবদ্য তার স্মৃতিচারণ।
এইভাবে লেখক ক্রমান্বয়ে তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। জিজ্ঞাসু পাঠকে সম্মুখে। লেখক ভারতবর্ষ সহ বিদেশের নানাবিধ স্হান ভ্রমণ কালে সেই অঞ্চলের ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজ, ধর্মীয়, ভাবাবেগ ইত্যাদি বিষয়গুলি অত্যন্ত গভীর ভাবে অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফলে তাঁর ভ্রমণ বত্তান্ত গুলি কখনই পাঠ করে ক্লান্তিবোধ আসে নি। তবে একএক সময় তিনি হয়ে উঠেছেন অত্যন্ত আবেগঘন তাই তাঁর লেখনীতে সেই আবেগ এসেছে অজ্ঞাতসারে। তাই তিনি কবির ভাষায় উচ্চারণ করেছেন-
ফিরি আমি উদাস গ্রাণে
একাই সবার মুখের পানে,
তেমার মতে এমন টানে
কেউ তো টানে না।
আবার পিরামিডের দেশে ভ্রমণ কালে লেখক হয়ে উঠেছেন ইতিহাস চর্চাকারী। সুপ্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা কীভাবে এবং কেনই বা গড়ে উঠেছিল তথা এক্ষেত্রে নীলনদের ভূমিকা, পিরামিড এবং মমি প্রক্রিয়ার ইতিহাস এর পাশাপাশি বর্তমান মিশর (ইজিপ্ট) ধর্ম -সংস্কৃতি ইত্যাদি আলোচনা কালে তিনি কখনই আবেগ তাড়িত হয়ে ওঠেন নি। বরং তাঁর ভাবনার পরিকল্পিত ভাবে অঙ্কন করেছিলেন। ফলে এক্ষেত্রে ইতিহাস চর্চাই মুখ্যত বিষয় ছিল।
দেশের মাঠি ! তাঁর ভ্রমণের পটভূনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) যে স্হানে একসময় তাঁর পূর্ব পুরুষ এবং পিতৃদেব বাস করতেন। লেখক অবগত করেছিলেন তাঁর পিতৃভূমি ছিল মানিকগঞ্জের আরিচা গ্রামে। অনুসন্ধিৎসা চোখে লেখক একসময় উপস্থিত হন সেই পৈতৃক ভূমিতে।লেখক এখানে বারংবার আবেগতাড়িত হয়েছেন এবং সেই কারণেই তিনি তাঁর পিতৃভূমি হতে নিয়ে এসেছিলেন একমুঠো মাঠি। বড়ই বিয়োগাত্নক এই ভ্রমণ পর্বটি।
‘কখনও সময় আসে জীবন মুচকি হাসে
ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আসা
অনেক দিনের পর মিলে যাবে অবসর
আশারাখি পেয়ে যাব বাকি দু-আনা।‘
কবি জীবনানন্দ দাসের ভিটার সন্ধানে ভ্রমণরসিক লেখক ছুটে গিয়েছেন কবির জন্মভূমি বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালে। ইতিহাসের পাকভন্ডে অনেক কিছুই আজ অনলিন হয়েছে। তাই তিনি বেদনাপ্লুত হয়ে বলেছেন, ‘এই পৃথিবীর কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। পরিবর্তনই এই জগতের নিয়ম।' মনে হয় লেখক বুদ্ধ বাণীর সারার্থ উপলব্ধি করেছেন, আদৌ কি লেখক তা বোঝাতে চেয়েছেন?
কবির বসত ভিটাটি আজ ছিন্ন পদাবলী। কারণ ইতিহাসকে অনেকেই মনে রাখেন না আর সেই কারণেই তারাও একদিন ইতিহাস হয়। অর্থবোধ সেই ট্রাভিশান আজও চলছে।
‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়'।
অবশেষে মহিময় কুরুক্ষেত্র এবং অপর নাম ভ্রমণ বৃত্তান্ত। লেখক এই সংকলন এখানেই ইতি টেনেছেন। তারপরে গ্রন্হে সংযোজিত হয়েছে তার ভ্রমণ বিষয়ক কিছু আলোকচিত্র।
যাই হোক, গ্রন্হের শেষে এই দুটি ভ্রমণ বৃত্তান্তের পরিবর্তে ‘দেশের মাটি’ হয়তো গ্রন্হের সামঞ্জস্যতা রক্ষা হত। মনে হয় লেখক এই বিষয়টির ক্ষেত্রে অতটা ভাবেন নি হয়তো। গ্রন্হের নাম ‘ঘরেতে ভ্রমণ এল' লেখকের নিজস্ব ভাবনা মনে হয়। গ্রন্হটির নামকরণ ‘বেড়ানোর গপ্পো’ অথবা ‘ভ্রমণের কোলাজ' হলে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো বলে মনে হয়।
তবুও বলবো, লেখক স্বপন রায় তার ভ্রমণ বৃত্তান্ত যেভাবে রচনা করেছেন, তাতে অনেক তথ্য, ইঙ্গিত ইত্যাদি বিষয়গুলি নতুন ভ্রনণকারীদের রসদ সংগ্রহ করতে সহায়তা করবে তা বলতে বাধা নেই। কারণ-
‘মুছে গেল পদচিহ্ন, আবার উদয় হল
বারংবার পদচিহ্নের ভীড়ে’।
- সুমনপাল ভিক্ষু
অতিথি প্রভাষক, পালি বিভাগ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অতিথি প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজ, কোন্নগর, হুগলি।
সুমনপাল ভিক্ষু
নিভৃত, প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে থাকা এ কবির নাম তরুণ সান্যাল। একান্ত সাধনায়, পরম অভিনিবেশে যারা উজ্জ্বল করে গেছেন বাংলা কবিতার ভাণ্ডার তিনি তাদেরই একজন।
অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গের
পাবনার পোরজনা গ্রামে কবি তরুণ সান্যালের
জন্ম ১৯৩২ সালের ২৯ অক্টোবর। প্রাথমিক পড়াশুনা নওগাঁতে, পনেরো-ষোলো বছর বয়সে দেশত্যাগ করেছিলেন দেশভাগের সেই উত্তাল সময়ে। শৈশবের সেই স্মৃতিমাখা জন্মভূমির
কথা তাঁর সত্তার মধ্যে চিরজাগ্রত ছিল।
১৯৭১ সালে, বাঙালি যখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, তরুণ সান্যাল তখন ছিলেন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ আলোড়িত করেছিলো ১৯৬৮ সালেই ‘তোমার জন্যই বাংলাদেশ’ নামের কাব্যগ্রন্থের জনককে।
তাঁর জন্মভূমি, গ্রাম, তাঁর চিন্তাচেতনায় চিরজাগরূক ছিল ছেড়ে আসা স্বদেশ।
১৯৭১-এ পাকিস্তানের অপশাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তার অনুপুঙ্খ ছবি তাঁর মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়েছিল।
১৯৪৭-এ ভারত ও পাকিস্তান
রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে
বঙ্গ বিভাগের মতো নির্মম ঘটনা ঘটেছিল। তরুণ সান্যালের
মতে "আমার মনে আছে দেশভাগের পরে বাবা বলতেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান
টিকবে না’। দেশভাগের পরে পূর্ব বাংলার সম্পন্ন হিন্দুরা দলে দলে চলে আসে ভারতে। দেশের একটা বড় অংশ বুদ্ধিজীবী তার মধ্যে ছিল। বাবা বলতেন, একটা বাড়ি বানাতে যা খরচ হয় তারচেয়ে অনেক বেশি খরচ হয় একজন ডাক্তার, উকিল বা ইঞ্জিনিয়ার
তৈরি করতে। আমার ধারণা, বঙ্গ বিভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে যে বুদ্ধিজীবী সমাজের সংকট তৈরি হয়েছিল সেটি পূরণ করতে তাঁদের বহু কষ্ট করতে হয়েছে। ক্ষুদিরাম,
সূর্য সেনের নতুন মুখাবয়ব পেয়েছিল ভাষা-আন্দোলন তথা স্বাধিকারের লড়াই। তাই-ই ক্রমে জন্ম দিয়েছিল ১৯৭১। বঞ্চনা আর অবিচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল বাঙালি।"
তিনি ‘মাটি’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন, তার খানিকটা অংশ–
প্রত্যাশায় বৃষ্টি হয়? মাঠ রুক্ষ ফাটা হাত
অঞ্জলি সাজালে বৃষ্টি আসে?
এবড়ো থেবড়ো জমি, ধুলো ওলোটপালট
কোন দক্ষিণের হাওয়ায় উদোম
এবং নয়ানজুলি বেয়ে নেমে গেছে ঘাস, দাম,
হলদে কচুরিপানায়
পরিণাম
দিনক্ষণ চলে যায় অশ্লেষা-মঘায় বারবেলায়
রবিবার বহে যায় অন্য এক শনিবারে
জলের ঢলক নোনা গাঙে
নামগুলি বহে যায় পিতামহ থেকে পৌত্রে
এমনি করে ঢেউ ওঠে ভাঙে
শালতির উপরে কার পায়ে সোনা জ্বলে
আউসে আমনে
বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সঙ্গে। তাই ‘বাংলাদেশ’ নামের ওই কবিতায় ধরা পড়েছে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের
ছবি।
তরুণ সান্যালের ‘মা আমার বাংলাদেশ’
নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ কোনোরকমে
উঠে দাঁড়াচ্ছে তখন, তিনি লিখেছিলেন–
সদ্যোজাত বাছুরের টলমল দাঁড়ানো দেখে
স্নেহার্দ সে বিশালাক্ষী,
প্রতিরক্ষা তীক্ষ্ণ শিঙে গম্ভীর হাম্বায়
মা আমার বাংলাদেশ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাদ মোছে তারই
ও-কি মরচে জ্বলে যাওয়া অঙ্গারকুসুম
খর খঙ্গে ঝকমকায়,
ওকি করশান শুদ্ধ তরবারি!
এই ভালোবাসার সাথে গভীর বেদনাময় উপলবদ্ধিও। যেখানে ভারতভাগের ঐতিহাসিক যন্ত্রণাকে দেখতে পাই। তাঁর অনবদ্য গদ্যসংকলন
যা এযুগের যুবাদেরও অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত সেই ‘রেনেসাঁস স্বদেশে বিদেশে’ গ্রন্থে তিনি লেখেন – “রেনেসাঁস যে জাতি গড়তে চেয়েছে সেই জাতিগঠন বিড়ম্বিত হয়ে গেল সামন্ততান্ত্রিক পিছুটানে।...
আমাদের দেশে রেনেসাঁসের মানবমুখিনতাকে আঘাত করেছিল ধর্মকে বাহন করে রাজনীতি।... বাঙালী নবজাগরণের প্রধান পুরুষেরা প্রথম রাউন্ডে পরাজিত হয়েছিলেন জিন্নাহ-শ্যামাপ্রসাদের কাছে। ভাবা হয়েছিল বুঝি এবার সেই মহানেরা জয়ী হতে চলেছেন ১৯৭১-এ। সে ধারণা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।
তরুণ সান্যালের ভাষায়– ‘আমার লেখা ও প্রায় প্রতিটি কবিতাই নিসর্গ, প্রকৃতি, সমাজ ও আত্মবিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে
রচনা’ এবং তরুণ সান্যালের
মতে কবি হলো "এক বিপ্লবী ব্যক্তিস্বরূপ"। তরুণ সান্যাল মতে, ‘কবিতা তো মানবসমাজের
এক ভিন্ন ধরনের ভাষা, বিশেষ জাতি বা সমাজ অংশে জন্ম নেওয়া স্পর্শপ্রবণ
ব্যক্তির হয়ে ওঠে, যা কবিতা রচনার ভিত্তি।’
কবি বেড়ে উঠেছেন সাম্যবাদী চেতনায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ ১৯৫৬ সালে। সাম্যময় এক উজ্জ্বল সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষায় কবি হয়ে উঠেছেন তরুণ সান্যাল। তরুণ সান্যালের
কবিতায় স্পষ্ট হয়েছে প্রতিবাদী
ও সমাজবিশ্লেষণ, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ ও উদ্বাস্তু
সমস্যা। আসলে সামাজিক ইতিহাসে সচেতন অধ্যাপক কবি জানেন এক সময় মানুষের মনুষ্যই ছিল সব কিছুর পরিমাপের একক; এখন পোষ্ট মর্ডাণ যুগে বা ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের পর মুনাফাই সব। পুঁজিবাদি শাসন কাঠামোয় সব কিছু ব্যাক্তি মালিকানায় এখন বিশ্বাসি হয়ে পড়ছে সমাজ। তিনি তাঁর ‘ভবিষ্যৎ সমাজ’ প্রবন্ধে সুচিন্তিত
মতামত দিয়ে বলেন- “ মানুষ তার নিজ দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করবে অভাবমুক্ত
সমাজে’’। তাঁর স্বপ্ন জাগরণে ছিল মানব মুক্তি –
“পুর্নবার ফিরে আসে তিতুমীর, বিরসা, সিধু
দিব্যক, মঙ্গল পাঁড়ে. রোডেসীয়া,
লুমুম্বা, লেনিন
একেকটি তরঙ্গ”। (সময়ের হাতে)
তাঁর কাব্যভাবনায় পঞ্চাশ দশক-চিহ্নিত যৌবনের যে অতৃপ্তি ও যন্ত্রণাবোধ তা-ই যেন এ কবিতার
পঙক্তিতে ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন:
কৈশোর গেছে উনপঞ্চাশী
বজ্রে
সে যে কী জ্বালার দুঃসহতম ভ্রান্তি
তাঁর কবিতা রচনায় শব্দ ও শব্দ-প্রকরণ, ছন্দ ও ধ্বনিময়তার বিন্দুমাত্র
বিচ্যুতি ছিল না। প্রেমের কবিতাতেও তিনি জানাতে ভোলেন না: ‘মানুষের শত ক্ষুধিত মিছিলে মুক্ত/ প্রবাহের ধ্বনি শুনেছি।’
পঞ্চাশের হয়েও তরুণ সান্যাল ‘কৃত্তিবাস’
এবং ‘শতভিষা’— যে দুইটা গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যস্রোত তার থেকে তিনি একেবারে আলাদা ছিলেন এবং কখনোই প্রচলিত ধাঁচের কবিতা লেখেননি।
১৯৫৪ সালে বা ৫৩ সালে ‘কৃত্তিবাস’ বেরোলো, তিনি ‘কৃত্তিবাস’-এর কয়েকটা সংখ্যায় লিখেছিলেন
পরপর। এদিকে ‘পরিচয়’-এ নিয়মিত লিখতেন। ‘সাহিত্যপত্র’-এ লিখতেন। দেশেও লিখতেন। ফলে তাঁর মধ্যে পরস্পরের কবিতা নিয়ে খুব বিরোধিতা ছিল না। তাঁর মতে "আমরা সবাই একটা পরাধীন দেশ থেকে স্বাধীন দেশে এসেছিলাম।
এবং আমার অধিকাংশ কবিবন্ধু পূর্ববঙ্গের অধিবাসী ছিল। যে দেশের প্রকৃতিতে
তারা বড় হয়েছিল সেই তরুণ বয়সে তারা পশ্চিমবঙ্গে
চলে গিয়েছিল। ফলে আমাদের কবিতা আদতে বাংলাদেশী কবিতা ছিল। ফলে জীবনানন্দের মাছরাঙা, আমাদের দেশে নদী, আমাদের দেশের পশ্চিমবঙ্গের এটা ওটা সব মিলিয়ে সেগুলো আমাদের কবিতাতে আসত। ফলে এই কবিতার ভেতরে সুনীলও যা লিখেছে, আমি যা লিখেছি, শক্তিও যা লিখেছে, যদিও শক্তি পশ্চিমবঙ্গবাসী কিন্তু তার ঝোঁকটা ছিল আমাদের সাথে, সে যা লিখছে তার সঙ্গে জীবনানন্দ দাসের কোনো তফাত নেই।"
তরুণ সান্যাল, এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,
"আল মাহমুদ আমার সমবয়সী বন্ধু। একই সময়ে লিখেছি। শামসুর রাহমান সামান্য বড়। আর অনেকেই একই প্রজন্মের মানুষ। কিন্তু ঘটনা হলো যে, আমি কবছর আগে বাংলা একাডেমিতে এসেছিলাম,
৯১ না কোন সালে যেন, আমাকে অনেক কবিরা প্রশ্ন করেছিল, আমাদের কবিতা এবং পশ্চিমবঙ্গের কবিতার ভেতর মৌলিক তফাৎ কী দেখেন? আমি যদিও খুব তফাৎ দেখি না, তবু তোমাকে একটা কথা বলি, তোমার লড়াইটা আমাদের চেয়ে বেশি। তার কারণ, ধরো, আমার পেছনের দিকে তাকিয়ে আমি বাল্মিকী থেকে শুরু করে মধ্যযুগের
সমস্ত কবিদের পেয়ে যাই। তারপর ধরো ঈশ্বরগুপ্ত থেকে ধরে একদম রবীন্দ্রনাথকে পাই। তার আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে পাই। পরবর্তীকালে সত্যেন দত্ত হয়ে একদম জীবনানন্দ
আমি পড়েছি। এটা উত্তরাধিকার। আর তোমাদের উত্তরাধিকার,
তুমি ক্ষমা করে দিও, বললাম, তোমার উত্তরাধিকার হলো পাকিস্তান হওয়ার পর। তোমাকে ধাক্কা দিয়ে একদম পাকিস্তানি
করে দিয়েছিল। ফলে তোমার উত্তরাধিকারে রবীন্দ্রনাথ
তো নেই-ই, বরঞ্চ রবীন্দ্রসঙ্গীত বন্ধ করেছিল। নজরুল ইসলামও তোমার নেই। এবং তোমার জীবনানন্দও
নেই। তোমার এগুলো ছিল না। তোমাকে লড়াই করে দখল করতে হয়েছে। ফলে দুটো দুরকম হবে।"
তিনি আরও বলেছেন,
"আমি শুধু তরুণ কবিদের বলব, যারা কবিতা লেখে তাদের জনজাতির গভীরে গোপনে আছে যে মহাস্রোত,
তা হলো যে, তারা চিত্র-বিচিত্র-চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে বিভাসিত হয়, সে বিষয়ে দারুণভাবে
চৈতন্যধর হতে হবে। দ্বিতীয়ত এগুলোকে প্রকাশ করতে গেলে পরে কবিতার ছন্দ সম্পর্কে খুব সচেতন হওয়া দরকার। রবীন্দ্রনাথের গানের অধিকাংশই স্বরবৃত্ত
ছন্দে লেখা। আদতে আমার মনে হয় বাঙালি কবিদের স্বরবৃত্ত ছন্দটা পরীক্ষা করা উচিত। আর অক্ষরবৃত্ত তো স্বাভাবিক, আমাদের দেশের ধর্মই ছিল, আগে বলা হতো মায়ের ছন্দ মেয়েলি ছন্দ, স্বরবৃত্ত। ওটা হলো শূদ্রছন্দ।
আর ব্রাহ্মণ ছন্দ হলো অক্ষরবৃত্ত। যাতে সমস্ত পণ্ডিতদের
বইপুস্তক লেখা। পাঁচটা বৃত্ত রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে বিকশিত হয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে শুরুতে স্বরবৃত্ত,
পরে অক্ষরবৃত্ত,
এরপর দুটো মিলে মাত্রাবৃত্ত। কথনের ভেতর অক্ষরবৃত্ত।
উভয় মিলে মাত্রাবৃত্ত। এগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। প্রত্যেকটি কবিতাই একটি বিস্তৃত চিত্রকল্প। কবিতাটা যেন সেই চিত্রকল্পের উপযুক্ত প্রাসঙ্গিকতা পায়। আর মানুষকে ছাড়া কবিতা হয় না। ফলে মানুষকে বাদ দিয়ে অন্যকিছু হতে পারে, কবিতা হবে না। একেকটা কবিতার ভেতরে একেকটা বিশ্বজগত ঘুমায়।"
তরুণ সান্যাল নিজেই বলেছেন, তিনি খুব দুঃখী প্রজন্মের মানুষ। কারণ দেশ ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একটা বড় দুর্ভিক্ষ
দেখেছেন। আন্দোলন দেখেছেন। মানুষকে মরতে দেখেছেন। এবং নানা রকম আর্ত অবস্থায় তাদের দেখেছেন। তাঁর কাছে দুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট— স্বদেশ।
কবিতা লেখা নিয়ে তিনি বলেছেন,
"তুমি যা লিখবে আমি যা লিখব, এই সমস্ত ক্ষেত্রে একটা প্রজন্মের
পর প্রজন্ম মানুষের সৃজনধর্মিতা
থাকবে।"
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের অশেষ আশার অভিব্যক্তি হৃদয়ে অনুভব করে কবি, যখন ‘মানুষ দুঃসহ ক্রোধে মাথা ঠোকে রাতের তিমিরে’, প্রার্থনা
শুধু রৌদ্রের।
........................... ‘তোমাকেই দীর্ণ দীন জীবনের নক্ষত্রবিলাসে/ বারবার উন্মোচন করি’।
ব্যক্তিগত
বেদনার সঙ্গে মানুষের বেদনায় কবি লেখেন– ‘এমন অকাল মৃত্যু স্বদেশের স্বকীয় শিবিরে/ জুড়ে আছে।’ তবু আশা জাগে– ‘আমার বিশ্বাসে প্রেম/আমার সত্তায় বিজয়িনী।’
তাঁর কাব্যগ্রন্থেই অসাধারণ চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে:
"বেদনার নিখিলে মিশিয়ে
আমার কুণ্ঠিত প্রেম এককোণে শিশিরের জলে
কালের পাষাণে ম্লান ছবি আঁকে।"
‘অন্ধকার উদ্যানে যে নদী’ (১৯৬১) ও ‘রণক্ষেত্রে দীর্ঘবেলা
একা’ (১৯৬৮) কাব্যগ্রন্থদু’টিতে ‘অতি ব্যক্তিগত’
কথারা ফুটে ওঠে:
"বাতাস দিয়ো না আমার শিওরে দোলা,
শোনো টুপটাপ রাতের শিশির ঝরে,
কার হৃদয়ের দুয়ার এখনও খোলা
আলোছায়া মুখ, কার মুখ মনে পড়ে"
কিংবা
"ভালোবাসা সবুজ কলম, ঠোঁটে কালি
কিন্তু আলো যদি ছোঁয় তোমার চিবুক
সব কালি ম্লান হয়ে যায়।"
চতুর্থ পেরেক (১৯৮১), কায়া নৌকায় (১৯৮৯), নিতান্ত পুঁতির টায়রা (১৯৯০) এবং কবি এক জাগে (১৯৯৫) কাব্যগ্রন্থগুলিতে আশাহতের বেদনা জাগে। ‘সর্বনাশ ও সর্বস্ব’ সমাজজীবনে
যেখানে কবিমন ক্ষয়িষ্ণু, আত্মসর্বস্ব,
স্বার্থজর্জরিত মানব সভ্যতার সমাধি-লিপি রচিত হয়েছে-
“প্রভু চলেছেন কাঁধে ক্রূশকাঠ গলগোদার দিকে / প্রভু চলিছেন / মুক্তি কাঁটার মুকুটে বিঁধে আছে / না, তোমারও মুক্তি নেই, যাও / সিংহের দাঁতের নীচে, ঘাতকের খড়গের তলায়, যাও / প্রভুর নির্দেশ (
চতুর্থ পেরেক)। তাঁর চেতনায় তৈরি হয়েছে তাঁর জীবনবোধ ও কাব্যভাবনায় আচ্ছন্ন কবির মন দোলাচলে, সংশয়ে।
কবি তরুণ সান্যালের
কাব্যভাষা পঞ্চাশের অন্য কবিদের থেকে শত মাইল দূরে। তিনি তাঁর সময়ের মধ্যেই এক স্বতন্ত্র
কণ্ঠস্বর। তিনি নির্দ্বিধায় জনতার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের
ভূমি থেকে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচ্যুতি তাঁকে উদ্বেল করেছে, শ্রেণি ও সমাজের প্রতি তাঁর যে দায়বদ্ধতা,
শুধু কাব্যজীবনের
মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, আর আমরা পেয়েছি এক প্রতিবাদী
কণ্ঠস্বরকে, যিনি নির্দ্বিধায় জনতার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের
ভূমি থেকেই। তাই বলতে পারি তিনি স্বাধীনতা সময়বর্তী কবি হলেও আজও কবির ভাবনা অমিল, কালগত দিক থেকে এখনও তাঁর ভাবনা, জীবন-দর্শন সমান ভাবে প্রযোজ্য।